জার্নাল: এপ্রিলের ২০-২৬, ২০০৮

আলতাফ হোসেন | ২৮ এপ্রিল ২০০৮ ১২:৫৮ পূর্বাহ্ন

এই ব্যাপারটা ভালো লাগল। মার্চ অন্তিমকালে জার্নাল লিখে পাঠকদের উদ্দেশে দেবার কথা ভেবে যখন ব্রাত্য রাইসুর ঠিকানায় সকাল দশটা-এগারোটার দিকে পাঠালাম এবং তারপর দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে তা altaf.jpg……
আলতাফ হোসেন
…….
তৈরি হয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ল তখন আমিও একজন পাঠক হিসাবে তা পড়তে পারলাম। ভলো লাগল ব্যাপারটা। অনেকেরই ক্ষেত্রেই নিশ্চয় এমনটা ঘটেছে। ভালো লাগতে পারে তাঁদেরও এমন তাৎক্ষণিক যোগাযোগের ঘটনাগুলো।

লেখা লিখে মার্জনা-পরিমার্জনা অনেক চলতে পারে, কিন্তু একবার তা চূড়ান্ত করা হয়ে গেলে তক্ষুনি-তক্ষুনি তা ছাপানোর ইচ্ছা হওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়? এটাও একরকম ছাপা হওয়া, এই আর্টস.বিডিনিউজ২৪.কম থেকে ইন্টারনেট-গ্রহীতাদের কাছে প্রকাশিত হওয়া।

লেখার পর পাঠকের কাছে এত দ্রুত পৌঁছে যাওয়ার ঘটনা একেবারেই আজকের দিনের।

কজনের কাছে পৌঁছল, রসিকজনদের কাছে গেল কি না, দেশি লোকদের চেয়ে প্রবাসীদের কাছেই কি বেশি গেল না, তা অবশ্য ভিন্ন প্রশ্ন। ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন।

আর একটি ব্যাপারও লাগল ভালো। যদিও একটি প্রতিষ্ঠানই এই ওয়েবসাইটটি, তবু পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে এখনও স্বাগত জানিয়ে চলেছে এটি।

আর যা খারাপ লাগে তা হচ্ছে নাম, এর ইংরেজি নাম।

গত বছর যে হোটেল আমরা পেয়েছিলাম সাড়ে চারশো রুপিতে, এবার সেটাতেই প্রথমে খোঁজ করতে গিয়েছিলাম নতুনের খোঁজে না গিয়ে। না, হবে না। সে রুম এখন মিলতে পারে সাড়ে ছশো রুপিতে। সাড়ে ছয়শো? চোখ কপালে উঠল আমার। ধরে নিয়েছিলাম এক বছরে বেড়ে বড় জোর পাঁচশো হতে পারে। খুব বেশি হলে সাড়ে পাঁচশো। কিন্তু এত্না বাড় গিয়া? তা হলে তো নতুন কোনও হোটেল খুঁজে বের করতেই হয়। বেলাল (চৌধুরী) ভাই গতবার পারামর্শ দিয়েছিলেন কলেজ স্ট্রিটের কাছাকাছি কোনও হোটেলে থাকতে। হাজরা রোডের একটি রেস্ট হাউজের কথা বলেছিলেন আরেকজন। কিন্তু ওখানে কোনও রুম খালি নেই।

মারকুইস স্ট্রিটে বাস থেকে আমরা যখন নেমেছি তখন স্থানীয় সময় রাত আটটার মতো। একটা হোটেলের কথা বলল সোহাগ বাসের একজন কর্মচারি। নাম, বিজু, আর হোটেলের নাম আফরিন। একটু দূরে হয় বাস স্টেশন থেকে, তাতে ফেরার দিনে একটু কষ্ট বা অসুবিধা হতে পারে। ভাবলাম, আজ তো উঠি, পরে চেঞ্জ করা যেতে পারে বেলাল ভাইয়ের পরামর্শমতো। সহমত হলো সহযাত্রীর। তথা রাকার। রাতে ভাবলাম, কলকাতা ঘোরার জন্য মূল বাহনটি যদি হয় মেট্রো, তবে এ অঞ্চলে মানে মারকুইস স্ট্রিট, মির্জা গালিব বা কিড স্ট্রিট এলাকায় থাকাটাই সুবিধাজনক হবে। এ ভাবনায় ফেরার সময়টায় হোটেল পরিবর্তন করতে বাধ্য না হওয়ার সুবিধার ব্যাপারটিও ছিল। আগাম-কেনা টিকিট অনুযায়ী ভোর পাঁচটায় আমাদের ফেরার বাস।

বিজুর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আফরিন হোটেলেই কক্ষ নেওয়া হলো একটি।

এখানকার ভালো বলতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাছেই অটো স্টপ; আর খারাপের মধ্যে রুমটি একতলায়, একই দামের অন্যগুলির তুলনায় ছোট না হলেও ছোটই, বেরোতেই সংস্কারাধীন ভাঙা রাস্তা। তবে ভাবাই তো ছিল আমাদের যে পরের দিন কিংবা তার পরের দিন অন্য হোটেলে যাওয়া হবে। কেমন অনুভূতি হলো কলকাতায় নেমে এবার? গতবার অসুখ-অসুস্থতার ব্যাপারটিও ছিল বলে ভালো করে চারদিকে তাকানো যায়নি। এবার তো শুধুই বেড়ানো। নতুন একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা, কথা হবে এবার। কবি রণজিৎ দাশ। প্রিয় কবি আমার। কিছুদিন আগে ঢাকায় এসেছিলেন। তখন সাজ্জাদ শরিফের মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল। কবিতা পড়াপড়ি হয়েছিল। কথাবার্তা। তাঁর স্ত্রী শর্মিলা দাশের সঙ্গে কথা বলেও ভালো লেগেছিল আমাদের। তা ছাড়া অনেক দিনের তরুণ বন্ধু নাসিমা সেলিম অলীক ও তার বন্ধু দেবলীনার সঙ্গেও দেখা হবার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গতবারের মতো এবার আর তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে দেখা হওয়া সম্ভব নয়। সে দিল্লীতে প্রায় বন্দিই হয়ে ছিল।

এই যে-এলাকায় থাকাটা পছন্দের (কেন যে তা আগেই বলা হয়েছে: মেট্রো স্টেশন কাছে, ফেরার বাস-স্টেশন কাছে) সেটা উর্দুভাষীদের অঞ্চল বলে করাচির কথা মনে পড়ে যায় বইকি। বিশেষত চা-দোকানগুলি দেখে, চা-বানানো দেখে, চায়ের গন্ধ পেয়ে। ছোটবেলা থেকে চায়ের নেশা আমার। তবে তখনকার চায়ের স্বাদ এখন আর কোথাও পাওয়া যায় না বলে নেশাও ততটা নেই। দিনে তিন-চার কাপ খাওয়া হয়।

সব মিলিয়ে ভালোই লাগছিল। ‘বিদেশ’ তো বটে কলকাতা। সবচেয়ে কাছের বিদেশ, ছোটবেলা থেকে সবচেয়ে বেশি চেনা ‘বিদেশ’। এই বিদেশের বই পড়েই বড় হয়েছি। বিদ্যাসাগরের বাল্যশিক্ষা থেকে শুরু করে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ থেকে শতাধিক লেখকের বই পড়া হয়েছে শৈশব থেকে। এখনও সকল দেশের চেয়ে কলকাতার লেখকদের বইই বেশি পড়া হয়। একদিকে ‘বিদেশে’ এসেছি বলে ভালো লাগছিল, অন্যদিকে যা ছিল এক সময়ের ‘মনোভূমি’ সেই বিদেশে এসেছি বলে একটু হলেও খারাপ লাগছিল।

আর একটি ব্যাপারও কষ্টের। যে লেখকদের ‘চিনি’, তাঁদের মধ্যে যাঁরা বেঁচে নেই তাঁরা তো নেই, যাঁরা আছেন, তাঁদেরকে তো লেখার সূত্রেই চিনি, ফলে তাঁদের কেউ আমাকে চেনেন না, ফলস্বরূপ, তাঁরা কেন আমাকে ‘বসতে দেবেন পিড়ে’?

এর উত্তরে বলা যায়, পরিচয় করে নিতে হয়, বা, করে নিতে জানতে হয়। আমার উত্তর: আমি পারি না।
সময়টা বেছে নিয়েছিলাম বইমেলার। কিন্তু কলকাতা মূল শহর থেকে দূরে বলে বিরক্তও লাগছিল। যাওয়া-আসাতে প্রচুর সময় ও পয়সা লেগে যায়। বইমেলাতেই অলীকের সঙ্গে দেখা ও কথা হলো আমাদের। কবি বিভাস রায়চৌধুরী, গল্পকার চিরঞ্জীব বসুর সঙ্গে পরিচয় হতে কথা বলে খুব ভালো লাগল। বইমেলাতে কবিদ্বয় মৃদুল দাশগুপ্ত ও গৌতম চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলো, তবে তেমন কথা হলো না। কথা ছিল আসবেন কবি কালীকৃষ্ণ গুহ, না আসাতে দেখা হলো না। হঠাৎ দেখা ঢাকা থেকে আগত গল্পকার পারভেজ হোসেন ও শামীমুল হক শামীমের সঙ্গে। ‘আলতাফ ভাই’ বলে একজন খুব আন্তরিক স্বরে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, তাকিয়ে দেখি কবি শামীম রেজা। অনেক কথা বললেন শামীম। গোয়া গিয়েছিলেন বেড়াতে, তার আগে পুরীতে তরুণ কবিদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে। একটু আগেই বলছিলাম পরিচয় করে নিতে পারার কথা। এর এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ শামীম। খুব অল্প সময়ে আপন করে নিতে পারেন মানুষকে। কলকাতার অনেক কবিলেখকের অতি প্রিয়জন এই শামীম। আমারও আপনজন মনে হলো তাকে।

তৃতীয় দিনের সকালে যে হোটেলে ওঠা হল তেমনটিই চাই প্রতিবার, আগেও চেয়েছিলাম মনে মনে। বাস্তবে এমন হোটেলকক্ষ কলকাতায় আছে জানা ছিল না। নাম বলছি না হোটেলটির পাছে ভিড় বাড়ে, তার চেয়েও বড় কথা, দাম যদি বাড়ে। অবশ্য নতুন ঝকঝকে হোটেল থাকতে এমন হোটেলে সকলেই উঠতে চাইবে না যে তা-ও জানি। তবে আমার ও সঙ্গিনীর আবারও যদি কোনওদিন কলকাতায় যাওয়া পড়ে, যদি আবারও পড়ে যাওয়া, তা হলে তো এমন হোটেলেই থাকতে চাইব আমরা। পুরানো, খুব পুরানো বিল্ডিং, সত্তর-আশি বছর আগের, রুমগুলিও সে সময়ের মতোই বড় বড়। জানালা বড়, আগেকার দিনেরই মতো। প্রশস্ত এক জায়গা সামনে, তা পেরিয়ে বিরাট গেট, সেখানে দারোয়ান, গোঁফঅলা। গরিব বিদেশিরা সাধারণত এর আশপাশের শস্তা হোটেলগুলোতে ভিড় জমায়। এটাতেও ওঠে। ফুটপাত জুড়ে বেঞ্চি পেতে চিনে ও দেশি মিলিয়ে তৈরি খাবার খেতে বসে মূলত বিদেশিরাই। দু-চার দালান পার হলেই কোনায় মদের দোকান। রাত নটায় গেট বন্ধ হবার পরেই সেখানে ভিড়টা জমে। তেষ্টায় কাতর তখন খদ্দেররা।

লিখতে লিখতে লেখকই বনে যাচ্ছি না কি একরকম! আর কোনো ধরনের না হলেও ডায়েরিলেখক তো বটে! তবে লিখতে বসলেই কেন যে খুব তাড়া আসে ভিতর থেকে: লেখ্, লেখ্ যা পারিস লেখ্, সময় পাবি না আর, নামিছে অন্ধকার…। এমন নয় যে, ডাক্তার বলেছে সময় কম, বলবে কীভাবে, ডাক্তারের কাছে যাইই না অনেকদিন, আর যেতে হবে না বলেও ভাবি, এমনও না যে কোনও ভিন্নমতাবলম্বী কাফনের কাপড় পাঠিয়ে দিয়েছে, এদেশে যে কাউকে যে কেউ পাঠাতে পারে, লেখক বা রাজনীতিবিদও হতে হয় না তার জন্য, শুধু একটু রটলেই হয় যে অমুক অমুক চিন্তায় বিশ্বাসী, তেমনটাও ঘটেনি, অর্থাৎ জানে মারবার ভয় দেখায়নি এখনও কেউ; তবে কি অনেক বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে? কেন, আর বিশটা বছরও কি পাব না হেসে খেলে? সে সময়ও কি কম? ব্যাপারটা হলো আসলে যে, লিখতে খুব ইচ্ছা করে, লিখতেই ইচ্ছা করে শুধু, কিন্তু সময় চলে যায় নানাভাবে, কিছুতেই লেখার সময় আর পাওয়া যায় না, আবার যদি নানা ‘জরুরি’ কাজের মধ্যে একটু সময়, একটু অবকাশ জুটেও যায় তখন আর মুড থাকে না লেখার।

সকল মানুষই ভাবে নিজের কথা সবার আগে। আমিও ভাবি। আসলে পড়ছিলাম মার্কেজের একটি ইন্টারভিউ, যেখানে মার্কেজ নিজের লেখার প্রতি ভালোবাসার কথা বলছিলেন। কীভাবে অল্পবয়সে লেখা নিয়ে উত্তেজিত থাকতেন, সর্বদা উৎসাহ জাগত তাঁর শরীরে, এক একদিনে, চার, পাঁচ বা দশ পাতা পর্যন্ত লিখে ফেলতেন। তবে এটা হচ্ছে তাঁর লেখার শুরুর দিকের কথা, যখন বয়স হলো, অনেক অভিজ্ঞতা হলো তখনকার কথা তাঁর: ‘এখন নিজেকে ধন্য মনে হয় যদি সারাদিনে একটা মাত্র ভালো এবং উপযোগী প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলতে পারি। যত দিন যাচ্ছে লেখা ক্রমশ দুরূহ এবং বেদনাসঞ্চারী হয়ে উঠেছে।’ প্রশ্নকর্তা বলছেন : ‘কেন অমন হবে? যত অভিজ্ঞতা বাড়বে ততই সহজ হয়ে উঠবে লেখা, এমনটাই তো হওয়া উচিত?’ মার্কেজ তখন বলছেন : ‘না, তা হয় না। আসলে তোমার দায়িত্ববোধ দিন দিন বাড়তে থাকে। তুমি অনুভব করতে শুরু কর যে প্রতিটি শব্দ ক্রমশ আরও বেশি ভার বইছে, আরও অনেক মানুষকে আক্রান্ত করছে।’

মার্কেজের এ কথা শুনে আরও ভয় করে। সারা দিনে মাত্র এক প্যারা লিখতে পারলেই তিনি খুশি তাঁর বয়সকালে?

মনে পড়ল আবারও শহীদুল জহিরকে।

প্রথম আলো-তো কিছুদিনের একটি কাজ জুটেছিল গত বছর। ঈদ সংখ্যার সম্পাদনা-সমন্বয়নের কাজ। বেকার বসে আছি বলে উপ-সম্পাদক ও কবি সাজ্জাদ শরিফই ব্যবস্থা করেছিলেন কাজটির। লেখা কত পাওয়া গেল, কে কোনটা পড়ে দেখবেন তা নিয়ে মাঝে মাঝে বৈঠক হত আমাদের। একদিন সাজ্জাদ শরিফ জানালেন, শহীদুল জহির লিখতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। আমি বললাম, সময় তো এখনও অনেকই আছে, তবু পারবেন না বলেই জানালেন? সাজ্জাদ বললেন, অনেক ঝামেলার মধ্যে নাকি আছেন। আমি বললাম, আমি একবার বলে দেখব? সাজ্জাদ বললেন, বলে দেখতে পারেন। সেদিনই বললাম শহীদুল জহিরকে, দেখুন না চেষ্টা করে একটা উপন্যাস, না হলে একটা গল্প অন্তত দিতে পারেন কি না?

না পারবেন না, আসলেই পারবেন না। বোঝা গেল।

হয়তো সত্যিই খুব দায়িত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে হিমশিম খাচ্ছিলেন এবং বুঝেছিলেন তার জের চলবে আরও অনেকটা সময়।

তবু মনে হতে থাকে আজ, তিনিও কি অনুভব করতে শুরু করেছিলেন যে প্রতিটি শব্দ ক্রমশ আরও বেশি ভার বইছে?

আবারও মার্কেজ। তাঁর কথা মনে আসতেই একটি প্রশ্ন এল মনে। জিজ্ঞেস করি ব্যালকনি থেকে সবচেয়ে কাছের সবচেয়ে প্রাচীন বটবৃক্ষকে: আচ্ছা বলুন তো, কোন সে বিষয় এই পৃথিবীতে বর্তমান যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত হয়? গাছ বললেন, যৌনতা। সঙ্গম।

বয়সকালে মার্কেজের এমনটা মনে হয়েছে বলেই নিশ্চয় হঠাৎ প্রায় ঘোরের মধ্যেই লিখে ফেললেন ওই চটি বইটি। মেমোরিজ অফ মাই মেলানকলি হোরস। তাঁর বই মানেই তো কাড়াকাড়ি। বিশেষ মনযোগ পাওয়া। এ বইটিও পেল। পাঠকদের একটি বড় অংশই নিশ্চয় অবাক। এ কী ধরনের বই লিখলেন মার্কেজ? কিছু অংশ হয়তো প্রায়-তড়িতাহত। অবদমন এতই বড়, এতই বড় যে পুরুষটিকে নব্বই বছর বয়স্ক হতে হলো আর মেয়েটিকে ষোল বছরের কিশোরী? স্বভাব, মানে কাম যায় না মলে? এবং এ ক্ষেত্রে ঈর্ষার অবদমনও এতটাই ছিল যে এই শেষের বয়সটিতেও একজন আনকোরা কুমারী মেয়ে না হলে চলবে না?

অবদমন, অবদমন, অবদমন। মানুষের ইতিহাস অবদমনেরই ইতিহাস। লালসাকে বা ক্ষুধাকে (বা যে কোনও ইচ্ছাকে) চেপে রাখতে বাধ্য হওয়ার কারণে ভাণ, ভণ্ডামি করে করে নিঃশেষিত হওয়া, না হয়তো ধর্ষণের উদ্যোগ বা ধর্ষণ ও হত্যা।

নিজের তথা মানুষেরই ভেতরকার সত্যটাকে প্রকাশ করতে চাওয়ার প্রবল তাড়না থেকে একজন লেখক মুক্ত থাকতে পারেন না যে তা-ই দেখা গেল মার্কেজের মধ্যে। দশ বছর অপেক্ষা করে শেষে এই বই: বাসনা-কামনার কথার তুবড়ি ছুটিয়ে অব্যাহতি খোঁজা, মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফটানি…। আবার, এমনভাবে কি ভাবা যায় মার্কেজকে নিয়েও? আলোচকদের মধ্যে দেখি কত না দ্বিধা, কত না ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা নানাভাবে। দেহকে আশ্রয় করে দেহাতীত অনুভূতির ব্যাপারটি তো রয়েছেই। সুখ কোথায় খুঁজতে গিয়েই তো শরীরকে তন্ন তন্ন করে খোঁজে মানুষ, তারপর স্বভাবতই হার মানে, মোহমুক্ত হয়, কিন্তু তারপরও তার স্মৃতিচর্যা আর শেষ হতে চায় না।

ভাব আসছে কি না সে কথাটা পরের, কিন্তু লেখার ব্যাপারটা যে কষ্টের সে কথা তো সবাই আমরা মানি? আগের লেখকদের জন্য তা আরও বেশি। টেবিলে বসো বা বিছানায়, একটু হলেও নুয়েই তোমাকে সাধারণত লিখতে হবে। দেয়ালে, বা চেয়ারে হেলান দিয়ে খাতা হাতে অথবা কোলে নিয়ে, বা, মাঝে একটা টেবিলমতো কিছু পেতেও লেখা যায়। বিদেশি অনেক লেখক কিছু আগেকার দিনেও টাইপরাইটারে লিখতেন। শব্দ হত, আর আঙুলে জোর খাটাতে হত। বেশিক্ষণ এভাবে লেখা স্বস্তিকর নয়। আর এখনকার অনেক লেখক লেখেন কম্পিউটারে। তুলনায় অনেক আরামের। ল্যাপটপে আরও। তা হলেও বিছানায় শুয়ে বই পড়ার আরামের কাছে লিখতে থাকা যথেষ্টই কষ্টের।

কিন্তু তবুও যে লেখেন লেখকরা, না লিখে পারেন না তার কারণ কী? কাফকার কথাই সবার আগে মনে আসে আমার, লেখার প্রসঙ্গে ভাবলে। আধুনিক উঁচুমানের লেখকদের মধ্যে কাফকার মতো পাঠকপ্রিয় আর কেউ আছেন কি না সন্দেহ করা চলে। তাঁর সম্পর্কে যত বই, যত নিবন্ধ লেখা হয়েছে আজ পর্যন্ত আর কারো সম্পর্কে লেখা হয়েছে কি না, সন্দেহ। নিজের লেখার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছিলেন : ‘সারা রাত জুড়ে দাপাদাপি করে লিখে-যাওয়া, সেই আমার পরম অভিপ্রায়। আর সেটা করতে করতে চুরমার হয়ে যাওয়া কিংবা ঘোর উন্মাদ হয়ে যাওয়া, সেটাও আমার অভিপ্রেত।’ কিন্তু কেন, কেন লিখতে লিখতে উন্মাদ পর্যন্ত হয়ে যাওয়ার এই বাসনা? নিজে এ ব্যাপারে সরাসরি কোনও ব্যাখ্যা না দিলেও তাঁর এক স্বীকারাক্তি অনুসারে উত্তরটি বোধহয় এরকম: ‘এত বিচিত্র বিদঘুটে জগৎ আমার মগজের মধ্যে প্রচ্ছন্ন রয়েছে। কিন্তু চূর্ণবিচূর্ণ না হয়ে কী করে তাকে বা আমাকে মুক্ত করে দিতে পারি আমি? হাজারও বার আমি বিধ্বস্ত হয়ে যেতে রাজী, তবু তাকে আমি নিজের মধ্যে প্রতিহত বা সমাধিস্থ করে রেখে দিতে পারি না।’

তাঁর লিখতে চাওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে আপাতত এটুকু লিখে ফেলে মনে পড়ল কাফকার মধ্যেই ছিল না লিখতে চাওয়ারও প্রবণতা, বা লিখে তা প্রত্যাহার করে নেবারও আকূতি।

সংবেদী পাঠক জানেন, কী সুস্থ, কী অসুস্থ কাফকার সারা রাত জেগে লেখার অভ্যাসটি ছিল অনেক দিনের। আমরা অবাক হয়ে শেষটায় ভাবি, বেশ তো, এমনই যদি প্রবণতা, জীবদ্দশায় লেখা প্রকাশে অনীহা কেন ছিল এত, আর বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের মাধ্যমে প্রকাশ না করে ধ্বংস করতে চাওয়া হয়েছিল কেন সব লেখা?

নিজের প্রকৃতি বিষয়ে তাঁর আরও এক উক্তি মনে করে আমরা এ প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে নিতে পারি মনে হয়: ‘সর্বজনীন জীবন আমাকে আমন্ত্রণ পাঠালেও আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছি। কেউ যদি আমাকে এই মাপকাঠিতে বিচার করে, তাহলে আমার দিক থেকে এমন অভিযোগ উঠলে ভুল হবে যে জীবনপ্রবাহ আমাকে অনুধাবন করতে পারেনি; আমিই সম্ভবত সেই উপচার থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি।’

নিজের লেখার প্রবল ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে ফেলে বড় বড় লেখকের প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছি। কী যে এক গাড়লতা! কিন্তু বড় লেখকদের বিষয়ে যা লেখা হয়েছে তার গুরুত্ব নিশ্চয় অনেক। তা যদি কেউ মানেন তবে এখানে ওখানে জুড়ে দেওয়া অর্বাচীনের মন্তব্যগুলোকে সহ্য করে নিতে তেমন অসুবিধা হবে না বোধ করি।

altaf_khokon@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Fauzia Khan — মে ৭, ২০০৮ @ ৪:৫৫ অপরাহ্ন

      খুব ভালো লাগল লেখাটি পড়ে! লেখা প্রকাশের ইচ্ছে-অনিচ্ছে নিয়ে মার্কেজ-কাফকার প্রসঙ্গও আরো ভালো লাগল। তবে কি যে হলো — বড় জানতে ইচ্ছে করে, শহীদুল জহীর কেন গল্প দিতে চাননি! কী ছিল উনার শেষ লেখা???

      ফৌজিয়া খান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Altaf Hossain — মে ৮, ২০০৮ @ ১১:২২ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ ফৌজিয়া আপনাকে। লেখা ভালো লেগেছে জেনে আরও লেখার অনুপ্রেরণা পাওয়া যাচ্ছে। আপনার জার্নাল, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদগুলো, সুমন রহমানের স্মৃতিচারণা, ব্রাত্য রাইসু এবং রাজু আলাউদ্দীনের নেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো এবং অনেকের অনেক লেখা আমার ভালো লেগেছিল, বেশ ভালো, কিন্তু জানাবো-জানাবো করে আর জানানো হয়নি। আপনার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার চেষ্টা করব ভবিষ্যতে। শহীদুল জহির যা বলেছিলেন তাতে মনে হয়েছে ওইসময় তাঁর দাপ্তরিক কাজ তাঁকে খুবই ব্যস্ত ও অস্থির করে রেখেছিল। তবে প্রতিটি শব্দ ক্রমশ আরও বেশি ভার তাঁর ক্ষেত্রেও বহন করছিল কি না, আমি এখনো জানি না ফৌজিয়া। তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগও মূলত তাঁর ব্যস্ততার কারণেই কমে এসেছিল, সেজন্য তাঁর শেষের লেখা সম্পর্কেও আর জানা হয়নি।

      আলতাফ হোসেন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুজিব মেহদী — মে ১০, ২০০৮ @ ১২:০১ পূর্বাহ্ন

      লেখাটা বেশ করে স্পর্শ করে গেল।

      লিখবার প্রচণ্ড তাড়না কাজ করা অথচ লিখতে না পারা, এক দু’বাক্য লিখে হা হয়ে বসে থাকা– এ যেন আর ছেড়ে যাবার নয়। নানারকম কোশেশ করেও তখন কাজের কাজ কিছুই হয় না। হয় না, কারণ কি ওই দায়িত্ববোধ দিন দিন বাড়তে থাকা এবং প্রতিটি শব্দ ক্রমশ আরও বেশি ভার বইছে এটা অনুভব করে ওঠা? অথচ এই আমিই তো একদিনে একাধিক কবিতা(!)র জন্ম দিয়েছি। মাঝে মাঝে এখনো তা দেই বটে। কীভাবে হতো ও হয় তখন? ওসময় কি শব্দের ভার বিস্মৃত হয়ে যাই আমি?

      এরকম পরিস্থিতির বাইরে এমনও হয়, প্রচুর আলস্য যাপন করছি, কেবলই পড়ে কিংবা ছবি দেখে সময় পার করছি, কাউকে কাউকে লেখা দেবার প্রতিশ্রুতির সময়সীমা অবহেলায় পার করে দিচ্ছি ; কিন্তু একটা অক্ষরও লিখছি না, লিখতে ইচ্ছেই করছে না। ওদিকে নানারকম লেখার পরিকল্পনায় ভরে আছে মাথা। কেন যে এমন হয় মাঝে মাঝে! কেন হয়?

      লেখায় ‘এনামুল হক শামীম’ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে সম্ভবত শামীমুল হক শামীমকে বোঝাতে।

      মন্তব্যের মন্তব্য
      সম্ভবত প্রথম আলোয় ছাপা শাহাদুজ্জামান ভাইয়ের একটা লেখা থেকে জেনেছি যে শহীদুল জহিরের শেষ লেখা ‘দ্য মিরাকল অব লাইফ’। এটি মাত্র চার পৃষ্ঠা আয়তনের একটা গল্প। চট্টগ্রাম থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এ প্রকাশিত আসমা বীথি সম্পাদিত ঘুড়ি নামক ছোটকাগজে এটি অণুগল্প হিসেবে মুদ্রিত হয়। গল্পের একটা জায়গার বর্ণনা এরকম : ‘এইখানে ঘরের ভিতরে এবং রাস্তায় মানুষ কিলবিল করে, বাড়িগুলা সব চাইরতলা ফ্লাট বানায়া ভাড়াইটা বসায়া মুড়ির টিনের মতো করে রাখা হয়, তারা বেশি খায় বেশি হাগে, ফলে ওয়াসার সুয়্যার লাইন ফেটে বেলের শরবতের মতো গলা গু রাস্তা দিয়া কুলকুল করে বয়ে যায় এবং এই গুয়ের কারণে দয়াগঞ্জে কিংবা মনির হোসেন লেনে আমরা একদিন দাঙ্গা করার সিদ্ধান্ত নেই,’। শহীদুল জহির মারা যাবার পর তাঁর এই শেষ লেখাটি আমার বউকে পড়ে শোনাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমাদের এগারো বছরের ছেলেও এসে ওই পাঠ সেশনে যোগ দেয়। উদ্ধৃতাংশের বর্ণনাটা গল্পটার শ্রোতা দুজনকে এমনভাবে আক্রান্ত করে যে ওরা প্রতিজ্ঞা করে আর কখনো বেলের শরবত খাবে না। এরপর থেকে সত্যি সত্যি খাচ্ছে না ওরা বেলের শরবত।

      মুজিব মেহদী

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com