সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ২)

চঞ্চল আশরাফ | ১৬ মে ২০০৮ ৯:১০ পূর্বাহ্ন

কিস্তি:

azad_eskaton.jpg
আন্‌ওয়ার আহমদের বাসার হুমায়ুন আজাদ, পেছনে লেখক, সামনে সালাউদ্দীন আইয়ুব ও মঞ্জু

বেশ ক’বার আমি হুমায়ুন আজাদকে ফুলার রোড থেকে নিউ ইস্কাটনে ইসমাইল লেনের সেই ৩৩ নম্বর বাসায় নিয়ে গেছি। সময়টা খুব সংক্ষিপ্ত, ১৯৯২ সালের মার্চ থেকে ১৯৯৩-র জানুয়ারি পর্যন্ত। সন্ধ্যার সামান্য আগে আমরা রিকশায় উঠতাম, আন্ওয়ার আহমদের বাসায় পৌঁছনোর আগেই রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠত।

খুব আড্ডা হতো। সেই সব আড্ডায় তারাই আসতেন, হুমায়ুন আজাদের ওপর যাদের অসন্তোষ নেই; যাদের ওপর হুমায়ুন আজাদের অসন্তোষ নেই। ফলে, তাঁর আগমনের দিনগুলোয় আন্ওয়ার ভাই অস্থিরতা ও উত্তেজনার মধ্যে থাকতেন। মাথায় সাহিত্যিকদের একটা লিস্ট নিয়ে সম্ভবত তাঁর এই অস্থিরতা — হুমায়ুন আজাদের অপ্রিয় কোনও ব্যক্তি যেন এসে না পড়েন। বা, তাঁকে সহ্য করতে পারেন না — এমন কারও আগমন অন্তত সেদিন যেন না ঘটে। আর, ওই বাসায় অনেক লেখকেরই, নিয়মিত ও অনিয়মিত আগমন ঘটত। এক সন্ধ্যায় আল মাহমুদ এসে ‘আন্ওয়ার, আন্ওয়ার’ বলে গলিতে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ডাকামাত্র তটস্থ হয়ে গৃহকর্তা গেটের দিকে ছুটে গেলেন এবং সেখান থেকেই তাঁকে বিদায় দিলেন। কারণ, বাসায় তখন হুমায়ুন আজাদ। মদ্যপানরত, আর হাতে মেলে-রাখা একটি বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছেন আমাদের সঙ্গে আর সিগারেট ফুঁকছেন। ‘আমি কি স্যারকে আজ নিয়ে আসব?’ ফোনে এ-জিজ্ঞাসার জবাবে আন্ওয়ার ভাই বলতেন, ‘না, আজকে আবদুল মান্নান সৈয়দ আসবে।’ এ-ধরনের ঘটনা বেশ ক’বার ঘটেছে।

আমার খুব কৌতূহল ছিল হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আল মাহমুদের সম্পর্ক নিয়ে। মনে পড়ে, ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে, এক শুক্রবারের সকালবেলা সালাউদ্দীন আইয়ুবের বাসায় আল মাহমুদের কাছে এ-নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে আমার কাছে এসেছিল নিজের বউয়ের চাকরির তদ্বির করতে। আমি বলেছি, এসব কাজে আমি অভ্যস্ত না। এর পর থেকে সে আমাকে পছন্দ করবে কীভাবে?’

‘আমি শুনেছি আপনি প্রতিক্রিয়াশীল, মানে, রাজাকার হয়ে গেছেন বলে উনি আপনাকে…’

কথাটা তিনি শেষ করতে দিলেন না; কিন্তু যা তাঁর শোনার তা বলা হয়ে গেছে। ‘ওসব ফালতু কথা আমাকে বলো না। একাত্তরে যখন আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তখন এদেশের অনেক কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী গ্রামের বাড়িতে গিয়ে অবকাশ যাপন করেছেন। পুকুরপাড়ে বসে কবিতা লিখেছেন স্বাধীনতা নিয়ে।’ রূপম-এ দেয়া নিজের সাক্ষাৎকারের প্রুফ দেখছিলেন তিনি। সে-কাজ আমার ওই কথা শোনার পর থেকেই থামিয়ে রেখেছেন; কিন্তু তাঁর কথা তখনও থামে না, ‘অথচ যুদ্ধ থেকে ফিরে যখন দেখলাম, আমার পরিবার উপোস কাটায় আর ড্রেনে ভাত বয়ে যায়; ওইসব বুদ্ধিজীবী ঢাকায় বেশ হর্তাকর্তা হয়ে গেছেন, আরাম-আয়েশ করছেন, তখন খুব যন্ত্রণা হল — এইজন্যে কি মুক্তিযুদ্ধ করেছি? শেখ মুজিব, ডেকে নিয়ে আমাকে চাকরি দিলেন। এতেও বাধা দেওয়ার লোকের অভাব ছিল না। তোমাদের মুস্তাফা নূরউল ইসলাম আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। শুনেছি, শেখ মুজিব বলেছিলেন, কবির আবার ডিগ্রি কী-রে? আর যা-ই হোক, শেখ মুজিবের সাংস্কৃতিক মন বাঙলায় আর কোনও নেতার নেই।’

ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এ-সব কথা আল মাহমুদের কাছ থেকে বেশ ক’বার শুনেছি আমি। এ-ও তাঁর মুখ থেকে শুনেছি: তোমাদের শামসু মিয়াকে (শামসুর রাহমান) হুমায়ুন আজাদ তো নিঃসঙ্গ শেরপা বানিয়েছে। শেরপা শব্দের অর্থ কি জানে ওই অধ্যাপক? এর মানে হল কুলি। কুলি আবার নিঃসঙ্গ হয় কীভাবে?

বুঝতাম, শামসুর রাহমানের কবিতা নিয়ে হুমায়ুন আজাদ আস্ত একটা বই লিখেছেন বলে তাঁর মনে যন্ত্রণা ও হতাশা খুব আছে। শামসুর রাহমানের কদর সবার চেয়ে বেশি হওয়ায় তিনি যে দুঃখিত, তা নানাভাবে প্রকাশ পেত। যেমন — তিনি সে-সময় প্রায়ই বলতেন, ‘ঢাকায় এসে আমি যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন আমার অবস্থান সাতচল্লিশ নম্বরে। তখন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীও অনেক বড় কবি। আজ আমার নাম শামসুর রাহমানের পরে উচ্চারিত হয়। কিছুদিন পরে একসঙ্গে হবে, তারপর এক নম্বরে, বুঝেছ? কিন্তু কুলি হওয়ার খায়েশ আমার নাই।’ বলতেন, ‘বাংলা কবিতার আধুনিকতার সংগঠক, বুঝেছ, বুদ্ধদেব বসু, আমার কবিতা ছেপেছিলেন, যখন পঞ্চাশের কারও কবিতা ওই বনেদি কাগজে ঠাঁই পায় নাই। বুদ্ধদেব, বুঝতে পারছ, তোমার গুরু হুমায়ুন আজাদেরও গুরু।’

আমি বলি, ‘কিন্তু যারা আপনার কবিতার অনুরাগী, তারাও যখন আপনাকে মৌলবাদী মনে করে কষ্ট পায় তখন আপনার কেমন লাগে?’

‘হ্যাঁ, তোমরা শামসুর রাহমানকে তোলার জন্যে আমাকে মৌলবাদী বানাইছ। এই দেশে একজনকে তোলার এইটা একটা বিজ্ঞান। ঠিক আছে, আমি মোল্লা। একবার শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ত পূর্ববঙ্গের মোল্লা। কথাটা আমার মনে ধরেছিল। আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, তুমি হইলা পশ্চিমবঙ্গের ব্রাহ্মণ, আমি হইলাম পূর্ববঙ্গের মোল্লা। পার্থক্যটা নিয়া একটু জড়াজড়ি কইরা নিলাম।’

‘তিনি আতরের গন্ধ পান নাই?’

‘না, ওদের সেই অনুভূতি আছে না-কি!’ বলে, সে কী হাসি আল মাহমুদের। ৩৩ ইসমাইল লেনের চারতলায় সালাউদ্দীনের রুমের সামনে বেশ বড় একটা ছাদবারান্দা; সেখানকার শীতরোদেও ছড়িয়ে পড়ে সেই হাস্যধ্বনি। বললেন, ‘যতই শহুরে হই না কেন, বেড রুমের জানালা দিয়ে এখনও আমার নাকে ঘাসের গন্ধ এসে লাগে।’

যা-ই হোক, খুব আড্ডা হতো। পরীক্ষা বা কোনও কাজ না-থাকলে সালাউদ্দীন আইয়ুব ছিলেন সেই আড্ডার অবধারিত সদস্য। গল্পকার পারভেজ হোসেন ঘন-ঘন আসতেন। মোহাম্মদ সাদিক, আসাদ মান্নান, সুশান্ত মজুমদার, আহমাদ মাযহার, নাসরীন জাহান — আরও অনেকেই আসতেন। কিন্তু একটা বিষয়ে আমার বেশ খটকা লাগত। সেটি হল, ওই বাসায় ব্রাত্য রাইসুর অনুপস্থিতি।

তিনি কিছুধ্বনি ফেব্র“য়ারি ১৯৯২ সংখ্যাটির সম্পাদক ছিলেন। এর কিছু বিশেষত্ব ছিল। যেমন, প্রচ্ছদে কোণাকুনি করে মুদ্রিত হয়েছিল — ‘ইহা লিটল ম্যাগ’; সেই সংখ্যায় ছিল অকালপ্রয়াত কবি অনন্য রায়কে নিয়ে ক্রোড়পত্র। এই রকম একজন সম্পাদক পত্রিকা প্রকাশের পর থেকে দফতরেই আসেন না, এটা কেমন কথা! আন্ওয়ার ভাইকে এ-প্রশ্ন করতেই তিনি তেলেবেগুনে-রকমের ক্ষেপে উঠে বলেন, ‘যাও, আমি রিকশাভাড়া দিচ্ছি, সুশান্ত মজুমদারের কাছ থেকে জেনে আস।’ এটা জানতে আমি যাই নি, আর তা জানাও হয় নি; যদিও রাইসুর সঙ্গে এরপর বহুবার দেখা হয়েছে।

হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে আমার স্মৃতিকথা ছেড়ে অনেক দূরে সরে গেছি। এবার সেই বিষয়ে ফিরতে চাই। বেশ ক’বার আমি হুমায়ুন আজাদকে আন্ওয়ার ভাইয়ের বাসা থেকে ফুলার রোডে তাঁর বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজের বাসায় ফিরেছি। তিনি আমাকে ভবনটির সিঁড়ি থেকে চলে যেতে বলতেন সেই রিকশাটি নিয়ে; তখন হয়ত রাত প্রায় ১১টা। অবশ্য খুব মদ্যপান হয়ে গেলে, তবেই আন্ওয়ার ভাই তাঁর সঙ্গে আমাকে যেতে বলতেন। শিভাস রিগ্যাল ছিল তাঁর প্রিয় ব্র্যান্ড। যে সন্ধ্যায় তাঁর সামনে প্রথমবার আন্ওয়ার ভাই শিভাস রিগ্যালের বোতল খোলেন, সেই সন্ধ্যা-রাতের কথা খুব মনে পড়ে। তো, বোতলটি খোলার সময় হুমায়ুন আজাদ জানতে চাইলেন এর সঙ্গে যে ছোট বোতলটি বোনাস হিসেবে দেওয়া হয়, তা আছে কি-না। আন্ওয়ার ভাই স্রেফ মজা করার জন্যে বললেন, ‘ওটা সব সময় আপনার এক ছাত্রের জন্যে রেখে দিই।’

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ-রকম মহাছাত্রের আবির্ভাব ঘটল কবে?’

আমাকে দেখিয়ে আন্ওয়ার ভাই বললেন, ‘সে আপনার পাশেই বসে আছে।’

‘এখন থেকে ওটা আমার জন্যে রেখে দেবেন।’

‘এই যে, এটা আজ সন্ধ্যার উপহার।’ বলে ছোট শিশিটা আন্ওয়ার ভাই হুমায়ুন আজাদের দিকে বাড়িয়ে দেন। সেটা তিনি ফতুয়ার পকেটে রাখলেন। সেদিন তাঁর মন যে বেশ ফুরফুরে ছিল, কথাবার্তা থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। এই রকম তাঁকে আমি খুব কমই দেখেছি। এটা শিভাস রিগ্যালের কন্ট্রিবিউশন কি-না, বলতে পারি না। চুমুকের ফাঁকে-ফাঁকে তিনি আলাপের পাশাপাশি টিভি দেখছিলেন। সুন্দরী প্রিন্ট শাড়ির বিজ্ঞাপন দেখে তিনি বললেন, ‘বিজ্ঞাপনটি আমার ভালো লাগে, কী যেন নাম এই মেয়েটার?’

খাটের পাশে মোড়ায়-বসা পারভেজ হোসেন বললেন, ‘মৌসুমী।’

‘আঃ দারুণ তো! এটা দেখলে মোল্লাদের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যােেব।’

আন্ওয়ার ভাই বললেন, ‘কেন, ওরা কি দেখে না ভাবছেন?’

‘মহিলাদের আঙুল দেখলেই ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এটা তো মৌসুমীর নগ্ন বাহু।’ সিগারেটের একদলা ধোঁয়া তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে খাটে মুখোমুখি বসে-থাকা আন্ওয়ার ভাইয়ের দিকে উড়ে যাচ্ছিল।

আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি কি সিনেমা দেখেন?’

‘একসময় দেখতাম। এখনকার নায়ক-নায়িকাদের থলথলে শরীর দেখে গা গুলিয়ে যায়। অপুষ্টির দেশে এত মাংস! আর ওরা খুব চিৎকার করে কথা বলে। ওদের শরীরে বেশ জোর আছে!’

‘একটু আগে বললেন আপনি সিনেমা দেখেন না।’ পারভেজ হোসেন বললেন।

‘বাঙলা সিনেমা সম্পর্কে জানার জন্যে হলে যেতে হয় না। আমার স্টাডি রুম থেকেই চিৎকার আর বিজ্ঞাপন শুনে বুঝতে পারি, বাঙলা সিনেমা চলছে।’ তখন খালি-করা গ্লাসটি আন্ওয়ার ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন হুমায়ুন আজাদ, ভ’রে দেয়ার জন্যে।

আমি বলি, ‘নাটক দেখেন?’

‘আজকাল নাটক বলতে তো টিভি নাটকই বোঝে সবাই। ওগুলো যদি নাটক হয় তাহলে সোপ অপেরা কী? একবার ঈদের রাতে হাসির নাটক দেখতে বসেছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল, নাট্যকার থেকে শুরু করে সবাই খুব পরিশ্রম করেছে হাসানোর জন্যে। মুলো ধ্বংস করতেও গর্দভের এত পরিশ্রম করতে হয় না।’

‘হাসতে পেরেছিলেন?’ আন্ওয়ার ভাই জানতে চাইলেন।

‘খুব ইচ্ছা ছিল হাসার; চেষ্টাও করেছিলাম।’

‘আপনি কি তরুণদের কবিতা পড়েন?’ আন্ওয়ার ভাই জিজ্ঞাসা করলেন।

‘তরুণ কারা?’

‘এই এখন যারা লিখছে।’

মুখ থেকে ধোঁয়া বের করে হুমায়ুন আজাদ বললেন, ‘এখন তো শামসুর রাহমানও লিখছেন। তবে সভাপতিত্ব করছেন তার চেয়েও বেশি।’

‘আমি বলছি যে এখন যারা লিখতে শুরু করেছে। যারা নতুন।’

‘পড়েছি। কিন্তু ওসব পড়ে বোঝা যায় বাঙলা ভাষা খুব বিপজ্জনক দূষণের দিকে যাচ্ছে। দিন-দিন এই ভাষার শব্দগুলো কবিতার জন্যে অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে। নতুন যারা লিখছে, তারা ভীষণ চেষ্টা করছে আলাদা একটা ভাষা তৈরির, কিন্তু সেটা পৃথিবীর ভাষা বলে তো মনে হয় না।’

আন্ওয়ার ভাই বললেন, ‘আমার তা মনে হয় না। এই যে, চঞ্চল, আপনার পাশে বসে আছে, ওর কবিতা পড়েছেন?’

‘আমার কথা থাক। কিন্তু আমাদের অনেকেই ভালো কবিতা লিখছেন।’ আমি কিছুটা আড়ষ্ট স্বরে বললাম।

‘আচ্ছা চঞ্চল, তোমার স্যারকে নিজের একটা কবিতা পড়ে শোনাও। দেখি, তোমাদের কবিতা নিয়ে উনার ধারণাটা ঠিক কি-না।’ আন্ওয়া ভাইয়ের কথা শুনে তিনি বললেন আমাকে, ‘হ্যাঁ, পড়ে শোনাও।’

আমি সে-সময়কার লেখা ‘বিলাসিতা’ নামের এই কবিতাটি পড়লাম :
তিনি সবকিছু অগ্রিম চাইতেন :
বৃক্ষের আগে ফল,
সন্ধ্যার আগে চাঁদ —
নিদ্রার আগে স্বপ্ন আর
সূর্যের আগে সকাল।

বিয়ের আগেই তিনি সন্তান চাইলেন,
তার প্রেমিকা গর্ভবতী হলো।
ঘরের আগে চাইলেন জানালা —
আয়তাকার কাঠের ফ্রেমগুলো খুব
দুলতে লাগলো শূন্যে; আর
ছাদের আগে পাখা চাইলে
গোল হয়ে ঘুরতে লাগলো বাতাস।

যেদিন তিনি নিজের গায়ে হাত বুলিয়ে দেখলেন :
তার চামড়ায় মালভূমির মতো ভাঁজ —
মৃত্যুর মিস্ত্রিকে ডেকে তিনি বানালেন
কারুকার্যময় কফিন আর কবর।

সেলাই না-করা শাদা পোশাকে শরীর গলিয়ে
এক লাফে ডিগবাজি খেলেন কফিনে
আর জুতার শব্দের মতো হাসতে লাগলেন —
তার প্রেমিকা ও সন্তানরা
কাঁধে নিয়ে চললো তাকে কবরের দিকে।…

গম্ভীর হয়ে শুনলেন তিনি। কিছুই বললেন না। কবিতাটি ১৯৯৫ সালে আগস্টের কোনও এক বিকালে শাহবাগে আজিজ মার্কেটের দোতলায় ব্রাত্য রাইসুকে শুনিয়েছি। সেখানে একটা মজার কাণ্ড ঘটেছিল। পরে, তা বলব।

বেশ রাত হয়ে গেলে চেয়ার ছেড়ে উঠবার মুহূর্তে ফতুয়ার পকেট থেকে শিভাস রিগ্যালের সেই ছোট্ট শিশিটা বের করলেন। আন্ওয়ার ভাই বললেন, ‘ওটা বাসায় খাবেন।’ তিনি সে-কথায় কান না-দিয়ে একটি গ্লাস চাইলেন। আন্ওয়ার ভাইয়ের বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাসে একটু ঢেলে সেটি তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন। এবার শিশিটি উপুড় ক’রে (এক পেগের মতো হবে) কিছুক্ষণের জন্যে ধরলেন নিজের হাঁ-করা মুখে। তারপর বললেন যে, এখনই তিনি উঠবেন না, শিভাস রিগ্যাল তাঁকে নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে করিয়েছে। সেটা বলার এখনই যথার্থ সময়। ঘটনাটি এই: একবার শিভাস রিগ্যালের একটা বোতল নিয়ে নির্মলেন্দু গুণ আর হুমায়ুন আজাদ খুব বিপদে পড়েন। কোথায় বসে খাওয়া যায়, জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। তৃতীয় কাউকে তাঁরা আশা করছিলেন না, কারণ তাতে ভাগ কমে যাবে। হুমায়ুন আজাদের বাসায় মদ্যপান ছিল বারণ। শেষে নির্মলেন্দু গুণ এমন একটা জায়গা নির্বাচন করলেন, যেখানে যেতে হলে ডাস্টবিন পার-হওয়া বাধ্যতামূলক। নাক-চেপে রাখা সার্বক্ষণিক কর্তব্য। হুমায়ুন আজাদ আপত্তি করলে নির্মলেন্দু গুণ তাঁকে বলেন, ‘নেশা ও নিদ্রা নাসিকার ক্ষমতানাশক। দুই পেগেই জগতের সমূহ গন্ধ বিলীন হওয়ার কথা।’ বোতলটি যখন বের করা হয় বড় একটা ঠোঙা থেকে, তখন হুমায়ুন আজাদ বলে ওঠেন, ‘এ-যে আবর্জনার পাশে অপ্সরা!’

খুব পান করা হয়েছিল তাঁর সেই সন্ধ্যায়, রাতে। গলি থেকে রাস্তায় আসতে বাঁ-পাশের দেয়াল ধরছিলেন তিনি, টলতে-টলতে হাঁটার ফাঁকে-ফাঁকে। ‘স্যার’ বলে একবার আমি তাঁর হাত ধরতেই তিনি বললেন, ‘তুমি ঠিক আছ তো!’ রাস্তায় এসে একটা রিকশার দেখা মিলল। ‘এ্যাই, যাবে, ফুলার রোড?’ রিকশাঅলা আরোহীর আসনে বসে মাথা নেড়ে জানাল যে, যাবে না। তিনি এবার হ্যান্ডেল ধরলেন, নেশজড়ানো স্বরে ‘কেন, ওখানে কি রয়েল বেঙ্গল টাইগাররা থাকে?’ বলে, ঘণ্টা বাজালেন, ‘নামো আসন থেকে। হুমায়ুন আজাদকে বসতে দাও।’ রিকশাঅলা নির্বিকার। আমি বললাম, ‘ফুলার রোড পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটা জায়গা। স্বাস্থ্যকর স্থান। যাইবা না?’ সে বলল, ‘পেরসিডেন কইলেও যামু না।’ ফলে, দিলু রোড থেকে আসা একটা খালি রিকশা থামিয়ে কিছু না-বলে তাতেই উঠে বসলাম আমরা। বললাম, ‘তোমারে খুশি করা হইবো। স্যার যেখানে যাইতে কইবেন, সেইখানে যাইবা। এখন বাংলামোটরের দিকে চলো।’

‘বুজছি ছার, আফনেরা ন্যাশা কইরা গুইরা ব্যারাইবেন। অসুবিদা নাই।’ রিকশা চলতে থাকল। রাস্তায় যানবাহন কমে এসেছে। তবু একটা লোক কেন যে দৌড়ে রাস্তা পার হল! আস্তে চলছে দেখে হুমায়ুন আজাদ রিকশাঅলাকে বললেন, ‘প্যাডেল মারতে থাকো।’ একটা সিগারেট ধরালেন। বললাম, ‘আমিও খাব স্যার।’ আমার দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমার বুদ্ধি আছে। রিকশাটায় চড়ে এই ঠাণ্ডা হাওয়ায় আর ফাঁকা রাস্তায় ঘুরতে পারলে মন্দ হতো না।’ আর তখনই আমার খেয়াল হল, আন্ওয়ার ভাই ব্যাগের মধ্যে তিনটি বিয়ার রেখে দিয়ে বলেছেন, ‘এগুলো বাসায় গিয়ে খেয়ো।’ বাতাসে দিয়াশলাইয়ের তিনটা কাঠি খরচ হয়ে গেছে দেখে তিনি ‘এই সাধারণ কাজটা তুমি এখনও শেখোনি’ বলে নিজের পুড়তে-থাকা সিগারেটটি আমাকে দিলেন। ধরিয়ে, তাঁকে ফেরত দিয়ে বললাম, ‘আজ না, কাল খুব সকালে উঠতে হবে তো, কাজ আছে। অন্য কোনও রাতে ঘুরব স্যার।’ বাংলামোটর এসে গেল। মোড় পার হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে রিকশা থামিয়ে আমি নেমে গেলাম।

‘এখানে নেমে তুমি যাবে কোথায়?’

জবাব দিলাম, ‘আজ ফুলার রোডে যাব না স্যার।’

‘এজন্যেই কি একটু আগে তোমার মনে হল ফুলার রোড পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি জায়গা?’
রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বাড়াতে চাচ্ছিলাম না আমি। বললাম, ‘বাসার গেট সাড়ে এগারোটায় বন্ধ হয়ে যায়। আপনি যেতে পারবেন তো!’ আগফাকালারের একটা বিশাল নিয়নসাইনে (এখন যেখানে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বিল্ডিং, সেখানে একটা দোতলা ভবন ছিল, তার ছাদের কিছু উপরে ছিল ওই নিয়নসাইনটি) তাঁর মুখ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। বললেন, ‘ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।’ বুঝলাম, তিনি বিরক্ত হয়েছেন। ‘আসি স্যার’ বলে শাহবাগ হয়ে-আসা বাস যেখানটায় থামে, সেখানে রওনা দিতেই তিনি জানতে চাইলেন পকেটে টাকা আছে কি-না। একটা বাস ঠিক তখনই এসে গতি কমিয়ে চলতে লাগল। হেলপার যাত্রী আকর্ষণের জন্যে চেঁচাচ্ছিল। ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’ বলে দিলাম সেই মন্থর-হওয়া বাসের দিকে দৌড়। ফুটবোর্ডে পা রেখেছি, আর দরজাটার গতি তখন বেড়ে গেছে। তার আগেই এক মুহূর্তে দেখি, ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি তাকালেন একবার, তারপর সামনের দিকে; রিকশাঅলা তার পাছা আসন থেকে উপরে, শূন্যে রেখে প্যাডেল মারতে শুরু করেছে।

(কিস্তি ৩)

মনিপুরী পাড়া, ঢাকা ১০/৫/৮

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: চঞ্চল আশরাফ
ইমেইল: chanchalashraf1969@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজী দিলরুবা লীনা — মে ২১, ২০০৮ @ ৯:৪৬ পূর্বাহ্ন

      প্রথম কিস্তির যে টান টান উত্তেজনা ছিল দ্বিতীয় কিস্তিতে সেই উত্তেজনার লাগামে রাশ ধরেছে মনে হল। সামনের কিস্তিতে হুমায়ুন আজাদের চরিত্রের অন্ধকার দিক ভয়ঙ্কর ভাবে আসবে বলে আশঙ্কিত হচ্ছি।

      কাজী দিলরুবা লীনা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিয়া হাশান — মে ২১, ২০০৮ @ ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন

      আগের কিস্তিতে বহুদিন স্ত্রী সংসর্গ থেকে বঞ্চিত আন্‌ওয়ার ভাইর সঙ্গে একই মশারির নিচে মদ্যপান ও রাত্রিযাপনের বর্ণনা পইড়া খুব মজা পাইছিলাম। কিন্তু এবারের কিস্তিতে মনে হয়, চঞ্চল সতর্ক হইয়া গেছেন। আল মাহমুদের কিছু বাক্য ছাড়া চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার নিজেরে জাহির করতে কবিতা তুইল্যা দিছেন।

      জিয়া হাশান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুজিব মেহদী — মে ২৩, ২০০৮ @ ৯:৩১ অপরাহ্ন

      ‘ঢাকায় এসে আমি যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, তখন আমার অবস্থান সাতচল্লিশ নম্বরে। তখন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীও অনেক বড় কবি। আজ আমার নাম শামসুর রাহমানের পরে উচ্চারিত হয়। কিছুদিন পরে একসঙ্গে হবে, তারপর এক নম্বরে, বুঝেছ? কিন্তু কুলি হওয়ার খায়েশ আমার নাই।’

      আল মাহমুদের এ কথাটা আক্ষরিকভাবেই সত্য হয়েছে। তিনি এক নম্বরেই।

      মুজিব মেহদী

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com