পিতলের প্রজাপতি ও অন্যান্য

প্রদীপ কর | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১০:২৬ অপরাহ্ন

border=0“রবীন্দ্রনাথ, তার বজরায় করে গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে যেতে যেতে নৌকোর জানালা দিয়ে তীরবর্তী জীবনধারা দেখেছেন। এই জানালা যেমন কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে, তেমনি কাজ করেছে ছাঁকনি হিসেবেও। জানালার ভিতর দিয়ে যতটুকু দেখা যায়, কেবল ততটুকুই তাঁর দৃষ্টি কেড়েছে, আর তার রূপরেখা নির্ধারিত করে দিয়েছে ঐ জানালার সীমানা।”

রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্পের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক হুমায়ুন কবির উপর্যুক্ত কথাগুলি বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের দেখা এবং ছোটগল্প রচনায় কবির অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ছোটোগল্পগুলিকে চিরন্তন সাহিত্যে উত্তীর্ণ করেছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ বদলেছে। বদলেছে সামাজিক বোধ, নীতি নৈতিকতাও। একই সঙ্গে বদলেছে সাহিত্যের ভাষা বিষয় আঙ্গিকও।

কবি মাহী ফ্লোরা-র ছোটগল্পের বই ‘পিতলের প্রজাপতি’ পড়তে গিয়ে এসব কথা মনে এলো। কবির গদ্য পড়তে গিয়ে একধরণের কাব্যিক আচ্ছন্নতা তৈরি হয়, এ বই অবশ্য সেরকম নয়। পনেরটি গল্পের এই সংকলনে আপাত কবিকৃতি নেই, তবে প্রচ্ছন্নে কবির দর্শন প্রবাহিত। একেবারে হৃদয়সংবেদী পাঠকের মর্মমূলে টান দেয়।

বইটির নামকরণ বেশ আশ্চর্যের, ‘পিতলের প্রজাপতি’। প্রজাপতি বলতেই মনের ভেতর যে রঙিন ওড়াউড়ি শুরু হয়, তা ক্ষণেকেই স্তব্ধ হয়ে যাবে, যদি, ‘প্রজাপতি’ শব্দটির আগে ‘পিতলের’ মতো একটি ধাতব শব্দ সংযুক্ত হয়। নামকরণেই বইটির চরিত্র কিছুটা প্রকাশিত। মুগ্ধতাবোধের সঙ্গে কাঠিন্যের ঠোকাঠুকি… কঠোর কোমলের সংঘর্ষ!

প্রচ্ছদ নামাঙ্কিত গল্পটিতে এক আশ্চর্য মায়ার খেলা সৃজিত। এক অভিমানী সংবেদনশীল নিঃসঙ্গ নারীর আখ্যান। কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়ী নাম্নী এক শিল্পীর অভিমান রাগ ভালোবাসা সঙ্গহীনতা তার অতীত বর্তমানের ক্যানভাসে চিত্রিত। অতৃপ্তির ভাঙাচোরা এক জীবন। সে নিজেই সঠিক জানেনা সে আসলে কী চায়! এই-ই বোধয় সমসময়ের যুগযন্ত্রণা। তার বর্তমান স্বামী যতবার যত্ন œ নিয়ে উচ্চারণ করে “জয়ী তুমি ভালো আছো তো?” ততবারই আমরা নিশ্চিত হই সে আসলে ভালো নেই। সে পরাজিত তার আকাঙ্খার কাছেই। গল্পটি নির্মাণে যথেষ্ট মুন্সীয়ানার পরিচয় পাই। এত সংকেতবাহী চিত্ররূপময় বিন্যাস গল্পটিকে পরিণত করে তোলে।

গল্পটিতে ঘুরে ফিরে জয়ীর যে অসুখের কথা বলা হয়েছে, চিকিৎসাশাস্ত্রে তার কোনো নির্দিষ্ট নাম থাকলেও পাঠকের মনে হবে তার অতৃপ্ত মনের অবশিষ্ট কোনো বাসনা এগল্পে মিলে মিশে আছে।

পরের গল্প ‘ভাঙা পেন্সিল’, প্রাথমিকভাবে, গল্পের বিষয়ের সঙ্গে এই নামকরণ প্রক্ষিপ্ত মনে হলেও একেবারে গল্পের শেষে পাই, “এখন পেন্সিলের ভাঙা অংশটা দিয়ে কেউ ইতিহাস হয়, কেউ খেলনা। মৃত্যু তো ভাঙা পেন্সিল।” একজন মৃত ব্যক্তিকে ঘিরে তার এবং তার পরিবারের মরণোত্তর দৃশ্যের কোলাজ। সাতটি পর্বে বিন্যস্ত অংশগুলিকে সপ্তম আশ্চর্যের মতোই লাগে। তবু তা মৃতের চারিপাশে। এভাবেই মৃত ব্যক্তির পরিবার শোক কাটিয়ে উৎসবের দিকে জীবন বইয়ে দেয়। বিষয়কে বিন্যস্ত করার, মৃত্যুকে ঘিরে জীবনের ঘটনাগুলিকে সাজানোর ক্ষেত্রে গল্পকার বেশ সুকৌশলী। শুধু “সময় নিজের মতো করে বর্তমান রচনা করে”ধরণের গত শতকীয় বাক্যরচনা মাঝে মাঝে বিসদৃশ লাগে।

গ্রাম শহরের মধ্যবর্তী এক পরিবারের গল্প ‘এক ঝলক আলো’ ’। বাংলাসাহিত্যে এই বিষয় এবং জীবন বহু ব্যবহৃত। আলাদা করে আলোর বিকিরণ কিছু পেলাম না, যা, এই বদলে যাওয়া সময়ের দলিল হতে পারতো।

সালাউদ্দীন সাহেব তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সকল সময় তার মৃত দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভুলতে পারছেন না। ছোটো বেলায় বিয়ে করা প্রথম স্ত্রী সংসার শুরুর আগেই হুট করে মারা গেছেন; তাকে ভুলতে পেরেছেন। কিন্তু এই দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভুলতে ‘‘ছেলে মেয়েদের বিয়ে দেবার বয়সে’ তিনি তৃতীয় বিয়ে করলেন- এই হচ্ছে ‘এজীবন ফড়িংয়ের’ বিষয়। বিষয় তেমন অভিনব নয়। ‘পিতলের প্রজাপতি’ গল্পে গল্পকার যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এই গল্পে যথেষ্ঠ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তার সঠিক প্রয়োগ করতে পারেননি। একটি দীর্ঘশ্বাস এই গল্পের বিষয়। তাকে নির্মাণে বিনির্মাণে আরও আধুনিক করে তোলার ক্ষমতা গল্পকারের আছে বলেই এই সাধারণ সৃষ্টিকে মেনে নিতে কষ্ট হয়।

পিতলের প্রজাপতি । মাহী ফ্লোরা । একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭ । প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
দেশ পাবলিকেশন্স । মূল্য:১৬০টাকা
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ @ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন

      ভালো রিভিউ। অভিনন্দন লেখক ও কবি,কথাশিল্পী ফ্লোরাকে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com