কুমার চক্রবর্তীর প্রবন্ধ: প্রেমের স্বর্গ নরক

কুমার চক্রবর্তী | ৩১ আগস্ট ২০১৭ ১:১০ অপরাহ্ন

rene magritteপ্রেম: যেন নিষিদ্ধ দরজার উন্মোচন,
সেই প্রস্থানপথ
যা আমাদের পৌঁছে দেয় সময়ের অন্য পারে।
মুহূর্তটি: মৃত্যুর বিপ্রতীপতা,
আমাদের ভঙ্গুর শাশ্বততা।
ভালোবাসা মানে সময়ের গভীরে আত্মকে হারিয়ে ফেলা,
অসংখ্য আয়নার ভেতর এক আয়না হয়ে ওঠা।

[বিশ্বাসপত্র: ভেতরে একটি গাছ: অক্তাবিয়ো পাস]
হেসিয়োদ তাঁর বিশ্বসৃষ্টির কাহিনিতে বলেছেন, শুরুতে ছিল অন্ধকার আর নিঃসীম শূন্যতা। এই আকারহীন শূন্যতা থেকে জন্ম নিল দুই সন্তান: রাত্রি আর এরিবাস, রাত্রি হলো অন্ধকার আর এরিবাস হলো অনন্ত গভীরতা যেখানে মৃত্যুর বসবাস। এছাড়া বিশ্বে আর কিছুই ছিল না। তারপর বিশাল বিস্ময়ের মাঝে অসীম শূন্যতা থেকে রহস্যজনকভাবে জন্ম নিল সেরাটি। আরিস্তোফেনেসের ভাষায়, কালো ডানার রাত্রি অন্ধকার এরিবাসের বুকে পাড়ল এক বাতাসতাড়িত ডিম্ব আর ঋতুচক্র সামনে এলে স্বর্ণময় ডানা থেকে জেগে উঠল আকাঙ্ক্ষিত ‘‘প্রেম’’। প্রেম থেকে এল ‘‘আলো’’ আর তার সহচর হিসেবে ‘‘দিন’’।
জার্মান মনস্তত্ত্ববিদ ও যৌনসংস্কারক ইভান ব্লোখ তাঁর আমাদের সময়ের যৌনজীবন: আধুনিক সভ্যতার সাথে তার সম্পর্ক গ্রন্থে বলেছেন, ‘‘প্রেমের ইতিহাস হলো মানবতার, সভ্যতার ইতিহাস।’’ ব্লোখ বলতে চেয়েছেন, সভ্যতার ইতিহাস এবং অস্তিত্বের উচ্চতর ভাবের প্রতি মানুষের অগ্রগমন যৌনানুশীলনের পরিবর্তনের দ্বারা মৌলিকভাবে প্রভাবিত হয়, আর এর কারণেই যৌনতার ইতিহাস নির্মাণে মানুষ তৎপর হয়ে ওঠে, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শরীরকে বোঝার বিষয়াদি। প্লাতোন বলেন, প্রেমের অভিজ্ঞতা হলো এমন কিছুর জন্য অস্থিরতা যা আসলে এক ধারণা, এজন্যই প্রেম-উচাটনে সর্বজনীনতার বিষয় নিহিত থাকে। দান্তে তাঁর নবীন জীবন-এ বলেছেন, প্রেম কোনো বস্তুতে নিহিত আপতিক গুণ; তার মানে দান্তে বলতে চেয়েছেন, বস্তুটি হলো মানুষ, এবং গুণটি শরীরী:
…আমার কথায় প্রেমের স্বকীয় সত্তাকে আমি এক বস্তু রূপে ধরেছি,–শুধু চেতনাযুক্ত সত্তারূপে নয়, কিন্তু দেহধারী পদার্থ রূপে। প্রকৃতপক্ষে এইটি অলীক, কারণ প্রেম স্বয়ং এক বস্তু নয়, তা কোনো বস্তুতে নিহিত আপতিক গুণ। আামি তার সম্বন্ধে তিনটি ব্যাপার বলেছি যা থেকে স্পষ্ট যে আমি তাকে যেন শরীরী, এমনকি যেন মানুষের মতো ধরি। বলেছি, আমি তাকে আসতে দেখি। যেহেতু আগমন স্থানীয় গতি বোঝায়, এবং স্থানীয় গতি সেই দার্শনিকের (অ্যারিস্টটলের) মতানুসারে কেবল অবয়বধারীর থাকতে পারে, তাই মনে হয় প্রেমকে আমি দেহী ধরি। আমি আরও জানিয়েছি সে হেসেছিল, আর কথাও বলেছিল। মনে হয় এসব, বিশেষত সহাস হওয়া, এক মানবিক গুণ। তাই দেখিয়েছে, আমি তাকে মানুষ ধরি।
[অনুবাদ: শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়]

দান্তে প্রেমকে বলেছেন এক সম্ভাবনাময় অস্তিত্ব যা বাস্তবে রূপ পায়। এই সম্ভাবনাময় অস্তিত্বের রূপায়ণ সম্পর্কে নবীন জীবন-এ তিনি বলছেন, কীভাবে তা প্রথমত পুরুষের তারপর নারীতে সংক্রামিত হয়:
ধীময়ী নারীর রূপে সুন্দরতা দেখা দিতে পরে
এত খুশি আনে চোখে, যার থেকে হৃদয়ে নিহিত
কামনা প্রজাত হয়, প্রিয় তার অভীষ্টকে লাভে
রয়ে কোনো কোনো বার এতকাল মর্মের ভিতরে
যাতে করে নিদ্রালীন প্রেমের শক্তিকে জাগরিত;
আর, এক নারীতেও সুজন করে না, সমভাবে।

[অনুবাদ: শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়]
আমরা দেখছি, ‘‘কামনা প্রজাত’’ হওয়ার কথা বলছেন দান্তে, প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য। সুতরাং স্বর্গীয় অধ্যায়ে যাওয়ার আগে দান্তে মানবীয় অধ্যায়, যা কিনা প্রেমের ভিত্তি, তাকে বুঝতে অক্ষম হননি। আমরা দেখি, নবীন জীবন-এর ঊনিশতম অধ্যায়ে দান্তে বলছেন, ‘‘ আমার দেবীকে পেতে,’’ এই পঙ্ক্তিটি, যার ব্যাখ্যায় দান্তে বলছেন:
কারণ একটিতে আমি প্রেমের উৎসরূপে তার দুই চোখের কথা বলি। দ্বিতীয়ে প্রেমের শেষ মোহনা রূপে তার মুখের কথা বলি। প্রতিটি দূষিত চিন্তাকে এখান থেকে সরাবার জন্য, এর সকল পাঠক মনে রাখুক, আগে লেখা হয়েছে,–এ নারীর মুখের ক্রিয়াসঞ্জাত অভিবাদনে আমার কামনার বস্তু ছিল, যতকাল তার অনুমতি বলে আমি তা নিতে পেরেছি।
[অনুবাদ: শ্যামলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়]
দেহ ছাড়া প্রেম বলে কিছু নেই, কাম বা যৌনতার প্রশ্নই আসে না। প্রেম তাই কাম থেকেই উদ্ভূত যদিও তা তাতে সীমাবদ্ধ নয়, তা এক উদ্ভাবন, এক রূপান্তর, এক অনন্যবোধ, এক জাদুরসায়ন। এর কারণেই প্রেমের ক্ষেত্রে দেহ প্রতীক হয় বটে কিন্তু শুধু তা যৌনতায় পরিণত হয় না। প্রাণীদের মধ্যে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে শরীরকে মুক্ত করতে পেরেছে তার মন ও মস্তিষ্ক দিয়ে। ফায়েদ্রুস-এ সোক্রাতেস বলছেন, দেহের সৌন্দর্যের অনুসদ্ধানের সাথে যখন বাসনা সম্পর্কিত হয়ে সৌন্দর্যের উদ্যাপনে অগ্রসর হয়, তখন সেই তাড়নার নতুন পরিগ্রহণ যে-বিজয় অর্জন করে, তা-ই প্রেম। প্রেম আসলে যৌনসত্যের এক বিনির্মাণ, যা তাকে চরিতার্থতা দেয় যেন শরীর তার প্রাকৃতিক ভূমিকাকে সুন্দরভাবে সম্পাদন করতে পারে। প্রেমের এই অগ্রগতি আসলে যৌনসম্পর্ক সৃষ্টির এক ধরনের উদারীকরণ ঘটায়, যৌনতাকে সদ্গুণে উপনীত করে। এ অর্থে প্রেমকে নিকোলাস ক্রয়ণের সাথে প্রেমবিষয়ক আলাপচারিতায় এ সময়ের বিখ্যাত দার্শনিক আঁলা বাদিয়ু বলেন, প্রেমিক-প্রেমিকা যখন পরস্পর প্রেম-উদ্যাপনে মিলিত হয় তখন বলে ওঠে, ‘‘আরও আরও’’–যা মূলত শারীরিক ইঙ্গিতবাচক ভাষার দ্বারা কামকে নবায়িত করার প্রচেষ্টা। বাদিয়ু যা বলেছেন তা হলো শব্দজাগরণ যার ফলে শারীরিক মিলন মাত্রা গ্রহণ করে ভিন্নভাবে। অক্তাবিয়ো পাস তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা ‘‘বিশ্বাসের সাক্ষ্য’’-এ প্রেম ও শরীরের তথা কামের সমাসক্তির আশ্চর্যতা বা বিস্ময়কে বোঝাতে বলেছেন:
প্রেমের আরম্ভ তো শরীরে
কিন্তু কোথায় সমাপ্তি তার?
যদি তা হয় এক ভূত,
তবে তা রক্তমাংসের এক শরীর:
যদি হয় তা এক শরীর,
তবে স্পর্শ মাত্রই তা উবে যায়।

প্রেম কামকে অসাধারণভাবে উপভোগ করার মনোশারীরিক এক উদ্দীপনরথ। প্রেম হলো কামজ, যেমন পদ্ম হলো পঙ্কজ। প্রেম ছাড়া কাম সম্ভব কিন্তু উন্নত ধরনের কাম প্রেম ছাড়া সম্ভব নয় যদিও তার আয়ু হতে পারে ক্ষণিক। প্রেম উপহার চায়, আর এজন্যই উপস্থাপন করে নিজেকে কামের জন্য। কাম বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে শারীরিক মিলন হলো নিকটতম দেহযোগাযোগ আর প্রেম হলো প্রাণের বা আত্মার ঐকতান, অক্তাবিয়ো পাস উপরোক্ত কবিতায় যেমনটা বলেছেন:
প্রেম:
আত্মা থেকে শরীরের সৃষ্টি
শরীর থেকে আত্মার নির্মাণ
একটি উপস্থিতি থেকে একটি তুমির সৃষ্টি।

কিন্তু কখনও কখনও চূড়ান্তভাবে কামকে পাওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে তাকে আড়াল বা অস্বীকার করে প্রেম, নিজেকে করতে চায় সদ্গুণসম্ভাবিত, এটা অনেকটা কামের জন্য কামের বিরুদ্ধে এক সংগ্রাম। এটার রয়েছে একটি দার্শনিক সৌন্দর্য: অস্বীকৃতির প্রাপ্তি। প্রেম যে-শারীরিক নিদর্শন খুঁজতে চায় কাম তা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করে। কাম হলো সেই যৌনতা যা বর্তমান ও ক্রিয়াশীল, যা নির্দেশনাপ্রাপ্ত ও অভিমুখী। যৌনতা প্রাকৃতিকভাবে যায় প্রজননে, কামে তা নয়। কামের সমাপ্তি আনন্দেই। যৌনতা জীবগত আর কাম মানবগত। কামক্রিয়ায় সবসময়ই থাকে অদৃশ্য ও চিরক্রিয়াশীল সঙ্গী, থাকে অভীপ্সা ও কল্পনা; থাকে একাধিক অংশগ্রহণকারী। প্রাণিযৌনতা ও মানবকামের মধ্যে আছে পার্থক্য। প্রাণিযৌনতায় কল্পনা নেই, নেই ফ্যান্টাসিও, আছে শুধু অভ্যাস। কিন্তু মানবকামে এগুলো আছে, রয়েছে যৌনমনস্তত্ত্বের খেলাও: আছে পুরাণের ইনকিউবি আর সুকুবি-র প্রলুব্ধতা। ইনকিউবি হচ্ছে পুরুষরূপী শয়তান যারা মহিলাদের সাথে আর সুকুবি হচ্ছে নারীরূপী শয়তান যারা পুরুষের সাথে আকছার যৌন-সংসর্গে মিলিত হয়। যৌনতায় প্রাণীদের কোনো রূপকথা নেই, নেই কোনো আলাদা জগৎও, কিন্তু মানুষ সৃষ্টি করেছে এসবকিছু। তপস্ব্যা ও লাম্পট্য, এ দুটোরই প্রকাশ রয়েছে কামে। এরা বিপরীতধর্মী হলেও কামের সার্থকতায় প্রজননকে বাতিল করে উভয়েই, যদিও একটার উদ্দেশ্য আধ্যাত্মিক বা লৌকিক সাধন ও পরিত্রাণ, অন্যটির উদ্দেশ্য ব্যক্তিক স্বাধীনতা। দুটোই পরিহার করে প্রজননকে। প্রথমটির দেখা মেলে তন্ত্র ও বাউল সাধনায় যেখানে যৌনতাকে ব্যবহার করা হয় যান হিসেবে,আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ সাদীয় (Sade) সাহিত্য ও তাঁর জীবন।
প্রেম হলো এমন এক শারীরিক অবস্থা যখন শরীরের সব ইন্দ্রিয়ই অংশগ্রহণ করে, এবং এই অংশগ্রহণ শরীরকে একটি তূরীয় অবস্থায় নীত করে। মানুষের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে, এবং তার ফলাফল হিসেবে আসে জননেন্দ্রিয়ের চূড়ান্ত উদ্দীপন। কোনোকিছুই বাকি থাকে না–চোখ, কান, সুগন্ধ,স্পর্শ, মর্দন এমনকি স্বাদও ক্রীড়াময় হয়ে ওঠে। প্রেম যদি কোনো গোপন রসায়ন হয় তবে পেমে-পড়া মানুষেরা যেন হয়ে ওঠে অলীক সত্তা, তাদের ভাষা ও আচরণ যেন হয়ে ওঠে অবাস্তব, ও অচেনা। সামাজিক বা ধর্মীয় নৈতিকতাও এই প্রবৃত্তির জাগরণকে থামাতে পারে না। তখন প্রেম হয়ে ওঠে বিশেষ ধারণা বা লক্ষণ। এটাকে বলা যায় বিশেষ প্রকল্প যা ফলাফল নির্ধারণে বেশি তৎপর থাকে। মহৎ অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে অপ্রত্যাশিত ফলাফল পেতেই তার স্বাচ্ছন্দ্য। প্রেমিকের কাছে তার প্রিয়তমা বা প্রেমিকার কাছে তার প্রিয়তম হলো পৃথিবীর পরিচিতিকরণের অবতার, একজন অন্যজনকে উপহার দেয় এক নতুন পৃথিবী যার নিরন্তর অন্বেষক হয়ে ওঠে তারা পরস্পর। এজন্যই প্রেমে বিভ্রম বলে কিছু থাকে না, কারণ তা স্বচ্ছতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় সম্পর্কের স্থায়ীকরণের মাধ্যমে।
প্রতিটি প্রাণীর শরীররই ইন্দ্রিয়ের মহোৎসব, সেখানে পূজা পায় এক ইন্দ্রিয়দেবতা। কিন্তু সাধারণ প্রাণীর ইন্দ্রিয়দেবতাটি একটি উদ্দেশ্যকে নিয়ে অগ্রসর হয়। উদ্দেশ্য পূরণ হলেই সে থাকে তৃপ্ত। তার মানে, প্রাণীর এই দেবতা সুস্থ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। কিন্তু মানুষের এই দেবতা মাতাল, শৃঙ্খলাহীন। একই সময়ে সে পূরণ করতে চায় অনেক উদ্দেশ্য। এই বহুগুণিত প্রবণতাই উপহার দেয় প্রেম যা কামের পথ ধরে হাজির হয়, ‘‘মর্ত্যমানবের রক্তে’’, সোফোক্লেসের ভাষায়, ‘‘মাতাল তরঙ্গ তোলে।’’ শুধু তা-ই নয়, তা মানুষকে করে তোলে নতুনের অভিলাসী, আবিষ্কারমুখী। ‘‘লাভ মাস্ট বি রি-ইনভেন্টেট, দ্যাট মাচ ইজ ক্লিয়ার’’–এটাই দস্তুর যে প্রেমকে পুনরাবিষ্কার করতে হয়, বলেছেন র‌্যাঁবো, নরকে এক ঋতুতে। মানুষের ভেতরে বাস করা ইন্দ্রিয়দেবতাই এই পুনরাবিষ্কারের ও নবীকরণের কাজ করে যায়। এই সৃষ্টিশীলতা তাকে বহুসৃষ্টিশীল হওয়ার শক্তি জোগায়। শুধু এটুকুই নয়, সে উপহার দেয় আকস্মিকতা ও পুনর্নির্মাণের ইচ্ছা, দেয় পরিবর্তনের মানসিকতা, দেয় অঙ্গীকারও। যৌনবাস্তবতার বাইরে একটি কল্পনাকে স্বাগত জানায় সে যা সৃষ্টি করে সৌন্দর্য। নৈতিক প্রত্যয়গুলোকেও সে নির্দ্বিধায় ভেঙে ফেলে। এ অর্থে প্রেম লঙ্ঘনকারী। প্রেম কামকে পূরণের মুখোশ হলেও এটা ইন্দ্রিয়ের একধরনের সৌন্দর্যকে আবাহন জানায়। এটা এক আনন্দের জন্ম দেয় যাকে উপভোগ করে শরীর। শুধু কাম প্রেম নয় কখনোই, অতি কাম বা অসুন্দর কাম বরং প্রেমকে হত্যা করতে পারে। প্রেম নিজে সুন্দর নয় কিন্তু তা সুন্দরকে যাচ্ঞা করে। প্রেম এক ভুল যা থেকে সুন্দরের জন্ম। বোদল্যের বলেছেন, প্রেমের অসাধারণ এবং সর্বোচ্চ আনন্দ রয়েছে ভুল করার নিশ্চিততার মধ্যে। আর এ কারণেই কখনও কখনও মনে হয় প্রেম বুঝি দেহাতীত বা কামাতীত কোনো কিছু। এর কারণ হলো সেই সৃষ্টসৌন্দর্য যা কামকে ঢেকে রাখে। জন ডান এজন্যই তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘‘এক্সটাসি’’তে বলেন ‘‘গুড লাভ’’-এর কথা, যা দেহের উপস্থিতি সত্ত্বেও কামময় নয়, ডান বলেন:
we said, and tell us what we love;
we see by this it was not sex.

প্রেম এমন একটি অবস্থার জন্ম দেয় যাকে বলা যায় দশা। মার্কেস তাঁর সরল এরেন্দিয়া ও তার নিদয়া ঠাকুমার অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনিতে এমন একটি প্রেমদশার বর্ণনা দিয়েছেন বিস্ময়কর রূপকে। গল্পে উলিসেস এরেন্দিয়ার প্রেমে পড়ার পর ঘরে এসে যখন মাকে ওষুধ দেবার জন্য কাচের গ্লাসগুলো ছোঁয়, তখনই একে একে সব গ্লাসের রং প্রথমে নীল হয়ে উঠল তারপর নানা রঙে ঝলমল করে উঠল। মা তাকে বলল, প্রেমে পড়লেই ওরকম হয়। উলিসেস যখন বলল রুটি খেতে তার ভালো লাগে না তখন মা আবার বলল, প্রেমরোগে পড়লে কারও রুটি খেতে ইচ্ছা করে না, মা তখন এই দশা থেকে মুক্তির জন্য মন্ত্রপড়া জলে তাকে স্নান করার কথা বলে। কিন্তু এখানেই শেষ নয় বরং আরম্ভ হয় প্রেমের সংগ্রাম যা সৌন্দর্যে শুরু হয়ে ধ্বংস হয় সমাপ্তিতে। মাঝ রাতেই উলিসেস বের হয়ে চলে যায় এরেন্দিরার কাছে তিনটি কমলালেবু নিয়ে যায় ভেতর যার রয়েছে চোরাই হীরা। সে দ্যাখে নগ্ন এরেন্দিয়াকে আর বলে যে তার গায়ের রং ঠিক কমলালেবুর মতো। চিঁরে দেখায় তার ভেতরে রক্ষিত হীরার টুকরা। তারপর এরেন্দিয়াকে পাবার জন্য প্রথমে সেঁকোবিষ তারপর ঘরে আগুন দিয়ে ঠাকুমাকে মারার চেষ্টা করে কিন্তু সফল না হতে পেরে অবশেষে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। ধরাও পড়ে যায় রেড ইন্ডিয়ানদের হাতে, এরেন্দিয়াও বিলীন হয়ে যায় চিরতরে। প্রেম ধ্বংসাত্মক এবং নিয়ন্ত্রণোর্ধ্ব, কারণ তা স্ফূলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে অবশেষে মহাবিস্ফোরণে শেষ হয়। এই ধ্বংসাত্মকতা আত্মমুখীও হয়, হ্বের্টের বা দেবদাসের ক্ষেত্রে যা হয়েছে; আবার পরমুখীও হয়, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রেমিকাকে হত্যা বা তার শারীরিক ক্ষতি সাধন করা যা প্রায়শই ঘটতে দেখা যায়। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নিজেকে বিনাশ করার উদাহরণ অনেক রয়েছে। ইতালীয় লেখক চিজার পাভেজে হলিউডের এক অখ্যাত অভিনেত্রীকে ভালোবেসে প্রতিদানে তার সাড়া না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন যদিও তখন তিনি ছিলেন সাহিত্যিক সাফল্যের চূড়ায়। সত্যিই এটা বিস্ময়কর যে, মুহূর্তের যে-মুগ্ধতা থেকে প্রেমের জন্ম তা ক্রমশ পরিণত হয় আচ্ছন্নতায়, এর সাথে যোগ হতে থাকে জিদ ও একগুঁয়েমি যা ক্ষিপ্ততাকে আহ্বান জানায়। অনেক সময়ই তার সমাপ্তি ধ্বংসে এমনকি কোনো কার্যকারণ ছাড়াই, এবং ধ্বংসেই তার অবিনশ্বরতা, কারণ সে হতে চায় কিংবদন্তি, প্রতিষ্ঠা করতে চায় চিরন্তনতা। লুইস বুনুয়েল তাঁর আত্মজীবনী মাই লাস্ট ব্রিদ-এ বলেছেন এক আশ্চর্য প্রেমের কথা যা মৃত্যুতেই তার সুখ বা প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করেছিল। বুনুয়েল বলছেন, ১৯২০-২১ সালের দিকে যখন তিনি মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন তখন সেখানে, পাশ্ববর্তী আমানিয়লে, ঘটে এক যুগল আত্মহত্যার ঘটনা: এক উদ্ভিন্ন প্রেমিক-প্রেমিকা রেস্তোরাঁর বাগানে একসাথে আত্মহত্যা করে। তাদের প্রেম ছিল বেগমান এবং অন্তহীন, দুই পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল; অর্থাৎ তাদের প্রেমে বা প্রেমের পরিণতিতে কোনো বাধাই ছিল না কিন্তু তবু তারা আত্মহত্যাতে চিরন্তনতা খুঁজল প্রেমের। মনে করা অনুচিত নয় যে তারা প্রেমের কোনো কল্পিত নভোবিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছিল যা তাদের প্ররোচিত করেছিল আত্মলীনতায়। হয়তো তারা কিংবদন্তি হতে চেয়েছিল, হয়তো মনে করেছিল, মৃত্যুই তাদের সম্পর্ককে মৃত্যুহীন করবে। প্রেমের ধ্বংসাত্মক, এটা শুধু প্রত্যয় নয়, নিয়তিও। আর এর জন্যই প্রেম অযৌক্তিক এবং স্বার্থপরও। সে-শুধু নিজের স্বার্থকেই রক্ষা করে, আর এটা সে করে প্রতিবারে সংস্কারবিহীনভাবে। প্রয়োজনে বহমান ও বিশ্বস্ত সব সম্পর্ককে ফেলে দিয়ে নতুন এবং হয়তো অবিশ্বস্ত সম্পর্কে যেতেও তার সে পিছ-পা হয় না। এর কারণটি নিহিত আছে প্রেমের এককেন্দ্রিক ও স্বার্থপর দর্শনের মধ্যে: অন্তর্গত চূড়ান্ততায় পৌঁছার জন্য বহির্গত দুর্ঘটনকে বরণ এবং মোকাবিলা করা আর তৃপ্তিলাভ করা। এটাই প্রেমের ইনফের্নো ও পারাদিসো।
বিখ্যাত পরাবাস্তববাদের জনক এবং বিংশ শতাব্দের বিখ্যাত কবি-লেখক আঁদ্রে ব্রেতঁ তাঁর কাব্যিক গদ্যে এবং অনতিক্রম্য গীতিময় কল্পনায় ১৯৩৭ সালে লেখেন তাঁর প্রেমবিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ ম্যাড লাভ (লে’মুর ফু), যেখানে তিনি অযৌক্তিক প্রেমের এবং প্রেমের অযৌক্তিকতার ওপর তাঁর দ্যুতিময় চিন্তা উপস্থাপন করেন। অনুপম ও রহস্যময় সুন্দরীখ্যাত শিল্পী জাকুলিন লাম্বাকে নিয়ে তিনি বইটি লেখেন। বইটি মূলত জাকুলিন লাম্বার সাথে তাঁর সম্পর্কের আত্মজৈবনিক স্মরণোক্তি যাকে বলা যায় প্রেমের এক ‘‘আর্স পোয়েতিকা’’ যেখানে ব্রেতঁ প্রেমের অসম্ভবতা, অযৌক্তিকতা ও তিরন্দাজি অবস্থাকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, প্রেমবস্তু যে অনুপম, তাকে বিশ্বাস ও গ্রহণ করে মন, অন্যদিকে প্রায়শই জীবনের সামাজিক শর্তগুলো এই অলীকত্বকে নস্যাৎ করে। এরপর তিনি বলছেন, এই অভিশপ্ত বোধ এখনকার মানুষকে অসুখী করে তুলছে এবং গত শতাব্দের অনেক কাজের ভেতর দিয়ে তা নিজেকে প্রকাশ করেছে। ব্রেতঁ যা বলতে চেয়েছেন তার আরেক মানে হলো, প্রেম অভীপ্সাকে আত্মগতকরণ করে, ফলে তার অভীপ্সিত-বস্তু যেন প্রাপ্ত-বস্তু হয়ে ওঠে, এজন্য ব্যক্তি তার বাস্তবায়নে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। প্রেমের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও যেহেতু সমাজকাঠামো তাকে অলীক ভাবে, তা-ই প্রেমকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অনেকটা ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মতো যা মিথ্যাকে দূরীভূত করে সত্য প্রতিষ্ঠার মতো এক আধ্যাত্মিক প্রয়োজনকে গতিশীলতা দেয়। কিন্তু সমাজ তা মেনে নিতে চায় না শেষাবধি, ফলে তীব্রতা ও সংঘর্ষ অধিক হারে দেখা দিতে থাকে। কিন্তু মানুষই একমাত্র প্রাণী যে, এমনকি ভুল থেকেও লাভবান হতে চায় লোকসানের মাধ্যমে, আর এর প্রমাণ সে দেয় প্রেমে।
প্রেমের অসম্ভব ও দুরন্ত বিভঙ্গ এবং ঘটনের জন্যই এখনও আমাদের সমাজে প্রেমকে রোগ হিসেবে চিন্তা করা হয়। যে বা যারা প্রেমে পড়ে তাদের ভাবা হয় অসুস্থ বা পাগল। ফলে প্রেম এক দুর্গম ও দুরাচারী অভিজ্ঞতা। চারপাশের সবকিছু তার বিরুদ্ধে। অভিভাবক, বন্ধু, রাষ্ট্র, আইন, নৈতিকতা, সমাজ সবকিছুই তাকে করতে চায় প্রতিহত। আর এসবকে মোকাবিলা করার জন্যই প্রেমকে হতে হয় আক্রমণাত্মক ও ধ্বংসাত্মক। আর এটাই প্রেমকে দেয় বিষাদিত সৌন্দর্য। শেক্সপিয়রও তাঁর ১৫১-সংখ্যক সনেটে বলেছেন: প্রেম মানে না বিবেককে/ যদিও কে না জানে বিবেকের জন্ম প্রেম থেকেই?
কখনও কখনও প্রেমে অবশেষে সম্পর্কের চেয়ে বড়ো হয়ে দেখা দেয় স্মৃতি যা পুড়িয়ে মারে স্মৃতিধরকে। স্মৃতিভস্ম গায়ে মেখে অনেকে কাটিয়ে দেয় অবশিষ্ট জীবন। স্মৃতি হলো আসলে সম্পর্কের স্থিরসময় বা তার ধারিত সেলুলয়েড যা বোঝায় সম্পর্কের অতীত বাস্তবতা। এই স্মৃতির আবির্ভাব ঘটে সময়ে সময়ে আর তা মাতাল করে তোলে প্রেমেপড়া মানুষকে। বিচ্ছিন্নতা বা প্রত্যাখ্যান, যেভাবেই প্রেমহীনতা আসুক না কেন, তা উগড়ে দেয় স্মৃতি। কেউ কেউ পড়ে যান স্মৃতিমত্ততার রোগে, কেউবা স্মৃত্যাঘাতে হয়ে পড়েন বেসামাল, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আত্মনাশে মেতে পড়েন তারা। আমরা জানি, স্মৃতি হলো সময়ের উদ্ভাসন ও পুনর্বিবেচনা, তা হারানো সময়ের পুনরুদ্দীপনও। প্রেমের ক্ষেত্রে ঘটে এই উদ্দীপন। এই উদ্দীপন প্রেমকে অমর করে রাখতে চায়।
যৌনতা প্রাকৃতিক, প্রেম নয়। প্রেম মানবিক, কেননা তা কামের সম্প্রসারণ ঘটায়, স্ফটিকীকরণ করে তাকে মনের নিশীথনীরবে। মানবিক বলেই তা বাধার সম্মুখীন হয়। প্রেমের ক্ষেত্রে মানবিক পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যা কখনও কখনও সংঘর্ষময়ও হয়। প্রেম চিরন্তনও নয়, নয় বলেই তা সম্পর্ককেও নস্যাৎ করে বসে, আবার নতুন সম্পর্ক সৃষ্টিতেও তার পারঙ্গমতা অসাধারণ। এটা আশ্চর্যের যে, সম্পর্কের জন্য গতিপ্রাপ্ত হয়ে তা স্থাপিত সম্পর্ককে বাতিল করে নতুন সম্পর্কের অন্বেষণে লিপ্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং পরিক্রমণ প্রেমের ধর্ম, গতিশীলতা তার নিরঙ্কুশ অবলম্বন। প্রেম তাই আপেক্ষিক। কামের যেমন সরলরৈখিকতা রয়েছে প্রেমের তেমনি বক্রতা। এ সবের কারণেই তা দেয়াল রচনা করে। যেহেতু প্রেম একটি স্বাধীন প্রপঞ্চ সেহেতু তার বৈশিষ্ট্য হলো পছন্দের উদ্যোগ গ্রহণ যা পক্ষপাতমূলক, আর এ পদ্ধতিতেই তা একটি পরম ও নিয়তিচালিত গোপনকে মন্থন করতে চায়। এই চাওয়া সামাজিক ও পারিবারিক নীতিসাম্যকে দুলিয়ে দেয়। এই পেরিয়ে যাওয়া, বা দুর্বারতার দর্শন ফুটে উঠেছে প্রাচীন গ্রিক কবি সাফোর একটি কবিতায়–‘‘সুন্দরতম’’ কবিতায় সাফো দুজন নারীর প্রেমের দুনির্বারতাকে অসাধারণ গীতিময়তায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সাফো যা বলছেন, শিশিরকুমার দাশের বাংলা অনুবাদে তা এমন:
কেউ বলে অশ্বারোহী, কেউ বলে পদাতিক দল
কারো মতে ভেসে-যাওয়া জাহাজের সারি সবচেয়ে
ভালো দৃশ্য এই কালো পৃথিবীতে, কিন্তু আমি বলি,
তোমার প্রেমিক।
একটি দৃষ্টান্ত নাও, মনে করো হেলেনের কথা
পৃথিবীর সবচেয়ে, সবচেয়ে রূপসী রমণী
একদিন অসামান্য স্বামীর প্রাসাদ ত্যাগ ক’রে
চলে গেল দূর
সমুদ্রের পারে ট্রয়ে, ভুলে গেল সন্তানের কথা
ভুলে গেল সব স্মৃতি, দেশ, স্বামী, জনক জননী;
সেরকমই কতদূরে সমুদ্রের পারে চলে গেছে
আনাক্তোরিয়া

কবিতাটিতে হেলেনের দুঃসাহসী প্রেমের কথা বলা হয়েছে যার পরিণতি সম্বন্ধে আমরা জানি, আমরা জানি ট্রয় ধ্বংসের কথা, কিন্তু অপর নারী আনাক্তোরিয়ার কথা হয়তো আমরা জানি না, তিনি ছিলেন সাফোর বান্ধবী, তিনিও সম্ভবত সার্দিয়ার এক সৈনিককে বিয়ে করে দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ইউরোপের বিখ্যাত ত্রিস্তঁ-ইজোলডের প্রেমেও দেখা যায় এই দুর্নিবারতা যা নানা অভিযানান্তে অবশেষে মৃত্যুতে শেষ হয়। কাহিনির শুরুতেই বোধগম্য হয় এই মৃত্যুর বিয়োগান্ত। ত্রিস্তঁর নিজের মামা ও অভিভাবকের স্ত্রীর সাথে মুহুর্মুহু মিলন ও বিচ্ছেদ, অবৈধ জেনেও প্রেমের পাগলামি–এসবই সেই ধ্বংসাত্মকতা ও দুঃসাহসিতা যা সমস্ত নিয়মনীতিকে অগ্রাহ্য করে বসে যদিও তাতে ছিল নিয়তির অমোঘ নির্দেশ। নিজের মামা ও কর্নওয়ালের রাজা মার্কের জন্য স্বর্ণকেশী ইজোলডেকে আয়ারল্যান্ড থেকে জাহাজে করে আনার সময়ে আয়ারল্যান্ডের রানির দেওয়া প্রেমোদ্দীপক পানীয় খেয়ে ফেলে তারা ভালোবাসায় পড়ে যায় চিরজীবনের জন্য। মরোয়াজ বনে সন্ন্যাসী অগ্রাঁর কথায় তারা এমনকি প্রায়শ্চিত্ত করতেও অস্বীকার করে, তারা ধর্মের বাণী গ্রহণ না করে পরকিয়া সম্পর্ককে রক্ষার ঘোষণা দেয়। এই বেপোরোয়া মনোভাব আসলে এক পার্থিবতার দ্যোতনা যা প্রেমিক-প্রেমিকাকে তুচ্ছতা থেকে চিরস্থায়িত্বের দিকে নিয়ে যায় মৃত্যুর বিনিময়ে, করে তোলে কিংবদন্তি। ত্রিস্তঁ ও ইজোলডা-র কাহিনির শুরুতেই বলা হয়:
হে পাঠক, প্রেম এবং মৃত্যুর এক মহৎ কাহিনি যদি আপনারা শুনতে চান, তবে বলি ত্রিস্তঁ আর সম্রাজ্ঞী ইজোলডের কাহিনি, যাদেরকে প্রেম দিয়েছিল পরমানন্দ, আবার দুঃখও দিয়েছিল, কীভাবে শেষ পর্যন্ত ওই প্রেমের কারণে একসাথে এবং একই দিনে মারা গিয়েছিল তারা, ত্রিস্তঁ-র পাশে ইজোলডে আর ইজোলডের পাশে ত্রিস্তঁ।
প্রেম নিজেকে সম্প্রসারণ করে প্রেমিকযুগলের দুর্ভাগ্যের বিনিময়ে, তাদের জীবনের দামে। গ্যোয়েটের তরুণ হ্বের্টেরের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, হ্বের্টের দিনকেদিন বাড়িয়ে চলে তার প্রেম, কোনোরকম হিসাবনিকাশ ছাড়াই। গ্যোয়েটের হ্বের্টের আরও ভাবে, প্রেম ছাড়া জীবনের কোনো মানে নেই। ম্যাজিক লণ্ঠনের মধ্যে বাতি না-থাকলে লণ্ঠনের যে করুণ অবস্থা হয় প্রেমহীন জীবন অনেকটা তাই। হ্বের্টের একই সাথে প্রেমের রূপকথা এবং তার প্রতিফলিত অলীকত্বকেও ভাবে: ম্যাজিক লণ্ঠনের কারণে সাদা পরদার ওপর যে-সব রঙিন প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে, তা অলীক হলেও আমরা অবাক নয়নে শিশুদের মতোই দেখে বিস্মিত হই। প্রেমের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার উৎস এবং পরিণতি প্রায় একই: কখনও একমুখী প্রেম আর তা না-হলে পরিবারের বা সমাজের বা ধর্মের বা গোত্রের বাধসাধা যা ব্যক্তিকে এক ধরনের মুক্তবেগ দিয়ে বসে, ব্যক্তি পেরিয়ে যেতে চায়, না পারলে মৃত্যুতে বা আত্মহত্যায় অবসান ঘটে জীবনের। বাধা যে সব সময় যুক্তিহীন তা নয় কিন্তু প্রেমিক বা প্রেমিকা সব বুঝেও কী এক অন্ধশক্তিতে ধাবিত হন অন্ধপ্রেমের দিকে। হ্বের্টেরও বোঝে তার এই অবস্থা, তাই ভাবে: ‘‘বড়োই বোকা আমি আর হতভাগ্য! আমি তো বঞ্চনা করছি নিজেকে! এই অন্তহীন প্রেমস্রোতের মানে কী? তাকে পাওয়া ছাড়া যেন আর কিছুই মনে আসে না। শুধু তার প্রতিচ্ছবিই মনে ভাসতে থাকে। জগতের সবকিছুকে তার, লোট্টের সাথে মিলিয়ে দেখি আমি।’’ হ্বের্টেরও জানে, মৃত্যুতেই শেষ হবে তার জীবন। এই বেপোরোয়া ও অস্বাভাবিক অবস্থা আসলে প্রেমের স্বাভাবিকতা যা প্রেমবস্তুকে করে তোলে দ্বিতীয় ঈশ্বর। এই অস্থিরতা এবং পরিবৃত্তি প্রেমের ধর্ম এবং অবস্থা। সাফোর একটি কবিতায় দেখা যায়, যে-মেয়েটিকে সাফো ভালোবাসেন তার পাশে এক যুবক নিবিড় ও ঘনিষ্ঠভাবে বসে থাকায় অবহেলিত সাফো পুড়ে মরছেন ঈর্ষা আর অন্তর্জালায় যা তাঁকে করে তোলে মত্ত আর অধীর। প্লাতোনও ফায়েদ্রুস-এ প্রেমকে উন্মাদনার আলোকে দেখতে চেয়েছেন। সেরভান্তেসের দন কিহোতের ৩৩ অধ্যায়ে আলসেনমো আর লোতারিয়ো নামক দুই বন্ধুর কাহিনিতে আলসেনমোর সুন্দরী স্ত্রী কামেলা যখন লোতারিয়োর প্রেমের ফাঁদে আটকা পড়ে তখন দেখা দেয় এই অস্থিরচিত্ততা এবং অপরাধবোধ। সহচরী লেয়োনেলাকে তার মনের এই অবস্থা জানালে লেয়োনেলা তাকে বলে যে, প্রেমের ধর্মই হলো এমন: কখনও ছুপিসারে হাঁটা, কখনও বাতাসের মতো ছুটে বেড়ানো, কখনও হাসিখুশি, কখনও বা প্রশান্তচিত্তে মন্থরভাবে চলা, কখনও উষ্ণ, কখনও বা শীতল, কখনও জখম হওয়া, কখনও বা মেরে ফেলা, কখনও দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা, কখনও বা ভস্ম হয়ে যাওয়া, কখনও চরম সুরক্ষা, কখনও বা একেবারে ধসে যাওয়া।
অক্তাবিয়ো পাস প্রেমের পার্থিবতাকে কালচক্রের সাথে মিলাতে গিয়ে প্রেমের আরেক দর্শনের কথা বলেছেন। তিনি তাঁর ডাবল ফ্লেম গ্রন্থে বলছেন, প্রেম হলো তীব্রতা আর সে-কারণেই তা সময়ের এক প্রসারণ যা মুহূর্তকে মহাকালে নিতে চায়। সরলরৈখিক সময় হয় অবচ্ছিন্ন ও অপরিমাপযোগ্য, কিন্তু এই ধরনের প্রতিটি অপরিমাপযোগ্য নিমিষের পর আমরা সময়ে ও সময়ের নিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসি, আমরা এই অনুক্রমকে এড়াতে পারি না। পাস আরও বলছেন: ‘‘প্রেমের শুরু দৃষ্টিতে: আমরা একজনকে দেখি আর তার প্রতি আকর্ষিত হই, আর সে-ও ফিরে দ্যাখে। আমরা আসলে কী দেখি? সবকিছুই আবার কোনোকিছুই না। কয়েক মুহূর্ত পরেই আমরা চোখ ফিরিয়ে নিই। অন্যথায় আমরা পাথরে পরিণত হয়ে যেতাম।’’ পাস বলছেন, ‘‘প্রেম যদি হয় কাল, তাহলে তা শাশ্বত হতে পারে না। মৃত্যুতেই তা ধ্বংসপ্রাপ্ত অথবা তা অন্য অনুভূতিতে হয় রূপান্তরিত। ওভিদের মেটামরফোসেস-এর অষ্টম পুস্তকে সবিস্তারে বিবৃত ফিলেমোন ও বাউচিজ-এর কাহিনি এক্ষেত্রে এক আকর্ষণীয় উদাহরণ।’’ এডিথ হ্যামিল্টন তাঁর বিখ্যাত মিথোলজিতেও প্রেমের আখ্যান হিসেবে এই কাহিনির বর্ণনা দেন আকর্ষণীয়ভাবে। কাহিনিটি সংক্ষেপে এমন:
এক সময় ফ্রিজিয়াতে অবস্থিত দুটো গাছের দিকে চাষিরা বিস্ময়ের সাথে তাকাতেন। গাছ দুটো ছিল একটি ওক আর অপরটি লিন্ডেন, দুটোরই উৎপত্তি একই গুঁড়ি থেকে। এই গাছ দুটোর জন্মের পেছনে ছিল ধার্মিক ও সদাশয় মানুষকে দেবতাদের পুরস্কার প্রদানের কিংবদন্তি। অলিম্পাস পর্বতে আমব্রোজিয়া খেতে খেতে আর নেকটার পান করতে করতে এক সময় দেবতা জুপিটার যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, অ্যাপোলোর বীণার ঝংকার বা গ্রেসদের নৃত্যকলাও যখন তাকে আরাম দিতে পারত না, তখন তিনি ছদ্মবেশে নেমে আসতেন পৃথিবীতে, তার সঙ্গী হতো আমুদেপ্রকৃতির ধনসন্ধানী দেবী মারকারি। পৃথিবীর মানুষেরা কেমন অতিথিপরায়ন তা পরীক্ষা করার জন্য একদিন তারা বেরিয়ে পড়ল। হতদরিদ্র মুসাফিরের বেশে তারা ফ্রিজিয়ার ভেতর দিয়ে ভ্রমণ করছিল, ধনিদের বাড়িতে করাঘাত করে খাদ্য এবং আশ্রয় চাওয়া সত্ত্বেও কারও কাছ থেকে তারা কোনো আতিথেয়তা পাচ্ছিল না। সবখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অবশেষে তারা একজন গরিব অথচ মহানুভব, ধার্মিক বৃদ্ধ ফিলেমোনকে খুঁজে পেল যে তার স্ত্রী বাউচিজসহ সেখানে এক নলখাগড়ায় ছাওয়া পর্ণকুটিরে বাস করছিল যা ছিল সবচেয়ে জরাজীর্ণ। এই দম্পতি তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাল। অত্যন্ত নীচু হয়ে সে-ঘরে তারা প্রবেশ করল কিন্তু প্রবেশ করে তারা দেখল সেই বৃদ্ধ ফিলেমোন দম্পতির আন্তরিকতা। তারা আগত অতিথিদের আরামের সব রকম ব্যবস্থা করল, তাদের ভালো শোবার ব্যবস্থাও করল। তারা আগত অতিথিদের বলল, তারা এখানেই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে আর তারা খুব সুখি। তারা আরও বলল, দরিদ্র হলেও দারিদ্র্যকে একবার মেনে নিলে তা আর খারাপ লাগে না, নিজের যা-কিছু আছে তাতে সন্তুষ্টতাই সবচেয়ে মঙ্গলজনক। সর্বক্ষণই তারা অতিথির সেবা করার জন্য ব্যস্ততা দেখাচ্ছিল। তারা অনেক কষ্টে বাঁধাকপি দিয়ে শূকরের মাংস রান্না করে অতিথিদের খাওয়াল। তারপর বিচ কাঠের পেয়ালা ও একটি পোড়ামাটির পাত্রে ভিনেগার জাতীয় হালকা মদ্য তাদের পরিবেশন করল। ফিলেমোন দম্পতি অতঃপর লক্ষ্য করল, মদ শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে-সাথেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পেয়ালা পূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। বিস্ময়ের সাথে তা দেখে ফিলেমোন দম্পতি সহজেই বুঝে ফেলল যে, যাদের তারা গৃহে আশ্রয় দিয়েছে তারা সাধারণ মর্ত্য মানবমানবী নয়, তারা দেবদ্বিজ ধরনের কেউ হবে। মনে হতেই তারা ভয় পেয়ে সাথে সাথে তাদের প্রণতি করল। তারা তখন তাদের থাকা একটি রাজহংসী দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য রাজহংসীটি ধরতে গেলে চেষ্টা করেও তা ধরতে পারল না। দেবতা জুপিটার তাদের এই প্রচেষ্টায় অতীব খুশি হয়ে বললেন, যেহেতু ফিলেমোন দম্পতি তাদের আতিথ্য দিয়েছে তাই তারা এর পুরস্কার পাবে। তখন তারা ফিলেমোন এবং তার স্ত্রীকে নিকটস্থ এক পাহাড়ের ওপর নিয়ে গেল। তারা এক ইশারায় জলপ্লাবন দিয়ে অধার্মিক ফ্রিজীয়দের ভূমি প্লাবিত করে দিল আর তাদের ঘরদোর খেতখামার নষ্ট করে দিল। পাহাড়ের ওপর থেকে ফিলেমোন আর বাউসিজ ভয়ে ভয়ে দেখল তাদের প্রতিবেশীদের ওপর নেমে আসা ধ্বংসযজ্ঞ; তারপর আশ্চর্য হয়ে দেখল, তাদের নিজ কুটিরটি স্বর্ণছাদমণ্ডিত হয়ে এক মার্বেল মন্দিরে পরিণত হয়েছে। এরপর জুপিটার তাদের প্রিয় ইচ্ছাটি জানতে চাইল। ফিলেমোন তার স্ত্রীর সাথে একটু আলাপ সেরে নিয়ে বলল, দেবতারা যেন তাকে এবং তার স্ত্রীকে আজীবন এই মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ও পুরোহিত বানিয়ে দেয়। ফিলেমোন আরও বলল, যৌবন থেকেই তারা একত্রে বেঁচেছে, একই সময়ে তারা মরতেও চায়, বাউচিজের চিতা যেন তাকে সাজাতে না হয় আর বাউচিজকে যেন তার কবর খুঁড়তে না হয়। অতঃপর তাদের ইচ্ছা পূরণ করা হলো আর মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত না-হওয়া পর্যন্ত মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তারা রয়ে গেল এবং একদিন অতিবৃদ্ধ হয়ে পড়ল। স্বর্ণখচিত মার্বেল মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে যখন তারা পরস্পর কথা বলছিল, আর স্মৃতিচারণ করছিল আগের সময়ের যখন তারা কত না সুখী ছিল! হঠাৎ তারা লক্ষ করল, তাদের গায়ে পত্রপল্লব জন্মাচ্ছে। মন্দিরটি যখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হলো তারা একে অপরকে দেখল যে তাদের শরীর পাতায় ছেয়ে যাচ্ছে, বাকলে ঢেকে গেছে তাদের শরীর। সে-মুহূর্তে তারা একে অপরকে শুধু বলতে পারল, ‘বিদায়, আমার দোসর,’ আর তখনই বল্কল ঢেকে দিল তাদের মুখমণ্ডলী, কথা শেষ না হতেই তারা রূপান্তরিত হলো। ফিলেমোন আর বাউচিজ রূপান্তরিত হলো: একজন ওক আর অন্যজন লিন্ডেন বৃক্ষে, কিন্তু তখনও তারা একত্রে, দুটো গাছ জন্ম নিল একই গুঁড়ি থেকে। দূর থেকে আসা মানুষজন বিস্ময় ভরে দেখত গাছ দুটোকে আর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা দেখাত তাদের।
একই ধরনের আরেকটি গল্পও রয়েছে যেখানে দাফনি অ্যাপোলোর ইচ্ছা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লরেল বৃক্ষে পরিণত হয়েছিল। গল্পটির মর্ম এই দাঁড়ায় যে, সময় তাদের ধ্বংস করতে পারল না, তারা সময়ধারাকে মেনে নিল আর সময় এবং নিজেদের রূপান্তর করল। ফিলেমোন ও বাউচিজ অমরত্ব চায়নি, তারা মানবীয় অবস্থার ঊর্ধ্বেও যেতে চায়নি, তারা তাকে গ্রহণ করেছিল, তারা কালের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। দেবতা বা সময়ের কাছ থেকে যে-রূপান্তর তারা পেয়েছিল উপহার তা ছিল প্রত্যাবর্তন: তারা প্রকৃতির কাছে প্রত্যাবর্তন করেছিল প্রকৃতিকে নিয়ে এবং প্রকৃতির ভেতর নিজেরা অংশভাক হওয়ার জন্য যা এক সার্থক রূপান্তর, প্রতিটি জীবিত সত্তা যা চায়। প্রাচীন এই বিশ্বাস বর্তমানে ভিন্ন এক শিক্ষা দেয়, বলেছেন পাস:
প্রাচীনকালে রূপান্তরের এই ধারণার ভিত্তি প্রোথিত ছিল তিনটি জগতের পারস্পরিক স্বতশ্চল যোগাযোগের ওপর, জগৎগুলো হলো: অপ্রাকৃতিক, মানবিক আর প্রাকৃতিক। নদী, গাছপালা, স্থাবর-জঙ্গম,সমুদ্র, সবকিছুই ছিল প্রাণময়, সবকিছুই সবকিছুর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করত, আর এই যোগাযোগের ফলে সবকিছুই রূপান্তরিত হয়ে যেত। খ্রিস্টানত্ব প্রকৃতির পবিত্রসংক্রান্ত ধারণাকে বাতিল করে দেয় এবং মানুষ ও প্রকৃতিকে বিভক্তিকরণের এক অনতিক্রমণীয় বিভাজনরেখা টেনে দেয়। নিম্ফরা পালায়, নাইড, স্যাটার এবং ট্রাইটনরা পরিবর্তিত হয়ে হয় দেবদূত বা শয়তান। আধুনিকতা বিবাহবিচ্ছেদকে প্রকটিত করে: একদিকে চূড়ান্তভাবে প্রকৃতি, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কারণে। এখন, আধুনিকতার অবসানে আমরা আবার পুনরাবিষ্কার করছি যে আমরা প্রকৃতির অংশ। পৃথিবী হলো সম্পর্কের এক সামগ্রিক সুসম্বন্ধতা বা, স্টোয়িকরা যেমন বলেছেন, উপাদানের চক্রান্ত যা সর্বজনীন সহানুভূতিতে অগ্রসরমাণ। আমরা এই সামগ্রিক সুসম্বন্ধতার জীবন্ত অংশ। মহাজগতের সাথে মানুষের আত্মীয়তার এই ধারণাই আদি প্রেমের ধারণায় প্রতিভাত হয়েছিল। এই বিশ্বাসই প্রথম কবির মধ্য দিয়ে শুরু হয়, পরিব্যপ্ত হয় রোম্যান্টিক কবিতায়, আর আমাদের কাছে তা হস্তান্তরিত হয়। একটি পর্বত ও একজন নারীর যে আত্মীয়তা বা একটি গাছ ও একজন পুরুষের যে আত্মীয়তা, তা-ই হলো প্রেমোপলব্ধির প্রধান ক্রিয়াকেন্দ্র। আজকাল প্রেম হলো, যেমনটা আগেও ছিল, প্রকৃতির সাথে পুনঃসম্পর্কায়নের এক পথ। আমরা হয়তো নিজেদের ঝরনা বা ওক গাছ, পাখি কিংবা ষাড়ে রূপান্তর করতে পারি না, কিন্তু আমরা নিজেদের এসবের মধ্যে চিনে উঠতে পারি।
অক্তাবিয়ো পাস আরও বলছেন:
প্রেম হলো সমগ্রতার পুনরুদ্ধার আর বিশাল সমগ্রতার অন্তর্গত সমগ্রতা হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার। আমরা যখন জন্মগ্রহণ করি, তখন আমরা সমগ্রতা থেকে চ্যুত হয়ে পড়ি; ভালোবাসায় আদি সমগ্রতায় প্রত্যাবর্তনকে অনুভব করি। এ কারণেই কাব্যিক চিত্রকল্প প্রেমীকে রূপান্তরিত করে প্রকৃতিতে–পর্বত, জল, মেঘ, নক্ষত্র, অরণ্য, সমুদ্র, ঢেউ–আর এর ফলে প্রকৃতিও কথা বলে ওঠে প্রেমিকের মতো।
পাস যা বলেছেন তার চিহ্ন আমরা দেখি হ্বের্টেরের মধ্যেও, হ্বের্টের লোট্টের মধ্যে জগতের সবকিছুকে মিলিয়ে দেখে, লোট্টের অস্তিত্বের মধ্যে জগতের সমগ্রতাকে আবিষ্কার করে। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে ফ্রয়েড ‘‘সামুদ্রিক অনুভব’’-এর কথা বলেছেন যখন সত্তার সংবেদন সকল অস্তিত্ব দ্বারা আবৃত এবং দোলায়িত, প্রেমও তা-ই। গ্যোয়েটের হ্বের্টেরের কাছে মনে হয়, একমাত্র ভালোবাসাই মানুষকে কাছের এবং অতি প্রয়োজনীয় করে তোলে। সোফোক্লেসও তাঁর আন্তিগোনে নাটকের কোরাসে বলেন, এ পৃথিবীতে সবকিছুই প্রেমের প্রজা, আর প্রেম অপরাজেয়।
আঁদ্রে ব্রেঁত তাঁর পাগল প্রেম (লে’মুর ফু) গ্রন্থে বলেছেন দুটো নিষেধের কথা যা প্রেমকে খুব মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়: সামাজিক অননুমোদন আর খ্রিস্টীয় পাপবোধ। এই দুটো প্রপঞ্চ, নানা বিবর্তনের এবং পরিবর্তনের মধ্যেও, এখনও সত্য হয়ে আছে। কোনো সমাজ বা ধর্ম বা এ দুয়ের মূল্যবোধ প্রেমকে আমন্ত্রণ তো জানায়ই না বরং তাকে মেনেও নিতে পারে না। যে পিতা-মাতা প্রেম করে বিয়ে করে, তারাও তাদের সন্তানদের প্রেমকে মেনে নেয় না, কারণ তারা প্রেমের সময়ে ছিল দ্রোহী ও অসামাজিক আর বিয়ের পর হয়ে ওঠে বিনীত এবং সামাজিক। যে-যুক্তি তারা নিজের জন্য বেছে নিয়েছিল তা-ই তারা প্রত্যাহার করে সন্তানদের ক্ষেত্রে। কিন্তু প্রতিটি খাঁটি প্রেমের মধ্যে থাকে এক ধরনের মুক্তবেগ যা পেরিয়ে যেতে চায় এই সামাজিক ও ধর্মীয় মাধ্যাকর্ষণকে। এটা করতে গিয়ে প্রেম নিজেও কক্ষচ্যুত হয়, এক অজানার মহাশূন্যে ছিটকে পড়তে হয়। কোনো না কোনোভাবে প্রেমিক-প্রেমিকা পতিত হয়ে যায়। তাদের অস্তিত্ব এমন ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যা বিলুপ্তির দিকেও নিয়ে যায় তাদের কখনও কখনও। কিন্তু এর ব্যাপকতর ক্ষতি ঘটে নারীদের ক্ষেত্রে। পুরুষকেন্দ্রিক সমাজ এক কৃত্রিম বিনয় নারীদের ওপর আরোপ করে খুশি থাকে। নারীদের কোথাও আবার বংশগৌরবের দায় বহন করতে হয়। পুরুষ-যৌনতা যেখানে উদ্যাপনযোগ্য সেখানে নারী-যৌনতা আতঙ্কের। কখনও তা নাড়িয়ে দেয় পরিবারের মান-মর্যাদা। ফলে নারী যখন প্রেমের স্বাধীনতাকে উপভোগের জন্য পছন্দকে গ্রহণ করে তখন হয়ে দাঁড়ায়, পাসের ভাষায়, কারাগার ভাঙার মতো বেআইনি বিষয়। প্রেমিক-প্রেমিকা বলে থাকে প্রেম তাদের বদলে দেয়, কথাটি নারীর ক্ষেত্রে শতভাগ সত্য। পাস বলেছেন, প্রেম একজন নারীকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত করে ফেলে, নারী যদি প্রেম করতে মনস্থ করে, সে যদি নিজের হতে চায়, তাহলে পৃথিবী তাকে যেভাবে বন্দি করে রেখেছে তার যাবতীয় প্রতিচ্ছবিকে সে ভেঙে বেরিয়ে আসে। প্রেমের ক্ষেত্রে নারী তাই দুঃসাহসী, পুরুষ বরং পরিকল্পিত ও সুবিধাবাদী। প্রেম করার জন্য পুরুষকে একটি স্তর অতিক্রম করতে হয় যা হলো তার নিজেকে অতিক্রমণ, যেখানে নারীকে অতিক্রম করতে হয় তিন থেকে চারটি যার মধ্যে অন্যতম হলো তা দেবিমূর্তি, মাতৃমূর্তি, সংসারমূর্তি, যৌনমূর্তি। তার স্বরূপের সাথে মিশে আছে তার নিজ সত্তা ও আরোপিত সত্তা। নারী তার নারীত্বকে আবিষ্কার করতে পারে না, পুরুষ যেভাবে তাকে আবিষ্কার বা চিহ্নিত করে তাতেই তাকে বাঁচতে হয়। ফলে প্রেমে পড়া নারীর জন্য আত্মধ্বংসের মতো একটি সিদ্ধান্ত। যে-পুরুষটি সম্পর্কের প্রেমহীনতায় ক্লান্ত হয়ে নতুন প্রেমে পড়ে, সেও তার স্ত্রীর এরূপ অবস্থাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। সুতরাং পছন্দের উদ্যোগ গ্রহণ নারীর জন্য যতটা ঝুঁকিময় পুরুষের জন্য তা নয়। তবে পুরুষও কখনও কখনও এই উদ্যোগ গ্রহণে নিষেধের বেড়াজ্বালে পড়ে। পুরুষ তার প্রথম নারীত্ব আবিষ্কার করে তার মা বা বোনের বা নিকটাত্মীয়ার মধ্যে এবং তারপর থেকে তার প্রেম নিষেধের বেষ্টনিতে পড়ে যায়। অজাচারের ভয়ে পুরুষের প্রেম ভীত হয়ে পড়ে। অনেক পুরুষের প্রেমই অজাচারকেন্দ্রিক থাকে যাকে সে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে না সমাজ ও পরিবারের নিষেধাজ্ঞার কারণে। যদিও আধুনিক সময়ে এসব ব্যাপার কমবেশি মীমাংসিত কিন্তু তবুও সামাজিক, নৈতিক ও স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধ একে কিছু মাত্রায় হলেও শাসন করছে। বিয়ের ক্ষেত্রে প্রেম বা পছন্দ অপেক্ষা পরিবারের ঠিক করে দেওয়া অধিক বাস্তবসম্মত আমাদের দেশে। ফলে প্রেমহীন একটি যৌনাবস্থার ভেতর দিয়ে অধিকাংশ মানুষ যায় এবং এক সময় তার মনে আসে যে ভুল মানুষের সাথে কেটেছে তার জীবন ঠিক প্রুস্তের হারানো সময়ের সন্ধান-এর সোয়ান যেমনটা ভাবে: ‘‘জীবনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময় আমি নষ্ট করেছি এমন এক নারীর সাথে যে আমার ধরনের নয়।’’ এই কথা হতে পারে ঠিক নারীরও উক্তি, এবং কোনো এক সময়ে দীর্ঘশ্বাসমথিত স্বরে সে তা বলেও বসে।
জীবনে তো আমরা খুঁজে ফিরি শারীরিক সৌন্দর্য। নারী, পুরুষ, পাহাড়, সমুদ্র সবকিছুতেই চাই শারীরিক সৌন্দর্য। বস্তু রূপে এসে হয়ে ওঠে বাস্তব। এমনকি অদৃশ্যেরও অবয়ব চাই। কিন্তু যখন শরীরকে ভালোবাসি তখন চেয়ে নিই একটি শরীর, একটি সৌন্দর্যের অবয়ব। এটা হচেছ পরিগ্রহণ যাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হতে পারে সৌন্দর্যের। কামোদ্দীপনা শুরুই হয় কাঙ্ক্ষিত শরীরকে ঘিরে, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, বাস্তব বা কল্পনায়। অনেকগুলো শরীর থাকলে সেখানে কাম খুঁজে নেয় একটি শরীর, তা ঢাকাই হোক বা নগ্নই হোক। এমনকি সংঘবদ্ধ কামক্রিয়ায়ও অবশেষে তা সত্য হয়ে ওঠে। শরীর হচ্ছে সেই বর্তমান যাকে ছিনতাই করে কাম। এই বর্তমান হলো একটি অবয়ব যা আবির্ভূত, যা ক্রিয়াশীল ও যা এমন এক যজ্ঞের সমিধ যেখানে ঋত্বিক কেউ নাই, শুধু আহুতি। যজ্ঞে যেমন কাঠ আত্মলোপিত, তেমনি এই কামাগ্নিতে সেই অবয়ব স্থির থেকে হয়ে ওঠে অস্থির, সসীম থেকে হয়ে ওঠে অসীম, আর বর্তমান থেকে হয়ে ওঠে সময়হীন। যেখানে আকার লোপ পায়, ব্যক্তি হারায় তার প্রকরণ, হয়ে ওঠে সংবেদন। এই সংবেদন অসংখ্য ও অসীম, ও অনিয়ন্ত্রিত। এই যে আনন্দের খমধ্য, এ অবস্থায় শরীর শরীরে লীন হয়। এই কামজ আবাহন লুপ্ত করে অবয়ব ও উপস্থিতি, এটা এক তুঙ্গ ও একাকার অবস্থা। এটা স্বরূপত্ব বিসর্জনের অভিজ্ঞতা। অসংখ্য সংবেদন আর স্বপ্নের মাঝে পরিব্যপ্তিক এক অবস্থা। সীমানাহীন পারাবারে ভেসে বেড়ানোর অবস্থা।
কেন এমন হয়? মানুষ কি একসাথে একজনের বেশি কাউকে ভালোবাসতে পারে না! এর কারণ কি এই যে, একজন মানুষ একসাথে একজনের বেশি কারও সাথে সম্ভোগ করতে পারে না এই? এখানেই হয়তো জন্ম নেয় প্রেমের দার্শনিকতা। এটা আশ্চর্যের নয় যে গ্রিসেই তা আবির্ভূত হয়েছিল কেননা তা-ই ছিল তার উপযুক্ত ভূমি। যাকে বলা হতো দর্শন, জগৎ ও জীবনের অনুসন্ধান, তার সূত্রপাত গ্রিসেই। গ্রিকরাই অঙ্ক, বিজ্ঞান আর দর্শনের জন্মদাতা। গ্রিসে বরাবরই দর্শন আর ধর্ম আলাদা ছিল, দর্শন ছিল বিজ্ঞানের প্রসারিত অংশ। গ্রিক দর্শনের সূত্রপাতই হয় পুরাণের সমালোচনা দিয়ে, গ্রিকরা যৌক্তিক চিন্তা দিয়ে দেবতাদের সমালোচনা করত। আর এক্ষেত্রে প্রেমের প্রথম দার্শনিক হলেন প্লাতোন যিনি তাঁর দর্শন দিয়ে এখনও আলোকিত করে রেখেছেন দর্শনের জগৎকে। সিম্পোজিয়াম হলো প্রেম-প্রশস্তি যার অবতারণা করেছেন সাত জন অতিথি বা বক্তা যাদের মধ্যে সোক্রাতেসও রয়েছেন ষষ্ঠ বক্তা হিসেবে। সোক্রাতেসের অংশটি প্লাতোনের নিজের চিন্তা। আরিসতোফানেসের বক্তৃতাটি ভিন্ন ও নতুন ব্যাখ্যা হিসেবে খুবই স্মরণীয়। নর-নারী বা মানুষে-মানুষে পারস্পরিক রহস্যের কারণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আদি উভলিঙ্গের বা নপুংসকের পুরাণের অবতারণা করেছেন। তিনি বললেন, আদিতে মানুষ ছিল তিন ধরনের: পুরুষ, নারী আর উভলৈঙ্গিক। আর এসব মানুষেরা ছিল গোলগাল নাদুশনুদুশ, তাদের প্রত্যেকের ছিল চার হাত, চার পা, মাথার দু-দিকে ছিল দুটো মুখ। পুরুষের জন্ম হয়েছিল সূর্য, নারীর পৃথিবী আর উভলিঙ্গের চন্দ্র থেকে। বলবান এসব মানুষেরা দেবতাদের মাঝেসাঝে আক্রমণ করত বলে দুর্বল করার জন্য তাদের কেটে দিল দেবতা জেয়ুস, ঠিক সুপারি কাটার মতো দু-ভাগ করে। কাহিনির স্থূলত্বকে বাদ দিলে প্রেমের দর্শন বিষয়ে আরিস্তোফানেসের বক্ততার মূল ভাব হলো, এই অর্ধেক করে দেওয়ার কারণে প্রত্যেক অর্ধেক মানুষ পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় হারানো অর্ধাংশকে পাওয়ার জন্য চালিত হয়: আর এটাই প্রেমের রহস্য। এক্ষেত্রে কোন অর্ধাংশ অন্য কোন কাঙ্ক্ষিত অর্ধাংশের সাথে মিলবে তা নির্ধারণ করে দেন কামদেব এরোস: হতে পারে পুরুষ-পুরুষ, নারী-নারী বা নারী-পুরুষ। কাহিনিটির আরেকটি দার্শনিক ব্যঞ্জনা হলো–আমরা সবাই অপূর্ণ, প্রেমের তৃষ্ণা বা কামনা হলো পূর্ণতার জন্য চিরন্তন কামনা। ব্যক্তিসত্তার পূর্ণতার সাথে জড়িয়ে রয়েছে নর বা নারীসত্তার পূর্ণতা। এটা আবার আনিমা বা অন্তর্নারীত্ব এবং আনিমুস বা অন্তর্পুরুষত্বের দ্যোতনাকারী। এই অপূর্ণতারই আরেক রূপক দেখা যায় আদমের পাঁজর থেকে ইভের জন্মের কাহিনিতে। এই চিন্তারই প্রতিফলন দেখা যায় ভারতীয় কায়াসাধনায় যেখানে মনে করা হয়, পিতৃ ও মাতৃসত্তা মানুষের ভেতরে অন্তর্লীন থাকে, আর প্রকৃত স্বরূপে মানুষ উভলৈঙ্গিক। অতএব পুরুষ ও নারীদেহ পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। বলা হয়ে থাকে যে প্লাতোন যে-প্রেমের দর্শনের কথা বলেছেন তা আসলে পরিশীলিত ও মহিমান্বিত কামের দর্শন। এটা অনেকের কাছে অবিবেচনাপ্রসূ বলে মনে হলেও হতে পারে তবে এর প্রমাণ মিলবে তাঁর সিম্পোজিয়াম বইটিতে। ফায়েদ্রুস-এও এর নজির আছে। সিম্পোজিয়াম-এ দাইআতাইমার বক্তব্যে প্লাতোন বলছেন, কোনো মানুষ যখন যথার্থ পথে বালকপ্রেম থেকে তাকে পেরিয়ে যায় আর সৌন্দর্যের দেখা পেতে শুরু করেন, তখনই তিনি উদ্দিষ্টলাভের নিকটে পৌঁছে যান; তার উচিত সুন্দর শরীরে গমন আর তারপর সুন্দর শরীর থেকে সুন্দর অনুশীলন, তারপর সুশিক্ষার অবয়বে উপনীত হওয়া। এ বক্তব্যের উপক্রমণিকায় রয়েছে নিখাঁদ কাম আর পরের অংশে রয়েছে কামের মহিমান্বিতকরণ। ফায়েদ্রুস-এ তো পুরোপুরিই পুরুষ সমকামিতা তথা বালমৈথুনের সৌন্দর্যায়ন যাকে প্লাতোন বলেছেন ‘‘ঐশী মাতালতা’’ যা অবশেষে আত্মদর্শন বা আত্মিক সৌন্দর্যায়নে উপনীত। ফ্রায়েদ্রুস-এ সোক্রাতেস আরও বলছেন, প্রেমিকের বন্ধুত্ব ক্ষুধা মেটানোর খাদ্যবস্তুর মতো।
কিন্তু সিম্পোজিয়াম-এর প্রধান আলোচনাই হলো সোক্রাতেসের বাচন। সোক্রাতেস তাঁর শ্রোতাদের শোনাচ্ছেন এমন এক অভিজ্ঞতার কথা যা তাঁর সাথে আলোচিত হয়েছিল মানতিনিয়ার এক জ্ঞানী সন্নাসিনী দাইআতাইমার। প্রেম হচ্ছে কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণ বা মোহ, ফলে প্রেম অন্যনির্ভর। এটা আশ্চর্যের যে সমকামীদের উপস্থিতিতে সোক্রাতেস শুনাচ্ছেন এমন এক প্রেমের দর্শন যা তিনি পেয়েছেন এক গুণবতী নারী দিয়োতিমার কাছ থেকে। এরোস বা কামদেব একজন সুদর্শন ও অপ্রতিরোধ্য–সোক্রাতেসের মুখে এই কথা শুনে দিয়োতিমা এই বলে শুরু করেছেন যে, প্রেমদেব এরোস শুভও নয়, সুদর্শনও নয়। তাহলে প্রেমদেব কি কুশ্রী, সোক্রাতেসের এই জিজ্ঞাসায় সে বলল, সুন্দর না হলেই কি কুৎসিত হয় কোনোকিছু। জ্ঞান ও অজ্ঞানের মাঝে আর একটি অবস্থা আছে। দাইআতাইমা আরও বলল যে, এরোস হলো না দেবতা না মানব; বরং এ দুয়ের মাঝামাঝি একজন। এরোস হচ্ছে আত্মা যে মানব ও দেবতাদের মাঝে সংবাদ বহন করে আর তার ব্যাখ্যা দেয়। দাইআতাইমার ব্যাখ্যা অনুযায়ী জ্ঞান হচ্ছে সবচেয়ে সুন্দর আর প্রেম হলো সৌন্দর্যের প্রেম, প্রেম সর্বত্রই সৌন্দর্যের অন্বেষক ফলে প্রেম থাকে জ্ঞান ও অজ্ঞানের মাঝামাঝি। প্রেম নিজে সুন্দর নয় কিন্তু সে সুন্দরের অভিলাষী। সুন্দরের প্রতি প্রেমের যে আকাঙ্ক্ষা তার কারণ হলো সুখী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই সুখ নশ্বর নয়, চিরন্তন। একই বস্তুর প্রেমিক যদি সকলে হয় তবু একপ্রকার ভালোবাসাকেই আমরা প্রেম বলি, অন্য ধরনের ভালোবাসাকে অন্য নামে ডেকে থাকি। এই প্রেম ও তার অভীপ্সার কারণ হলো মর মানুষের বা প্রকৃতির অমরত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, আর এই অমরত্বের এক পথ হলো প্রজনন। প্রতিটি মানুষই মনে করে তার সময় শেষ হয়ে আসছে, কারণ সে মরণশীল। ফলে তার অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তাকে প্রজননের দিকে নিয়ে যায়। সুতরাং প্রজনন হলো প্রেমের এক অনিবার্য উপাদান। নর ও নারী যার যার সৌন্দর্যে আকর্ষিত হয়ে শারীরিকভাবে মিলিত হয় নিজেদের বৃদ্ধি করার জন্য। প্লাতোন বলেছেন, প্রজনন হলো মানুষ ও প্রাণীর জন্য একটি মহান প্রাপ্তি। কিন্তু আরেক ধরনের প্রজনন হলো সবচেয়ে মহৎ, আত্মায় আত্মায় মিলন যার থেকে প্রজনন হয় অবিনাশী চিন্তা ও অনুভূতির। যারা আত্মার পথে উর্বর হয়, তাঁরা চিন্তায় পূর্ণ হয়, তাঁরা হলো কবি, শিল্পী, সাধু, আর আইনপ্রণেতা যারা তাঁদের অনুগামী ও নাগরিকদের আধুনিকায়নের শিক্ষা দেয়। যৌবনে শারীরিক সৌন্দর্যে আমরা মুগ্ধ ও আকর্ষিত হই, আমরা ভালোবাসি একটি শরীর, একটি সুন্দর অবয়ব। যা আমরা ভালোবাসি তা যদি সৌন্দর্য হয় তবে কেন ভালোবাসি একটি শরীর, অনেক নয় কেন? সুন্দর যদি বহু ও অনেকান্ত হয় ধারণা ও অবয়বে, তাহলে তাকে একা ভালোবাসা যায় না কেন? কেন আবরণ ও অবয়বের ঊর্ধ্বে উঠে সেই বস্তুকে ভালোবাসা যাবে না যা তাকে করেছে সুন্দর? দাইআতাইমার কাছে প্রেম হচ্ছে এক মই, যার গোড়ায় থাকে একটি সুন্দর শরীর, তারপর থাকে অনেক সুন্দর শরীর, তারপর সুন্দর নিজে, একা; তারপর মহান আত্মা, আর অবশেষে দেহাতীত সৌন্দর্য। সত্যম, শিবম আর সুন্দরম হলো একের ভেতরে তিন, একটি সত্যিকার বাস্তবতার তিনটি দিক। এই স্তরীয় সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অবশেষে আসে তূরীয় সৌন্দর্য যা ন্যায্য, প্রজনন-ঊর্ধ্ব এবং স্থির। এভাবেই মেকি ও ছায়াবৎ সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে সৌন্দর্যের সত্য আবির্ভূত হয়।
আমাদের মনে রাখা উচিত, যে-ব্যাখ্যা বা দর্শনের সূত্রপাত হলো দাইআতাইমার বাচনে, তার চেয়ে জনপ্রিয় দর্শন এক্ষেত্রে আর আসেনি, হয়তো আসবেও না, কারণ এখানে উত্তরণের যে পর্যায় বর্ণিত তা মানবীয় কামনার চিরন্তনতাকে প্রতিফলিত করেছে। দেবতাদের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ চোখে পড়ে না, কারণ দেবতাদের বস্তুত কোনো উত্তরণ নেই, বরং মর্ত্যমানবের এতসব বৈচিত্র্যই দেবতাদের আগ্রহের বিষয়। দর্শন মানুষকে যা উপহার দেয় তা হলো এক উদ্গতি বা ভ্রমণ যা রয়েছে এই দার্শনিক ব্যাখ্যায়। মানুষের জীবনচক্রের যে মনোশারীরিক অবস্থা, তাতেও তা নিমিষেই খাপ খেয়ে যায়। দাইআতাইমার এই দর্শনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে কাম বা কামের একগামিতা, তারপর বহুগামিতা, আর সবশেষে স্বর্গীয় প্রেম যেখানে সত্তা সৃষ্টিশীল হয় প্রজ্ঞাত্বকে অর্জন করে। এই মাত্রিকতা ইউরোপীয় সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে মধ্যযুগে যদিও গ্রিসে তা তেমন আঁচ রাখতে পারেনি। দান্তের বেয়াত্রিচে বা পেত্রার্কের লউরার আবির্ভাব এই দর্শনকেই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু কথা হলো, দাইআতাইমার সংলাপীয় মাধুর্যে কি প্রেমকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে নাকি কামকে, কেননা প্রথম দুটো স্তর তো কামের শস্যক্ষেত্রের কথা, কেননা তা শারীরিকতা, কেননা তা শুধু ইন্দ্রিয়ময়তা, আর শেষটি তো আসলে বিমূর্ত ও পরাসৃষ্টিশীল দশা যেখানে অনিবার্যতই শরীর অনুপস্থিত। তাই মনে হয়, দাইআতাইমা বা সোক্রাতেস বা প্লাতোন আসলে বলেছেন কামের বা এরোসের কথা যা প্রাণীজও নয় আধ্যাত্মিকও নয়। এখানে স্পষ্ট হওয়া দরকার কাম আর প্রেমের একাকিত্ব বা পার্থক্যের বিষয়টিকে। প্রেমে কাম আছে–প্রচ্ছন্ন বা সরাসরি যেভাবেই হোক না কেন, কিন্তু কামে প্রেম নাই, বা থাকলেও ক্ষণিকের যা উদ্দিষ্ট সাধনের বা মনোযোগ নিবিষ্টের কৌশল মাত্র। এই ধারণা থেকে আমরা আরও দুটো ধারণা পাই–কামুক/লম্পট/লিবারটাইন এবং প্রেমিক/লাভার। আবার এখানেই আবির্ভূত হয় গণিত আর শিল্পের। লম্পটের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো গণিত, সে হিসাব করে কাম-গণিত যা জড়িত থাকে লিপ্সা, যেখানে থাকে পুরুষতন্ত্র, তার উদ্দেশ্য গাণিতিকভাবে নারীকে ভোগ করা যা কল্পনাকে ভর করে হয়ে থাকে, আর প্রেমিকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিল্প যা আসলে পূর্ণতাকাঙ্ক্ষী, যা তার নিজের চেয়ে অন্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু কীভাবে প্রেমকে আলাদা করা যায় অন্য অনুভূতিজাত মানসিক অবস্থা থেকে? বন্ধুত্ব ও প্রেমের সম্পর্ক কী? বন্ধুত্ব কী প্রেম নয় বা প্রেম কি উচ্চ পর্যায়ের বন্ধুত্ব নয়? ইন্দ্রিয়সুখ বা শারীরিক উপাদানগুলো বাদ দেওয়া গেলে এই দুয়ের মিল অনেকটা স্পষ্ট হয়। দুটিই আন্তঃব্যক্তিক, দুটিই আইন ও প্রথামুক্ত স্বাধীনভাবে গৃহীত অনুরাগ। বন্ধুত্ব অসংখ্যের সাথে হয় না, ব্যক্তির সাথে হয়। পছন্দ ও স্বাতন্ত্র্য বন্ধুত্বের যেমন শর্ত তেমনি প্রেমেরও। কিন্তু প্রেম একমুখীন ও একতরফা হলেও বন্ধুত্বে তা অসম্ভব। কেউ একজন অন্যের সমর্থন ও সম্মতি ছাড়া বন্ধুত্ব করতে পারে না কিন্তু প্রেম হয়তো করতে পারে। অর্থাৎ বন্ধুত্বে পারস্পরিকতা শতভাগ বাস্তবানুগ, প্রেমে ঠিক তা শতভাগ নয়। তবে কেউ অন্যের সম্মতি ছাড়া প্রেমে পড়া আর যা-ই হোক অসম্ভব না হলেও অবান্তর। আর একটা ব্যাপার হলো, প্রথম দর্শনে প্রেম হলেও বন্ধুত্ব নয়। বন্ধুত্ব হয় ধীরে ধীরে–পছন্দ, মত, উদ্দেশ্য, সহমর্মিতা, অংশভাগিতা ইত্যাদি জটিল পদ্ধতির ভেতর দিয়ে সম্পর্ক অবশেষে যে প্রগাঢ়তায় পৌঁছে, তাকেই বলে বন্ধুত্ব। প্রেমের শুরুটা হয় বিস্ময়ে, তাতে কাজ করে একে অপরকে আবিষ্কার করার উত্তেজনা ও অভিযান। দুজনই যেন হয়ে পড়ে আগন্তুক, বহিরস্থিত। প্রত্যেকে প্রত্যেককে উপহার দিতে চায় বিস্ময় যাতে বাড়ে মুগ্ধতা, এবং এর ফলে দুজনই হয়ে পড়ে দুঃসাহসী। প্রেমের জন্ম নির্জনে, একা একা, এবং তা গোপন করে নিজেকে আর জানান দেয় অনেক পরে। পক্ষান্তরে বন্ধুত্ব হয় গোষ্ঠীতে, মতৈক্যে, তা শুরু থেকেই বহির্মুখী। সহমর্মিতা ধীরে ধীরে সম্পর্কপ্রাপ্ত হয়ে বন্ধুত্বে উপনীত হয়। সুতরাং বন্ধুত্ব সময়ানুবর্তী কিন্তু প্রেম স্বতঃস্ফূর্ত এবং আকুলিত। প্রেম মোহান্ধ, বন্ধুত্ব স্বচ্ছ। আর সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য হলো প্রেম শরীরী ও সংরাগময়, বন্ধুত্ব সামাজিক ও মানসিক। প্রেম চিরস্থায়ী নয়, প্রাকৃতিক কারণেই তা নয়, শরীর পুরোনো হয়, শরীরে ক্লান্তি ও একঘেয়েমি আসতে পারে, তাই প্রেমেরও পরিবর্তন হতে পারে, প্রেম তাই আপেক্ষিক ও ধ্বংসাত্মক কেননা তাতে রয়েছে বাসনা, ইন্দ্রিয়সুখ এবং নতুন প্রাপ্তির দুঃসাহস, কিন্তু বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হতে পারে, বন্ধুত্ব তাই গঠনাত্মক।
প্রাচীন গ্রিসে বন্ধুত্বকে বোঝাতে ব্যবহৃত হলো ফিলিয়া শব্দটি আর প্রেমকে বোঝাতে এরোস। ফিলিয়া হলো বন্ধুত্ব, তবে এর ব্যাপক কোনো মীমাংসাভাষ পাওয়া যায় না। লাইসিস-এর শেষ বাক্যটি এই অসম্পূর্ণতায়ই সমাপ্ত হয়, বন্ধুত্ব কী তা অনাবিস্কৃতই থেকে যায়। এরস বলতে বোঝাত আবেগময় প্রেম বা কামজ প্রেম। প্রাচীন গ্রিসে প্রেম অপেক্ষা বন্ধুত্বকে বড়ো করে দেখা হতো। আরিস্তোতলের কাছে বন্ধুত্ব হলো ন্যায়পরায়ণতা বা সদ্গুণ বা সদগুণসম্বন্ধিত বিশেষ সম্পর্ক, এমনকি তার চেয়েও–জীবনের জন্য সবচেয়ে দরকারি কিছু একটা। আরিস্তোতলের এই চিন্তন প্রভাবিত করেছিল প্লুতার্ক, কিকেরো ও অন্যদের বন্ধুতা-সম্পর্কিত শংসাবাচনে। আরিস্তোতল তাঁর নিকোমেকিয়ান এথিকস-এর অষ্টম অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন বন্ধুত্বের বিষয়টি। বন্ধুত্বের যে দর্শনকে তিনি এখানে উপস্থাপন করেছেন তা হলো–বন্ধুত্ব ছাড়া বাঁচতে পারি না আমরা। আরিস্তোতল এখানে তিন ধরনের বন্ধুত্বের কথা বলেছেন: স্বার্থ বা উপযোগিতার বন্ধুত্ব, আনন্দের জন্য বন্ধুত্ব আর খাঁটি বন্ধুত্ব যার নির্ভরতা ভালোবাসায়, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য সমান মঙ্গল কামনা করে। প্রথম দুই ধরনের বন্ধুত্ব অপ্রত্যক্ষ ও পারিপাশ্র্বিকতানির্ভর ফলে স্বল্পস্থায়ী, তৃতীয়টি হচ্ছে সর্বোচ্চ যা মানুষের কাঙ্ক্ষিত। আরিস্তোতলের কাছে বন্ধুত্ব হচ্ছে আত্মন, মানুষ তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু আবার একজন মানুষ নিজের স্বার্থ চিন্তা না করেও বন্ধুর কথা ভাবে, এমনকি মৃত্যুবরণও করে। এরই অনুসরণে ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, বন্ধু যেন আরেকজন আমিই, প্রকৃতপ্রস্তাবে নিজের চেয়েও অনেক বেশি হচ্ছে বন্ধু। আরিস্তোতলের বন্ধুত্বের সংজ্ঞাকে অনেকে মনে করেন অবাস্তব, অনেকটা নৈতিক। একজন খারাপ লোক একজন ভালো লোকের ভালো বন্ধু হওয়ার নজির রয়েছে। আরিস্তোতল বলেছেন, তরুণদের পক্ষেই বন্ধুত্ব সহজলভ্য, কিন্তু সহজেই তা চলেও যেতে পারে, ফলে বন্ধুত্ব প্রবীণদের সাথেই মানানসই। কিন্তু যেহেতু বন্ধুত্ব সম্পাদনমূলক হলেও তার সাথে আবেগ উচ্চমাত্রায় জড়িত, তাই তারুণ্যেই বন্ধুত্ব অধিক স্বাভাবিক, ও স্বাচ্ছন্দ্যকর।
প্রেম ও বন্ধুত্ব, উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে ব্যাখ্যাতীত এক পূর্বনির্ধারিত শক্তি। উভয়ই জীবনের জন্য উপযোগী এক প্রপঞ্চ। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যটাও অতি পরিষ্কার, গুলিয়ে ফেলার অবকাশও নেই। প্রেমের ক্ষেত্রে যদিও কাজ করে পছন্দ বা নির্বাচন তবু বন্ধুত্বের নির্বাচন বা পছন্দের থেকে তা ভিন্ন; প্রেম হচ্ছে অগ্নি, অধিক সাঁধানো, অধিক ক্রিয়াশীল এবং অধিক কঠোর; কিন্তু তা হলো এক বেপোরোয়া ও পরিবর্তনশীল অগ্নি, এক জ্বরো অগ্নি, আর অন্যদিকে বন্ধুত্ব হলো এক মোলায়েম ও সর্বজনীন উত্তাপ, স্থিতিস্থাপক, অধিকন্তু নমনীয়, এবং স্থির ও প্রশান্ত উত্তাপ, কোনোরকম কাঠিন্য ছাড়াই কোমল ও মসৃন–বলেছেন ফরাসি চিন্তাবিদ মতেঁইন। বন্ধুত্ব হলো উল্লেখযোগ্যভাবে একটি সামাজিক সদগুণ যা প্রেম অপেক্ষাও অধিকতর সহনীয়। প্রেম দ্রোহাত্মক, বেকন বলেছেন, প্রেম বাড়াবাড়ি করে, সব নিয়মকানুনকে এমনভাবে লঙ্ঘন করে যা আশ্চর্যের জন্ম দেয়। প্রেম সবসময়ই সমাজ ও সম্প্রদায়ের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। প্রেমে স্থিরতা থাকে না, বেকন বলেন, প্রেমে পড়ে বিচক্ষণ থাকা অসম্ভব, প্রেমের জন্য মানবমনের ভেতরে থাকে চিরন্তন এক আকুতি। প্রেমের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সৌন্দর্য যার ভিত্তি শরীর কিন্তু বন্ধুত্বের জন্য দরকার মানসিক সৌন্দর্য। কিন্তু প্রেম বা বন্ধুত্ব কি সহোদর ? অর্থাৎ এই দুয়ের চেতন ও অবচেতন এলাকা কী? আমরা বলেছি যে এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো শরীর আর মিল হলো মন। তাহলে যদি এ দুটিকে মেলাতে চাই তবে তা কীভাবে সম্ভব? বিষয়টিকে আরও একটু খোলাসা করে বলা যায়, প্রেমের ক্ষেত্রে কি বন্ধুতা সম্ভব, বা হয়? লাইসিস-এ সোক্রাতেস এ প্রশ্নটি তোলেন যে প্রেমিক যদি বন্ধু না হয় বা প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়ে যদি বন্ধু না হয় তখন কাকে আর বন্ধু বলা যায়? সোক্রাতেস এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি আর দেন না কিন্তু অন্যভাবে বলেন যে একে অন্যের সমধর্মী হলেও বন্ধু না-ও হতে পারে। বাৎস্যায়ন কামসূত্র-এ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যে গণিকা কি প্রেমিকা হতে পারে, পারলে তাদের প্রেমের ধরন কেমন, তা কি স্বাভাবিক নাকি কৃত্রিম? কিন্তু তিনিও এর উত্তর যথাযথভাবে না দিয়ে তা কঠিন বলে বিরতিতে গেছেন।
কিছু কিছু বিষয়ে আমরা দেখেছি যে বন্ধুত্ব ও প্রেম এই দুয়ের মধ্যে কতকগুলো সাধারণ সংগতি রয়েছে, কিন্তু প্রেম বন্ধুত্বকে বাতিল করে কারণ বন্ধুত্বের মধ্যে যে নিরীহতা বর্তমান প্রেম তাকে অপছন্দ করে, তাছাড়া প্রেম যেখানে বিপ্লবাত্মক বন্ধুত্ব সেখানে বিবর্তনবাদী। এ দুয়ের মধ্যে আবার কালগত পার্থক্য আছে: প্রেম যেখানে কালকে হরণ করে, বন্ধুত্ব সেখানে কালকে মান্যতা দিতে চায়। কোনোরকম গন্ডোগোল না পাকিয়েই বন্ধুত্বের ধারণা টিকে থাকে প্রেম সেখানে গন্ডোগোল পাকিয়ে সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দেয়। প্রেম অশান্ত আর বন্ধুত্ব নিরীহ। এ দুয়ের পার্থক্য মার্কস আর বার্নাড শ-র সমাজতন্ত্রের মতো। মতেঁইন মনে করেন, প্রেম ও বন্ধুত্বের ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ অসম্ভব। তাঁর মতে, প্রেমিকা বন্ধু হতে পারে না, কারণ বিয়ে। যদিও বিয়ে হয় পছন্দের ভিত্তিতে তবু, তিনি মনে করেন, বিয়েতে রয়েছে অসংখ্য বহুবিধ স্বার্থ ও আবেগ যা নিজ বলয়ে প্রেমকে জায়গা করে দেয় না। আরও অগ্রসর হয়ে মতেঁইন বলে বসেন যে, এটা ভালোই হতো যদি প্রেমিক-প্রেমিকার দেহমন বন্ধুতার দ্বারা একাত্ম হওয়াকে উপভোগ করত কিন্তু এক্ষেত্রে বাধা হলো নারীর মন, কারণ নারীর মন এই নিবিড় ও দীর্ঘস্থায়ী মর্মবন্ধনের বাঁধো বাঁধো ভাবকে সহ্য করতে পারে না। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাচীনদের মতো মঁতেইনও বলে বসেন যে, নারীযৌনতা বন্ধুত্বের জন্য অসমর্থ। এর সমালোচনা করে ওক্তাবিয়ো পাস বলেছেন, মতেঁইনের বিয়ের ধারণা এখন পরিবর্তিত, আধুনিক বিয়ে কোনোভাবেই অবিচ্ছেদ্য নয়। অর্থাৎ আধুনি কালের বিয়ে অনেকটা খোলামেলা যা সম্পর্ককেই সুন্দর করতে চায়, সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়িত্বের দিকে নজর দেয় না। এটা ঠিক যে নারীবন্ধুত্বের তেমন উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ইতিহাস বা সাহিত্যে নেই। না থাকার কারণ হলো শতাব্দের পর শতাব্দ ধরে নারী ছিল অবরুদ্ধ। প্রাচীন রোম, গ্রিস, চীন বা ভারতের নারী-ইতিহাস এখনও অলিখিত। তবু আমরা দেখি বেশ কিছু নারীকে, যেমন সেন্ট পাউলা, ভিকতোরিয়া কোলোন্না, গার্গি, মৈত্রেয়ী, জাবালা প্রমুখ, যারা ছিলেন সে যুগের কবি-শিল্পী-দার্শনিক-ধর্মতত্ত্ববিদদের বন্ধু। তবে এটা ঠিক যে পুরুষে-পুরুষে বন্ধুত্বের তুলনায় নারী-নারীতে বন্ধুত্ব অনেক কম। যা-ই হোক, প্রেম যেমন বন্ধুতে পরিণত হতে পারে তেমনি বন্ধুত্বও প্রেমে পরিণত হতে পারে।
আমরা বলে থাকি দেশকে ভালোবাসি আমরা, ভালোবাসি আমাদের ধর্মকে, বা আদর্শকে। কিন্তু বাংলায় আমরা বলি না দেশকে প্রেম করি আমরা। সুতরাং কী পার্থক্য এই দুইয়ের ভেতর। প্রেমিক বা প্রেমিকাকে বলি আমি তোমাকে ভালোবাসি আবার মাকেও বলি তা কিন্তু এই দুইয়ের ভেতর রয়েছে আকাশসমান পার্থক্য। দেশকে বা মাকে যে ভালোবাসা, তাতে থাকে না কামোপাদান কোনো, থাকে না শরীর-আকর্ষণ। প্রেমের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অনুরাগ ব্যক্তিতে, কোনো বিমূর্তে নয়। প্রেম পারস্পরিকতার অন্বেষণ, অনেকের ভেতর থেকে একজনকে নির্বাচন। মা, বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়ের প্রতি যে ভালোবাসা তা হলো তাদের প্রতি এক বিশেষ ধনাত্মক ঝোঁক বা প্রবণতা। ধর্ম বা প্রথা বা নৈতিকতা বা রক্তের সম্পর্কের বিধানে তা সমত্থিত। এক্ষেত্রে কোনোরকম প্রণয়ঘটিত উদ্দীপনা বা যৌনলিপ্সা কাজ করে না। কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত, প্রেম প্রথা-ধর্ম-নৈতিকতা বিরোধী হিসেবেই খ্যাত। সন্তানপ্রেম, ভার্তৃপ্রম, পিতৃপ্রেম, মাতৃপ্রেম আসলে প্রেম নয়, এসব হলো সুকৃতি বা সদাচার ইংরেজিতে যাকে ধর্মীয় অর্থে বলে piety। শব্দটি এসেছে লাতিন pietas থেকে যা বোঝায় ঈশ্বর, পিতামাতা, স্বদেশের উদ্দেশ্যে আরোপিত বিশেষ গুণ। প্রাচীন রোমে দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ বা ধর্মানুরাগকে বলা হতো pietas। এটা আবার বোঝায় করুণা (piety) খ্রিস্টানদের কাছে যার আরেক মানে হলো মহানুভবতা। সদাচার বা piety এসেছে এই ধারণা থেকে যে মানুষ এই পৃথিবীতে নিক্ষেপিত বা পরিত্যক্ত, এবং বিচ্ছিন্নও, সুতরাং মানুষের চিরায়ত অন্বেষণ হলো ঈশ্বরে পৌঁছা যে ঈশ্বর মানুষের পরমপিতা বা স্রষ্টা। অতএব ঈশ্বরপ্রেম হলো অপত্যপ্রেমের সাথে সম্পর্কিত। পিতামাতার প্রতি আমাদের কাঙ্ক্ষা যেহেতু অনৈচ্ছিক সুতরাং তা মানবীয় প্রেম নয়, তা হলো চ্যারিটি বা হৃদয়ের দাক্ষিণ্য, বা প্রসারতা। ‘‘ডিভাইন লাভ’’ বা দিব্যপ্রেম আসলে একটি ধারণা যা পবিত্র বা বিশুদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের অনুরাগের এক অপর রূপ। বেয়াত্রিচেকে না-পেয়ে দান্তের প্রেম যেমন দিব্য হয়ে উঠতে চায়, তেমনি প্রিয় বস্তুকে না-পেলে মানুষ সেই বস্তুর প্রতি তার অনুরাগকে প্রতিস্থাপন করতে মনোযোগী হয়ে ওঠে যা প্রকারান্তরে দিব্যপ্রেমে রূপলাভ করে।
কিন্তু কাকে বলে প্রেম? অক্তাবিয়ো পাস প্রেম ও কামের সম্পর্ক ও পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে ব্যবহার করেছেন বহ্নিশিখার রূপক। তিনি বলেছেন, আদি ও মৌলিক অগ্নি হলো যৌনতা যা থেকে কামের লোহিত শিখা প্রজ্জ্বলিত হয়, আর এই শিখা অতঃপর আরেকটি শিখাকে জাগিয়ে তোলে যা কম্পমান, যার রং নীল: প্রেমের শিখা; কাম ও প্রেম তাই, জীবনের দ্বৈত শিখা। যে জলবিভাজনরেখা পার্থক্য টানে কাম ও প্রেমের, তাকে বুঝতে গেলে জানবে হবে শুধু একটি শব্দ–অনিবার্যতা। কিন্তু এই অনিবার্যতাকে বুঝতে গেলে বুঝতে হবে আরও তিনটি শব্দের–সম্পর্ক, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতা যাকে বহিরাবৃত করে রাখে আবেগ। গ্রিকরা সম্ভবত তা জানত না। দিয়োতিমা প্রশ্ন তুলেছেন কেন সৌন্দর্যবস্তু অনেক হলেও একটিতে মানুষ প্রবেশ করে, কিন্তু তিনি তার উত্তর দিতে পারেননি। কাঙ্ক্ষিত বস্তু অনেক হলেও একটিতে ব্যক্তি যায় এই তিনটি শর্তাধীনে–সম্পর্ক, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়পরায়ণতায়, তা না হলে সে সব সৌন্দর্যকেই উপভোগ করতে পারত। প্রেম হচ্ছে গ্রহণের একটি অবভাস। দাইআতাইমা কাম বা প্রেমকে বলতে গিয়ে প্রকারান্তরে এ দুটোকেই পরিহার করেছেন অবশেষে। প্রেমের ক্ষেত্রে সম্পর্কের কথা বলছেন না প্লাতোন, তাঁর প্রেম যেন এক একক নিঃসঙ্গ অভিসার বা অভিযান। তত্ত্বের সৌন্দর্য সত্ত্বেও মনে হবে কামদেবের নিছক অভিযানই যেন এখানে সার। সাধারণত সৌন্দর্যচিন্তায় ভাব বস্তুতে পরিণত হয়, বস্তুও ভাবে পরিণত হয়। কোনো বস্তুকে দেখে আমরা তাতে সৌন্দর্য আরোপ করি, সৌন্দর্যের চিরন্তন বা আপতিক ভাব তখন বস্তু হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রেমে বস্তু ভাবে পরিণত হয়। কিন্তু প্লাতোনের প্রেমের ক্ষেত্রে তা হয় না। প্লাতোনের কামোদ্দীপক বস্তু, তা শরীর বা আত্মা বা বালক যা-ই হোক না কেন, তা কখনোই ভাব হয়ে ওঠে না। তাদের শরীর কিছু ভাবে না, তাদের আত্মাও থাকে নিশ্চুপ। তারা সত্যিকারের বস্তু যা শুধু দার্শনিকের অভিযানের পশরা সাজায়। প্লাতোন যে আত্মার কথা বলেছেন তা-ও এখন মনোশারীরিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে আলোচিত নয়। তা যুক্ত রয়েছে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বেলায়। অবশ্য আত্মার ধারণা গ্রিকদের আবিষ্কার নয়। তাদের চিন্তায় যা ছিল আত্মা তা আজকের ধর্মীয় বিবেচনায় এক না। হোমারে মৃতদের আত্মা সত্যিকারের আত্মা নয়, তা হলো অশরীরী সত্তা, অনেকটা ছায়াবৎ। প্রাচীন গ্রিকদের কাছে শরীর ও আত্মার পার্থক্য স্বচ্ছ ছিল না। এ দুয়ের পার্থক্য-ধারণা প্রথম আসে সোক্রাতেসপূর্ব পিথাগোরাস ও এমপেদোক্লেস-এর মধ্যে। প্লাতোন তা পরিগ্রহণ করেন এবং তাঁর উত্তসূরিদের দিয়ে যান। শরীর-সংক্রান্ত প্রাচীন গ্রিক ধারণাও এখন আর নেই। সম্ভবত গ্রিকরা মনে করত, শরীর হলো প্রাকৃতিক আধার। কিন্তু আজকের শরীর-ধারণা অনেক জটিল। শরীর যেমন এক ভৌতবস্তু তেমনি তা আবার সমাজ দ্বারা সৃষ্টও। সুতরাং শরীরকেন্দ্রিক যৌনতার ধারণাও তাই এখন ভিন্ন। কিন্তু যেভাবেই দেখি না কেন, প্রেম এক মর্ত্যভাবনা, কোনোভাবেই তা স্বর্গীয় নয় যদিও আমরা বলে বলে ক্লান্ত যে স্বর্গ থেকে আসে প্রেম স্বর্গে চলে যায়। প্রেম স্বর্গীয় এই ধারণা জীবনবিরুদ্ধ এক অতিশয়োক্তি, এবং সবচেয়ে বড়ো ভ্রান্তি, কেননা স্বর্গে থাকবে না কোনো অভাববোধ, তাই পূর্ণতার কোনো ইপ্সা সেখানে থাকবে না। বরং কাম স্বর্গীয়, আদি মানবমানবীর স্বর্গাবস্থান কামময় ছিল। প্রেম হলো মর্ত্যবোধ, যে মর্ত্যবোধ বলে যে স্বর্গকে পেছনে ফেলে রেখে আমরা এসেছি এই পৃথিবীতে সেই স্বাধীনতার জন্য যা ছিল স্বর্গে অপ্রাপণীয়। আর প্রেমে-পড়া হলো মর্ত্যমনস্তত্ত্বের বিকার যার ক্ষেত্র হচ্ছে শরীর। শরীর হলো সেই সমিধ যে উপহার দেয় কামাগ্নি। প্রেম তাই কামকে নিরঙ্কুশ ও সৌন্দর্যময় করার এক উদ্গীতি। কিন্তু মনে রাখা দরকার, কামের জন্য প্রেম বাধ্যতামূলক নয়, অনেকেই বা অনেক সময় প্রেম ছাড়াই চলতে থাকে কামের অবধারিত চর্চা, কিন্তু প্রেমের ভাব ও ছন্দ হলো কাম। শরীরই প্রেমের ইনফের্নো এবং পারাদিসো, কারণ শরীরই প্রেমের উত্থান ও গমনভূমি, কেননা প্রেমের জন্য সহ্য করে সব শারীরিক যন্ত্রণা অবশেষে প্রাপ্তিযোগে আবার শরীরই হয় প্লুত, আর তৃপ্ত।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com