রবীন্দ্রনাথ ও জাপান

সৌরভ সিকদার | ৬ আগস্ট ২০১৭ ৮:১১ অপরাহ্ন

tagore1 রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন বহুমাত্রিক লেখক। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলির জন্য ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি এশিয়ার কবি-লেখকদের মধ্যে প্রথম যে এই পুরস্কার লাভ করেন। তাই সঙ্গত কারণেই এই মরমী (Mystic) কবিকে নিয়ে জাপানি জনগণ এবং সেদেশের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। বিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকেই জাপান ছিল এশীয় দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান, বিজ্ঞান, অর্থ ও সমর শক্তিতে অগ্রসর। এমনকি শিল্প-সাহিত্য চর্চায় ও তারা কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছিল।
জাপানীদের কাছে রবীন্দ্র বিষয়ে আগ্রহ তৈরি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির কারণে হলেও জাপান বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি হয়েছিল বেশ আগেই। তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান হওয়ায় যুবক বয়সে ইউরোপ তথা ইংল্যান্ড ভ্রমন করেছিলেন। পাশ্চাত্যের সমাজ, সভ্যতা ও সাহিত্য জ্ঞান ক্ষেত্রের বিষয়ে তাঁর একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জাপানে যাবার এবং সেখানকার জীবন আচরণের অভিজ্ঞতা তখনও তার হয়নি- অর্থাৎ সুযোগ ছিল না। কবির নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি সে দরোজা খুলে দিলো। জাপানের আমন্ত্রনে তাই ১৯১৬ সালে প্রথম কলকাতা থেকে জাহাজে তার জাপান যাত্রা শুরু হল।
তবে এ লেখার শুরুতেই যে কথাটি উল্লেখ না করলেই নয় যে, বিশ শতকের গোড়ার দিকে জাপানের বিখ্যাত শিল্প সমালোচক এবং সংস্কৃতি সংগঠক ওকাকুরা কাজুকো (১৯৬২-১৯১৪) যার অন্য নাম ‘তেনসিন’ যখন ভারতে আসেন এবং রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষাৎ পান, তখন উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ট এক শিল্প-বন্ধুত্ব তৈরি হয়। তেনসিন-এর আগ্রহ ছিলো জাপানি সংস্কৃতিতে ভারতীয় সংস্কৃতির কোন প্রভাব বা ধারার অনুসন্ধান যা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের মধ্য দিয়ে চীন হয়ে জাপানে গিয়েছিল। বলা উচিৎ যে ১৯০১ সালে ওকাকুরা ১১ মাস ভারতে থেকে তার বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত করেন- দ্যা আইডিয়ালস অব দি ইস্ট। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল জাপানের শিল্প সাহিত্য ও সমাজ জীবন বিষয়ে জানার। কিন্তু পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও শৌর্যের প্রভাবে জাপান যে ক্রমশ আগ্রাসী হয়ে উঠছে তা তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তো তার মানস কল্পনার জাপানের সঙ্গে বাস্তবের জাপানকে মিলিয়ে নিতে সানন্দে জাহাজে চেপে বসলেন জাপানের পথে। শুরু করলেন ডায়েরি লেখা- ‘জাপান যাত্রী’ নামে তা প্রকাশিতও হয় ১৯১৯ সালে (বাংলা ১৩২৬)। এই ডায়েরিতে জাপান বিষয়ে তার ভাবনা ও অভিজ্ঞতার যে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট রূপ ফুটে উঠেছে- তা শুধু একজন সাহিত্যিকের চোখে দেখা নয়- সমাজবিজ্ঞানীর দৃষ্টিও আমরা পাই। জাপানের মানুষের চিরন্ত্রন সারল্য ও সৌন্দর্যবোধ থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের নেতির প্রভাব এমনকি বাণিজ্য বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।
১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের জাপান ভ্রমণের পূর্বেই সেখানে মাশিনো সাবুরো নামে একজন কবি তার কবিতার জাপানি অনুবাদ করেন ১৯১৩ সালে এবং ১৯১৫ সালে তিনি ‘গীতাঞ্জলির পূর্ণ অনুবাদ করে তা প্রকাশ করেন। এছাড়াও আরও কয়েক জন জাপানি লেখক তাঁর বিভিন্ন রচনা বিশেষ করে কবিতা, গল্প অনুবাদ করে প্রকাশ করেন, এগুলো সবই অবশ্য ছিলো ইংরেজি থেকে অনুবাদ। অর্থাৎ সীমিত আকারে হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অর্থাৎ ‘তাগোরু’-র লেখা বিষয়ে সেখানের সাহিত্য সমাজে ধারণা তৈরি হয়েছিল। তবে কবির দিক থেকে বেদনার বিষয় ছিল তাঁর জাপানি শিল্পবোদ্ধা বন্ধু ওকাকুরা ততদিনে গত হয়েছেন। এমনকি তার সাহিত্যের অনুবাদক মাশিনোও ১৯১৬ সালে মৃত্যুবরন করেন।
এ বছর জাপানের কোবে বন্দরের দেড় শ বছর পূর্তি উৎসব হল। গত জুনের শেষ সপ্তাহে কোবে শহর দেখতে গিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে । ১৯১৬ সালের ২৯ মে রবীন্দ্রনাথ কোবে বন্দরের মাধ্যমে জাপানে প্রবেশ করেন। তাকে নিয়ে তখন এমন টানাটানি শুরু হয়, সংবাদকর্মীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা শুরু হয় যা কবিকে বিরক্ত করেছিল। তিনি লিখেছেন ‘জাপানি পক্ষ থেকে তাদের ঘরে নিয়ে যাবার জন্য আমাকে টানাটানি করতে লাগলেন, কিন্তু ভারতবাসীর (প্রবাসী) আমন্ত্রণ আমি পূর্বেই গ্রহণ করেছি। এই নিয়ে বিষম একটা সংকট উপস্থিত হল। কোন পক্ষই হার মানতে চায় না। বাদ-বিতন্ডা-বচসা চলতে লাগলো। আবার এরই সঙ্গে সঙ্গে সেই খবরের কাগজের চরের দল আমার চারিদিকে পাক খেয়ে বেড়াতে লাগলো’। খ্যাতি যে কখনো কখনো বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায় তা রবীন্দ্রনাথ টের পেয়েছিলেন সেদিন।
জাপানে রবীন্দ্রনাথকে অসীম আগ্রহ ও সৌজন্যে সাথে বরণ করা হয়েছিল, কিন্তু কোবে থেকে ওসাকা গিয়ে তার দেয়া প্রথম ভাষণের পর হঠাৎ যেন ‘তাগোরু’ বিষয়ে তাদের আগ্রহ ভাটা পড়ে যায়। ‘ভারত ও জাপান’ শিরোনামের সেই ইংরেজি ভাষণে কী এমন ছিল যা জাপানিরা সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। সে ভাষণে রবীন্দ্রনাথ আসলে জাপানকে এশিয়ার ইতিবাচকতার উন্নয়নের নেতৃত্বে দেখতে চেয়েছেন কিন্তু তিনি আগ্রাসী জাপানকে মেনে নিতে পারেননি, তীব্র জাতীয়তাবাদী ও পাশ্চাত্যের মতো আধিপত্যবাদী জাপানের তিনি সমালোচনা করেছিলেন। ফলে সেখানে রবীন্দ্রনাথকে ভুল বোঝা হয়েছিল । তখনকার দিনের জাপানের প্রায় সব পত্রপত্রিকাই এমনকি আসাহি শিমুবনও এই ভাষণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। তাতে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ থেমে যাননি। তিনি পরবর্তী ভাষণগুলোতেও তার বক্তব্যে স্থির ছিলেন। তবে জাপানের রাজনৈতিক আদর্শ ও জাতীয়তাবাদ তাকে পীড়া দিলেও সাধারণ মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন অনুশীলন সৌন্দর্যবোধ, ধৈর্য ও শিষ্টাচারের প্রশংসার কথা বার বার উচ্চারিত হয়েছে তার ভ্রমণ কাহিনি, এমন কি অন্য লেখাতেও। ‘জীবন যাত্রার রীতি যদি আমরা অসংকোচে জাপানের কাছ থেকে শিখে নিতে পারতুম তাহলে আমাদের ঘর দুয়ার এবং ব্যবহার শুচি হত, সুন্দর হত, সংযত হত’।
পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ‘ধ্যানী জাপান’ নামে একটি প্রবন্ধও রচনা করেছিলেন। সেখানে, সকল কর্ম ও সাধনায় ধ্যান যে কিভাবে মানুষকে শক্তি ও দক্ষতা দান করে তা জাপানের কাছ থেকে শেখার আছে বলে তিনি মনে করেন। যদিও ‘ধ্যানের যুগ, সংযমের সাধনা, সমস্ত পৃথিবী থেকেই আজ তিরস্কৃত হচ্ছে’ বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তার ভাষণে জাপান যে পাশ্চাত্য থেকে ভাল জিনিসকে দ্রুত গ্রহণ করতে পেরেছে এবং প্রাচ্যের দেশ হয়েও পাশ্চাত্যের মতো সমাজ সভ্যতাকে নতুন সম্পর্কে স্থাপন করছে তাও ব্যক্ত করেছিলেন। তা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের আগ্রাসী মনোভাব গ্রহণ করা যে জাপানের জন্য সুদিন বয়ে আনবেনা এই সাবধান বাণী ও সমালোচনা মেনে নেবার মতো বাস্তবতা তখন জাপানের ছিলোনা- তাই কোবের বন্দবের কবিকে বরণ করার দৃশ্যের বিপরীত চিত্র দেখা গেল ইয়োকোহামাতে যখন তিনি বিদায় নেন। হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র তাকে বিদায় দিতে এসেছিলেন। মাত্র ৩টি ভাষণে এশিয়ার প্রথম নোবেলবিজয়ী বাঙালি কবির প্রতি অদম্য আগ্রহ ও কৌতুহল বোধ কি নিমেশেই না ফাকা হয়ে গেল।
এর পর রবীন্দ্রনাথ আরও দু বার জাপান এসেছেন ১৯২৪ এবং ১৯২৯ সাল। প্রথম যুদ্ধোত্তর সেই উত্তাল সময়ে। কিন্তু তখন রবীন্দ্রনাথ ও জাপান সম্পর্কের সেই শীতলতা কাটেনি। ১৯২৯ সালেও তিনি জাপানের ঔপনিবেশিক, আধিপত্যবাদী ও তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনার সমালোচনা করেছেন বিবেকের তাড়নায়। কেননা যুদ্ধের বিভীষিকা কবিকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলেছিল। এই উগ্ন জাতীয়তাবাদী চেতনার আগ্রাসী বীজ যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে- মানবিকতা ভুলণ্ঠিত হবে তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কিন্তু যা দেখার দূর্ভাগ্য তাঁর হয়নি- তা হচ্ছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। প্রাচ্যের মানবিক ও নিষ্ঠা চেতনার যে নেতৃত্বে জাপানকে রবীন্দ্রনাথ দেখতে চেয়েছিলেন- তা অনুপস্থিত দেখে তিনি হতাশ হয়েছিলেন। আর জাপান রবীন্দ্রনাথের উচিৎ কথা তথা নীতিবাক্যকে স্পর্ধা হিসেবে বিবেচনা করে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার পর নতুন জাপান উপলব্ধি করেছে- যুদ্ধ নয় মানবিকতাই আসল, জাতীয়তাবাদ নয় শিষ্টাচার ও একনিষ্ঠতাই জয় করতে পারে বিশ্ব। তাইতো (চারিদিক নাগিনীর…) যুদ্ধপরবর্তী ষাট সত্তরের দশকে নতুন প্রজন্মের জাপানিদের কাছে রবীন্দ্রনাথ নতুন করে পরিচিত হতে থাকে, একের পর এক তার সাহিত্যের অনুবাদ প্রকাশিত হয়- বের হয় পেপারব্যাক ও সুলভ সংস্করণ- ক্রমে ক্রমে রবীন্দ্র রচনাবলী। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের যে ভাষণকে তারা বর্জন করেছিল ১৯৫৭ সালে ইয়ামামুরোর অনুবাদে তাও প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ জাপানকে অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে জাপানের উপলব্ধি এবং ভুল ভাঙ্গাতে লেগে গেলে গেল অর্ধ শতক এবং একটি ভয়াবহ যুদ্ধ।
অথচ জাপানের প্রতি কী আশাবাদই না তিনি ব্যক্ত করেছেন – ’জাপানের প্রাচ্যমন পাশ্চাত্যের কাছ থেকে কাজের শিক্ষা লাভ করেছে। কিন্তু কাজের কর্তা তারা নিজেই। এ জন্য মনের ভেতরে একটা আশা হয় যে জাপানে হয়তো পাশ্চাত্যের কাজের সঙ্গে প্রাচ্য ভাবের একটা সামঞ্জস্য ঘটে উঠতে পারে। সেটা যদি ঘটে তবে সেটাই পূর্ণতার আদর্শ হবে। পশ্চিমের শিক্ষা জাপানে কী আকার ধারন করবে, সেটা স্পষ্ট করে দেখবার সময় এখনো হয়নি। প্রকৃতির কাজ হচ্ছে অসামঞ্জস্যকে মিটিয়ে দেয়া- জাপানে সেই কাজ চলছে সন্দেহ নেই। এই যে এখানে সারাক্ষণ ঘরে ঘরে দ্রুত বেগে মেয়েদের হাতের কাজের স্রোত এত বেগে বইছে- এ খুব সুন্দর লাগছে। এখানে নারী পুরুষের মধ্যে কোন গ্লানি দেখতে পাইনে। এদের মধ্যে মোহের একটা আবরন যেন কম। এখানে নারী পুরুষের দেহ পরস্পরের দৃষ্টিতে কোন মায়াকে লালন করেনা, দেহ সম্পর্কে এরা খুব স্বাভাবিক। পৃথিবীতে যত সভ্য দেশ আছে তার মধ্যে কেবল জাপানি মানুষের দেহ সম্পর্কে যে মোহমুক্ত এটা আমার কাছে বড় জিনিস মনে হয়। এখানে মেয়েদের কাপড়ের মধ্যে নিজেকে স্ত্রীলোক বলে বিজ্ঞাপন দেবার চেষ্টা নেই। পৃথিবীব্যাপী বানিজ্য ও অফিস রাজ্য বিস্তীর্ন হওয়ায় জাপানের শহরের চেহারায় জাপানিত্ব বিশেষ নেই। মানুষের সাজস্জ্জা থেকে জাপানি ক্রমশ বিদায় নিচ্ছে। তবে মেয়েরা কিছুটা ব্যতিক্রম। রাস্তায় বের হয়ে এদেরকে দেখলেই মনে হয় এটা জাপান। জাপানিরা চেচামেচি-ঝগড়া করে নিজের শক্তি ক্ষয় করে না। এখানে ভীর আছে গোলমাল নেই… এখানে প্রাণ শক্তির বাজে খরচ নেই বলে প্রয়োজনের সময় টানাটানি পড়ে না। শরীর ও মনের শান্তি ও সহিষ্ণুতা এদের জাতীয় সাধনার একটা অঙ্গ। শোকে দুঃখে আঘাতে উত্তেজনায় এরা নিজেকে সংযত করতে জানে। এরা যে নিজেকে সংক্ষিপ্ত ও পরিমিত প্রকাশ করে- তা তাদের কবিতায়ও দেখা যায়- মাত্র তিন লাইনের কাব্য- জগতে আর কোথাও নেই। এরা কবিতা দিয়ে দৃশ্য দেখায়। আবেগের বোধ এবং প্রকাশকে খুব ছোট করে সৌন্দর্য বোধ এবং প্রকাশকে বাড়িয়ে তোলা যে সম্ভব- এখানে এসে অবধি এই কথাটা আমার মনে হয়েছে’।
রবীন্দ্রনাথ যে জাপানের জীবন, সমাজ, মানুষ দেখেছেন গভীর ভাবে তা বোঝা যায়– ’জাপানী চোখ এবং হাত দুই-ই প্রকৃতির কাছ থেকে সৌন্দর্যের দীক্ষা লাভ করছে, যেমন এরা দেখতে জানে তেমন ওরা গড়তে জানে। জাপানীরা কেবল যে শিল্পকলায় ওস্তাদ তা নয় মানুষের জীবনকে এরা একটি কলা বিদ্যার মতো আয়ত্ব করেছে। এরা এটুকু জানে যে- জিনিসের মূল্য আছে, গৌরব আছে, তার জন্য যথেষ্ট জায়গা ছেড়ে দেয়া চাই। পূর্ণতার জন্য রিক্ততার সবচেয়ে বেশি দরকার। বস্তবাহুল্য জীবন বিকাশের প্রধান বাধা। এরা ঝগড়া করে না বটে অথচ প্রয়োজনের সময় প্রাণ দিতে প্রাণ নিতে এরা পিছপাও হয় না। জিনিসপত্রের ব্যবহারে এদের সংযম, কিন্তু জিনিস পত্রের প্রতি প্রভুত্ব এদের তো কম নয়। সকল বিষয়েই এদের যেমন শক্তি তেমনি নৈপূন্য, তেমনি সৌন্দর্যবোধ। এ সমন্ধে আমি এদের যখন প্রশংসা করছি, তখন এদের অনেকের কাছেই শুনেছি যে- “এটা আমরা বৌদ্ধধর্মের প্রসাদে (মাধ্যমে) পেয়েছি। অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের একদিকে সংযম আর এক দিকে মৈত্রী, এই যে সামঞ্জস্যের সাধনা আছে এতেই আমরা মিতাচারের (ভাল আচরণ) দ্বারাই অরক্ষিত শক্তির অধিকার পাই। বৌদ্ধ ধর্ম যে মধ্যপথের ধর্ম”। শুনে আমার লজ্জা বোধ হয়। বৌদ্ধধর্ম তো আমাদের দেশেও ছিল, কিন্তু আমাদের জীবন যাত্রাকে তো এমন আশ্চর্য ও সুন্দর সামঞ্জস্য বেঁধে তুলতে পারে নি।
তিনি ইউরোপ-জাপান তুলনাও করেছেন– ইউরোপে যখন গেছি তখন তাদের কল কারখানা, তাদের কাজের ভীড় তাদের ঐশ্বর্য এবং প্রতাপ খুব করে চোখে পড়েছে এবং মনকে অভিভূত করেছে।
ইউরোপ যে শক্তিতে পৃথিবীতে সর্বজয়ী হয়ে উঠেছে একমাত্র সেই শক্তির দ্বারাই তাকে ঠেকানো যায়। নইলে তার চাকার নীচে পড়তেই হবে এবং একবার পড়লে কোন কালে আর উঠবার উপায় থাকবে না। জাপানীরা ইউরোপ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলেছে ঠিকই কিন্তু ইউরোপীয় যুদ্ধবাজ বা আধিপত্যকামী সংস্কৃতিও যে সে ধীরে ধীরে আয়ত্ব করছে এটা কবিকে পীড়িত করেছে। এ জন্য চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ তিনি মেনে নিতে পারেননি। প্রায় তিন মাস জাপানে অবস্থান কালে তিনি যে তিনটি ভাষণ দিয়েছেন সেখানে ‘আধুনিকতার নামে ঘুর্ণিঝড়’, এবং পশ্চিমের অনুকরণের মধ্য দিয়ে জাপান যে ভবিষ্যতে তার সর্বনাশ ডেকে আনছে তা প্রকাশ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ যুদ্ধকে দেখেছেন দানবীয় শয়তান হিসেবে যা কিনা মানব সভ্যতাকে বিপন্ন করতে উদ্যত। জাপানের জাতীয়তাবাদী চেতনা নিয়ে সেদিন (১৯১৩) রবীন্দ্রনাথ ভীত ছিলেন। তিন দশক পরে কবির সে আশংকা বাস্তবে রূপ নেয় এক বিভীষিকা ও ভয়াবহতা নিয়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিরোসিমা ও নাগাসাকির পারমানবিক ক্ষতের মধ্য দিয়ে। এশিয়ার মধ্যে জাপানের রয়েছে নতুনকে গ্রহণ ও উদ্ভাবন করার ক্ষমতা এবং চিত্তের নমনীয়তা। এদিক দিয়ে বাঙালির সঙ্গে তাদের কিছুটা মিল আছে। কোবের বন্দরে যখন রবীন্দনাথের জাহাজ ভিড়েছিলো তখন নোবেলবিজয়ী এশিয়ার প্রথম কবিকে দেখতে ও তাঁর কথা শুনতে ভীড় জমিয়েছিল প্রায় লক্ষ জাপানি। টোকিও ষ্টেশন কবিকে স্বাগত জানিয়েছিল কয়েক হাজার মানুষ। টোকিওতে ভাষণের সময়ও অসংখ্য শ্রোতা উপস্থিত ছিল কিন্তু কবি যখন ৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৬ সালে ইয়োকোহামা বন্দর থেকে জাপান ছেড়ে যান তখন তাকে বিদায় দিয়ে ছিলো মাত্র কয়েক জন মানুষ। কেন এমন হয়েছিল? সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ভাবনা এবং যুদ্ধপন্থি জাপানের সমালোচনা করেছিলেন বলেই কবিকে নিয়ে জাপানীদের যে উচ্ছ্বাস তা কমে গিয়েছিলো, তাই বলে কবি কিন্তু শান্তির বানী শোনাতে থেমে যাননি। এমনকি এর পর ১৯২৪ এবং ১৯২৯ সালে আরও দুবার রবীন্দ্রনাথ জাপান ভ্রমন করেছেন। জাপানের প্রতি তার অসীম আগহ এবং ভালাবাসা থেকে বিশেষ ভাবে তাঁর বন্ধু ওকাকুরা তেনসিন (১৮৬২-১৯১৪)-এর জন্য। যদিও জাপানের এক শ্রেণির শিল্পী সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর মনে তিনি দাগ কেটেছিলেন কিন্তু সমালোচনার জন্য জাপানের রাজনৈতিক শক্তি তাকে আপন ভাবেনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত। সে কারণে রবীন্দ্র সাহিত্য অনেকটা আড়ালেই থেকে গেছে জাপানীদের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ১৯৬১ সালে নতুন ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ জাপানে প্রবেশ করে অনুবাদের মাধ্যমে। নতুন প্রজন্মের জাপানে স্বাগত হন রবীন্দ্রনাথ। এটা ছিল যুদ্ধোত্তোর মানবিক উপলব্ধিজাত নতুন প্রজন্মের কাছে তাগোরো বুম । সেই থেকে এখনো জাপানে রবীন্দ্রনাথ বহুল পঠিত, দারুণ সমাদৃত।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com