পার্থ চট্টোপাধ্যায়: কেউ হিজাব পরলে বা বোরখা পরলে বলবে এটাতো ধর্ম–এখানেই মুশকিলটা হচ্ছে

সাব্বির আজম | ৫ আগস্ট ২০১৭ ৪:০৫ পূর্বাহ্ন

Partha-Chatterjeeপার্থ চট্টোপাধ্যায় এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদদের মধ্যে অন্যতম। দৈনন্দিন রাজনীতিকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও তত্ত্বায়নে তাঁর জুড়ি নাই। ‘আধুনিকতা’, ‘গণতন্ত্র’, ‘সেকুলারিজম’, ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘সিভিল সোসাইটি’ ইত্যাদি ধারণাগুলো এখন পোস্টকলোনিয়াল রাষ্ট্রগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে বাহাসের কমতি নাই। অনেকেই মনে করেন এই ধারণাগুলো দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে ঠিকভাবে প্রোথিত হতে পারে নাই। খামতি থেকে গেছে। এখানকার গণতন্ত্র, সেকুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি বিকৃত বা অপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশে যেকোনো আলোচনায় এই ধারণাগুলাকে খুব কমই মোকাবেলা করা হয়। এগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ ক্যাটেগরি আকারে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু পার্থ চট্টোপাধ্যায় একে একদম ভিন্ন তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মূল কথা হল, এইসব ধারণাগুলো পশ্চিমা সমাজ ও ইতিহাসের ক্রমবিকাশ থেকে আমদানি করা হলেও, এখানকার স্থানীয় বাস্তবতার সাথে মিলেমিশে এগুলো নিজস্ব আকার লাভ করেছে। একে ঘাটতি আকারে দেখা বা পশ্চিমা ছাঁচে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং উপরোক্ত ধারণাগুলো সর্বজনীনতা দাবি করলেও, তাতে সবসময়ই স্থানিকতার কাদা-মাটি লেগে থাকে। লিনিয়েজেস অব পলিটিকাল সোসাইটি (২০১১) বইয়ে দেখিয়েছেন, কেন আধুনিক বা পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্ব দিয়ে পোস্টকলোনিয়াল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। আজ [৫ই অগাস্ট] পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ৭০তম জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে জানাই শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।

গত বছর হলি আর্টিজানের ঘটনার সময় রাতে আমরা সবাই সহি-সালামতে আছি কি না জানতে চেয়ে পার্থ-দা ইমেইল করেন। তখন তাঁকে জানাই কয়েকদিন বাদে কলকাতা যাচ্ছি, উনি কলকাতায় থাকবেন কি না। ১১ জুলাই সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস-এ তার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। আলাপচারিতার সময় আমার দুই বন্ধু আবদুল্লাহ আল মেহেদী ও ব্যারিস্টার আহমেদ ইশতিয়াক রুপম আমার সাথে ছিল।- সাব্বির আজম

সাব্বির আজম : জাতীয়তাবাদী নেতারা প্রত্যেকেই ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির। কিন্তু এই ভদ্রলোক শ্রেণির তত্ত্ব-খায়েশ যখন সাবলটার্নের মধ্যে ছড়াল তখন তাদের ভিতরকার প্রতিক্রিয়া তো ভিন্ন রকমের হবে। অর্থাৎ সাবলটার্ন তো তার নিজের চোখ দিয়ে জাতীয়তাবাদ পাঠ করবে। এই পাঠ-ক্রিয়ার বা রোজকার রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিতে সাবলটার্নদের নিজস্ব কী কী নিশান আমাদের নজরে পড়ে যা ভদ্রলোকদের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে আলাদা?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : সাবলটার্ন স্টাডিজের বিভিন্ন প্রবন্ধ বা পরবর্তীতে গবেষণামূলক নানা বইয়ে এর হদিস মিলবে। যেমন ধর, জাতীয়তাবাদের সময়কার গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের আন্দোলনগুলো নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে ভারতবর্ষের বহু অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে কংগ্রেস-আন্দোলনের জনসমর্থন তৈরি হয়েছিল। সেগুলো আন্দোলনের মধ্য দিয়েই হয়েছিল। এবং বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে জাতীয় আন্দোলনের নেতারা নানারকমভাবে স্থানীয় দাবি, স্থানীয় মানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন সংগঠন করতে পেরেছিলেন এবং এগুলো ছিল প্রধানত ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে। বাংলার কথাই যদি ধর। উনিশশো বিশ-ত্রিশ-চল্লিশের দশকে মেদিনীপুর অঞ্চলে কংগ্রেসের একটি বড় জনসমর্থন ছিল। এর মূল কারণ ছিল, এ অঞ্চলে ১৯১৯-২০ সালের দিকে ব্রিটিশ সরকার গ্রামে ইউনিয়ন বোর্ড চালু করল। তারা চৌকিদারি ট্যাক্স বসায়। মেদিনীপুরে এই ট্যাক্স নিয়ে ক্ষোভ ছিল। এমনিতেই এত ট্যাক্স দিতে হয়। আবার হঠাৎ চৌকিদারি ট্যাক্স কেন? এটা কিন্তু একেবারে স্থানীয় দাবি। কিন্তু সেইটে কংগ্রেস নেতারা জাতীয় আন্দোলন তথা ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছিলেন বলেই তারা সমর্থন পেয়েছিলেন। অর্থাৎ সাবলটার্ন শ্রেণি অনেক সময় তাদের স্থানীয় দাবি-দাওয়ার সঙ্গে বাইরের আন্দোলন যুক্ত হলে তাকে সমর্থন করেছে। আবার বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে তারা সমর্থন করেনি। অনেক জায়গায় দেখা গেছে যোগ দেয়ার পরে তারা আন্দোলন থেকে সরে গেছে।

সেজন্যে, উপর থেকে জাতীয়তাবাদ এল, তারপরে হঠাৎ সাধারণ মানুষ রাজনীতি বুঝতে শুরু করল, রাজনৈতিক চেতনা তাদের মধ্যে বাইরে থেকে নিয়ে আসা হল ইত্যাদি, এরকম মনে করলে ভুল হবে। সাধারণ মানুষ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এসেছে। তাদেরকে জমিদার রাজা-রাজড়া ইত্যাদি শাসকবর্গের সঙ্গে নানাভাবে মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেটাও রাজনৈতিকই। এক ধরনের রাজনৈতিক চেতনা তো ছিলই। পরবর্তীতে নতুন ধরনের রাজনীতি তাদের কাছে এল। তারা সেটা কতটা গ্রহণ করবে, কতদূর অব্দি গ্রহণ করবে সেটা কিন্তু ওপরের নেতারা কী বলল, কী প্রোগ্রাম দিল এটা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

সাব্বির আজম : গত দুই দশক ধরে আপনি ‘পলিটিক্যাল সোসাইটি’ নামক ক্যাটেগরি নিয়া কাজ করতেছেন। বাংলাদেশের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে কি আপনার এই বর্গ খাটবে? যদি খাটে তাহলে রাষ্ট্রের সাথে তাদের দর কষাকষির সুরত কি একদমই কনটেক্সট নির্ভর হবে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : বাংলাদেশের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে খাটে কিনা তা চট করে বলতে পারব না কারণ আমার কাছে যথেষ্ট তথ্য নেই। আমি যেটুকু জানি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী আদিবাসী পরিস্থিতি অন্যান্য সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের থেকে আলাদা। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতির চরিত্র অন্যরকম। কিন্তু ভারতবর্ষের বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আমি লক্ষ করেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদিবাসীদের স্বতন্ত্র দাবি-দাওয়াগুলো দুরকমভাবে প্রকাশ পায়। একটা হচ্ছে, বাইরের জগত বা সমাজের কাছে সামগ্রিকভাবে কোনো আদিবাসী সমাজের দাবি। অর্থাৎ সেখানে আদিবাসী নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব রক্ষা করে, বাইরের সঙ্গে আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে তারা কিছু জিনিস গ্রহণ করে, কিছু জিনিস লেনদেনের মাধ্যমে সামঞ্জস্যের মধ্যে নিয়ে আসে। বহু ক্ষেত্রে আবার বিদ্রোহও হয়েছে। ইতিহাসে এমন তথ্য-প্রমাণ আছে।

আর দ্বিতীয় যে রকমফের সেটা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বলা এবং এটা আমার পলিটিক্যাল সোসাইটির যুক্তির কাছাকাছি। আদিবাসী সমাজেও কিন্তু বহু জায়গায় বৃহত্তর রাষ্ট্রের নানারকম কর্মসূচি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনেক দূর অব্দি ঢুকে গেছে। ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগে এরকম দেখতে পাওয়া যেত না। আদিবাসী অঞ্চলে আগেও থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারি ছিল কিন্তু আদিবাসী সমাজ কখনো মনে করত না এগুলো তাদের জিনিস। এখন অনেক জায়গায় পরিবর্তন ঘটেছে, যদিও সব জায়গায় সমানভাবে ঘটেনি। কারণ এখন অনেক জায়গায় আদিবাসী সমাজেরই একটি অংশ বিভিন্ন রকম সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়ভাবে আমাদের এখানে পঞ্চায়েত হয় সেখানে আদিবাসী সমাজের লোকরাই নির্বাচিত সদস্য। আদিবাসীদের মধ্য থেকে এমএলএ আছে। রাজনৈতিক দলে নাম লিখিয়েছে এরকম বহু লোক আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যকার প্রতিযোগিতাও আদিবাসী সমাজের ভেতর ঢুকে গেছে। আরেকটি জিনিস মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক আদিবাসী সমাজের ভিতরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি হয়েছে। এরা আদিবাসী পরিচয়বোধ ছেড়ে দিয়েছে তা কিন্তু নয়। তবে তাদের চাহিদা বা প্রত্যাশার ধরন আলাদা। আদিবাসী অঞ্চল বাদেও বাইরের জগত সম্পর্কে তাদের অনেক বেশি ধারণা আছে। তারা অনেকেই শিক্ষাসূত্রে, চাকরিসূত্রে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছে। এর ফলে আদিবাসী সমাজের ভেতরে যে পরিবর্তনগুলো এসেছে তাতে, আমি যাকে পলিটিক্যাল সোসাইটি বলছি, ওই ধরনের লেনদেন কিন্তু এখন অনেক বেশি হচ্ছে। অন্তত ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় এরকম দেখতে পাই।

আর ব্রিটিশ আমলে দেখা যেত আদিবাসী সমাজ মোটেই চাইত না বাইরের লোক এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করুক। এ নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছিল। এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিদ্রোহও হয়েছে। যেমন সাঁওতাল অঞ্চলে বড় বিদ্রোহ হয়েছে। পরে ব্রিটিশ শাসকেরাও মনে করল এদেরকে একটু আলাদা করে রাখাই ভালো। নইলে বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে।

সাব্বির আজম : জয়া চ্যাটার্জীর থিসিসে তিনি বারবার তথ্য-সাবুত হাজির করে দেখানোর চেষ্টা করছেন, ’৪৭-এর বাংলা ভাগ উচ্চবর্ণ হিন্দুরই চাহিদা ছিল। সামগ্রিকভাবে আপনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিরে ‘নাইভ ভিউ অব ন্যাশনালিস্ট পলিটিকস’ বলছেন। আরেকটু বিস্তারিত বলবেন?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : জয়ার সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। ওঁ খুব খুঁটিয়ে দেখিয়েছে, যখন নিশ্চিত হল দেশভাগ হবে, পাকিস্তান হবে, তখন পাকিস্তানে সামগ্রিকভাবে বাংলার জায়গাটি কী হবে তাই নিয়ে হিন্দু নেতাদের মধ্যে এই প্রশ্নটা উঠল–সারা বাংলা যদি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে আমরা কি পাকিস্তানে বাস করতে পারব? তার থেকে জয়া সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, হিন্দু নেতারা ভয়ঙ্কর দোষ করে ফেলেছে। এটাকেই আমি একটু নাইভ বলছি। দোষ-গুণ বিচার করা কিন্তু মুশকিলের ব্যাপার। কারণ এখানে খুব জটিল প্রকৃতির অনেক রকমের স্বার্থ জড়িত ছিল। এই স্বার্থগুলোকে ঠিকমতো বিচার না করলে রাজনৈতিক বিচারে অসুবিধা হবে। জয়ার প্রথম বইয়ে এই জটিলতা অতটা আসেনি। সেইজন্যে আমি খানিকটা সরল মনে করেছিলাম।

কতগুলো জিনিস যদি দেখ, গোটা অবিভক্ত বাংলা যদি পাকিস্তানে ঢুকত তাহলে পাকিস্তানের দুই-তৃতীয়াংশ হত পূর্ব-পাকিস্তান এবং সেই রাষ্ট্রে বাঙালিরা হত দুই-তৃতীয়াংশ। এদিকে পাকিস্তান আন্দোলন তো প্রধানত বাঙালিদের দিক থেকে আসেনি। তার নেতৃত্ব অন্য জায়গায়। এইবারে দেখ, তারা এটাকে কতটা মেনে নিত, এটাও কিন্তু পরিষ্কার নয়। এখনকার গবেষণায় অনেক রকম কাগজপত্র বের হচ্ছে। যেমন ধর সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে জিন্নাহর পত্রালাপ ইত্যাদি।

আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখরা মিলে পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি নামক খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। মূলত তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজ, বর্তমান মৌলানা আজাদ কলেজে তাদের সভা হত। তাঁরা সেসময়, আমি বলছি বোধহয় ১৯৪৩ সালের কথা, পূর্ব পাকিস্তানের একটা ম্যাপ তৈরি করেছিলেন। সেই ম্যাপে কিন্তু পশ্চিমের এই জেলাগুলো বাদ। কারণ হচ্ছে এই জেলাগুলোতে মুসলিম বসতি খুবই সামান্য। হিন্দুপ্রধান জেলা। এবং এত বেশি পরিমাণে হিন্দু একই জায়গায় কনসেনট্রেটেড, এরা পাকিস্তানের অংশ হলে ভবিষ্যতে সমস্যা হবে। ফলে ওরা গোড়া থেকেই বাদ। কাজেই দুদিক থেকেই এরকম ধারণা সেই সময়ে ছিল।

গোটা বাংলা পাকিস্তানে গেলে কলকাতা তার রাজধানী হত। পশ্চিম পাকিস্তানে তখন কলকাতার মতো শহর ছিল না। কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্য তখনও ইংরেজ-ডমিনেটেড। সেখানে ব্যবসায়ী ইংরেজদের পজিশন কী? কলকাতায় যারা ভারতীয় ব্যবসায়ী ছিলেন তাদের অধিকাংশই অবাঙালি। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশ থেকে আসা লোক। তাদের ব্যবসার মূল কেন্দ্র ভারতবর্ষের বাইরে চলে যাক তা তাদের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে এত রকম চাপ ছিল। তার সঙ্গে বাঙালি হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নিশ্চয়ই ভয় ছিল পাকিস্তানে তারা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। সেখানে তারা কতটা শান্তিতে থাকতে পারবে? এ ভয় অবশ্যই ছিল। এবং সেসময় ওই প্রেক্ষিতের কারণেই তখন সোহরাওয়ার্দি-শরৎ বসুর যুক্ত বাংলার আন্দোলন হলেও তা দাঁড়াতে পারেনি। হিন্দু মহাসভার দিক থেকে শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জী, এরাই প্রধানত, আপত্তি তুলেছিল- আজ না হয় বাংলা স্বাধীন হল; কালকে যদি এই বাংলা বলে আমাদের এখানে তো মুসলিম বেশি, আমরা এবার পাকিস্তানে যুক্ত হব, তখন সেখানকার হিন্দুরা কী করবে? তখন ভারতবর্ষ থেকে বাংলা আলাদা হয়ে গেছে। এইসব যুক্তিতে তাঁরা চাপ দিতে শুরু করে। এবং এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল পাঞ্জাবের প্রশ্ন। কারণ পাঞ্জাবে তখন প্রধানত শিখদের নেতৃত্বে পাঞ্জাবকে ভাগ করার দাবি উঠেছিল। তার সঙ্গে জুড়ে গেল, তাহলে বাংলাকেও ভাগ কর। পাঞ্জাবের দাবি না হলে এটা হত কিনা সন্দেহ আছে। দুটো প্রদেশে একই রকম দাবি হওয়ার ফলে এই জিনিসটা আরো বেশি জোরদার হয়। কাজেই জয়ার গবেষণা খুবই ভালো। একদমই অস্বীকার করছি না। কিন্তু ওই দোষ-গুণের বিচারটা আমার কাছে একটু সরলীকরণ মনে হয়েছে।

সাব্বির আজম : এটাকে আপনি বরং রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি আকারে দেখতেছেন?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, এখানে তো রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজির প্রশ্ন উঠছেই। ওই দিকটাতে জয়া সেরকমভাবে গুরুত্ব দেয়নি।

সাব্বির আজম : জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে একটা কমন পাটাতন লাগে। বাংলাদেশে যেমন ভাষা। ভারতের ক্ষেত্রে বুনিয়াদটা কোথায়?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : এটা তো বলা খুব মুশকিল (হাসতে হাসতে)। কারণ এদিক থেকে ভারতবর্ষ একটা রহস্য, কী করে এক থাকছে। চল্লিশের দশক থেকে কত লোকে বলে আসছে এ কখনো এক থাকতে পারবে না। কিন্তু নানা রকমভাবে থেকে গেছে। এখানে স্বভাবতই ভাষা তার ভিত্তি নয়। জবাবটা হয়ত এভাবে দেয়া যেতে পারে। রাষ্ট্রের একটা কাঠামো এখানে আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রের কাঠামো বলতে বোঝাচ্ছি সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস বা আমলাতন্ত্র, সর্বভারতীয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন-কানুন, কোর্ট ইত্যাদি। ব্রিটিশ আমল থেকে মূল কাঠামোটা মোটামুটি একই রয়ে গেছে। এর উপরে রাজনৈতিকভাবে এই কাঠামোর ভিতর সকলে মোটামুটিভাবে মিলিমিশে থাকতে পারে কিনা তার বন্দোবস্ত করতে হয়েছে। এতে একটা বড় ভূমিকা রেখেছে ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামো। ভারতবর্ষের বিভিন্ন সময়ে এর সঙ্কট হয়েছে। আবার এর থেকে অনেক রকম সমাধান বেরিয়েছে। পঞ্চাশের দশকে যেমন তামিল অঞ্চলে রীতিমতো জোরদার আন্দোলন ছিল যে তারা ভারতবর্ষে থাকবে না। কারণ ভারতবর্ষ হিন্দি ভাষার লোকেরা ডমিনেট করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আস্তে আস্তে সেটাও কেটে গেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাবর্ত্য অঞ্চলে এই মনোভাব বিভিন্ন সময়ে খুবই জোরদার হয়েছে। তারা আলাদা হওয়ার চেষ্টা করেছে। পাঞ্জাবে কিছুদিন আগে পর্যন্ত রীতিমত আলাদা হওয়ার আন্দোলন ছিল। কাজেই আন্দোলন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে। কিন্তু ওই সঙ্কট নানা অবস্থায় হওয়া সত্ত্বেও কোনো না কোনো ভাবে এক ধরনের কাজ চালানোর মতো সমাধান তৈরি হয়েছে। এই সমাধানের স্ট্র্যাটেজি দু-রকম। এক, পুলিশ-সেনাবাহিনী দিয়ে বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন দমন করা। দরকার হলে, বছরের পর বছর এই দমননীতি চালিয়ে যাওয়া। বিক্ষোভ যখন স্তিমিত হয়ে আসবে, তখন আপস করা। আর দ্বিতীয়, বিরোধীদের মধ্যে কিছু গোষ্ঠী বা নেতাকে কিনে নেওয়া। দুটোই এখনো চলছে।

আমার ধারণা, এখানে অন্য কতগুলো জিনিস অনেক বেশি কাজ করে, সেগুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক নয়। যেমন ধর সিনেমা। বোম্বেতে ছবি তৈরি হচ্ছে। সারা ভারতবর্ষের লোক এই ছবি দেখছে। দিনের পর দিন। এর থেকে সকলের মধ্যে এক ধরনের আত্মীয়তা তৈরি হয়। অর্থাৎ আমি যে সিনেমা দেখি অন্য অঞ্চলের লোকেরাও সেগুলো দেখে। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাথে এগুলো জড়িয়ে গেছে। খেলার ক্ষেত্রেও একথা খাটে। ক্রিকেট, হকি ইত্যাদিতে জাতীয় দল যখন ভালো করে তখন সবার মধ্যে আত্মীয়তা তৈরি হয়। এগুলো কোনোটাই সরাসরিভাবে রাজনৈতিক বিষয় নয়। কিন্তু এইগুলো এক ধরনের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করে এবং খুব গভীরভাবে কাজ করে। অর্থাৎ আমি তামিলনাড়ুর লোকই হই বা মহারাষ্ট্রের লোকই হই, আমরা এক ভাষায় কথা বলি না হয়ত কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো মোটামুটি এক। কারণ সিনেমার খবর আমি যা জানি সেও জানে, খেলার খবর আমি যা জানি সেও তা জানে। এই দৈনিক জীবনযাপনের মধ্যে যে আত্মীয়তা তৈরি হয় তা অনেক গভীরে কাজ করে।

এর সঙ্গে রাজনৈতিক অন্য দিকগুলো আছে। তুমি প্রশ্ন করেছিলে এর পেছনে ভারতের জাতীয়তাবাদে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হিন্দুত্ববাদ আছে কিনা। নিশ্চয়ই আছে। এবং রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে নিশ্চয়ই সেটা কাজ করে। যদিও কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ছাড়া কেউ তা স্বীকার করে না। কিন্তু এটা কাজ করে। কারণ দেশের নানান কিছু বিচার করার সময় এই প্রশ্নগুলো চলে আসে, কোন ইতিহাসটা ভারতের ইতিহাস? বা ভারতের ইতিহাস বলতে কোন ইতিহাসকে প্রাধান্য দেব? এখানে ধর আদিবাসীদের ইতিহাসকে কেউ প্রাধান্য দেবে না। ওদের ইতিহাস প্রান্তিকই থাকবে। আসল ইতিহাস হচ্ছে, বেদ থেকে শুরু কর বা মহেঞ্জোদারো থেকে শুরু কর ইত্যাদি।

কাজেই সংক্ষেপে যদি বলি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সামগ্রিক ঐক্য ভারতকে এক রাখার ক্ষেত্রে খানিকটা কাজ করেছে। আর দ্বিতীয়ত, এই সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। আমার ধারণা পাকিস্তানে সবচেয়ে গোলমাল হয়েছিল যখন সামরিক শাসন এসে পুরোটা কেন্দ্রীভূত করে নিল। আইয়ুবের সময় থেকেই কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার বীজটা বপন করা হয়ে গিয়েছিল।

সাব্বির আজম : কাশ্মীরের যে করুণ পরিস্থিতি এর সুরাহার কি সম্ভাবনা নাই?
পার্থ চট্টোপাধ্যায় : সমাধান পাওয়া মুশকিল। কারণ কাশ্মীর এমন একটা ক্ষেত্র যেখানে ভারত আসলে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছে। এক ধরনের লো গ্রেড যুদ্ধ যেটা টানা চলবে। কোনো সময় তীব্রতা বাড়ে। কোনো সময় কমে। দল-মত নির্বিশেষে যে দলই সরকারে থাকুক একটা সিকিউরিটি এসট্যাবলিশমেন্ট সেখানে আছে। একটা ফরেন পলিসি এসট্যাবলিশমেন্ট আছে। তাদের কাছে কাশ্মীর হল পাকিস্তানের সাথে লড়াই করার জায়গা। যেখানে কাশ্মীরের মানুষ হয়ে গেছে একেবারে দাবা খেলার বড়ের মতো। তারা যায় যাক। ওতে কিছু এসে যায় না। কাশ্মীরে যাই হোক না কেন তাকে বিচার করা হবে পাকিস্তানের না ভারতের এতে লাভ হচ্ছে তার নিক্তিতে। ফলে কাশ্মীর প্রশ্নের সমাধান করা মুশকিল। দিনে দিনে অবস্থাটা তো খারাপের দিকে যাচ্ছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঝগড়া মিটুক বা না মিটুক, ভারতবর্ষে কাশ্মীরের যে অংশটুকু রয়েছে তার মধ্যে এক ধরনের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি হত যদি এই যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যে কাশ্মীরকে যথেষ্ট স্বাতন্ত্র্য দেয়া হত। কোনো সরকারই এই স্বাতন্ত্র্য দিতে রাজি নয় কারণ তাদের ভয় স্বাতন্ত্র্য দিলেই পাকিস্তানের সুবিধা হবে। এখন সবটাই যদি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের ব্যালেন্সটা কী রকম দাঁড়াচ্ছে, এই দিয়ে বিচার করা হয় আর কাশ্মীরের মানুষ কী চায় বা না চায়–এ বিষয়টা এতই গৌণ হয়, তাহলে এরকমতো হবেই। ফলে আমি কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে মোটেই আশাবাদী নই।

সাব্বির আজম : ‘হোয়াই আই সাপোর্ট দ্য বয়কট অব ইসরায়েলি ইন্সটিটিউশনস’ প্রবন্ধে আপনি কাশ্মীরের প্রসঙ্গ তুলছিলেন।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ। একদিক থেকে তো প্যালেস্টাইন-ইসরায়েলের মতোই অবস্থা হয়ে গিয়েছে। ভারতীয় আর্মি অকুপাই করে রেখেছে। পারমানেন্ট অবস্থা এরকম হলে তার রাজনৈতিক সমাধান হওয়া মুশকিল।

সাব্বির আজম : ‘ইতিহাসের উত্তরাধিকার’ প্রবন্ধটি আপনার অন্যতম সেরা রচনা। আপনি লিখছিলেন–‘হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা আসলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদেরই প্রতিচ্ছবি, আয়নায় মুখ দেখার মতো-রূপ, আকৃতি, গড়ন, অবিকল এক।’ যে বিকল্প ইতিহাসের কথা আপনি এই প্রবন্ধে বলছেন গত দুই যুগে কি এ বিষয়ে কোনো কাজ হইছে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : আমি সাধারণভাবে বলেছিলাম, হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আয়নায় মুখ দেখার মতো। কিন্তু একেক অঞ্চলে এর রূপ একেক রকম। এই জিনিসটা সাম্প্রতিককালের গবেষণায় অনেক বেশি পরিষ্কার হয়েছে। আমি যেমন ওই প্রবন্ধে বাংলার বিভিন্ন ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টা কিভাবে এসেছে সেইটা দেখার চেষ্টা করেছিলাম। এই ধরনের কাজ কিন্তু মারাঠি, তামিল, হিন্দি, পাঞ্জাবি ইত্যাদি নিয়ে হয়েছে এবং সেখানে লক্ষ করবার মতো বিষয় হল, এরা সকলেই ‘ভারত’ বলে একটা কিছু আছে মানে। কিন্তু একেকটা অঞ্চলে এই ‘ভারত’ জিনিসটার কল্পনাটা আলাদা। প্রত্যেকে এক জিনিস ভাবে না। এর মধ্যে অনেক রকম মজার জিনিস আছে। যেমন ধর একটা শব্দ বা ইমেজ এখন খুব চালু আছে–‘ভারত মাতা’। ভারতকে মাতা বলে ভাবা হয়। বঙ্গিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ থেকে শুরু। যদিও মাতা কিন্তু ভারতের না, একেবারেই বাংলার ছিল। সেখানে সপ্ত কোটি সন্তানের কথা বলা হয়েছে। বাঙালির জনসংখ্যা তখন সপ্ত কোটি হতে পারে। ভারতের জনসংখ্যা তখন অনেক বেশি। আর সেটা হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে। বাংলা হচ্ছে মা। সেই থেকে ভারতমাতা হয়েছে। তার অনেক ইতিহাস আছে। মূলত বাংলা থেকে শুরু করে উত্তর-ভারত এই অঞ্চল পর্যন্ত ভারতমাতা ছবিটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।

অন্যদিকে মহারাষ্ট্রে ভারতকে কখনো ‘মাতা’ বলে ভাবা হয়নি। মহারাষ্ট্রে নেশন পুরুষ। ফাদারল্যান্ড। পিতৃভূমি। মাতৃভূমি কথাটা খুবই কম ব্যবহৃত হয়। এখন ‘ফাদার’ হয়ে গেলেই কিন্তু ধারণাটা অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে এবং সেখানে নেশনের ইমেজটা শেষ অব্দি আসে শিবাজি মহারাজ। সে ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার হাতে। মানে ভারত মাতার মতো তার চেহারা নয়। তার চেহারা হচ্ছে যোদ্ধার চেহারা। তামিলে ‘মা’ বলে ঠিকই কিন্তু তামিলে ভাষাটা হচ্ছে ‘মা’। ফলে যা বলছিলাম এখনকার গবেষণায় এই জিনিসগুলো অনেক বেশি উঠে আসছে।

দ্বিতীয় যে জিনিসটা আসছে, আগে যে আলোচনা করছিলাম, হিন্দু জাতীয়তা ও ভারতীয় জাতীয়তা হিসেবে আমার ওই প্রবন্ধে প্রধানত শিক্ষিত শ্রেণির কথা এসেছে। মানে তাদের কল্পনাতে ভারত ব্যাপারটা কিভাবে আসছে। একেবারেই শিক্ষিত শ্রেণির কথা। কারণ এরা বই লেখে, ইতিহাস লেখে, প্রবন্ধ-উপন্যাস লেখে বা হয়ত স্কুলে পড়ায় ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যেও তো ‘দেশ’ বলে একটা ধারণা আছে। সেই ধারণাটা কী? এইসব বিষয় নিয়ে অনেক রকম কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে কিন্তু সবসময় লিখিত ছাপা বই পাওয়া যাবে এমন না। অনেক বেশি কথ্য ভাষায় মুখে মুখে ছড়ানো নানা গল্প-কাহিনি-গান। সেও তো ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাস আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ইতিহাসের মধ্যে পড়বে না। ঐতিহাসিকরা ওরাল হিস্ট্রি বলে খানিকটা মানে। এগুলো লোকেদের কাছ থেকে শুনে শুনে সংগ্রহ করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়ত মুখে ছড়ানো কাহিনিগুলো পরে কেউ না কেউ সংগ্রহ করেছে। বই ছাপিয়েছে। এই ইতিহাস নিয়ে সম্প্রতি অনেক কাজ হচ্ছে।

উত্তর প্রদেশের গাজি মিয়ার কাহিনি নিয়ে আমাদের সাবলটার্ন স্টাডিজের শাহিদ আমিনের সম্প্রতি একটা বই বেরিয়েছে। গাজি মিয়ার একটা বিশাল উরস হয় এই বর্ষার সময়। কথিত আছে, তিনি নাকি গজনির মাহমুদের ভাইপো। ইতিহাসে কিন্তু মাহমুদের কোনো ভাইপো ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। কাজেই ঐতিহাসিকরা পুরো ব্যাপারটাকেই বাজে গালগপ্পো বলে ইতিহাসের বাইরেই রেখে দিয়েছিলেন। কারণ তাদের কাছে মাহমুদের সময়কার ইতিহাস ভালো করেই লেখা আছে। মাহমুদের কোনো ভাইপো এসে যুদ্ধে লড়াই করে জিতেছে, এরকম কোনো প্রমাণ নেই। এই গল্পটা কবে থেকে শুরু বলা মুশকিল। বেহরাইচ-এ ওঁর যে মাজার আছে, স্থানীয় উরস হয়, সেখানে ইবনে বতুতাও এসছিলেন। তাঁর বইতে এর উল্লেখ আছে। আকবর নিজে গিয়েছিলেন। বেহরাইচের এই উরসে যারা যায় তারা প্রধানত হিন্দু। অথচ তিনি কিন্তু মুসলিম গাজি। কী করে হয়? অদ্ভুত গল্প। গল্পটা হচ্ছে–ওইখানকার লোকেরা প্রধানত গোচারণ দ্বারা জীবিকা অর্জন করত। তাদের স্থানীয় রাজা সোহল দেব খুব অত্যাচারী ছিলেন। মাহমুদ যখন ভারতবর্ষ জয় করতে এসছিলেন তখন এই গাজি এসে সোহল দেবকে যুদ্ধে হারান এবং সেই যুদ্ধে গাজি নিজেও মারা যান। কিন্তু গরু রক্ষা পায়। যে কারণে এই অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু এখনো তাঁর মাজারে যায়।

এখন অত্যাশ্চর্য ইতিহাস হল, মুসলমানরা আক্রমণ করল, দেশ দখল করল ইত্যাদি ধারণা প্রচলিত আছে, অথচ সে আবার হিন্দুদের গোরক্ষার জন্য জীবন দিল। এই দুটো গল্প কী করে মেলে? অথচ এইটেই তো মিলেছে। অনেক রকমভাবে তুমি একে ব্যাখ্যা করতে পার। শাহিদের বইতে বিভিন্ন সময়ে গল্পটা কিভাবে এসছে, কত রকম তার রূপ, কত রকমভাবে লোকে গল্পটা বলার চেষ্টা করেছে, ব্যাখ্যা করেছে, তা উঠে এসেছে। তো এরকম ধরনের অনেক কাজ এখন হচ্ছে।

সাব্বির আজম : ‘হিস্ট্রি ইন দ্য ভারনেকুলার’ বইয়ের ভূমিকায় যেরকম লিখছেন, স্থানীয় যে ইতিহাস সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ইফেকটিভ ইতিহাসের জন্ম দেয়। আবার অনেক কিছু আছে যেগুলা অনুমোদনযোগ্য নয়।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : স্থানীয় ইতিহাস স্থানীয় বলেই তার ভেতর কোনো ক্ষমতার প্রক্রিয়া নাই, ছোট-বড় নাই, এরকম তো নয়। স্থানীয়ভাবে একেকটা অঞ্চলে বড় রাজা-রাজড়া না থাকতে পারে কিন্তু স্থানীয় অঞ্চলেও তো অত্যাচারী আছে, শ্রেণি আছে, শ্রেণিবিভাগ আছে। ক্ষমতার বিভাজনও ওখানে রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এই গল্প চালু আছে বলেই একবাক্যে মেনে নিব এমন নয়, আবার একবাক্যে বাতিলও করা যায় না। জয়ার কথা প্রসঙ্গে যেটা বলছিলাম, চট করে ভালো-মন্দ বলা মুশকিল। আমার মতে, অনেক বেশি প্রয়োজন হচ্ছে এই ইতিহাস গল্প-কাহিনিগুলোকে জানা। বহু ক্ষেত্রেই কী হয়, এর জন্য আমরা সবাই অল্প-বিস্তর দোষী, যে একেক ধরনের জেনারেলাইজেশন আমরা করি। করে ধরে নিই এটা সবক্ষেত্রে সার্বিকভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু তা তো নয়। এতে হয় কী, অনেক জিনিস আমরা তলিয়ে দেখি না, কারণ মনে করি কোথাও একটা সত্যে পৌঁছে গেছি। এই তলিয়ে না দেখার ফলে জানার অভাব থেকে যায়। আমরা যদি খোঁজ করতে শুরু করি তাহলে কিন্তু দেখা যাবে যেটাকে আমরা সত্য বলে মেনে নিয়েছি তার নিচে আরো অনেক জিনিস আছে। এইটে জানা অনেক বেশি জরুরি মনে হয়। শুধু সাবলটার্ন স্টাডিজ নয়, অন্য অনেকে নানা গবেষণা করতে গিয়ে এরকম আরো অনেক জিনিস খোঁজ করে বার করেছে যেগুলো সত্যি আমাদের জানা ছিল না। গবেষণার দিক থেকে এটা অনেক বেশি জরুরি। খোঁজ করে যা বের হবে, সেটা সবসময় আমাদের পছন্দ হবে তা নয়।

সাব্বির আজম : সাম্প্রতিক নানা লেখায় আপনি দেখানোর চেষ্টা করছেন, মডার্ন এম্পায়ার আর আধুনিকতা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। তালাল আসাদ ও দীপেশদাও [চক্রবর্তী] বারবার এ বিষয়টার ওপর জোর দিছেন। কিন্তু আমরা যে সাদাসিদা সরলরৈখিক ন্যারেটিভ পাই, অর্থাৎ মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রেক্ষাপটে রেনেসাঁর বরাতে আধুনিকতা ও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং প্রগতি ও শান্তির ফিরিস্তি। এখানে এম্পায়ারের কাহিনি লোপাট হয়ে যায় বা একদম বিচ্ছিন্ন আকারে হাজির করা হয়। এই ন্যারেটিভ এত শক্তিশালী হল কিভাবে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : এটা জটিল প্রশ্ন। কিভাবে এত শক্তিশালী হল? গোড়ার দিকে উনিশ শতকের বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে ইউরোপীয় বা পশ্চিমা শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে আমাদের দেশে বিতর্ক শুরু হল যে এটা আমরা গ্রহণ করব কী করব না। এর সমাধান ছিল প্রধানত এরকম–পশ্চিমা বলেই আমরা সব গ্রহণ করব, এমন নয়। কিছু গ্রহণ করব। কিছু নেব না, এই স্বাধীনতাটা আমাদের আছে। বিচার করে দেখার দরকার কোনটা নিলে ভালো, কোনটা মন্দ। এই বিচারটা গোড়া থেকেই ছিল। বাংলায় কি মহারাষ্ট্রে কি মাদ্রাজ অঞ্চলে প্রথম যে শিক্ষার প্রসার হতে লাগল, এই তিনটা জায়গাতেই ছিল। পরবর্তীতে উত্তর ভারতে যখন গেল তখন বিশেষ করে মুসলিমদের মধ্যে প্রথমদিকে এ বিষয়ে রেজিসটেন্স ছিল। কিন্তু সৈয়দ আহমদ খান বা আলীগড় আন্দোলন মুসলমানদের বোঝাতে চাইল আমরা ইংরেজি শিখব কিন্তু তাতে খ্রিস্টান হয়ে যাব না। ইংরেজ হয়ে যাব না। বিজ্ঞান বা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা আমরা নেব কী নেব না, এ নিয়েও তর্ক ছিল। মোটের ওপর অনেকেই মেনে নিল যে, ইংরেজরা নিয়ে এসেছে বলেই খারাপ তা নয়। এর মধ্যে গ্রহণ করার মতো অনেক জিনিস আছে। এই বিচারটা ছিল।

আমার ধারণা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে যখন রাজনৈতিক আন্দোলনটাই প্রধান হয়ে উঠল, তখন অন্য ধরনের বিচারগুলো পেছনে পড়ে গেল। অর্থাৎ কিভাবে ইংরেজকে তাড়ানো যায় এবং ইংরেজরা যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করে দিয়ে গেছে সেখানে ভারতীয়রা কিভাবে চালাবে, এই প্রশ্নই প্রধান হয়ে উঠল। এবং তার থেকেই এবারে ধর মুসলিমদের জায়গার কী হবে, ইংরেজরা চলে গেলে রাষ্ট্রটি কিভাবে চলবে, কারা ক্ষমতায় আসবে–এগুলোই প্রধান আলোচ্য বিষয় হল।
partho and Sabbir
তার ফলে কলোনিয়াল শাসনের বিষয়ে আমাদের বিচারটা কী হবে, এখানে অপেক্ষাকৃত জটিল যে ধরনের বিচারগুলো ছিল, সেগুলো পরে অনেক সরল হয়ে গেল। মূল বিষয়টা দাঁড়িয়ে গেল, পলাশীর যুদ্ধ থেকে ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। যাক এদ্দিনে তারা গেছে। সেখানে বিজ্ঞানে, শিক্ষায়, ভাষার কিংবা সংস্কৃতির নানারকম দিকে কালোনিয়াল অনুপ্রবেশ কত গভীরে (বা অনেক ক্ষেত্রে গভীরে নয়, তাও হতে পারে)–এই বিচারের তাড়নাটাই কমে গেল। ফলে তুমি যে প্রশ্নটা করলে, ন্যারোটিভটাই ওই রকম হয়ে গেল, একটা মধ্যযুগ ছিল, তারপর আধুনিক যুগ এল। আধুনিক যুগের সমস্যা হল ওখানে ঔপনিবেশিক শাসন। আমরা এখন আধুনিক হয়ে গেছি। আমাদের আর ঔপনিবেশিক শাসনের দরকার নেই। এরকম সরল ইতিহাস দাঁড়াল।

উল্টোদিকে এই প্রশ্নগুলো নতুন করে আসছে শিক্ষায় কলোনিয়াল প্রভাব রয়েছে কী নেই? আমাদের ভাষার মধ্যে কলোনিয়াল প্রভাব আছে কী নেই? প্রভাব কতটা আছে, এখানে সূক্ষ্ম বিচারের অভ্যেসটাই চলে গিয়েছে, তার ফলে অনেক সময় সরল উত্তর আসে। বিদেশি মানেই খারাপ। বাদ দাও। আমাদের নিজেদের দেশে যা আছে সেই ভালো। এ ধরনের উত্তর তো আমরা পাই। সুসংহতভাবে ভাবনা-চিন্তা করে যুক্তিসিদ্ধ ইতিহাস দাঁড় করানোর চেষ্টা অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। কারণ মাঝের একটা অংশ গেছে যেখানে কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিষয়টাই প্রাধান্য পেয়েছে।

সাব্বির আজম : যখন আমরা বলি ৯/১১ কিংবা ৭/৭ তখন কি আমরা আধিপত্যশীল ডিসকোর্সকে মাইনা নেই না? আমরা তো মনে রাখি না কত তারিখে ইরাক কিংবা আফগানিস্তান আক্রমণ করা হল।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, একদমই ঠিক কথা। ইদানিংকালে পশ্চিমে যাকে ‘টেররিজম’ বলা হয় সে কথাটাই সারা পৃথিবীতে চালু হয়ে গেছে। টেররিজমকে অন্যান্য ঘটনা থেকে আলাদা করে একটা বিকৃত কোনো প্রতিহিংসা বা বিকৃত চেতনা আকারে উপস্থাপিত করলে সত্যি সত্যি টেররিজম যারা করে, তারা কী ভেবে করে, তার পেছনে প্ররোচনা কী–এগুলো নিয়ে যে আলোচনা হওয়া উচিত, সেগুলোকে চাপা দেয়া হয়। এটাতো খুবই সত্যি যে, যাকে এখন ইসলামি টেররিজম বলা হচ্ছে এর সঙ্গে ইরাকযুদ্ধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সত্যি যে, যারা এ সমস্ত তথাকথিত সুইসাইড বোম্বিং বা জঙ্গি কাজে যায় তারা বিকৃত মস্তিষ্কের লোক নয়। তাদের অধিকাংশই যথেষ্ট শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান। তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক হোক বা ধর্মীয় হোক, এই ধরনের বিচার-বিবেচনা থেকে ভেবেচিন্তেই এদিকে যাচ্ছে। ভালো করে দেখার দরকার তারা কেন যায়? এই প্রশ্ন কিন্তু আগেও বহুবার উঠেছে। এই ধরনের তথাকথিত সন্ত্রাস তো পৃথিবীতে এই প্রথম হচ্ছে না। ইউরোপে হয়েছে, ইউরোপের বাইরের বহু দেশে হয়েছে। আমাদের এখানেও হয়েছে। এদের অনেকেই শিক্ষিত এবং সচ্ছল পরিবার থেকে আসা। তারা হঠাৎ এদিকে যায় কেন? তার কারণ খুঁজতে গেলে অনেক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হয়। সেগুলোকে স্বীকার করতে হয়।

সাব্বির আজম : বাংলাদেশে প্রগতিশীলদের কম-বেশি ধারণা মাদ্রাসা হল জঙ্গির কারখানা। এখন তো তাদের চোখের সামনে তা ভুল প্রমাণিত হল।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : ঠিকই। এবং সেই জন্যে মুশকিল এখানেই হয় যে, স্বীকার করলে নিজেদের নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠবে। পশ্চিমেও একই জিনিস হচ্ছে। তুমি লন্ডন, প্যারিস কিংবা বেলজিয়ামের ঘটনাই বলো, এরা তো আরব দেশ থেকে হামলা করছে না। এদের জন্ম এই সব দেশেই। ওখানেই তারা বড় হয়েছে। এরা যেকোনো অর্থে ফরাসি, ইংরেজ কিংবা বেলজিয়ান। এই প্রশ্ন সবার আগে করতে হবে, আমাদের পরিবেশে বড় হয়ে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় হয়েও এদের মধ্যে এমন কী ক্ষোভ থাকতে পারে যে তারা আমাদের সিস্টেমকে রিজেক্ট করছে? এই প্রশ্নটাকে ফেস করতে হবে। তুমি বলে দেবে আইএসের প্রপাগান্ডা থেকে হয়েছে। এসব বললে আসল প্রশ্ন ফেস করা হয় না। অন্যদিকে ঠেলে দেয়া হয়। কিন্তু তা তো নয়। যদ্দিন না এর সম্মুখীন হওয়া যাচ্ছে তদ্দিন কিন্তু বিপদটি কাটবে না। এই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে। এটি আমাদের দেশ কিংবা পশ্চিমা দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সাব্বির আজম : কথা লেখার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আপনি দু’রকমের পথ বাতলেছেন–ক. বিতর্কমূলক রচনার প্রচারকে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা। খ. লেখককে লেখার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে অনেক বেশি সজাগ থাকতে হবে। ইন্টারনেটের জমানায় প্রথম তরিকা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : প্রতিষ্ঠানিক নিয়ম বলতে আমি কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ম, আইনের নিয়ম বোঝাচ্ছি না। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম, মানে ধর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে কী বলা হবে, সেটা অধ্যাপকই বল বা ছাত্রই বল, কে কী বলবে তার কিছু নিয়ম আছে। যে কেউ যা খুশি বলতে পারে না। সেই নিয়মটা কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব। এবং সে প্রতিষ্ঠানের নিয়মও সময় অনুযায়ী বদলায়। পঞ্চাশ বছর আগে সেখানে যে ধরনের নিয়ম ছিল আজকে নিশ্চয়ই অনেক কিছু বদলেছে। সংবাদপত্র, প্রকাশনা সব জায়গাতেই এরকম স্বশাসনের নিয়ম থাকে। আমি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনেই চাকরি করতে হবে। তার বাইরে গিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। বললে প্রতিষ্ঠান আমাকে শাসন করার অধিকার রাখে। এটা হল একটা দিক।

দ্বিতীয় দিকটা হল, আমি যা বলি বহু ক্ষেত্রেই তা প্রতিষ্ঠানের গন্ডির বাইরে চলে যায়। ধর, আমি একাডেমিক মহলের লোকদের জন্য একটা প্রবন্ধ লিখলাম। কিন্তু সব সময় তা এর মধ্যে সীমিত থাকে না। তার থেকে দুটো তিনটে বাক্য তুলে নিয়ে খবরের কাগজে বেরিয়ে গেল, ইন্টারনেটে সার্কুলেট হল। তখন আমাকে নানা প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হবে। এজন্যই আমি বলেছিলাম, এখানে লেখকের নিজের একটা সচেতনতা থাকতে হবে। তার এরকম আঁচ করতে পারা উচিত। সাধারণভাবে যেকোনো সামাজিক সিচুয়েশনেও আমরা এরকম করে থাকি। যেমন বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে একরকমভাবে কথা বলি। বাইরের লোক থাকলে অনেক কথা বলি না। এগুলো আমরা নিজেরাই করি। আমরা শিখে নিই, কোন কোন জিনিস করা উচিত আর কোন কোন জিনিস করা উচিত নয়। ঠিক সেরকম আমি যখন ছাপার অক্ষরে কোনো কিছু লিখছি, আমি ধরে নিচ্ছি আমার উদ্দিষ্ট পাঠকের বাইরে অন্য কেউ পড়বে না। অনেক ক্ষেত্রেই তা বাইরে চলে যায়। সেজন্য আমাকে নিজে থেকেই সচেতন হতে হবে। সবাই সবক্ষেত্রে সবসময় পারবে তাও নয়। অনেক সময় হয়ত লোকে ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারবে না। কিন্তু আমি বলতে চাচ্ছি, এটা একটা উপায়। অর্থাৎ এবারে লেখাটা যদি বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, তারপরে সেটার ভুল অর্থ করে কনটেক্সটের বাইরে নেয়া হয়, তখন যদি আমি বলি আমি তো তোমাদের জন্য কথাটা বলিনি, তাতে কোনো লাভ হবে না। আমাকে সেটা ফেস করতে হবে। সেজন্যেই আমি বলেছিলাম, লেখককেও সতর্ক হতে হবে।

সাব্বির আজম : বাক-স্বাধীনতা নিয়ে মূল বাহাসটা হল শিল্পের স্বাধীনতা বনাম ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু গত দুই-তিন দশকে অন্তত বাহাসটা এই ডাইকোটমির গন্ডি ছাড়ায়া খোদ পশ্চিম বনাম ইসলামে পরিণত হইছে। শার্লি হেবদো হামলার পর আমরা শার্লি অথবা শার্লি নই। অর্থাৎ বাক-স্বাধীনতার পক্ষে অথবা বিপক্ষে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : জানি। এই জায়গাটা পুনরায় তৈরি করা খুব কঠিন কাজ। কারণ জিনিসটা এরকম যে, ঠেলতে ঠেলতে এই জায়গায় পৌঁছেছে। ইসলাম মানেই বাক-স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, একথার তো কোনো অর্থ হয় না। ধর, যেকোনো ইসলামি বা মুসলিম প্রধান দেশে ফকিরদের নিয়ে মোল্লাদের নিয়ে কত রকমের ঠাট্টা তামাশা বহুকাল ধরে চলছে। একটা ট্র্যাডিশনের মতো।

একদিকে খানিকটা অজ্ঞানতার জন্য এরকম হয়। পশ্চিমের অধিকাংশ মানুষের ইসলাম সম্পর্কে, মুসলমানদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নেই। তাদের কাছে ইসলাম মানেই কট্টর একটা কিছু। অন্যদিকে, পশ্চিমেও তো বাক-স্বাধীনতার নিজস্ব একটা ইতিহাস আছে। পশ্চিমে কি চিরকাল আজকে যাকে লিবেরাল বাক স্বাধীনতা বলা হয়, তা হাজির ছিল? কত লোককে অমুকের বিরুদ্ধে, ধর্মের বিরুদ্ধে, চার্চের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য গলা কাটা হয়েছে। বেশিদিন আগেও নয়। এখন যে হয় না, তারও কতগুলো গন্ডি আছে। তার ভেতরে হয় না। একটা সামাজিক মতৈক্য তৈরি হয়েছে যে, ধর্ম নিয়ে বা বিশ্বাস নিয়ে সবাই সমালোচনা করতে পারে। অধিকার আছে। আমি তার সাথে এ বিষয়ে তর্ক করতে পারি, বলপ্রয়োগ করতে পারি না। রাষ্ট্রও তার জন্য আইনে শাস্তি দিতে পারে না। চিরকাল খ্রিস্টানদের মধ্যেই ঝগড়া বেশি হত। প্রোটেস্টান্টদের সঙ্গে ক্যাথলিকদের, অমুক চার্চের সঙ্গে তমুক চার্চের। বা ইউরোপীয় ইহুদিদের সঙ্গে ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের। জু-দের শেষ করার জন্য কত কিছু হয়েছে। কিন্তু তারপরে একটা মতৈক্য তৈরি হয়েছে যে, এইসব বিষয় নিয়ে রাষ্ট্রও হস্তক্ষেপ করবে না। মানুষ তার বিশ্বাস বা মত অনুযায়ী সামাজিকভাবেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রাখে। এই কনসেনসাস খ্রিস্টানদের মধ্যকার কনসেনসাস।

সঙ্কট হল এখন অধিকাংশ ইউরোপীয় দেশে, কোথাও পাঁচ, কোথাও দশ, কোথাও পনের শতাংশ খ্রিস্টান নয়, ইউরোপীয় নয়, এমন মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এদের ধর্মবিশ্বাস আলাদা, সাংস্কৃতিক আচার-আচরণ আলাদা। এদের অনেকেই প্রশ্ন করা শুরু করল, তোমার বাক-স্বাধীনতার যে গন্ডি তৈরি করেছ, এর মধ্যে আমরা কোনদিন ছিলাম না। তোমরা একসময় নিজেদের মধ্যে ঠিক করে নিয়েছ। এখন আমরা যে এ দেশে এসে থাকছি, আমরা ফরাসি হয়েছি, জার্মান হয়েছি, আমাদের মতটা তো একবার নেবে। বাক-স্বাধীনতা কতদূর অব্দি আমাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য আর কোথায় গ্রহণযোগ্য নয় বা কোনটাতে আমাদের অপমান হচ্ছে, তোমরা এটা জিজ্ঞেস কর না। আমাদেরও তো একটা মত আছে। মুশকিলটা এখানে হচ্ছে। কারণ পশ্চিমা দেশের শিক্ষিত এলিটদেরও মত হচ্ছে, বাক-স্বাধীনতা নিয়ে ওদের কনসেনসাসটাই হল ওদের ভাষায় ‘ওয়ে অব লাইফ’। বাইরে থেকে কেউ আসলে ওদের ‘ওয়ে অব লাইফ’টাকে মেনে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে নতুন কোনো আলাপ-আলোচনা হবে না।

সাব্বির আজম : পশ্চিমা দেশেও বাক-স্বাধীনতার নানা বিধিনিষেধ আছে। ডেফামেশন বা লাইবেল আছে। যা ইচ্ছা তাই তো ওরাও বলতে পারে না।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। যেমন ইউএসএতে ডেফামেশন লাইবেল প্রমাণ করা ভীষণ কঠিন। কেউ যদি বলে ফ্ল্যাগ পুড়িয়ে দাও, তাও কিছু করতে পারবে না। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে অবশ্য তা নয়। নানারকম আইন আছে, কতটা বলতে পার, কতটা পার না। যেটা বলছিলাম, কতটা বলতে পারবে আর কতটা বলতে পারবে না, এ নিয়ে তাদের মধ্যে কনসেনসাস তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন উঠছে, তারপরে যারা এল তাদেরকে তোমাদের নাগরিক বলেই মেনে নিচ্ছ। নতুন এই নাগরিকদের মতটা আগেই তৈরি হওয়া কনসেনসাসের সাথে না মিলতেই পারে। তারা বলতেই পারে, ধর, আমাদের মুসলিম মেয়েরা স্কুল-কলেজে মাথা ঢেকে যাবে। এটা তোমাদের মত নাও হতে পারে। কিন্তু তুমি পশ্চিমা অন্য অনেক কিছুই করেছ। তুমি টাই পর। টাই পরাটাও তো খ্রিস্টানদের কালচার। ওরা বলে এর সঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মের সম্পর্ক নেই। কিন্তু আদিতে তো ছিল। সেটাকে তোমরা মেনে নিয়েছ। কারণ ওটা তোমাদের কনসেনসাস হয়ে গেছে। ওটা সামাজিক ব্যাপার। যে টাই পরার ইচ্ছে পরবে, যার ইচ্ছা না হয় সে পরবে না। এর সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই। কিন্তু তুমি কেউ হিজাব পরলে বা বোরখা পরলে বলবে এটাতো ধর্ম–এখানেই মুশকিলটা হচ্ছে। তাহলে তোমাকে বাক-স্বাধীনতা নিয়ে নতুন সামাজিক মতৈক্য তৈরির জন্য নতুন আলোচনার জায়গা খুলে দিতে হবে। বিশেষ করে ফ্রান্স বা ইউরোপের অনেক দেশেই এই সমস্যা হচ্ছে।

সাব্বির আজম : ১৯৭১-৭২ সালে আপনি রচেস্টারে পিএইচডি শেষ করেন এবং তখন আপনি ওখানকার শিক্ষকও। রচেস্টার ছেড়ে কলকাতা চলে আসলেন কিসের তাড়নায়?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : আমি টিচার ছিলাম অল্প কিছু দিন। দেশে আসার ভাড়াটা জোগাড়ের জন্য (হাসতে হাসতে)।

সাব্বির আজম : ওখানেও তো থেকে যেতে পারতেন।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : আমি কোনোদিনই থাকার কথা ভাবিনি। যে কারণে যত দ্রুত সম্ভব পিএইচডি শেষ করে চলে এসেছি। গোড়া থেকেই ইচ্ছা ছিল ডিগ্রি নেব, চলে আসব। আলাদা কোনো তাড়না ছিল না।

সাব্বির আজম : অ্যাবসট্র্যাক্ট ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রি লেখার বদলে বাস্তবিক কৃৎকৌশল বিশ্লেষণের প্রতি আপনার পক্ষপাত স্পষ্ট। এর কি কোনো সামাজিক প্রেক্ষিত আছে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : অ্যাবসট্র্যাক্ট হিস্ট্রি তো কিছুদিন করার চেষ্টা করেছি।

সাব্বির আজম : আপনি যেটাকে বাই-প্রোডাক্ট বই [দ্য নেশন অ্যান্ড ইটস ফ্র্যাগমেন্টস (১৯৯৩)] বলছেন।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ। বাই-প্রোডাক্ট, তার কারণ হচ্ছে, আমি ওই সময়ে কৃষক আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। বাংলার প্রত্যেকটি জেলা নিয়ে অনেক বছর ধরে কাজ করেছি। তার থেকে মনে হল কৃষকদের রাজনীতি বুঝতে গেলে একদিকে যেমন নিচের তলার দৈনন্দিন রাজনীতির ক্ষেত্রে কী হচ্ছে তার খোঁজ নেয়াটা জরুরি, ওপর তলার ব্যাপারটা ঝালিয়ে নেয়াও দরকার। জাতীয় আন্দোলনে শুধু কংগ্রেস নয়, আমি যেহেতু বাংলার রাজনীতি নিয়েই বেশি ঘেঁটেছিলাম, বিংশ শতাব্দীতে মুসলিম রাজনীতি, কৃষক প্রজা পার্টি, ফজলুল হক ইত্যাদি তাতে এই প্রশ্নটি আমাদের কাছে খুব বেশি করে এসেছিল যে বৃহত্তর রাজনীতির সঙ্গে কৃষক আন্দোলনের যোগটা কিভাবে হবে? সেটা দুদিক থেকে দেখার জন্য পরে আমি গান্ধি-নেহরুদের লেখাপত্র নিয়ে ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রির কাজ করার চেষ্টা করেছি। করতে গিয়ে এই মতটিই অনেক বেশি দৃঢ় হল যে, ইফেক্টিভ রাজনীতি বুঝতে গেলে পন্ডিত লেখকদের তত্ত্ব বেশি কাজে আসে না। তারা রাজনীতিবিদ হোন বা না হোন, তার সঙ্গে কিন্তু দৈনন্দিন রাজনৈতিক ঘটনা বা ঘটনা-পরম্পরার সম্পর্কটা খুব ক্ষীণ। এমনকি গান্ধি আন্দোলন বুঝতে গিয়েও শেষ অব্দি দেখলাম, গান্ধি নিজে একরকম কথা বলছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেক সময় অন্য রকম করেছে বা বুঝেছে। যেমন ধর, অনেক বর্ণনা পাওয়া যায় ওই সময়ের যে অমুক জায়গায় গান্ধি আসবে। মাসখানেক আগে থেকে উত্তেজনা ছড়াতে শুরু করেছে গান্ধি আসবে। তাঁকে নিয়ে নানা গুজব। গান্ধি লোকটা কে? একেকজনের একেক ধরনের ধারণা। বিশেষ করে যে ধারণা খুব বেশি ছিল, তিনি নিশ্চয়ই সাধুসন্ত ধরনের লোক যার দৈব ক্ষমতা আছে। অসুখ করলে তাবিজ দিয়ে দিলে ভালো হয়ে যাবে। এরকম ধরনের সব ধারণা। সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোড়াই চরিত মানস’ উপন্যাসে গানহি বাবাকে দেখার জন্য সবাই যাচ্ছে। সেখানে একজন দেখল চশমা পরা এক লোক। সে কিছুতেই মানবে না সাধুসন্ত কখনো চশমা পরতে পারে। চশমা পরে সাহেবরা (হাসি)। যাই হোক, তো শাহিদ আমিনের সুন্দর লেখা আছে, ওঁ ওখানকার স্থানীয় খবরের কাগজ থেকে বিভিন্ন গ্রামে কী কী গুজব ছড়াচ্ছে তাই নিয়ে কলাম…

সাব্বির আজম : ‘চৌরি চৌরা’ বইতে আছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, ওই বইটাতে আছে। কী কী গুজব ছড়াচ্ছে। অমুক লোকটা গান্ধিকে খুব গালাগাল দিয়েছিল। রাত্রিবেলা আগুন লেগে তার বাড়িটা পুড়ে গেল। এরকম সব গল্প। গান্ধি নিজে কোনোদিন দাবি করেননি যে তাঁর দৈব ক্ষমতা আছে। কিন্তু তার সঙ্গে সাধারণ মানুষ গান্ধি বলতে কী বুঝত, এর আকাশ-পাতাল তফাত। গান্ধি তো থিওরেটিকাল বই লিখে যাননি। নানা রকম ছোট ছোট লেখা, চিঠি এসব থেকে লোকে সংগ্রহ করে সংকলন করেছে। সেগুলো নিশ্চয়ই দরকারি কাজ। কিন্তু রাজনৈতিক দিক দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে গান্ধির সিগনিফিকেন্সটা কী, এই প্রশ্নটা বিচার করতে গেলে ইন্টেলেকচুয়াল হিস্ট্রি খুব একটা কাজে আসবে না। ওটা সম্পূর্ণ অন্য প্রশ্ন। এর গবেষণা অন্যভাবে করতে হবে।

আমার বরাবরই ঝোঁকটা দৈনন্দিন রাজনীতিতে অর্থাৎ সাধারণ মানুষ কী বুঝছে এবং বিশেষ করে বিংশ শতাব্দী ও তারপরে এখন অব্দি রাজনীতির মূল কেন্দ্রটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ থেকে সরে আস্তে আস্তে অনেকটা সাধারণ মানুষের কাছে গেছে। কারণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার জায়গাটা তাদের জন্য বেড়েছে। আমার কাছে এগুলো বোঝাই অনেক বেশি জরুরি মনে হয়। আমি বলছি না প্রত্যেককেই তাই করতে হবে। সকলে সেটা করবে না। কিন্তু আমার নিজের ঝোঁক এইদিকে।

সাব্বির আজম : এইটা কি ডেমোক্রেসির কারণে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : নিশ্চয়ই, ডেমোক্রেসির কারণে। ডেমোক্রেটিক রাজনীতির কারণে। ঠিকই বলেছ।

সাব্বির আজম : কলকাতায় জন্ম হলেও–আপনি বললেন–রিফিউজির অনুভূতি আপনার মধ্যে প্রবল। সাবলটার্ন স্টাডিজের মধ্যে আপনার, গৌতমদা [ভদ্র], দীপেশদা প্রত্যেকের পরিবার পূর্ববঙ্গ থেকে আসা। আর রণজিৎদা [গুহ] বরিশালেই বড় হইছেন। আপনাদের এই মোহাজেরত্ব আর ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্র হিশেবে নিম্নবর্গরে বাইছা নেয়ার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র আছে?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : এটা কখনো ভেবে দেখিনি। হয়ত থাকতে পারে। থাকলে কিভাবে আছে বলা কঠিন। একটাই হয়ত কারণ হতে পারে, প্রত্যক্ষ নয় যদিও। কারণ প্রত্যক্ষভাবে কখনোই আমাদের মনে হয়েছে বা এই নিয়ে আমরা কখনো আলোচনা করেছি বলেও মনে পড়ে না। সত্যি যে, তুমি যাদের নাম বললে আমাদের সকলেই বা বাড়ির লোক ওদিক থেকে আসা। একটা জিনিস হয়ত হতে পারে, আমরা সেই অর্থে সাংঘাতিক দুঃস্থ বা অভাবি পরিবারে জন্মাইনি। আবার মোহাজেরত্বের কারণেই আমাদের কারোরই কিন্তু পারিবারিক সম্পত্তি ছিল না। আমাদের আগের জেনারেশনে যারা কলকাতায় এসছেন তারা মোটামুটি নিঃস্ব অবস্থাতেই এসেছেন। তারা শিক্ষিত ছিলেন। চাকরি-বাকরি করে উপার্জন করেছেন। তারপর আমার ক্ষেত্রে যেমন, দীপেশ-গৌতমের ক্ষেত্রেও তাই, আমাদের বাবারা চাকরি-বাকরি করে শেষ বয়সে কলকাতার কোথাও একটি দোতলা বাড়ি কিনেছেন। আমরা ছোটবেলায় সব ভাড়া বাড়িতে ছিলাম। আমি এখনো বাবার দোতলা বাড়িতেই থাকি। অন্য কোথাও থাকিনি।

রণজিৎদার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অন্যরকম। কারণ, তুমি যেটা বললে, বরিশালে ওঁদের গ্রামের বাড়ি। ওঁরা কলকাতায় এসছিল কারণ ওঁনার বাবা কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি করতেন। সেই হিসেবে তিনি কলকাতায় ছিলেন। তিনিও কিন্তু চিরকাল ভাড়া বাড়িতে ছিলেন। রণজিৎদার বাবা খুব ইন্টারেস্টিং এইদিক থেকে যে, সাতচল্লিশ সালের দেশভাগের পর ঢাকায় হাইকোর্ট হলে তিনি হাইকোর্টের জজ হয়ে কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে যান। উনি ফজলুল হকের বিশেষ বন্ধু ছিলেন এবং মৃত্যু অব্দি ঢাকাতেই ছিলেন।

সাব্বির আজম : ওনার নাম কী ছিল?

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : নলিনীকান্ত গুহ। রণজিৎদা অবশ্য তদ্দিনে ফুলটাইম কমিউনিস্ট হয়ে গিয়েছেন।

সাব্বির আজম : প্যারিসে চলে যান।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, ’৪৮ সালে বিদেশে চলে যান। উনি আর কখনো বাড়িতে থাকেননি। উনি বারেবারে বলেন আমি তো ছোটবেলা থেকেই নিঃস্ব। মানে খানিকটা শিকড়হীন অবস্থা হয়ত ছিল কোথাও। একটা জিনিস সত্যি, আগের জেনারেশনেও আত্মীয়-স্বজন সকলকেই দেখেছি যে, নতুন করে একটা জায়গায় এসে জীবন শুরু করতে হয়। শূন্য থেকে। তারপর ধীরে ধীরে সেখানে অনেকের অবস্থার উন্নতি হল। অনেকেরই আবার হয়নি। আমার নিজের আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেই আছে। তো এটা হয়ে থাকতে পারে। আমি ঠিক বলতে পারব না। কিন্তু সাধারণভাবে এক ধরনের বামপন্থি রাজনৈতিক ভাবধারা আমাদের অল্প বয়স থেকেই চারদিকে ছিল। আমাদের পুরো জেনারেশনের ক্ষেত্রে এটা সত্য। কলেজ জীবন থেকেই সেই প্রভাবটা আমাদের জেনারেশনে বেশি করে ছিল। এ কারণে জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসকে আমরা মনে করতাম রিঅ্যাকশনারি। আর এক ধরনের বামপন্থা, সেই বামপন্থার মধ্যেও অনেক ঝগড়াঝাটি ছিল। কিন্তু এক ধরনের বামপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের অল্পবয়স থেকেই ছিল, তার মধ্যে থেকেই খানিকটা সাবলটার্ন স্টাডিজের ধারণা। সেসময় নকশালবাড়ি আন্দোলন ইত্যাদি এগুলোর প্রভাব অনেক বেশি প্রত্যক্ষভাবে পড়েছিল।

সাব্বির আজম : আপনাদের লেখালেখিতে, ধরেন, অন্যদের যে লেখা–রণজিৎদা, দীপেশদা বা গৌতমদার লেখার সমালোচনা দেখা যায় না। আপনাদের নিজেদের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক তর্কবিতর্ক হয়। কিন্তু পাবলিকলি কোনো লেখায়…

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : রণজিৎদার লেখার সমালোচনা আমি একাধিক জায়গায় করেছি। তার দু’একটা নিয়ে রণজিৎদা চটেও গিয়েছিলেন (হাসি)। একটা জিনিস জান তো, গোড়ার দিকটায় বিশেষ করে, আমরা এত বেশি আক্রান্ত বোধ করতাম, এত সমালোচনার শিকার হতাম যে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া থাকলেও প্রকাশ্যে করতাম না। আমাদের নিজেদের মধ্যে প্রচুর দ্বিমত ছিল।

সাব্বির আজম : আপনাদের লেখা থেকে সেটা বোঝা যায়।
পার্থ চট্টোপাধ্যায় : শুধু তাই নয়। একেকজন একেক দিকে চলে যাচ্ছে। তুমি যদি ক্রমানুসারে পড় তাহলে দেখবে, গোড়ার দিকে আমরা যে কথা বলি তারপরে একেকজন একেক দিকে চলে যাচ্ছে। এইগুলো হয়েছে। তবে যারা আমাদের সমালোচনা করছে তাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষাটা বেশি প্রয়োজন ছিল।

সাব্বির আজম : আপনাদের সাবলটার্ন সবার মধ্যেই নিজেদের ভুল বা সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেয়ার প্রবণতা আছে; আত্মসমালোচনা আছে। যেমন সাবলটার্ন স্টাডিজের ফ্রেমওয়ার্ক এখনকার পেজেন্ট হিস্টির ক্ষেত্রে কেন খাটবে না তা নিয়ে আপনার বিশাল একটা প্রবন্ধ আছে [‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইকোনমিক ট্রান্সফরমেশন’, লিনিয়েজেস অব পলিটিকাল সোসাইটি (২০১১)]। এই টেনডেন্সিটা অন্যদের মধ্যে কম দেখা যায়।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ, সেটা ঠিকই। সাত-আট বছর আগে আমরা যখন স্থির করলাম সাবলটার্ন সিরিজ আর বার করব না তখন পাবলিশারসহ সবাই বলেছে, একি কান্ড করছ! তোমরা যে বই বের করবে তাই বিক্রি হবে। বন্ধ করবে কেন? আমাদের সকলের একসঙ্গে একটা কমন প্রজেক্ট ছিল। স্বাভাবিকভাবেই একেকজন একেক দিকে চলে গেছে। তখন জোর করে সবাইকে একত্রে এক জায়গায় রাখা মুশকিল। দ্বিতীয়ত, এটা আমি নিজে বলেছি এবং দীপেশও ওঁর লেখায় বলেছে, প্রজেক্টটা নিয়েই নতুন করে ভাবনার দরকার। মানে ১৯৮০-৮১-৮২তে যে রাজনৈতিক অবস্থায়, ইতিহাস চর্চার যে অবস্থায় প্রজেক্ট তৈরি হয়েছিল, ত্রিশ বছর বাদে কত জল গড়িয়ে গেছে। রাজনীতি বদলে গেছে। ইতিহাস চর্চার একটা অংশ হয়ত সাবলটার্ন স্টাডিজের প্রভাবেই অন্যরকম হয়েছে। আমাদের প্রজেক্টের বাইরেও অন্য অনেকে অনেক রকমের কাজ করেছে। কাজেই ঠিক ওই ভাবে তো প্রজেক্টটা থাকেনি। নতুন করে প্রজেক্টটাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো অর্থ হয় না। যদি কোনো নতুন প্রজেক্ট বের হয়, আপনা থেকেই বেরোবে। সেজন্য আমরা বন্ধ করে দিয়েছি এবং বন্ধ করে দেয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু বারে বারে আমাদের এই প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে–‘কেন বন্ধ করেছি?’ তো সেইটা ভাবতে গিয়েই আমরা একেকজনের এই প্রজেক্টের অভিজ্ঞতাটা কী সেটাও আমরা অনেক বেশি ভাবতে বাধ্য হয়েছি। কোথা থেকে শুরু করেছিলাম। কোথায় গিয়ে দাঁড়াল। সে কারণেই, তুমি যেটাকে আত্মসমালোচনা বলছ, এই জিনিসগুলো হয়েছে।

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত সাব্বির আজমের নেয়া পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাতকারে প্রথম কিস্তি:
পার্থ চট্টোপাধ্যায়: বাংলাতে হিন্দু নেতারাই চাইলেন যে, ভারতবর্ষ ভাগ হলে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সারোয়ার — আগস্ট ৫, ২০১৭ @ ১১:০০ অপরাহ্ন

      জানি তিনি উত্তর দিবেন না, তবুও প্রশ্ন করি। পার্থ চট্টোপাধ্যায় এক জায়গায় বলেছেন” তার সঙ্গে বাঙালি হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্তের নিশ্চয়ই ভয় ছিল পাকিস্তানে তারা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। সেখানে তারা কতটা শান্তিতে থাকতে পারবে? এ ভয় অবশ্যই ছিল।” কারা সেই ভীতিকর অবস্থা তৈরি করতো? কারা হিন্দুদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছিল? কারা ছিল সেই অসহিষ্ণু?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com