মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১০)

অদিতি ফাল্গুনী | ২০ জুন ২০০৮ ৩:১১ অপরাহ্ন

—————————————————————-
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–
paris-prison.jpg
প্যারিস জেলখানা, ১৯৭১ সালে তোলা ছবি

কিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১১৩-১২২)

(গত সংখ্যার পর)

পুরনো শাস্তি ব্যবস্থার উত্তরসূরী হিসেবে নয়া শাস্তি ব্যবস্থায় একমাত্র যে অপরাধের জন্য অপরাধীকে কঠিনতম নির্যাতন করা হতো তা হলো রাজহত্যা। এই অপরাধে অপরাধী হলে হতভাগ্য ব্যক্তির চোখ উপড়ে ফেলা হতো। তাকে পাবলিক স্কোয়ারে বাতাসশূন্য একটি লোহার খাঁচায় বন্দি করা হতো। রাখা হতো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। কোমরে একটি লোহার বেড়ির মাধ্যমে তাকে সেই খাঁচার ইস্পাত পাতের সাথে শক্ত ভাবে আটকে রাখা হতো। দিনের শেষে খেতে দেওয়া হতো শুধুই রুটি আর পানি। ‘এভাবে ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমের আবহাওয়ার যাবতীয় কষ্ট যেন অপরাধী ভোগ করতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হতো। শীতের দিনে তার মাথা ঢেকে যাবে তুষারে। আবার গরমে সে ঝলসে যাবে সূর্যের তাপে। এমন কঠিন নির্যাতনের মাধ্যমেই কেবল মানুষ বুঝবে যে রাজহত্যার অপরাধে দণ্ডিত খলনায়কের কী কঠোর শাস্তিই না হওয়া উচিত। স্বর্গীয় যে বিধান লঙ্ঘন করে সে রাজহত্যা করেছে, তার অপরাধে সে আর কখনো স্বর্গে যেতে পারবে না। রাজহত্যা এমন এক অপরাধ যে এর মাধ্যমে শুধু স্বর্গ নয়, অপরাধী কলঙ্কিত করে পৃথিবীর পবিত্রতাকেও। কাজেই, পৃথিবীতেও সে খুব বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারে না। তাই তার শাস্তি যেন যন্ত্রণাময় জীবন শুধু নয়, যন্ত্রণাময় মৃত্যুরও দ্যোতক হয়ে ওঠে।’ (ভার্মেইল, ১৪৮-৯)। অপরাধীকে শাস্তি প্রদানকারী শহরের মাথায় ঝুলবে মাকড়সার মত দেখতে এই লোহার খাঁচা যেখানে অপরাধী নয়া আইনের অধীনে পিতৃহত্যাতুল্য অপরাধ অর্থাৎ রাজহত্যার জন্য ফাঁসিতে লটকাবে।

দেখতে দেখতে ছবির মতো অজস্র শাস্তিতে ভরপুর এক নয়া গুদামঘরই যেন গড়ে উঠল এসময়। ‘একই ধরনের শাস্তি বারবার দিও না,’ মেবলি বলেন। মেবলির সময় নাগাদ অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সামান্য হেরফেরের সমধর্মী শাস্তি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরো যথাযথভাবে বলতে গেলে: এসময়কার আইনবিদরা অপরাধীকে জেলখানায় বন্দি করাকে খুব বড় শাস্তি হিসেবে মনে করতেন না। অপরাধীকে যথার্থ শিক্ষাদানের জন্য জেলখানায় নির্বাসনকে আইনবিদরা কখনোই সুনির্দিষ্ট এবং প্রত্যক্ষ শাস্তির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করেন নি। জেলখানায় নির্বাসনকে অপরাধীর জন্য নির্দিষ্ট কিছু শাস্তির অন্যতম উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিছু নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধ যা ব্যক্তির মুক্তি বা স্বাধীনতাকে ব্যাহত করে (যেমন, অপহরণ) বা ব্যক্তির মুক্তি বা স্বাধীনতাকে যা অপমানিত করে (আইনভঙ্গ, সন্ত্রাস প্রভৃতি) মূলতঃ সেসব অপরাধের জন্যই অভিযুক্তকে জেলখানায় পাঠানোর বিধান ছিল। এছাড়াও, অপরাধীকে জেলখানায় পাঠানো হতো যেন তার জন্য নির্ধারিত শাস্তি ঠিকঠাক মতো কার্যকর করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাধ্যতামূলক শ্রমের কথা বলা যায়। অপরাধীকে জেলখানায় না পাঠানো গেলে তাকে দিয়ে দিনের একটি লম্বা সময় ধরে বাধ্যতামূলক শ্রম করানো যাবে না। তবে, বহু আইন সংস্কারক অবশ্য খোলাখুলিভাবে এই সশ্রম কারাদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। কারণ, অপরাধের নির্দিষ্ট চরিত্রের সাথে সশ্রম কারাদণ্ড অনেক সময়ই খাপ খায় না। অপরাধীকে হাজারো মানুষের সামনে না পিটালে সাধারণ মানুষ শাস্তির ভয়াবহতা বুঝবে কী করে? এমন ছিল সেসব আইন সংস্কারকের যুক্তি। জেলখানায় বন্দিদের পুরে রাখাটার উপযোগ মূল্য নিতান্ত কম। এমনকি তা সমাজের জন্য ক্ষতিকরও বটে। এছাড়া জেলখানায় তিন বেলা খাইয়ে-পরিয়ে অপরাধীদের বাঁচিয়ে রাখতে টাকা-পয়সাও প্রচুর খরচ হয়। তা-ও যদি আবার অপরাধীদের সশ্রম কারাদণ্ড না দেওয়া হয়, তাহলে তো তারা অলস হয়ে পড়বে। এবং আলস্য তাদের ভেতর হাজারটা বদগুণের জন্ম দেবে (আর্কেইভস্ পার্লেমেন্তেয়হস, ২৬, ৭১২)। এছাড়াও, জেলখানায় কয়েদিরা ঠিকমতো শাস্তি পাচ্ছে কিনা তা জেলখানার বাইরে থেকে তদারক করাটা কঠিন। কারারক্ষীরা চাইলে কয়েদিরা ঠিকমতো শাস্তি পাবে। আর, কারারক্ষীরা ঢিলেঢালা হলে কয়েদিদের উপর কঠিন শাস্তি কার্যকর হবে না। কোনো ব্যক্তিকে তার চলাচলের স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করা এবং সারাক্ষণ তার উপর নজরদারি করার কাজটা স্বৈরাচারী কাজের অনুশীলন। কারারক্ষীরা এই অনুশীলনে দক্ষ না হলে মুশকিল। ‘তোমরা দাবি করছো যে তোমাদের ভেতর কিছু দৈত্য থাকা উচিত। এই ঘৃণ্য লোকগুলোকে জেলে পোরার বদলে শাসকের উচিত বরং তাদের খুনী হিসেবে বিবেচনা করা।’ (মেবলি, ৩৩৮)। শাশ্বত বা সনাতনী শাস্তি হিসেবে জেলখানা অবশ্য শাস্তি-প্রতিক্রিয়া (penalty-effect), শাস্তি-প্রতিনিধিত্ব (penalty-representation), শাস্তি-সাধারণ কর্মকাণ্ড (penalty- general function), শাস্তি-চিহ্ন (penalty-sign) এবং তত্ত্বীয় মতবাদের (discourse) গোটা কৌশলের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। এ যেন অস্বচ্ছতা, সন্ত্রাস এবং সন্দেহ। ‘জেলখানা হলো এমন এক অন্ধকার জায়গা যেখানে সাধারণ নাগরিকরা ঢুকে অপরাধীদের খুঁজে বের করতে পারে না। এভাবেই অপরাধীরা হারিয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। …অন্যদিকে যদি অপরাধ বহুগুণে না বাড়া সত্ত্বেও অপরাধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিগুলোর সংখ্যা কেউ বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন, তাহলে জেলখানাকে মানুষ আর গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে না। সাধারণ নাগরিকের চোখে জেলখানার ভেতরের ধোঁয়াটে কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিরুদ্ধতা তৈরি হবে। সাধারণ মানুষ সহজেই ধরে নেবে যে জেলখানার ভেতর নানা অবিচারের ঘটনা ঘটে। নিঃসন্দেহে সেই আইনে কিছু গলদ আছে যে আইন সাধারণ মানুষের ভালোর জন্য তৈরি হলেও তা মানুষের ভেতর কৃতজ্ঞতা তৈরির পরিবর্তে ক্রমাগত অসন্তোষ সৃষ্টি করে চলে। (দ্যুফ্রিশ দ্যু ভালাজে, ৩৪৪-৫)।

মোদ্দা কথা হলো ফ্রান্সের মধ্যযুগ হতে আধুনিক যুগের অব্যবহিত আগের সময় পর্যন্ত আইন সংস্কারকরা জেলখানায় অভিযুক্তকে প্রেরণ করাকে মৃত্যু এবং হালকা শাস্তির মধ্যবর্তী স্তরের শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে কিনা তা নিয়ে বহু দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগেছেন। এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে তাদের বহু ভাবনা-চিন্তা করতে হয়েছিল।

সমস্যা হলো যে খুব অল্প সময়ের ভেতরেই বন্দিকে বিনা বিচারে জেলখানায় আটক করাটাই হয়ে উঠল শাস্তির মৌলিক এক প্রকরণ। ১৮১০ সালের দণ্ডবিধি অধ্যাদেশে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জরিমানার মতো হালকা শাস্তির মধ্যবর্তী যাবতীয় শাস্তি ছিল অভিযুক্তের জন্য নির্ধারিত নানা মেয়াদের কারাবন্দিত্ব। ‘নয়া আইনে গৃহীত শাস্তির ব্যবস্থাটি ঠিক কেমন? সোজা ভাষায় এ হলো নানা মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান। দণ্ডবিধি আইনের চারটি প্রধান শাস্তিকে প্রতিতুলনা করুন। বাধ্যতামূলক শ্রম একধরনের কারাদণ্ড। অভিযুক্তদের বহনকারী জাহাজ (convict ship) হলো খোলা বাতাসের জেলখানা। বিনাবিচারে আটক, অভিযুক্তকে সবার থেকে আলাদা করে সরিয়ে রাখা, ছোট ছোট অপরাধের জন্য অভিযুক্তকে জেলখানায় পোরা এসবই হলো ভিন্ন ভিন্ন নামে একই প্রকৃতির শাস্তি কার্যকর করা।’ (রেম্যুসাট, ১৮৫)। সুদৃঢ় আইনী কাঠামোর আওতায়, গোটা ফরাসী সাম্রাজ্য তৎক্ষণাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়লো অপরাধীদের বিভিন্ন মাত্রার কারারুদ্ধকরণের কার্যক্রমে। এবং যাবতীয় শাস্তিমূলক, প্রশাসনিক এবং ভৌগোলিক পরম্পরা সুশৃঙ্খল ভাবে মান্য করার মাধ্যমেই এই কাজটি করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট এই স্তরবিভাজনের নিম্নতম স্তরে ছিল পৌর এলাকার পুলিশ কারাগার (মেইসোঁস দ্যু পুলিশ)। ফ্রান্সের প্রতিটি প্রশাসনিক এলাকায় ছিল আটক করার জেল (মেইসোঁস দ্যু আহেত)। সরকারের প্রতিটি বিভাগে ছিল একটি সংশোধনী কারাগার (মেইসোঁস দ্যু কারেকশিও)। আর একেবারে শীর্ষস্তরে ছিল কতিপয় কেন্দ্রীয় কারাগারের সমাহার বা সংশোধনাগার (মেইসোঁস সেন্ত্রালস বা কারেকশনলেস্) যা অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য এক বছরের অধিক মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করতো। সর্বোপরি কিছু বন্দরে ছিল অভিযুক্তদের বহনকারী জাহাজ। একটি বিপুলায়তন জেলখানার কাঠামো গঠন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল যার বিভিন্ন স্তর কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে। অতীত দিনের বধ্যমঞ্চ, যেখানে অপরাধীর নির্যাতিত শরীরটি সার্বভৌম সম্রাটের অসীম শক্তির সামনে উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল এবং শাস্তির যে নাটমঞ্চে সমাজদেহের নিকট শাস্তির প্রতিনিধিত্ব চিরস্থায়ীভাবে প্রাপণীয় ছিল, তার জায়গা দখল করে নিল নয়া জমানার রাষ্ট্রযন্ত্রের দেহে একীভূত জেলখানার বৃহদায়তন বদ্ধ, জটিল এবং আধিপত্য পরম্পরা মেনে চলা কাঠামো । পুনর্গঠন (Restoration) এবং জুলাই সাম্রাজ্যের (July Monarachy) যুগে, ব্যতিক্রমী কিছু মুহূর্ত বাদ দিলে ফ্রান্সের জেলগুলোতে ৪০-৪৩ হাজার কারাবন্দি ছিল। প্রতি ছয়শ’ কারাবন্দির জন্য মাত্র একজন জেলার থাকতেন। উনিশ শতকের শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে দ্রুতই জেলখানার উঁচু ও একঘেঁয়ে, অব্যর্থভাবে চারদিক দিয়ে বদ্ধ দেয়ালগুলো হয়ে দাঁড়াবে সম্রাটের শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার একইসাথে বস্তুগত এবং প্রতীকী চিহ্ন। এই দেয়ালগুলো অতীত দিনের মতো নাগরিকদের রক্ষাকারী ও নিরাপত্তা দানকারী দেয়াল নয়। এই দেয়াল আর অতীতের মতো সম্রাটের ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য প্রকাশের দেয়ালও নয়। নতুন জেলখানার এই দেয়ালগুলো এত উঁচু যে প্রবেশ এবং নিগর্মন কোনো পথেই এটি টপকানো যায় না। শাস্তির নয়া রহস্যময় তরিকাগুলো এই জেলখানার ভেতরেই বর্তমানে কার্যকর করা হয়। ইতোমধ্যেই দূতাবাসের (Consulate) আওতায়, অভ্যন্তরীণ বিষয়াদির মন্ত্রীকে বিভিন্ন ‘নিরাপত্তামূলক এলাকা’ (Places of Safety) বিষয়ে তদন্ত করতে নিযুক্ত করা হয়েছে। এই ‘নিরাপত্তামূলক এলাকা’গুলো ইতোমধ্যেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। প্রশাসন এই এলাকাগুলো বিভিন্ন শহরেই কাজে লাগাচ্ছিল। কয়েক বছর পরেই এই নয়া প্রশাসনিক শৃঙ্খলার বাহন নয়া প্রাসাদ (অর্থাৎ জেলখানা) গঠনে তহবিল বরাদ্দ করা হয় যাতে সম্রাটের ক্ষমতার প্রদর্শন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে। জেলখানা গঠনের মাধ্যমে শুধুমাত্র সম্রাটের ক্ষমতাই প্রদর্শিত হয় না বরং সম্রাটের প্রতি প্রশাসনের সেবাপরায়ণ মনোভাবও পরিস্ফূট হয়। ব¯ত্ততঃ সাম্রাজ্য এই জেলখানাগুলো ব্যবহার করতো আর একটি যুদ্ধের কাজে (দ্রষ্টব্য, Decazes)। গোটা উনিশ শতক জুড়েই ফ্রান্সের এক তুলনামূলক মিতব্যয়ী তবে একরোখা নীতিসম্পন্ন অর্থনীতির কল্যাণে এই জেলখানাগুলো নির্মিত হতে থাকে।

পরবর্তী বিশ বছরে ফরাসী আইনসভা তার সুনির্দিষ্টভাবে প্রণীত নীতিমালার আওতায়, মৃত্যুদণ্ড ভিন্ন অন্য যে কোনো ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের ক্ষেত্রে যেকোন নির্দিষ্ট, যথার্থ এবং কার্যকরী শাস্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাবাসকে জরুরি করে তুলেছিল। আঠারো শতকে অপরাধীকে দৈহিক শাস্তি দেবার যে নাটকীয়তা সাধারণ মানুষের মনে ত্রাস সঞ্চার করতো, উনিশ শতক আসতে না আসতে সেই নাটকীয়তা মুছে গিয়ে স্থান নেয় জেলখানার বিপুলায়তন একক গঠনতন্ত্র। সমগ্র ফ্রান্স এবং ইউরোপ জুড়ে সৃষ্টি হচ্ছিল অসংখ্য জেলখানার স্থাপত্য। আইনসভায় লো পেলেতিয়েহ (Le Peletier) কর্তৃক উত্থাপিত ফৌজদারি আইনের বিলের দিকে একবার তাকালেই যে কেউ বিষয়টি বুঝতে পারবেন। বিলটির মুখবন্ধেই যে নীতি ঘোষিত হয়েছিল তা হলো ‘অপরাধের প্রকৃতি এবং শাস্তির প্রকৃতির ভেতর যথাযথ সম্পর্ক’ থাকতে হবে। যেমন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত অপরাধীর শাস্তি হতে হবে দৈহিক নিগ্রহ, অলসদের শাস্তি হবে কঠোর পরিশ্রম, এই অলসরূপী অধঃপতিত ব্যক্তিদের জন্য লজ্জা ও তিরস্কার প্রদান জরুরি বৈকি। তবে, মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত সবচেয়ে কঠোর তিন শাস্তি হলো তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদের কারাবাস। প্রথমত, কাশোত বা কারাসেলে বন্দিত্ব যেখানে বন্দিত্বের শাস্তির যন্ত্রণা নানা ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে বহুগুণ বাড়ানো হয় (যেমন, কারাসেলে নির্জনতা, আলো না থাকা, বন্দিকে স্বল্প পরিমাণ খাবার খেতে দেওয়া প্রভৃতি)। দ্বিতীয়ত, জিন বা অপরাধীর অস্বস্তি বৃদ্ধির জন্য নানা ধরনের নিগ্রহ। তৃতীয়ত, কারাবন্দিত্বকে নেহায়েত আটকাদশায় নামিয়ে আনা। যদিও নয়া ফৌজদারি আইনের মুখবন্ধে যথেষ্ট ভাবগাম্ভীর্যের সাথে বিভিন্ন প্রকৃতির অপরাধের জন্য বিভিন্ন প্রকৃতির শাস্তির কথা বলা হয়েছে, শেষমেশ সব অপরাধের জন্যই এক ধূসর জেলখানার সমধর্মী শাস্তি বরাদ্দে এসে শেষ হয়। এতদ্সত্ত্বেও সেসময় কিছু ডেপুটি ছিলেন যারা অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শাস্তি বিষয়ক সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ‘আমি যদি আমার দেশের সাথে প্রতারণা করি, তাহলে আমার শাস্তি হলো জেলে যাওয়া। যদি আমি আমার বাবাকে খুন করি, সেক্ষেত্রেও আমার শাস্তি জেলে যাওয়া। কল্পনাযোগ্য প্রতিটি অপরাধেরই শাস্তি হলো জেলে যাওয়া। এ যেন সেই ডাক্তার যে সব অসুখেই একই ওষুধ দেয়।’ (Chabroud, ৬১৮)।

অপরাধীকে শাস্তির নামে তড়িঘড়ি জেলে পাঠানোর ব্যবস্থাটা শুধুমাত্র ফ্রান্সেই যে বিদ্যমান ছিল এমন নয়। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও কম বেশি একই হাল ছিল। সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয়া ক্যাথেরিন-এর (Catherine II) আমলে অপরাধ ও শাস্তি (দে দেলিতস্ এ দে পেইনস্ — Des delits et des peines) বিষয়ক আলোচনাগ্রন্থ প্রকাশের পরবর্তী বছরগুলোয় সম্রাজ্ঞী একটি কমিশন গঠন করে কমিশনকে ‘নতুন আইন সংহিতা’ রচনার দায়িত্ব প্রদান করেন। তবে, এই কমিশন নতুন আইন সংহিতা রচনার সময় শাস্তির সুনির্দিষ্টতা এবং বৈচিত্র্য বিষয়ক বেক্কারিয়ার (Beccaria) শিক্ষা ভুলে যাননি। নতুন আইন রচনায় কমিশন বেক্কারিয়ার শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। ‘নাগরিক মুক্তির এ এক পরম বিজয় যখন ফৌজদারি আইন প্রতিটি অপরাধের নির্দিষ্ট প্রকৃতি বিবেচনা করে প্রতিটি শাস্তি নির্ধারণ করে।’ এই পন্থায় আইনের যাবতীয় স্বেচ্ছাচারিতা মুছে যায়। শাস্তি আর আইনপ্রণেতার খেয়ালখুশির উপর নির্ভরশীল থাকে না, বরং অপরাধের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। তখন মানুষ আর মানুষের প্রতি সন্ত্রাস করতে পারে না। বরং অপরাধী তার কর্মের প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তিপ্রাপ্ত হয়।’ (অনুচ্ছেদ ৬৭)। কয়েক বছর পর, ইতালীর ফ্লোরেন্স অঞ্চলের অধিবাসীদের কথ্যভাষা বা তুস্কানি ভাষায় [আমাদের সাহিত্যের প্রমিত ভাষা নদীয়া-শান্তিপুর অঞ্চলের ভাষার মতো ইতালীর সর্বজনীন প্রমিত সাহিত্য ভাষাও এই তুস্কানি ভাষা। দান্তে তার ডিভাইন কমেডি এই ভাষাতেই রচনা করেছেন — অনুবাদক] একটি নয়া আইন সংহিতা রচনার সময়ও বেক্কারিয়ার নীতিমালা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। অস্ট্রিয়াতে সম্রাট দ্বিতীয় জোসেফ (Joseph II) তাঁর জাতিকে যে আইনসংহিতা উপহার দেন সেখানেও বেক্কারিয়ার নীতিমালা ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই দুই আইনেই কারাবন্দিত্বকে তার মেয়াদকাল অনুযায়ী পরিমার্জনা করা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারাবন্দিত্বকালীন দুর্দশার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অপরাধীকে কলঙ্কদাগে চিহ্নিত করা বা তপ্ত লোহা দিয়ে তাকে দাগিয়ে দেওয়া এক সর্বজনীন শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়। রাজহত্যার প্রচেষ্টা, অর্থ জাল এবং ডাকাতিসহ নরহত্যা — এই তিন অপরাধের প্রতিটিরই শাস্তি ছিল ৩০ বছর কারাভোগ। নরহত্যা এবং সশস্ত্র ডাকাতি — এ দুই অপরাধের শাস্তি ছিল ১৫ হতে ৩০ বছর কারাদণ্ড এবং নির্ভেজাল চুরির শাস্তি ছিল এক মাস হতে পাঁচ বছর জেল।

তবে, মধ্যযুগের শেষে আইনী সংস্কারের পর শাস্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন মেয়াদের কারাবাসের এই প্রাধান্যকে বেশ আশ্চর্যজনকই বলতে হবে। কারণ, তখনো শাস্তি ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের পরপরই কারাবন্দিত্বের শাস্তি প্রধান শাস্তি হিসেবে জায়গা নেয়নি। অতীতে মৃত্যুদণ্ডের পরই দ্বিতীয় যে প্রধান শাস্তি ছিল তা হলো জনসমক্ষে অপরাধীকে অমানুষিক ভাবে নির্যাতন করা। সেই প্রকাশ্য নির্যাতন বন্ধ হবার পরপরই অবশ্য কারাবন্দিত্ব জনসমক্ষে নির্যাতনের শূন্য জায়গাটি দখল করে। মধ্যযুগ নাগাদও শাস্তি ব্যবস্থায় জেলখানার অবস্থান ছিল অত্যন্ত সীমিত এবং প্রান্তিক। এবং এই ক্ষেত্রে ইউরোপের অনেক দেশেই ফ্রান্সের মতো একই হাল বিদ্যমান ছিল। এসময়কার আইনী সাহিত্যই একথা জানায়। ১৬৭০ সালের অধ্যাদেশ বিনাবিচারে আটককে গুরুতর শাস্তি হিসেবে গণ্য করছে না। স্বল্পমেয়াদের কারাবাসকে কিছু স্থানীয় প্রথা এবং অনুশীলনের ভেতর অন্তর্ভুক্ত করা হতো (দ্রষ্টব্য, আইনবিদ ককিল [Coquille] -এর রচনাবলী)। তবে, ককিলের সমকালীন লেখকদের মতে দীর্ঘমেয়াদি কারাবাস অন্যান্য নানা ধরনের শাস্তির সাথে সাথে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল: ‘অতীতে ফ্রান্সে এমন কিছু শাস্তি ছিল যা আর ইদানীং কালে তেমন দেখা যায় না। যেমন, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখ বা কপালে তার শাস্তি লিখে দেওয়া বা আজীবন কারাবাস দণ্ড প্রদান করা। ঠিক যেমন আজকাল আর কেউ চায় না যে একজন অপরাধীকে বন্য পশুর সামনে ছেড়ে দেওয়া হোক বা খনিতে পাঠানো হোক।’ (Rousseaud de la Combe, ৩)। বস্তুতঃ স্থানীয় আচার এবং অনুশীলন অনুযায়ী কারাদণ্ড আগে অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য শাস্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল। আইনবিদ স্যুলাতজেস (Soulatges) এমন কিছু ‘হালকা শাস্তি’র কথা উল্লেখ করেছেন যা ১৬৭০ সালের অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়নি। সেগুলো হলো: অপরাধীকে কঠোর তিরস্কার, হুঁশিয়ারি, একটি নির্দিষ্ট এলাকা হতে নির্বাসন, ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের ক্ষতিপূরণ এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাবাস। অবশ্য ফ্রান্সের কিছু কিছু এলাকা যেখানে তখনো অবধি তাদের নিজস্ব আইনী স্বাতন্ত্র্য সংরক্ষণ করা হতো, সেসব এলাকায় কারাদণ্ডের ব্যাপক প্রচলন ছিল। সেই সাথে শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ডের নিজস্ব কিছু সমস্যাও ছিল। পরবর্তী সময়ে ফ্রান্সের অধিকৃত নতুন প্রদেশ রুসিল্লনে (Roussillon) এই একই সমস্যা দেখা দেয়।

এসময় ফরাসী দেশের ভেতরেই বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রীতি প্রচলিত থাকলেও আইনবিদরা মোটামুটি ভাবে একটা মতৈক্যে পৌঁছতে সমর্থ হন। আর তা’ হলো: ‘আমাদের দেওয়ানি আইনে কারাদণ্ড কোনো শাস্তি হিসেবে গণ্য হবে না’ (Serpillon, ১০৯৫ — যাহোক, সার্পিল্লনের লেখাতেই প্রথম সেই আভাসটি পাওয়া যায় যে কারাবাসের কঠোরতাই শাস্তির সূচনা)। জেলখানার ভূমিকা যেন ব্যক্তি এবং তার শরীরকে আমানত হিসেবে রাখা। ad continendos homines, non ad puniendos। লাতিন এ বাক্যের অর্থ হলো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করাটা হলো দেনাগ্রস্থ ব্যক্তির কোনো ব¯ত্ত বন্ধকি রাখার সমার্থক। কোনো ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ করার মাধ্যমে সেই ব্যক্তিকে হাতের নাগালে পাবার নিরাপত্তা তৈরি হয়। কেউ তখন আর তাকে শাস্তি দিতে আসে না। এই ছিল সেসময়কার সাধারণ নিয়ম। কারাবাস যদিও বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তির রূপ পরিগ্রহ করেছে, প্রায় সবক্ষেত্রেই কারাদণ্ড যেন পালন করেছে এক বিকল্প ভূমিকা। নারী, শিশু বা অসুস্থ ব্যক্তি যাদের ক্রীতদাসের জাহাজে তুলে জবরদস্তি শ্রমের বাজারে দেওয়া যেত না, তাদেরকেই মধ্যযুগে কারাদণ্ড দেওয়া হতো : ‘একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করাটা হলো ক্রীতদাসের জাহাজে তোলার সমান শাস্তি।’ এই সমতায় যে কেউ এক সম্ভাব্য যোগসূত্রের আসন্নতা প্রত্যক্ষ করতে পারেন। কিন্তু এহেন ঘটনা ঘটার পূর্বে জেলখানাকে তার আইনী অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে।

জেলখানার এই আইনী অবস্থান পরিবর্তনের আগে দ্বিতীয় একটি প্রতিবন্ধকতাও অপসারণ করতে হয়েছে। প্রতিবন্ধকতাটি ফ্রান্সের হিসেবে মোটামুটি বড়সর একটি বাধাই ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারাদণ্ডের রায়গুলো নেওয়া হতো স্বেচ্ছাচারী রাজকীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে অথবা সম্রাটের ক্ষমতার অতিরেক হিসেবে। ‘ক্ষমতার ঘর’গুলো (মেইসোঁস দ্যু ফোর্স — Maisons de Force) যেমন হাসপাতাল, বিখ্যাত ব্যক্তি অথবা পরিবারবর্গের সীলমোহরানা যুক্ত চিঠি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করতো যাকে প্রায়ই ‘নিয়মতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থা’র সাথে গুলিয়ে ফেলা হলেও আসলে তা ছিল ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ বিপরীত এক অবস্থা। এবং বিচার ব্যবস্থার বহির্ভূত এই স্বেচ্ছাচারী কারাদণ্ডের রায়গুলো দ্রুতই ধ্রুপদী আইনবিদ এবং আইনসংস্কারকরা বাতিল করা শুরু করেন। সার্পিল্লনের মতো সনাতনী আইনবিদ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হন যে, ‘রাজকুমাররাই জেলখানা গঠন করেন।’ বিচারক ব্যুহিয়ের (Bouhier) পক্ষছায়ায় সার্পিল্লন আশ্রয় নিয়েছিলেন। ‘যদিও, রাষ্ট্রের কারণে, রাজকুমাররা মাঝেমাঝে এমন কঠোর সব দণ্ড দিতে প্রবৃত্ত হন, সাধারণ বিচারব্যবস্থা এমন দণ্ড অনুমোদন করে না।’ (সার্পিল্লন, ১০৯৫)। সংস্কারকরা এসময় অসংখ্য বিবৃতির মাধ্যমে বিনা বিচারে আটক বা ডিটেনশনকে স্বেচ্ছাচারিতার সুবিধাপ্রাপ্ত উপকরণ এবং প্রতিমূর্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। ‘রাজতন্ত্রের ভয়ানক শক্তি যে গোপন জেলখানাগুলো গড়ে তুলেছিল সেই জেলখানাগুলো সংরক্ষিত থাকতো মূলতঃ যেন দার্শনিকদের জেলে পোরার উদ্দেশ্য নিয়ে যাদের হাতে হতভাগ্য অন্ধকার দেশে আগুন জ্বালাতে নিখিল প্রকৃতি তুলে দিয়েছিল পাবক দীপশিখা। জেলখানাগুলোয় আরো জায়গা হতো সেই সাহসী স্বাধীন সত্তার মানুষদের যারা দেশের মন্দ বিষয়গুলো নিয়ে চুপ থাকার ভীরুতা কাটিয়ে সোচ্চার হতো প্রতিবাদে। ক্ষমতাশালীদের রহস্যময় চিঠির বদৌলতে জেলখানার বিষণœ দরজা খুলে যেত দার্শনিক ও বিদ্রোহীদের জন্য। এবং তারপর এই হতভাগ্যদের সারাজীবনের মতো গিলে ফেলতো। বিনাবিচারে আটকের আদেশ জারি করা এই চিঠিগুলো সম্পর্কে কীইবা আর বলা যেতে পারে? অকপট স্বেচ্ছাচারিতার যা চূড়ান্ত নিদর্শন? বিচারের পূর্বেই আটক প্রত্যেক নাগরিকের শুনানি হবার স্বাধীনতা যা হরণ করে? যা কিনা সাধারণ মানুষের জন্য ফালারিসের (Phalaris) আবিষ্কারের চেয়েও হাজারগুণ বিপজ্জনক? (Brissot, ১৭৩)।

কোনো সন্দেহ নেই যে বিভিন্ন উৎসমুখ হতে উঠে আসা এই প্রতিবাদ আইনী শাস্তি হিসেবে প্রদত্ত কারাদণ্ডের বিরোধিতা করে নি। এসব প্রতিবাদ বিরোধিতা করত মূলতঃ শাসকের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের জের হিসেবে অনির্ধারিত কালের জন্য বিনাবিচারে আটকের দণ্ডাজ্ঞার। মোটের উপর কারাদণ্ডকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবেই দেখা হতো। অসংখ্য অভিযোগের খাতায় (কাইয়ে দ্যু দোলিয়েন্সেস্ [cahiers de doleances]) বিনাবিচারে আটক করাকে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হিসেবে দেখা হতো। কখনো ধ্র“পদী আইনী নীতিমালার নামে এই বিনাবিচারে আটক করাকে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী মনে করা হতো। ‘আইন জেলখানা সৃষ্টির মাধ্যমে শাস্তি দিতে চায় নি, চেয়েছে অপরাধীদের রক্ষা করতে…’ (দেসজাহদা [Desjardin], ৪৭৭)। কখনো কখনো কারাদণ্ডের প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করেও বিনাবিচারে গ্রেপ্তারকে ন্যায়বিচারের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে করা হয়েছে। বিনাবিচারে গ্রেপ্তারের ফলে সেই সব ব্যক্তি শাস্তি পায়, যাদের অপরাধ এখনো পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি। ফলে, জেলখানা সৃষ্টি হয়েছে সমাজ হতে যে মন্দ ও অশুভ বিতাড়নের জন্য, সেই অশুভ বা মন্দই বরং জয়ী হয়। এসময় ফ্রান্সে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে অপরাধী সন্দেহে অনেক সময় তাকে গোটা পরিবারস্দ্ধু বিনাবিচারে গ্রেপ্তার করা হতো। তখন কর্তৃপক্ষের তরফ হতে তোতাপাখির মতো আওড়ানো হতো, ‘কারাদণ্ড কোনো বড় শাস্তি নয়।’ মানুষের সহজ বিবেক বোধ অবশ্য কর্তৃপক্ষের এজাতীয় আতঙ্কজনক চিন্তাধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে উঠতো। যদি একজন সাধারণ মানুষকে তার সবচেয়ে দামি সম্পদ স্বাধীনতা হতে বঞ্চিত করে জেলে বিনাবিচারে আটক করা হয়, তার চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? বিনাবিচারে গ্রেপ্তারের পর সেই নিরীহ মানুষটিকে যদি দুঃখজনকভাবে জেলখানায় থাকতে দেওয়া হয় দাগি অপরাধীদের আখড়ায়, তার জীবনের প্রিয় সব কিছু যদি তার কাছ হতে কেড়ে নেওয়া হয়, যদি তাকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে আসা হয়, তার চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? এবং শুধুমাত্র অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই নয়, তার গোটা পরিবারকেই যদি কয়েদখানায় পুরে তাদের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকা নির্বাহের সব উপায় বা অবলম্বন কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? (দেসজাহদা, ৪৮৩)।

এবং, কোনো কোনো ক্ষেত্রে, অভিযোগের খাতাগুলো (কাইয়েস) এসব নিরীহ মানুষকে ‘দাফনের ঘর’ (houses of internment) বা জেলখানার অবসানের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে: ‘ আমরা বিশ্বাস করি যে এই ক্ষমতার গৃহ বা মেইসনস্ দ্যু ফোর্সগুলো (maisons de force) ধূলোতে গুঁড়িয়ে ফেলা উচিত।’ ১৩ই মার্চ ১৭৯০-এর অধ্যাদেশ অবশ্য ‘প্রাসাদ, ধর্মীয় গৃহ, ক্ষমতার গৃহ, পুলিশের গৃহ প্রভৃতি নানা প্রতিষ্ঠানে সম্রাটের ব্যক্তিগত মোহরানা সম্বলিত আদেশপত্র অথবা প্রশাসনিক ক্ষমতাশালী কর্মকর্তাদের আদেশে বন্দি সকল মানুষের মুক্তি’ ঘোষণা করে।

১৭৯০-এর উপরোক্ত অধ্যাদেশের পরও কী করে আইনহীনতার সাথে সরাসরিভাবে জড়িত বিনাবিচারে গ্রেপ্তার (যা কিনা স্বয়ং সম্রাটেরও এখতিয়ারের বাইরে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল) আবার খুব স্বল্প সময়ের ভেতরেই আইনী শাস্তির সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত আঙ্গিক হয়ে ওঠে?

এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা দিতে বলা হলে আইনবিদরা সাধারণতঃ বলে থাকেন যে ধ্রুপদী যুগে শাস্তিমূলক কারাদণ্ডের বেশ কিছু বড়সর নমুনা (models) সৃষ্টি হয়েছিল। বৃটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে শাস্তিমূলক কারাদণ্ডের যে উদাহরণগুলো (examples) সেসময় ফ্রান্সে আসছিল, সেই উদাহরণগুলোর নিরিখে ফ্রান্সেরই আইনবিদদের সৃষ্টি ধ্রুপদী যুগের শাস্তিমূলক কারাদণ্ডগুলোর মহিমা আরো বেড়ে যায়। যুগ যুগ পুরনো আইন এবং কারাদণ্ডের স্বেচ্ছাচারী সক্রিয়তার দ্বিবিধ (despotic functioning of imprisonment) বাধা অপসারিত হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। অতীতে বিনা বিচারে গ্রেপ্তারের ব্যপারে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো ছিল, খুব দ্রুতই সেগুলো অপসারিত হয়। আইনী সংস্কারকরা শাস্তির ক্ষেত্রে কিছু অভিনব সংস্কার করেন যার ফলে বিনাবিচারে গ্রেপ্তার দ্রুতই ফরাসী সমাজের এক বাস্তবতা হয়ে ওঠে। ধ্র“পদী যুগের শাস্তিমূলক কারাদণ্ডের এই নমুনাগুলোর গুরুত্ব বিষয়ে সন্দেহের তাই কোনো অবকাশ নেই। তবে, শাস্তিমূলক কারাদণ্ডের এই নমুনাগুলো সমস্যা সমাধান করার বদলে নিজেরাই সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সমস্যা তাদের অস্তিত্বের (existence) এবং প্রসারমানতার (diffusion)। কীভাবে শাস্তির এই নমুনাগুলো তৈরি হলো এবং কী করেই বা তারা এত সর্বজনীনভাবে গৃহীত হলো? কারণ যদিও এটা দেখানো বেশ সহজ যে কারাদণ্ডের এই নমুনাগুলো শাস্তিমূলক সংস্কারের সাধারণ নীতিমালার সাথে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কখনো কখনো আবার উভয়েই উভয়ের জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

শাস্তিমূলক কারাদণ্ডের এই নমুনাগুলোর পুরনোতম নমুনা হলো আমস্টারডামের রাসফুইসের (Rasphuis) কারাগার যা ১৫৯৬ সালে কাজ শুরু করেছিল। রাসফুইসের কারাগারের এই মডেলটি কমবেশি অনেককেই উদ্দীপিত করেছে। শুরুতে এটি ভিক্ষুক অথবা তরুণ অপরাধীদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল। এর কাজ তিনটি বড় নীতি মেনে চলেছে: অপরাধীর শাস্তির মেয়াদ তার আচরণ অনুসারে প্রশাসন নির্ধারণ করতো। কয়েদির আচরণ ভাল হলে তার শাস্তির মেয়াদ কমবে এমন দিকনির্দেশনা দণ্ড ঘোষণার সময়ই বলে দেওয়া হতো। যেমন, ১৫৯৭ সালে বারো বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত কোনো বন্দি জেলখানায় সন্তোষজনক আচরণ করলে তার শাস্তির মেয়াদ কমিয়ে আট বছরে আনা হয়। কারাবন্দিত্বের সময় শ্রম ছিল বাধ্যতামূলক। সব বন্দিকেই কাজ করতে হতো। ব্যক্তিগত সেল শুধুমাত্র একটি অতিরিক্ত শাস্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কারাবন্দিরা দু’জন/তিনজন করে একটি বিছানায় ঘুমাতো। এক/একটি সেলে সব মিলিয়ে চার হতে বারোজন থাকতো। এবং জেলখানায় কাজ করার বদলে বন্দিরা কিছু মজুরি পেত। একটি কঠোর সময়-সূচী, বাধানিষেধ এবং বাধ্যবাধকতার এক ব্যবস্থা, ক্রমাগত তদারকি, সনির্বন্ধ অনুরোধ এবং ধর্মগ্রন্থ পাঠের বিধিবিধান মিলে এক জটিল প্রণালী বন্দিদের ‘ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া’ এবং ‘মন্দ হতে রক্ষা করা’ জাতীয় প্রকল্পের আওতায় কঠোরভাবে নিয়ে আসে। এই কঠোরতা দিন দিন শুধু বেড়েই চলতো। আমস্টারডামের রাসফুইসকে এমন এক মৌল প্রকল্প হিসেবে যে কেউ বিবেচনা করতে পারেন। ঐতিহাসিকভাবে, এজাতীয় প্রকল্প তত্ত্বের ভেতর সংযোগ স্থাপন করে। ষোড়শ শতকের চারিত্র্য অনুযায়ী ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে ব্যক্তির শিক্ষামূলক এবং আত্মিক চেতনার রূপান্তর এবং আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক কৌশলের মিশ্রণে শাস্তিমূলক কারাদণ্ডের নমুনা সৃষ্টি হয়।

ঘেন্টের (Ghent) ক্ষমতাগৃহ (মেইসোঁ দ্যু ফোর্স — maison de force) অর্থনৈতিক আশুকর্তব্যকে (economic imperatives) কেন্দ্র করে বন্দিদের শ্রমকে সংগঠিত করতে তৎপর হয়। এর পেছনের যুক্তিটি ছিল এমন যে আলস্য অধিকাংশ অপরাধের সাধারণ কারণ। ১৭৪৯ সালে এ্যালস্টের (Alost) বিচারাধীন এখতিয়ারের আওতায় কারাবন্দিদের উপর একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখা যায় যে অন্যায়কারীরা ‘কারুশিল্পী’ বা শ্রমিক’ ছিলেন না (যেহেতু শ্রমিকরা শুধুই কাজের কথা ভাবে যা তাদের আহার যোগাবে) কিন্তু ‘অলসেরা শেষপর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে।’ সুতরাং এমন এক সংশোধনাগার এই অপরাধীদের জন্য গড়ে তুলতে হবে যেখানে কাজ করতে না চাওয়া অলসদের কর্মের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বোঝানো হবে। এর চারটি ভাল দিক রয়েছে: প্রথমত, দেশে ফৌজদারি মামলার সংখ্যা কমে গিয়ে রাষ্ট্রের খরচ কমবে (এক ফ্লেন্ডার্সেই [Flanders] তাহলে ১০০,০০০ পাউণ্ড ব্যয়সাশ্রয় হবে)। ভবঘুরেদের দ্বারা ধবংসপ্রাপ্ত বনভূমির মালিককে খাজনার আকারে টাকা ফেরত দেওয়ার তাহলে আর কোনো দরকার থাকবে না। কারাগারে বন্দিদের শ্রমে নিযুক্ত করলে প্রচুর নতুন কর্মী জন্ম নেবে যা ‘প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শ্রমের মূল্য কমিয়ে আনবে।’ সর্বোপরি, বন্দিদের সশ্রম কারাদণ্ড সত্যিকারের গরীবদের প্রয়োজনীয় দাতব্য (necessary charity) হতে পূর্ণ মাত্রায় লাভবান হবার সুযোগ দেবে (Vilan, ৬৮)।

শ্রমের মূল্য বিষয়ে সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় হিতোপদেশ অলস ব্যক্তিদের ভেতর কাজের প্রতি ভালবাসা জন্ম দেবে। এই হিতোপদেশ একজন অলস ব্যক্তিকেও এমন এক স্বার্থের নিয়মতান্ত্রিকতার (system of interest) ভেতর নিয়ে আসবে যাতে করে পরিশ্রম অলসতার চেয়ে অধিকতর সুবিধাজনক হয়ে উঠবে। এই নিয়মতান্ত্রিকতা অলস ব্যক্তির চারপাশে এমন এক ক্ষুদ্র, সরল কিন্তু অনুচিত্রের (miniature) মতো দমনমূলক সমাজ ঘিরে থাকবে যেখানে ‘বাঁচতে চাইলে কাজ করতে হবে’ এই নীতিবাক্যটি পরিষ্কার ভাবে পরিষ্ফূট হয়ে উঠবে। বন্দির জন্য শ্রম যেমন বাধ্যতামূলক, তার মজুরি প্রাপ্তির বিষয়টিও তেমন সুনিশ্চিত। এই মজুরির সাহায্যেই বন্দি তার বিনাবিচারে আটকাদশার সময় এবং কারামুক্তির পরেও নিজের ভাগ্য ফেরাতে সচেষ্ট হবে। ‘যে ব্যক্তি আজো নিজের জন্য একটি জীবিকা খুঁজে পায়নি, তাকে কাজের মাধ্যমে নিজের জন্য এই জীবিকা অর্জন করে নিতে হবে। (জেলখানায়) কর্তৃপক্ষের তদারকি এবং শৃঙ্খলার মাধ্যমে তাকে এই কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। সত্যি বলতে, কাজের প্রতি ভালবাসা অর্জনের জন্য বন্দিকে একপ্রকার বাধ্য করা হবে। পরবর্তী সময়ে সে জেলখানায় কাজের ফলে যে সুযোগ সুবিধাগুলো পাওয়া যায় সেসব সুযোগ সুবিধা দ্বারা কাজ করার জন্য প্রলুব্ধ হবে। ধীরে ধীরে তার নৈতিকতা পরিশুদ্ধ হয়ে উঠবে। সে কাজ করায় অভ্যস্ত হতে শিখবে। নিজের মুক্তির জন্য যে স্বল্প পরিমাণ অর্থ সে সঞ্চয় করেছে সেই অর্থের জন্য তার ভেতর উদ্বেগ তৈরি হবে।’ সে এমন একটি বৃত্তি শিখেছে ‘যা তাকে বিপদমুক্ত ভাবে জীবিকা অর্জনে সাহায্য করবে।’ (ভিলান, ১০৭)। হোমো ঐকোনোমিকাস (homo oeconomicus) বা গার্হস্থ্য অর্থনীতির পুনর্গঠন প্রকল্প খুব বেশি স্বল্পমেয়াদী বা খুব বেশি দীর্ঘমেয়াদী উভয় ধরনের শাস্তিরই ব্যবহার বর্জন করেছে। যেমন, বন্দিকে খুব অল্পসময় আটক রেখে কারিগরী প্রশিক্ষণ দিলে সেই কারিগরী বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পুরোপুরি অর্জন করার আগেই তার মুক্তি হয়ে যায় এবং এই প্রশিক্ষণ তখন অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। আবার, খুব বেশি লম্বা সময় ধরে জেলখানায় থেকে কারিগরী প্রশিক্ষণ নিতে থাকলে শিক্ষানবিশীর কোনো মানেই থাকে না। কবে আর সে এই শিক্ষানবিশীকে কাজে লাগাতে পারবে? ‘ছয়মাসের কারাবাস অপরাধীদের সংশোধন করার জন্য এবং তাদের ভেতর কাজের প্রতি ভালবাসা জাগ্রত করার জন্য খুব বেশি অল্প সময়। আবার, অন্যদিকে ‘কয়েদিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে তারা হতাশায় মুহ্যমান হয়ে পড়বে। তখন তারা তাদের চরিত্র সংশোধন এবং কাজের প্রতি ভালবাসা অর্জনের জন্য কোনো তাগিদ বোধ করবে না। তখন তাদের দিন কাটবে স্রেফ পালিয়ে যাওয়া অথবা বিদ্রোহের নানা পরিকল্পনা করে। অবশ্য যেহেতু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় এই বন্দিদের জীবনে বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেয় নি, সেক্ষেত্রে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে অসহনীয় হিসেবে বিবেচনা করা তাদের উচিত নয়। (ভিলান, ১০২-৩)। তবে, শাস্তির মেয়াদ সেভাবেই নির্দিষ্ট হওয়া উচিত যা অপরাধীর সম্ভাব্য সংশোধনকে সম্ভব করে তুলবে এবং সংশোধিত অপরাধীর শ্রমকে অর্থনৈতিক বিনিময় মূল্যের উপযুক্ত করে তুলবে।

অপরাধীর জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমের এই আদর্শের পাশাপাশি, ব্রিটিশ শাস্তিব্যবস্থা অপরাধীর চারিত্রিক সংশোধনের পাশাপাশি আরো বাড়তি যা যোগ করেছিল তা হলো তাকে আর সবার কাছ হতে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। ১৭৭৫ সালে হ্যানওয়ে (Hanway) কয়েদির জন্য নির্জন কারাপ্রকোষ্ঠ বরাদ্দের রূপরেখা প্রথম তুলে ধরেন। এবং সেটা তুলে ধরেন মূলতঃ নেতিবাচক কিছু যুক্তির সাহায্যে। তার যুক্তিগুলো ছিল এমন যে জেলখানায় একসাথে অনেককে রাখা হলে স্বল্পমেয়াদী ফলাফল হবে বন্দিদের একযোগে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল হবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘুষ আদায় বা সোজা কথায় ব্ল্যাকমেইল অথবা নানা ধরনের দুষ্কর্মে বন্দিদের একে অপরকে সহায়তা করার মতো নানা অনাকাক্সিক্ষত কাজের পরিমাণ বেড়ে যাবে। কিম্বা, বন্দিদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে দিলে জেলখানার চেহারা কারখানার মতো দেখায়। নির্জনতা বন্দিকে এক ‘মারাত্মক ধাক্কা’ দেয় যা কিনা বন্দিকে সহবন্দিদের মন্দ নানা প্রভাব হতে রক্ষা করার পাশাপাশি তাকে তার নিজের ভেতর ডুব দিতে এবং আপন সত্ত্বার গভীরে শুভতার কণ্ঠস্বর শুনতে সহায়তা করে। নির্জন প্রকোষ্ঠে একা একা বসে কাজ করা তখন শুধু নিছকই শিক্ষানবিশীই হয়ে থাকবে না বরং বন্দিকে নিজের সাথে নিজেকে এক আত্মিক সংলাপের মুখোমুখি করবে।

(খণ্ড ২, ২য় অধ্যায় চলবে)

তথ্যনির্দেশ

৩. এই আইনের অংশবিশেষ কলকুহৌনের (Colquhoun) করা ফরাসী অনুবাদের ভূমিকায় তর্জমা করা হয়েছিল, ১৮০৭, ১, ৮৪।

৪. এব্যাপারটিই মূলতঃ অসংখ্য কারা বিধিমালাকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। কারারক্ষীদের কাজ, জেলখানার চৌহদ্দির নিরাপত্তা এবং কয়েদিরা যেন পারস্পরিক যোগাযোগে ব্যর্থ হয় সেসব বিষয় কেন্দ্র করেই এই বিধিমালাগুলো প্রণীত হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে দেখুন ১৭৬০ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর দিজন পার্লেমেন্তেহের (Dijon Parlement) রায়। আরো দেখুন সার্পিল্লন, ৬০১-৪৭।

৫. অসংশোধনযোগ্য চোরদের বিষয়ে ৪ঠা মার্চ ১৭২৪ সালের ঘোষণা অথবা ১৮ জুলাই ১৭২৪ সালের ভবঘুরেপনা বিষয়ক ঘোষণায় এই একই শাস্তির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ক্রীতদাসদের জাহাজে পাঠানোর মত বয়স হয়নি বলে এক বালককে দীর্ঘসময় জেলে রাখা হয় যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্রীতদাসের জাহাজে প্রেরণের মতো তার বয়স হয়। দণ্ডাজ্ঞার পুরো মেয়াদটাই তাকে খাটতে হয়েছিল। দ্রষ্টব্য, প্রাচীন যুগে ফ্রান্সে অপরাধ ও অপরাধীগণ (ক্রাইম এ ক্রিমিনালিতে অ ফ্রাঁস সু লা এনশিয়েন রেজিম [Crime et Crimininalite en France sous l’Ancien Regime] , ২৬৬)।

৬. সিসিলি ভূখণ্ডের গ্রিক নগর অগ্রিজেন্তাম (Agrigentum)-এর স্বৈরাচারী শাসক ফালারিস (Phalaris)। ৫৬০ অব্দে তিনি নগরটি শাসন করেছেন। একটি তামার বৃহদাকার ও ষাঁড়ের মতো পাত্রে জীবন্ত মানুষ তিনি ঝলসে রোস্ট বানাতেন বলে কিংবদন্তি রয়েছে। তার নাম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে স্বৈরাচারী শাসকদের ভয়াবহতা বোঝাতে।

৭. ব্রিয়ি (Briey), তৃতীয় শর্ত (তিয়ার্স এতাত), উদ্ধৃত দেসজাহদা, পৃষ্ঠা ৪৮৪। গুবার্ট (Goubert) এবং ডেনিস (Denis)। পৃষ্ঠা ২০৩। অভিযোগ খাতা বা কাইয়ে-তে কেউ কেউ এমন দাবিও করেছেন যে বিনাবিচারে গ্রেপ্তারের ঘরগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হোক যাতে সেখানে পরিবারগুলো থাকতে পারে।

৮. দ্রষ্টব্য, থর্স্টেন সেলিন (Thorsten Sellin), পাইয়োনিয়ারিং ইন পেনোলজি (Pioneering in Penology), ১৯৪৪ গ্রন্থে আমস্টারডামের (Amsterdam) রাসফুইস (Rasphuis) এবং স্পিনহুইস (Spinhuis) বিষয়ক একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষাগত ফলাফল প্রদান করে। মাবিলোঁ (Mabillon) ১৮৪৫ সালে পুনরায় প্রকাশিত তার রিফ্লেকশিও সু লে প্রিসনস দে অহদে হেলিজিওস (Reflections sur les prisons des ordres religieux) গ্রন্থে আমস্টারডামের উপরোক্ত দুই কারাগারের মডেল প্রস্তাব করেন। উনিশ শতকে ক্যাথলিকরা যখন প্রটেস্ট্যান্টদের সাথে দাতব্য নানা আন্দোলন এবং কিছু প্রশাসনিক দপ্তরে তাদের অবস্থান বিষয়ে বিবাদ-বিতণ্ডা চালাচ্ছিল, তখন মাবিলোঁ-র এই গ্রন্থ পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। মাবিলোঁর কাজ যা তুলনামূলক ভাবে অপরিচিত এবং প্রভাবহীন হিসেবে গণ্য করা হয়, পাঠককে এটাই দেখায় যে ‘মার্কিনী শাস্তি বিষয়ক চিন্তা’ সম্পূর্নতঃ একটি ‘সন্ন্যাসমূলক এবং ফরাসী চিন্তা, তা’ একে কেউ জেনেভা বা পেনসিলভেনিয়া যে কোন স্থান হতেই উদ্ভুত বলুক না কেন।’ (এল, ফুশার [L, Faucher])।

৯. ভিলান, ১৪, ৬৪। ভিলানের এই স্মৃতিকথা, যা ঘেন্টের কারাগার প্রতিষ্ঠার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ১৮৪১ সাল অবধি অপ্রকাশিত ছিল। এসময়কার কর্তৃপক্ষ প্রদত্ত ঘন ঘন নির্বাসন দণ্ড অপরাধ এবং ভবঘুরেপনার ভেতরকার সম্পর্কের উপর জোর দিয়েছে। ১৭৭১ সালে দ্য স্টেটস্ অফ ফ্লেণ্ডার্স (The States of Flanders) মন্তব্য করে যে ‘ভিখিরিদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত নির্বাসন দণ্ড কোন কাজে আসে নি। অঙ্গরাজ্যগুলো একে অপরকে এমন সব প্রজা বা নাগরিককে পাঠায় যাদের স্ব স্ব অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশে ক্ষতিকর গণ্য করা হয়। ফলাফলস্বরূপ, একজন ভিখিরিকে ক্রমাগত এক প্রদেশ হতে অন্য প্রদেশে পাঠালে শেষমেশ একদিন তাকে পাওয়া যাবে ফাঁসিতে ঝুলন্ত অবস্থায়। অথচ, প্রদেশ হতে প্রদেশে চালানে না পাঠিয়ে বরং তাকে কোন কাজে ঢুকিয়ে দিলে সে হয়তো তার মন্দ পথ থেকে সরে আসতো। (স্টুবান্ট [Stoobant], ২২৮)।

a_falgun@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুলিয়ান সিদ্দিকী — জুন ২৮, ২০০৮ @ ১:৫৭ পূর্বাহ্ন

      প্রিন্ট নেবার অপশন থাকলে খুবই ভালো হতো। অনলাইনে পড়ার সমস্যা হলো অনেক সময় ইন্টারনেট কানেকশন থাকে না। বিদ্যুতের সমস্যা। প্রিন্টের সুবিধা কিংবা পিডিএফ কপি থাকলে খুব সহজেই সংগ্রহ করে পড়তে পারি। এমন বিশ্লেষণাত্বক সুন্দর লেখাগুলো অনলাইনে পড়ে খুব একটা সুবিধা পাওয়া যায় না। যে কারণে পড়ছি একটু একটু করে।
      ধন্যবাদ অনুবাদককে।

      জুলিয়ান সিদ্দিকী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saikat Biswas — জুন ৩০, ২০০৮ @ ১২:০৫ অপরাহ্ন

      আমিও একমত। আগেও লিখেছি প্রিন্ট করার অপশন দরকার। অথবা ডাউনলোড করে পড়ার ব্যবস্থা দরকার।

      সৈকত বিশ্বাস

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com