আমি অন্যদের কাছে নিজের দেশকে ব্যাখ্যা করার জন্য বই লিখি না

মুহিত হাসান | ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১:৩২ অপরাহ্ন


ওরহান পামুক
ভাষান্তর : মুহিত হাসান

OrhanPamukতুরস্কের নোবেলজয়ী কথাশিল্পী ওরহান পামুকের ইংরেজিতে অনূদিত হওয়া নতুন উপন্যাস দি রেড হেয়ারড ওম্যান বা লালচুলো মহিলা প্রকাশ পেলো সম্প্রতি, বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউজ থেকে। তুর্কি ভাষায় লিখিত মূল উপন্যাসটি প্রকাশ পেয়েছিল ২০১৬ সালে। এ বছর একিন ওকলাপের করা এর ইংরেজি অনুবাদ হাতে পাচ্ছেন দুনিয়াজোড়া পামুকের পাঠকেরা। উল্লেখ্য, দি রেড হেয়ারড ওম্যান উপন্যাসটির দক্ষিণ এশীয় সংস্করণও দিল্লিতে অবস্থিত পেঙ্গুইনের ভারতীয় শাখা প্রকাশ করেছে।
উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ পাওয়া উপলক্ষ্যে দি স্টেট-এর তরফ থেকে সাংবাদিক আইজ্যাক সটিনার টেলিফোনে ওরহান পামুকের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন। যদিও সাক্ষাৎকারটি কেবলমাত্র ওই উপন্যাসের প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সটিনার যখন পামুকের সাথে কথা বলছিলেন, তখন তিনি ইস্তাম্বুল থেকে এক ঘন্টা দূরত্বের একটি দ্বীপে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপন করছেন। যেখানে কিনা তাঁর দিন মূলত কাটছে লেখালেখি করে ও সাঁতার কেটে।

আইজ্যাক সটিনার : একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে আপনি দিনে দশ ঘন্টা কাজ করেন। এখনও কি তাই?
ওরহান পামুক : হ্যাঁ, আমি কাজ করতে ভালোবাসি। আমি ফিকশন লেখাটাকে কাজ হিসেবে দেখি না কারণ তখন নিজেকে আমার সব সময় খেলনা নিয়ে খেলতে থাকা এক বালক বলে মনে হয়।
সটিনার: ননফিকশন লেখা কি আপনার কাছে ‘কাজ’ হিসেবে গণ্য?
পামুক : না, আমি তো এখন ফিকশন লিখছি। বেশিরভাগ সময় আমার মন নতুন কিছু তৈরিতে ব্যস্ত থাকে, বাস্তবতাকে ননফিকশনে তুলে আনার বদলে।
সটিনার : সে বুঝলাম, কিন্তু ননফিকশন লেখাটাকে ‘কাজ’ বলে অনুভব করেন কি?
পামুক : ওটা অনেকটা সাংবাদিকতার অনুভূতি দেয়। এই বয়সে এসে এখন নিজে যা লিখতে চাইÑ কেবল তা-ই লিখছি। এবং এর মধ্যে আমি সবসময় খেলাধুলা, আবিষ্কার ও আমোদের আমেজ পাই। আমি নিঃসন্দেহে একজন সুখী লেখক।
সটিনার : যখন আপনি লেখা শুরু করেন, তখনকার থেকে আপনার এই দশম উপন্যাসটি লেখার প্রক্রিয়াকে কীভাবে আলাদা করবেন?
পামুক : গোড়ায়, যখন আমি চল্লিশ বছর আগে লেখালেখি শুরু করিÑ তখন আমি আরো বেশি মহাকাব্যিক, আরো চিত্রময়, এবং হয়তো অধিক নিরীক্ষাপ্রবণও ছিলাম। কিন্তু এইবারে আমি অধিবিদ্যা ও দর্শনে পূর্ণ একটা ছোট্ট উপন্যাস লিখতে চেয়েছি। আমি এখানে এক ঝানু কুয়াখননকারী ও তাঁর শিক্ষানবিস সহকারীদের নিয়ে পুরোপুরি বাস্তবানুগ একটা গল্প বলেছি। ১৯৮৮-এর গ্রীষ্মকালে আমার আবাসস্থলের পাশের জমিতেই এঁদের আমি দেখেছিলাম। জায়গাটা ছিল একটা দ্বীপ-শহর, সেখানে আমি বই লেখার কাজ করছিলাম। তাঁরা ছিলেন শেষতম সেকেলে ঘরানার কুয়াখননকারী, এবং তখনও ইস্তাম্বুলের প্রান্তীয় অংশে তাঁদের ব্যবসা টিকে ছিল। কেননা সেসব এলাকায় জলের সরকারি সরবরাহ অপ্রতুল ছিল, বিশেষত সত্তর ও আশির দশকে। সবাইকে নিজের জমিতে একটা করে কুয়া খুঁড়ে জল পেতে হতো। একটা কুয়া খোঁড়ার সময় এক দক্ষ প্রবীণ খননকারী পিতা ও তাঁর কিশোর শাগরেদ পুত্রের মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্ক আমি পর্যবেক্ষণ করতাম। বৃদ্ধ গুরুটি বালকটিকে কাজ শেখাতেন আর রেগে খেঁকিয়ে উঠতেনÑ আবার অত্যন্ত স্নেহের সাথে তাঁকে আগলে রাখতেন, তাঁর যত্ন নিতেন। প্রতিদিন রাতে যখন আমি শহরের কেন্দ্রস্থলে যেতাম, প্রত্যেকবারই এই দৃশ্য দেখতে পাই। তাঁদের সম্পর্কটা আমাকে নাড়া দিয়েছিল। এর নেপথ্য কারণ হয়তো এই, আমাকে এমন একজন বাবা বড় করে তুলেছিলেন, যিনি কিনা প্রায়শই আমার খুব নিকটে থাকতেন না কিংবা কখনও আমাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও করতেন না। আদতে, বাবা আমার সম্পর্কে খুব বেশি জানতেনও না তিনি এমনটাই ছিলেন।
সটিনার : আপনার বাবা কি এখনও বেঁচে? নাকি মারা গেছেন?
পামুক : না, তিনি মারা গেছেন।
সটিনার : কবে?
পামুক : বারো বছর আগে।
সটিনার : তিনি কি আপনার ফিকশনগুলো কখনও পড়েছেন?
পামুক : হ্যাঁ, তিনি আমাকে দারুণভাবে সমর্থন জোগাতেন। বাবার সুটকেস নিয়ে আমার নোবেল বক্তৃতাটা লিখেছিলাম। তিনিও কবি হতে চাইতেন। কবিতা লিখতেনও। এতে খুব একটা সফল হননি, তবে তিনি সাফল্যের পেছনে মোটেও ছুটতেন না। যাহোক, মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে তাঁর লেখালেখির একটা সংগ্রহ দিয়ে যান, এবং পরে আমি তা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখি। যেটা কিনা এক কাব্যগন্ধী প্রবন্ধও বটে।
সটিনার : যখন জানতে পারলেন তিনি প্রথমবারের মতো আপনার কোনো লেখা পড়েছেন, সেই মুহূর্তের অনুভূতির কথা মনে পড়ে?
পামুক : তিনি খুবই দয়ালু, শ্রদ্ধেয় মানুষ ছিলেন। এই ব্যাপারটা আমাকে অবাক করেছিল যে তিনি আমার সমালোচনা করেননি। বরং আমাকে অভিনন্দিত করেছিলেন। আমার ভাইদের সাথেও তিনি একই আচরণ করতেন। যেন আমরা খুব প্রতিভাবান মানুষ ছিলাম। বাবার সাথে আমার সম্পর্কই রেড হেয়ারড ওম্যান উপন্যাসের মূল সুরটা বেঁধে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, এই উপন্যাসটি আবেগের ও ব্যক্তিগত দিক থেকে সফোক্লিসের ইডিপাস রেক্স-এর সাথে তুলনাযোগ্যÑ যা কিনা পুত্রের হাতে পিতার হনন বিষয়ে রচিত। আবার তুলনাযোগ্য ফেরদৌসির শাহনামা অর্থাৎ সোহরাব আর রুস্তমের কাহিনির সাথেও, যা কিনা ইডিপাস-এর কাউন্টারপার্টও বটে, কারণ সেখানে পিতার হাতে পুত্রের খুন হবার গল্প বলা হয়েছে। এ হলো সন্তান-হনন।
আপনি জানেন যে প্রতি বছরই, আমি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিস্টার পড়াই। পড়াই সফোক্লিস, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, শেক্সপিয়র। চিরায়ত সাহিত্য সম্পর্কে পাঠদানের ক্ষেত্রে কলাম্বিয়ার সুনাম রয়েছে। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, “প্রাচ্যের চিরায়ত সাহিত্য সম্পর্কে কী করা হবে? ইডিপাস-এর সাথে আরেকটি রচনার তুলনা করার বেলায়?” আমাদের ঝোঁকটা থাকে ইডিপাসকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে যুক্ত করার দিকে, কারণ সে নিজের পিতাকে খুন করেছিল। তাঁকে এখনও শ্রদ্ধেয় মনে করা হয়। আবার আমরা সন্তানহননকারী রুস্তমকে যুক্ত করতে চাই স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে। কেন? কারণ সোহরাব-রুস্তমের কাহিনির পুরোটা জুড়েই পিতার হাতে পুত্রের খুন হওয়াটাকে নায্য হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। আমার ধারণা, আমরাÑআধুনিকরা, যেভাবে সফোক্লিসের ইডিপাস পড়ি তাতে মনে হয় যে সেখানে পুত্রের দ্বারা পিতার খুন হওয়াটকে তুলনামূলকভাবে কম নায্যতা দেওয়া হয়েছে। তাই আমরা ইডিপাসকে সম্মান জানাই, তাঁর যন্ত্রণাকে সহানুভূতিসমেত অনুধাবন করতে পারি। যখন আমরা তাঁকে বুঝতে পারি, তখন আমরা তাঁর পাপকেও মর্যাদা দিই। তো, আমি এই বিষয়গুলো নিয়েই লিখতে চেয়েছি পিতা-পুত্রদের নিয়ে পিতাদের হীনতা, পুত্রদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নিয়ে।
সটিনার : আপনার লেখালেখিকে সচেতনভাবে কতটা এ হিসেবে দেখেন, আমি বলতে চাইছি না যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যেকার একটি অনিবার্য সেতুবন্ধন…কিন্তু…
পামুক : আপনার প্রশ্নটা আমি ধরতে পেরেছি।
সটিনার : ঠিক আছে।
পামুক : আমি এ বিষয়ে আত্মসচেতন হতে চাই না। আমার বইগুলো যখন মধ্য-নব্বই ও বিশেষত একবিংশ শতকের গোড়ায় আন্তর্জাতিক মহলে অনুবাদের মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে, তখন সবাই আমাকে বলতে শুরু করলো “ওহ, এ তো পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যেকার এক সেতু”। আমি এটা পছন্দ করিনি। কেন? কারণ, আমি অন্যদের কাছে নিজের দেশকে ব্যাখ্যা করার জন্য বই লিখি না। আমি লিখি(হয়তো সাধাসিধা ভাব দেখিয়ে আমি ছলনা করছি) আরো গভীর সব কারণে।
একইভাবে আমি ‘ইস্তাম্বুলের লেখক’ হয়ে উঠেছি, এমন কথাও শুনেছি। এটা ঠিক যে আমি ইস্তাম্বুল বিষয়ে লিখেছি। জীবনের পুরোটা জুড়েই আমি ইস্তাম্বুলে বাস করেছি। আমার বয়স পঁয়ষট্টি, আর এই পঁয়ষট্টি বছর ধরেই আমি এই শহরে রয়েছি। কাজেই এটা অনিবার্য যে আমার গল্পগুলো ইস্তাম্বুল সম্পর্কেই হবে। কিন্তু এ তো কোনো স্ব-আরোপিত কান্ড নয়। “আহ, আমাকে যে ‘ইস্তাম্বুলের লেখক’ হতেই হবে” এমনটা ঘটেনি। আমি আমার চেনাজানা মানুষদের নিয়ে লিখেছি, অন্যসব লেখকদের মতোই। তবে হ্যাঁ, আমি মানবিক বিষয়াদি নিয়ে লিখতে চেয়েছি, আর মানবিক বিষয়াদির সম্মুখীন হয়েছি ইস্তাম্বুলেই, সেই অর্থে পরোক্ষভাবে আমি একজন ইস্তাম্বুলের লেখক। একবিংশ শতকের গোড়ায় আমি খেয়াল করি যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমালোচকরা আমাকে একটি ‘সেতু’ হিসেবে অভিহিত করছেন। বিষয়টা আমি এড়িয়ে যাই। তারপর বলা শুরু হলো ইস্তাম্বুলের লেখক। তা হওয়াও আমার উদ্দেশ্য নয় দেখে পুনরায় এড়িয়ে গেলাম। তবে এসব ঘটনা থেকে আমি শিক্ষা পেয়েছি। একটা সেতু হতে গেলে, নিজের স্বভূমিকে বাকি বিশ্বের কাছে তুলে ধরার কাজটা করতে হয়। যাহোক, আমি তো শুধু গল্প লিখছি। আমার লক্ষ্য হলো একটা সেতু হিসেবে গণ্য না হওয়া।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com