বিধবা সময়ের গল্প
গল্প ছাড়া মানুষ নেই, সব মানুষের গল্প আছে, গল্প সে বলবেই।
- হাসান আজিজুল হক
সাহিত্যের যাবতীয় চশমা খুলে লিখতে বসেন হাসান আজিজুল হক। মারাত্মক আবেগের চশমা, ধর্ম-সম্প্রদায়ের চশমা, — সবকিছুই খুলে রাখেন তিনি। যদি কেউ তাঁর চোখে কোনও চশমা দেখেই থাকেন, বলতে হয়
…….
বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প । হাসান আজিজুল হক । সময় প্রকাশনী । ফেব্রুয়ারি ২০০৭ । প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী । ১০০ টাকা ।
…….
নির্লিপ্তির চশমা সেটি। ওই এক চশমার গুণে আমাদের চারপাশের এত আবেগ, এত স্বপ্ন, এত ধর্ম, এত বিভেদ সবই এক অন্য রূপ পায় হাসানের গল্পে। গল্প-উপন্যাসের গাঁথুনিকে নিরাবেগী ও যৌক্তিক বললে গদ্যলেখকরা সাধারণত উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। এইভাবে লেখকের নিরাবেগী ও নির্লিপ্ত বোঝাপড়ার ক্ষমতার সঙ্গে অনেকেই তাঁর গদ্যে আবেগ থাকা না-থাকার বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেন। হাসান এ ধারণার অন্যতম প্রধান শিকার। বিশেষ করে তাঁর স্বপ্ন, আবেগ, ধর্ম ও বিভেদের কথাই লিখছি এ কারণে, সবশেষ গল্পের বই বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্পতে তাঁর এই নিরাবেগ ও নির্লিপ্তি নতুন এক মাত্রা পেয়েছে নিরূপায়তার ক্রোধ ও ক্রন্দন সর্বজনীন হওয়ার মধ্যে দিয়ে।
হাসানের লেখায় আবেগ ও স্বপ্নের এই নতুন জন্ম ছুঁতে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের অপেক্ষা করতে হয় গল্পের শেষ অবধি। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’-এর ক্ষেত্রে যেমন — ‘অহন তুমি কাঁদতিছো? অহন তুমি কাঁদতিছো?’ সংলাপের নম্র বক্রতা ও অসহায়তা দিয়ে আমরা অনুভব করি তাঁর নির্লিপ্তি জন্ম দিচ্ছে কী এক গভীর ক্ষতের জগত, বইয়ে দিচ্ছে আবেগের কী এক প্রস্রবন, বাঁচিয়ে রাখছে স্বপ্ন কী এক বেঁচে থাকার! যতক্ষণ না এই প্রান্তরে পৌঁছান ততক্ষণ কিছুতেই হাসান রেহাই দেন না তার নিরাবেগকে। এই নিরাবেগের সঙ্গে হাসানের পরিশীলিত, ঋজু ও ঝকঝকে গদ্যরীতি যুক্ত হলে পরাস্ত আবেগ সম্পূর্ণ উধাও হয়। ফলে আবেগের চশমা খুলে হাসান যে আবেগ দেখেন তা রূপান্তরিত হয় অথবা জন্ম নেয় প্রমিত আবেগের রূপে।
পূর্বসূরি কথাসাহিত্যিক জগদীশ গুপ্ত কিংবা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রতি হাসান আজিজুল হকের যে সশ্রদ্ধ আকর্ষণ, তা দিয়ে অবশ্য তাঁর এই নির্লিপ্তিকে ব্যাখ্যা করা যায় না। হতে পারে, এ রকম একটি গন্তব্যে পৌঁছতে তাদের লেখার ধরন হাসানকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, হাসানের এক সহজাত দক্ষতা রয়েছে আবেগকে অদৃশ্য করে ফেলার, আবেগকে রূপান্তরিত করার। আর সেটি বারবার সম্ভব হয় পারিপার্শ্বিক আর্থ-সমাজ, ভূগোল ও সময় সম্পর্কে হাসানের নিরবধি অভিজ্ঞানের ফলে। তিনি নিজেই যেমন বলেন, তাঁর লেখার যাবতীয় উৎস হলো বাস্তবতা; আর ওই বাস্তবতা যে-অসম্ভব নির্দয়তা ও কল্পনার পাঁকেচক্রে জড়িয়ে থাকে, নিরাবেগী বোঝাপড়া ছাড়া সম্ভব নয় সেসবের মধ্যে থেকে কোনও কিছু তুলে এনে প্রকাশ করা। কিন্তু হাসান ওই কাজটিই করেন, কেননা তা তাঁর সহজাত প্রবণতার সঙ্গে মেলে। ফলে তাঁর বাক্য হয় অসম্ভব নির্মেদ ও তীক্ষ্ণ, যদিও নিরাশ্রয়ী তীক্ষè বাক্যগুলি সম্পর্কবদ্ধ হয়ে দৃশ্যজ চিত্রকল্প তৈরি করতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই আশ্রয় নেয় কাব্যিকতার। বাস্তবতাকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করার জন্যেই এ কাব্যিকতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কেননা বাস্তবতার তলদেশে যাবতীয় আবেগ ডুবিয়ে দিয়ে বাস্তবতাকেই ফের স্ফূরিত করা এ ছাড়া সম্ভব হয় না। এইভাবে এই বাস্তবতা আবেগের একটি বিশেষ ভরকেন্দ্র তৈরি করে যা আপাতদৃষ্টিতে আবেগময় নয়, বরং অবরুদ্ধ আবেগজাত। অবরুদ্ধ আবেগ প্রকাশে বিকৃতির যে ভয় ও আশংকা থাকে, হাসানের নির্লিপ্ত অন্তর্দৃষ্টি ও লেখনরীতি কাজ করে তার প্রতিষেধকের।
দুই.
বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প বইয়ে হাসানের নির্লিপ্তি স্পর্শ করেছে জাতীয়তাবোধের মৌলিক ও বিকৃত স্বর, কথিত গণতন্ত্রঅভিমুখিনতা আর ধর্মজ রাজনীতির বিষয়আশয়। কিন্তু এই নির্লিপ্তির মধ্যে দিয়ে যে নিরুপায়তার ক্রোধ ও ক্রন্দন উপচে উঠেছে তা প্রতিটি গল্পেই ছড়িয়ে দিয়েছে ধানীলংকার ঝাঁঝ। প্রকৃতার্থে এই ঝাঁঝই এ বইয়ে হাসানের রক্ষাকবচ, এই ঝাঁঝের কারণেই খুলে পড়েছে এতে সাহিত্যের সব চশমা।
তবে কাল-ভূগোল আর আর্থসামাজিক বৈষয়িক বিবেচনাগুলি ছাড়াও আরও অনেক কিছুই আছে এ বইয়ের গল্পে। প্রথমত হাসানের এসব লেখার সংলাপআশ্রয়ী গল্পের কাঠামো আর সংলাপ আগের চেয়ে অনেক খোলামেলা। শব্দ ও বাক্যের খুব স্পষ্ট সর সর শব্দ প্রতি মুহূর্তে আমাদের তাড়িয়ে ফেরে এইসব গল্পে। সব মিলিয়ে হাসানের পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ভাষার মসৃনতায় যুক্ত হয়েছে উদ্দেশ্যহীনতার অস্থিরতা। দ্বিতীয়ত আঞ্চলিক ভাষারীতিকে জীবনযাপন, দ্বন্দ্ব ও মনোভঙ্গী প্রকাশের চালক হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যে দিয়ে হাসান নেমেছেন এক অপর-নিরীক্ষণে। তৃতীয়ত ব্যক্তি হাসানও সশব্দে উপস্থিত তাঁর এসব নতুন কোনও কোনও গল্পে। ফলে লেখকের শ্রেণিঅবস্থানের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন শ্রেণির সঙ্গতি-অসঙ্গতিও তীব্র কোনও কোনও গল্পে। এইসব গল্পে একদিকে প্রথম পুরুষ (আমি) চেষ্টা চালায় অপরাপর শ্রেণিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে সংরক্ষিত রাখার। কিন্তু তারপরই আবার সেই প্রথম পুরুষ নিজের লেখকসত্বা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে মনযোগী হন অন্যান্য শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দিকে। হাসানের ভাষার শক্তিমানতা এসব গল্পের একটি পরিণতি দিতে পারলেও লেখকের শ্রেণিগত অসহায়তা ও শৈল্পিকতার আকাক্সক্ষার দ্বন্দ্বের সাক্ষী এ গল্পগুলো।
হাসানের লেখার নতুন এ স্বর যাবতীয় দুর্বলতাসহ প্রথম ধরা পড়ে ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’তে, যে বই একই সঙ্গে গল্প ও ব্যক্তিগত গদ্য। মানবচরিত্রের যা সচরাচর বৈশিষ্ট্য, — উত্তাপ ও ঝাঁঝ পেরিয়ে সে প্রবেশ করে নিস্পৃহতার জগতে, — হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রে তা হয় নি, বরং নিস্পৃহতার কারণেই ঝাঁঝ যুক্ত হয়েছে তাঁর লেখাতে। প্রথম পর্বে (সম্ভবত ‘আমরা অপেক্ষায় আছি’ অবধি) তাঁর লেখায় তিনি নির্লিপ্তির মধ্যে দিয়ে আবেগকে স্থৈর্যের রূপ দেন, — কেননা তখনও তাঁর কোনও না কোনওখানে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন তিনি কোনও স্বপ্ন দেখেন না, একেবারেই স্বপ্নহীন এখন তিনি। অক্ষমতা ও নিরূপায়তার মধ্যে দিয়ে মানুষ তাঁর সমসময় সম্পর্কে যে বোধিসত্বা অর্জন করে, তা তাঁর মধ্যে ঘটায় নীরব ক্ষরণ, তা তাঁর মধ্যে খুব গোপনে জন্ম দেয় উদ্বেগ আর ক্রোধের। এই ক্ষরণ, এই উদ্বেগ ও ক্রোধই এখন তাঁর গল্পে উঠে আসছে তীব্র ঝাঁঝসমেত। ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’র পর ‘মা-মেয়ের গল্প’ বইয়ে এই ঝাঁঝ সুস্পষ্ট,Ñ যা একটি উপসংহার তৈরি করেছে বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প বইয়ে। স্বপ্ন আর দেখেন না বলেই হয়তো প্রকৃতিনির্ভরতাও এসেছে হাসানের কোনও কোনও গল্পে।
তিন.
হাসানের এ বই নাকি ছাপা হওয়ার কথা ছিল আরও আগে। কিন্তু বইটির নামগল্প অর্থাৎ ‘বিধবাদের কথা’ ছাপানোর জন্যে নেয় একটি লিটল ম্যাগ। সম্পাদকের পক্ষ থেকে তাঁকে অনুরোধ করা হয়, পত্রিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত গল্পটি কোনও বইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্যে। লিটল ম্যাগ প্রকাশের বিপত্তি সম্পর্কে আমাদের সবারই কমবেশি ধারণা আছে। ফলে হাসান আজিজুল হকের অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে এবং শেষপর্যন্ত বইটি বাজারের মুখ দেখে ২০০৭-এর বইমেলাতে। আর এতসব কাণ্ডকারখানার তোড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর ‘বিধবাদের গল্প’ ছাপা হওয়ার আগেই বিভিন্ন লেখকআড্ডায় আলোচিত হয়ে ওঠে। দু বোনের ভুল বিয়ে, তাদের দু ছেলের ভিন্ন পথ রূপকার্থে আমাদের এতসব ইতিহাসের অন্তর্গত করে, এতসব অন্তর্দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়, এতসব অন্তর্ক্ষরণ ঘটায় যে শেষপর্যন্ত গল্পটি হয়ে ওঠে মহাভারতের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। কালো ও শাদার আত্মিকতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে, শোকসত্ত্বা বুনতে বুনতে এ গল্পে বাঙালি মুসলমান ক্রমান্বয়ে পরিশীলিত হয় আর মুসলমান বাঙালি বিকৃত হতে থাকে। কিন্তু তারপরও একই রক্তজাত হওয়ার নিরূপায় নিয়তি তাদের তাড়িয়ে ফেরে। দু বোন চেষ্টা করে আবারও একটি কাথা বুনতে। কিন্তু সেই কাথা বোনা হবে কি না কেউ জানে না। জানে না, নাকি দুটো কাথাই বোনা হবে। আর দুটো কাথা বোনা হলে জোড় কে মেলাবে, কীভাবে মেলাবে। তারা কেবল নকশা আঁকার কাজ করে আর সন্ধ্যা নামছে বলে কাঁথাটা আলগোছে ভাঁজ করে রেখে দেয় কালো সিন্দুকের ডালা খুলে একেবারে তলাতে।
এই এক গল্পের কাছে আমাদের বার বার ফিরে আসতে হবে নতুন হাসানের মন ও বিভঙ্গ অনুভব করবার জন্যে, আমাদের সমাহিত সব অর্জন ও কালযন্ত্রণাকে অনুভব করবার জন্যে। তবে গল্প তো শুধু এই একটিই নয়, এ বইতে হাসান রেখেছেন আরও ছ’টি গল্প। ‘দূরবীনের নিকট-দূর’ ও ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ গল্প দুটিতে রয়েছে আদিবাসীরা। ‘একটি নির্জল কথা’য় রয়েছে ভারতবিভক্তির ফলে উন্মূল হয়ে এ দেশে আসা সন্তানহারা একজন মায়ের প্রতিদিনকার জীবনযাপনের কাছে হেরে-হেরেও বেঁচে থাকা স্মৃতিহাহাকার। যে সন্ত্রস্ত জীবনে আমরা এখন প্রায়অভ্যস্ত তারই আখ্যান ‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’ এবং ‘ভূতের ভবিষ্যত’ গল্পে। আর আছে খানিকটা দলছুট গল্প ‘অতিথি সৎকার’।
চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হলো, সাতটি গল্প মিলেমিশে হাসান আজিজুল হকের গল্পের নতুন অর্থময়তা তৈরি করেছে। আর এই অর্থময়তা তৈরি হয়েছে চিত্রল অনুভবময় ক্ষুধা, নারী ও প্রকৃতিনির্ভরতার মধ্যে দিয়ে। আবার, এ তিন অনুভবই যাবতীয় সৃষ্টিময়তার উৎস ও গন্তব্য। আপাতদৃষ্টিতে যে গল্পগুলিতে (‘দূরবীনের নিকট-দূর’, ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ এবং ‘অতিথি সৎকার’) প্রথম পুরুষ হিসেবে হাসানও ক্রমউন্মোচিত, সে গল্পগুলি আসলে যাবতীয় ব্যাকরণকে পরাস্তকারী ক্ষুধা ও ক্ষরণের গল্প। ‘দূরবীনের নিকট-দূর’ ও ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ গল্পে তিনি এবং তার বহিরাগত একাত্মতাওয়ালা সঙ্গীরা একাত্ম হওয়ার চেষ্টা চালান আদিবাসীদের ভূগোল আর সমাজে। ‘অতিথি সৎকার’ গল্পে তিনি বিপ্লবী দলের এক নেতার সঙ্গে একই মাইক্রোবাসে যেতে যেতে হঠাৎ যাত্রাবিরতি দেন নেতার এক আত্মীয়বাড়িতে। এ সব গল্পের উপস্থাপনা মনে করিয়ে দেয় তাঁর আত্মগত গল্পের নকশা ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’কে। কিন্তু গতিময় দৃশ্যকল্প আর দৈববাণীর মতো বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্যে দ্বিধান্বিতও হতে হয় এগুলিকে শুধু নকশার পর্যায়ে রাখতে :
“ছোট রাস্তাটিও শেষ। একেবারে ডবল দাঁড়ি দেওয়া। এইখানে পৃথিবীর কিনারা, সময়ও শেষ, জায়গাও শেষ। পা ফেলতেই কিনারার বাইরে, সময়ের বাইরে। কিনারা পেরিয়ে ভুক্তাবশিষ্ট এটোকাঁটা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। বিলটা পারদ-শাদা, নিভাঁজ ধাতব চাদরের মতো পাতা, কোনো প্রতিফলন নেই, শুধু দিনের তীব্র আলো ছিটকে ফেলে দেয়। সেদিক থেকে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় চোখ সরিয়ে আনতে পারলেই ভালো। রাতে অন্তত বিলের পূবপাড়ের চওড়া বাদামি মাটির উপর পাতা অমৃতডাঙি গাঁ-টিকে দেখতে পাওয়া যায়। শদুয়েক গজ চওড়া, মাইলটাক লম্বা এক চিলতে উঁচু-নিচু জমিতে সাঁওতালদের একটির পর একটি পড়ো-পড়ো বাড়ি। সাঁওতালরা কিছুতেই পুরো পড়তে দেবে না, তারা তালি মারবে, ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া আঁকাবাঁকা সেলাই করবে, গাছের হাড়, মানুষের হাড় গুঁজে দিয়ে চালাগুলিকে খাড়া করে রাখবে। ন্যাকড়াফালি, শুকনো পাতা, মাটি দিয়ে বুজিয়ে দেবে আর যদি কোনো, যদি কোনোমতে একখানিও আস্ত মাটির বাড়ি থাকে, তাহলে সাঁওতালবউ সিঁদুর-মাটি লেপে, নীল-মাটি, গেরুয়া-মাটি লেপে, আলকাতরা-মাখানো দরজায় শিকল দিয়ে সেখানে জীবনের ছায়া আর শান্তি আটকে রাখবে। সেই অমৃতডাঙির পশ্চিম শিওরে তীরসোজা সরলরেখায় বিল আর পৃথিবীর কিনারা, পুবে তেমনিই সরলরেখায় ভীষণ সবুজ ধানের মাঠ। অমৃতডাঙিতে একটিও ভিটে নেই, মাটি আর ঘরের মেঝে একই সমতলে। এখানে সেখানে উঁচু মাটির ডিবিগুলিতে গোখরো আর উইপোকা আর গাঁয়ে ঢোকার মুখে একটিমাত্র নিখুঁত অক্ষয় বিশাল বট যাতে ওরা যে এখনো কেন বেঁচে আছে, তার কারণ বোঝা যায়।” — (দূরবীনের নিকট-দূর)
“গোরস্থানে গেলে এরকম হয়। মনে হয় কেউ নেই, কেউ আসবে না, তারপরই বাতাসই যেন এক একটি হালকা মূর্তি হয়ে হাত-পা তুলে নাচতে থাকে। তেমনিই, এতক্ষণ কেউ কোথাও ছিল না, বাড়ি নয়, ঘর নয়, মাঠ নয়, পথ নয়Ñ তারপরেই ধীরে ধীরে কাঠি-বসানো পতাকা, তারপর দুই সারি পতাকার ভিতর দিয়ে হাওয়া থেকে তৈরি হাওয়া মানুষেরা নিঃশব্দ চিৎকারে ধেয়ে আসছে বড় রাস্তার দিকে।” — (দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে)।
“কিন্তু পাখিদুটো গেল কোথায়? ওরা কি উড়ে গেছে? হতেই পারে না — সরিতেন্দু বলল, দুটোই পড়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ভিটের ঢালুতে ভাঁট জঙ্গলের মধ্যে তাদের কিছু কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাওয়া গেল। একটাতে বন্ধ-রাখা অটুট ঠোঁট, অন্যটার শরীরের নিচের অংশ। সেটা হাতে নিতে দপদপ করছে হৃৎপিণ্ড। সেখানকার মাংস তপ্ত। সরিতেন্দু খুব সুদর্শন। এখন এমন কুৎসিত লাগল ছেলেটাকে!” — (অতিথি সৎকার)
চার.
কিন্তু অবহেলা সহ্য করে শেষ পর্যন্ত এই গল্প তিনটিতে টিকে থাকে সরল ক্ষুধা। এই সরল প্রসঙ্গটি উঠে না আসা পর্যন্ত নাগরিক বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির আদিবাসীসংক্রান্ত সুশীল উদ্যোগকে আর একটি বিপ্লবী দলের নেতার সঙ্গে একই মাইক্রোবাসে মফঃস্বলযাত্রায় আমাদের পাঠকদেরও তেমন গরম বা হাঁসফাঁস লাগে না। বরং বেশ আরামই লাগে। আর এই আরামের কারণে আদিবাসীদের জন্যে নিবেদিত সুশীলদেরও একেবারে আত্মার সঙ্গীই মনে হয়। সুশীল মধ্যবিত্তরা আদিবাসীদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ক্যারিকেচার দেখাতে ‘দূরবীনের নিকট-দূর’ গল্পে আদিবাসী উৎসবে যায় আর একটানা কয়েকদিন ধরে মদ্যপানের তীব্র লালসায় খাবি খেতে থাকে। আর এর ফাঁকে ফাঁকে যা হয় আর কি, — সাঁওতালদের অতিথিবরণ উপভোগ করতে করতে নিজেদের উদারতা ও স্বার্থত্যাগের নজির স্থাপন করে চলে। যদিও সাওতালদের ভাষায় গাওয়া গান শুনতে শুনতে সুশীলদের ভারি অসুবিধাই হয়, আর ‘দোষ’ ও ‘অপরাধ’ দূর করতে সাওতাল বুড়ি, প্রৌঢ়া, কিশোরী ও যুবতীরা বাংলা ভাষায় নতুন করে গান গাইতে থাকে।
কিন্তু ক্ষুধা উঠে আসে, কেননা দূরবীন গল্প জানে, আর হাসান পারেন না দূরবীনকে সামাল দিতে। কেননা ‘গল্প ছাড়া মানুষ নেই, সব মানুষের গল্প আছে, গল্প সে বলবেই।’ আর বাতাসে চোখ ভাসতে থাকে। আর এমন নয় যে সেসব চোখ লাল রঙের কুকুরের চোখ। বরং চোখগুলো সব রক্তঝরা লাল চোখ, বাতাসের চোখ, রোদের চোখ, জমির আর আকাশের চোখ। এইসব চোখ জ্বলজ্বল করে তৃষ্ণায়, অপার এক তৃষ্ণায়, তারপর নিভে যায় জলের ভারে। জলের নিমজ্জিত অজস্র চোখ পায়ে মাড়ালেই কোথায় সে জল আর কোথায় সে চোখ, — পড়ে থাকে শুধু কাঠকয়লা! আর অতিথি সৎকার করতে আসতে থাকে পচুইভর্তি মাটির কলস, ছোট ছোট গ্লাস। কলসির মধ্যে ছলাৎ ছলাৎ করতে থাকে কুল কুল করতে থাকে কত ফুর্তি, কত মজা, কত বসন্ত-রাতের রমণসুখ, কত স্মৃতি, কত বিস্মৃতি, রাতপাখির ডাক, কখনো কুচকুচে কেউটের নিঃশব্দ বুকে হাঁটা, হয়তো কখনো একটু নড়ে ওঠে কলসি, ককিয়ে কেঁদে ওঠে দারুণ ব্যথায়। এবং তাই কলসীদোলা আবিলতা নিয়ে উদারতা জাগে আর এও জানতে ইচ্ছে করে হাসানের, কী করে এই সাওতালরা বেঁচে থাকে, বাঁচে কেমন করে?
গল্প এইবেলা আরও গল্প তৈরি করে; এ-ও কি সম্ভব এইসব সুশীল মানুষ শিখতে পারবে তাদের মতো বেঁচে থাকা? দারুণ ত্রাসে, দারুণ ক্ষোভে দূরবীন চিতাবাঘ হয়ে ওঠে, বোমাবাজ হয়ে ওঠে, এইবেলা সে সুশীল মানুষদের অক্ষমতা দেখিয়ে দেয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে মাটি পুড়িয়ে, ঘাস পুড়িয়ে, গাছ পুড়িয়ে, বাতাস পুড়িয়ে আকাশ পুড়িয়ে সংগুপ্ত হাসিতে ফেটে পড়ে,
“শিখতে লারবেন ছার, শিখতে লারবেন? আমরা সোমবছর কি খাই তাই জিগাছেন? আমরা শাকপাতা ছিঁড়্যা খাই, ঘাস কালাই সেদ্ধ করে খাই, খামচে খামচে মাটি তুলে খাই, খিদেয় প্যাটে মাটি লেপি, ইঁদুরÑছুঁচো মেরে খাই, শামুক গুগলি খাই। আমাদের কুন্নো অভাব নাই।…আর কুনো ধান আমরা দেখি না। আমাদের দিষ্টি নাই।
“এইবার সে একটু শান্ত হয়। কেননা আগুন নিভে আসে। এইবার ‘সে কেমন জুড়িয়ে যেতে যেতে’ বলে, ‘সাঁওতাল-ওঁরাও-রা না খেঁয়ে খেঁয়ে শিখেছে ক্যামন করে খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়।’”
আদিবাসীদের সঙ্গে সংহতি ও একাত্মতাওয়ালাদের আর এক গল্প ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ অবশ্য এক দেবী আছেন। হাসানের গল্পের উৎস যদি বাস্তবতাই হয়ে থাকে তা হলে আমার ধারণা, ইনি মহাশ্বেতা দেবী। তিনি যাচ্ছেন রাজশাহীর সাঁওতাল আর ওঁরাওদের মধ্যে সংহতি ও একাত্মতাওয়ালা সবাইকে সঙ্গে করে। ঢোল, মাদল বাজছে বটে, কিন্তু দ্রিম দ্রিম, ঘোরলাগা, দোল-লাগা নয় সেই ঢোলমাদল, বরং ঢ্যাপঢ্যাপানো। আর সেই শব্দে দুই দিকে দুই রুঠো শুকনো যুবতীদের সঙ্গে দেবীও নেমে পড়েছেন, দুলছেন, নাচছেন। কোথাও বেসুরো সুরে শোনা যাচ্ছে অতিথিবরণের বেসুরো গান। গানের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চকিত বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দের মধ্যে কেমন এক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ‘‘… মা এসো গো, রানী এসো, ধুলোকাদার মধ্যে দিয়ে এসো, হাড়-ফাটানো রোদের মধ্যে দিয়ে এসো, খালি পায়ে ফাটা-পায়ে বাবুদের ফাঁকা মাঠের ভিতর দিয়ে রক্ত ঝোঁঝাতে ঝোঁঝাতে এসো, মাঘের কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে ছেঁড়া শাড়ির ফোকর দিয়ে এসো। এসো গো, ছেলেপিল্যার ভোকের মধ্যে, ফাটা শানকির কান্দনের মধ্যে, যবের শীষে, গমের শীষে, চাল-পচুনির আমানির সোয়াদে এসো।’’
এ ভাবেই সর্বগ্রাসী ক্ষুধা জেগে উঠতে থাকে, ‘‘…আমরা খেতে পাই না, আমাদের শুয়োরগুনো, ছাগলগুনো, গরুটো মোষটো, মুরগিগুনো, ডোবার শোলটাকি মাছগুনো পর্যন্ত খেতে পায় না। সবাই খালি রোগা হচে আর মরে যেচে।’’
এই ক্ষুধার্ত মানুষদের দেবী মানে মহাশ্বেতা দেবী দিব্যি দিতে চান, ‘‘চায়ের কাপে পচুই খাস। ঘরে ভাত নেই খাবার নেই, আর ভাত পচিয়ে মদ খাস?’ শুনে একজন বলে, ‘এক কাপ দুই কাপ খাই গ, কুন্ শালা বেশি খায়, ঊরি বাবা মায়ের সামনে খেতে পারি? আপনারা সব অতিথি আসিচ্ছেন, তাই আজ এট্টু…’’
হ্যাঁ, অতিথিরা মানে সংহতি ও একাত্মওয়ালা অতিথি এসেছেন; তাই আজ একটু মন খুলে খাওয়াদাওয়া করতে পারছে আদিবাসীরা। কেননা অতিথিদের জন্যে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে মুঠো মুঠো সরু মোটা নানারকম চাল জোগাড় করা গেছে পুরো বিশ কে.জি.। একটি শাদা হাঁস, — তাও পাওয়া গেছে ভাগ্যগুণে। মুষ্ঠিচালের গরম খিঁচুড়িবোঝাই বিশাল ডেকচির মধ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে দা দিয়ে কুটি কুটি করা সে হাসের মাংস। এ হেন গরম খিঁচুড়ি খেতে খেতে আনন্দে সাঁওতাল আর ওঁরাওদের চোখ মুদে আসে; কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দু মাইক্রোবাসে করে আবারও শহরের দিকে রওনা হন বমি সামলাতে ব্যতিব্যস্ত সংহতি আর একাত্মওয়ালারা। আর আদিবাসীপাড়া আবারও নির্জন, পরিত্যক্ত ও জনহীন হয়ে পড়ে। হাসানের ভাষায়, ‘‘সৃষ্টির প্রথম দিনের মতো।’’
আমরা জানি না, সৃষ্টির প্রথম দিন কেমন ছিল। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের সৃজনক্ষমতা সর্বগ্রাসী। তাই এই নির্জনতা ও জনহীনতায় পরিত্যক্ত অঞ্চলে আমরা খুঁজে পাই সৃষ্টির প্রথম দিবসটিকে।
এসবের পাশাপাশি হাসানের ‘অতিথি সৎকার’ যেনবা ক্ষুধার জাদুবাস্তবতা। এক বিপ্লবী রাজনীতিকের সঙ্গে দল বেঁধে জিপে করে সাতক্ষীরা যাওয়ার এই গল্প শুরু হয়েছে আধুনিকতার উপদ্রব পাটকেলঘাটা ব্রিজের মুখে। জিপ সেখানে কিছু সময়ের জন্যে আটকে গেলেও তাদের মধ্যে অবশ্য তেমন কোনও উদ্বেগ কাজ করে না। কেননা ব্রিজ থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম কোণেই তাদের গন্তব্য, যেখানে নেতার আত্মীয় বা বোনজামাইয়ের বাড়ি। শেষপর্যন্ত অবশ্য হেঁটে যেতে হয় না তাদের। গাড়ি ফের উঠে পড়ে খাদ থেকে এবং জিপ সোজা ঢুকে পড়ে খুব বড় পড়ো এক উঠোনে। এবং তখনই আসল গল্পের শুরু হয়। কীর্তিমান বামনেতার দুলাভাই চেক লুঙ্গি আর ফর্শা গেঞ্জি গায়ে বেরিয়ে আসেন। হাসানের বয়ানে লিখতে গেলে, “ছিপছিপে চেহারা, চোখ দু’টি শান্ত না নিস্পৃহ ঠিক বলতে পারি না। আমাদের বন্ধু বাম নেতা তাঁর শ্যালক, অতি মধুর সম্পর্ক কিন্তু ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বেলাতেও উচ্ছ্বাস কিংবা হৃদয়চাঞ্চল্য প্রকাশ করা বাম রাজনৈতিক ঐতিহ্যে একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু গৃহকর্তার তো সে বালাই নেই, তবু তিনি কেমন একটা জণ্ডিস-জর্জর হলুদ চোখে চেয়ে মৃদু গলায় শুধু বললেন, বাড়িতে সব ভালো? আম্মা ভালো আছেন?”
গৃহকর্তার নিস্পৃহতার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল আরও একটু পরে, তারা দুপুরে কিছুই খান নি বলার পরে। ততক্ষণে ক্ষুধা যেন আকাশের মতো ভেঙে পড়ছে তাদের সকলের ওপরে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে জেগে উঠছে আরও তীব্র অবিনাশী ক্ষুধা। আর সেই অবিনাশী ক্ষুধাকে উপহাস করতেই বুঝি গৃহকর্তা অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটাতে শুরু করলেন। বাড়ির মধ্যে থেকে এক ছোকরা অতিথিদের জন্যে নিয়ে এলো বগলে পুরানো মাদুর, হাতে পানি ভরা বিরাট এক পিতলের জগ। তারপর সে আবারও ফিরল দু হাতে দুটি গামলা নিয়ে। একটিতে একটু একটু ঢেউ তুলছে ‘নিরুৎসাহজনক পাতলা ঠাণ্ডা ডাল’ আর আরেকটিতে ‘ডেলা পাকিয়ে আছে ভাতের দানা’। ক্ষুধা ততক্ষণে তাদের সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে ফেলেছে, তারা একজন আরেকজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন ক্ষুধার তোড়ে, তাই তাদের শুধু এটুকুই মনে হলো, ‘‘খুব ভালো কথা হচ্ছে গামলা দুটোই পুরোপুরি ভরা।’’ এরপর ছোকরার পাশাপাশি গৃহকর্তাও এলেন একহাতে একবাটি পুঁইশাক আর আরেক হাতে চীনেমাটির বাসন নিয়ে। এবার শুরু হলো ক্ষুধাহত্যার পর্ব।
“আমরা চমৎকার শৃঙ্খলায় তক্তপোশের উপর বসে যাই। করকরে ঠাণ্ডা ভাত পুঁইশাক দিয়ে মেখে দুএক গ্রাস মুখে তুলে আমাদের নেতা বন্ধুটির মুখের দিকে চেয়ে দেখি। অস্বস্তি আর লজ্জায় তাঁর বামপন্থী মুখ সামান্য আরক্ত — গোঁফজোড়া ওঠানামা করছে। ভগ্নিপতি একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন, একটি কথাও বললেন না। আশ্চর্য দ্রুততায় শেষ তণ্ডুলকণাটি, পুঁইশাকের সর্বশেষ পাতাটি আর ডালের তলানিটুকু পর্যন্ত অদৃশ্য হলো আর নিজের নিজের গর্ত পুরোপুরি বুজিয়ে ফেলায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের সকলের মুখের চামড়ায় স্বাভাবিক রং ফিরে এল। আলো রোদ হাওয়া ভালো লাগতে লাগল, জিপের মালিক আমাদের ভীষণ বড়োলোক বন্ধু আবার খুনসুটি চালাতে শুরু করলেন। বাংলাদেশের মানুষের নিদারুণ অবস্থা আর আসন্ন বিপ্লব নিয়ে দুচারটে কথা শুরু করাও এখন সম্ভব বলে মনে হলো। এর মধ্যে কয়েকবার আমি আমাদের ধনী বন্ধুটিকে দেখেছি। কোনো খাবারেই কখনই তাঁর তেমন আগ্রহ দেখিনি। মুখে খাবার নিয়ে এমন এলিয়ে চিবোনোর অভ্যাস তাঁর যেন ভিতরে ঢুকতেই চাইছে না মুখ-ভরা খাদ্য, উগড়ে পড়ল বলে। হুইস্কি-টুইস্কি হলে একটু-আধটু লোভ করতে দেখেছি তাঁকে কখনো কখনো। অত যে কথা বলেন, মুখে তাঁর একটি শব্দ ছিল না এতক্ষণ। তক্তপোশে বসার আগে যখন ভাত ডাল সাজানো হচ্ছিল, বিবর্ণমুখে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সবার পিছনে। আর খাওয়ার সময় একবার দেখেছিলাম তাঁকে। কি গভীর মনযোগ তাঁর, যেন সাধনায় বসেছেন। একটি শাকপাতা তাঁর বাসন থেকে সরানোর চেষ্টা করলে যেন একবোরে সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বেন।”
কিন্তু, তারপর যা হয়, পেট ভরতেই মাওলানা ভাসানী যেমন আল মাহমুদকে বলেন, নাও এবার তোমার কবিতা শোনাও, তেমনি এবার বুদবুদিয়ে তির্যক সব ভাবনা উঠে আসতে থাকে পরিতৃপ্ত পেটের মধ্যে থেকে। তৃপ্তি অর্জনের পর সমালোচনায় আক্রান্ত হতে আর বাধে না তাদের। কেননা ‘পছন্দ অপছন্দ সব খাবার আগে, খাওয়া হয়ে গেলেই তৃপ্তি অবিকল এক।’
তবে ভগ্নিপতি আরও অনেক কাণ্ড করতে জানেন। শিকার থেকে ফিরে মুখোমুখি হলেন তারা সেইসব কাণ্ডকারখানার। পুকুরে তখন মাছ ধরতে নেমেছে বোধহয় পুরো গাঁয়ের মানুষ, বড় বড় রুই কাতলা জাল ফেলে তুলে আনছে তারা, শুকনো ডাঙায় সেই সব মাছ লাফালাফি করছে আর তাদের প্রতিটি আঁশের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তীব্র মৃত্যুপূর্ব আকুলতা। আরও আছে দুটি খাসী, খুঁটিতে বাধা অবস্থায় তারাও অপেক্ষা করছে মৃত্যুর জন্যে। এরই মধ্যে কোনওখান থেকে স্তব্ধতা ফুঁড়ে কার যেন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “সোবাই কি মাছ পালো — মেয়াভাই বলে দিইছে মাছ যেন সোবাই পায়, বাড়িতি মানী অতিথি খাবে, তাদের সম্মানে গাঁয়ের সোবাইকে মাছ দিতি হবে হবে, সোবাই কি পাইছে? অলো, কথা কস্ না ক্যানো –।”
এবং অনেক রাতে অতিথিরা যখন খেতে বসলেন, “তখন প্রচুর আলো, প্রচুর বাতাস, প্রচুর মানুষ, সামনে ধরে দেওয়া হচ্ছে নকশা-করা চিনেমাটির বাসন, তাতে রাখছে ঘিয়ে জবজবে ধোঁয়া-ওঠা পোলাও, রুইমাছ ভাজার এক একটি বিরাট টুকরো, প্লেট ছাপিয়ে বাইরে গিয়ে পড়ছে, মুরগির রান, মাছের কালিয়া, দোপেয়াজা, খাসির কোর্মা — ঘুমচোখে আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। সত্যি বলতে কি জীবনে আর কখনো এত বিপুল খাদ্যবস্তুর দিকে এত ভাবলেশহীন নিস্পৃহ চোখে চেয়ে দেখিনি।”
কেন এমন করলেন গৃহস্বামী? তিনি কি আসলে বামমনাদের বোঝাতে চাইছিলেন ক্ষুধার ভাষা? বোঝাতে চাইছিলেন প্রকৃত সমতার ভাষা? তাই প্রথমবেলা অবহেলামেশানো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন, আর রাতে গাঁয়ের সব হতদরিদ্র মানুষসহ ভোজনের আয়োজন? এইসব চিন্তা নিয়ে আমরা এগুনোর আগেই হাসান জানিয়ে দেন, “বছরতিনেক পরে, একাত্তর সালের প্রথম দিকেই, এপ্রিল-মে মাসে হবে, খবর পেয়েছিলাম, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি দল এক ঝাঁক বুলেটে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল ওঁর দেহ। সঙ্গে ছিল তাঁর একমাত্র কিশোর পুত্র।”
পাঁচ.
গল্পে হাসান ভবিষ্যতদ্রষ্টা হতে চান না, — এই অর্থে তার গল্পে কোনও গন্তব্য নেই। ব্যাপারটিকে বেশির ভাগ সময়েই আমরা স্বপ্ন না থাকার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। নামহীন গোত্রহীন-এর একটি গল্পে যেমন, কোনখানে যাবে তা জানা নেই তার, তবে কোথাও না কোথাও যেতে হবে। ‘ফেরা’ গল্পে যেমন, ডোবাটা ছোট, অস্ত্রটি যে কোনও মুহূর্তে তুলে আনার আকাক্সক্ষাও থাকে। লোকমুখে এ গল্প এত প্রচারিত যে, নিজের লেখার অর্থময়তা প্রমাণ করার জন্যে কাউকে আমি তাঁর সাক্ষাৎকারে বয়ান করতে পড়েছিলাম, “হাসান আজিজুল হকের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা গল্প ‘ফেরা’তে এক মুক্তিযোদ্ধা পুকুরের মধ্যে ফেলে দেয়া অস্ত্র অনেকদিন পর আবার তুলে আনে।” ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই আনন্দিত যে হাসানের গল্প এভাবে তিল থেকে তাল হচ্ছে এবং ব্যক্তি হাসানই ম্যাজিকরিয়াল হয়ে উঠছেন। তবে হাসানের এই পর্বের গল্পে ভবিষ্যতহীনতা সুস্পষ্ট হওয়ার পরও কোনও এক স্বপ্নময়তা উঠে আসছে তাঁর নারীদের মধ্যে দিয়ে। জগতের সব কিছুর ওপর আস্থা হারালেও হাসানের অভিজ্ঞান নারীতে স্বপ্নময়। হাসানের নারীসম্পর্কিত এই অভিজ্ঞান তাঁর ভবিষ্যতহীনতা ও গন্তব্যহীনতার সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে।
আর নারীর কত মূল্যের বিনিময়ে, কত অসম্ভব হাহাকারের মধ্যে দিয়ে যে এই স্বপ্ন বেঁচে থাকে! নিরুদ্দিষ্ট বেঁচে থাকাটাও তখন কী যে ভালো আর আবেগময় হয়ে ওঠে! ‘একটি নির্জল কথা’য় এ রকম এক আবেগময় মা এগিয়ে চলেন আত্মকথনের মধ্যে দিয়ে। এরকম সব কথন আত্মকথনের মধ্যে নীরব হয়েই তো সম্ভব হয় কোনও এক অজানায় বেঁচে থাকা স্বপ্নের খোঁজ পাওয়া! সমবয়সী সৎ-মায়ের সঙ্গে বন্ধুতায় যেন দুই বোন হয়ে পড়ার স্মৃতি, বিয়ের পরে স্বামীর কাছ থেকে তার শরের কলম কালিতে ডুবিয়ে কোনোমতে নাম সই করতে শেখার স্মৃতি…আরও কত স্মৃতি তার। এতগুলো ছেলেমেয়ের মা হয়েছে সে, স্মৃতি তো থাকবেই তার। কিন্তু সবচেয়ে নৃশংস স্মৃতি এই, ছেলে তার মারা গেছে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সান্নিপাতিক জ্বরে। এই ছেলে সেলাইকলের মতো গুনগুনিয়ে ওঠে মায়ের মনে, যার কবর সে ফেলে এসেছে আরেক দেশে। সেই মা বলে চলে :
“সারা জেবন খ্যালোম-দ্যালোম, হাঁটলোম-ফিরলোম, এতগুনো ছেলেমেয়ের মা হলোম, কিন্তুক আমি জানি, আমি বাঁচি নাই। কে বিশ্বেস করবে এই কথা? আমি এ্যাকন জীয়ন্তে মরা। ছেলে য্যাকন চলে গেইচে, কি কাঁদন সব কাঁদচে। সেই কাঁদনের রোলের মধ্যে এ্যাকমনে একটো কতাই বলেছেলোম যি, আল্লা, ছেলেকে তুমি বেহেশত-দোজখ যিখানেই রাখো, সি তুমার ইচ্ছা, আমার কুনো কতা নাই, তবে আমার মরণের পরে আমাকে ছেলের কাছে রাখবে। নাইলে মায়ের কাছে দায়ী হবে তুমি। ছেলের কাছে থাকার লেগে সারা জেবন আমি মরে থাকলোম। বিশ্বেস কর ধনরা, আমি বাঁচি নাই।
“সেই মরাকে টানতে টানতে ই দ্যাশে আনলে। কত্তা আর নাই। নাইলে তাকে শুদোতম। ছেলেদের কাছে শুদোই, বল্, ক্যানে আমাকে ই ভিন্ দ্যাশে আনলি। ই দ্যাশ দ্যাশের লোকদের লেগে ভালো — আমাকে ক্যানে লিয়ে এলি! কুন্ দোজখিরা দ্যাশ ভেঙেছে, তাতে আমার কি? আল্লা, আল্লা, আমার মুখটো যি খারাপ হয়ে যেচে। সব মায়ের পুত ভালো থাকুক। কেউ দোজখি লয়। আমি জানি আমি দোজখি, জরমো থেকে দোজখি। একবার খালি বেহেশত থেকে বাতাস আইছিল। খোকার মুখ দেখেছেলোম আমি। মায়ের বুকে পনেরো বছর ছিল। তাইতে বলছি, ছেলম তার কাছে, ই দ্যাশে আনলি ক্যানে, একবার শুদুইলি না বুকের ভ্যাতর কি হচে, গলায় দাড়ি বেঁধে টানতে টানতে লিয়ে এলি।”
এইসব বিলাপের মধ্যে পার্থিব-অপার্থিব সব সত্য একাকার হয়ে যায়। কিন্তু আধার নামতেই থাকে, দুপুরবেলায় রুপোর টুকরোর মতো সব প্লেন উড়ে যায়; হাহাকার ও আঁধারের মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে বুড়ি মা বলে সাঁঝবেলার রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বেলে দিতে।
হাসানের ‘বিধবাদের কথা’ স্পষ্ট করে কিছু বলে না, কিন্তু আমরা স্পষ্টই জেনে যাই, সৃষ্টির সপক্ষে অনুরণিত যাবতীয় হাহাকারের সবটুকু অধিকার কেবল নারীর। নিঝুমপুরের দু বোন মিলে আমাদের ইতিহাস একটাই, কিন্তু তাদের দু ছেলের মতো এ ইতিহাসের অন্তর্গত ধারা দুটো। অথচ এই ইতিহাসের গতি নির্ধারণে তাদের কোনও ভূমিকাই নেই। দু বোনের বিয়ে হয় একই পরিবারের দু ভাইয়ের সঙ্গে। দু বোনের মতো দু ভায়েরও চেহারা একই রকম। আর তফাৎও একই, — একজন শাদা, একজন কালো। কথা ছিলো শাদার সঙ্গে শাদার বিয়ে হবে, কালোর সঙ্গে কালোর। কিন্তু মৌলভী ভুল করে ফেললো। বিয়ে হলো শাদা বড় ছেলের সঙ্গে ছোট কালো মেয়ের, আর কালো ছোট ছেলের সঙ্গে বড় শাদা মেয়ের। তারপর মৌলভীরও কি আর সাধ্য আছে সেই ভুল শোধরায়?
“কিছুই করার নাই, কিছুই করার নাই, আল্লার কালাম পাঠ করা হইছে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়, আল্লাতালা নিজেই বাঁধা তাঁর কালামের কাছে, আল্লার সাধ্য নাই তাঁর কালাম ডিঙি মেরে পেরিয়ে যাবার।”
তবে এই বিয়ের সর্বগ্রাসী তাৎপর্য দেখা দিলো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে। তার আগে দু বোনের দু ছেলে হলো। এবং এখানেও হাসানের প্রতীকায়নের খেলা, ছেলেরা পেলো মায়ের গায়ের রং। শাদা মা রাহেলার শাদা ছেলে রাহেলিল্লাহ, কালো মেয়ে সালেহার কালো অথবা ঘনশ্যামল ছেলে সাহেবালি। আবার এক বোনের ছেলে ন্যাওটা হলো আরেক বোনের। সাহেবালিকে যাবতীয় প্রশ্রয় দেয় রাহেলা আর রাহেলিল্লাহকে মাথায় করে রাখে সালেহা। রাহেলিল্লাহর কালো বাপ সহ্য করতে পারে না তার শাদা ছেলের নিকষ কালো কাণ্ডকারখানা। আবার সাহেবালীর বাপে সহ্য করতে পারে না শেখ মুজিবের প্রতি তার কালো ছেলে সাহেবালির পক্ষপাতিত্ব। কেমন করে সহ্য করবে, ‘দেশকে’ যে ‘ওই শেখ মুজিবই ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিচ্ছে’! ইতিহাসের যাবতীয় আকস্মিকতার মতো এসবও অদ্ভুত আকস্মিকতা! আবার এক গোলকধাঁধাও। এমন তো বলা যাবে না কালো বলেই তা কালো, এমনও বলা যাবে না শাদা বলেই তা। আপাতদৃষ্টিতে হাসানের এই প্রতীকায়ন যত সিঁধেই মনে হোক, তিনি আমাদের নিয়ে প্রবেশ করেন শাদা-কালোর গোলকধাঁধায়।
যা হাসানের সহজাত নয় বলে এতকাল আমাদের ধারণা ছিল, তাও দেখি তাঁর করতলে খেলা করছে, শুধু ‘বিধবাদের কথা’য় নয়, এ বইয়ের আরও সব গল্পে। যেমন, নিষ্ঠুরতার বয়ান। ‘বিধবার কথা’য় রাহেলার ছেলে রাহেলিল্লাহ স্কুলে যাওয়া বাদ দিলো সেখানে কমিন হিন্দুদের ছেলেরাও পড়ে বলে। অথচ কালো বাপের ষোলআনাই ইচ্ছে ছিল ছেলে তার স্কুলেই পড়–ক। আবার সালেহার ছেলে সাহেবালি মক্তব থেকে পালিয়ে এলো, যদিও বাপ চেয়েছিল ছেলে তার মওলানা হোক। ‘বিধবাদের কথা’ এইভাবে বাংলাদেশের আদর্শের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত প্রতিটি পরিবারের গল্প হয়ে উঠতে থাকে, ইতিহাস-আখ্যান হয়ে উঠতে থাকে। রাহেলিল্লাহ জন্মনিষ্ঠুর, খেঁকশিয়ালের এইমাত্র চোখমেলা বাচ্চাটাকেও সে হত্যা করে কাঁধে করে ঘুরে বেড়াতে পারে প্রচণ্ড রিরংসা নিয়ে। সাহেবালী সেরকম নয়, তুলে আনা পদ্মফুল সে অনায়াসে দিয়ে দিতে পারে তার খালাকে, কেননা তার মা তো নিজেই এক পদ্মফুলের মতো। কিন্তু শুকানো পদ্মফুলের গন্ধও সহ্য হয় না রাহেলার মরা খেকশিয়ালের বাসী রক্তের মতো। ফুল সে ছুঁড়ে ফেলে আর তা কুড়িয়ে নিয়ে যত্ন করে রেখে দেয় সালেহা। সেই শুকনো পদ্মপাপড়ির ঘ্রাণে বিহ্বল বাতাসেরা ঘুরপাক খায় সালেহার ঘর জুড়ে। মরা খেকশিয়ালের লাশ আর উৎকট ঘ্রাণ কাঁধে নিয়ে রাহেলিল্লাহ বড় হতে থাকে। সাহেবালী বড় হতে থাকে একেবারেই গন্ধবিহীন। তারা যত বড় হয়, যুদ্ধ ততই ঘনিয়ে আসে। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আর দুই ভাই শপথ করে যার যার পুত্র নিধন করার। এক ভাই শপথ করে আরেক ভাইকে হত্যা করার। সেটাই তো সঙ্গত যুদ্ধের সময়ে! কিন্তু তারপরও তো কথা থাকে। সে কথাই হাসান বলেন :
“এখন তারা দুইবোন কি করবে? এই দুই মা কি করবে? তাদের দেশ নেই, সমাজ নেই, মানুষ নেই, মানুষকে ভালোবাসার অধিকার নেই, ঘৃণা করারও অধিকার নেই, তাদের স্বামী নেই, পুত্র নেই, যদি থাকেও তাতে কিছুমাত্র অধিকার নেই। তারা রাঁধে বাড়ে, স্বামীপুত্রকে খাওয়ায়, নিজেরা খায় কি খায় না। তারা আদেশ করে না, আদেশ মানে। তবু মানুষ যে তারা, কেমন করে দূরে থাকে, স্বামী মরবে, পুত মরবে, অতি কঠিন কষ্ট, অতি তীব্র বিষ তাদের দেহে যতটা ধরে তার চেয়ে বেশি জোর করে ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের মুখ সেলাই করে দেওয়া হবে কিন্তু মরবার অধিকার দেওয়া হবে না। এঁটো হাতে বোনের মুখের দিকে তীব্র চাউনিতে চেয়ে থাকে রাহেলা। ঘটনাগুলি সব যখন ঘটে যাবে, তোর ছেলে যখন আমার ছেলেকে সরিয়ে দেবে দুনিয়া থেকে, আমার ছেলে যখন তোর সোয়ামির কলজেটা ছিঁড়ে নেবেÑযখন স্বামীরা নেই, ছেলেরা নেই তখন আমরা কি একজন আরেকজনকে খুন করব, একে অপরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ব, নখ দিয়ে ছিঁড়ে নেব গলার নালি, উপড়ে নেব চোখ! আমরা কি করব? আমার স্বামী মেরেছে তোর স্বামীকে, আমার ছেলে মেরেছে তোর ছেলেকে, আমরা দুই বোন, সালেহা বুন আমার, রাহেলা বুবু আমার, এই পেয়ারা আদ্দেক আমি খাইছি, বাকি আদ্দেক তুই খা, আমি বাবার বাঁ কোলে চড়ি, তুই ওঠ ডান কোলে, দুধ নেই, তবু আয়, মায়ের এক বুকের দুধ তুই খা, আর এক বুকের দুধ আমি খাই।”
যুদ্ধ, যে আদর্শ নিয়েই সংঘটিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কী দেয় মানুষকে? বেঁচে থাকা দু বোনের স্থির ও দ্রবীভূত বেদনার মধ্যে দিয়ে সেই সত্যের কাছে পৌঁছান হাসান। তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তিতে আমরা পেয়েছিলাম শান্তির এই দর্শন: এ হলো এমন সময় যখন বিহ্বল পুত্র কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায় তার মৃত জনকের খাটিয়া; আমরা পেয়েছিলাম যুদ্ধের এই দর্শন: এ হলো এমন সময় যখন পিতার কাঁধে চেপে বসে মৃত পুত্রের খাটিয়া। কিন্তু ‘বিধবাদের কথা’ থেকে কী পাই আমরা? মাত্র নয় মাসের, অথচ ধর্মের উন্মত্ততায় এতই বিধ্বংসী এই যুদ্ধ যেখানে পিতাও বেঁচে থাকে না মৃত পুত্রকে কবরে শোয়াবার জন্যে! ৩৫ বছর পেরুনোর পর মুক্তিযুদ্ধের চাওয়াপাওয়ার যে পরিণতি দেখেন হাসান, যে গ্লানি ও ক্রোধে দ্রবীভূত হন তিনি তা থেকেই কি খুঁজে পান এই আখ্যান? এটি এমন এক আখ্যান, যেখানে যাবতীয় সৃজনশীলতা নিয়ে নারীরা মরে মরেও বেঁচে থাকে আর পুরুষ কেবলই হারিয়ে যায়, যুদ্ধ নিঃশেষ করে ফেলে তার সকল সৃষ্টির ক্ষমতা। খরখরে এক দ্রষ্টব্যহীন, নিয়তিহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দুই বোন আবারও কাঁথা বুনবার কাজ শুরু করে, নকশা আঁকতে থাকে, সুতো বাছতে থাকে। কেউ কোনও কথা বলে না। কাঁথার আধেক জুড়ে সালেহা ফুটিয়ে তোলে তার সারা জীবন, আর এমন এক পৃথিবী যা সে নিজেই দেখে নি কোনও সময়, এমন সব শিশুও থাকে সেই নকশায় যাদেরও সে কোনওদিন দেখে নি, তবে হয়তো তার ওই না দেখা পৃথিবীর ওই না দেখা শিশুদের নমুনা হিসেবেই তার কোলজুড়ে এসেছিল সাহেবালী। সে সেই সাহেবালীর জন্যে একটি কন্যে, ধান দূর্বা, এলাহি ভরসা, বট অশত্থের পাতা, মাছ আর হরিণ আর শিকায় রাখা হাঁড়ি এইসবও আঁকে। তারপর সুতা বাছাই করে, কেননা কাঁথা যেদিন শেষ হবে, সেদিন সেখানেই মাথা রেখে মরতে হবে তাকে। পৃথিবীতে এখন তার একটি কাজই বাকি আছে, — এই মরে যাওয়া। আর রাহেলাও কাঁথা বোনে, কাঁথার প্রান্তে আঁকে বিরাট একটি শিকল, যা দিয়ে সে আটকে ফেলবে সালেহার সব নকশা। এইভাবে হাসান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে মিলিয়ে দেন একই তরঙ্গে। এইভাবে নির্লিপ্ততা নয়, প্রবল এক ক্রোধ থেকে তিনি আবার ফিরে যান শুরুতে অথবা শুরুর মতো একটা কিছুতে।
ছয়.
নির্লিপ্ততা পেরুনো আবেগের ধানীলংকা ঝাঁঝ চূড়ান্তে পৌঁছেছে হাসানের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ গল্পে। আমাদের মানুষরা তো গত কয়েক দশকের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে এমনই এক মানুষে পরিণত হয়েছে যে অনায়াসে মানুষকে তারা এখন ৮০/৯০ টুকরো করে ফেলতে পারে, ১৬০/১৭০ টুকরো করে কেটে পুরানা ঢাকা থেকে আবাহনী মাঠ পর্যন্ত মুড়িমুড়কির মতো ছড়াতে ছড়াতে যেতে পারে। এই নিস্পৃহ নৃশংসতার সংস্কৃতি, এই মানবিক অবমাননার সংস্কৃতি, এই অবরুদ্ধ ভয়ের সংস্কৃতিই হাসানের এ গল্প জুড়ে। এই এক সংস্কৃতিতে আক্রান্ত সময় রয়েছে তাঁর ‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’ গল্পটিতে। এই যে সব সংস্কৃতির তাণ্ডব এখন আমাদের এই দেশে, সমাজে, রাজনীতিতে, গ্রামে, নগরে সেখানে মানুষের আজ হাহাকার করবারও কোনও অধিকার নেই। হাসানের এ সব গল্পেও কোনও হাহাকার নেই, কোনও কান্না নেই, এমনকি কোনও ফোঁপানিও নেই। হাসান তার অবরুদ্ধ ক্রোধ ও আবেগ নিয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রকৃতির কাছে, প্রকৃতির নিচে। যেভাবে টিটন তার নিরীহ ও অনুগামী বন্ধুকে খুন করেছিল, এমনকি দেহটাকেও আর ফেলে রাখে নি মাঠের ভেতর যাতে কেউ কবর দিতে পারে, ঠিক একইভাবে সে নিজেও তাই খুন হয়ে যায় প্রকৃতির রহস্যময়তার দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিতে। সারা গল্প জুড়ে রহস্যগল্পের মতো ছমছমে অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতি, কী উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে আমরা পড়ি দুটি হত্যার বিবরণ! এমনকি হত্যার পরেও এক সন্ত্রাসের তীব্র আশংকা। কেননা কলজে বিসমিল্লাহ সবই তো টিটন উপড়ে ফেলেছিল তার বন্ধুর; ইটের ভাটার গনগনে আগুনের মধ্যে সে জ্বলছে হৃদয়হীনতা নিয়ে। এখন মৃত্যুর পর টিটন তার দিকে যত আগুনে ঠাণ্ডা চাউনিতেই চেয়ে থাকুক, তাতে কিছু আসে যায় না। এবার টিটনকে আর ছাড় দেবে না সে, ভূতেরও ভবিষ্যত আছে, — এই সত্য মৃত্যুর পর জানতে পেরেছে সে। পরশুরামের ‘ভূষণ্ডীর মাঠ’কে ফিরিয়ে আনেন হাসান, তবে তামাশা হিসেবে নয়, রূঢ় হিংস্রতা হিসেবে। যেন তিনি মার্কসের কথাকেই একটু ঘুরিয়ে বলেন, প্রতিটি গল্পই দুইবার লেখা হয়, একবার কমেডি হিসেবে একবার ট্র্যাজেডি হিসেবে। আমরা দেখি এই প্রথম সেই বন্ধুটি টিটনকে নাম ধরে ডাকে, বলে, আয় লড়ি আমরা, হাড্ডাহাড্ডি লড়ি।
মৃত্যুর পর পর্যন্তই কেন এগিয়ে যায় বাস্তবতার সহগ আর আরজ আলী মাতুব্বরের মুগ্ধদ্রষ্টা হাসানের চোখ? কারণ তিনি কোনওখানে আর আশা দেখেন না, সম্ভাবনা দেখেন না।
‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’-এও যেমন: ধর্ষণ করা হলো ফুলিকে। ছোট কোষা নিয়ে একেবারে সুন্দরবনের মধ্যেই ঢুকে পড়ে ফুলি কয়েকটি গুগলি, চিংড়ি আর শামুকের পিছু পিছু। তারপর ঘাসের ঢাল বেয়ে খানিকটা ওপরে উঠে একটি সুন্দরি গাছের তলায় হাঁড়িটি শিয়রে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে লাল রোদের ভেতর গুটিশুটি মেরে। তারপর ঘুম ভেঙে দেখে হাত পনেরো দূরে হেঁতাল আর বেতবনের মধ্যে অর্ধেক শরীর ডুবিয়ে তারই মতো মোহঘুমে শুয়ে আছে ডোরাকাটা। কিন্তু সে ভয় পায় না। আর যেন একযুগ তাকিয়ে থাকে সেই বাঘের দিকে। আর বাঘটিও হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেন একযুগ ধরে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে ফুলির দিকে। তারপর আয়েস করে মস্ত একটা হাই তুলে আবারও দেখতে লাগল তাকে। তাদের মধ্যে নীরব এক যুদ্ধ চললো খানিকক্ষণ। অনেকক্ষণ তার সামনে পিছে ঘুরে, আড়চোখে তাকিয়ে ডোরাকাটা বিরাট এক লাফে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে। এই এতক্ষণ ফুলি নিজের কথা ভাবে না, সে ভাবে, যাই হোক না কেন, কিছুতেই হাড়ির ওসব খেতে দেয়া যাবে না ডোরাকাটাকে। এরকম এক ডোরাকাটা তার কিছুই করল না। কিন্তু তাকে ধর্ষিত হতে হলো একটু পরে মানুষেরই কাছে।
আর তারপর জ্ঞান হারাতে হারাতে ফুলি দেখল ডোরাকাটা বিদ্যুৎ ঠিকরে পড়ছে চোখের ওপর। একটা মুণ্ডু গড়িয়ে পড়ল খালের ওপর। আর মুণ্ডুছেঁড়া দেহটা নিয়ে একান্ত অনুগতের মতো ফুলির কাছে বসে পড়ল ডোরাকাটা।
এখানেও হাসানের সেই প্রকৃতিনির্ভরতা। ধনীদের জন্যে আছে বিচার বিভাগ আর গরীবের কণ্ঠে আছে কেবল এই হাহাকার, ‘আল্লায়, আল্লায় অ্যার বিচার কইরবো।’ ডোরাকাটা ছাড়া তাই কে আর পাশে দাঁড়াবে ফুলির?
বিধবার কথা ও অন্যান্য গল্প বলছে, জীবনের উপান্তে এসে হাসান আজিজুল হক এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আঁকুপাকু করছেন সভ্যতার সংকটের মধ্যে। ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’, তাই পারছেন না আস্থাহীন হয়ে পড়তে, আবার মানুষ যে বড় দানব হয়ে উঠেছে, পারছেন না এই রূঢ় সত্যকে অস্বীকার করতে। তাঁর অসহায়, বেদনার্ত ও ক্রুদ্ধ চোখ তাই ভূতের ভবিষ্যতে, একান্ত অনুগত ডোরাকাটার দিকে।
সংলাপআশ্রয়ী দৃশ্যজ চিত্রকল্পের জন্ম দিতে সক্ষম এক কথ্য ভাষার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে হাসানের এই অসহায়তা, এই বেদনা আর এই ক্রোধ। এ সব গল্পের বেদনা ও ক্রোধকে স্পর্শ করার জন্যে বোধ হয় এর কোনও বিকল্পও ছিল না। হাসানের ভাষা পরিশীলিত, এ কথা বহু পুরানো, বহুবার প্রমাণিত সত্য। কিন্তু সংলাপও যে কথাসাহিত্যে অনবরত শক্তিমান দৃশ্যজ চিত্রকল্পের জন্ম দিতে পারে, সংলাপই যে একক ও অনন্য বর্ণনাভঙ্গি হয়ে উঠতে পারে তা তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন আমাদের। তাঁর পরিশীলিত ভাষাও উন্নীত হয়েছে অন্য এক স্তরে। আর তার কারণও হাসানের ক্রমরূপান্তর। ‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’-এ যেমন পড়ি :
“তবে সে এখনও নিজেকে ঠিক জানে না। কি যে ঠিক করতে হবে বুঝতে পারে না। নিজের শরীরের বাইরেটা দেখতে পায়, কিন্তু শরীরের ভিতরে কি যে বিজবিজ বিড়বিড় করে, শিরশির টনটন করে ফুলি কিছুতেই ধরতে পারে না। তার বুক দুটি সুপারির মতো শক্ত তবে তার চাইতে একটু বড়। হাত পড়লেই ব্যথা করে। সেখানে একটুও লোম নেই। অথচ নাভির নিচে, দুই ঊরু যেখানে একসঙ্গে মিলেছে, সেখানে ত্রিভুজের মতো জায়গাটায় হালকা চিকন ধোঁয়াটে রোম দেখা দিয়েছে। ফুলি দেখেছে, জঙ্গলের ভিতর হালকা বালির চর, তার উপর সরের মতো মাটি, তার উপর নরম কচি দুর্বাঘাস। এসবের কিছুই কি সে বুঝতে পারে? বিরক্তিতে মুখ তার কুঁচকে ওঠে।”
হাসান লিখছেন: “ফুলির মানচিত্রে একটা ফুটকি, খুব ছোটো কালো একটা ফুটকি। ঐটুকুতেই প্রাণ। কোমর সামান্য ভারী হয়েছে, কঠিন যন্ত্রণার সঙ্গে বুকের সুপারি দুটি বাড়ছে, কোমল ত্রিভুজের উপর রোঁয়ারা ঘন হচ্ছে। সন্ধের মুখে নিঃশব্দ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে।”
‘বিধবার কথা’তে তিনি লিখছেন: “এদিকে সমস্ত রাত ধরে অন্ধকারে সারা বাংলাদেশ জুড়ে বৃষ্টি হচ্ছে, বিদ্যুৎ ললপাচ্ছে, মাটির তলা থেকে গুম গুম আওয়াজে বাতাস ধসে পড়ছে, তখন খুব সকালে টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে রাহেলা এক পা এক পা করে উঠোন পেরিয়ে, ঘরের দাওয়া পেরিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল বামুনের মেয়ে ন্যাংটো মরে পড়ে আছে। সোনা দিয়ে গড়া ভাঙা পুতুল, না-ই বা থাকল পরণে একটি সুতো, নিজের আব্র“ নিজেই রেখেছে মেয়ে, শুয়ে যে আছে কি ভঙ্গি তার, উপুড় হয়ে আছে। বিশালাক্ষী এই কন্যার মুখটি কিন্তু আকাশের দিকে তোলা। মরার সময় চোখের পাতা পড়েনি, পাথরের চোখ, শাদা জমিনের উপর গোল কষ্টিপাথর বসানো, তাদের মাঝখানে আবার দুই বিন্দু হিরের কণা! শরীরে তার আঘাত তেমন কিছু নেই। মেয়েকে উপুড় করে শুইয়ে পিঠের উপর বসে ঘাড়টা ভেঙে মুণ্ডু উপরের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আছে একটি মোক্ষম আঘাতের চিহ্ন। দুই উরুর মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গেছে শরীরের সমস্ত রক্ত।
“মাথা থেকে, বুক থেকে এক টানে ময়লা শাড়িটা সরিয়ে নিজের খোলা দুই বিশাল বুকের দিকে হিংস্র চোখে চেয়ে রইল রাহেলা: এত বিষ খেয়েছে এখান থেকে তার ছেলে! এত রক্ত ঝরেছে যেখান থেকে এই মেয়ের, তার নিজের ঠিক সেই জায়গা থেকেই একদিন রাহেলিল্লাহ নামে এক দানব বেরিয়ে এসেছিল! রাহেলা দুই হাতে নিজের চুল ধরে মাটিতে মাথা ঠুকতে লাগল, টেনে হিঁচড়ে ফেলতে চাইল তার বুক, তারপর মরা মেয়ের কপালে বার বার চুমু খেয়ে পা ছড়িয়ে অর্ধোলঙ্গ অবস্থায় সেখানে বসে রইল।”
তিনি লেখেন: “সে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন পিছন থেকে তার দিকে চেয়ে কয়েকবার ককিয়ে উঠল সবর, থেমে থেমে কয়েকবার, যেন শেষবারের ককানিটা থেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মাটির ঢেলার মতো গড়িয়ে পড়বে তার মরা দেহ: আমি আমার একমাত্র পুত্রের জন্য শেষবার কাঁদি, জন্মের শেষ কান্না কাঁদি, আকাশ চিরে কাঁদি, বাতাস পূর্ণ করে কাঁদি, বুক ফাটিয়ে কাঁদি, আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে কান্না ঢুকুক, বাঁশির মতো বেজে উঠুক, বাজের মতো ফেটে পড়–ক। শুনে রাখ্, সবর বলে, তোর জন্যি এই আমার শ্যাষ কান্না, রাজাকারের জন্যি আমার কাছে মরণ ছাড়া তার আর কিছু পাওনা নাই। আমার হাতেই তুর মরণ, তোর নিস্তার নাই। নিজির হাতে নিজির কলিজা এই আমি কাটি ছিঁড়ি ফালায়ে দিতেছি।”
এইভাবে হাসানের লেখার নির্লিপ্তি ও নিরাবেগ ক্রমাগত এক বিধবা সময় খনন করে চলে; আমরা হিম হয়ে যাই, আমাদের শরীরে জ্বালা ধরে, আমাদের মধ্যে কান্না ও আক্রোশের জন্ম নেয়। যে নির্লিপ্তি এতদিন কঠিন বরফ হয়ে জমাট বেধেছিল, নির্লিপ্তির সেই বরফগলা চোরাফাঁদে ডুবে যেতে যেতে এখন এত আতংক, অনিশ্চয়তা আর এত মৃত্যুর আশংকা আমাদের ঠেঁসে ধরে যে তা নিয়ে উপহাস করার কোনও শক্তি আমরা খুঁজে পাই না। যে নির্লিপ্তি এতদিন ছিল ছিপছিপানো মাঞ্জা মারা এখন সেই নির্লিপ্তির খরখরানো ধারে আমরা ক্ষতবিক্ষত, ব্যান্ডেজ বাধতে ব্যতিব্যস্ত। আমাদের তিনি একটি দেশের জন্মকথা শুনিয়েছেন, আবার সে দেশের বন্ধ্যাত্বের কথাও শুনিয়েছেন। আমাদের তিনি ইতিহাসের কথা বলেছেন, তেমনি সে ইতিহাসের জোড়াতালিটুকুও দেখিয়েছেন। আত্মজা ও একটি করবী গাছ দিয়ে যার শুরু হয়েছিল, বিধবাদের কথা এখন তাঁরই মুখে।
বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রিয় সাধনদা’, সাধন চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘সাহিত্য দিয়ে আমরা কি করব/ কলম কি কখনো তপ্ত ইস্পাত হবে।’
আমার মনে হয়, ওই প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে যাই আমরা এসব গল্প থেকে।
লেখা : এমা রোড, লন্ডন। ১-২০ চৈত্র ১৪১৪, ১৪ মার্চ-০৩ এপ্রিল ২০০৮




জবাব নেই। (সন্দীপনের ভাষা ধার করতেই হলো)। অভিনন্দন লেখক হাসান আজিজুল হক, অভিনন্দন আলোচক ইমতিয়ার শামীম।
আলতাফ হোসেন
অনেক দিন পর হাসানের গদ্যজগতের চমৎকার এক ব্যবচ্ছেদ পেলাম। অজস্র ধন্যবাদ।
শিবলী নোমান
ইমতিয়ার শামীম, এরকম লেকা আপনিই পারেন লিখতে।
অপূর্ব সোহাগ
ইমতিয়ার শামীমকে ধন্যবাদ। অসাধারণ!
লাবণ্য প্রভা
ভালো লাগলো।
সরকার আমিন
অসাধারণ।
এ তো একটা গ্রন্থের আলোচনা লিখতে গিয়ে রীতিমতো আরেকটা ক্ষুদ্রাকৃতির গ্রন্থই লিখিত হয়ে গেল দেখছি। এরকম প্রবন্ধ লিখতে সন্দেহ নেই, আনুপূর্বিক অধ্যয়ন জরুরি হয়ে পড়ে। ইমতিয়ার শামীম যে সে পর্বটা নিখুঁতভাবেই সম্পন্ন করেছেন, এ লেখায় তা স্পষ্ট হয়েছে।
আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধেয় হাসান আজিজুল হকের যে সঙ্গত অভিযোগ, এ ধরনের লেখা সে দীনতা ঘুচাতে পারে।
মুজিব মেহদী
চমৎকার লেখা।
খালেদা