মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সমস্যা ও সম্ভাবনা

আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনি | ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ৭:৪৩ অপরাহ্ন

KSA-MFS-Bookepsনতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন প্রযুক্তির নবতর উৎকর্ষ আজ বিশ্বকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। সরকার এই নতুন প্রযুক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেশব্যাপী তার বড় পরিসরের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবর্তন দৃশ্যমান। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক আজ দেশের সকল প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে। আর এটিই সুযোগ সৃষ্টি করেছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মত সেবা অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার।
দেশের বেশীরভাগ মানুষকে উন্নয়ন কর্মকান্ডের বাইরে রেখে, দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়ন দর্শনের আলোকে, এটি মোটেও নতুন কোন কথা নয়। তবে সাম্প্রতিককালে উন্নয়ন দর্শনে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কথা বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বেশ জোরেসোরেই আলোচিত হচ্ছে। এসডিজিতে (২০১৫-২০৩০) আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে স্বাধীনতাপরবর্তী এই অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রথম উদ্যোগ ছিল ক্ষুদ্র ঋণ। আর স্বাধীনতার প্রায় চল্লিশ বছর পর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হলো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস)। আর এই সেবা খাতটি গড়ে উঠেছে সরকারের নীতি-সহায়ক অবস্থানের কারণে। প্রথমত ১৯৯৬ সালে এ সরকারের নীতি সহায়তার কারণে গ্রামীণ ফোনের লাইসেন্সের অনুমোদন দেয়। যার ফলে গরীব মানুষের মোবাইল ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়ত: ২০০৮ সালে দ্বিতীয় বারের মত ক্ষমতায় আসার পর তারা ডিজিটাল রূপকল্প ২০২১ গ্রহণ করে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নীতির কারণে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এই সাফল্য।

বর্তমান সরকারের সর্বক্ষেত্রে ডিজিটাল বাংলাদেশের নীতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিনিষেধের সমন্বয়ের ফলে বড় ধরনের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে। দেশের মোবাইল টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তার ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) উন্নতি, বর্তমানে দেশের মাইক্রো-অর্থনীতিসহ মূলধারার অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে অনিবার্য অংশে পরিণত হয়েছে। সময়ের কথা বিবেচনা করলে এমএফএসের অগ্রগতি অতীতের যেকোন আর্থিক ব্যবস্থার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। এমএফএসের বর্তমান বয়স ৬ বছর। আর এ অল্পসময়ে গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটির বেশী। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণের বয়স প্রায় ৩ দশকের বেশী আর গ্রাহক সংখ্যা ২ কোটি। অর্থাৎ ঋুদ্রঋণের তুলনায় এক পঞ্চমাংশ সময়ে প্রায় দ্বিগুন বেশী মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। অবশ্য ঋুদ্রঋণ সংস্থার আর্থিক সেবা এমএফএসের বর্তমান আর্থিক সেবার চেয়ে অপেক্ষাকৃত জটিল ও ব্যাপক। তবে এমএফএস মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় পরিণত হলে এর কর্মপরিধি আরো অনেকগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইন, নীতি কাঠামো, নিরাপত্তা বিধান ইত্যাদি পূর্বশর্ত গ্রহণ করতে হবে।
এমন প্রেক্ষাপটে খন্দকার সাখাওয়াত আলী রচিত বাংলাদেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সাফল্য, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: নীতি পর্যালোচনা ও কতিপয় সুপারিশ গ্রন্থটিকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বইয়ে সর্বমোট ৬টি অধ্যায় রয়েছে। গ্রন্থটিতে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সাহসী নীতিনির্ধারণী প্রস্তাবনা রয়েছে যা পাঠককে খন্দকার সাখাওয়াত আলীর নির্মোহ গবেষণা ও সুস্পষ্ট সাহসী অবস্থানকে প্রমাণ করে। আর এ কারণেই বইটির মুখবন্ধ লিখতে গিয়ে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, গ্রন্থের লেখক খন্দকার সাখাওয়াত আলী সম্পর্কে লিখেছেন: “সাখাওয়াত গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক, আমার অনুজপ্রতিম। পেশাগত নিরপেক্ষতা রক্ষার ব্যাপারে তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা আমি দীর্ঘদিন ধরে জানি। নীতি আলোচনায় তাঁর চিন্তার স্বচ্ছতা ও স্পষ্ট অবস্থান আমাকে উৎসাহিত ও আশাবাদী করে।” লেখক সম্পর্কে এমন মন্তব্য যেকোন পাঠককে বইটি সম্পর্কে আগ্রহী করার জন্য যথেষ্ট।
বইটি নীতিনির্ধারকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, নীতি নির্ধারণী বিষয় আলোচনার আগে লেখক এমএফএসের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর ইতিহাস ও এর বিবতর্নের ধারাটি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। কারণ এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় এটাই প্রথম প্রকাশিত বই। এর সঙ্গে এই খাতের ভবিষ্যত উন্নয়নের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা প্রণয়ণের সুফল ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) আর্থিক লেনদেনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো এর মাধ্যমে দ্রুত ও সহজতরভাবে অর্থ লেনদেন করা যায়। এই সুবিধা দেশের প্রায় সর্বত্র গ্রাহকের ঘরের দোড় গোড়ায় পৌঁছে গেছে। এমএফএসের কার্যকারিতার ফলে গ্রাহকের কাছে তা আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশে প্রথম এমএফএস শুরু করে ট্রাস্ট ব্যাংক। এরপর ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংক একাউন্ট নামে প্রথমে ও পরে তার নতুন নামকরণ করা হয়, রকেট হিসেবে। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিকাশ, বর্তমানে সর্বাধিক গ্রাহক নিয়ে এমএফএস খাতে শীর্ষে অবস্থান করছে। এমএফএস খাতে চারটি স্টোকহোল্ডার বা পক্ষ রয়েছে: (১) এমএনও বা মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক অপারেটর (এমএনও), (২) বাণিজ্যিক ব্যাংক ও এর ব্যাংকের সাবসিডিয়ারী এমএফএস প্রতিষ্ঠান, (৩) বাংলাদেশ ব্যাংক তথা সরকার এবং (৪) সাধারণ এমএফএস গ্রাহক। বাংলাদেশে এমএফএসের সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন: বিকাশ, রকেট ইত্যাদি বিশ্বের অন্যান্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলক কম দামে সেবা প্রদান করছে। ২০০৯ সালে দেশে এখাতে ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। বাজারের নিয়মে (Market rules) যারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আছে– তাদের কাছ থেকে অন্যরা শিখছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বময় এই ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার ঘটেছে। কেনিয়ায় ‘এমপেসা’ নামে বাংলাদেশের মতো এক স্থান থেকে অন্যস্থানে গ্রাহক পর্যায়ে অর্থলেনদেন করা যাচ্ছে। এমএফএস ব্যবস্থা, সেখানে ১ লক্ষ ৯৪ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। মেক্সিকোতেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান হচ্ছে, এই ব্যবস্থার আওতায়, প্রায় ৯০ লক্ষ দরিদ্র গ্রাহককে অন্তর্ভুক্ত করা গেছে। ভারতেও বড় আকারে ডিজিটাল প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে, ইতোমধ্যেই যা ১০০ কোটির বেশী মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ বছরের জানুয়ারিতে ভারতের কেন্দ্রিয় ব্যাংক পেটিএম কোম্পানীকে এমএফএস পর্যায়ের কাজ শুরুর অনুমতি প্রদান করেছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। সে জন্যই কতগুলো অবারিত সম্ভাবনার খাত যেমন সৃষ্টি হয়েছে; পাশাপাশি এই খাতের স্থায়িত্ব ও মানুষের আস্থা অর্জনের উদ্দেশ্যে কতগুলো নীতিগত পরিবর্তন আবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে। খন্দকার সাখাওয়াত আলী বর্তমান নীতির সুফল ও সীমাবদ্ধতাগুলো যেমন সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন, তেমনি এ খাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নীতির কিছুটা পরিবর্তন ও নতুন নীতি-নির্ধারণ করলে এ খাত যে ক্রমেই আরও অধিক সংখ্যক মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হবে-তার পথ নির্দেশনা দিয়েছেন।
বইটিতে লেখক তিনটি সাহসী সিদ্ধান্তের সুপারিশ করেছে। সে সিদ্ধান্তগুলোর মূল লক্ষ্য অবশ্যই, দেশের ও গ্রাহকদের স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে। লক্ষণীয় যে, গবেষক হওয়ার কারণে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর যুক্তি তুলে ধরার মাধ্যমে প্রস্তাবণা বা সিদ্ধান্তসমূহ নীতি নির্ধারকদের প্রতি তুলে ধরছেন। প্রকাশ্যে কোন ধরনের উচ্চ স্তর নেই সত্য, যা আছে তা হলো ঝজু ও সাহসী অবস্থান। পুঁজির কেন্দ্রিভবনের বিষয়টি সামনে এনে তিনি আমাদের মোবাইল ফোন কোম্পানী ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের রাজনৈতিক অর্থনীতির দিকটির প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন। এদের প্রথম পক্ষটি হচ্ছে টেলিনরসহ (গ্রামীণ ফোন) মোবাইল ফোন কোম্পানীগুলো, আর দ্বিতীয় পক্ষটি হলো আমাদের দেশীয় করপোরেট এনজিওসমূহ (ব্র্যাক ও গ্রামীণ ব্যাংক, যদিও আইনী কাঠামোর বিচারে এনজিও নয়। তবে এরা উভয়ই দারিদ্র্য ব্যবসায় পারঙ্গম তা বলাই বাহুল্য)। এই দুই পক্ষের বাইরে, এমএফএস খাতের সম্ভাবনার স্বার্থে লেখক পক্ষ নিয়েছেন, দেশের ও গ্রাহক স্বার্থের পক্ষে। নীতি-নির্ধারক ও পাঠকদের সুবিধার্থে তাঁর প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো;
(১) বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে এমএফএস গাইড লাইন অনুসারে উদ্যোক্তা, এজেন্ট ও গ্রাহকদের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এমএনও ভূমিকার বিষয়টি নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কথা বলেছেন, মালিকানার ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অপারেটরদের অংশীদার করা সমীচীন হবে না কেননা এতে এ খাতে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ রক্ষার জন্য গ্রাহকদের সমিতি বা সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখে সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
(২) এমএফএস খাতের মোবাইল সংক্রান্ত প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণে মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের কাঠামো কেন্দ্রিয় ব্যাংক নির্ধারণ করে দেয়। এখানে মোবাইল ফোনের কোম্পানীগুলোর মালিকানার পরিবর্তে আয়ের অংশীদারের ভিত্তিতে চলার কথা বলা হয়েছে। উল্লিখিত দু’টো মৌলিক সিদ্ধান্তের কোন হেরফের না করে এ নীতিমালাকে সময়োপযোগী ও পরিমার্জন করা যেতে পারে।
(৩) রাষ্ট্রে ও জনগণের স্বার্থে কোন একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে যেন পুঁজির ঘনীভবন না হয় – যাতে করে প্রতিযোগিতা বাঁধাগ্রস্থ না হয় সেদিকে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বাজারের অন্যান্য শক্তিগুলোর উন্নয়নেও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি রাখা জরুরি। প্রান্তিক মানুষের স্বার্থকে কেন্দ্রিয় বিবেচনায় রাখাই তাই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মূল কথা, সে কথাটি নীতি-নির্ধারকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমএফএস খাতের মূল দর্শন যেহেতু প্রান্তিক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা তাই এটি যেন কেন্দ্রিয় ব্যাংকের কেন্দ্রীয় নীতি থেকে ছিটকে না পড়ে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্য লেখক তিনটি প্রস্তাবনা তুলে ধরছেন, যা নিম্নরূপ;
প্রথমত, এমএফএসের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে পেমেন্ট ব্যাংক এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভালো সমাধান। বর্তমানে এমএফএস লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংকসমূহের মধ্যে যারা ইতিমধ্যে ভালো করেছে তাদেরই কেবল এই লাইসেন্স বা অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এমএফএসে সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে কোন বিশেষ গোষ্ঠীর পুঁজি কেন্দ্রভবন দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের পথ দ্রুততর করার লক্ষ্যে এমএফএসের গাইডলাইন চুড়ান্ত করা জরুরি। সফল এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশীয় মালিকানা নিশ্চিত করা জন্য, ব্যাংকের জন্য দেশীয় পুঁজিবাজারে ৫০ ভাগ শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার বিধান রাখা, ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে এদের আসার সুযোগ তৈরি করা, যাতে সাধারণ মানুষ ক্রমান্বয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারহোল্ডার হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, আর্থিক অন্তর্ভূক্তির এমন একটি সফল ও সম্ভাবনাময় খাতকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের লক্ষ্যে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দিকনির্দেশনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সুদৃষ্টির দাবি রাখে। গ্রাহকের সংখ্যা, আকার, গরিব মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ সাইবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কেবল মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর নয়, বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের এই খাতের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকা বিশেষভাবে জরুরি।
পরিশেষে বলি, খন্দকার সাখাওয়াত আলীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় – তাঁর সম্পাদিত “আন্তোনিও গ্রামসি: জীবন সংগ্রাম ও তত্ত্ব” গ্রন্থের মাধ্যমে। গ্রামসির সাথে তিনিই প্রথম একটি তরুণ প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যেখানে আমরা তাঁকে পাই একজন নিবিষ্ট মার্কসবাদী ও গ্রামসির অনুরক্ত হিসেবে। যিনি নিজেও তখন বয়সে তরুণ। গোড়া থেকেই মোটেও উচ্চ স্তরের ব্যক্তি নন, তবে ঋজু তার বিশ্বাস-আস্থা-ইচ্ছাশক্তি আর ভালোবাসায় এবং স্থির মানবিক সৃজনশীলতায় আর কর্মযজ্ঞে। যেখানে তিনি তাত্ত্বিক ও জ্ঞান ঘনিষ্ট। তবে প্রকাশে সরল, আন্তরিক ও মননশীলতায় গভীর। দূর থেকে মানুষটা তার গ্রামসি বিষয়ক বইয়ের মাধ্যমে আমাকে আকৃষ্ট করেছিলেন।
বর্তমান গ্রন্থটি নিতান্তই আপাত দৃষ্টিতে একটি প্রযুক্তিনির্ভর টেকনিক্যাল বই। কিন্তু বই শুরু করার পর, সে ধারণাটির পরিবর্তন হতে থাকে। অন্তত আমার কাছে। বইটি ক্রমশই এমএফএস খাতের রাজনৈতিক-অর্থনীতির অন্দরমহলের একটি চিত্র তুলে ধরে। সবটা সরাসরি না বললে ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। বিশেষত এই খাতের প্রধান চরিত্রগুলো দৃশ্যমান।
দেশে বিকাশমান এই খাতটির উপর নীতি-নির্ধারক ও সাধারণের দৃষ্টি আর্কষণের জন্য লেখককে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ। এমএফএস-খাতের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের এই বইয়ের মূল প্রস্তাবনাগুলো নীতি প্রণয়নে কাজে লাগাবেন। অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে, নীতি-নির্ধারকদের জন্য এখন একটি গ্রন্থ বাংলায় লেখার জন্য, লেখকের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা। একজন সমাজতাত্ত্বিক ও গবেষক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও সমাজের নানাখাতে ও বিষয়ের প্রতি লেখক তাঁর দৃষ্টি রাখবেন, এমনটি তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশা। সে সাথে নীতি নির্ধারকদের প্রতি প্রত্যাশা – বইটি তাঁরা পড়বেন এবং নীতি নির্ধারনী সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগাবেন।

বাংলাদেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সাফল্য, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: নীতি পর্যালোচনা ও কতিপয় সুপারিশ
খন্দকার সাখাওয়াত আলী, রিভার সাইড প্রেস, ঢাকা, ২০১৭।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭ @ ১১:৫৫ পূর্বাহ্ন

      ‍‍‍”গ্রাহকের সংখ্যা, আকার, গরিব মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ সাইবার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কেবল মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর নয়, বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের এই খাতের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকা বিশেষভাবে জরুরি”

      বাংলাদেশের মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সাফল্য, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: নীতি পর্যালোচনা ও কতিপয় সুপারিশ- বইয়ের আলোচনা ভাল লেগেছে। শুভেচ্ছা বইটির লেখক খন্দকার সাখাওয়াত আলীকে এবং বইয়ের আলোচক জনাব আহমেদ জাভেদ চৌধুরী রনিকে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com