উইলিয়াম শেক্সপিয়র-এর ট্র্যাজেডি অবলম্বনে

এ নিউ টেস্টামেন্ট অব রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট

সাইমন জাকারিয়া | ২৫ এপ্রিল ২০০৮ ১২:০৪ অপরাহ্ন

কথামুখ
‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’-এর কাহিনীকার হিসেবে উইলিয়াম শেক্সপিয়র-এর নামটি জানা থাকলেও আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, এর কাহিনীটি অতি প্রাচীন এবং শেক্সপিয়র এ কাহিনীটি ধার romeo_and_juliet_brown.jpg
…….
১৮৭০-এ আঁকা ফোর্ড ম্যাডক্স ব্রাউনের তেলছবি, রোমিও জুলিয়েট-এর বিখ্যাত ব্যালকনি দৃশ্য
…….
করেছিলেন তাঁর থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে লেখা ইংরেজ লেখক আর্থার ব্রুকস্-এর দি ট্র্যাজিক্যাল হিস্ট্রি অব রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নামের একটি মহাকাব্যিক রচনা থেকে।

কাহিনী হিসেবে রোমিও-জুলিয়েটের ইতিহাস শুধু এটুকুই নয়, বরং তা সুদূর অতীত পর্যন্ত বিস্তৃত। গবেষণায় জানা যায়, রোমিও-জুলিয়েটের এই সকরুণ bandello.jpg…….
মাতিয়ো বান্দেলো (১৪৮০-১৫৬২)
…….
প্রেমকাহিনী সংঘটিত হয়েছিল ইতালিতে। সেখানে এই প্রেমময় জীবন-গাঁথা উপাখ্যান হিসেবে আনুমানিক ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পেলেও মূল কাহিনীটি সম্ভবত ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দের। আর মূলকাহিনীতে দেখা যায়, প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবার চেয়ে আত্মহত্যাকেই শ্রেয় বলে মেনে নেয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ইতালির এমন ঘটনার একশত বছর আগে প্রায় একই রকম আরেকটি কাহিনীর সন্ধান পাওয়া যায় স্পেনের তেরুয়েলে। অবশ্য স্প্যানিশ আখ্যানে এ কাহিনীর একটু ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। রোমিও সেখানে আত্মগোপন করে রয়েছেন, আর জুলিয়েট সেই সময়ে অন্য এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে বসেন এবং নতুন বিয়ে করা স্বামীর সাথে আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পর তার (জুলিয়েটের আগের) স্বামী এসে তাদেরকে একসঙ্গেই সমাহিত করেন।

shex.jpg…….
উইলিয়াম শেক্সপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬), শিল্পী: Martin Droeshout, ১৬২৩
…….
গবেষক মনে করেন, স্পেনে সংঘটিত ওই প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের গল্পটা একসময় ইতালিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় লোকজনের মুখে মুখে তা কিংবদন্তীর আকার লাভ করে। সে কিংবদন্তীকে অবলম্বন করে ইতালির লেখক মাতিয়ো বান্দেলো একটি উপন্যাস রচনা করেন। ১৫৬২ খ্রিস্টাব্দে বান্দেলোর সে উপন্যাস থেকেই কাহিনী ধার করে ইংল্যান্ডের লেখক আর্থার ব্রুকস্ তাঁর মহাকাব্যিক রচনা দি ট্র্যাজিক্যাল হিস্ট্রি অব রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট প্রকাশ করেন। তারও ত্রিশ বছর পরে আনুমানিক ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে আর্থার ব্রুকস্-এর কাহিনী ধার করে শেক্সপিয়র বিখ্যাত ট্র্যাজেডি রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট রচনা করেন।

সত্যি কথা বলতে কী, বর্তমান নাটকটি লেখার আগ পর্যন্ত এ সব তথ্য আমার নিজেরও জানা ছিল না। কিন্তু নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে শেক্সপিয়রের আখ্যান নির্ভর এই নাট্য রচনার পর আমার মনে অনেকগুলো প্রশ্ন জন্ম নিল, তার মধ্যে প্রধান প্রশ্নটি হলো — শেক্সপিয়রের অন্যান্য নাট্যাখ্যানের মতো এ আখ্যানটিকে নিয়েও বহুভাবে, বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নিশ্চয় সারা পৃথিবীতে ব্যাপক নাট্যকর্ম সৃজিত হয়েছে, এক্ষেত্রে নিজের অজ্ঞতায়, অজ্ঞানে পৃথিবীর অন্য কোনো নাট্যকারের নাট্যচিন্তা ও নাট্যকর্মের পুনর্বয়ান বা পুনর্নিমাণ করলাম না তো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের তরুণতর বিশ্বসাহিত্যের পাঠক থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্য বিশেষজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্বনাট্য দর্শনে অভিজ্ঞ নাট্যনির্দেশক ও কাছের বন্ধুদেরকে নাটকটি পাঠ করতে দেই, সর্বোপরি ওয়েবসাইটে অনুসন্ধান করি।

প্রায় সব ধরনের অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসা তথ্যগুলো বর্তমান নাট্যকর্মের পক্ষে জোরালো কিছু যুক্তি এনে দেয়। কেননা, প্রাগৈতিহাসিক কালের রোমিও-জুলিয়েটের আসল কাহিনীকে ট্র্যাজেডি-নাট্যে রূপ দিতে মহাত্মা উইলিয়াম শেক্সপিয়র যা করেছিলেন তা সুচতুর একটি খেলা ছাড়া কিছু নয়, বর্তমান নাটকটি সে-কথাই প্রমাণ করেছে। এক্ষেত্রে বিশেষ কৌশলে দেশ-কাল-পাত্রের সীমাবদ্ধ গণ্ডীকে অতিক্রম করে শিল্পের সার্বজনীন ভূখণ্ড, সময় এবং চরিত্র সৃজন করেছি মাত্র। যা নাট্যচিন্তা প্রকাশের তীব্রতাকে বাড়িয়েছে বলে আমার ধারণা।

নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের স্বাধীনতা নেবার প্রয়োজনে বর্তমান নাটক রচনায় ইউরোপীয় নাট্য রচনার গঠন-কৌশলকে সম্পূর্ণরূপে অবলম্বন না করা হলেও — এই নাট্যে ইউরোপীয় নাট্যাদর্শের মূখ্য বৈশিষ্ট্য ঘটনা অনুসন্ধানের সঙ্গে প্রাচ্যের নাট্যাদর্শ মানুষের প্রেমময় জীবন সংকটের সামগ্রিক রূপ প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় মানব চরিত্রের মহৎ বৈশিষ্ট্য হিসেবে লেখকের সূক্ষ্ম তৎপরতার কথা এবং সামাজিকভাবে নিজের প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তির অভিপ্রায়ে সেই একই লেখক কীভাবে গোপনে সংঘটিত নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডকে সম্ভব ও সমর্থন করেন তা তুলে ধরা হয়েছে। শুধু তাই নয়, নতুন বিশ্বব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মচর্চাকারীর মিথ্যাচার ও সুবিধাবাদী আচরণকে স্পষ্ট করা হয়েছে।

এ নাটকের ভাষারীতি ও চরিত্রাবলী সৃজনে, সর্বোপরি গঠন-কৌশলে প্রাচ্যের নাট্যাদর্শ অনুসরণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় নাট্যরীতির ত্রি-ঐক্য (ইউনিটি অব টাইম, ইউনিটি অব প্লেস অ্যান্ড ইউনিটি অব অ্যাকশন) বিধানের পরিবর্তে এই নাটকে প্রাচ্যের নাট্য আদর্শের অনুসরণে সময়, চরিত্র ও তার অবস্থানের সীমারেখা অতিক্রম করা হয়েছে। পাঠককে প্রাচ্যের নাট্যাদর্শের দৃষ্টিভঙ্গিতে এই নাটকটি পাঠ করতে অনুরোধ করি। উল্লেখ্য, বর্তমান নাটকটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের এমএ ফাইনাল পরীক্ষার প্রযোজনা হিসাবে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের থিয়েটার ল্যাবে আব্দুল হালিম প্রামানিক সম্রাটের নির্দেশনায় ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩, ৪ ও ৫ মার্চ মঞ্চস্থ হয়েছিল।

জগতের সবার মঙ্গল হোক।

romeo_and_juliet_4fjf.jpg
রোমিও জুলিয়েটের গোপন বিবাহ

এ নিউ টেস্টামেন্ট অব রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট

পূর্ণিমা রাতে সাম্প্রতিককালের এক কবি গ্রেভইয়ার্ডে ঢুকে পড়েছেন। পূর্ণিমা-মায়ায় তিনি এক একটি সমাধির কাছে গিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ে সমাধিস্থ মানুষের সাথে ফিস ফিস করে কথা বলার চেষ্টা করেন — ‘এই যে শুনতে পাচ্ছেন…শুনছেন আপনি…আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছি…উঠে আসুন উপরে…আপনার সাথে আমার কথা আছে…অনেক কথা। আর এইভাবে বোবার মতো ঘুমিয়ে থাকবেন না। উঠে আসুন।’ না কেউ তার কথা শোনে না। তাই তিনি সমাধি থেকে গজিয়ে ওঠা লতায় ধরা বিচিত্র সব ফুল স্পর্শ করে গন্ধ নিতে থাকেন এবং এক সময় সমাধিফুলের গন্ধে দশাগ্রস্ত ঘোরলাগা কণ্ঠে এই নাট্যকথার সূচনা করেন —

কবি : গ্রেভইয়ার্ড মানে সমাধিক্ষেত্র। দুটি নামই বড় ব্যঞ্জনাময়। আর এখানকার পূর্ণিমা রাত আমার খুব প্রিয়। এখানে নেশা ছাড়াই ফুলের গন্ধে মাতাল হওয়া যায়। আমি জানি, সমাধিতে যে ফুল ফোটে — তার পুষ্পলতার শিকড় সমাধি তলের ঘুমন্ত মানুষটির দেহসার থেকে রসদ নিয়েই উপরের বাতাসে গন্ধ ছড়ায় — এক একটি জীবন্ত মানুষের গায়ের গন্ধ যেমন এক একরকম — এক একটি সমাধি থেকে ভেসে আসা ফুলের গন্ধও তেমনি আলাদা আলাদা। আমি তাই এই রাতে সমাধিক্ষেত্রের মাটির গভীরে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকা মানুষ আর এই পৃথিবী পৃষ্ঠের জাগ্রত মানুষকে একসঙ্গে মিলাতে পারি। আমার প্রেমগান জীবিত ও মৃতের মাঝখানে কোনো বিভেদ রচনা করে না। আমার প্রেমগান জীবিত-মৃত সকলকেই লক্ষ করে —

প্রেম-পাথারে যে সাতারে
তার মরণের ভয় কি আছে
নিষ্ঠা-মনে প্রেম করিয়ে
এক মনে বসে রয়েছে॥
শুদ্ধ-প্রেম রসিকের ধর্ম
মানে না বেদ-বিধির কর্ম
রসরাজ রসিকের ধর্ম
রসিক বই আর কে জেনেছে॥
শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ
পঞ্চতে হয় নিত্যানন্দ
যার অন্তরে সদানন্দ
নিরানন্দ জানে না সে॥

গান গাইতে গাইতে কবি যখন গ্রেভইয়ার্ডের আরও গভীরে ঢুকে যেতে থাকেন ঠিক তখনই সে গ্রেভইয়ার্ডের ভেতর থেকে রোমিও এবং জুলিয়েট জুটি প্রকাশিত হন। তারা কবিকে অনুসরণ করে কণ্ঠে গান তুলে নিতেই তিনি চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকান —

কবি : কে কে?

রোমিও : আমি রোমিও।

কবি : কিন্তু আমি যে রোমিওকে জানি সে তো বহুকাল আগে…

জুলিয়েট : আত্মহত্যা করেছে।

কবি : হ্যাঁ।

জুলিয়েট : সত্য কথা । কিন্তু এও তো সত্য আত্মহত্যার ভিতর দিয়ে আমরা প্রেম ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছি। যতদিন মানুষ আর তার হৃদয় থাকবে ততদিন আমাদের প্রেম পরম দৃষ্টান্ত হয়ে বেঁচে থাকবে।

কবি : তুমি নিশ্চয় জুলিয়েট?

জুলিয়েট : ঠিকই ধরেছেন।

কবি : কিন্তু…তোমরা…এইভাবে উপরে উঠে এলে কী করে!?

রোমিও : আপনার মিষ্টি মধুর সঙ্গীতে। আর একটু আগেই আপনি যে আমাদের সমাধিক্ষেত্রের ফুলের গন্ধে মাতাল হয়ে মৃত আর জীবিতদেরকে একসঙ্গে মেলালেন। আপনার এমন মিলনে আমরা কিন্তু বেশ খুশি হয়েছি…তাই না জুলিয়েট?

জুলিয়েট : হু…খুব খুশি হয়েছি।

রোমিও : এখন বলেন — আমাদেরকে দেখে আপনি খুশি হননি?

কবি : না। আমি তোমাদের ঘৃণা করি। তোমাদের প্রেমকীর্তিকেও আমি অস্বীকার করি।

রোমিও : কী বলতে চান?

কবি : কী আর বলবো! প্রেমক্ষেত্রে তোমরা উভয়েই ছিলে চঞ্চল ও অস্থির। অস্বীকার করতে পারো রোমিও — এই জুলিয়েটকে দেখার আগে — তুমি যে রোজালিনের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলে?

রোমিও : কেন? একথা তুলছেন কেন?

কবি : কেন তুলবো না! সমাধি থেকে আজ যে শুধু জুলিয়েটের হাত ধরে উঠে এসেছো! এখন বলো — রোজালিনকে তুমি কোনোদিনই বাসোনি ভালো!

রোমিও : না, তা বলতে পারবো না — আমি সত্যিই তাকে অন্তর থেকে কামনা করেছিলাম, কিন্তু সে আমার…আমার জীবনে সে একটা দুঃসহ কষ্ট ছিল…।

জুলিয়েট : ছি রোমিও ছি! আমি তোমার মতো একটা মিথ্যুক প্রতারকের জন্যে আত্ম-উৎসর্গ করেছি! ছি!

রোমিও : জুলিয়েট, জুলিয়েট, শান্ত হও।

জুলিয়েট : না, তুমি আমাকে স্পর্শ করবে না।

রোমিও : কেন জুলিয়েট? আমি কি তোমাকে ভালোবাসি নাই? আমাদের প্রেম কি সত্য নয়?

জুলিয়েট : তবে, কেন তুমি তোমার জীবনের এমন সত্য আমার কাছে গোপন করেছিলে? কেন? এরকম ছলনা তুমি আমার সঙ্গে না করলেও পারতে?

রোমিও : না জুলিয়েট, আমার কোথাও কোনো ছলনা ছিল না। একথা সবাই জানতো — আমার বন্ধু বেনভোলিও জানতো, জানতো মারকুশিও, এমনকি ফাদার ফ্রায়ারও…বিশ্বাস করো জুলিয়েট, সেকথাটা কেবল তোমাকেই বলে উঠতে পারি নাই।

জুলিয়েট : বুঝেছি বুঝেছি আমি সব বুঝেছি — ছি রোমিও, ছি — যে-কথা সবাই জানতো সে-কথা আমাকে জানালে কী এমন ক্ষতি হতো তোমার! বলো — তুমি কি ভেবেছিলে রোজালিনের প্রতি তোমার প্রেমের কথা জানলে আমি তোমাকে বিয়ে করতাম না! ভালোবাসতাম না!

রোমিও : ব্যাপারটা তা নয় জুলিয়েট। আসলে, তোমার সঙ্গে দেখা হবার পর, তোমার সাথে কথা বলার পর বুঝেছি প্রেম কী বস্তু…! আর এও বুঝেছি রোজালিনের প্রতি আমার যেটা ছিল সেটা আসলে প্রেম নয় — আমার চোখের মুগ্ধতা মাত্র।

কবি : মুগ্ধতা! তুমি কোনটাকে মুগ্ধতা বলছো! মিস্টার রোমিও, এইবার কিন্তু আমাকে কথা বলতে হচ্ছে…। এই তুমিই কিন্তু সেদিন বলেছিলে — ‘আমার এই দুই চোখের দোহাই, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ ধ্যান রোজালিন, আমি বিশ্বাস করি ওর থেকে সুন্দর ত্রিভুবনে আর নেই, আমি তাই রোজালিনের প্রতিই নিষ্ঠাবান থাকছি — যদিও সে আমাকে বাসেনি ভালো, তবু বিশ্বাস একসময় সে আমার প্রেমনিষ্ঠার কাছে পরাজিত হবেই…আর সেই জয়ের আনন্দ নিয়ে আমি সংসার পাতবো কেবলমাত্র রোজালিনের সঙ্গেই…।’

মিস্টার রোমিও, এখন বলো — এই মনকথা এই প্রতিজ্ঞা তোমার ছিল না! হায় কী অপূর্ব তোমার প্রেমনিষ্ঠা! সেদিনের ভোজসভায় রোজালিনের প্রেমনিষ্ঠ রোমিও, তুমি তো সং সেজে রোজালিনকেই দেখতে গিয়েছিলে, নাকি? আর সেখানে গিয়ে তোমার ওই দুই চোখের দোহাই লাফিয়ে পড়ল জুলিয়েটের দেহের উপর…! বাহ, চমৎকার! এই তোমার প্রেমনিষ্ঠা! ভোজসভায় জুলিয়েটের সাক্ষাত পেয়ে একমুহূর্তেই রোজালিনকে ভুলে গেলে! হায় প্রেম নিষ্ঠা!

রোমিও : আপনার কথা কি শেষ?

কবি : আপাতত। এখন বলো, আমি সব মিথ্যে বলেছি — সব মিথ্যে।

রোমিও : না, আপনি ঠিকই বলেছেন…রোজালিনকে আমি সত্যিকারের প্রেমনিষ্ঠা থেকেই অন্তরে স্থাপন করেছিলাম।

কবি : তবে সমস্যা হলো…।

রোমিও : আমাকে বলতে দিন।

কবি : ঠিক আছে, তাই বলো। আমি তো তোমার…না না, তোমাদের কথা শোনার জন্যে সেই কবে থেকে অপেক্ষা করছি। বলো বলো — প্রাণ খুলে বলো। তবে, একটা কথা —

রোমিও : আবার কী কথা?

কবি : মিথ্যা বলবে না। মিথ্যাবাদীকে আমি ঘৃণা করি।

জুলিয়েট : মিথ্যাবাদীকে আমিও…

রোমিও : জুলিয়েট, আমাকে কথা বলতে দাও।

জুলিয়েট : কী বলবে তুমি!

রোমিও : জুলিয়েট!

জুলিয়েট : ঠিক আছে, বলো।

রোমিও : এই যে মিস্টার, আমি জানি না আপনি কে? তবে, শুনুন, আমাকে ভুল বুঝবেন না…

কবি : বলুন, আমি শুনছি।

রোমিও : আসলে কী জানেন, জুলিয়েটকে দেখার পর আমি নতুনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি…।

কবি : নতুন সিদ্ধান্ত!

রোমিও : হ্যাঁ নতুন সিদ্ধান্ত, আর সেটা ঘটেছিল জুলিয়েটের অদ্ভুত এক জাদুকরি আকর্ষণে এবং তারই সমর্থনে। আমি সেই প্রথম বুঝি — এক নিষ্ফল প্রেমনিষ্ঠায় মাসের পর মাস অর্থহীনভাবে রোজালিনকে ভালোবেসে গেছি…জুলিয়েটকে দেখামাত্র আমার সেই মোহভঙ্গ ঘটে। তবে, এও সত্য — আমি রোজালিনকে একসময় যথার্থ অর্থেই ভালোবাসতাম, কিন্তু এই আমার প্রকৃত প্রেম সম্ভব হয়েছে কিন্তু এই জুলিয়েটের সঙ্গে, জুলিয়েটের সাথে।

কবি : মিথ্যে, সব মিথ্যে…জুলিয়েট তোমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে তুমি সত্য গোপন করছো…আসলে, জুলিয়েটের প্রতি তোমার কোনো প্রকৃত প্রেম ছিল না, যা ছিল রোজালিনের প্রতি।

রোমিও : জুলিয়েট, তুমি তো রোজালিনকে চিনতে…বলো ওর সঙ্গে তুমি কি কোনোদিন আমাকে দেখেছো…জুলিয়েট বলো?

জুলিয়েট : না, কিন্তু এতে প্রমাণিত হয় না যে, তোমার জীবনে আমিই একমাত্র।

রোমিও : জুলিয়েট! …তুমিও আমাকে ভুল বুঝলে!

জুলিয়েট : ভুল কি ঠিক তা আজ আমার বোঝার সাধ্যকে অতিক্রম করে গেছে।

রোমিও : তাহলে শোনো — এই দুটি চোখ তখন শুধু একপাক্ষিকভাবে এই আমাকে রোজালিনের প্রতি আসক্ত রেখেছিল। কিন্তু রোজালিন কোনোদিনই আমাকে বাসে নাই ভালো, এমন কি সে এই আমার দিকে ফিরে তাকায়নি…উহ সে কী অসহ্য যন্ত্রণা! যে আমাকে ভালোবাসে না, আমার দিকে একবারের জন্যও ফিরে তাকায় না, তার জন্যে হৃদয় নিয়ে বসে থাকার সে যে কী যন্ত্রণা…তা তুমি বুঝবে না জুলিয়েট! এখন বলো — এটা কি কোনো প্রেম? না জুলিয়েট, তোমার সঙ্গে আমার যা হয়েছে, তারপর ওটাকে কি কখনো প্রেম বলা যায়? বলো জুলিয়েট বলো…কথা বলছো না কেন? বলো…।

জুলিয়েট : তোমার কথার চমৎকারিত্বে আমি প্রথম থেকেই মুগ্ধ…এরপর…আর কী শুনতে চাও আমার কাছে?

জুলিয়েলের শ্লেষবাক্যে রোমিও কিছুক্ষণের জন্য বাক্য হারিয়ে ফেলে। তারপর একটুখানি স্বাভাবিক হয়ে ঠাণ্ডা গলায় জুলিয়েটকে প্রবোধ দিতে চান।

রোমিও : জুলিয়েট, একটা কথা শোনো, একটু মন দিয়ে শান্ত হয়ে শোনো — আর একবার শুধু একবার আমাদের জীবনের ঝড়ো ভালোবাসার দিকে তাকাও।

কবি : চমৎকার রোমিও চমৎকার! তোমাদের ভালোবাসাকে চমৎকার বিশেষণে বিশেষায়িত করলে, বড়োই চমৎকার! তোমার কথার সূত্রে ভবিষতের মানুষ জানলো নতুন একটি কথা — রোমিও এবং জুলিয়েট ‘ঝড়ো ভালোবাসা’ করেছিল, ‘ঝড়ো ভালোবাসা’য় মরেছিল।

রোমিও : থামুন আপনি, থামুন।

কবি : ঠিক আছে থামছি। রোমিও বলো বলো আরও বলো, আজ তো শুধু তোমাদের কথাই শুনবো।

রোমিও : হ্যাঁ তা-ই শুনবেন। কেবল একটুখানি দয়া করুন, আমার কথাটা বলতে দিন। দয়া করে আমার কথার মাঝে আর কোনো কথা বলবেন না।

কবি : তথাস্তু। দেখি কতটুকু বলতে পারো! আর কতটা মিথ্যে দিয়ে ভোলাতে পারো ওই সরলা জুলিয়েটকে! দেখি।

তীর্যকভাবে কথা বলতে বলতে কবি সরে দাঁড়ান। রোমিও কবির যে তীর্যক কথায় অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছুই বলতে পারেন না। বরং তিনি জুলিয়েটের পাশে এসে বলেন —

রোমিও : জুলিয়েট, ওই লোকটা আমাদের শত্রু, দেখছো না — তোমার সামনে আমাকে কেমন ব্যঙ্গ করছে!

কবি : আরো নিবিড় হয়ে জুলিয়েটকে আগলে ধরো। তারপর কথা বলো।

রোমিও : থামুন আপনি।

কবি : পারলে আরো উত্তেজিত হও, আমি জানি মানুষ উত্তেজিত হলে ভেতরের আসল মানুষটা বেরিয়ে আসে। আমি তোমার সেই রূপটা তোমার ওই জুলিয়েটের সামনে প্রকাশ করে দিতে চাই, পৃথিবীর সব মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিতে চাই।

রোমিও প্রচণ্ডভাবে রেগে কবির দিকে ছুটে যেতে গিয়ে কেন যেন থেমে যান। তারপর অত্যন্ত অস্থির আবেগে কেঁপে কবির দিকে তীক্ষ্ণ-তীর্যকচোখে তাকিয়ে নিজেকে এক প্রকার সংযত করে নেন। শেষে তিনি জুলিয়েটের দিকে ফিরে তাকান এবং কাছে গিয়ে বলেন —

রোমিও : জুলিয়েট, তুমি কী বুঝতে পারছো — ওই লোকটা একটা বদ্ধ-উন্মাদ…আমাদের শক্র…কী কথা বলছো না কেন?

জুলিয়েট : আজ আমার সব কথা হারিয়ে গেছে।

রোমিও : শোনো, আমি আমার পূর্বপ্রেমের কথা নিশ্চয় তোমাকে বলতাম হয়তো। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে, সে সময়টা আমার জীবনে আসেনি। জুলিয়েট, জুলিয়েট, তুমি তো জানো, আমরা আমাদের অতিঅল্প সময়ের যুগল প্রেমের মাঝখানে কোনো অবসর পাইনি। অবসর পেলে আমি আমার সব কথা তোমাকে বলতাম — নিশ্চয় হয়তো।

জুলিয়েট : নিশ্চয়, হয়তো! বাহ বেশ, বেশ রোমিও, আমি জানি, ‘নিশ্চয়’ আর ‘হয়তো’ এই শব্দ দুটি পরস্পর বিরোধী কথা বলে…বেশ রোমিও বেশ, আজ তোমার কথার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে — অবসর পেলেও তুমি ওই গোপন-সত্যটা আমাকে বলতে না, কোনোদিন বলতে না। শুধু শুধু মিথ্যা বলে কী লাভ রোমিও!

রোমিও : জুলিয়েট জুলিয়েট জুলিয়েট, তুমি বিশ্বাস করো…।

জুলিয়েট : সরে যাও তুমি। আমাকে একটুও স্পর্শ করবে না।

রোমিও : জুলিয়েট!

জুলিয়েট : হ্যাঁ, স্পর্শ করবে না।

রোমিও : জুলিয়েট, ভুলে যেয়ো না, একদিন তুমি আমার এই হাতের স্পর্শেই শিহরিত হয়েছিলে — সে কথা ভুলে যেয়ো না।

জুলিয়েট : না, একেবারেই ভুলে যাচ্ছি না যে, ওই হাতের স্পর্শ-ছলনাই সবচেয়ে বেশি ঠকিয়েছে আমাকে!

রোমিও : ভুল জুলিয়েট, সব ভুল। আমার কথার আদ্যোপান্ত শুনলে তোমার সব ভুল ভেঙে যাবে। জুলিয়েট, একবার, শুধু একবার মনে করে দেখো, — রাতে তোমার সাথে দেখা। কোন অচেতনে জানি তোমার হাতে লেগে গেল আমার হাত, সেই স্পর্শ শিহরনকে নিয়ে হলো কথা।

জুলিয়েট : আর সে রাতেই তুমি আমার সরল-মুগ্ধতার সুযোগ নিয়ে উঠে এসেছিলে আমার শোবার ঘরের বেলকনিতে…।

রোমিও : হ্যাঁ, আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উঠে গিয়েছিলাম তোমার বেলকনিতে…কেননা, তখন তুমি আমার স্পর্শ-ভালোবাসার কথাই ভাবছিলে…তোমার সেই ভাবনা আমাকে পাগল করে দিয়েছিলো জুলিয়েট…পাগল করে দিয়েছিলো…আজও ধন্য মানি তোমার সেই ভাবনাকে…।

জুলিয়েট : আমার সেই ভাবনার সঙ্গে একটি কচি মনের পবিত্র-সরলতার যোগ ছিল…।

রোমিও : সত্যিকারের ভালোবাসা কাকে বলে সেই রাতে আমি টের পেয়েছিলাম জুলিয়েট।

জুলিয়েট : আমি তখন একটুও ভাবতে পারি নাই যে কোনো প্রেমিকের মধ্যে একবিন্দু মিথ্যের আশ্রয় থাকতে পারে…।

রোমিও : শুধু একটুখানি কথা বলতে — তোমার বেলকনিতে উঠে গিয়েছিলাম আর বুঝেছিলাম সত্যিকারের ভালোবাসার ভেতর কেমন অস্থিরতা মিশে থাকে…।

জুলিয়েটের সঙ্গে রোমিও’র এমন কথার মধ্যে কবি আর স্থির থাকতে পারেন না। তিনি রোমিও-র দিকে এগিয়ে বলেন —

কবি : না না, মিথ্যে ভালোবাসার সঙ্গেই অস্থিরতা মিশে থাকে।

রোমিও : মানে?

কবি : কেননা, মিথ্যে ভালোবাসা নগদ-প্রাপ্তির জন্য মরিয়া হয়ে থাকে, যত দ্রুত সম্ভব অর্জন আর ভোগে বিশ্বাস করে। কারণ, মিথ্যে ভালোবাসাতে হারানোর ভয় একটু বেশি থাকে। না-কি বলো রোমিও?

রোমিও : আমি আপনার কথার কিছুই বুঝতে পারছি না।

কবি : আমি জানি, বুঝলেও তা তোমার স্বীকার করার কথা নয়।

রোমিও : কী বলতে চান আপনি?

কবি : বলছি। আচ্ছা বলো তো তোমার ওই ‘ভালোবাসা’, ‘অস্থিরতা’ আবার ‘ঝড়ো ভালোবাসা’ এ সবের মধ্যে নিশ্চয় কোনো পার্থক্য নেই?

রোমিও : তা থাকবে কেন?

কবি : জানি, প্রশ্ন দিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয় চতুর মানুষেরা।

রোমিও : আপনি আমাকে চতুর বলছেন!

কবি : হ্যাঁ, বলেছি। এবং আবারো বলছি আপনি চতুর। কেননা, আপনি প্রথম থেকেই আমার সব কথাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছেন।

রোমিও : না আমি আপনার কোনো কথাকেই পাশ কাটিয়ে যাইনি।

কবি : তাহলে স্বীকার করো — তোমার ওই তথাকথিত ‘ভালোবাসা’, ‘অস্থিরতা’, আর ‘ঝড়ো ভালোবাসা’ এ সবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

রোমিও : আমি জুলিয়েটকে ভালোবেসে অস্থিরভাবে ওকে পেতে চেয়েছিলাম।

কবি : ব্যাস, আমার উত্তর পেয়ে গেছি। এখন — শোনো, শোনো সত্যিকারের ভালোবাসার সঙ্গে কোনো অস্থিরতা মিশে থাকতে পারে না। কেননা, সত্যিকারের ভালোবাসায় হারাবার কোনো ভয় থাকে না, আবার মনের মানুষটাকে নিশ্চিত পাবার বিষয়েও কোনো সন্দেহ থাকে না। তাই সত্যিকারের ভালোবাসার গতি বা চলন হয় অস্থির নয়, ধীর-স্থির। এই মুহূর্তে তুমি আমার গানটির কথা মনে করতে পারো — ‘নিষ্ঠা মনে প্রেম করিয়ে/এক মনে বসে রয়েছে।’ সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই স্থিরতাকে মানে। আরেকটু শোনো ওই গানটা — ‘প্রেম-পাথারে যে সাতারে/তার মরণের ভয় কি আছে/নিষ্ঠা-মনে প্রেম করিয়ে/এক মনে বসে রয়েছে॥’

কবি তার এই গান গাইতে গাইতে আবার একটু দূরে সরে যান। আর রোমিও তার আগের কথার ধারাবাহিকতা রেখে জুলিয়েটকে বলেন —

রোমিও : জুলিয়েট, তুমি আমি দুজনেই খুব অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। মনে করে দেখো জুলিয়েট, শুধু আমি নই, তুমিও আমার জন্য কেমন উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলে, আমিও তোমার জন্য। একটুও বিরহ আমাদের সহ্য হয়নি। সকাল হতে না হতেই আমি আমার অস্থির প্রেমের উপায় বাতলে নিতে ছুটে গিয়েছিলাম চার্চে।

জুলিয়েট : আমি সেদিন সরল বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কী যে করেছিলাম!

রোমিও : কিছুক্ষণ পর তুমিও ছুটে গিয়েছিলে একই স্থানে — মানে চার্চে। সেখানে সেই সকালে ফাদার ফ্রায়ার আমাদের দুজনার দুটি হাতকে একসঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন বিয়ের কারণে, বিয়ের মন্ত্রে। মনে নেই তোমার?

জুলিয়েট : মনে আছে। কিন্তু তারপর?

রোমিও : তারপর তোমার ভালোবাসা আমার এই পোড়াকপালে সইলো না জুলিয়েট, সইলো না…।

জুলিয়েট : আর ভান করো না রোমিও! আর না। আমি বলি শোনো — তারপর সেই সকালে তুমি আমাদের পরম-আত্মীয় টাইবল্টকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিলে, এটাই আসল কথা।

রোমিও : না, জুলিয়েট, না। আমি সেইদিনও বলেছি, আজও বলছি — আমি টাইবল্টকে হত্যা করিনি। বরং টাইবল্টের আক্রমণ হতে নিজেকে বাঁচাতে গিয়েছিলাম।

জুলিয়েট : আর তখনই টাইবল্ট তোমার হাতের তরবারিতে খুন হয়েছিল, সেটা ছিল তোমার অনিচ্ছাকৃত। জানি তো!

রোমিও : বিশ্বাস করো, এটাই সত্য। আমি তাকে হত্যা করিনি, আত্মরক্ষার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে সে আমার হাতের তরবারিতে খুন হয়েছিল।

রোমিও-র কথার মধ্যে কবি চিৎকার করে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসেন —

কবি : বাহ্ বেশ রোমিও! জানি, প্রতারকেরা এরকমই বলে — ‘আমি তাকে হত্যা করিনি, সে আমার হাতের তরবারিতে খুন হয়েছিল।’

রোমিও : থামুন আপনি।

কবি : রোমিও!

রোমিও : না, ওই মুখে আর আমার নাম উচ্চারণ করবি না।

কবি : রোমিও!

রোমিও : বেরিয়ে যা এখান থেকে।

কবি : রোমিও!

রোমিও : আর একটাও কথা নয়, যা এখান থেকে।

কবি : না, আমাকে ধাক্কা দেবে না।

রোমিও : তুই না গেলে, তোকে ধাক্কা দিয়েই বের করে দেবো।

কবি : আমার সাথে ভদ্রতা করে কথা বলো।

রোমিও : ভদ্রতা! এই তুই কে, যে তোকে সালাম করে কথা বলতে হবে! যা বলছি, যা এখান থেকে।

কবি : দেখেছো দেখেছো মিসেস রোমিও, তোমার হাসব্যান্ডের কেমন ব্যবহার! আমার সাথে কেমন অসৎ খারাপ ব্যবহার করছে দেখো।

রোমিও : আর কোনো কথা না, যা এখান থেকে।

কবি : মিসেস রোমিও, দেখো দেখো, কেমন ব্যবহার তোমার স্বামীর!

রোমিও : মুখ বন্ধ কর।

কবি : কারো মুখে হাত দিয়ে নিজের চরিত্রের দুর্বলতা চেপে রাখা যায় না — মিস্টার রোমিও।

রোমিও : আমার চরিত্র নিয়ে তুই কথা বলার কে!

কবি : মিস্টার রোমিও, আমি আবার বলছি — আমার সাথে ভদ্রতা করে কথা বলো — আই অ্যাম এ পোয়েট, আই মিন কবি, আমার সঙ্গে ভদ্রতা করে কথা না বললে — এখানে আজ তোমার সব সহপাঠী বন্ধুদের ডেকে এনে জুলিয়েটকে শুনিয়ে ছাড়বো — জুলিয়েটকে ভালোবাসার আগে তুমি রোজালিনকে কতটা ভালোবাসতে।

জুলিয়েট : তার আর প্রয়োজন হবে না, আমি আজ আমার প্রেমিক বা স্বামীর চরিত্র সম্পর্কে সবটুকু বুঝে গেছি।

রোমিও : না জুলিয়েট, তুমি কিচ্ছু বোঝোনি, কিচ্ছু না। আসলে কী জানো, একটি দিনের জন্যেও আমি আমার সব কথাকে তোমার কাছে বলার সুযোগ পাইনি জুলিয়েট।

জুলিয়েট : কেবল সুযোগ পেয়েছিলে মেকি আর মিথ্যে প্রেমের কথাগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলে শোনাতে।

রোমিও : আমাকে এইভাবে আর আহত করো না জুলিয়েট।

জুলিয়েট : তুমি একজন মিথ্যেবাদী, আমার সত্য কথাতে তুমি আজ আহত হলে আমার কিচ্ছু করার নেই।

রোমিও : আহ্ জুলিয়েট, এরকম কথা বলার চেয়ে আমাকে হত্যা করো।

জুলিয়েট : আমি তোমার মতো নিষ্ঠুর নই।

রোমিও : নিষ্ঠুর! কে নিষ্ঠুর? আমি না তুমি? দিনের বেলায় টাইবল্ট খুন হবার পর রাতের বেলায় আমি যখন তোমার কাছে বিদায় নিতে গিয়েছিলাম তখন তুমি বলেছিলে, আমার স্পষ্ট মনে আছে, তুমি বলেছিলে — ‘যথার্থ প্রেমিক যদি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো মারাত্মক অপরাধও করে ফেলে তবে তার প্রেমিকার উচিত তাকে ভুল না-বোঝা।’ আজ কোথায় তোমার সেই কথা! কোথায়, জুলিয়েট!

জুলিয়েট : কথাটা ঠিকই আছে, কিন্তু আজ আমি জেনে গেছি — তুমি সেদিন যথার্থ প্রেমিক না।

রোমিও : জুলিয়েট!

জুলিয়েট : বলো? কী বলতে চাও?

রোমিও : আমি যথার্থ প্রেমিক ছিলাম না!

জুলিয়েট : না।

রোমিও : না! তাহলে শোনো, তুমিই আমাকে তোমার কাছে যথার্থ প্রেমিক হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ দাওনি, এখনও দিচ্ছো না।

জুলিয়েট : ভুল, রোমিও, ভুল।

রোমিও : না এটাই সত্য।

জুলিয়েট : গলার জোরে সত্য ঘোষণা করলেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না।

রোমিও : জুলিয়েট, আমি ভুলে যাইনি যে, সেদিন আমাদের দুজনার মধ্যে কথা ছিল, আমরা আমাদের প্রেম-দুঃখের অবসান ঘটাবো এক মধুর মিলনে। আর তাই আমরা এক অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলাম সামান্য বিরহকে স্বীকার করে নিয়ে। তুমি আমার স্বেচ্ছানির্বাসনের অন্তরায়ের ভেতর আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছিলে — আমরা এক মধুর মিলনের অপেক্ষায় থাকবো। কিন্তু তুমি তোমার কথা রাখোনি, জুলিয়েট কথা রাখোনি।

জুলিয়েট : আমি কথা রাখিনি!

রোমিও : হ্যাঁ, তুমি কথা রাখোনি। তুমি আমাদের মধুর মিলনের জন্য শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারোনি, একটুখানি কষ্ট স্বীকার করতে পারোনি।

জুলিয়েট : কী যা তা বলছো! আমি জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়েছি তোমার সঙ্গে মিলনের জন্য।

রোমিও : মিথ্যে কথা। কিচ্ছু করো নি তুমি। কিচ্ছু না। বরং আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে নির্বাসনে পাঠিয়ে নিজে আত্মহত্যা করে আমাকেও আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছিলে…।

জুলিয়েট : আর মিথ্যে বকো না, আমি তোমাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করিনি, বরং তুমিই আমাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছো। আর মিথ্যে বলো না।

রোমিও : কোনটা মিথ্যে, জুলিয়েট? আমি মাঞ্চুয়ায় নির্বাসনে যাবার পর তুমি আত্মহত্যা করোনি?

জুলিয়েট : না, আমি তোমার সঙ্গে মিলনের জন্য একটা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলাম মাত্র।

রোমিও : মিথ্যে কথা।

জুলিয়েট : না মিথ্যে নয়, আমি মিথ্যে বলছি না।

রোমিও : তাহলে নিশ্চয় — আমি মিথ্যে বলছি — মাঞ্চুয়ায় নির্বাসনে যাবার পর আমি বন্ধু বালথাসারের মাধ্যমে খবর পেয়েছিলাম যে — তুমি নাই। তোমার মৃতদেহকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে গ্রেভইয়ার্ডে। এটা মিথ্যে? বলো — আমি যে চোখের নিমিষে সুদূর মাঞ্চুয়া থেকে এই গ্রেভইয়ার্ডে ছুটে এসে তোমার কবর খুঁড়ে — তোমার যে মৃতদেহকে বের করে এনেছিলাম — সেটা মিথ্যে? নাকি বলো — তোমাকে মৃত দেখে আমি যে আত্মহত্যা করেছিলাম — সেটা মিথ্যে? বলো বলো — আমার জন্য অপেক্ষা না করে কেন তুমি আত্মহত্যা করেছিলে? কেন?

জুলিয়েট : বিশ্বাস করো, আমি তখনও আত্মহত্যা করিনি! আমি তোমার আগে আত্মহত্যা করিনি — তোমার আগে মরিনি। তুমি ভুল বলছো রোমিও। ভুল।

রোমিও : না জুলিয়েট, আমি ঠিকই বলছি। কেননা, কবর খুঁড়ে তোমাকে আমি মৃত পেয়েছিলাম। আমার এই হাতের স্পর্শ আর চোখের দৃষ্টি শক্তি সেদিন একটুও ভুল করে নাই জুলিয়েট, একটুও না।

জুলিয়েট : ভুল, রোমিও, ভুল, সব ভুল, তুমি ভুল করে আত্মহত্যা করেছিলে।

রোমিও : না, আমার আত্মহত্যার ভেতর কোনো ভুল ছিল না।

জুলিয়েট : ছিল, রোমিও, ছিল। কেননা, তোমার আত্মহত্যার পর আমার চেতনা ফিরে এসেছিল।

রোমিও : এ আমি বিশ্বাস করি না।

জুলিয়েট : বিশ্বাস করো রোমিও, আমার চেতনা ফিরে এলে — এই আমার দেহের উপর তোমাকে নি®প্রাণ পড়ে থাকতে দেখে নিজের জীবনকে নিরর্থক মনে হয়েছিল।

রোমিও : বাহ্ জুলিয়েট, বাহ্! তোমাকে ধন্য মানি, আমার আত্মহত্যার কথা শুনে তুমি তাৎক্ষণিকভাবে যে মিথ্যে আর বানোয়াট গল্প বানাতে শুরু করছো — তাতে আমি মুগ্ধ!

জুলিয়েট : মিথ্যে নয় রোমিও — তোমাকে মৃত দেখে তোমারই কোমর থেকে ভোতা একটা ছুরি খুলে নিয়ে এই বুকে বিদ্ধ করে আমি যে আত্মহত্যা করেছিলাম, এটা মিথ্যে নয়।

রোমিও : তোমার এই প্রতিভার কথা আগে আমি জানতাম না! মিথ্যে আর কাল্পনিক গল্প বানাতে তুমি যে এতো ওস্তাদ — তা আজ এতোদিন পর জেনে আমি তোমার প্রতি নতুন করে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি!

জুলিয়েট : বিশ্বাস করো, আমি তোমায় কোনো মিথ্যে-কাল্পনিক গল্প বানিয়ে বলিনি। বলেছি আমাদের নাটকীয় জীবনের সত্যকাহিনী।

কবি এবার চিৎকার করতে করতে জুলিয়েটের সামনে এসে দাঁড়ান এবং বলেন —

কবি : জুলিয়েট, জুলিয়েট — আমিও তোমাদের নাটকীয় জীবনের সত্য কাহিনীটাকে একটু খুলে খুলে শুনতে চাই, শোনাতে চাই তোমার রোমিওকে। কী জুলিয়েট, বলবে না?

জুলিয়েট : কী বলতে চাইছেন?

কবি : না, তেমন কিছু না, আজ শুধু বলে যাও তোমার প্রথম গান-প্রথম আখ্যান, যার অন্তরাটুকু রচিত হয়েছিল তোমার প্রথম মৃত্যুর আগে।

জুলিয়েট : মানে?

কবি : প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে — আজ নয়, ওতে রোমিও আর তোমার মাঝের গভীর ফাঁককে বোঝা সম্ভব নয়। আজ বলো, তোমার প্রথম মৃত্যুর আগের কথাগুলো।

জুলিয়েট : কেন?

কবি : উত্তরটা একটু পরে দিই? তার আগে বলো, তোমার প্রথম মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল?

জুলিয়েট : কী সব বলছেন আপনি! প্রথম মৃত্যু, দ্বিতীয় মৃত্যু…আমি যে এর কিছুই বুঝতে পারছি না।

কবি : পারবে পারবে, সব বুঝতে পারবে…আগে বলো, রোমিও নির্বাসনে চলে গেলে তোমার জীবনে কী এমন ঘটেছিল যে তুমি প্রথম মৃত্যুর স্বাদ নিয়েছিলে? প্রথম নয়, ওটাই ছিল তোমার আসল মৃত্যু…না-কি বলো?

জুলিয়েট : কী বলছেন আপনি? আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না।

কবি : বোকা মেয়ে, এইটুকু বুঝতে পারছো না!

জুলিয়েট : না।

কবি : তাহলে শোনো, রোমিও কিন্তু তোমাকে মৃত-ই জেনেছিল এবং গ্রেভইয়ার্ডে মাটি খুঁড়ে মৃত-ই পেয়েছিল তোমাকে।

জুলিয়েট : না না, এ হতে পারে না, ফাদার ফ্রায়ারের দেওয়া প্রতিশ্র“তি কখনো মিথ্যে হতে পারে না।

কবি : ফাদার ফ্রায়ারের দেওয়া প্রতিশ্র“তি! হে হে…সে তোমাকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল…হে হে…। শুনে রাখো, সে ছিল একটা মিথ্যুক, প্রতারক…।

রোমিও : থামুন। আমি আর কিছুই শুনতে চাই না।

কবি : কেন রোমিও? তোমার আবার কী হলো?

রোমিও : একটা সৎ ও ভালো মানুষ সম্পর্কে আপনি মুখ সামলে কথা বলুন।

কবি : আমার বিবেচনায় তিনি সৎ নন, ভালো মানুষও নন, তিনি একটা খারাপ এবং নিকৃষ্ট মানুষ।

রোমিও : না, তিনি সৎ এবং আদর্শবান মানুষ।

জুলিয়েট : তাঁর মতো ভালো মানুষ এখনও এ পৃথিবীতে নাই।

রোমিও : আপনি জানেন না — তিনি আমাদের জন্য কী করেছেন!

কবি : কী করেছেন?

রোমিও : আমাদের দুই পরিবারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অহেতুক দ্বন্দ্ব-বিরোধকে উপেক্ষা করে তিনি গোপনে জুলিয়েট আর আমাকে বিবাহ দিয়েছিলেন।

জুলিয়েট : শুধু তাই নয়, তিনি আমাদের এই বিবাহের মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব-বিরোধের অবসান ঘটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই না, রোমিও?

রোমিও : একেবারে ঠিক কথা। একজন সৎ ও ভালো মানুষ না-হলে তিনি এই রকমটি করতে পারতেন না।

জুলিয়েট : এই যে মিস্টার পোয়েট, আপনি ভাবতে পারবেন না — তিনি কতটা ভালো মানুষ ছিলেন!

কবি : কতটা?

জুলিয়েট : শুনুন, বলছি।

কবি : বলো।

জুলিয়েট : রোমিও নির্বাসনে যাবার পর যখন প্যারিসের সঙ্গে আমার বিবাহ স্থির হয়ে যায় — তখন আমি খুব অস্থির হয়ে উঠেছিলাম — কী করবো কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না। এরই মাঝে আমার ফাদার ফ্রায়ারের কথা মনে হয় — ছুটে গিয়েছিলাম সেন্ট পিটার্স গির্জায় ফাদার ফ্রায়ারের কাছে। তিনি আগে থেকেই জানতেন — ব্যাপারটা — যে প্যারিস আমাকে বিবাহ করতে আসছে।

কবি : তারপর?

জুলিয়েট : আমি ফাদার ফ্রায়ারের কাছে গিয়ে একটা ছুরি হাতে নিয়ে ভীষণ আবেগিক হয়ে বলেছিলাম — ‘ফাদার, জানি আমি — ঈশ্বর আমাদের দু’টি হৃদয়কে এক করেছেন আর আপনি এক করেছেন আমাদের দু’টি হাত। রোমিওর সাথে আবদ্ধ এই হাত যদি অন্য কারো সাথে আবদ্ধ হয়। তাহলে তার আগেই আমার এই হাত আর এই হৃদয় — দু’টিকেই আমি হত্যা করবো। এখন আমি কী করবো? বলুন ফাদার। আর যদি তা না বলেন, তাহলে দেখুন, আমি এই ছুরির আঘাতে সব সমাধান করবো। আপনি আর দেরী করবেন না, ফাদার। আমি মরতে চাই। তার আগে অন্য কোনো উপায় যদি কিছু থাকে বলুন — যাতে আমি এবং আমার প্রেম রক্ষা পেতে পারে। না হলে মৃত্যুই হোক আমার পরিণতি।’ আমি আমার বুকের উপর ছুরির আঘাত বসাতে গেলে ফাদার ফ্রায়ার আমাকে নিরস্ত্র করেন।

কবি : না হলে যে চার্চ-প্রাঙ্গন রক্তাক্ত হয়ে যেতো।

রোমিও : আহ্ আপনি থামুন, আমাকে শুনতে দিন। তারপর কী হলো, জুলিয়েট?

জুলিয়েট : তারপর ফাদার ফ্রায়ার বললেন — ‘ঈশ্বরের দোহাই জুলিয়েট, একটা না একটা উপায় নিশ্চয় আছে। তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো। আমি আসছি।’

কবি : বিপদের মুহূর্তে আসছি বলে অনেকে কিন্তু পালিয়ে যায়।

জুলিয়েট : কিন্তু ফাদার ফ্রায়ার পালিয়ে যাননি। তিনি কিছুক্ষণ পরই তিনি ফিরে এসেছিলেন।

কবি : এই কিছুক্ষণ তিনি কোথায় গিয়েছিলেন?

জুলিয়েট : সঠিক বলতে পারবো না। তবে, সম্ভবত তাঁর প্রিয় পুষ্প-উদ্যানে গিয়েছিলেন আর গিয়েছিলেন প্রার্থনা ঘরে। একজন ফাদার কোনো প্রশ্নের উত্তর কিংবা কোনো সমাধানের গূঢ় ইশারা তো ওই প্রার্থনা ঘর থেকেই নিয়ে আসেন।

কবি : অবশ্যই।

রোমিও : ফাদার তোমার জন্য কী সমাধান এনেছিলেন — জুলিয়েট?

জুলিয়েট : এক টুকরো মদিরা।

রোমিও : মদিরা!

জুলিয়েট : হ্যাঁ রোমিও, মদিরা। মদিরা ছোট্ট একটা শিশি হাতে করে এনে ফাদার বলেছিলেন — ‘ভুলে যেয়ো না জুলিয়েট, আমি একদিন গোপনে তোমাদের বিবাহ দিয়েছিলাম।’

রোমিও : তার জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।

জুলিয়েট : আমি সে-কথা বলতেই তিনি বললেন — ‘তবে শোনো, আমি যা বলছি — তুমি সেই মতো কাজ করবে।’ আমি বললাম — ‘অবশ্যই ফাদার।’ তিনি বললেন — ‘এবার বাড়িতে গিয়ে প্যারিসের সঙ্গে বিয়েতে তোমার সম্মতি জানাবে।’

রোমিও : কী বলছো, জুলিয়েট! তিনি এই কথা বলতে পারলেন!

জুলিয়েট : আমিও তখন তোমার মতো বিস্মিত হয়েছিলাম।

রোমিও : শুধু বিস্মিত হবার ব্যাপার নয়, আমি ভাবছি — যিনি তোমাকে আমার সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন তিনি কেমন করে অমনটা বলতে পারলেন!

কবি : মিস্টার রোমিও, একটু শান্ত হও, জুলিয়েটকে বলতে দাও।

রোমিও : এরপর আর কী বলবে! বলবে যে — ফাদারের ওই কথা শুনে সে আত্মহত্যা করেছিল — এই তো!

জুলিয়েট : না রোমিও, তা নয়। ফাদার আসলে তোমার আমার মিলনের জন্য একটা কৌশলের আশ্রয় নিতে বলেছিলেন। বলেছিলেন — প্যারিসের সঙ্গে বিবাহতে সম্মতি জানিয়ে রাতে একটা নির্জন ঘরে থাকতে। তারপর সে ঘরের নির্জনতায় খুব গোপনে তাঁর দেওয়া ওই মদিরা পান করতে।

রোমিও : কেন, মদিরা পান করতে কেন?

কবি : বলো জুলিয়েট, বলো।

জুলিয়েট : ফাদার বলেছিলেন — ওই মদিরা পানের কিছুক্ষণের মধ্যে আমার চেতনা লুপ্ত হবে। কিন্তু বিয়াল্লিশ ঘণ্টা পর আবার আমার চৈতন্য ফিরে আসবে।

কবি : মিথ্যে কথা।

জুলিয়েট : আমাকে বলতে দিন।

কবি : মিথ্যে কথা আমি সহ্য করতে পারি না।

জুলিয়েট : আমি যা বলছি সত্য বলছি। শুনুন, ফাদার আরো বলেছিলেন — সকালে ঘরের দুয়ার খুলে সকলে চেতনাহীন আমাকে দেখে ভেবে নেবে আমি মৃত…ভেবে নেবে আমি আত্মহত্যা করেছি একা ঘরে রাতের অন্ধকারে।

কবি : আসলে তো আত্মহত্যা করেছিলে। আর তা ওই ফাদারের দেওয়া বিষ পানে।

জুলিয়েট : বিষ পানে নয়, ফাদারের দেওয়া মদিরা পানে আমার চেতনা লুপ্ত হয়েছিল মাত্র। আর ফাদারের দেওয়া কথামতো চেতনাহীন আমাকে তো সবাই মাটির সমাধিতলেই রেখে এসেছিল।

কবি : কারণ, তুমি মৃত ছিলে।

জুলিয়েট : না। আমার চেতনা ফিরে এসেছিল। ফাদারের দেওয়া কথামতো রোমিও এসে কবর খুঁড়ে আমাকে উদ্ধার করেছিল। কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য যে, তখনও আমি ছিলাম চেতনাহীন। আর রোমিও, তুমিও সেই চেতনাহীন আমাকে দেখে অন্যান্যদের মতোই আমাকে মৃত ভেবেছিলে।

কবি : রোমিও ঠিকই ভেবেছিল — তুমি মৃত ছিলে।

জুলিয়েট : রোমিও, কেন তুমি সাময়িক চেতনাহীন আমাকে মৃত ভেবে আত্মহত্যা করেছিলে? কেন? ফাদার ফ্রায়ার বলেছিলেন — তুমি এসে কবর খুঁড়ে আমাকে নিয়ে যাবে মাঞ্চুয়ায়। কথা ছিল সেখানেই সম্ভব হবে আমাদের যৌথ প্রেমজীবন, যা আমাদের নিজের শহর ভেরেনায় সম্ভব হয় নাই। তোমার সামান্য ভুলের জন্য আমার সব প্রত্যাশা সব স্বপ্ন এক মুহূর্তেও মধ্যে শেষ হয়ে গেল। সব সব। আমি কতো ভেবে ছিলাম — আমরা দুটি প্রাণ মাঞ্চুয়ায় পাখির সংসার পাতবো — এক হীনমন্য আর দ্বন্দ্ব-সর্বস্ব পারিবারিক কলহের বাইরে। দূরে।…শুধু তোমার একটুকু ভুলে আমার সব শেষ হয়ে গেল। সব সব।

কবি : দেখছো রোমিও, কেমন কথার ছলনায় জুলিয়েট আজ সব দোষ তোমার কাঁধে তুলে দিতে চাইছে! তোমাকে ধন্য মানি জুলিয়েট — ফাদার ফ্রায়ারকে মহান প্রমাণ করতে নিজের স্বামীকে ছোট করছো বলে!

জুলিয়েট : তিনি আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার মহান-আদর্শের প্রমাণ রেখে গেছেন।

কবি : কেমন কেমন?

জুলিয়েট : রোমিও আত্মহত্যার পর যখন আমার চেতনা ফিরে আসে তখনও ফাদার ফ্রায়ার আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাকে মা বলে ডেকে দিতে চেয়েছিলেন নানের পবিত্রতম পদ। কিন্তু আমি রোমিওকে ছাড়া বাঁচতে চাইনি। বাঁচিনি। আজ ভেবে দেখুন যে মানুষটি আমার জীবনের সব সঙ্কটের উপায় বাতলে দিয়েছিলেন, এমনকি আমার জীবনের শেষ মুহূর্তে আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে দিতে চেয়েছিলেন নানের পবিত্রতম পদ, সে মানুষটি মহান নয়তো কী? আমি জানি ফাদার ফ্রায়ার এখন কোথায় আছেন? কিন্তু এখনও আমি বিশ্বাস করি ফাদার ফ্রায়ারকে যদি আমি মন থেকে ডাকি, তবে নিশ্চয় তিনি ছুটে আসবেন।

কবি : তোমার সেই বিশ্বাসকে আমি সম্মান করতে চাই। এখন একবার তাকে ডাকো তো দেখি — তিনি আসেন কি-না?

রোমিও : হ্যাঁ, জুলিয়েট, তুমি ফাদারকে ডাকো — আজ তাঁর সম্পর্কে আমার সব বিশ্বাস, ভালোবাসা, সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ডাকো জুলিয়েট, ফাদারকে ডাকো।

কবি : হ্যাঁ, জুলিয়েট, ডাকো।

জুলিয়েট : ফাদার, ফাদার, আমি জানি না আপনি কোথায়? কিন্তু আজ আমি আপনাকে ডাকছি — আজ আপনাকে আমার ডাকে আসতেই হবে। ফাদার, ফাদার।

জুলিয়েটের এই ডাকের মধ্যে নৈপথ্য থেকে ফাদার উত্তর করেন —

ফাদার : কে? কে আমাকে ডাকে? কে?

জুলিয়েট : ফাদার, আমি জুলিয়েট। আপনি আসুন একবার।

ফাদার : কেন ডাকছো আমায়?

কবি : বলো জুলিয়েট, বলো — খুব জরুরি দরকার আছে।

জুলিয়েট : খুবই জরুরি একটা দরকার পড়েছে ফাদার। আপনি আসুন।

ফাদার : হ্যাঁ জুলিয়েট, তুমি যখন ডেকেছো — আমি অবশ্যই আসবো। কিন্তু…।

জুলিয়েট : কিন্তু কেন ফাদার? আপনি আসুন।

ফাদার : আমাকে তোমার ডাকে যেতে হলে — উইলিয়াম শেক্সপিয়রের অনুমতি লাগবে।

কবি : জুলিয়েট, বলো বলো, বলো তুমি — শেক্সপিয়রকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসতে বলো।

জুলিয়েট : ফাদার, তাহলে আপনি শেক্সপিয়রকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসুন।

ফাদার : আচ্ছা, দেখছি তাকে সঙ্গে নিয়ে আসা যায় কি-না।

কবি : বলো জুলিয়েট, অবশ্যই তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে বলো।

জুলিয়েট : ফাদার, আপনি তাকে অবশ্যই সঙ্গে করে নিয়ে আসুন।

ফাদার : ওকে ওকে, আমি আসছি। মহাত্মা শেক্সপিয়রকে সঙ্গে করেই আনছি।

জুলিয়েট : আসুন।

ফাদার : মহাত্মা শেক্সপিয়র, আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।

শেক্সপিয়র : কোথায়?

ফাদার : আপনার জুলিয়েট, আপনাকে এবং আমাকে আজ একসঙ্গে ডাকছে। আপনাকে আমার সঙ্গে যেতেই হবে। আমি জুলিয়েটকে কথা দিয়েছি।

শেক্সপিয়র : জুলিয়েট! এতদিন পরে! আবার নতুন কোনো কিছু ঘটেনি তো? চলো চলো, জলদি চলো।

ফাদার : হ্যাঁ স্যার চলুন।

শেক্সপিয়র ও ফাদার এক সঙ্গে রোমিও, জুলিয়েট এবং কবির দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন। আর কবি তাদের আগমনের ভেতর স্বাগত জানিয়ে বলেন —

কবি : আসুন আসুন, মহাত্মা শেক্সপিয়র, আসুন। আপনি তো জানেন না — আপনার সাক্ষাত প্রতীক্ষায় আমি দীর্ঘদিন ধরে এই মর্ত্যরে ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি, সমাধিক্ষেত্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া লতায় ধরা ফুলের গন্ধ নিয়েছি। আসুন… হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন…।

শেক্সপিয়র : এই ছোড়া, তুই কে?

কবি : আমাকে আপনি চিনবেন না।

শেক্সপিয়র : চিনি কি না চিনি সেটা আমার ব্যাপার, প্রশ্ন করেছি উত্তর দে — কে তুই?

ফাদার : এই যে, মিস্টার বল তুই কে? স্যার তোর পরিচয় জিজ্ঞেস করেছেন — আর তুই উত্তর না দিয়ে ভণিতা করছিস! তোর সাহস তো কম না!

কবি : আমার সাহস কতটুকু — তা একটু পরেই বোঝা যাবে। আর তখন আপনা থেকেই আমার পরিচয় আপনারা পেয়ে যাবেন।

ফাদার : থাম, থাম বলছি। এই ছোকরা, তুই দেখছি গুরুজনদের সাথে ভদ্রতা করে কথা বলতেই শিখিস নি। মহাত্মা শেক্সপিয়র, আমি আর এখানে থাকতে চাইনে। আমি গেলাম।

শেক্সপিয়র : তুমি, চলে যাবে মানে! তুমিই না আমাকে এখানে ডেকে আনলে — জুলিয়েটের কথা বলে! জুলিয়েট কোথায়?

জুলিয়েট : স্যার, এই তো আমি।

শেক্সপিয়র : কেমন আছো তুমি? তোমার রোমিও কোথায়?

রোমিও : স্যার, আমি এখানে।

শেক্সপিয়র : ওইভাবে অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছো কেন?

কবি : যথেষ্ট কারণ আছে। না-কি বলেন ফাদার?

ফাদার : স্যার, আমি গেলাম।

কবি : না আপনি যাবেন না।

ফাদার : আমি তোর কথার বাধ্য নই।

কবি : হা হা হা… (উচ্চস্বরে হেসে বলে) একজন হত্যাকারী যে শেষপর্যন্ত অবাধ্য হবেন — তা আমি আগে থেকেই জানতাম ফাদার ফ্রায়ার।

ফাদার : এ কী বলছিস তুই!

কবি : আপনি হত্যাকারী, জুলিয়েটকে প্রথমবার আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছেন আপনি। বলুন চেতনা-নাশক মদিরার নামে আপনি কি জুলিয়েটের হাতে মরণ-বিষ তুলে দেননি? দেননি ফাদার?

ফাদার : মহাত্মা শেক্সপিয়র, শুনলেন তো ওই বদ্ধ উন্মাদটি কী বললো! আপনার উচিৎ ওর কথার প্রতিবাদ করা।

কবি : হ্যাঁ, প্রতিবাদ করুন। (একটুখানি হেসে) জানি তা পারবেন না আপনি। কেননা, সেদিন আপনিই (শেক্সপিয়রের দিকে ইঙ্গিত করে) উনাকে সমাজের চোখে সম্মানে আসীন রেখেছিলেন, আজও আপনার সেই সম্মান বহাল রয়ে গেছে…। কী মহাত্মা শেক্সপিয়র, আমি কি ভুল বললাম?

শেক্সপিয়র : কী বলতে চাস তুই?

কবি : আপনি সবই জানেন এবং বোঝেন। তারপরও আবার অহেতুক প্রশ্ন করছেন কেন?

শেক্সপিয়র : তোর হেয়ালি ভরা কথায় আমি সত্যি খুব অবাক হচ্ছি।

কবি : আর আমি এতদিন অবাক হয়েছি আপনাদের খেলার প্রতিভায়। হায় ফাদার! হায় শেক্সপিয়র! আপনারা আপনাদের নিজের নিজের সম্মান আর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠায় একটার পর একটা মানুষকে হত্যা-আত্মহত্যায় প্রাণোদিত করেছেন…ধিক শত ধিক আপনাদের মাহাত্ম্যে…।

শেক্সপিয়র : যুক্তি ব্যতীত ধিক্কার দিতে পারে কেবল উন্মাদ আর কাপুরুষেরা।

কবি : ঠিক আছে, তাহলে আমি যুক্তিতেই ফিরে যাচ্ছি। বলুন, প্রেম-জুটি রোমিও-জুলিয়েটকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন কে?

শেক্সপিয়র : কেন? ফাদার ফ্রায়ার।

কবি : ফাদার ফ্রায়ার, কথাটা কি ঠিক? বলুন ঠিক তো?

ফাদার : হ্যাঁ ঠিক।

কবি : এবার বলুন, বিবাহ-টা কি প্রকাশ্যে ঘটিয়েছিলেন, না-কি গোপনে?

ফাদার : গোপনে।

কবি : এই গোপন কথাটি আপনি কি কখনো কোথাও প্রকাশ্য করেছিলেন?

ফাদার : এই সব পুরোনো প্রসঙ্গ নতুন করে সামনে আনার কারণ?

কবি : নিশ্চয় কারণ আছে। ফাদার, ওদের গোপন বিবাহের কথা দুই পরিবারের কাউকে কখনো জানিয়েছিলেন? বলো জুলিয়েট, বলো রোমিও, তোমাদের পরিবারের কাউকে কখনো তোমাদের বিবাহের ব্যাপারটা উনি জানাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন? বলো?

ফাদার : আবার পুরোনো প্রসঙ্গ! মহাত্মা কবি শেক্সপিয়র, আপনি ওকে নিবৃত্ত করুন।

কবি : আমার এতদিনের জমানো কথাগুলো বলতে দিন।

শেক্সপিয়র : বুঝেছি — তুই তোর কথা বলার জন্য জুলিয়েটের নাম করে আমাদেরকে এখানে ডেকে এনেছিস।

কবি : ব্যাপারটা, উভয়পাক্ষিক।

শেক্সপিয়র : মানে?

কবি : আমার যেমন দরকার তেমনই দরকার রোমিও-জুলিয়েটের।

শেক্সপিয়র : কিন্তু ওরা তো কোনো কথা বলছে না। যা শুনছি সবই তো তুই বলছিস।

কবি : আমার বলার ভেতর দিয়ে ওরা ওদের জীবনের সত্যটা জানতে পারবে।

শেক্সপিয়র : ঠিক আছে বলো তাহলে।

কবি : ধন্যবাদ। ফাদার ফ্রায়ার, আপনার প্রতি আমার কথা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি।

ফাদার : ভণিতা না করে যা বলবি বল।

কবি : ফাদার, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে, — রোমিও নির্বাসনে যাবার পর যখন জুলিয়েটের সাথে প্যারিসের বিবাহ স্থির হয় এবং সে বিবাহ পড়িয়ে দেবার দায়িত্ব বর্তায় আপনারই হাতে — তখনও কি আপনি রোমিও-জুলিয়েটের গোপন বিবাহের কথা প্রকাশ করে দিতে পারতেন না?

ফাদার : তোর প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।

কবি : এমন কথা আপনার মুখে আগেও শুনেছি। কিন্তু এখন যে আপনাকে বলতেই হবে। ওই যে আপনার জুলিয়েট, রোমিও আপনার উত্তর শোনার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ফাদার : না আমি বলবো না।

কবি : তাহলে মহাত্মা শেক্সপিয়র! আপনি বলুন?

শেক্সপিয়র : তোর আজকের উদ্দেশ্যটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

কবি : তাহলে আমি…আপনাদের বুঝিয়ে দেবার সাহস করতে পারি? নাকি বলেন?

ফাদার : স্যার, আপনি ওকে কিছু বলুন স্যার।

শেক্সপিয়র : তাতে কোনো লাভ হবে না।

কবি : ফাদার ফ্রায়ার, আপনি সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান দুইটি প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবারের মাঝে একটি গোপন মধুর বিবাহ ঘটিয়ে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সামাজিকভাবে তাকে প্রকাশ্যে ব্যক্ত করবার সাহস পান নি। কারণ, গোপনে একটি বিবাহ সংঘটনের অপরাধে আপনাকে সামাজিক মানুষগুলো আদর্শচ্যুত বলে শনাক্ত করতো আর সেই সে অপরাধে আপনাকে ফাদারের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হতো…বলুন, আমার কথা কি মিথ্যা? বলুন শেক্সপিয়র?

শেক্সপিয়র : সরি। আমি তোর যুক্তির সবটুকু মানতে পারছি না।

কবি : তাহলে আরো ভেঙে বলি। আর, এইবার কিন্তু আপনিও পার পাবেন না।

শেক্সপিয়র : মানে? কী বলতে চাও?

কবি : আমি জানি — আপনি মহৎ লেখক। আর মহৎ লেখক-কবিরা যে সামাজিকভাবে সম্মানিত পদের সমালোচনায় একটা আবরণ-আবহ তৈরি করেন — সে কথাও জানি। জানি, মহৎ লেখক-কবিরা আবরণ-আবহ তৈরি করা সমালোচনার ভিতর দিয়ে আপাতত দৃষ্টিতে সম্মানিত ব্যক্তিটির তেমন কোনো ত্র“টি ধরা পড়ে না, কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়ে দেখলে আসল ব্যাপারটি বেরিয়ে পড়ে। আপনি ফাদার ফ্রায়ারের ক্ষেত্রে তা-ই করেছেন। তাই না?

শেক্সপিয়র : কেমন?

কবি : যেমন — আপনিই ফাদার ফ্রায়ারের হাত দিয়ে এক দুঃসাধ্য প্রেমের পরিণয় ঘটিয়েছিলেন — খুব গোপনে। তখন ফাদারকে এবং আপনাকে কি মহৎ-ই না মনে হয়েছিল! কেননা, আপনারা তখন প্রতি মুহূর্তে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত দুইটি পরিবারের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনার সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। ঠিক না?

শেক্সপিয়র : হ্যাঁ ঠিক।

কবি : কিন্তু, তারপর?

শেক্সপিয়র : তারপর যা ঘটেছে ট্রাজেডির নিয়ম-মাফিক ঘটেছে, তা নিয়ে তুই প্রশ্ন করতে পারিস না।

কবি : আমার প্রশ্নে এত ভয় কেন? শুনেছি — সত্য প্রকাশে মহাত্মারা কখনো ভীত হন না।

শেক্সপিয়র : সব কথাকে এমন বাঁকা নিস কেন? সোজাভাবে নিতে পারিস না?

কবি : বাঁকা পথটা কিন্তু আপনার — সোজা পথটা আমার।

ফাদার : স্যার, ওকে আমার আর সহ্য হচ্ছে না।

কবি : ফাদার, আমি জানি, যে-জন অপরাধীর অপরাধগুলো সবার সামনে তুলে ধরতে পারে সৎ সাহসে তাকে আর যাই হোক অপরাধীর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।

শেক্সপিয়র : বল, তোর যা কথা আছে বল।

কবি : ফাদার ফ্রায়ার, আমি আবার বলছি, বলুন — যখন রোমিওর বিবাহ করা স্ত্রী জুলিয়েটের সাথে প্যারিসের বিবাহ সংঘটনের দায়িত্ব পড়ে আপনার হাতে — তখন আপনি জুলিয়েট পরিবারের কারো কাছে, এমনকি প্যারিসের কাছেও কেন রোমিও-জুলিয়েটের গোপন বিবাহের কথা প্রকাশ করলেন না? তার বদলে আপনি খুব গোপনে চেতনা-নাশক মদিরা বলে জুলিয়েটের হাতে কেন মরণ-বিষ তুলে দিয়েছিলেন বলবো?

ফাদার : ওটা মরণ-বিষ ছিল না, ওটা মদিরাই ছিল।

কবি : মিথ্যে কথা। ওটা মদিরা ছিল না ওটা মরণ-বিষ-ই ছিল। তা না হলে, কেন আপনি ইঙ্গিতে জুলিয়েটকে মৃত্যুর সঙ্গে মিতালী করবার কথা বলেছিলেন?

ফাদার : কারণ, ওটা একটা মৃত্যুর মতো ব্যাপার ছিল।

কবি : মৃত্যু মতো নয়, ওটা মৃত্যুই ছিল। আপনি জুলিয়েটকে বলেছিলেন — চার্চ থেকে বাড়ি ফিরে গিয়ে বাবা-মাকে প্যারিসের সাথে বিবাহের ব্যাপারে সম্মতি জানানোর কথা। তারপর রাতে একা ঘরে শুয়ে আপনার দেওয়া মদিরার নামে মরণ-বিষ পান করতে বলেছিলেন। কিন্তু কেন বলেছিলেন?

ফাদার : এই সব খামাখা প্রশ্নের কোনো অর্থ হয় না।

কবি : অর্থ হয় ফাদার, হয়। আমি বলছি হয়। আর এই অর্থ প্রকাশ করতেই তো আপনাদেরকে আজ রোমিও-জুলিয়েটের সামনে ডেকে এনেছি।

ফাদার : তার মানে জুলিয়েট, তুমি আমাকে নিজে থেকে ডাকো নি? এই দুষ্ট লোকটার কথা প্ররোচিত হয়ে এখানে ডেকে এনেছো!

কবি : হ্যাঁ ঠিক তাই। কিন্তু এখন আর আমার সামনে আপনার কিছুই করার নেই।

ফাদার : স্যার, আর কত সহ্য করবেন?

শেক্সপিয়র : থামো তুমি।

কবি : ধন্যবাদ। আজ আমার কথা শুনুন।

শেক্সপিয়র : বলো।

কবি : ফাদার ফ্রায়ার, আপনিও শুনুন।

ফাদার : স্যার!

শেক্সপিয়র : ওকে বলতে দাও।

কবি : রোমিও তুমিও শোনো — কেন ওই ফাদার ফ্রায়ার তোমাদের গোপন বিবাহের কথা প্রকাশ না করে দিয়ে জুলিয়েটকে মরণ-বিষ পানে বাধ্য করেছিলেন? সেই কথাটি শোনো। আসলে কী জানো রোমিও, তোমার অবর্তমানে জুলিয়েটকে মেরে ফেলাটা ফাদারের জন্যে খুব জরুরি ছিল। কারণ, উনার সন্দেহ হয়েছিল — জুলিয়েট বেঁচে থাকলে এক সময় প্যারিসের সাথে বিবাহের বিরোধ করে সে তোমাদের বিবাহের কথা প্রকাশ করে দিতে পারে। আর তাই তাই যদি ঘটতো তাহলে তো উনাকে তোমাদের বিবাহের মতো গোপন কর্ম সম্পাদনের অপরাধে ফাদারের পোশাক খুলে গির্জা থেকে ফকিরের মতো বেরিয়ে যেতে হতো। হতো না ফাদার? হতো — অবশ্যই হতো। আর মহাত্মা শেক্সপিয়র, আপনি ওই ফাদারের সম্মান রক্ষার্থে অদ্ভুত এক কৌশলের আশ্রয় নিলেন — ফাদারের দেওয়া মদিরার নামে মরণ-বিষ পানে মৃত জুলিয়েটকে বিয়াল্লিশ ঘণ্টা পর কবর থেকে পুনরায় বাঁচিয়ে তুলেছিলেন এবং দেখালেন অদ্ভুত এক খেলার প্রতিভা। কেননা, এর আগেই জুলিয়েটের কবরের উপর রোমিওকে এনে — আপনি, মহাত্মা শেক্সপিয়র, সেই রোমিওকে মৃত জুলিয়েট দর্শনে বিষপানে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছিলেন। হায় কি অদ্ভুত আপনার খেলার প্রতিভা! না হলে — কেন রোমিও আত্মহত্যা করতেই জুলিয়েট কবর থেকে জেগে ওঠে — আর মৃত রোমিওকে দেখে রোমিওর সঙ্গে আনা ভোতা ছুরিকা হাতে তুলে নিয়ে আপনার বক্ষে বিঁধে আত্মহত্যা করে। বলুন — এত সব হত্যার সবই আত্মহত্যা!…চুপ করে আছেন কেন? বলুন? রোমিও, জুলিয়েট, তোমাদের নাটকীয় জীবনের সবটুকু সত্য জানলে তো?

জুলিয়েট : জেনেছি, আমি সব জেনেছি।

রোমিও : আমিও জেনেছি।

কবি : এখন বলো, এদের প্রতি তোমাদের ঘৃণা হয় না?

জুলিয়েট : আমার আজ খুব কষ্ট হচ্ছে। আজ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি — কেবল সরল বিশ্বাসে কারণে কোনো রকম বিবেচনা না-করেই আমি ফাদার ফ্রায়ারের সব কথা মেনে নিয়ে নিজের জীবনের উপর কী অবিচারই না করেছি।

রোমিও : ভাবতে পারছি না — যে ফাদার তোমাদের দুটি হাতকে এক করেছিলেন সে ফাদারই আমাদের মিলনকে চিরদিনের জন্য অসম্ভব করে দিলেন কীভাবে!

কবি : আমার কথা শেষ…আমি যাচ্ছি।

জুলিয়েট : না যাবেন না। দাঁড়ান একটু।

কবি : কেন জুলিয়েট?

জুলিয়েট : আমাদেরকে আপনি আপনার সঙ্গে নেবেন?

কবি : কেন?

জুলিয়েট : আপনি আমাদের জীবনকে নতুনভাবে চিনিয়েছেন — আমরা এখন থেকে আপনার সঙ্গে থাকতে চাই। আপনি কী আমাদেরকে রাখবেন না আপনার সঙ্গে?

কবি : কেন নয়, জুলিয়েট? অবশ্যই। তোমাদের জীবনের নতুন অর্থ যখন আমার কাছ থেকে পেয়েছো তখন তো তোমাদের আমার সঙ্গেই থাকার কথা।

রোমিও : আমরা আপনার সঙ্গেই থাকছি।

কবি : ইচ্ছে হলে থাকতে পারো।

জুলিয়েট : আমরা থাকছি।

কবি : ঠিক আছে থাকো। এই যে মহাত্মা শেক্সপিয়র, আপনার কাছে আমার সর্বশেষ প্রশ্ন…।

শেক্সপিয়র : বলো।

কবি : আপনি কী স্বীকার করেন, ট্রাজেডির নামে আপনি শুধু শুধু মহৎ প্রেমের হত্যা-আত্মহত্যার প্রহসন রচনা করেছেন? বলুন, এ কথা কি আপনি স্বীকার করেন? বলুন? কথা বলছেন না কেন? তার মানে আমার কথাটা স্বীকার করে নিলেন? ধন্যবাদ। আমি এখনই চলে যাচ্ছি…আপনাদেরকে বিরক্ত করতে আর কোনোদিন ডেকে আনবো না। আপনাদের মঙ্গল হোক।

জুলিয়েট ও রোমিওকে সঙ্গে নিয়ে কবি গ্রেভইয়ার্ডের বাইরে চলে যান। শেক্সপিয়র ও ফাদার ফ্রায়ার কিছুক্ষণ থম ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপর এক চিলতে নিরবতা ভেঙে ফাদার ফ্রায়ার এক সময় বলেন —

ফাদার : মহাত্মা শেক্সপিয়র, আপনি কি খুব বেশি আহত হয়েছেন?

শেক্সপিয়র : না। আমি অন্যকথা ভাবছি —

ফাদার : কী ভাবছেন?

শেক্সপিয়র : সারা পৃথিবীব্যাপী প্রায় চারশ’ বছর ধরে রোমিও এন্ড জুলিয়েট পাঠ এবং মঞ্চায়ণের পরও যে-সত্য কেউ আবিষ্কার করতে পারল না। তা এক্ষণে প্রকাশ পেয়ে গেল! কিন্তু, এই সত্যটা শেষপর্যন্ত যে এইভাবে প্রকাশ পাবে — তা আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি!

ফাদার : এ কী বলছেন!

শেক্সপিয়র : সত্যি বলছি ফাদার, আমার রোমিও-জুলিয়েটের জন্যে এই দুই চোখ বেয়ে জল নেমে আসছে। আজ অনুভব করছি — ওদের প্রেমে আমি অবিচার করেছি।

ফাদার : মহাত্মা শেক্সপিয়র!

শেক্সপিয়র : আজ আমার নিজেকেই এক ট্রাজেডির নায়ক বলে মনে হচ্ছে। আমার শ্রেষ্ঠতম ট্রাজেডি রোমিও এন্ড জুলিয়েটের গূঢ় সত্য প্রকাশমাত্র ওই ট্রাজেডির সব উপাদান ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে — ফাদার। আজ আমি যেন বসে আছি — আমার ট্রাজেডি ভূখণ্ডের বিধ্বস্ত এক ধ্বংস-স্তুপের মাঝে।…

শেক্সপিয়রের এমন কথার মধ্যে আকস্মিকভাবে কবি চলে আসেন এবং উচ্ছ্বাসের সাথে বলেন —

কবি : আমাদের প্রিয় কবি, আপনি সত্যি মহৎ…মহৎ না হলে কি আপনি আপনার ভুল কোনোদিনই স্বীকার করতেন? আজ এই নববিধান রচনার কালে আপনি আপনার দোষ স্বীকার করেছেন বলে — সত্যিকার অর্থেই চিরদিন এই জগৎ-সংসারের মানুষের নতুন নতুন মানুষের কাছে মহান এবং মহাত্মা হয়ে রইবেন।

(এ পর্যায়ে কবি পেছন ফিরে কথা বলতে থাকলে শেক্সপিয়র আর ফাদার তার অগোচরে অদৃশ্য হয়ে যান।)

ধন্যবাদ আপনাকে। আজকের নতুন এই আত্মবোধনের তরে আসুন আপনার পা ছুঁয়ে প্রাচ্যের আদর্শে একটা প্রণাম করি।

(প্রণাম করতে গিয়ে কবি আর শেক্সপিয়রকে পান না। আর তিনি শেক্সপিয়রকে না-পেয়ে অস্থির হয়ে বলেন — )

আরে কোথায় গেলেন আপনি। আপনি আমাকে একটা প্রণামের সুযোগ দিলেন না।…না, এমন তো হতে পারে না…তিনি নিশ্চয় গ্রেভইয়ার্ডের কোথাও লুকিয়ে আছেন।

(হঠাৎ হাসিতে ফেটে পড়ে বলতে থাকেন — ) হা হা হা…কোথায় আর লুকাবেন?…হা হা হা…নিশ্চয় তিনি আবার এই গ্রেভইয়ার্ডের ঘাস-লতা-পাতায় কিংবা এই মাটিতে মিশে গিয়েছেন। হা হা হা…। তবু ভালো, আজ আমি আমার চেতনার রঙে মেলাতে পেরেছি তার প্রিয় ট্রাজেডির গূঢ় সত্য…হা হা হা…আজ আমিও নিশ্চিন্তে এই গ্রেভইয়ার্ডের ঘাস-লতা-পাতায় কিংবা মাটিতে মিশে গিয়েও আনন্দ পাবো। হা হা হা।

সমাপ্ত

রচনাকাল ঢাকা ২০০৪-২০০৭

saymonzakaria@gmail.com

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইমন জাকারিয়া — অক্টোবর ৩০, ২০১০ @ ২:১৮ অপরাহ্ন

      বহুদিন পর হঠাৎ লক্ষ্য করলাম- আমার প্রিয় নাটকটি নিয়ে সপ্তর্ষি বিশ্বাস একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেছেন… ভালো লাগলো… এর আগে আর্টস-এ প্রকাশিত এই লেখাটি নিয়ে কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া করেননি… কিন্তু আমার ই-মেলে নাটকটি নিয়ে অনেকই প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন, যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তবে, সপ্তর্ষি বিশ্বাসকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আর্টস-এ তার মন্তব্য পোস্ট করার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেলসন প্রতীক — এপ্রিল ১২, ২০১৭ @ ১০:৫১ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ আপনার লেখাটির জন্য।
      পরবর্তী লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com