মার্কেস-অনুবাদক আনিসুজ্জামান: মৌলিক আসলে কিছুই নাই, সবই অনুবাদ

অলাত এহ্সান | ২ আগস্ট ২০১৭ ৭:২৯ অপরাহ্ন

anis.gif
বহুভাষি অনুবাদক আনিসুজ্জামানের উজ্জ্বলতম কাজ নোবেল জয়ী কলাম্বিয়ান সাহিত্যিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জগৎখ্যাত Cien años de soledad নামক উপন্যাসটি স্প্যানিশ থেকে প্রথমবারের মতো বাংলায় অনুবাদ। ২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশের আগে উপন্যাসটি বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমে দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের বছরই উদযাপিত হচ্ছে স্প্যানিশে মূল বইটি প্রকাশের ৫০ বছর পূর্তি। বইটির গুরুত্ব, অনুবাদের বিশেষত্ব ও সংকটসহ সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন এই সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহ্সান। –বি.স

অলাত এহ্সান : প্রতিটি লেখার ভেতরই লেখকের জীবনের একটা ছাপ-ছায়া থাকে; অনুবাদের ক্ষেত্রে কি অনুবাদকের জীবনের সেই প্রভাব থাকে?
আনিসুজ্জামান : বাদকের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা খুব একটা নেই। অনুবাদের মাধ্যমে পাঠককে মূল বইয়ের স্বাদের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই অনুবাদকের মূল লক্ষ্য। সেখানে অনুবাদকের ব্যক্তিত্বের ছাপ বা ব্যক্তিগত অভিরুচির অনুপ্রবেশ অনুচিত বলে মনে করি আমি।
অলাত এহ্সান : গল্পের সন্ধান পাওয়ার মতো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের Cien años de soledad’, (আপনার অনুবাদে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’) উপন্যাসটাও কি আপনার কাছে অনুসন্ধান পাওয়ার মতো কিছু? মানে, একজন লেখক যেমন গল্পের অনুসন্ধান বা প্লট খুঁজে পান, অনুবাদের ক্ষেত্রে আপনিও কি তেমন কিছু অনুভব করেছেন?
আনিসুজ্জামান : আমি একবার বাংলাদেশে আসি, সম্ভবত ২০১০ সালে বা আরো পরে। সে সময় হাবীব (অনুবাদক ও অধ্যাপক জিএইচ হাবিব) ভাইয়ের বইটা প্রথম প্রকাশিত হয়েছে।
অলাত এহ্সান : সম্ভবত ২০১১ সালে।
আনিসুজ্জামান : ২০১১ সালে বইটা আমি কিনি প্লেনে পড়ার জন্য। অনেকগুলো বই কিনেছিলাম তখন। ওর মধ্যে হাবীবের বইটাও ছিল। প্লেনে বসে তার অনুবাদটির দু তিনটা পরিচ্ছেদ আমি পড়েছিলাম। পড়ার পর হঠাৎ করে মনে হলো বইটা যদি আমি এখনই পড়ে ফেলি তাহলে মূল ভাষা থেকে পড়ার ইচ্ছাটা চলে যাবে। ওটা আমি ওখানেই স্টপ করে দেই। যাই হোক, উনি আসলে আমাকে এই বইটার সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন–এজন্য আমি তার কাছে কুতজ্ঞ। মজার ব্যাপার হলো বইটা আমি মূল ভাষা থেকে অনুবাদের আগেও সম্পূর্ণটা পড়িনি। আমি পড়তে পড়তে অনুবাদ করেছি। তারও কারণ আছে। আমার ভয় হচ্ছিল আগেই পুরোটা পড়ে ফেললে আমি অনুবাদ করার প্যাশন হারিয়ে ফেলবো। আমার মতে, আমি যদি একবার-দুইবার বইটা পড়তাম, তারপর যদি অনুবাদ করতাম তাহলে হতো কি, খুব সম্ভবত আমি অজান্তেই আমার নিজস্ব বিশ্বাস ও সংস্কারগুলো ঢুকিয়ে দিতাম। আমি তা করিনি। আমি পড়তে পড়তে অনুবাদ করেছি। একেকটা অংশ অনুবাদ করেছি, তারপর দ্বিতীয় বার সেই অংশটা আবার পড়েছি, অনুবাদ ঠিক হয়েছে কিনা দেখার জন্য–এভাবেই করেছি।
অলাত এহ্সান : একটা উপন্যাস একটা সামগ্রিক ইমেজ, একটা তাপ-উত্তাপ নিয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে পুরো উপন্যাস যদি না পড়ে অনুবাদ করা হয়, সেক্ষেত্রে উপন্যাসের সেই মসৃণ ভাবটা যে-অনুভূতি নিয়ে উপন্যাসটা লেখা হয়, যে-অনুভুতিকে ধারণ করে থাকে উপন্যাস–সেটায় ছেদ পড়ে যেতে পারে কিনা?
আনিসুজ্জামান : আমার মনে হয় না। কারণ আমার লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদেরকে মূল স্বাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আমি প্রথম পাঠের আনকোরা অনুভূতির যে শিহরণটা অনুভব করেছি সেটাকেই বাংলায় তুলে ধরতে চেয়েছি। সুতরাং আপনি যে-মসৃণতার কথা বলছেন তাতে করে সেটা অক্ষুন্ন থাকে বলে আমার মনে হয়।
অলাত এহ্সান : বইটা তো পাঠকদের কাছে পরিচিতই ছিল। কিন্তু বইয়ের একটা বিশেষ অনুভূতির কথা আপনি বলছিলেন।
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, ওই অনুভূতিটাই, আমি যদি বইটা সম্পূর্ণ পড়ে ফেলতাম তাহলে হয়তো অন্য রকম রং চড়িয়ে দিতাম ওটার উপর। এই কারণেই আমি পাঠের সৃষ্টিশীল কোন অনুভূতি ছাড়া বইটা অনুবাদের চেষ্টা করেছি, পরে আরেকবার পড়েছি বইটা।
অলাত এহ্সান : এই যে উপন্যাসের ভেতরে অনুবাদকের যে নিজস্ব অনুভূতি বা পাঠের অনুভূতি ঢুকে যেতে পারে, অনুবাদকের ক্ষেত্রে ব্যপারটা কি রকম আমাকে একটু বলেন।
আনিসুজ্জামান : লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন একশ বছরের নিঃসঙ্গতার মধ্যে পশ্চিমী উচ্চাঙ্গ সংগীতের একটা কাঠামো লুকানো আছে, বিশেষ করে এর বর্ণনাভঙ্গির মধ্যে। বাক্য গঠনে দেখবেন আপনি, এমন বাক্যও আছে যেগুলো অর্ধেক পাতা বা এক পাতা জুড়ে বাক্যটা। ওটা শেষ হয়ে গেল, তারপর মাত্র দুটো বা তিনটে শব্দ দিয়ে পরের লাইন। একেবারে মোজার্টের সুরের মতো। এতে আমি যদি খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে যেতাম তখন হয়তো আমি ওই বাক্যগুলোর ভেতরে আমার ঐ উচ্ছ্বাসটা ঢুকে যেত। তারপর মনে করুন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মৃত্যু–সমগ্র বইটার প্রধান একটা খুঁটি সে, যে কিনা মাকোন্দ পত্তন করেছেন। তার আগে মেলকিয়াদিসের মৃত্যুটা আপনি দেখুন, ওর মৃত্যুর কত বড় বিশাল বর্ণনা–দুইপাতা জুড়ে তার বর্ণনা, আর হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মৃত্যু সেখানে কিভাবে করেছে–দুই লাইনে করেছে। ওই যে ছেলেটা, ভৃত্যটা চলে গেছিল সে ফিরে আসে। ফিরে আসার পর জিজ্ঞেস করা হয়–কিরে তুই ফিরে এসেছিস। কেউ জানতো না হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ও বলল যে, রাজার মৃত্যু হয়েছে। তখন সবাই যায়, ধরে ঠেলাঠেলি করে দেখে যে সত্যি সে মারা গেছে। এরপরে সব কিছু হলুদ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলে ভরে যায় এবং ওদের কোদাল দিয়ে, বেলচা দিয়ে পরের দিন ওগুলোকে সাফ করতে যায় যেগুলো নাকি আসলেই দুঃখের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষুদ্রভাবে এই অনুভূতিটা ব্যক্ত করেছেন। যদিও ওই এক লাইন দুই লাইন দিয়েই আমি লিখেছি, লেখার চেষ্টা করেছি তবু এতে আমি এতই অভিভূত হয়ে পরেছিলাম যে আমার পক্ষে খুব কষ্ট হয়েছে লোভ সংবরণ করা। নিজেকে সংবরণ করেছি এবং মার্কেস যেভাবে লিখেছেন, যেভাবে করেছে ওইভাবে রাখার চেষ্টা করেছি।
অলাত এহ্সান : এটা একটা দারুন বিষয়, যে একজন অনুবাদকও অনুবাদের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারেন বা উপন্যাসটা শক্তিশালী হয়, তাহলে তাকে টেনে নিয়ে যায়। এই জায়গাটা আপনি সংবরণ করছেন, এটা দরকার?
আনিসুজ্জামান : আমার মনে হয়, কোনো সফল অনুবাদকই কোনো বইকে ভালো না বেসে অনুবাদ করতে পারবেন না সঠিকভাবে। একটা ভালোবাসা থেকেই যায়, একটা ভালোবাসা এসেই যায়। যে বই আপনার ভালো লাগবে না ওই বই আপনি অনুবাদ করতে পারবেনই না। আপনি যে ওই ঢুকে পড়ার কথা বলবেন, অবশ্যই ঢুকে পড়বেন আর এই ধরণের বড় মাপের লেখা হলে তো কথাই নেই। এর পরে এই বইটা হয়তো আমি আমার জীবনে ১০ থেকে ২০ বার পড়বো। আমাকে পড়তেই হবে। এবং যতবার পড়ি আমি ততবার এটাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি। যেমন প্রথমবার যখন পড়ি তখন আমি হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আর মেলকিয়াদিসকে জাস্ট দুটো চরিত্র হিসেবে পড়েছি।
অলাত এহ্সান : প্রথম দিকে তাই মনে হচ্ছিল, মানে উনি চরিত্র নির্মাণ করছেন।
আনিসুজ্জামান : কিন্তু এখন ঐ দুটোকে আমি চরিত্র হিসেবে পাচ্ছি না। রূপক হিসেবে পাচ্ছি। লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপ–এ দুয়ের যে বন্ধুত্ব এবং সংঘর্ষ, আমি সেভাবে দেখছি দুটোকে এখন। সুতরাং এই জিনিসগুলো যতবার পড়বো ততবার আমার কাছে পরিষ্কার হবে, কারণ এই বই বুঝতে হলে একবার দুইবার পড়ে বুঝতে পারা যাবে না।
অলাত এহ্সান : আমার কাছে মনে হচ্ছে, আপনি উপন্যাস পাঠের আনন্দ আর এর সাথে পাঠের অনুসন্ধানের বিষয়টির কথা বলছেন। (অবশ্যই–আনিসুজ্জামান)। আমি যদি লাতিন আমেরিকা সম্পর্কে জেনে, তাঁর (মার্কেস) এলাকার ভাষা তথা স্প্যানিশ জেনে, তারপর উপন্যাসে যে স্থানগুলো আছে তাকে জেনে উপন্যাসটা পাঠ করি তখন এর পাঠের জায়গাটা অন্য রকম হবে। যেমন, আমরা যাকে গল্পে চরিত্র হিসেবে দেখি, আপনি ও-গুলোর রূপক খুঁজে পাচ্ছেন। তো বোঝা যাচ্ছে, এতে ইতিহাস-সংস্কৃতির রূপক তৈরি করে এখানে দেয়া হয়েছে, তাই না?
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, আরো ব্যাপার আছে। মনে করুন আমি যদি ওখানে না থাকতাম, ওদের সৃষ্টির সাথে, ওদের ধর্মের সাথে, ওদের ভাষার সাথে একেবারে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে না যেতাম, তাহলে অনেক কিছু বুঝতে পারতাম না। সামান্য উদাহরণ, আমি নাম বলবো না, অনুবাদে অনেকেই লিখছেন একটা জায়গায় যে হাজারো সুচ নিয়ে ঘরে ঢুকে (চরিত্রটার নাম ভুলে গেছি) বিয়ের কাপড় সেলাই করছে। একটা বিয়ের পোষাক সেলাই করতে তো এক হাজার সুচ দিয়ে সেলাই করতে হয় না, সুচের ফোঁড় দিতে হয় হয়তো। কিন্তু ব্যপারটা তা না। ব্যাপারটা হচ্ছে ওই অঞ্চলটা এমন একটা জায়গা হঠাৎ করে বৃষ্টি এসে পড়ে, বৃষ্টিগুলো এমন হয়–হঠাৎ আসে এবং হঠাৎ চলে যায়। এবং ওর ফোঁটাগুলো গায়ে একেবারে সুঁইয়ের বর্শার মতো বিঁধে যায়। যখন পড়ে তখন ফেনার মত দেখা যায় গায়ে। যার ফলে গাব্রিয়েল মার্কেস লিখেছে, হাজারো সুঁইয়ের ফেনা নিয়ে ঘরে ঢুকে তারপর বিয়ের পোষাক সেলাই করে। আর সেখানে, যেহেতু অন্যান্য অনুবাদকের ব্যাপারটা জানা ছিল না, তাই তারা মনে করছিলেন সে (মার্কেস বোধহয় হাজারো সুচের ফোঁড় দিয়েছে।
অলাত এহ্সান : তারা নিজেদের বোধ ও বোঝার মতো সহজ করে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করেছে। তাতে ভুল হয়ে গেছে।
কারণ তাদের ওই অস্ত্রটা নেই যে অস্ত্রটা আমার আছে, আমি জানি কি হয়েছে, কেন হয়েছে।
আনিসুজ্জামান : কারণ সেখানে আমি বাস করি, ওই ভাষার সাথে, ওই কালচারের সাথে আমি খুবই ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অলাত এহ্সান : প্রতিটা দেশের ভূগোল-পরিবেশ অনুযায়ি শব্দ ব্যবহার হয়। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, স্প্যানিশ অঞ্চলে কিছু কিছু যন্ত্র আছে যেমন কৃষি যন্ত্রগুলো বা ঘর শয্যার জিনিসগুলো– এটা হতে পারে যে, কলম্বিয়ার ওই অঞ্চলে আছে কিন্তু আরেক অঞ্চলে নাই। তখন এটা একেবারে আঞ্চলিক শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। অনুবাদ করতে গেলে ওই আঞ্চলিক শব্দটাকে আমার দেশের আঞ্চলিক শব্দ দ্বারা, আমার দেখা জিনিস দ্বারা উপস্থাপন করা, তাই না? যে কারণে আপনাকে অনেক ফুট নোট ও ব্র্যাকেট ব্যবহার করে শব্দের ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।
আনিসুজ্জামান : তা তো অবশ্যই। অনেক স্প্যানিশ ভাষাভাষি লোকও এটা বুঝতে পারেন না সঠিকভাবে। কারণ কি, গাব্রিয়েল শুধু আঞ্চলিক ভাষাই ব্যবহার করেন নি, অনেক শব্দ নিয়েছেন যেগুলো নাকি তাদের আদিবাসি ভাষা থেকে ঢুকে পড়েছে এবং শেষে যা করেছেন উনি, নিজে কিছু শব্দ আবিষ্কার করেছেন।
অলাত এহ্সান : তার মানে, লেখক যে ভাষা, যে শব্দ তৈরি করেন সেই শব্দটা তৈরি করে ব্যবহার করেছেন।
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, শব্দও তৈরি করেছেন, এবং একটা শব্দের কোন মানেই আমি খুঁজে পায়নি। শব্দটাকে আমি ওইভাবে রেখে দিয়েছি এবং ব্র্যাকেটে লিখে দিয়েছি–গাবরিয়েল গার্সিয়া কর্তৃক আবিষ্কৃত। এছাড়া আমার উপায় ছিল না। আর আমার অনুবাদের জন্য আর একজন মহিলা খুব সাহায্য করেছেন। উনি ওই আরাকাতাকার এবং ওই বইটার উপর থিসিস করেছেন। অনেকেই থিসিস করেছেন। যেহেতু উনি ওই এলাকাবাসী, সেহেতু যখনই আমার কোনো খটকা লেগেছে উনার শরণাপন্ন হয়েছি; এবং উনি এত সুন্দরভাবে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তখন মনে করেছি–তাই তো, এটা আর কেউ তো এভাবে বুঝবেন না, একমাত্র ওখানে যারা আছেন তারাই বুঝতে পারবেন। এরকম অনেক জায়গা আছে ওগুলো আমার অনুবাদটাতে ফুটে উঠেছে।
অলাত এহ্সান : আমি যেটা দেখছিলাম যে সেই আঞ্চলিক ভাষাকে এ অঞ্চলের ভাষা করে তোলাটা বেশ কঠিন ছিল।
আনিসুজ্জামান : যেমন আমি যদি জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে স্প্যানিশে অনুবাদ করতে চাই, খুবই খুবই কষ্ট হবে, আমি স্প্যানিশে যত ভালোই হই না কেন।
অলাত এহ্সান : কারণ এর ভেতরে একটা অনুভূতির সঞ্চার করে দেয়া।
আনিসুজ্জামান : আমাদের দেশে বট (গাছ) বললে মানুষের যে অনুভূতিটা হয়, ওটা স্প্যানিশে বড় বৃক্ষ, মহিরূহ– যাই-ই লিখি না কেন, ওদের মনে ওই ভাবটা আসবে না। ওদের ওখানে বট গাছ নেই।
অলাত এহ্সান : সুতরাং আপনাকে ওই দেশের স্থানীয় কোন কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলতে হবে।
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, বটের বদলে আমাকে হয়তো কৃষ্ণচূড়ার (কৃষ্ণচূড়া আছে ওখানে) মতো কিছু দিয়ে বোঝাতে হবে।
অলাত এহ্সান : বট আর কৃষ্ণচূড়া তো বিস্তর ফারাক।
আনিসুজ্জামান : বিস্তর ফারাক কি, একেবারে আকাশ-পাতাল! কিন্তু আমাকে কিছু একটা দিয়ে বোঝাতে হবে, ওই ভাবটা তাদের ভেতরে দিতে হবে এবং ওই রকম বড় গাছ তাদের ওখানে ওক গাছ হয়তো আছে, ওক গাছ হয়তো নিতে হবে। আবার খুঁজতে হবে কোন গাছটা এত বড়, বেশির ভাগ নদীর পাড়ে হয়, অনেক কিছুকে ছায়া দেয়। বটবৃক্ষগুলো থাকে, ওখানে সন্যাসীরা বসে। বট বললে কতকিছু মাথায় আসে আমাদের।
অলাত এহ্সান : বটের সাথে কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির অনেক কিছুর যোগ আছে। সুতরাং একটা বৃক্ষ সংস্কৃতির পুরো একটা প্রতীক হিসেবে উপস্থিত হয়।
আনিসুজ্জামান : বট গাছ সেভাবে হয়তো খুঁজে পাবো না, তাহলে আর কিভাবে করা।
অলাত এহ্সান : ফলে, উপন্যাসে যখন ওরকম কিছু গাছের নাম খুঁজে পেলেন যেগুলো আমাদের দেশে নাই বা ওটার ধারের কাছেও নাই হয়, তখন এটাকে আপনার ব্র্যাকেটে দিয়ে দিতে হল।
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, এর জন্য শব্দ রেখেছি এবং ব্র্যাকেটে বলে দিয়েছি কি জাতীয় গাছ। যেমন পাইকা।
অলাত এহ্সান : একটা ঘাসের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ঘাস ধরনের গাছ।
আনিসুজ্জামান : কিছু করার নেই আমার। ওভাইে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে যাতে পাঠক অন্তত বুঝতে পারেন।
অলাত এহ্সান : এখানে আরেকটা বিষয়ে বলার দরকার, বাক্য গঠন। এজন্য একটা উদাহরণ টানতে হবে, ঔপন্যাসিক হোসে সারামাগো’র উপন্যাস ‘ব্লাইন্ডনেস’। ‘ব্লাইন্ডনেস’ বইটায় সারামাগো বিশেষ ধরণের ভাষাভঙ্গি ব্যবহার করেছেন। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে, আমরা বক্তব্য দেয়ার সময় থামি না, সুতরাং লেখার মধ্যে এত দাঁড়ি-কমা আরোপ করার দরকার নাই। সে কারণে তিনি দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য এবং দাড়ি-কমা বাদেই লিখে যেতেন। আমাদের দেশে ‘ব্লাইন্ডনেস’ বইটার দুজন অনুবাদক আছেন, একজন হচ্ছে শওকত হোসেন ও আরেকজন কবীর চৌধুরী। তাতে করে দেখা গেল যে, শওকত হোসেন পুরো উপন্যাসটা পড়ে আয়ত্বে এনে তারপর ছোট ছোট বাক্য বা মোটামুটি বড় বাক্যে রূপান্তর করলেন। কিন্তু কবীর চৌধুরী পুরাপুরি মূলানুগ হতে গিয়ে করলেন কি, দাড়ি-কমা ছেড়ে দিলেন। তাতে করে অনুবাদটা একজন পাঠকের কাছে ভয়ঙ্কর পরিমাণে কষ্টকর হয়ে উঠল। আমি দুটো বই-ই পড়লাম। কিন্তু প্রথমে কবীর চৌধুরীরটা পড়তে গিয়ে এত বেশি মনোযোগ দিতে হয় যে তাতে পাঠের আনন্দটা মরে যায়। মার্কেস যখন মোজার্টের সুরের মতো দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য আবার ছোট ছোট ব্যবহারও করেছেন, আপনি মূলানূগ হতে গিয়ে লেখকের প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষা করলেন। কিন্ত আপনি যাদের অনুবাদ পড়াতে যাচ্ছেন তাদের উপর এক ধরণের জোরারোপ হয়ে যাচ্ছে না? মানে সেই অমিমাংসিত ও চলমান তর্ক, লেখক তার লেখার জন্য পাঠকের কথা মনে রাখবেন কি না? একইভাবে তা অনুবাদকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
আনিসুজ্জামান : আমি বলবো, এ ধরণের বড় বড় যে উপন্যাসগুলো আছে সেগুলো বুঝতে হলে হুমায়ূন আহমদের বই পড়ার যে আনন্দ (আমি নিজেও পড়ি) –ঐ ধরণের আশা নিয়ে, ইচ্ছে নিয়ে পড়লে হবে না। এই ধরনের বই পড়ার জন্য আলাদা একটা প্রস্তুতি দরকার। এই ধরনের বই বোঝার জন্য আশেপাশের অন্যান্য অনেক বই আগে পড়ে, বেইজটাকে ঠিক মতো নিয়ে তারপর বসে পড়া উচিৎ। এবং আমি কবির স্যারকেই, আমি বলবো, এভাবেই অনুবাদ হওয়া উচিৎ যেভাবে উনি করেছেন, অন্তত সারামাগোর ওই বইটার ক্ষেত্রে। আমার যে বইটা, আপনি প্রথম ১৯-২০-৩০ পৃষ্ঠা যখন পড়বেন আপনার যথেষ্ট খটকা লাগবে, ওই কবীর চৌধুরীর মতই। তারপর যখন আপনি ওই স্টাইলটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন, এরপর আপনার কাছে কষ্টকর মনে হবে না। কারণ লেখক যদি পাঠকদের কথা চিন্তা করে লেখেন তাহলে সেটা হালকা হয়ে যাবে বলে মনে করি, অনুবাদের কথা বাদই দিলাম। লেখাটা কি? পাঠকের কথা চিন্তা করলে ইমদাদুল হক মিলন, হুমায়ূন আহমেদের মতো হবে যেগুলো আমিও পড়ি। প্রচুর বই কিনেছি, সেবা প্রকাশনীর বই কিনেছি; ওই বইগুলো আমি পড়ি প্লেনে উঠে, বইটা শেষ করি সময়টা কেটে যায়, প্লেনে বইটা রেখে চলে আসি। গাব্রিয়েলের বইটা আমি পড়ি, পড়ে রেখে দিই দুমাস পরে আবার পড়বো বলে; যখন আবার পড়বো, নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে আমার কাছে। আবার নতুন করে চিনবো গাব্রিয়েলকে। লেখকের মৃত্যুর ৫০-১০০ বছর পরও হয়তো বইগুলোর কদর একই রকম থাকবে। আর হুমায়ন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, মাসুদ রানা–এগুলো হারিয়ে যাবে।
marquez
অলাত এহ্সান : ‘বড় বই’ যে শব্দটা বললেন, তাতে একটা বড় বই বহুবার পাঠের বিষয় থাকে, বহুবার পাঠোন্মোচনের বিষয় থাকে।
আনিসুজ্জামান : আপনি গানই দেখুন না, দেখুন এই যে মোজার্ট, উনি কি করেছেন জাস্ট কম্পোজ করেছেন। আপনি শোনেন কেন ক্লাসিক?
অলাত এহ্সান : আমি শুনি এ জন্য যে, আমার মনে হয় ওই সুর আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয়কে আরো সুক্ষ্ম স্বরে উন্নততর করছে। নিয়ত নতুন মনে হয় বা ওটার ভেতর কিছু থেকেই যাচ্ছে যা আমি খুঁজে পাইনি।
আনিসুজ্জামান : ঠিক তাই, আপনি যখনই শুনবেন তখনই আপনার নতুন লাগবে। নতুন আর একটা দিগন্ত উন্মোচিত হবে মোজার্টের। ক্লাসিকগুলো তো এরকমই হয়। বাংলা ক্লাসিকগুলো দেখুন আপনি, কত বছর আগে লিখে গেছেন। ঠুমরিগুলো দেখুন–বাজু বান খুলে খুলে যায়–কত বছর ধরে আমরা শুনছি চার লাইনের একটা গান। এক-একজন এক একভাবে পরিবেশন করে, আপনি নতুন করে তাদের খুঁজে পান।
অলাত এহ্সান : একজন লেখকের প্রস্তুতি হিসেবে তার জীবনটাকে দেখা হয়। তার জীবন যাপন, পঠন-পাঠনের ভেতর দিয়ে একটা জার্নি, জীবনব্যাপি জার্নি। আমি এখানে একজন অনুবাদকের জীবনকে দেখতে চাই যে, আপনি কখন এসে অনুবাদে হাত দিলেন, তার আগের প্রস্তুতিটা বলুন।
আনিসুজ্জামান : আমি ছোট বেলায় প্রচুর বই পড়েছি। আমার ফ্যামেলি, আমি ভূমিকাতে লিখেছি আমার নানার কথা। নানা করতেন কি, ওনার কাছে (জালালউদ্দিন) রুমির সবগুলো খন্ড ছিল। উনি ফার্সিতে পড়তেন এবং আমাকে বাংলায় শোনাতেন গদ্য হিসাবে না, কবিতা হিসেবে। তখন যদি রেকর্ডার থাকতো বিশাল একটা কাজ হতো। যাই হোক, উনি মারা গেছেন। ওই পরিবেশ থেকে আম্মা লেখালেখি করেন, খালাদের দেখেছি ওনারা লেখালেখি করতে তবে তারা কখনোই তা প্রকাশ করেননি কোনো পত্রপত্রিকায়। ওই পরিবেশে মানুষ হয়েছি। একেবারে বাচ্চা বয়স থেকে মায়ের কাছ থেকে বই চুরি করে পড়েছি। গুলিস্তানে ইন্ডিয়ান লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়েছি। গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান, এমনকি ম্যাথমেটিকসের বই খুঁজে নিয়ে পড়তাম। এরপর মেক্সিকোতে এসে স্প্যানিশে এখানকার লেখকদের বই পড়তে শুরু করি। তারপর রাজু আলাউদ্দিন— ভালো বন্ধু–ও গুতোগুতি করতো, এত বেশি পড়িস এবার অনুবাদ আরম্ভ কর। তারপর একটা-দুইটা কবিতা অনুবাদ করি। তারপর আবার অনেকদিন করি না, গ্যাপ যায়। এভাবে করতে করতে ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ অনুবাদ তো হয়েই গেল। এখন আরো দুইটা অনুবাদ করবো।
অলাত এহ্সান : এই বইটার অনুবাদ করলেন, এটার কয়েকটা অনুবাদই প্রচলিত আছে। মানে কলকাতায় যদি অনুবাদ হয়, তা বাংলাদেশে চলে আসে। সেটা ধরলে মার্কেজের এই বইটার সম্ভবত তিনজনের অনুবাদ প্রচলিত আছে।
আনিসুজ্জামান : আরো বেশি বোধ হয়। জি এইচ হাবিব ভাই, তরুণ কুমার ঘটক, খুব সম্ভবত আরো একজন বা দুইজন করেছে।
অলাত এহ্সান : এই বই থাকতেও আপনি অনুবাদ করলেন। পাঠের আনন্দ থেকে করেছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার অনুবাদ যখন শেষ হয়ে আমার হাতে পৌঁছেছে, তখন তো এটা একটা পণ্য হয়ে গেছে। পাঠক একটা পণ্য ক্রয় করছে। পাঠককে তো দেখতে হবে যে, তারা ৪০০–৪৫০ টাকার বই কিনবে–এটা টাকার অনুপাতে ঠিক আছে কিনা– বইটা পাঠ করে সেই আনন্দ পাবো কি না? সুতরাং এই ধরনের একটা ঝুঁকি, এতগুলো অনুবাদ প্রচলিত আছে,তারপরও আপনি অনুবাদ করলেন।
আনিসুজ্জামান : আমার মনে হয়েছে, বাকি অনুবাদ যেগুলো হয়েছে সেগুলো তো ইংরেজি থেকে হয়েছে, মূল থেকে আমার আগে অনুবাদ হয়নি। তরুণ ঘটকের অনুবাদটা বেরিয়েছে আমার অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের পর। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে বাংলা ভাষাভাষি অনুবাদক লেখকরা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছে–এমন চিহ্ন খুঁজে পেলে আমি হয়তো অনুবাদ করতাম না । গাব্রিয়েলের আগের বইগুলো যে অনূদিত হয়েছে, আমি এখনো জি এইচ হাবিব ভাইয়ের অনুবাদ সম্পূর্ণটা পড়িনি, যতটুকু পড়েছি তাতে আমার মনে হয়েছে, উনিও অনুবাদ করতে পেরেছেন ৮০%। আমি হয়তো ভাষিক সুবিধার কারণে আরেকটু বেশি করতে পেরেছি। আমি কৌতুহলবসত তরুণ কুমার ঘটকের বইটাও নাড়াচাড়া করেছি আমার অনুবাদ শেষ করার পর, কিছুদিন আগে। তার অনুবাদটা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। সাধারণত আমরা ধরে নিই যে মূল থেকে করলে ভালো ও বিশ্বস্ত হওয়ার কথা। উনি এ ক্ষেত্রে সেই আস্থার জায়গায় পৌঁছুতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। যদিও উনি লিখেছেন–মূল থেকে করেছেন এবং উনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
অলাত এহ্সান : এই বইটার জন্য উনি পুরস্কারও পেয়েছেন বোধ হয়?
আনিসুজ্জামান : না, পেয়েছেন ‘দন কিহোতে’ করে এবং ‘দন কিহোতে’ আমি মূল স্প্যনিশে পড়েছি, উনার অনুবাদ হয়নি। এবং দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমি অনুমান করছি, যারা উনাকে ‘ময়ূরাক্ষি পুরষ্কার’ দিয়েছেন (খুব সম্ভবত ময়ূরাক্ষিই নাম পুরস্কারটার) ওনাদের যেহেতু স্প্যনিশ জানা নেই, যার ফলে আমার মনে হয় না, ওনারা ঠিক মতো বুঝতে পেরেছেন যে কি আসলে অনুবাদ করেছেন। ‘দন কিহোতের অনুবাদ ওখানে হয়নি। আপনি দয়া করে আমার বইটার সঙ্গে অথবা (জি এইচ) হাবিব ভাইয়ের বইটার সঙ্গে তরুণ কুমার ঘটকের অনুবাদটা মিলিয়ে দেখবেন–ওটা অনুবাদ হয়নি। একথা আমি বলছি মূলানুগতার প্রশ্নে।
অলাত এহ্সান : একাধিক অনুবাদের আরো কিছু বিষয় দেখা যায়। যেমন, জিএইচ হাবিব ভাইয়ের আরো কয়েকটা ভাল কাজের মধ্যে আছে নাইজেরিয়ান লেখক আমোস তুতুয়ালার বিখ্যাত বই ‘দ্য পাম ওয়াইন ডিংকার’, তার অনুবাদে ‘তারিখোর’। এটাই আবার কলকাতায় ধ্রুব গুপ্ত অনুবাদ করেছেন, তার নাম ‘তাল-মদিরা মাতাল’। সেক্ষেত্রে অনুবাদ করতে গিয়ে যা ঘটলো, পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক শব্দগুলো তিনি ব্যবহার করলেন, একটা গ্রামীণ আবহ আনার জন্য, যেভাবে অঞ্চল ভেদে মুখের ভাষার বদল ঘটে। জিএইচ হাবিব ভাই সেখানে প্রমিত বাংলার কাছাকাছি থাকলেন। কিন্তু অনুবাদে মুখের ভাষা নিয়ে তো একটা দ্বন্দ্ব হতেই পারে যে, কোন অঞ্চলের মুখের ভাষাকে নেয়া হবে। আপনাকেও দেখলাম যে, মার্কেজের অনেক শব্দ একেবারে আঞ্চলিক শব্দ দিয়ে বা মৌখিক ভাষা দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলেন।
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ, তার কারণ একটাই–আমি যতটুকু পেরেছি মূলানুগ থাকার চেষ্টা করেছি। নিজের কিছুই আমি ঢুকাতে চাইনি, তবে ভাবটার প্রতি বেশি বিশ্বস্ত থেকেছি আমি। প্রথমত যা প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তার প্রতি লয়াল থেকেছি, তারপরে এসে আমি ভাষাটার প্রতি লয়াল থাকার চেষ্টা করেছি। যার ফলে আপনি দেখবেন আমার বইটায় স্প্যানিশের চলন-বলন-ধরন যতটুকু পেরেছি আমি বাংলায় রেখে দিয়েছি। হয়তো অনেকে বলবেন, এটা তো বাংলা ভাষা না, বাংলা ভাষায় তো এভাবে বলা হয় না। কিন্তু ভাষাতো পাল্টায়, আস্তে-ধীরে বাংলা ভাষাটাও পাল্টে যেতে পারে। যিনি অনুবাদ পড়বেন তাকে অন্তত খোলা মনে আসতে হবে যে, আমি একটা অন্য কিছুর সাথে পরিচিত হতে যাচ্ছি, যেটা কিনা আমার একেবারেই অপরিচিত। ভাষাটাও অপরিচিত, চরিত্রের নামগুলোও অপরিচিত, সংস্কৃতি অপরিচিত, ধর্ম অপরিচিত–সেগুলির সাথে পরিচিত হতে চাই বলেই আমি অনুবাদ করতে চাচ্ছি। তা না হলে আমি বাংলা উপন্যাসই পড়বো। ওই স্পৃহাটা না থাকলে আমি কেন অনুবাদ পড়বো? এটা প্রথমে চিন্তা করা উচিৎ। তারপর ওই খোলা মন নিয়ে অনুবাদ পড়া উচিৎ বলে মনে করি।
অলাত এহ্সান : আমার কাছে মনে হচ্ছে যে, ভাষার প্রশ্ন ধরে নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তাহলো অনুবাদ সাহিত্য না। এই তর্কটা আমি তুলতে চাই না। কারণ অনুবাদ সাহিত্য, অনেক সময় স্বদেশি ভাষার সাহিত্যের চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে অনুবাদে।
আনিসুজ্জামান : আসলে সবই তো অনুবাদ, নিজস্ব কি বলা যায়? সেদিন টিভিতে দেখলাম খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ভাই, রাজু আলাউদ্দিন, জিএইচ হাবিব ভাই–ওনারা যে আলোচনা করলেন তার ভেতর কেউ একজন বললেন, শিশু যখন জন্ম গ্রহণ করে যখন মা বলে, সেটাও তো একটা অনুবাদ আসলে। সবই আসলে অনুবাদ। সেই অর্থে আপনি যদি বলেন, মৌলিক আসলে কিছুই নাই, সবই অনুবাদ।
অলাত এহ্সান : মৌলিক শব্দ তো আসলে কৃষক-শ্রমজীবীরা তৈরি করেন।
আনিসুজ্জামান : ওভাবে দেখলে, আপনি যেটা বলছেন–অনুবাদ সাহিত্য নয়–তা ঠিক না। সাহিত্য মানেই অনুবাদ।
অলাত এহ্সান : তবে ‘অনুবাদ কোন সাহিত্য না’–এই কথাটা বলা, রটিয়ে দেয়ার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে আমার মনে হয়। কেননা, এর মধ্যদিয়ে মৌলিকতার নামে দেশীয় দ-মার্কা (মানে হাঁটু ভাঙা) সাহিত্যের প্রচলন-প্রতাপ টিকিয়ে রাখা যায়। যদিও আমি কখনোই একটা দেশের নিজস্ব সাহিত্যের বিকাশের প্রসঙ্গকে উপেক্ষা করি না। তো, ওই প্রচারণা সম্পর্কে আপনার কি মনে হয়?
আনিসুজ্জামান : আমি ঠিক জানি না, হলেও হতে পারে। যেহেতু অনুবাদ নিয়ে তেমন কোন বড় ধরণের কাজ এখানে হয় না, তাই এটাকে উৎসাহিত করার জন্য আমি এ বছর একটা পুরষ্কার ঘোষণার কথা চিন্তা করছিলাম। অনুবাদ নিয়ে একটা ও নিজস্ব লেখা নিয়ে একটা–এই দুটো ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রবর্তনের ইচ্ছে আছে, ‘সীওমো ফাউন্ডেশন’ নামে আমার একটা নন-প্রফিড অর্গানাইজেশন আছে সেখান থেকে। কিন্তু এবার ওই ঘোষণাটা দেয়া হয়নি। আগামীতে দিব হয়তো। ওটা জাস্ট উৎসাহিত করার জন্য যাতে উৎসাহী কেউ অনুবাদ করেন এবং মূল ভাষা থেকে অনুবাদটা করেন।
অলাত এহ্সান : এক্ষেত্রে একটা বিষয় হচ্ছে, অনুবাদের দক্ষতা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা যেটা দেখলাম, তরুণ কুমার ঘটক ‘নিঃসঙ্গতার শত বছর’ মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন, তার চাইতে আমাদের এখানে জিএইচ হাবিব যে ইংরেজি থেকে করছেন, সেটা বরং আরো ভাল করেছেন। অনুবাদকের সুযোগ থাকে কল্পনাশক্তি, জানা-শোনার মধ্যে দিয়ে মূলের কাছাকাছি যাওয়ার। এখানের বইয়ের মার্কেটে কার যেন দেখলাম নাজিব মাহফুজের অনুবাদ, তাতে বলা হচ্ছে মূল ভাষা থেকে করা। কিন্তু আমাদের দেশে আলী আহমদ নাজিব মাহফুজের দুটি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন, তা আরো ভাল করতে পেরেছেন। এবং যারা স্কলার তারাই বলছেন, আলী আহমদের অনুবাদ আরো বেশি ভাল হয়েছে। সুতরাং মূল থেকে অনুবাদ করার চাইতে বরং সাহিত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর দিকে নজর দেয়া জরুরি নয়?
আনিসুজ্জামান : অবশ্যই। একজন অনুবাদক শুধু যদি ভাষাটাই জানেন, উনি যদি না জানেন শিল্পরীতি; প্যারাডক্স, উনি যদি না জানেন উপমা, উনি যদি না জানেন লেখক কি বলতে চাচ্ছেন এবং সেই প্রস্তুতি যদি না থাকে অনুবাদকের, তাহলে বই অনুবাদ করতে যাওয়াটা বৃথা শ্রম। ওই ধরণের লেখা পড়ে বোঝার মত মানসিকতা খুব একটা বেশি লোকের নেই। কারণ আমি আগেই বলেছি, লেখক যা বলতে চেয়েছেন, যা বুঝাতে চেয়েছেন সেটার প্রতি প্রথম লয়াল থাকাটা বিশেষভাবে জরুরি। তারপর ভাষার প্রতি বিশ্বস্ত থাকাটা জরুরি। ওই ভাবটাই যদি না জানেন, অর্থটাই যদি না জানেন তাহলে তো অনুবাদ করতে পারবেন না আসলে।
অলাত এহ্সান : আমাদের দেশে অনুবাদ হচ্ছে। অনুবাদ নিয়ে একটা কথা প্রায় শতসিদ্ধ যে, উইলিয়াম ফকনার বলছেন–প্রতিটি দেশের সাহিত্যে একটা নিস্তরঙ্গ সময় যায়, সাহিত্যের নিস্তরঙ্গ সময় হচ্ছে অনুবাদের শ্রেষ্ঠ সময়। তো অনুবাদই সাহিত্যের ফিনিক্স জন্ম দিতে পারে বা পুনর্জন্ম দিতে পারে বা নবজাগরণ যাকে বলি–এ ধরনের কিছু ঘটাতে পারে। আমরা বোধ করছি, আমরা সাহিত্যের একটা নিস্তরঙ্গ সময় অতিক্রম করছি। সেদিক দিয়ে অনুবাদকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। কিন্তু অনেক সময় অনুবাদ ও অনুবাদিত সাহিত্য পাঠ অনেকটা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে, একটু আগে যেটা বলছিলাম ‘অনুবাদ আদৌ কোন সাহিত্য না’–এমন ধারণা সামনে আসার ফলে। এটা আমাদের দেশের সাহিত্যের যে শিথিল অবস্থা বা একটা স্তিমিত অবস্থা আছে বা একেবারে নাজুক অবস্থা, এই অবস্থা টিকে থাকার পেছনে ওই বাক্যটা কাজ করছে বলে মনে করেন কি না? আমাদের সাহিত্য নিয়ে আপনার কি ধারণা?
আনিসুজ্জামান : হতে পারে। আমি আসলে খুব একটা পরিচিত না আমাদের এখানে কি রটানো হচ্ছে, কি সাহিত্য হচ্ছে। বাইরে থাকি তো, ফলে দেশের সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না আমার। আমি বেশির ভাগ যা পড়ছি, এখন যা করছি সবই বাইরের বই, বেশির ভাগ সময় স্প্যনিশ বই নাড়াচাড়া করি। বাংলাভাষার যেসব বই আমার আগ্রহের সেগুলো আসলে অনেক আগের লেখা, যাঁরা ইতিমধ্যে গত হয়ে গেছেন। সাম্প্রতিক কযেকজন লেখকের গল্প উপন্যাস পড়েছি। তবে আমার মনে হয় এখানে ভালো কবিতা সৃষ্টি হচ্ছে অনেক বেশি। কিন্তু গল্পকার, ঔপন্যাসিক–আমার জানা মতে–আমি এখনও এমন কোনো প্রবল ঔপন্যাসিক পাইনি যারা স্প্যানিশ সাহিত্যের ঔপন্যাসিকদের সাথে পাল্লা দিতে পারেন। আমি উপন্যাস হিসেবে যেটুকু পাচ্ছি তা হলো অসাধারণ ঘটনার একটা আখ্যান লিখে গেছেন।
অলাত এহ্সান : অনুবাদ নিয়ে কথা বলতে গেলেই এটা বলা জরুরি মনে হচ্ছে, আমাদের এখানে অনুবাদের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় ধারার বা আলোচিত বইয়ের অনুবাদ হচ্ছে। সেদিক দিয়ে মার্কেজের বইটা জনপ্রিয় হয়েছে, কিন্তু বইটা জনপ্রিয় ধারার নয়।
আনিসুজ্জামান : জনপ্রিয় হয়েছে অন্য অর্থে, এই বইটা বহুল আলোচিত এবং স্প্যনিশে এটাকে পাঠ্যপুস্তক করা হয়েছে অনেকগুলো দেশে। তারা প্রায় সবাই বইটা পড়ার চেষ্টা করেন যেহেতু বিদ্যালয়ে এটি পাঠ্য।
অলাত এহ্সান : পাঠ্যপুস্তকের মধ্য দিয়ে বইয়ের মৃত্যু ঘটছে।
আনিসুজ্জামান : এটাতে দাঁত বসানো ভীষণ কষ্টকর। কারণ, আবার বলবো একটাই, সেটা হচ্ছে এটাকে তুলনা করা যায় বাইবেলের সঙ্গে, একটা সার্বিক বই। সেই অর্থে যদিও আমি কোরআনের সাথে কোনো কিছু তুলনা করবো না ধর্মীয় অনুভূতি থেকে, তারপরেও এটা সাহিত্যের একটা সামগ্রিক বই। সম্পূর্ণ একটা বই। এ ধরণের বই আসলে হয়নি অথবা আমি পড়িনি।
অলাত এহ্সান : মার্কেজের অন্য বইয়ের তুলনায়?
আনিসুজ্জামান : অন্য বইয়ের তুলনায় আমি বলবো–অন্য বইগুলো এই ধরনের সামগ্রিক বই নয়। এটা ওঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। অন্য বইগুলো যথেষ্ট ভালো বই, ভাল উপন্যাস। কিন্তু এটার ধারে কাছেও যায় না।
অলাত এহ্সান : এই ব্যাপারটা খুব ভালো দিক যে, আপনি একটা বই অনুবাদ করবেন বলে লেখকের একটা বই-ই পড়ছেন, ব্যাপারটা তা না। সাহিত্য বুঝতে তার দেশ বুঝা, কালচার বুঝা, সংস্কৃতি বুঝা, ভাষা বুঝতে হয়। সঙ্গে সাহিত্যিককে বুঝা, তার সমগ্র সৃষ্টিকে বুঝাটার ব্যাপারটা কিন্তু থাকছে।
আনিসুজ্জামান : দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, আমি তার মৃত্যুর কিছু দিন আগে অ্যাপয়েনমেন্ট পেয়েছি তার ইন্টারভিউ নেয়ার। উনি আমাকে ফাঁকি দিয়েছেন। অ্যাপয়েনমেন্টের দেড় মাস আগে তার মৃত্যু হয়েছে। যার ফলে ওটা আর নেয়ার সুযোগ পাইনি। উনি তো মেক্সিকোতেই বাস করতেন। যার ফলে একে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি বলবো। আর কি যেন বলছিলেন?
অলাত এহ্সান : আমাদের দেশে জনপ্রিয় ধারার বইগুলোর অনুবাদ বেশি হয়।
আনিসুজ্জামান : হ্যাঁ। ওইগুলো পড়তে ভাল লাগে, মানুষকে আকৃষ্ট করে, বিক্রি হয়। আর আমি তো বিক্রি করে মুনাফা করার জন্য বইটা অনুবাদ করি নি। কেউ যদি ভালোবেসে কিনে সেটা ভাল, কিন্তু এই বই বিক্রি হবে না। ক’জন পড়বে এই বই। আমি বইটা অনুবাদ করেছি অন্য কারণে। নিজস্ব একটা চ্যালেঞ্জ ছিল আমার যে, বইটা অনুবাদ করতে হবে, বাংলা ভাষাভাষিদের কাছে এটা পৌঁছে দিতে হবে যারা পড়তে চায়। একজন মানুষ যদি পড়েন এবং ভালভাবে পড়েন এবং কি করতে চেয়েছি এটা দেখে যদি আপনি এ্যাপ্রিসিয়েট করেন আমার এত বছরের পরিশ্রম সার্থক।
অলাত এহ্সান : আপনি যেহেতু প্রবাসেই থাকছেন দীর্ঘদিন, ওখানে তথা স্প্যানিশ ভাষাভাষিদের কেউ কি আছেন যিনি আমাদের সাহিত্যের সাথে পরিচিত?
আনিসুজ্জামান : আমি পাইনি। ভবিষ্যতে, আমার যে উপন্যাসটা লিখছি তা শেষ করে আশা আছে এদিক থেকে কিছু ওদিকে নিয়ে যাওয়ার।
অলাত এহ্সান : এটা একটা ভাল উদ্যোগ, তাতে সুরঙ্গের দুটি মুখই খোলা থাকছে। সালাইনের মতো ঝুলে থেকে নিচের দিকে শুধু প্রবাহিত হবে না। আপনার লেখালেখির পরবর্তী পরিকল্পনাটা কী।
আনিসুজ্জামান : উপন্যাস একটা ধরেছি। নিজস্ব উপন্যাস। অনেকে বলে মৌলিক। আমি বলবো না মৌলিক। কারণ মৌলিক বলতে কিছুই নেই। নিজস্ব উপন্যাস। ওটা শেষ করবো আগামী ২-৩-৪ বছরের ভেতরে। মাঝে মাঝে স্বাদ বদলের জন্য একটা-দুটো কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট কিছু হয়তো অনুবাদ করে যাবো অথবা করবো কিনা জানি না ঠিক। তো ওটা শেষ করার পর অন্য কিছু ভাববো। এর মাঝে বাংলা কিছু গান লিখছি।
অলাত এহ্সান : ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ অনুবাদটা আমরা দেখলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ ২ বছর ধরে প্রকাশিত হলো। আর আপনিও একটা উপন্যাস লিখতে যাচ্ছেন সেটাও প্রায় ৩-৪ বছরের কথা বলছেন। (বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বলছি না, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেই এই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে)। এত দীর্ঘ সময় কেন?
আনিসুজ্জামান : কেউ যদি সাত্যিকারের ভাল উপন্যাস লিখতে চায় তা হলে তার ভালোভাবে প্রস্তুতি নেয়া দরকার। যেমন আমি এই উপন্যাসের কঙ্কালটা দাঁড় করিয়েছি। কঙ্কালটা একটা বড় পেইন্টিং। পেইন্টিংয়ের প্রথম রঙের যে স্তর, সেই বেইজটা শুধু তৈরি করেছি। তারপর আমি একের পর এক ওটার উপর রং চড়িয়ে যাবো, রং চড়িয়ে যাবো। এই যে রং চড়িয়ে যাবো এর জন্য সময় দরকার। বারেবারে আমার নিজের পড়তে হবে আসলে। কিছু বাদ পড়ে গেল কিনা, আরো কিছু বলতে চাই কিনা। যেমন একটা পরিচ্ছেদ আমি শেষ করেছি ওই উপন্যাসটার। একটা পরিচ্ছদ, মাত্র ১৬ পৃষ্ঠা শেষ করেছি ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ (২০১৬)। ওটা শেষ করতে আমার সময় লেগেছে ২ মাসের কাছাকাছি। এখনও আমি সন্তুষ্ট না। (ক্যালিফোর্নিয়া) গিয়ে হয়তো আরো একমাস লেগে যাবে ওই পরিচ্ছেদটা সম্পূর্ণভাবে আমার মনোমতো করার জন্য। আর এর পরিচ্ছেদ হবে অন্তত ২০টা-২২টা। গুণ করে দেখুন, তিন মাস যদি লাগে একটা পরিচ্ছদে তাহলে তিন বারোং ছত্রিশ, মানে তিন বছর লেগেই যায়।
অলাত এহ্সান : আপনার অনুবাদ পড়া বা স্প্যনিশ সাহিত্য পড়ার মধ্য দিয়ে আমার মনে হয়েছে স্প্যানিশদের ভাষার জায়গাটা অনেক বেশি জটিল। ধ্রুপদী ভাষার যে চরিত্র থাকে তার বিশেষ রকম প্রভাব আছে তাদের উপর।
আনিসুজ্জামান : হতে পারে, আমি অন্তত ওভাবে দেখি না। জটিল বলে আমার মনে হয় না। হয়তো বা আমি ওখানে এত বছর আছি বলে আমর মনে হয় না।
অলাত এহ্সান : বাংলা ভাষা কিন্তু একটা জটিল ভাষা।
আনিসুজ্জামান : ওভাবে দেখলে সব ভাষাই জটিল ভাষা।
অলাত এহ্সান : সে দিক দিয়ে হিন্দি ভাষা সহজ বলে আমরা জানি।
আনিসুজ্জামান : হিন্দির সাথে আমি অত পরিচিত না, আমি জাপানিতে ফ্লুয়েন্ট। জাপানি, স্প্যানিশ, ইংলিশ অথবা বাংলা সবই একই রকম লাগে। জটিল বলে কি বোঝাতে চাচ্ছেন?
অলাত এহ্সান : বোঝাতে চাচ্ছি যে ওখানকার ভাষার শব্দের একটা গভীরতা থাকে, হালকা চালের কথা বলে না বা একেবারে হালকা কিছুতে চলে না। মানুষের সংস্কৃতির গভীরতা ভাষাকে গভীরতা দিয়েছে অনেক বেশি।
আনিসুজ্জামান : দুটোই আছে। হালকা আছে, গভীর শব্দও আছে এবং এটা সব ভাষাতে আছে বলে মনে করি আমি।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saifullah Saif — আগস্ট ৪, ২০১৭ @ ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

      দারুণ কথোপকথন ।
      ভাল লাগছে প্রিয় অলাত এহ্সান ভাই ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবের — আগস্ট ৪, ২০১৭ @ ৩:৪৯ অপরাহ্ন

      “আমি যদি জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে স্প্যানিশে অনুবাদ করতে চাই, খুবই খুবই কষ্ট হবে”। সৈয়দ মুজতবা আলী ওনার অনূদিত একটা রুশ উপন্যাসের মুখবন্ধে লিখেছিলেন – অনুবাদ কর্মটা হলো নারীর মতো। সতী হলে সুন্দরী হয়না আর সুন্দরী হলে সতী হয় না”। অনুবাদক আনিসুজ্জামান-এর সাক্ষাতকারে একই মতের প্রতিধ্বনি পাওয়া গেলো। চমৎকার সাক্ষাতকারটা নেবার জন্যে অলাত এহ্সানকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন লোকমান হেকিম — আগস্ট ৭, ২০১৭ @ ১:২৪ অপরাহ্ন

      অলাত এহসানের বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন আর অনুবাদক আনিসুজ্জামানের সাবলীল বয়ান এককথায় অনবদ্য।

      আমি মার্কেজের নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী এই বইটি তিনবার পড়েছি। একবার ইংরেজিতে। দুইবার বাংলায়। প্রথমবার জিএইচ হাবীবের অনুবাদে। আবার পড়লাম আনিসুজ্জামানের অনুবাদটি। জিএইচ হাবীবের অনুবাদটি অসাধারনভাবে গতিশীল। অপরদিকে, আনিসুজ্জামানের অনুবাদটি মূলানুগ, বিধায় কোথাও কোথাও পাঠকের গতি হয়তো কিছুটা নেমে আসবে; এবং মূলানুগ অনুবাদে, বিশেষ স্প্যানিশ বা জার্মান ভাষার ক্ষেত্রে তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আনিসুজ্জামানের মার্কেজ অনুবাদের সাফল্য আরো অন্য কোথাও। বস্তুত মূল থেকে অনুবাদের যে দুঃসাহসিক প্রয়াস আনিসুজ্জামান দেখিয়েছেন তা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে অবশ্যই স্থান করে নিবে।

      অনুবাদকের কাছ থেকে আমাদের আরো প্রত্যাশা রইল যে, তিনি বিপুল বিস্তৃত হিস্পানিক বিশ্বের সাথে আমাদের আরো নিবিড় সংযোগ রচনা করে দিবেন।

      অলাত এহসান এবং আনিসুজ্জামান উভয়কেই ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনিসুজ্জামান — আগস্ট ১৫, ২০১৭ @ ১০:২২ অপরাহ্ন

      প্রতিক্রিয়া জানাতে বিলম্ব হলো বলে মার্জনা করবেন।
      সাক্ষাৎকারটি যারা পাঠ করেছেন তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com