সেই ভয়ংকর দিনের স্মৃতি কিছু আমারও ছিল

ফারুক আলমগীর | ১৫ আগস্ট ২০১৭ ১:২৬ পূর্বাহ্ন

Mujibশেষ শ্রাবণের রাত। আকাশে মেঘের ঘনঘটা থাকলেও বৃষ্টি ছিলো না। কালো মেঘ মাঝে মাঝে ঢেকে দিচ্ছিলো চাঁদকে। হয়তো বৃষ্টি হয়েছে কাছে কোথাও। বাতাস তাই শীতল। কিন্তু রমনায় বৃষ্টি হয়নি। বৃষ্টি হয়নি ধানমন্ডী লেক ঘেঁষে বত্রিশ নম্বর সড়কের বাড়ীটিতে; যেখানে থাকেন বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের চ্যান্সেলর। আগামীকাল তাই তিনি আসবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। উৎসবের সাজে সেজেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন। স্বাধীনতার আগে মধ্যষাটে আমরা যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ; ১৯৬৫ সালের সমাবর্তন অনুষ্ঠান শুধু বর্জন করিনি; আমাদের যুগপৎ আন্দোলনে ষাটের দশকে কোন সমাবর্তন হতে পারেনি। তারপরের ইতিহাস- ঊনসত্তরের উত্তাল গণআন্দোলনের জোয়ার আর বাংলাদেশের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ ও অভ্যুদ্যয়ের ইতিহাস যার অংশীদার আমরা, যারা তখন নবীন, যুবা, তারুন্যে টগবগ। আমাদের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতার এমন মিলিত ঐক্য বাংলাদেশ আর দেখেনি। সেই দুর্মর সময়ে কত ভয়ংকর রাত ও দিন পেরিয়ে এসেছি তা আমাদের সকলের অভিজ্ঞতায় কত রকম বেদনার দুঃসহ দাগ কেটেছে ,কিন্তু স্বাধীনদেশে যে এমন একটা সময়ে আমাদের হৃদয়ে কালো রক্তাক্ত ক্ষত সৃষ্টি হবে তা কি আমরা কখনো স্বপ্নে ভেবেছি?

ভেবেছিলাম এসব কথা লিখবো না। দীর্ঘ চারটি দশক অতিক্লান্ত হলো; বাংলাদেশের ক্ষুদ্র মানচিত্রে কত লোক এলো, গেলো। কত জন কত কথা বললো, লিখলো, কল্পকথা ও বাস্তবতা মিলিয়ে তাতে কার কি এসে গেলো? আমার স্মৃতি কথায় কি আসে যায়? কিন্তু পরে ভাবলাম বঙ্গবন্ধুকে এতো কাছে থেকে দেখেছি; তাই সেই ভয়ংকর দিবসের কথা কিছু বলা উচিৎ।

রাত তখন নবীন। বিটিভির রাত ন-টার সংবাদের পর ওয়ারীর ১৬, লারমিনি স্ট্রীটে নিজস্ব ঠিকানায় ফিরবো। বিটিভির তরুন প্রকৌশলী লোকমান আহমেদ বললো, ‘চলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাই; এ্যারেজমেন্টটা দেখে আসি।’ ভাবলাম আমাকেও সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সকল রাষ্ট্রীয় কভারেজের স্টোরি করার দ্বায়িত্বতো আমার। একবার দেখে আসা যাক টি.এস.সি তে আয়োজন কতদূর। প্রকৌশলী লোকমানের উপর নির্ভর করছে সমাবর্তনের লাইভ টেলিকাস্টের যাবতীয় তদারকীর কাজ, আর আমিও সঙ্গে। আগামীকাল বিটিভি- সংবাদের জন্য কভারেজ করবে রাষ্ট্রপতির তথা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গের সংযুক্ত চিত্রগ্রাহক জিয়াউল হক। জিয়া খুবই নিপুন ও চতুর ক্যামেরাম্যান। বিটিভিতে মুনীর আলম মির্জার পরে একমাত্র ডেয়ার-ডেভিল ক্যামেরাম্যান বলা যেতে পারে। যে কোন পরিস্থিতিতে যাঁরা চিত্রগ্রহনে ওস্তাদ। আমার সুবিধা হলো জিয়া প্রায়শ: যথাযথ দৃশ্য সঠিক মাপে ধারন করে (টেলিভিশন সংবাদে যাকে আমরা বলি অলমোস্ট এডিটেড শট)। তখন সর্বাধুনিক ইএনজি প্রযুক্তি তো দূরে থাক, ইলেকট্রনিক নিউজ গ্যাদারিং এর চল ছিলোনা; এমনকি যুরোপের উন্নত টেলিভিশনেও। য়ুরোপের উন্নত টিভি রিভার্সাল ফিল্ম ব্যবহার করে ক্যামেরা সরাসরি প্রস্ফুটিত ছবি তুলতো, আর স্টেইনব্যাক টেবিলে দ্রুত এডিট করে সম্প্রচার উপযোগী করে তুলতো। আমরা মান্ধাতার ১৬ মিলিমিটার ক্যামেরা ছবি তুলতাম যার নেগেটিভ বের করা হতো ল্যাবে ডেভেলপ করে। সেই নেগেটিভ ছবি টেলিভিনের ডিভিকন চেইন দিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে সচল পজিটিভ ছবি তৈরী করতো যা দর্শক-সাধারণ ঘরে বসে টিভি স্ক্রীনে দেখতো। সুতরাং কোন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান যদি অনুষ্ঠান বিভাগ থেকে সরাসরি টেলিকাস্ট করা হতো, আমাদের বার্তা বিভাগের জন্য তা আশীর্বাদ স্বরূপ হতো। আমরা সহজে প্রয়োজনমত ধারন করা টেপ থেকে গ্রহণ ও সম্পাদন করতে পারতাম। এই ক্ষেত্রে জিয়ার কভারেজের মধ্যে আমাকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংযোগ করতে হবে । আমার আরো বাড়তি সুবিধা হলো বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা আগেই তৈরী থাকবে এবং প্রেস সচিব তোয়াব ভাই (প্রবীন সাংবাদিক তোয়াব খান) এর সৌজন্যে এক কপি আমি আগে-ভাগেই পেয়ে যাবো। সুতরাং আমার কোন ভাবনাই নাই। লোকমানকে বললাম- ”দেখো ভাই তোমার যন্ত্রপাতি ঠিক আছে কিনা?” বিটিভির বিশাল ওবি ভ্যান দেখলাম সগৌরবে শোভা পাচ্ছে। মঞ্চ পর্যন্ত মোটা ক্যাবল গড়িয়ে নেয়া হয়েছে জেনারেটর থেকে সেখানে ক্যামেরা ও লাইট সংস্থাপন করা হয়েছে। তিন ক্যামেরার লাইভ টেলিকাস্ট একটা ক্যামেরা মঞ্চে স্থির থাকবে; অন্যটা দর্শক ও আনুষঙ্গিক অন্য সবকিছু ধারণ করবে। ৩য় ক্যামেরাটি সমাবর্তনের পোষাক পরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সারির ছবি ও বঙ্গবন্ধুর আগমন ও সাদর সম্ভাষন পুস্পস্তবক অর্পন ইত্যাদির ছবি তুলে বাইরে একটা জায়গায় স্থিত হবে। মোটামুটি ওবি ভ্যানে বসা একজন প্রযোজকের (এই ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ প্রযোজক) পরিকল্পনা এ-রকমই থাকে। টি.এস.সিতে লোকমান ও আমি টিভি কভারেজের এসব দেখতে দেখতে অদূরে কিছু ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলাম আল্পনা আঁকতে। এদের অধিকাংশই চারুকলার ছাত্র-ছাত্রী। তাদের কাছাকাছি শেখ কামাল দাড়িয়ে কি যেন বলছেন। আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন। কুশল বিনিময় এবং শেখ কামাল আমার সঙ্গে করমর্দন করার পর জানতে চাইলেন কালকে কি কি করা হবে? শেখ কামাল আগে থেকেই আমাকে চিনতেন। ০৭ই মার্চের ঐতিহাসিক সেই ভাষণের পর থেকে, প্রতিরাতে রাত নটার সংবাদের পর আমরা বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতাম আগামী দিনে কি কি করতে হবে তার নির্দেশনা নিতে। আর সেজন্য প্রায়শ: শেখ কামালের সাথে দেখা হতো। ২৫ শে মার্চের রাতেও যথারীতি নটার সংবাদের পর আমি হুমায়ুন চৌধুরী (বিটিভির তদানীন্তন বার্তা প্রধান), সিনিয়র রির্পোটার এ.জেড.এম হায়দার (প্রয়াত), সংবাদ পাঠক ইকবাল বাহার চৌধুরীর গাড়ীতে বত্রিশ নাম্বারে গেলে দেখলাম শেখ কামাল নিচতলার বারান্দায় কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। আমরা যেতেই বললেন, ”বাবা খুবই অস্থির আছেন”। দেখলাম বঙ্গবন্ধু ইপিআরের ওয়্যারলেসে জোরে জোরে কথা বলছেন আর অস্থিরভাবে পায়চারী করছেন। আমরা সামনে যেতেই বললেন, ”তোরা তাড়াতাড়ি বাড়ী যা, আজ কোন কথা নেই।” সেই রাতে বঙ্গবন্ধুকে খুবই উদ্বিগ্ন দেখেছিলাম এবং আমরা চারজন তাঁর নির্দেশমত তাড়াতাড়ি গৃহে ফিরেছিলাম। হুমায়ুন চৌধুরীকে ইস্কাটনে আর আমাকে সর্বশেষ পুরানা পল্টন লাইনে (মধু চৌধুরীর বাড়ীর গলি) নামিয়ে ইকবাল ভাই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পেছেনে তার শান্তিনগরের পৈতৃক বাড়ীতে যখন ফিরছিলেন তখন রাত এগারোটা। আমার অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রী শারিরীক কষ্টের মধ্যে আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে অত্যন্ত উদ্বিগ্নতায় “এই বঙ্গবন্ধু তোমাদের কি বলেছেন, কি হচ্ছে এখন?” আমি বললাম-” তিনি আমাদের তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যেতে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের আর কিছু বলেন নি। ”
এখন ভাবি, ১৪ আগষ্ট রাতে তাঁর কতো ব্যস্ততা ছিলো। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্ণরদের তার আগের দিন সকালে প্রায় দু-ঘন্টার ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গভবনে ডেকে। ১৩ আগস্ট তারিখের এই ভাষণ ছিলো বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আমার করা শেষ কভারেজ। বিটিভির ওবি ভ্যানে ভাষণের পুরোটা ধারণ করা হয়েছিলো। সেখান থেকে শব্দ-ছবি সম্পাদনা করে বিভিন্ন পর্বে (প্রায় চার/পাঁচটি) ভাগ করে এক একটা পর্বে একটা করে সূচনা বাক্য সহযোগে সংবাদ পাঠক তাজুল ইসলাম ভাইকে দিয়ে পাঠ করিয়ে একটা টিভি প্রতিবেদন তৈরী করেছিলাম। রাত ন’টার বাংলা সংবাদের পর তা প্রচারিত হয়েছিলো। তদানীন্তন প্রশাসন পরিচালক প্রয়াত মনিরুল আলমের তত্ত্বাবধানে প্রতিবেদনটি আমি তৈরী করেছিলাম যা টেলিভিশনে প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর শেষ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের ভাষণ। আমার মনে পড়ে তাৎক্ষনিক এই দীর্ঘ মৌখিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করছিলেন, লোকজ কিছু বাক্য ব্যবহার করেছিলেন এবং স্থানীয় প্রশাসন থেকে কৃষি ও সমবায় নিয়ে গভর্ণরদের উদ্দেশ্যে পরামর্শমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন। সামনের সারিতে কিছু প্রাজ্ঞজন ও সিনিয়র সচিবরা বসেছিলেন এবং সমবায় নিয়ে আলোচনা পর্বে বঙ্গবন্ধু একজন সিনিয়র সরকারী কর্মকর্তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন “আহসান এটা তোমার সমবায় নয়”। এ,কে,এম আহসান বাঙ্গালীদের মধ্যে একজন সিনিয়র সিএসপি ছিলেন এবং বহুদিন জাতীয় সমবায় সমিতির নিবন্ধক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন “ধান বেচা, পিঁয়াজ বেচা পয়সা দিয়ে কে পড়ে নাই? আজকে যারা বড় বড় অফিসার হয়েছে তাদের নিজের অতীত বুঝতে হবে। তাই যাও গ্রামের মানুষকে বুঝ।” বঙ্গবন্ধু সেদিনের ভাষা প্রয়োগে আমার শব্দ-ছবি এডিট করতে মুশকিল হচ্ছিলো। সেদিন মনিরুল আলম সাহেব আমাকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সাহায্য করেছিলেন। পচাঁত্তরের ৭ নভেম্বরের তথাকথিত সৈনিক জনতার বিপ্লবে তিনিও শহীদ হন। আজ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁকে স্মরণ করি।
১৪ আগস্ট রাতের কথায় আবার ফিরি। শেখ কামাল আমার চাইতে বেশ কয়েক বছরের ছোট হবেন। বয়সের ব্যবধানের কারণে আমাদের সম্মান করে কথা বলতেন। আজো বললেন,” আপনাদের ওবি ক্যামেরাতো এতদূর আসতে পারবেনা, জিয়া ভাইকে বলবেন এই সাজ-সজ্জা, আল্পনাগুলো যেন ভালোভাবে তোলে।” একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বগতোক্তির মতোন করে বললেন “বৃষ্টি হলে এদের সব পরিশ্রম বিফলে যাবে।” তার স্ত্রী সুলতানা কামালের বড় বোন খালেদা আমাদের সমসাময়িক, সমাজবিজ্ঞানে বিভাগে পড়তো । তাদের বড় ভাই জাহাঙ্গীর ভাই আমাদের অগ্রজ । আমাদের বিদায় দিয়ে শেখ কামাল কতো রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় টি,এস,সি চত্বরে ছিলো জানিনা। তবে টিভি প্রকৌশলীদের গাড়ীতে করে লোকমান আমাকে যখন আমার ওয়ারীর নিবাসে পৌছালো তখন রাত প্রায় পৌনে বারোটা। আমার স্ত্রীও প্রায় আমার কাছাকাছি সময়ে বাসায় পৌঁছেছে সেদিন। আমাদের সতীর্থ বাংলা বিভাগের হাস্নাহেনা বকুলের সঙ্গে সে এবং আরো কয়েকজন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের বাসায় গিয়েছিলো এক নিমন্ত্রন রক্ষা করতে। তিনি আমাদের সমসাময়িক ছিলেন, ভোলা সিংহ নামে খ্যাত এই নেতা পড়তেন সয়েল সাইন্সে। আমি ও বকুল বাংলায়, আমার স্ত্রী পিংকি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিল । পিংকি ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদিকা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল ১৯৬৫-১৯৬৬ শিক্ষাবর্ষে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ছিল সে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমারই মতোন। সেই সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদ ও ধারার ছাত্রনেতা- নেত্রীদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকত। তোফায়েল আহমেদের বাসায় সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মতো আড্ডা দিয়ে এসে সে পরিতৃপ্ত। কেউ জানতো না কি নিদারুন এক রাত অপেক্ষামান। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ ও সেদিন আত্মদানকারী অনেক নিকটজন কেউ কি জানত?
রাত করে ঘুমোতে যাওয়ার জন্য পরদিন সকালে বিলম্বে বিছানা ছাড়ার কথা। কিন্তু ভোরের আলো ভালো করে ফোটার আগেই দরোজায় করাঘাত ও চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দেখি আমাদের পাড়াতুত ভাগিনা বাদশা সারা ১৬ লারমিনি স্ট্রিট কাঁপিয়ে চিৎকার করছে, “তোমরা ঘুমায়ে আছো, বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে।” কি এক অবিশ্বাস্য বার্তা আমাদের কাছে। আমি ততোধিক চিৎকার করে বললাম “বিশ্বাস করি না, বঙ্গবন্ধু আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন সমাবর্তনে উৎসবে যাবেন, আমিও যাব কভার করতে”। ততক্ষনে ১৬ নম্বর বাড়ীর আরো বাসিন্দা মাওলানা তর্কবাগীশের ছেলে এ্যাাডভোকেট নুরুল আলম, দোতালার বাংলাদেশ বিমানের কায়সার আব্দুল গনি, পেছনের একতলার তরুন ব্যাংকার খন্দকার খালেদ ইব্রাহীম (বাংলদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর ও কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান) চকবাজারের ইন্ডেন্ট ব্যবসায়ী তকিউদ্দীন, বিসিকের চিত্রগ্রাহক তোতা মিয়া এবং পনের নম্বরের অধিবাসী মালেকা বেগমদের (আমাদের সতীর্থ, নারী নেত্রী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক) বাড়ি থেকে মালেকার একাধিক ভাই, জামাল, বকুল উঁকি দিচ্ছে। সবারই মুখ কালো থমথমে। কেউ বিশ্বাস করছেনা। বাদশা বললো রেডিও শোনেন। আমি ট্রান্সমিটার চালু করতেই মেজর ডালিমের দর্পিত কন্ঠস্বর শুনলাম। আমি রেডিও বন্ধ করে বললাম, বিশ্বাস করিনা, এটা কোন Clandestine Radio হবে। এডভোকেট নুরুল আলম খুবই চিন্তায় পড়লেন এবং টেলিফোনে খবর নেয়ার জন্য উপরে গেলেন।। ষোলো নম্বরে সাত/আটটি পরিবারের মধ্যে একমাত্র তার ঘরেই টেলিফোন ছিলো একটি, কিন্তু অনেক চেষ্টা করে তিনি বিফল হলেন। টেলিফোন বিকল। আমি সকাল সাতটার রেডিওর খবরের জন্য উদ্বিগ্ন চিত্তে অপেক্ষা করতে লাগলাম। সাতটা বাজলে সময় সংকেত দিয়ে বেতারের সংবাদ পাঠ করতে শুরু করলেন সরকার কবির উদ্দীন এবং তাঁর কন্ঠে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যর খবর শুনে এই প্রথম বিশ্বাস করলাম। সেই সকালে বেতারের খবর খুবই অগোছালো ছিল এবং কবির ভাইও অনেকটা ভারী গলায় যেন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে পাঠ করছিলেন। পরে জেনেছি মেজর শাহরিয়ার ও মেজর ডালিম দুজনেই বাংলাদেশ রেডিও অফিস নিয়ন্ত্রন করছিলো। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের মতো করে প্রচারিত খবরটা তৈরি করা হয়। সরকার কবির উদ্দীন তাঁর নির্ধারিত সংবাদ পাঠ সূচী অনুযায়ী ভোরে খবর পড়তে এসে আর্মির লোকজন ও শাহবাগের বেতার ভবনের বাইরে ট্যাঙ্ক দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই তাকে ধরে স্টুডিওতে নিয়ে যাওয়া হয়। বেতারের বার্তা কক্ষেও সকালের বুলেটিনের দায়িত্ব পালন করতে যে সব সংবাদ কর্মী এসেছিলেন, তারা সকলেই নজরবন্দী হয়ে যান সেদিনের জন্য।
বেলা দশটার দিকে বাদশা হন্তদন্ত হয়ে আবার এলো। আমাদের ঘোর তখনো কাটেনি। তাকেও খুব উৎকনিঠত দেখালো, বললো শেখ কামালের বন্ধু হারুন হল থেকে পালিয়ে তাদের বাসায় এসেছে। তাদের বাসা হারুনের জন্য নিরাপদ নয় কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাদের চেনা-জানা সবাই জানে বাদশার মেঝবোন শেফালীর সঙ্গে হারুনের বিয়ে ঠিকঠাক। সামনে হারুনের লেখাপড়া ও নিরাপত্তা নির্বিঘ্ন করার জন্য পিংকি আমাদের আড়াই কামরার ছোট ঘরটা কামালের বন্ধু হারুনের জন্য ছেড়ে দিলো। ঘটনার আকস্মিকতায় সে একেবারে বিহ্বল। হারুনের কাছে শোনা গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি। ছাত্রলীগের সব নেতা-কর্মীর হল থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিযে যাবার খবর। হারুন সেই ঘরে লুকিয়ে থেকে অনেকদিন নির্বিঘ্নে পড়াশোনা চালিযে গিয়েছিলো। আমার বড়ো মেয়ের বয়স তখন তিন। শেফালীর কোলে কোলে মানুষ এবং তাকে ডাকে বন্ধু বলে। মায়ের কোলে চড়ে জ্ঞান হওয়া অবধি তাকে ক্যালেন্ডার, পত্রিকায় কিম্বা দেয়ালে কোথাও বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখলে উচ্ছসিত হয়ে বলতো “সেক মুজিক”। তিন বছরের শিশুটি আমাদের কথাবার্তায় কিছু একটা আঁচ করে বেশ বিমর্ষ। শেফালী স্বাভাবিকভাবেই কোন অজানা পরিস্থিতির আশংকায় উদ্বিগ্ন। শেফালীর হাত ধরে আমার ছোট্ট মেয়ে দাড়িয়ে। দুই অসম বন্ধুর উদ্বিগ্নতার মধ্যে বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাড়ালো বিটিভির একটি ঝরঝরে পুরোনো মাইক্রোবাস। ড্রাইভার নেমে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিলো, বার্তা প্রদান হুমায়ুন চৌধুরীর দুই ছত্রের পত্র “আমরা সবাই বঙ্গভবনে অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি চলে এসা।” ঘড়িতে তখন ১৫ আগস্টের বেলা এগারোটা। ড্রাইভারকে পরিস্থিতি আঁচ করার জন্য বললাম- “বঙ্গভবন আমার বাসার খুবই কাছে। তুমি যাও, আমি নিজেই চলে যাবো।” ড্রাইভার চুন্নু মিয়া খাস ঢাকাইয়া এবং স্পষ্টবাদী। ত্বরিত বলল- “আপনেরে বাইন্ধা নিয়া যাইতে কইছে। জলদি গাড়ীতে উইঠা পড়েন। গাড়ী ছাড়া গেলে মগর আপনারে আর্মিরা গেইটে ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিবো”। চুন্নু মিয়ার মর্জি মোতাবেক গাড়িতে উঠে বসতেই জোরে গাড়ী টান দিয়ে বলে উঠলো, “স্যার কালা ট্যাংকের আর্মিরা পাওয়ার লইয়া লইছে। শেখরে মাইরা ফ্যালাইছে। অখন শুনতাছি মুসতাকরে নাকি পেরসিডেন্ট বানাইবো।” সর্বনাশ খন্দকার মুশতাক হবে প্রেসিডেন্ট যিনি কিনা মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে বসেই তাজউদ্দিনের বিরোধিতা করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের অপচেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু কেন যে এই লোকটাকে চিনতে পারলেন না জীবৎকালে! তাঁর রক্তের দামে জাতির কাছে লোকটির স্বরূপ উন্মোচিত হলো। মনের মধ্যে কুকড়ে উঠা ভাবনাগুলো নিয়ে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে নামলাম বঙ্গভবনে।
বঙ্গভবনের এসে দেখি বিটিভির মহাপরিচালক জামিল চৌধুরী, পরিচালক (প্রশাসন/অনুষ্ঠান) মনিরুল আলম, ঢাকা কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার মুস্তফা মনোয়ার, বার্তা প্রধান হুমায়ুন চৌধুরী, অনুষ্ঠান বিভাগের আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অনুষ্ঠান ও প্রকৌশল শাখার এসডি খানসহ অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা উপস্থিত রয়েছেন। এদের আনা হয়েছে যে-কোন মুহূর্তে খন্দকার মুশতাকের মন্ত্রীসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান প্রচার ও ধারনের জন্য। আমাদের সবাইকে একটা কক্ষে বসতে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে আমি ক্যামেরাম্যান জিয়াকে দেখলাম। পিআইডি এবং দুটি সংবাদপত্রের দুজন ফটোগ্রাফারকে দেখলাম যারা আমার খুব চেনা ও বেশ সিনিয়র। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এতোদিন সংযুক্ত বিটিভির ক্যামেরাম্যান স্বাভাবিক কারণে বিষাদগ্রস্ত ও উৎকন্ঠিত হলেও আমাকে দেখে তাঁকে বেশ আশ্বস্ত মনে হলো। আমাকে কি করতে হবে জানিনা। জিয়াও জানেনা তার কি করণীয়। জামিল চৌধুরী সাহেব ও হুমায়ুন চৌধুরী পাশের একটি কক্ষে ঘন ঘন আসা যাওয়া করছেন খুবই ত্রস্ত পায়ে। উভয়ের মুখ পাংশুবর্ণ কোন বা নির্দেশনা পেয়ে মনে হলো। আমরা যারা একটি কক্ষে বসেছিলাম সকলের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা আর ফিসফিস গুঞ্জন। বঙ্গবন্ধু নিহত হযেছেন ঠিকই, কিন্তু আর কাদের হত্যা করা হয়েছে। বত্রিশ নম্বর কেমন আছে। গতকাল রাতেইতো আমি শেখ কামালকে দেখেছি। লোকমানই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো টি.এস.সি-তে লাইভ টেলিকাস্টের আয়োজন পর্যবেক্ষনে। এ-সব কথা ফিসফিস করে বললাম আমার সহকর্মীদের কানে কানে। বেলা একটার দিকে জিয়া ও আমার ডাক পড়লো যে কক্ষে জামিল চৌধুরী সাহেব ঘন ঘন যাতায়াত করছিলেন সেই কক্ষে। দেখলাম সেই কক্ষে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহরে উদ্দীন ঠাকুর বসা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। চোখে রাত্রি জাগরণের আভাস। এই প্রথম জানলাম বত্রিশ নম্বরে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে জিয়াকে ও আমাকে। জিয়াতো অবধারিতভাবে যাবে। কিন্তু বাধ সাধলো আমাকে নিয়ে। আমার অনীহা দেথে তাহের উদ্দীন ঠাকুর জামিল চৌধুরীকে জিজ্ঞ্যেস করলেন জিয়ার সঙ্গে কে যাবে? হুমায়ুন চৌধুরী আমার নাম বলতেই আমি জামিল সাহেবকে বললাম “স্যার আমাকে ক্ষমা করুন। আমি বঙ্গবন্ধুর প্রায় সকল কভারেজের রিপোর্টই করেছি তার সঙ্গে থেকে। কিন্তু তার মৃত্যুর দৃশ্য আমি সহ্য করতে পারবোনা।” জামিল চৌধুরী মেনে নিলেন। সাংবাদিকতার জগতে বিচরণ করি বলে তাহরেউদ্দীন ঠাকুরও আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে সুপরিচিত। আমার অবস্থা লক্ষ্য করে তিনি কেন জানি আর জোর করলেন না। কিন্তু হঠাৎ করে মুস্তফা মনোয়ার সাহেব বললেন,” জিয়া তোমার সাথে আমি যাব।” আর্মি পরিবৃত হয়ে একটি আর্মি জিপে জিয়ার সঙ্গে মুস্তফা মনোয়ার এবং আরো দুজন স্থির চিত্রগ্রাহক গোলাম মাওলা ও কামরুজ্জামান বত্রিশ নম্বরের দিকে রওয়ানা হলেন। পরে জেনেছি ধানমন্ডির তিন নম্বরের মাথায় মুস্তফা মনোয়ার সাহেব শারিরীক অসুস্থতার কথা বলে জিপ থেকে নেমে সেন্ট্রাল রোডে (এখন শহীদ মুনীর চৌধুরী সড়ক) তার বোনের বাসায় চলে যান। আসলে মুস্তাফা মনোয়ার আপাদমস্তক শিল্পী মানুষ। বড়ো কোমল মন। ঐ করুণ মৃত্যু দৃশ্য সহ্য করার মতোন মন-মানসিকতা তাঁর নেই। মুস্ততফা মনোয়ার যাননি। আমি যাইনি। কি করে যাব? যে মানুষটাকে চিনতাম তাঁর অনন্যসাধারণ মানবিক গুনাবলীর জন্য তাঁর রক্তস্নাত দেহ নির্মম ও নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষী হয়ে পড়ে আছে, কী করে তা দেখবো? মনে পড়ে চুয়াত্তরের মহা প্লাবনে বঙ্গবন্ধু যাচ্ছেন উপদ্রুত এলাকায় রাশিয়ান বেল হেলিকপ্টারে। বিশাল হেলিকপ্টারে সামনে দুটি আসনে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পানি সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রন মন্ত্রী। পেছনে হেলিকপ্টারের দুপাশে লম্বা বেঞ্চ পাতা। আসনে আমরা সমাসীন তার সফরসঙ্গী। বিএসএস, রেডিও থেকে বাঘা বাঘা সাংবাদিক, সংবাদপত্র থেকেও ছিলো বেশ সিনিয়র রিপোর্টার কয়েকজন। বড়ো হেলিকপ্টার বলেই চৌদ্দ/পনের জন অনায়াসে যাওয়া যায়। তোয়াব ভাই পেছনে আমাদের সাথে এবং আমি বসেছি বেতারের তদানীন্তন প্রধান বার্তা সম্পাদক সাইফুল বারী (পরবর্তীতে বেতারের ডিজি এবং এনবিএ এর চেয়ারম্যান) ও বেতারের ওবি তথা ট্রান্সক্রিপশন শাখার একজন সিনিয়র কর্মী পিআইডির স্থির চিত্রগ্রাহক খসরু ও সংবাদের আলম (তখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সার্বক্ষনিক সংযুক্ত) এক সারিতে। বঙ্গবন্ধু একাধিক স্থানে নামেন, লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন, সরকারী কর্মকর্তাদের তদারকির বিষয় জানতে চান ইত্যাদি এবং আমরাও তাঁর সঙ্গে দৌড়াই। কোথাও কোথাও হ্যান্ডসেট মাইক্রোফোনে ছোট্ট বক্তব্য রাখেন। সেবার প্রায় আট ঘন্টা হেলিকপ্টারে কাটাই। একটি স্থানে আমাদের দৌড়াদৌড়ি কর্মতৎপরতা থামিয়ে বলেন “কিরে তোদের ক্ষিধা লাগে নাই। তোয়াব ওদের খাবার দাও।” এমনি করে কোন একটি স্থানে নামার মুহূর্তে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠেন “এই তোর মুখে কালো পোচ দিছে কে? মুখ ব্যাজার ক্যান?” আমি কিছু বলার আগে সাইফুল বারী সাহেবকে লক্ষ্য করে বললেন, “দ্যাখতো ওর কি প্রবলেম?” বঙ্গবন্ধু হেলিকপ্টার থেকে নেমে পড়েন এবং ঐ এলাকা পরিদর্শন শেষে হেলিকপ্টার আবার উড়তে শুরু করলে সাইফুল বারী সাহেব আমাকে জিজ্ঞ্যেস করলেন, আমার মন খারাপের কারণ কি? আমি আমার শিশু কন্যার অসুখের কথা বললাম। সব শুনে সাইফুল বারী বললেন তার মেয়ের ও ঐ ধরনের অসুখ ছিলো এবং আমাকে পরের দিন তার বেইলি রোডের বাসায় যেতে বললেন। সাইফুল বারীর বড় ভাই ইরফানুল বারীর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় আমার শিশু কন্যা সুস্থ হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধুর কি প্রখর দৃষ্টি। তিনি আমার বেজার মুখ দেখে আঁচ করেছিলেন কোনো প্রবলেমের আর সাইফুল বারী সাহেবকে সমাধান করতে বলেছিলেন। বারী ভাইও সমস্যা সমাধান করে দিলেন যার ফলে পরম করুণাময়ের অসীম কল্যাণে আমার শিশুকন্যাটিকে আর সেই অসুখে আক্রান্ত হতে হয়নি। আজ এতগুলি বছর পরেও সেদিনের কথা মনে হলে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। আর সেই বঙ্গবন্ধু দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চলে গেলেন। সপরিবারে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হলো স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে দেওয়ার জন্য।
পনেরই আগস্ট বত্রিশ নম্বর থেকে জিয়াউল হক শূন্য ক্যামেরা নিয়ে ফিরেছিলেন। তার গৃহীত চিত্রসহ পুরো ম্যাগাজিন সেনা সদস্যরা নিয়ে গিয়েছিলো। ফিরে এসে জিয়া বলেছিল, ”আপনার বাসা কাছেই, চলুন আপনার বাসায় যাই।” তাকে খুব বিমর্ষ লাগছিল। তাকে সঙ্গে করে বাসায় ফিরলে পর পিংকি ও আমাকে বঙ্গবন্ধুসহ সকলের মৃত্যুদৃশ্যের করুণ বর্ণনা দেয় যা শুনে আমরা উত্তেজিত ও বিমূঢ় হয়ে পড়ি। আমরা দুজন আবারো বিকাল ৪/৫ টায় বঙ্গভবনে ফেরত যাই। কেননা আমাদের ঐসময় ফিরতে বলা হয়েছিল। কারণ নতুন মন্ত্রীসভার সকলে শপথ নেবে। একজন একজন করে আসতে থাকেন শপথ গ্রহন করতে, যাঁদের দেখে আমরা হতবাক হয়ে যাই, কারন এঁরা বঙ্গবন্ধুর ক্যাবিনেটে ছিলেন। শুধু ৪ জন সেদিন আসেন নি। সেই চারজন –সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে পরবর্তীকালে অবরুদ্ধ করা হয়। যাঁরা আর কোনদিন বাংলাদেশের মুক্ত আলো-হাওয়ায় নিশ্বাস নিতে পারেননি। সেই মর্মান্তিক কাহিনী এখন অন্য এক ইতিহাস।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনকালের প্রথম মেয়াদে বিটিভির ক্যামেরাম্যান জিয়াউল হক ও ইত্তেফাকের স্থির চিত্রগ্রাহক গোলাম মাওলার তোলা সেদিনের কিছু চিত্র সর্বপ্রথম বিটিভির মাধ্যমে জন-সমক্ষে আসে। দীর্ঘ বাইশ বছর পর প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া আংশিক ফুটেজ উদ্ধার করা হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে জিয়াউল হক মাদ্রাজ থেকে তা প্রিন্ট করে আনেন যাতে ছবিগুলো দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। জিয়া তখন চাকুরী থেকে অবসর নিয়েছেন। আমি তখন বিটিভির ডিডিজি নিউজ। সিড়িতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধু, বুকে ছোপ ছোপ রক্ত, চোখ বুজে যেন ঘুমিয়ে আছেন, এমন দৃশ্য দেখে কে না শিহরিত ও হতবাক হয়? মনে পড়ে ১৫ আগস্টের সেই ভয়ংকর দিনের কথা। এখনতো বঙ্গবন্ধু কন্যার শাসন আমলে আমরা অনেক ভারমুক্ত। তাই জিয়াকে বললাম, “এবার আপনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান এবং আপনি নির্ভয়ে বলে যান সেদিন আপনি বত্রিশ নম্বরে ঢুকে কি দেখেছিলেন, আপনার কেমন লেগেছিলো, কি মনে হয়েছিলে কাছের প্রিয় মানুষের রক্তাপ্লুত নির্জীব শরীর দেখে? ”জিয়া ক্যামেরার পেছন থেকে সেই প্রথম সামনে এলেন এবং বললেন সেদিনের কথা । জিয়া বলেছিলো আবেগে বিষাদে মন খুলে জাতির কাছে এবং হয়ে গেলেন ইতিহাসের অংশীদার। সেদিনের স্বাক্ষী অনেকে আজ নেই। গোলাম মাওলা স্থির চিত্র অফিসে জমা দিয়ে ভয়ে সেই রাতেই তার দেশ ফেনীতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এতটাই তিনি শোকাহত ছিলেন যে পরে মারাত্মক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর্মির লোকেরা তার তোলা ছবিগুলো নিয়ে যায় রিলসহ। দুঃখের বিষয় জিয়াউল হকও দীর্ঘ রোগ ভোগের পর পরিণত বয়সে সম্প্রতি লোকান্তরিত।
এখন আমরা শোকাবহ দিবসের যে চলচ্চিত্র টিভি চ্যানেলে দেখি এবং মর্মাহত চিত্তে সেই ভয়ংকর অন্ধকার দিনকে স্মরণ করি তা পনের আগস্ট মধ্যাহ্নে জিয়াউল হকের সচল চিত্র এবং দৈনিক বাংলার গোলাম মাওলার স্থির চিত্রের সমন্বয়ে তৈরী ফাইল ফুটেজ। অনেকে কোলাজ করেও তা দেখিয়ে থাকেন। দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করি বিশেষ কিছু টিভি চ্যানেল ‘এক্সক্লুসিভ’ বলে দাবী করে তা প্রদর্শন করছে অথচ সেদিন এসব চ্যানেল ও মানুষগুলো এই ইতিহাসের অংশিদার হওয়া তো দূরের কথা তাদের অস্তিত্বও ছিল না। আমরা যারা পনের আগস্টের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি, তাদের জন্য এটা কষ্টকর।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Firoz Uddin — আগস্ট ১৭, ২০১৭ @ ৫:১৬ অপরাহ্ন

      Respected Alamgir vai,
      Thank you very much to bring the events to us. We came to know many unknown facts. Million respects to you who respected dead Bangabandhu and hated the senior people who went to take oath under Mushtak cabinet. May Allah keep departed souls of Zia vai and Golam Mowla in peace.
      Pray for your sound health.
      Firoz/working in Govt.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোঃ আলী আজম — আগস্ট ১৮, ২০১৭ @ ১২:২৩ অপরাহ্ন

      এই লেখার দরকার ছিল এবং আজীবন থাকবে। ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Omar Faruk — আগস্ট ১৯, ২০১৭ @ ৬:৩৮ অপরাহ্ন

      অসাধারণ লেখা, আপনার লেখা সব সময় আমাদের ভালো লাগে, এই লেখাটার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন হওয়া উচিত মনে করি… এভাবে লিখতে থাকেন স্যার

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com