সব রায় রায় নয়

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ২৫ আগস্ট ২০১৭ ১২:৪৬ অপরাহ্ন

massসব রায় রায় নয়,
কিছু রায় ভালো রায়,
কিছু রায় কালো রায়
কিছু রায় কারসাজি রায়;
ভ্রান্ত বিচারিক রায়
চিরকাল হায়-হায় রায়;
উদ্দেশ্য-তাড়িত রায়
চিরকাল হায়-হায় রায়;
জনতার বেনোজলে
যায় ভেসে যায়
যে-রায় অন্যায়।

নিজে নিরাপদ থেকে অপরকে
সন্ত্রস্ত তটস্থ রাখে যেই রায়,
সেই রায় স্বেচ্ছাচারী রায়,
সেই রায় অজাচারী রায়;
জনতার বেনোজলে
চিরকাল ভেসে যায়
যে-রায় অন্যায়।

নিরাপদ রেখে নিজ সত্তা
অন্য সকলের নিরাপত্তা
সমান নিশ্চিত করে যেই রায়,
সেই রায় সদাচারী রায়,
সেই রায় সর্বজন রায়;
অনন্তের পুণ্যজলে চিরকাল
শাম্পান ভাসায়
সব ন্যায় রায়।


কলিকাল, কলিকাল, ঘোর কলিকাল!–
সততার মমতার নিরপেক্ষ দক্ষতার
অধুনা বাড়ন্ত শুধু বেবাহা আকাল;
সর্বত্র বিরাজমান স্বৈরাচার, কৃষ্ণ কলিকাল;
লড়াই লড়াই শুধু গদীলোভী মত্ত ক্ষমতার;
বড়াই বড়াই শুধু আত্মতুষ্ট মগ্ন ক্ষমতার;
সদাচারী রাজারাণী, এমনকি, কাজির আকাল।
পাল তুলে দাও পাল তুলে দাও পাল
হাল ধরো ভাই হাল ধরো ভাই হাল;
শুরু হোক ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের কালমহাকাল।

পাল তুলে দাও পাল তুলে দাও পাল
হাল ধরো ভাই হাল ধরো ভাই হাল;
মানুষেরা বেঁচে থাক নূহের নৌকায়
প্রাণীমাত্র জেগে থাক ন্যায়ের নৌকায়;
অপরাধী বেনোজলে যাক ডুবে যাক,
কারসাজি রায়বাজি যাক ডুবে যাক –

ঘাটে ঘাটে বাঁকে বাঁকে
শুরু হোক তোমার শপথ –
ঘাটে ঘাটে বাঁকে বাঁকে
তোমাকে দেখাক পথ
তোমার নিজের রায়
তোমার বীজের রায়
শুধু ন্যায় রায়
শুধু ন্যায় রায়
শুধু ন্যায় রায় …


কোথায় ন্যায়ের রায়, কোথায় কোথায়?
এ রায় দেখেছি আমি সত্যযুগে মানব-সভায়।
দেবতারা রায় দেবে, বিনাবাক্যে মানবে মানুষ –
এমন চলতে পারে, মানুষেরা যদি না-মানুষ!
মানুষ মানুষ হতে চিরকাল চেয়েছে যেহেতু,
মানুষের মধ্যে আছে মানুষের প্রমুক্তি সেহেতু।

দেবতার রায় মানে ওলিম্পীয় জিউসের রায়,
দেবতার রায় মানে প্রমিথিউস-শৃঙ্খলের রায়,
দেবতার রায় মানে রাজা-প্রজা বিভেদের রায়।

মানুষ দেবতা হোক কোনদিন চায়নি দেবতা,
দেবতা মানুষ হয়ে কোনদিন ছাড়েনি ক্ষমতা।
মানুষের মধ্যে যদি দেবতার আকাঙ্ক্ষা গজায়,
মানুষের মধ্যে সব মানবতা লোপ পেয়ে যায়।
মাটির মানুষ যদি সাদাসিধে মানুষ অমল,
সাম্যসুখী সকলের হাতে হাতে পতাকা ধবল:
মানুষ নিজের রায়ে মুক্ত হয়ে পায় নিজ বল:
নিজেই নিজের রাজা, নিজে প্রজা, ন্যায়বান কাজী:
নিজ ন্যায়দণ্ড হাতে অত:পর নিজেই স্বরাজী;
নিজে বীর, ধীর-স্থির; ন্যায়-যুদ্ধে গাজী।

তাহলে দেবতা নয়, মানুষেই চাই সুবিচার।
তাহলে দেবতা নয়, মানুষেই পাই সুবিচার।
বিচারহীনতা নিয়ে যে-মানুষ বিরাজে সমাজে,
বিচারের মধ্যে তাকে নিয়ে আসা মানুষেরই সাজে।
মানুষের মধ্যে আছে মানুষের বিচারের ভার।
শ্রেষ্ঠ নর শ্রেষ্ঠ নারী বিচারক : শর্ত সদাচার।


আদি সদাচারী তেমন মানুষ জানি মহাজ্ঞানী কনফুসিয়স:
সোনালি কানুনে তিনি মানুষকে সঁপেছেন সদাচার রস।
অনন্তের স্থিরযাত্রী সক্রেটিস আত্মরায়ে নির্বিকার হেমলক পান,
ভ্রান্ত বিচারিক রায় আর কৃপা, দুটোকেই সম হারে ম্লান।
যিশুর শরীরী সত্তা ক্রুশবিদ্ধ ভ্রান্ত রায়ে, কূট প্রহসনে;
শোধিত শোণিত তার পরিত্রাতা ন্যায়নিষ্ঠ দেহে আর মনে।
বুদ্ধের সজ্ঞান রায়ে বোধিদ্রুমে সিদ্ধ তার নির্বাণ-নিবাস,
লোভ থেকে নির্বাসন; দুঃখজয়ী; বসবাস আকাশ ও ঘাস।
আদি-অনাদির আলো বুকে ঋদ্ধ মুহম্মদ, হেরার গুহায়:
একাকার স্রষ্টা-সৃষ্টি, নিরাকার সর্বসত্য, আলোকের রায়।
নেই ভেদ তুমি-আমি, উপনিষদ রায় দেয় অভেদসুন্দর;
সেই সত্যে তপোবন জুড়ে দুষ্মন্ত-শকুন্তলার ঘর ও বাসর।
জানি, ঘর্ম-কর্ম সংসারের বেড়াজাল, হালচাল আর হানাহানি,
মানুষকে লোভী করে, দেয় না থাকতে তাকে মঙ্গলের ধ্যানী।
তেমন সঙ্কট এলে পণ্যজয়ী বণিকের লোভ-লাভ করে তাকে ভর,
মানুষেরা থাকে না মানুষ, এমনকি বিচারক বনে যায় পণ্য-অনুচর।
নিজের ভিতরে ঢুকে যে মানুষ পেয়ে যায় আপনার আলো-পরিচয়,
যুক্তি ও মুক্তির শর্তে সে মানুষ কালে কালে সত্যনিষ্ঠ বিচারক হয়।
নিজের ভিতরলোকে যে পায় না পক্ষহীন সখ্যহীন দক্ষ পরিচয়, –
নিজের অচেনা নিজে, যুক্তিহীন মুক্তিহীন, সে কখনো বিচারক নয়।
বিচারক ধ্যানী-জ্ঞানী, জ্ঞানী-ধ্যানী – সর্বলোকে নি:শঙ্ক, নির্ভয়।


অতএব
ধ্যান হোক,
ধ্যান হোক,
ধ্যান হোক,
ডুবুরীর ধ্যান :
ধ্যান হোক,
ধ্যান হোক,
ধ্যান হোক
আত্মঙ্গলের জ্ঞান,
ধ্যান হোক,
ধ্যান হোক,
ধ্যান হোক
সর্বমঙ্গলের ত্রাণ।


নিজের ভেতরে ডুবে দেখে নাও অন্তহীন শুধু নিজ বীজ,
বীজের ভেতরে ডুবে দেখে নাও তুমি-আমি সকলেই নিজ।


অন্যের বিরুদ্ধে যাবে?
তাহলে তো নিজের বিরুদ্ধে যাবে তুমি।
নিজের বিরুদ্ধে যাবে?
তাহলে তো অন্যের বিরুদ্ধে যাবে তুমি।
তোমাকে তোমার রাখো, আমাকে তোমার;
আমাকে তোমার রাখো, তোমাকে আমার।
সুবিচার এভাবেই সুনিশ্চিত করে যায় আত্ম-স্বার্থ তোমার-আমার:
সত্য হোক বিচারক, প্রত্যেকেই বিচারক; সত্যশস্যে মানবখামার।


প্রত্যেক ব্যক্তির সত্য গণসত্য, অনন্তর সর্বসত্য; এই সত্য সত্যতন্ত্র;
এই সত্য গণসত্য, গণমানুষের সর্বস্বার্থ: সাম্যবাদী এই তন্ত্র গণতন্ত্র;
প্রজন্মে প্রজন্মে এই সত্য ডানা মেলে মানুষের সর্বচারী সদাচারী মনে;
এই সত্য ডানা মেলে কালে কালে ডালে ডালে মেঘলোকে গগনে গগনে।
গণমন, ব্যাবিলন, চীন কিংবা সপ্তসিন্ধু; দশদিগন্তের আগে সুপ্রাচীন গ্রিস
দেখেছিল গণতন্ত্র, অ্যাথেন্সের গণরাজ্য, গণরাজ ন্যায়বান পেরিক্লিস।
ধরণী পায়নি আর কোনদিন এরকম সত্যালোক, এরকম নন্দন হদিস।


পাশাপাশি গঙ্গাঋদ্ধি, হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর, গোপাল রাখালরাজ;
অনন্তর বঙ্গভূমি তৃণগুল্মে সাজিয়েছে সামষ্টিক মঙ্গলের গণতন্ত্রী তাজ;
তারপর কত যুগ যুগান্তর, শকহূন আয আর অনাযের মিশ্রবিবর্তন,
সঙ্গমে সঙ্গমে সিদ্ধ বঙপ্রজাতির সৃষ্টি-কৃষ্টি, পূর্বপশ্চিমের অরুণ-মিলন।
মোগল-পাঠান আর ইংরেজের শাসন-ত্রাসন শেষে জাগে প্রমুক্ত বাঙালি,
নিজেই শনাক্ত করে নিজের স্বাধীন রূপ, নিজের বাগানে নিজে মালী।
বিদেশি শাসক মানে রাজা-রাণী, দেবদেবী; তারা নয় কেবল মানুষ;
বিদ্রোহী বীরের চিত্তে মানবিক সমতা ও মমতা ও স্বেচ্ছাপ্রমুক্তির হুঁশ।

অতএব অনিরুদ্ধ,
আত্মরায়ে আত্মযুদ্ধ,
সেই যুদ্ধে অজাচারী শিশ্নধারী,
দানব ও মানব-দমন।
অতএব অনিরুদ্ধ,
নিজে রায়ে নিজ যুদ্ধ,
নিজে দেশে নিজ বেশে
নিজেকেই প্রতিষ্ঠার রণ।

ভ্রান্ত বিচারিক রায়ে ফাঁসিকাষ্ঠে ক্ষুধিরাম, শহীদান শরীয়ত, তিতুমীর, সূযসেন;
ভ্রান্ত রাজবিচারিক রায়ে আশাভাগ, ভাষাভাগ, মনভাগ, ধনভাগ, ভাগ লেনদেন,
কৃষ্টিভাগ, সৃষ্টিভাগ, রাষ্ট্রভাগ, শাস্ত্রভাগ, দেশভাগ, শেষভাগ, ভাগ সমুদ্র সফেন…

না, কোনো বিচারিক রায়ে
কোনদিন জাগেনি জনতা,
আপনার মনোরায়ে
বাঙালি জেগেছে নিত্য
সঙ্গে নিয়ে আপন ক্ষমতা;

সাতচল্লিশের পর বায়ান্ন-র ভাষারাক্ত, স্বাধিকার, ঊনসত্তুরের গণযুদ্ধ,
সত্তুরের নির্বাচন, একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধ – সব রায় দিয়েছেন জনতা প্রবুদ্ধ;
এ অন্তিম জনযুদ্ধে সকল নেতার নেতা বাঙালির জাতিপিতা প্রমুক্ত মুজিব,
আরেক রাখালরাজ, যাকে নিয়ে ব্যক্তিবাঙালির বীরসত্তা প্রবুদ্ধ সজীব;

১০
গণরায়ে গণরাজ,
গণরায়ে গণসত্তা,
সেই সত্তা জাতিসত্তা,
বীর বাঙালির:
ক্ষুধিরাম, সূযসেন,
হাজী শরীয়ত, তিতুমীর
বরকত, সালাম, জব্বার
শফিউর, মতিউর…
অগণন মুক্তিযোদ্ধা, ধাবমান তীর …
তারপর আরো কতো-কতো বীর
কতো-কতো বীর
বীর …
‘বল বীর,
বল চির-উন্নত মম শির’

১১
গণসত্তা দেয় গণরায়,
গণমানুষেরা সেই রায় মেনে যায়;

শেষ রায় গণমানুষের রায়,
জনতা মানে না কোনো ভ্রান্ত বিচারিক রায়;

জনতা নতুন করে
জনতার আদালতে সাজায় জনতা-রায়;
জনতা শোধন করে
অজেয় বুকের রক্তে ঝুটকৌশলের রায়।

জয় হোক জয়
গণমানুষের আদালতে
গণচেতনার জয়
গণসমতার জয়
গণক্ষমতার জয়
গণমমতার জয় …

জয় হোক জয়
মুক্তিযুদ্ধে যুক্তিযুদ্ধে
শুদ্ধচিত্ত মানুষের জয়

২৪.০৮.২০১৭
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — আগস্ট ২৬, ২০১৭ @ ৩:০৭ অপরাহ্ন

      ভাল লেগেছে কবিতা। কবিকে শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr. Muhammad Samad — আগস্ট ২৬, ২০১৭ @ ৫:২৬ অপরাহ্ন

      It sounds nice. It’s a good protest.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zaki — আগস্ট ৩১, ২০১৭ @ ২:৪১ অপরাহ্ন

      Bar bar podtey ichchey korey!!!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com