সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৪)

চঞ্চল আশরাফ | ৩ জুলাই ২০০৮ ১০:৫৮ অপরাহ্ন

কিস্তি:

humayun-a.jpg
সমুদ্রে হুমায়ুন আজাদ

১৯৯২ সালের খুব সম্ভবত মধ্য জানুয়ারির কোনও এক সকালে কলাভবনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শীতকালীন কবিতা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজক ছিলেন আবীর বাঙালী। তিনি তখন বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় পর্বের ছাত্র। করতেন ছাত্রদল, কিন্তু হুমায়ুন আজাদের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। সাপ্তাহিক পূর্বাভাস-এ খালেদা জিয়া সম্পর্কে গরিব গ্রহের রূপসী প্রধানমন্ত্রী নামে প্রকাশিত কলামটি তাঁকে আবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এটি ১৯৯১ সালের ঘটনা। তখন ছাত্রদলের ক্যাডাররা হুমায়ুন আজাদের হাত কেটে ফেলবে ব’লে হুমকি দিলে তিনি সম্ভবত প্রথমবারের মতো সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। আবীর বাঙালী দলবল নিয়ে তাঁকে বাসা থেকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসতেন এবং বাসায় পৌঁছে দিতেন বলে শুনেছি। যা-ই হোক, ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হুমায়ুন আজাদ। বেশ উঁচু করে বানানো মঞ্চে তিনি কেডস খুলে উঠে বসেন। তাঁর পরনে নীল-শাদা-লাল কম্বিনেশনে হরাইজন্টাল স্ট্রাইপের সোয়েটার আর জিন্সের প্যান্ট। অনুষ্ঠানটি ছিল এলোমেলো; সভাপতির বক্তব্যের পরও কবিতা পাঠ চলেছিল দীর্ঘক্ষণ। মনে পড়ে, হুমায়ুন আজাদ বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে আমি আসতে চাই নি। মাইক এখন দালালি আর গালাগালির যন্ত্র; এই যন্ত্রের সামনে আমি দাঁড়াতে যন্ত্রণা বোধ করি। আবীর বাঙালী আমার ছাত্র, তার প্রবল পীড়নে আমাকে এখানে আসতে হয়েছে। আমি মনে করি, কবিদের মাইক আর মঞ্চ বর্জন করা উচিত। কারণ, এই দু’টি জিনিস কবিতার ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। মাইক আর মঞ্চের কাছে কবিরা এখন অসহায়; এ-দু’টি জিনিসই নির্ধারণ করছে কবিতা কীভাবে লিখতে হবে।’

ওই অনুষ্ঠানে জেনিস মাহমুন তাঁর ‘ওম কবিতাম্মৃত’ কবিতাটি পড়েন। সত্যি বলতে কী, কবিতাটি উপস্থিত প্রায় সবাইকে প্রথমত চমকে দেয়, দ্বিতীয়ত মুহ্যমান করে। পরদিন হুমায়ুন আজাদ আমাকে বলেন, ‘কবিতাটি লেখা হয়েছে মঞ্চের জন্যে। কিন্তু মঞ্চের কবিতা এত ভালো হয় না। কবিকে একদিন আমার কাছে নিয়ে এসো।’ আন্ওয়ার আহমদের বাসায় এবং বাংলা একাডেমীর তরুণ লেখক প্রকল্পে রিসোর্স পার্সন হিসেবে জেনিসের কবিতাটির প্রশংসা করেন তিনি। ১৯৯২ সালে, একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে বাংলা একাডেমীর মঞ্চে জেনিস কবিতাটি দ্বিতীয়বারের মতো পড়েন। সেখানেও শ্রোতারা আচ্ছন্ন হয়ে যান কিছুক্ষণের জন্য। কবিতা পড়া শেষ হলে নরেন বিশ্বাস ও সৈয়দ শামসুল হক তাঁকে খুঁজতে থাকেন; সেই বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছনোর আগেই তিনি মঞ্চের পেছন দিয়ে সেদিনের জনস্রোতে মিশে যান। বলতে পারি, সেই সময়ের এবং এখনকার শ্রেষ্ঠ একটি কবিতা ‘ওম কবিতাম্মৃত’। শ্রেষ্ঠ ও অসাধারণ; এজন্যে — এর আগে ও পরের রচনাগুলো থেকে এটি আলাদা। কবিতাটির অংশ বিশেষ :

ওমকবিতাম্মৃত কবিতাম্মৃত
ওমঅগ্নি অগ্নি বোধের হোমাগ্নি
অধমুখি ঊর্ধ্বমুখি ধোঁয়ারা বেগুনি
ওমস্নায়ুর ঘন্টি গভীর ঘন্টি
তৃষিত অঞ্জলি পূর্ণ পুণ্য
ওমকবিতাম্মৃত কবিতাম্মৃত

ওমদিবস রাত্রির মধ্য সীমানায়
ওমস্বপ্ন বাস্তবের মধ্য সীমানায়
বর্ণ স্তূতি গন্ধ স্তূতি
ওমদৃশ্য স্তূতি স্পর্শ স্তূতি

ওমচেতনার দ্রাক্ষারসে
মাতাল আত্মা হবে
মানুষে নমিত

হুমায়ুন আজাদ সমকালীন কোনও কবিতার প্রশংসা করতেন না। অন্তত কারও কবিতা নিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট হতে আমি দেখি নি। ব্যতিক্রম এই ‘ওম কবিতাম্মৃত’। এই নামে জেনিসের কবিতার একটি বই বেরোয়, ১৯৯৩ সালে। একই বছর, সম্ভবত, মাসুদ খানের পাখিতীর্থদিনে প্রকাশিত হয়। দুঃখিত নই, তবু বলি, আমার আর জেনিসের বই নিয়ে কোনও আলোচনাই তেমন করে হয় নি। কারণ, তখন (এবং এখনও), গ্রুপ বা দল কিংবা ফিল্ডওঅর্ক ছাড়া তরুণ কবির আলোচিত হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। এর কোনওটাই আমার আর জেনিসের হয়ে ওঠে নি। কারও ডাক পড়লে এবং সম্ভব হলে বা মন-মেজাজ ভালো থাকলে নিজেদের দু’একটা কবিতা পড়ে শোনাতে পারাটাই আত্মপ্রচারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট বলে মনে হয়েছিল। আমার বইটি নিয়ে টুটাফাটা আলোচনা অবশ্য হয়েছিল, সূচক-এ কবির হুমায়ুন আর বরিশাল থেকে বেরোনো অক্ষর-এ হাবিবুর রহমান হাবিব (নাম ভুল হতে পারে; কারণ পত্রিকার সেই কপিটি হারিয়ে ফেলেছি। ক্ষমা করবেন না, নামটি জানাবেন, ভুল হয়ে থাকলে) সেটি করেছিলেন। কিন্তু জেনিসের বইটি নিয়ে কোনও আলোচনাই হয় নি। তা না হোক, পরোয়া তিনি করেন নি। বলা দরকার, মাসুদ খানের পাখিতীর্থদিনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে তরুণ কবি ও সাহিত্যমনস্কদের মধ্যে। বেশ ঘটা করেই বইটি বের হয় — এর প্রুফ দেখেছিলেন সাজ্জাদ শরিফ, সেটিও আলোচনার বিষয় ছিল তখন। ১৯৯৪ সালে বের হয় শান্তনু চৌধুরীর উৎস থেকে বহ্নি থেকে এবং বইটি পরের বছরেই ছোট কাগজ দ্রষ্টব্য-র বিষয় হয়ে যায়; আর শান্তনু চৌধুরীর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। আর এসব উপভোগ করা ছাড়া আমাদের কোনও উপায় ছিল না। ছফা ভাই [আমার চিরনমস্য আহমদ ছফা (১৯৪৩ — ২০০১)] এই উপভোগের কথা শুনে হাসতে হাসতে সত্তরের দশকে লন্ডনে বেড়ে-চলা ধর্ষণের ঘটনায় ভিক্টিমের যন্ত্রণা ও মৃত্যু এড়াতে ব্রিটিশ সরকারের একটি প্রচারমূলক সক্রিয়তার কথা বলেন। সেটি হল একটি পোস্টার টানেলে, বাসস্টপে, মাটির তলার রেলস্টেশনে লাগিয়ে দেয়া; তার বক্তব্য মোটামুটি এরকম: ইফ দেয়ার ইজ নো ওয়ে টু গেট রিড অব দ্য রেপিস্ট, হোয়াই ইউ ডোন্ট এনজয় দ্য সেক্স?

হুমায়ুন আজাদের দিকে ফিরে আসি। তরুণদের কবিতা নিয়ে হতাশা থাকা সত্ত্বেও জেনিসের ‘ওম কবিতাম্মৃত’ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে যতবার তাঁর মুখোমুখি হতাম, প্রায় ততবার তিনি কবিতাটির কথা বলতেন। একদিন তরুণদের ব্যাপারে তাঁর এই নেতিবাচক মনোভাব ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিভা হয়তো আছে, কিন্তু আমার আশেপাশে তো তাদের দেখছি না!’ বললাম, ‘কথাটার অর্থ কি এই যে, প্রতিভারা (যদি থাকে) আপনাকে ঘিরে থাকুক, অন্তত কাছাকাছি থাকুক বা যোগাযোগ রাখুক আপনার সঙ্গে, এটা আপনি চাইছেন! না-কি এটা আপনি বোঝাতে চান, আশপাশে থাকার মতো আপনার কাছাকাছি মানের প্রতিভাই নেই!’ ১৯৯২-র মাঝামাঝি, বৃষ্টিজড়িত কোনও এক দুপুরে আমার পরের ব্যাচের কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সামনে তিনি আমাকে বলেন, ‘এখন বেরোও!’ বললাম, ‘আমি যাচ্ছি স্যার। কিন্তু এর তো একটা জবাব থাকবে। আর সেটা না-জেনে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে?’

একটা সিগারেট বের করলেন প্যাকেট থেকে, (তখন তাঁর ব্র্যান্ড গোল্ড লিফ এবং এর প্যাকেট ছিল গাঢ় লাল) সেটি ঠুকতে লাগলেন প্যাকেটে; বললেন, ‘কোনও প্রতিভা এখন আসলে নেই। আমার কাছাকাছি দাঁড়ানোর মতো প্রতিভা তো আরও পরের ব্যাপার। ওই যে, ছেলেটা, ওম ওম… এটা তো সে লিখেছে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে। হঠাৎ এরকম একটা দু’টো রচনা সাহিত্যে দেখা দিতেই পারে। যেমন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’। যদিও নিয়ন্ত্রণহীন উত্তেজনায় রচনাটি ব্যর্থ ও হাস্যকর হয়ে পড়েছে।’

‘স্যার, দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যাপারটি সব কবির মধ্যে কম-বেশি থাকে। কিন্তু প্রতিভা ছাড়া একটা আলাদা রকমের কবিতা কেমন ক’রে সম্ভব?’

সিগারেটটায় আগুন দিয়ে প্রথম টানের একগাল ধোঁয়া ছেড়ে তিনি বললেন, ‘একটু-আধটু সৃষ্টিশীলতা থাকলেই চলে।’

‘প্রতিভা… সৃষ্টিশীলতা… বুঝলাম না স্যার।’

‘পড়াশোনা ঠিকমতো করো? মানুষ মাত্রই সৃষ্টিশীল। যারা কবিতা লেখে না, ছবি আঁকে না, তারাও সৃষ্টিশীল। চমস্কির নাম শুনেছ? তাঁর কথা হল, প্রতিদিন মানুষ উচ্চারণ করে অসংখ্য সৃষ্টিশীল বাক্য। কিন্তু তারা এসবের খোঁজ রাখে না।’ বলে এ্যাশট্রেতে ছাই ফেললেন।

বললাম, ‘কোনও কবিতাই সাধারণ মানুষের সৃষ্টিশীলতার মানদণ্ডে বিবেচিত হতে পারে না।’

‘তোমাকে বেশ আগেই আমি যেতে বলেছি।’

বুঝলাম, আমাকে এখন তাঁর আর স্বস্তিকর মনে হচ্ছে না। কিন্তু উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নহীনতা, ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি আর নৈঃশব্দ্য ছিল বিস্ময়কর। আমি বেরিয়ে এলাম। বৃষ্টি থেমেছিল তখন নিশ্চয়, নইলে, সেই ভবন থেকে বেরিয়ে আমি কলাভবনে গেলাম কী ক’রে? বাংলা বিভাগের সামনে আমাকে দেখে জুন আপা (মেহের নিগার; সে-সময়ের বিখ্যাত বিতার্কিক, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক) বললেন, ‘কী ব্যাপার, তোমাকে বেশ বিমর্ষ মনে হচ্ছে!’ তিনি তখন বিটিভিতে উপহার নামের একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করতেন, অভিনয়ও করতেন। বিটিভিতে তাঁর উপস্থাপনা ও অভিনয়ের খবর শুনে হুমায়ুন আজাদ মর্মাহত হন। মনে পড়ে, এক সকালে লেকচার থিয়েটারের সেই কক্ষে কোনও এক কারণে (মনে করতে পারছি না) তাঁর প্রসঙ্গ উঠলে আক্ষেপ ক’রে বলেছিলেন, ‘আমার এই চিন্তাশীল প্রিয় ছাত্রী বিশ ইঞ্চি পর্দার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তাকে হারিয়ে ফেলেছি, যেমন আমি হারিয়েছি সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীকে। সে আমার বন্ধু ছিল।’

যা-ই হোক, পুরো ব্যাপারটা শুনে এ-নিয়ে মন খারাপ করতে বারণ করলেন তিনি। তাঁর কথা, শিক্ষক যে আচরণই করুন না কেন, তাতে ছাত্রের মন খারাপ হতে নেই।

জেনিস মাহমুনকে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া, বলতে গেলে, হয়ে ওঠে নি আমার। আর তিনিও এই সাক্ষাতের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর সৃষ্টিশীলতা তখন এতটাই তুঙ্গে যে, এসবের তোয়াক্কা করার সময় তিনি পান নি। অথচ, বাংলা বিভাগের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও সালাউদ্দীন আইয়ুবকে হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কাজটি আমাকেই করতে হয়েছিল; কাজটি সালাউদ্দীন নিজেই করতে পারতেন, অন্তত এই সূত্রে যে, বিভাগের ছাত্র হিসেবে তিনি আমার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন। ‘তুমি যখন স্যারকে নিয়ে আন্ওয়ার ভাইয়ের বাসায় আসবে, আমি সেখানে আগে থেকেই থাকব। উনার সঙ্গে আমার পরিচয়টা তুমিই করিয়ে দিও।’ আগের দিন সন্ধ্যায়, নিজের বাসায় সালাউদ্দীন আমাকে কথাটি বলেছিলেন। যদিও তিনি তখনকার নবীন পণ্ডিত, হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দৃশ্যটি ছিল বড়ই মর্মান্তিক। যেন তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর বিগলিত হাসিসুদ্ধ লুটিয়ে পড়ছেন। কোনও মেধাবীর এমন অবস্থা দুঃস্বপ্নেও দুর্লভ। তো, লুটিয়ে পড়ার আগে বিছানার পাশে-থাকা মোড়াটা দেখিয়ে আন্ওয়ার ভাই তাঁকে বসতে বললেন।

এর মধ্যে আমি একবার অসুস্থ হয়ে পড়ি। ফলে, আন্ওয়ার ভাইয়ের বাসায় যাওয়া সপ্তাখানেকের জন্যে বন্ধ হয়ে যায়। সুস্থ হওয়ার পর আবার যাওয়া শুরু হয় এবং সালাউদ্দীন আইয়ুবসহ সন্ধ্যায় ইস্কাটন থেকে বেইলি রোডের উদ্দেশ্যে রওনা হই। খুব খুশি দেখাচ্ছিল তাঁকে; রিকশায় উঠে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হুমায়ুন আজাদের সাথে গতকাল মদ্যপান করলাম।’

বলা বাহুল্য নয় যে, সাহিত্য চর্চার শুরুতে আমি বেশ কিছু বিদেশি কবিতা অনুবাদ করেছি। টি এস এলিয়ট, ই ই কামিংস, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, সিলভিয়া প্লাথ, ফিলিপ লারকিন, এডওঅর্ড বন্ড, রবার্ট পেন ওয়ারেন — এঁদের মধ্যে এলিয়ট আর সিলভিয়ার কবিতাই ভালো লাগত বেশি; আমার বন্ধু এবরার সাইপ্রাস থেকে কালেক্টেড ওয়র্কস অব সিলভিয়া প্লাথ (খুব সম্ভবত এটাই নাম, বইটির) নিয়ে আসে। প্রচ্ছদে কালোর মধ্যে সোনালি রঙে ছাপা নামলিপির বইটি দেখে আমি দিশেহারা হয়ে যাই। সূচিতে দেখি যে তাঁর আত্মজৈবনিক দ্য বেল জার বইটিতে আছে। মাথায় আরও গোলমাল লাগল — এতদিন এর নাম শুনে আসছি, আর এখন একেবারে হাতেই! ভাগ্য ভালো যে সঙ্গে একটা ব্যাগ ছিল (প্রায় সব সময়ই তা থাকত) এবং এবরার ভিতরের ঘরে যাওয়ামাত্র সেটা ঢুকিয়ে ফেলি। ঠিক করি যে, প্রাণত্যাগের আগ পর্যন্ত বইটি সঙ্গেই রাখব। কেননা, সেই সময়ের তরুণ কবিদের অনেকেই ছিল আত্মহত্যাকারী এই কবির প্রতি বিশেষ অনুরাগী। আত্মহত্যার ব্যাপারেও অনেকের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তো, বেহাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এবং অতি অনুরাগবশত কিছুদিন বইটি নিয়ে আমাকে চলাচল করতে হয়। এক বিকালে, ১৯৯২-র বইমেলায়, হুমায়ুন আজাদের সামনে দিয়ে যেতেই তিনি আমাকে ডাকলেন। কাছে দাঁড়াতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার হাতে ওটা কী বই?’

বললাম, ‘সিলভিয়া প্লাথের বই স্যার।’

‘এই গৌণ কবিকে নিয়ে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছ?’

বুঝলাম, এর আগে বইটি তিনি ক্যাম্পাসে আমার হাতে লক্ষ করেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা আড়াল করার চেষ্টা চালাতে গিয়ে সিলভিয়া প্লাথের পক্ষ নিলাম। বললাম, ‘আপনার কথাটা ঠিক না স্যার। সিলভিয়া চল্লিশের দশকের কবিদের মধ্যে প্রধান, যাঁদের হাতে কনফেশনাল কবিতার ধারাটি সৃষ্টি হয়েছিল। এলিয়টের পর এটা ছিল ইংরেজি কবিতার বড় একটা বাঁক, যা শামসুর রাহমানকেও প্রভাবিত করেছে। কিন্তু নিঃসঙ্গ শেরপায় এ-নিয়ে একটা কথাও নাই।’

‘খুব পণ্ডিত হয়েছ তা হলে?’

‘না স্যার, আসলে আমি বইটি হাতছাড়া করতে চাই না। সে-জন্যেই হাতে নিয়ে ঘুরি।’

তিনি চলে যাওয়ার জন্যে পা চালাতেই আমি বললাম, ‘কিন্তু এটা তো বললেন না কেন সিলভিয়া গৌণ কবি।’

আমার দিকে তাকালেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর আয়েশি কায়দায় হাঁটা দিলেন। এর তিন-চার দিন পর বইটি গায়েব হয়ে গেল।

প্রাতিস্বিক (সম্পাদক: মিহির মুসাকী; ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত এর ৪টি সংখ্যা বেরোয়) ২য় সংখ্যার (ফেব্র“য়ারিÑএপ্রিল ১৯৯২) জন্যে প্রেমের কবিতা বিষয়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণের দায়িত্বটি আসে আমার ওপর। কাজটি করতে গিয়ে খুব মজার দু’টো অভিজ্ঞতা হয়। একটি নির্মলেন্দু গুণ, অন্যটি হুমায়ুন আজাদ থেকে। তখন বিশ্বকাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছিল। নিউমার্কেটের প্রগতি প্রকাশনীতে (বইয়ের দোকান, এখন নেই) গুণদা প্রায়ই আসেন শুনে আমি সেখানে যাওয়া শুরু করি। প্রথম তিন দিন তাঁর দেখা মিলল না। হয় তিনি একটু আগে বেরিয়ে যান নয় তো আসেন না। এক দুপুরে সৈকত (বাংলা বিভাগের ছাত্র) জানাল যে, গুণদাকে সে প্রগতিতে বসে থাকতে দেখেছে। পড়িমরি ছুটলাম আমি। পৌঁছে দেখি, তিনি দৈনিক সংবাদ-এর খেলার পাতা পড়ছেন। পাশের চেয়ারে বসে আছে একটি মেয়ে। পত্রিকা পড়ার ব্যাঘাত হবে ভেবে তাঁর কাছে না-গিয়ে আমি শেলফের বই দেখতে লাগলাম আর চোরা-চোখে লক্ষ রাখলাম কখন তিনি মুখ তোলেন পত্রিকা থেকে। না, তার কোনও লক্ষণ দেখা গেল না। এর মধ্যে টেবিলে দুপুরের খাবার সাজিয়ে রেখে গেছে শাদা শার্ট ও ছাইরঙা প্যান্ট-পরা খোঁচা-খোঁচা গোঁফ-দাড়ির একটা লোক। এতেও ব্যাঘাত ঘটল না। মেয়েটিও খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে (অবশ্য, তখন বুঝতে পারলাম, সে তাঁর কন্যা মৃত্তিকা) ব্যর্থ হল। ওদিকে মিহির ভাই ক্যাম্পাসে হাকিম ভাইয়ের চা-দোকানে বসে আছেন। আসার সময় বলেছেন, ‘অন্তত তারিখটা জেনে এসো।’ কিন্তু গুণদার মনোযোগ যেন আরও গভীর হচ্ছে। পত্রিকায় চোখ রেখেই তিনি কন্যাকে বললেন, ‘খেয়ে নাও।’ অধৈর্য হয়ে আমি একটা কাণ্ড করে বসলাম: শেলফ থেকে বেশ ক’টি বই নিয়ে মেঝেয় দিলাম ফেলে। ভাবখানা এমন, যেন পড়ে গেছে হাত থেকে। কিন্তু পুস্তকপতনের সেই শব্দ তুলে ধরল নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত মুখ, বেশ কাজ হল বলতে পারি। তিনি আমার দিকে তাকালেন। দোকান-কর্মচারি বইগুলো তুলে শেলফে রাখার সময় বললাম, ‘সারা শেলফ তন্ন-তন্ন করে দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী পেলাম না, শালার দিনটাই বরবাদ হয়ে গেল!’ তিনি পূর্ববৎ তাকিয়ে রইলেন। তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম। এবার বললাম, ‘আমি চঞ্চল আশরাফ, আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই।’

‘কোন পত্রিকার জন্যে?’

‘একটা ছোটকাগজ, প্রাতিস্বিকের জন্যে।’

‘এখন আমি খেলছি।’

‘আমি দেখছি আপনি পত্রিকা পড়ছেন।’

‘সবাই দেখছে। বুঝতেও পারছে। তুমি ছাড়া।’

‘খেলা কখন শেষ হবে?’

‘দেরি হবে। ২৫ তারিখে।’

কন্যাটি বলল, ‘বাবা, ২৩ তারিখে তো আমার জন্মদিন।’

‘হ্যাঁ, তোমার জন্মদিনটাই শুধু হবে।’

বুঝলাম, তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া আপাতত সম্ভব নয়। কারণ, পত্রিকাটি প্রেসে যাবে ফাইনাল খেলার অন্তত সপ্তাখানেক আগেই। সংখ্যাটি ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল। এবার বের করতে না-পারলে আর এ-বছরে বেরোবে না। কারণ, এরপর পরীক্ষার ঝামেলা। অন্যদিকে, ফাইনাল খেলার কত দিন পর অখ্যাত ও লেখক-সম্মানী দিতে অক্ষম এই পত্রিকার জন্যে ‘কবিমশাই’ সামান্য ‘অসামান্য’ সময় দেবেন তা অনিশ্চিত। ফলে হাকিম ভাইয়ের দোকানের চা-য় চুমুক দিতে দিতে নির্মলেন্দু গুণকে ওই আইটেমের ফর্দ থেকে মুক্তি দেয়া হল। বিকল্প হিসেবে মুহম্মদ নূরুল হুদার নাম এল। এইজন্যে যে, কাছেই বাংলা একাডেমী, খুব তাড়াতাড়ি তাঁর সাক্ষাৎকারটি পাওয়া যাবে। মিহির মুসাকীর সহযোগিতায় তা গেলও। আমাদের যিনি আধুনিক কবিতা ও বাংলাদেশের কবিতা পড়াতেন, বেগম আকতার কামালের সাক্ষাৎকারটিও কাম্য সময়ের মধ্যেই পাওয়া গেল। বলা বাহুল্য নয়, সবই লিখিত আকারে।

বাকি রইলেন হুমায়ুন আজাদ। তাঁকে ক্যাম্পাসে না-পেয়ে ফুলার রোডের সেই বাসায় গেলাম। দরজা খুলে তাঁর কন্যা মৌলি বলল, ‘আব্বু তো বাসায় নাই, আপনি একটু দাঁড়ান।’ তখন দুপুর। স্কুলফেরত বালক-বালিকার মুখগুলি ফুলার রোডে ইউনিফর্ম আর রোদে জড়িয়ে রিকশায় চলেছে, বা, হাঁটছে, দৌড়ুচ্ছে ঘাসে, এলোমেলো দৌড়ে মাঠ পার হয়ে কোনও-কোনও ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ছে, মনে পড়ে। ‘আমি যখন ঢাকায় পড়াশোনা করতে আসি, আমার সহপাঠিরা দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমাতো। আমি শুয়ে-শুয়ে পড়তাম বই। ফাঁকে-ফাঁকে দেখতাম গাছ-আকাশ, খুব গরম আর বৃষ্টি না-থাকলে কাছে কোথাও হেঁটে আসতাম।’ তাঁর ছাত্রজীবন সম্পর্কে তিনি কথাটি বলেছিলেন। সামান্য পরে মৌলি এল একটা খাতা নিয়ে, সম্ভবত ওর; শেষের পাতাটি দেখিয়ে বলল, ‘আসার কারণ এখানে লিখে দিয়ে যান।’

‘তার দরকার নাই। আমার কথা বললেই চলবে।’

‘না-না। লিখে দিয়ে যান। আমার যদি মনে না থাকে?’

বললাম, ‘যদি আমার লেখা কাগজটা দিতে মনে না থাকে?’

‘আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি আব্বুকে বলে দিব।’

‘আচ্ছা, দাও খাতাটা। লিখছি।’

মৌলি কি রেগেছিল? নইলে, বসতে পর্যন্ত বলল না কেন? কী কাজে এসেছি তা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই লিখতে হল। আর সে ছিল দাঁড়িয়ে, দরজার পাল্লা ধরে, ভিতরে।

পরদিন সকালে, বাংলা বিভাগের করিডোরে আমাকে দেখেই বলে উঠলেন তিনি, ‘তুমি কি গতকাল মৌলির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলে?’

হতভম্ব হয়ে গেলাম। তবু বাসায় যাওয়ার কারণটা বলতে পারলাম। এ-ও পারলাম বলতে, ‘আপনি বলে থাকেন যে বাঙালি জাতিগতভাবে খুবই অভদ্র, বাসায় গেলে তারা দাঁড়াতে বলে, যদিও তাদের থাকে বসবার জন্যে সাজানো-গোছানো একটা ঘর। স্যার, আপনার বাসার দরজায় দাঁড়িয়েই আমাকে ওটা লিখতে হয়েছিল।’

‘তুমি কি সেজন্যে দুঃখিত?’

‘আপনি সাক্ষাৎকারটা দিলেই হবে স্যার।’

তিনি বারোটার কিছু আগে তাঁর রুমে আমাকে যেতে বললেন। গেলাম। লিখিত সে-সব প্রশ্নের কাগজটি তাঁকে দিলে বললেন যে, উত্তরগুলো তিনি লিখে রাখবেন এবং বাসায় রেখে যাবেন। কারণ বাইরে তাঁর একটা কাজ আছে। পরদিন বিকালে সেটি নিয়ে আসতে হবে।

(কিস্তি ৫)

মনিপুরী পাড়া, ঢাকা ২/৭/৮

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: চঞ্চল আশরাফ
ইমেইল: chanchalashraf1969@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (11) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুলিয়ান সিদ্দিকী — জুলাই ৪, ২০০৮ @ ৭:৫৪ পূর্বাহ্ন

      পড়ছি। ভালো লাগেছ। লিখিত সাক্ষাৎকারটি কি হুবহু তুলে দিতে পারবেন? তাহলে খুবই ভালো হয়। সব শেষে পুরো লোখাটির একটি পিডিএফ লিংক আশা করা কি খুব বেশি চাওয়া হবে?

      পরবর্তী লেখার অপেক্ষায়। ধন্যবাদ।

      জুলিয়ান সিদ্দিকী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Miti — জুলাই ৫, ২০০৮ @ ৭:৫৩ অপরাহ্ন

      অনেকদিন পর চঞ্চল আশরাফের লেখা পড়তে পেরে ভাল লাগল। প্রতি সপ্তাহে চঞ্চলের লেখা এখানে থাকতে পারে না। চঞ্চল বেশ খোলামেলা বলে দেন। কোনো রাখঢাক নেই। তাঁর এই বলার ভঙ্গীটি আমাকে খুব আকর্ষণ করে। যেমন আকর্ষণ করে কবি চঞ্চল আশরাফের কবিতা। চঞ্চল আশরাফের কবিতার ভেতর অন্যরকম একটা টান অনুভব করি। ব্যক্তি চঞ্চল আশরাফের আকর্ষণও বা কম কী? এখনও স্মরণ করতে পারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তরুণ চঞ্চল আশরাফকে (অবশ্য চঞ্চল আশরাফরা কখনও বুড়ো হয় না)। চশমার মোটা কাচের আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। তাঁর সেই দীপ্তি চঞ্চলের কবিতার প্রতিটি শব্দে প্রতিভাত হয়। যেমন এই লেখাটিতেও পাওয়া যায় অন্য এক চঞ্চল আশরাফকে। এই লেখাটির পরবর্তী পর্ব কবে আসছে বিডি নিউজে? লেখাটি সবার আগে আমি পড়তে চাই।

      মিতি
      ইন্দিরা রোড, ঢাকা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saikat Biswas — জুলাই ৬, ২০০৮ @ ১:৪১ অপরাহ্ন

      সেদিন বইমেলায় পাশে আমিও ছিলাম।

      সময়টা ৫টার কিছু পরে হবে। ফাঁকা ফাঁকা। তখনও ভিড় বাড়েনি। পুকুর পাড়ে আগামী প্রকাশনীর স্টলে বসা হুমায়ুন আজাদ। সৌভাগ্যবশত, সেসময় আমি দাঁড়ানো হুমায়ুন আজাদের উল্টো দিকে, বই দেখছি। অনতিদূরে আবিদ আনোয়ার। বই ঘাটছেন আর একটা দুটো কথা হচ্ছে। এমন সময় চঞ্চল আশরাফ এসে দাঁড়ালেন সেখানে। হাতে সিলভিয়া প্লাথের বই। সাদা কালো প্রচ্ছদে সোনালী অক্ষরে লেখা। হুমায়ুন আজাদ বললেন “ওঁটা কী বই?” চঞ্চল আশরাফ বললেন, সিলভিয়া প্লাথ। হুমায়ুন আজাদ বললেন “তার বই কি মানুষ এখনও পড়ে?” বলতে বলতেই হাত বাড়িয়ে নিলেন বইটি। উল্টাতে উল্টাতে বললেন “সাইপ্রাসের লাইব্রেরীর সিল মারা দেখছি।” চঞ্চল আশরাফ বললেন, আমার এক বন্ধু ওখানে পড়তে গিয়েছিল, সে নিয়ে এসেছে।” হুমায়ুন আজাদ বললেন, ”বাঙালী ওখানে গিয়েও চুরি করেছে নাকি?” এরপর বইটি ফেরত দিলেন চঞ্চল আশরাফের হাতে। এরকম দু’একটি কথার পর চঞ্চল আশরাফ হেঁটে হেঁটে চলে গেলেন। আমার সেদিনের এই স্মৃতিটুকু স্পষ্ট মনে আছে। ফলে চঞ্চল আশরাফ যে কথাগুলো যেভাবে ইন্টারপ্রিট করে বলছেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমি এর প্রতি সম্মান দেখাতে পারছি না। হুমায়ুন আজাদ বসা ছিলেন আগামীর স্টলের ভিতর। ফলে আয়েসী কায়দায় হাঁটা দিলেন কীভাবে? বরং সাধারণ একজন দর্শক হিসেবে আমার মনে হয়েছে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই চঞ্চল আশরাফ ঐ বইটি ওভাবে হাতে নিয়ে ঘুরছিলেন। আর ওটি ছিল সম্ভবত ৯৪-এর বইমেলা, ৯২-এর তো নয়ই।

      আর “এই গৌণ কবিকে নিয়ে এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছ” হুমায়ুন আজাদ-এর মুখে এটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ সেদিনের সেই সংলাপটি এখনও আমার স্মৃতিতে গেথে আছে।

      মজার বিষয় ক’দিন আগে চঞ্চল আশরাফ-এর লেখার ১ম কিস্তি পড়তে গিয়ে আমার সেই স্মৃতি মনে হচ্ছিল। আর আজ এটি একটু অন্যভাবে তিনি লিখছেন!!!! কারণ হুমায়ুন আজাদ তো আর মৃত্যুর ওপার থেকে এসে বলতে পারবেন না আমি ওটা ওভাবে বলিনি।

      সৈকত বিশ্বাস

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনি আলমগীর — জুলাই ৬, ২০০৮ @ ২:১২ অপরাহ্ন

      চঞ্চল আশরাফের লেখা পড়ার সুযোগ হলো বহুদিন পর। ভালো লাগলো। নিয়মিত লেখা আশা করি।

      অনি আলমগীর

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চঞ্চল আশরাফ — জুলাই ৮, ২০০৮ @ ১১:২৬ অপরাহ্ন

      সৈকত বিশ্বাসের প্রতিক্রিয়ায় লেখকের প্রতিক্রিয়া

      বর্ণিত একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সৈকত বিশ্বাসের দেয়া আরেকটি বিবরণ অসত্য বলে মনে হচ্ছে না। বুঝতে পারছি, আমার এই স্মৃতিচারণে বর্ণিত ঘটনার সত্যাসত্য নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। সেজন্যে তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু যে-ঘটনার বর্ণনা আমি দিয়েছি, তা ঘটেছিল বাংলা একাডেমীর পুকুরের উত্তর-পুব পাশে, তখন বিকাল এবং বইমেলা ফাঁকা। হুমায়ুন আজাদের ওই আয়েশি হাঁটা সম্ভব ছিল মেলা ফাঁকা থাকার কারণেই। তাড়া না-থাকলে, অন্যের শরীরের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি কেউ নেন বলে আমার জানা নেই। সৈকত যে-ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, তা স্মৃতিচারণে লিখিত ঘটনার কয়েকদিন আগেই ঘটেছিল। আর তখন তো সিলভিয়া প্লাথের বইটি সঙ্গেই রাখতাম। এর একটা ফল আমি পেয়েছি: বইটির বেশ ক’টি কবিতা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। এখনও ‘লেডি ল্যাজারাস’, ‘দ্য অ্যারাইভাল অব দ্য বি বক্স’, ‘ড্যাডি’, ‘চাইল্ডলেস উইম্যান’ সহ বেশ ক’টি কবিতার পঙ্‌ক্তি আমার মনে আছে।

      ঘটনাটি কোন বছরের, তা নিয়ে সৈকত আমাকে খানিকটা সংশয়ে ফেলেছেন। কিন্ত তা কোনও মতেই ১৯৯৪ নয়, কারণ, ১৯৯৩-র মার্চের পর কবিতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কখনও আমার আলাপ হয় নি। তবে সালটি ১৯৯২ না-ও হতে পারে। ১৯৯৩ হলেও কোনও সমস্যা নাই। আসলে এসব নিয়ে বাক্য খরচের কোনও প্রয়োজন আমি দেখি না। সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে কেউ স্মৃতিচারণ করতে বসেন কি? একটা প্রশ্ন অবশ্য জাগতে পারে: যদি সৈকত-বর্ণিত ঘটনা অসত্য না হয়, স্মৃতিচারণে তা এড়িয়ে গেলাম কেন? উত্তর এই — ঘটনাটি আমার কাছে খুব সাধারণ মনে হয়েছে। আর, লেখকের একটা সিলেকশন তো থাকেই!

      চঞ্চল আশরাফ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরিফ জেবতিক — জুলাই ৯, ২০০৮ @ ১০:৪৭ অপরাহ্ন

      ধারাবাহিকটি পড়ে যাচ্ছি নিয়মিতই। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে আর কাহিনী এগুচ্ছে না, পাঠক হিসেবে এটা আমার নিজের সমস্যাও হতে পারে।

      যাক, এ পর্বে ইন্টারেস্টিং একটা বিষয় লাগল, একটি বই সংগ্রহ (!) করার পরে সেই বইটি সাথে নিয়ে একজন তরুণ সাহিত্যসেবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকা শহরে। একদিন নয়, হয়তো মাস কিংবা তার চাইতেও বেশি।

      প্রদর্শনের এই প্রক্রিয়াটি আগ্রহ আর কৌতূহল জাগায়, এ ধরনের প্রবণতা আমি অনেকের মাঝেই দেখেছি।

      কে জানে, এই প্রবণতা নিয়েও হয়তো সমাজবিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে লিখতে পারেন তাদের পর্যবেক্ষণ।

      আরিফ জেবতিক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হারেছ — জুলাই ১১, ২০০৮ @ ৪:১৪ অপরাহ্ন

      কবি হিসেবে চঞ্চলের সঙ্গে আমার পরিচয় বেশি দিনের নয়। তবে তার এই লেখাটির একটি আকর্ষণ আছে। পড়ে মজা পাচ্ছি। কতটুকু সত্যি-মিথ্যে জানি না। তবে মজা লাগছে। হুমায়ুন আজাদের মত একজন সজ্জন ব্যক্তি কী করে উনার সঙ্গে এত সময় কাটিয়েছেন সেটাই বিস্ময়।

      হারেছ
      নয়াপল্টন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন barek — জুলাই ১৩, ২০০৮ @ ১:৪৩ অপরাহ্ন

      আমি হুমায়ুন আজাদের একজন ছাত্র বলেই এই লেখাটি লিখছি। চঞ্চল আশরাফ যে স্মৃতিচারণটি স্যারকে নিয়ে করছেন তাতে সত্যিকার অর্থেই আমি ঋণী বোধ করছি।

      বারেক
      পোস্তগোলা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খলিল মজিদ — জুলাই ১৬, ২০০৮ @ ৩:২৩ অপরাহ্ন

      “তখন (এবং এখনও), গ্রুপ বা দল কিংবা ফিল্ডওঅর্ক ছাড়া তরুণ কবির আলোচিত হওয়া অসম্ভব ব্যাপার।”

      না, আমার অভিজ্ঞতা এমন মন্তব্যে সায় দেয় না। নতুন ভাষাভঙ্গিতে লেখা-ই এখনো এবং তখনো তরুণ কোনো লেখকের আলোচিত হওয়ার সুযোগ এনে দেয়/দিত।

      খলিল মজিদ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুব্রত নন্দী — আগস্ট ১৩, ২০০৮ @ ৭:০২ পূর্বাহ্ন

      স্মৃতিচারণে সব কিছু হুবহু হতে হবে এমন কথা নেই। তবে চঞ্চল যদি তার লেখায় সততা ঠিক রাখেন তবে সেটি আগামী দিনের পাঠকদের হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে অনেক তথ্যসমৃদ্ধ করবে।

      – সুব্রত নন্দী

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com