জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য: ৭৪-এ বঙ্গবন্ধুর আর্শীবাদপুষ্ট কবি মহাদেব সাহা

ইজাজ আহমেদ মিলন | ৫ আগস্ট ২০১৭ ১:৩৯ পূর্বাহ্ন

Mahadev- ‘ আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমার পিতৃশোক ভাগ করে নেবে, নেবে আমার ফুসফুস থেকে দূষিত বাতাস…/ আমি এই ঢাকা শহরের সর্বত্র, প্রেসক্লাবে, রেস্তোরাঁয়, ঘোড়দৌড়ের মাঠে এমন একজন বন্ধু খুঁজে বেড়াই যাকে আমি মৃত্যুর প্রাক্কালে উইল করে যাবো এইসব অবৈধ সম্পত্তি…/’ আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যের অন্যতম কবি মহাদেব সাহা এভাবেই তাঁর কবিতায় একজন খাঁটি বন্ধু খুঁজে বেড়িয়েছেন। জীবনের এই সায়াহ্ণে এসেও কবি পাননি তাঁর আজন্ম বাসনার সেই প্রত্যাশিত বন্ধুর খোঁজ। যে বন্ধু কবির বাবা হারানো শোক ভাগ করে নেবে। ফুসফুস থেকে বের করে নেবে জমে থাকা দূষিত বাতাস। এ প্রসঙ্গে কবিই বলেছেন ‘ মানুষ কখনো মানুষের এতো বন্ধু হয় না। ঈশ্বরই মানুষের একমাত্র আশ্রয়, একমাত্র বন্ধু। তার কাছেই সব কিছু পাওয়া যায়। তিনিই কেবল সুখ দুঃখের সমান অংশীদার। আমার দুঃখে ঈশ্বর যতো ব্যথিত হন- ততো ব্যথিত আমি নিজেও হই না। কিন্তু সবই আমার কৃতকর্মের ফল। ঈশ্বর আমার জন্য কাঁদেন। এমন কোন বন্ধু হয় না যে আমার জন্য কাঁদবে। মানুষ নিজের জন্যই কাঁদে।’
বঙ্গবন্ধুর আর্শীবাদপুষ্ট এই কবি এখন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের মাটি ছেড়ে পুত্র তীর্থ সাহার আশ্রয়ে কানাডা রয়েছেন। সেখানে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। বয়সের ভারে অনেকটা ক্লান্ত দেড় শতাধিক গ্রন্থের স্রষ্টা কবি মহাদেব সাহার কিডনী ও মূত্রনালিতে বাসা বেধেছে একটি জটিল সংক্রমণ। ‘নির্মোহ’ এই বিশেষণটির যদি যথার্থ ব্যবহার করি তাহলে নিমগ্ন চৈতন্যের কবি মহাদেব সাহার নামের আগে ব্যবহার করা মানায়। তিনি পুরোটা জীবন তাঁর নীতি থেকে এক বিন্দুও সরে দাঁড়াননি। কবি মহাদেব সাহা কবিতাকেই চির আরাধ্য ভেবেছেন, জেনেছেন। এই কবিতার জন্যই তিনি তাঁর পুরোটা জীবন বিনিয়োগ করেছেন। কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে প্রেম ,দ্রোহ, শান্তি , আশা আর মানবতার জয় গান গেয়েছেন তিনি। মহাদেব সাহা ফুল,বৃক্ষ আকাশ,মেঘ, নদী, ঢেউ, ভালোবাসা, দুঃখ কষ্ট আর যাতনাকে সাবলীল ভাষায় পরম দরদ দিয়ে বিনির্মাণ করেছেন একেকটি কবিতা ।
সেই কবি আজ চিকিৎসার অভাবে অসুস্থতায় দুঃখ ভারাক্রান্ত। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। অবাক করার মতো ঘটনা হলো সফর সঙ্গীদের সকলেই বরাদ্দকৃত বিজনেস ক্লাসের যাত্রী হয়ে নিউইয়র্ক গিয়েছিলেন। ব্যতিক্রম হলেন কবি মহাদেব সাহা। (তাঁর সঙ্গে ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ ও মুহাম্মদ সামাদ, তারাও বিজনেস ক্লাস বর্জন করেছিলেন)। তিনি বিমানে বিজনেস ক্লাসে না গিয়ে সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে সেই সফর করেন। এতে সরকারের প্রায় ৫লাখ টাকা বেঁচে গিয়েছিল। সরকারী কোষাগারে জমা হয় কবির বাঁচানো সে টাকা। শুধু তাই নয় ১৯৮৩ সালে দেশের সবোর্চ্চ বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি। পুরস্কারের সমুদয় টাকা মেহনতি মানুষের জন্য খরচ করতে কবি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রদান করেন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের সময় সাংবাদিকদের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কবি মহাদেব সাহাও সে জমি পেয়েছিলেন কিন্তু গ্রহণ করেননি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আ’লীগ ২০০৯ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর কবি মহাদেব সাহাকে উচ্চপদস্থ সরকারী চাকরি প্রদান করলেও তা তিনি সবিনয় প্রত্যাখ্যান করেন। কানাডায় অবস্থানরত কবি টেলিফোনে জানালেন- কেউ তার খোঁজও নেয় না। তিনি বললেন ‘ আমি উপায়হীন অবস্থায় চলে এসেছি। কোন সুখের সন্ধানে এখানে আসিনি। নিরুপায় হয়ে কেবল বেঁচে থাকার জন্য। আমার কিছু নেই। ‘ নেই ’ শব্দটা বলতে খুব কষ্ট হয়। কে বলছে ? আমার কিছু নেই। আমার তো সবই আছে। এই আকাশ আমার, নদী আমার , শিশির কণা আমার পাখির গান আমার । তবুও আমার নেই বলতে হচ্ছে। আমি কার সঙ্গে অভিমান করবো ? আমি অভিমান করলে আমার প্রকৃতির সাথে অভিমান করবো। কিন্তু এগুলো তো এখানে নিয়েই এসেছি। বাংলার মাটি আমি কপালে নিয়ে এসেছি, হৃদয়ে নিয়ে এসেছি। বাংলাদেশ আমি ছেড়ে আসিনি। দূরে এসেছি মাত্র। নিরুপায় হয়ে আসতে হয়েছে। আমি সারা জীবন কাজ করেছি। অথচ এই জীবনে এসে আমার মাথা গোঁজার একটু জায়গা নেই। এই বয়সে এসে এতোটা অসহায় আমি হবো ভাবিনি কখনো। মিলন -আমি সারা জীবন কবিগিরি করেছি। কবিত্ব নয় শুধু। সার্বক্ষণিক কবি হওয়ার জন্য জীবনকে তছনছ করে দিয়েছি।’

বঙ্গবন্ধু একবার মহাদেব সাহার কন্ঠে স্বরচিত কবিতা শুনে মুগ্ধ হয়ে পরম মমতায় তার কপালে চুম্বন করেছিলেন। তখন কবির বয়স মাত্র এগারো বার বছর। সিরাজগঞ্জের এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্যে ভূয়সী প্রশসংসা করেছিলেন। প্রত্যাশা করেছিলেন কিশোর মহাদেব একদিন অনেক বড় কবি হবে। তারপর প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে। বিধাতা নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর সে আর্শীবাদ অপূর্ণ রাখেননি। মহাদেব সাহা কবি হয়েছেন। এবং বড় কবি। শুধু বড় কবিই নন, দেশ বরেণ্য কবি। অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর এই এতো বড় কবি হয়ে ওঠার পেছনে হয়তো বঙ্গবন্ধুর সেই আশির্বাদ হয়তো কাজ করেছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে ঘাতকদের হাতে নিহত হওয়া যে দুজন কবি সর্বপ্রথম কবিতার মাধ্যমে জঘন্যতম এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের মধ্যে মহাদেব সাহা একজন।
প্রেম ও বিরহের এই কবির আজ ( ৫ আগস্ট) ৭৪ জন্মদিন। ১৯৪৪ সালের এই দিন সিরাজগঞ্জের ধানঘরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। মহাদেব সহার মতো এতো চিত্রকল্প অন্য কোন কবির কবিতায় খুব কমই পাওয়া যায়। কাব্য বির্নিমানে তাঁর যে দরদ আর মমতা সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন পড়ি ‘ বন্ধুর জন্য বিজ্ঞাপন’,‘আবুল হাসানের জন্য এলিজি’ ‘ মানব তোমার কাছে যেতে চাই’, ‘দেশপ্রেম, ’ফিরে আসা গ্রাম’ কিংবা ‘ চিঠি দিও’, বা আজীবন একই চিঠি’, ইত্যাদি কবিতা। কবি মহাদেব সাহার কবিতায় নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট আছে। তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি পঙক্তিই যেন দেশের জন্য, মানব জাতির জন্য। সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি মহাদেব সাহা সকল ধর্ম বর্ণের মানুষকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর কাব্য প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর ‘ এই গৃহ এই সন্যাস’ ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর বেশ আলোড়ন তুলেছিল। সফলতার শৈলচূড়া স্পর্শ করেছেন বহু আগেই। এই কবির কবিতা পড়ে নিরাশা দূরে ঠেলে দিয়ে পাঠক আশায় বুক বেধেছেন। কবি মহাদেব সাহার ৭৪ তম জন্মদিনে প্রার্থনা করি সুস্থ্য হয়ে আবার ফিরে আসুন কবিতার টেবিলে। আমাদের প্রয়োজনেই আপনার ফিরে আসতে হবে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Onu — আগস্ট ৮, ২০১৭ @ ৩:৩২ অপরাহ্ন

      কবির দীর্ঘায়ু কামনা করি।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com