ইংরেজ-রাজের রোষানলে নজরুল : ফিরে দেখা

মুহিত হাসান | ২৭ আগস্ট ২০১৭ ৫:০৯ অপরাহ্ন

Nazrul islamমনোবিকারগ্রস্ত নিন্দুককুল ও বিদ্রোহত্রস্ত ঔপনিবেশিক সরকারি মহল, এই দুই মহল নজরুলের উত্থানকাল থেকে তাঁর অসুস্থ হয়ে পড়ার আগ অব্দি তাঁকে হেনস্তা করতে উদ্যোগী ছিল– এমনটা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তবে ব্রিটিশরাজের তুলনায় নিন্দুকদের পীড়ন ছিল নেহাতই মামুলি। তারা কুরুচিপূর্ণ লেখায়-কথায় তাঁকে হেয় করতে চাইতো। আর ব্রিটিশরাজ নজরুলকে ঘায়েল করতে চেয়েছিল বই নিষিদ্ধ করে, এমনকি জেলে ভরেও।
নজরুল ঠিক কোন সময়টায় প্রথমবারের মতো ইংরেজ-রাজের নজরে পড়েন, তা দিনক্ষণ মিলিয়ে বলা মুশকিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাঙালি পল্টনে সৈনিক হিসেবে কর্মরত নজরুল রুশ বিপ্লবের খবর জেনে উৎসাহিত হয়েছিলেন এমন খবর তাঁর সহ-সৈনিক শম্ভুনাথ রায় দিয়েছেন। পল্টন থেকে ফিরে আইরিশ বিপ্লবী রবার্ট এমেটের জীবনকথাও রচনা নজরুল করেছিলেন ছদ্মনামে। কাজেই ব্রিটিশরাজ-বিরোধী মনোভাব যে পরাধীন স্বদেশে জন্ম নেওয়া নজরুলের মধ্যে তরুণ বয়স থেকেই প্রবাহিত হচ্ছিল এমনটা বলা অসংগত নয়। এসব কর্মকান্ড ইংরেজ সরকারের স্বভাবতই ভালো লাগবার কথা নয়। তবে পল্টনে থাকার সময়েই তিনি বিপ্লবপ্রীতির কারণে ব্রিটিশরাজের গোয়েন্দাদের নজরে পড়েছেন, এমন খবর মেলে না। গবেষক শিশির করের ধারণা, ১৩২৮ বঙ্গাব্দে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম প্রকাশের পর থেকেই পুলিশ দপ্তর নজরুলের ব্যাপারে নড়েচড়ে বসেছিল। কিন্তু তখন কবির বিরুদ্ধে আইনানুগ পথে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে কীভাবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল। কারণ, ঠিক কোনদিক থেকে এখানে সরাসরি ইংরেজ সরকারকে আক্রমণ করা হয়েছে, তা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নির্ণয় করতে পারেননি। নজরুলের সমসাময়িক কথাসাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ধারণা ছিল যে “এ কবিতায় হিন্দু-মুসলমান দু’জনেরই এত পুরাণ প্রসঙ্গ ঢুকেছে যে ব্রিটিশ সরকার সরাসরি একে রাজদ্রোহ বলে চিহ্নিত করতে পারলো না।…একে রাজদ্রোহ বলতে গেলে ধর্মের উপরে হাত দেওয়া হবে।”

২.
‘বিদ্রোহী’ নিয়ে ইংরেজ-রাজের অস্বস্তি প্রকাশ্যে আসেনি ঠিকই, কিন্তু নজরুলের প্রতি নজরদারির ছায়া সম্ভবত এরপর আরো দীর্ঘ হয়। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলার প্রাদেশিক সরকারের তরফ থেকে গেজেট জারি করে ফৌজদারি বিধির ৯৯এ ধারায় তাঁর যুগবাণী শীর্ষক প্রবন্ধ-নিবন্ধ সংকলনটি নিষিদ্ধ করা হয়। যুগবাণী-র একাধিক রচনাতেই নজরুলের কড়া ব্রিটিশ-বিরোধীতা নজরে পড়ে। আয়ারল্যান্ড ও তুরস্কের অনুসরণে মুক্তির জন্য বিপ্লবের আহ্বান তিনি যেমন এতে জানিয়েছেন, তেমনি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা জেনারেল ডায়ারকে একটি লেখায় ‘কসাই’ ও ‘জালিম নরপিশাচ’ বলতেও ছাড়েননি। কাজেই এ বই যে ইংরেজ সরকারের ঘুম কেড়ে নেবার উপযুক্তই ছিল, সে তো বলাই বাহুল্য। এমনকি ১৯৪০ সালে যখন বইটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া যায় কিনা সেই বিষয়ে ভাবা হচ্ছিল, তখনও এক গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া উচিত হবে না। কারণ বইটি জাতিবিদ্বেষে পূর্ণ(!) ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করবে।
এরপর ১৯২৪ সালে নজরুলের দুটি কাব্যগ্রন্থ নিষেধাজ্ঞার খড়্গে পড়ে। বই দুটো হলো যথাক্রমে বিষের বাঁশিভাঙার গান। কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান অক্ষয়কুমার দত্তগুপ্তর চিঠি পেয়ে বিষের বাঁশি সম্পর্কে অবগত হন, পরে নিজেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি লিখে অবিলম্বে বইটি নিষিদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু বইটি নিষিদ্ধ করার পর যেন জনতার কাছে এর আকর্ষণ আরো বেড়ে গেলো। ইংরেজ সরকার উপায় না দেখে আটটি বইয়ের দোকানে তল্লাশি চালিয়ে ৪৪ কপি বই বাজেয়াপ্ত করে। মুজফফর আহমেদ জানিয়েছেন, যত ধরা পড়েছিল তার তুলনায় কিন্তু গোপনে বইটি ছড়িয়েছিল বেশি। কেননা বইটির সব ছাপা ফর্মা বাঁধাই করা হয়নি। আর ফর্মাগুলোর প্রেসের এক কোণে চাপা পড়ে থাকায় সেদিকে গোয়েন্দাদের নজর পড়েনি। পরে ওই ফর্মাগুলোই বেআইনি বই হয়ে আগ্রহী পাঠকদের হাতে হাতে ঘুরেছিল।
বছরখানেক পর, ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখে( নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত গেজেট জারির তারিখ) নিষিদ্ধ হলো নজরুলের আরেকটি কবিতার বই প্রলয়-শিখা। তবে এবার শুধু নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি প্রশাসন। সরাসরি নজরুলের নামে ওই বইটির মাধ্যমে রাজদ্রোহ প্রচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা চলার পর ডিসেম্বর মাসে রায় আসে, কবিকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নজরুল তৎক্ষণাৎ এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে জামিন ও আপিলের আবেদন করেন। তা মঞ্জুরও হয়। এর মাঝে মহাত্মা গান্ধীর সাথে ইংরেজ সরকার একটি সন্ধিতে পৌঁছেছিল, ‘গান্ধী-আরউইন’ প্যাক্ট নামে পরিচিত ওই সন্ধির চুক্তিনামায় সকল রাজবন্দীকে মুক্তি দেবার প্রসঙ্গটিও ছিল। যথাসময়ে আপিল করায় ও এই চুক্তির কারণে নজরুলকে তাই আর সে যাত্রায় কারাগারে যেতে হয়নি। প্রলয় শিখা প্রকাশের এক মাস পর নিষিদ্ধ হয়েছিল নজরুলের রম্যকবিতার বই চন্দ্রবিন্দু-ও। তবে ওই বইটি নিয়ে কোনো মামলা-মোকদ্দমা হয়নি।
কবির এই নিষিদ্ধ হওয়া বইগুলো পুনরায় প্রকাশের ছাড়পত্র পায় ইংরেজ রাজের বিদায়বেলায়। এক্ষেত্রে কবি-রাজনীতিবিদ হুমায়ুন কবিরের একটা ভূমিকা ছিল। তিনি বিভিন্ন সময় নজরুলের একাধিক বইয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে বাংলার আইনসভায় জোর সওয়াল করেছিলেন।

৩.
তবে নজরুল কারাদণ্ড এড়াতে পারেননি একবারই। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ তাঁরই সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকায় ১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় । কবিতাটি বাজেয়াপ্ত হয়। এরপর নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে বেরুলো গ্রেফতারি পরোয়ানা। সেই সময় কলকাতায় ধূমকেতুর অফিসে পুলিশ তল্লাশিও চালায়। পরে নজরুলকে গ্রেফতার করা হয় কুমিল্লা থেকে। দ্রুত বিচারকাজ শেষ করে কলকাতার তখনকার চিফ ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহো ১৯২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি নজরুলকে দোষী সাব্যস্ত করেন। শাস্তি ধার্য করেন এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। তার ওপর আবার কবিকে গণ্য করা হলো সাধারণ কয়েদি হিসেবে। বিচারকাজ চলার সময় প্রেসিডেন্সি জেলে থাকলেও রায়ের পর কবিকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে বদলি করে নেওয়া হয় হুগলি জেলে। এখানেই কবি জেলের মধ্যেকার নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার প্রতিবাদে ৩৯ দিনের ঐতিহাসিক অনশন করেছিলেন। কবির প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদে তখন রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিকরা প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। অনশন ভাঙার পর তাঁকে বিশেষ বন্দীর মর্যাদা দিয়ে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হলো। এখানে কবির সাথে সহবন্দী হিসেবে কিছুদিন ছিলেন লেখক শিবরাম চক্রবর্তী। তাঁর ভাষ্য থেকে জানা যায় যে জেলে বন্দী থাকা অবস্থায়ও কবির মনোবল এতটুকুও ভেঙে পড়েনি, বরং তিনি আগের মতোই প্রাণচাঞ্চল্য ও রসে টুইটুম্বুর ছিলেন। প্রতিদিন রাতের খাবার পালা সাঙ্গ হবার পর নজরুল সহবন্দীদের নিয়ে গান গাইতে বসতেন। চলতো কবিতা আবৃত্তিও। “নিজের গানের চেয়েও বেশি গাইত সে রবীন্দ্রসংগীত”, লিখেছেন শিবরাম। কবি তখন হাত লাগাতেন রান্নাতেও, যাঁদের ওপর ভার ছিল কয়েদখানার রান্না করার, তাঁদের তাড়িয়ে নিজেই হাত পোড়াতেন। তাঁর হাতের রান্না খেয়ে অনেক রাজবন্দীর নাকি ওজন বেড়ে গিয়েছিল। শিবরামের সরস টিপ্পনী : “কয়েদখানার পাক-ই-স্তানের কায়েদে আজম নজরুল…কতো রকমের রান্নার কায়দাকানুন জানা তার, তা বলবার নয়।” প্রায় এক বছর জেল খাটবার পর কবি মুক্তি পান ১৯২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে।

৪.
নজরুল জেল থেকে মুক্তি পাবার পরও সরকারি গোয়েন্দারা তাঁর পিছু ছাড়েনি। বরং তাঁরা মাঝেমধ্যেই ছদ্মবেশে তাঁর চলাফেরার দিকে নজর রাখতো। এমন একটি ঘটনার উল্লেখ পাই কবি সুফিয়া কামালের স্মৃতিকথায়। তাঁর ‘দাদু’ নজরুল তাঁদের বাড়িতে একসময় প্রায়ই আসতেন। সেটা পুলিশের নজরে পড়ে যায়, অতঃপর : “তাঁরা দাদুর পিছু নিলেন। একদিন দাদু বসে আছেন–এক ভদ্রলোক এসে বসলেন। আমাদের কাছে আসেন কবি, তাঁকে দেখতে পাড়ার অনেক লোকই আসতো। দাদু তাঁকে দেখে বলে উঠলেন, ‘তুমি টিকটিক জানি ঠিক ঠিকই’–আরও একটা লাইন কী বলেছিলেন আর আমার মনে নেই। লোকটি মুখ লাল করে উঠে চলে যেতেই আমি এসে বললাম, ‘কী করে তুমি চিনলে দাদু?’ হেসে দাদু বললেন, ‘গায়ের গন্ধে। বড় কুটুম্ব যে!’”

তথ্যসূত্র :
১. কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃজন-রফিকুল ইসলাম
২. নজরুল জীবনী-অরুণকুমার বসু
৩. নিষিদ্ধ নজরুল-শিশির কর।
৪. কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা-মুজফফর আহমেদ
৫. স্মৃতিকথায় কাজী নজরুল ইসলাম– রফিকউল্লাহ খান ও সৌরভ সিকদার সম্পাদিত।
৬. ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা-শিবরাম চক্রবর্তী।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Osman — সেপ্টেম্বর ১, ২০১৭ @ ৮:২৩ পূর্বাহ্ন

      নজরুল ইসলাম আমাদের গর্ব,স্বাধীনতার প্রেরণা। তাকে নিয়ে এমন একটি তথ্যভিত্তিক রচনা প্রকাশ কররা জন্য লেখককে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com