যেভাবে নিজের অপরাধবোধকে গল্পে রূপান্তরিত করেছেন রুডইয়ার্ড কিপলিং

সোহরাব সুমন | ২৯ জুলাই ২০১৭ ৮:২১ অপরাহ্ন

Rudyard-Kiplingঠিক কোন জিনিসটি ফিকশন লেখকদের ফিকশনের কাছে টেনে আনে? প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, সাংবাদিকতা– গদ্যের এমন অনেক কাঠামোয় রয়েছে অকাট্য সব সুযোগের হাতছানি। তবে, আগে থেকে প্রস্তুত রক্তমাংসের কিছু চরিত্র নিয়ে বড় ধরনের বাজি ধরবার শিহরণ এসবের মাঝে নেই। বাস্তবে এমন সুনির্দিষ্ট কিছু ঘটনা সত্যিই ঘটেছে কী-না তা জানবার শিহরণ। কী-করে এই অবাস্তব বাছ-বিচারহীন আবিষ্কারের অব্যবহারিক দক্ষতাটিকে বুঝে ওঠা যেতে পারে? কেমন করে পাওয়া যাবে মিথের অজানা জলরাশির সন্ধানে নিশ্চিত বাস্তব জীবন থেকে প্রস্থান করবার প্রেরণাটুকুকে?
সম্প্রতি কথাসাহিত্যের এমন সব জটিল বিষয় নিয়ে দ্য আটলান্টিক ডেইলি’র প্রতিবেদক জো ফাসলা কথা বলেন ঔপন্যাসিক স্কট স্পেন্সার-এর সঙ্গে। এই কথোপকথনে স্পেন্সার সাহিত্য আবেদনের কাঁচামাল তৈরী সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। এসময় তিনি রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর মনোমুগ্ধকর ছোট গল্প “দ্য গার্ডেনার”কে পথনির্দেশ হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, ফিকশন কী-করে জীবনের দ্বান্দ্বিক ও অপমানজনক, একই সঙ্গে জটিল সব ঘটনা প্রবাহ আঁকড়ে থাকতে আমাদেরকে সহয়তা করে আসছে। লেখক কীভাবে তার চরিত্রসমূহ কল্পনা করেন। কীভাবে তিনি একের পর এক দৃশ্যাবলীর বুনট বাছাই করেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য চরম দক্ষতায় অবতারের মতো নিজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে উপাদান মেলে ধরেন– এমন আরো অনেক বিষয় নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন।
বছর খানেক আগে, ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডর চিই (Chee) তার পাঠকদেরকে কিছু বিষয়ে পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেন : আপনি যদি আপনার চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলতে চান, তাহলে তাদেরকে কোনো পার্টিতে নিয়ে হাজির করুন। স্পেন্সারের নতুন উপন্যাস, ‘রিভার আন্ডার দ্য রোড’, তার এই ধারণারই প্রমাণ। কারণ তার এই উপন্যাসে মোট তেরোটি সমাবেশকে একটি উপন্যাসের লেন্সের নিচে জড়ো করে হাডসন ভ্যালির দুই দম্পতির গল্প তুলে ধরা হয়েছে। একটি গ্রাজুয়েশন উদযাপন, একটি বিয়ে, একটি গৃহপ্রবেশ, মোন্ডালে প্রচারনার জন্য অর্থসংগ্রহ, ঘুর পথে নিউইয়র্ক সেক্স ক্লাবে যাওয়া, বারবিকিউর সঙ্গে আফিমের ধূমপান– এধরনের সমাবেশের সার্বজনীন সব মুখগুলোর মাঝে পাঠক তাদের ব্যক্তিগত সব আশা-আকাঙ্ক্ষার ও ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর পরশ্রীকাতরতার রেখাচিত্রটিই দেখতে পাবেন।
‘এন্ডলেস লাভ’, ‘ওয়াকিং দ্য ডেড’, ‘আ শিপ মেড অব পেপার স্কট’ স্পেন্সারের বিখ্যাত উপন্যাস। ‘ব্রিড’ খ্যাত ঔপন্যাসিক চেস নোভাক-এর লোমহর্ষক উপন্যাসসমূহের আদলে তার আরো দুটি উপন্যাস রয়েছে। এগুলোসহ স্কটের বেশীরভাগ উপন্যাসই সর্বাধিক বিক্রিত। তার ননফিকশনসমূহ ‘দ্য নিউইয়র্কার’, ‘হারর্পাস’, ও ‘রোলিং স্টোন’- এর মতো ম্যাগাজিনগুলোতে ছাপা হয়েছে। এছাড়াও তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া-এর লেখক কর্মশালায় ফিকশন বিষয়ে শিক্ষকতা করেন।
আটলান্টিক ডেইলির প্রতিবেদক জো ফাসলা-এর সঙ্গে এই ফোনালাপে স্কট স্পেন্সার বলেন : প্রায় বছর দশেক আগে “দ্য গার্ডেনার” পড়ার সময় আমি রুডইয়ার্ড কিপলিংকে আবিষ্কার করি। এই নির্জলা খাঁটি সুযোগ অনেকটা প্রকাশকের উদ্ভাবনকুশলতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল। বিক্রি বাড়াবার খাতিরে পেঙ্গুইন, ক্যাশ রেজিস্টারের পাশে রাখার উপযোগি এর একটি সংস্করণ বের করে। পুঁচকে সেই পকেট বইখানা মাত্র ৯৫ সেন্টে বিক্রি হচ্ছিল। আজকের দিনে যা দিয়ে আপনি একটি ক্যান্ডি বারও কিনতে পারবেন না। আমি তাই সেটিকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে আসি এবং পড়ি, আর সেই বইটির দ্বিতীয় গল্প “দ্য গার্ডেনার”-এর আবেগী প্রভাব আমাকে প্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলে।
এর আগে আমি কিপলিংকে খুব একটা আমলে নেইনি। শিশুতোষ পাঠ ও একঘেয়ে রাজনীতি এমন সব বিষয়েই কেবল সে আমার স্মৃতিতে যুক্ত ছিল। তবে তার এই গল্পের কাঠখোট্টা এবং কমনীয় শুদ্ধতা (আমি জানি, এটি অক্সিমোরন বা স্ববিরোধিতা) আমাকে আঘাত করে। এর সাহায্যেই তিনি বিষয়ের অবতারণা করেন। হেলেন নামে এক মহিলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার এক ভাগ্নে বা ছেলেকে হারান, এবং শেষে ফ্রান্সের বিশাল এক সামরিক সমাধিক্ষেত্রে তার এই চূড়ান্ত লোকশানের মুখোমুখি হন। সেখানে কেবল সে এবং অপরিচিত একজন মালী, বিনীতভাবে একরের পর একর বিরানভূমি পেরিয়ে যান।
তাদের সম্পর্কের সত্যিকার ধরন কিপলিং পুরোপুরি চেপে যান। গল্পটিকে একটি আদল হিসেবে নেয়া যেতে পারে। বা হেলেনের গল্প হিসেবে এটি পড়া যেতে পারে। একজন বলিষ্ঠ মহিলা, যিনি অবিবাহিত অবস্থায় নিজের সন্তানকে বড় করে তুলেছেন। তার ইংরেজ গ্রাম জুড়ে তিনি অভিনয় করে গেছেন যে সে তথা মাইকেল, তার মৃত ভাইয়ের ছেলে। সারা জীবন ছেলেটি তাকে “আন্টি” ডেকেছে। যদিও ছেলেটির জানা মতে সত্যিকার মা না হলেও, ভালোবাসা আর আবেগের বশবর্তী হয়ে ছেলেটি তাকে “মাদার” ডাকবার জন্য কাকুতি-মিনতি করেছে। সততা এবং বাস্তববাদিতার কারণে মহিলা মাঝে মধ্যে একান্তে তা অনুমোদনও করেছেন।
তার আঠারোতম জন্মদিনে, মাইকেল ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দেন, এবং কিছুদিন পর মারা যান। তার মরদেহ যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের মাঝে ঢাকা পড়ে থাকে। জায়গাটি কেউ চিহ্নিত করতে পারে না। অনেক দিন পর তার মরদেহখানি খুঁজে পাওয়া যায়। এবং অবশেষে ছেলের প্রতি সবশেষ শ্রদ্ধা জানাতে হেলেন ফ্রান্সের সেই সামরিক সমাধিক্ষেত্রে যেতে সক্ষম হন। গল্পটি খুব একটা বড় না হলেও, অর্ধেক বাক্যে আস্ত একটি বছর পেরিয়ে অত্যন্ত কার্যকরভাবে তা একটি নীতিকথার (ফেইবল) দিকে মোড় নেয়। এর লয় অনেকটা বাস্তবতা সমৃদ্ধ হলেও, গল্পের বিধ্বস্ত পরিণতি বোধের দিক দিয়ে আমরা এতে একজন ঝানু কারিগর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হই। সমাধির বিশালতা দেখে হেলেন খুবই অবাক হন। এর কবরগুলোর কোথাও কোন নাম খচিত নেই। সবগুলো একেকটি সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত। খুব সতর্ক প্রক্রিয়ায় প্রত্যেক সৈনিকের সমাধি রেকর্ড করা আছে। কিপলিং অজানা সব সৈনিকদের সমাধির ওপর খচিত বাইবেল থেকে একগুচ্ছ শব্দ তুলে ধরেছেন “নোন আনটু গড : সদা প্রভুর পরিচিত।” তারপর সংখ্যা খচিত কবরের সেই অসীম সমুদ্রের মাঝে হাতড়ে বেড়াবার সময়, হেলেন একজন মালীর দেখা পান। কিপলিং তা পাঠকের সামনে তা এভাবে উপস্থাপন করেন :
[দ্য গার্ডেনার : মালী] তাকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ান এবং কোন ভূমিকা বা প্রীতিসম্ভাষণ ছাড়াই জানতে চান : “আপনি কাকে খুঁজছেন?”
“লেফটেনান্ট মাইকেল টুরাল– আমার ভাই পো,” জীবনে অজস্রবার বলা শেষের এই কথার প্রতিটি শব্দ হেলেন খুব ধীরে, টেনে টেনে উচ্চারণ করেন। তারপর লোকটি অসীম সমবেদনায় তার দিকে তাকান। তার আগে কালো ক্রস ঘিরে সদ্য বোনা ঘাসের দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ান।
“আমার সঙ্গে আসুন,” সে বলে, “এবং আমি আপনাকে দেখিয়ে দেবো আপনার ছেলে কোথায় শুয়ে আছে।”
এমন গুরুতর আঘাতের– আমি একে বলি ভাস্বরতা– মুহূর্তে গল্পটি চড়ম বিড়ম্বনা আর মিথ্যায় ভরে ওঠে। সমঝোতার একটি মাত্র শব্দ নির্মমভাবে চেপে বসে এবং অনুভূতিগুলো সমাধিস্থ বা নিঃশেষিত হয়ে যায়। তবে যখন মালী চোখ তুলে তার দিকে তাকায় তখনই গল্পটি একটি অপার্থিব চরম পরিণতিতে এসে উপস্থিত হয়। আদতেই যা নান্দনিক এবং সন্তোষজনক।
আমার পাঠে ‘দ্য গার্ডেনার’-এর হেলেন এমন একটি চরিত্র যাকে তার গোপনীয়তা ধরে রাখতে হয়েছে। আজীবন তাকে তার সবচেয়ে মহান ভালোবাসার সম্পর্কটিকে গোপন করতে হয়েছে। টানা আঠারো বছর ছেলেটিকে তিনি ভাই পো হিসেবে পরিচয় দেবার পরও, সমাধির লোকটি, মুহূর্তের জন্য তার দিকে তাকিয়েই, বলে ওঠেন তিনি হেলেনকে তার ছেলের কাছে নিয়ে যাবেন। “সমাধি ছেড়ে যাবার আগে হেলেন লোকটির দিকে শেষ বারের মতো তাকায়। দূর থেকে তিনি দেখতে পান লোকটি তার কচি গাছগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ছে; এবং তিনি চলে আসেন, মনে মনে লোকটিকে একজন মালী বলে ভাবেন।”
আমার সংস্করণের গল্পটি তারকাচিহ্নিত একটি লেখায় গিয়ে শেষ হয়। লাইনগুলো বাইবেলের, জন ২০ : ১৫ : “যিশু তাহাকে বলিলেন, ‘হে নারী, রোদন করিছ কেন? কাহার অন্বেষণ করিতেছ?’ তিনি, তাঁহাকে বাগানের মালী মনে করিয়া কহিলেন, ‘মহাশয়, আপনি যদি তাঁহাকে লইয়া গিয়া থাকেন, আমায় বলুন, কোথায় তাঁহাকে শায়িত রাখিয়াছেন।’”
গল্পটির সামর্থ্য দেখতে পাওয়া যায় এই শিল্পীর নিজস্ব উপাদান আঁকড়ে থাকার মাঝে।
কিপলিং সম্বন্ধে কোন কিছু না বলে তার গল্পনিয়ে কথা বলা খুবই দুষ্কর। যিনি “শেতাঙ্গদের বোঝা” এই শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন। এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি জার্মানদের হান বলে উল্লেখ করেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি কোন যুদ্ধে না লড়েই যুদ্ধের মহিমা কীর্তণ করে গেছেন। সেই যুদ্ধের সময়কার তীব্র শোক ও অপমান বোধের উদগ্র মিশ্রণকে নিশ্চিতভাবে কিপলিং তার এই গল্পের মাঝে টেনে এনেছেন। সেই সময়কার অসংখ্য তরুণের মতো, কিপলিং-এর ছেলে জন-ও যুদ্ধে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু ক্ষিণদৃষ্টির কারণে তাকে রয়েল নেভি ও পদাতিক বাহিনীর ডাক্তারি পরীক্ষা থেকে পরপর দুবার ফিরে আসতে হয়। তার বাবা তখন একজন অভাবনীয় প্রভাব সৃষ্টিকারী লেখক। তরুণতম এই নোবেল বিজেতা, ইংরেজ সামরিক বাহিনী এবং ব্রিটিশ অভিজাততন্ত্রের একজন অত্যন্ত প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তার ম্যধস্থতায় ছেলের ভাগ্যের চাকায় গ্রিজ লাগে। এভাবে তার ছেলে আইরিশ গার্ডের সৈন্য হিসেবে যুদ্ধে যোগ দেন। এর ফলাফল হিসেবে তরুণ জন কিপলিং যুদ্ধে যোগ দেবার দুদিন পরই মৃত্যু বরণ করেন। শক্তিবৃদ্ধি করা এক সেনা কন্টিনজেন্টের সঙ্গে তাকে লুস-এর এক যুদ্ধে পাঠানো হয়। সম্ভাব্য মুখে আঘাতসহ তাকে সবশেষ অন্ধের মতো কাদায় ডুবে যেতে দেখা যায়। ১৯৯২ সালে উদ্ধার করা একটি লাশকে জন কিপলিং-এর মরদেহ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

Gardener
ছেলেকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় খুঁজে পাবার সব আশা ফুরিয়ে গেলে, উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত হবার পর, কিপলিং “এপিটাফ অব ওয়ার” শিরোনামে তার বিখ্যাত কবিতাটি লিখেন : “যদি প্রশ্ন করা হয় আমরা কেন মরেছি/ওদেরকে বলো, কারণ আমাদের বাবারা মিথ্যে বলেছে।” এই একই আত্ম-ব্যঞ্জনা আপনি অনুভব করবেন “দ্য গার্ডেনার”-এর মাঝে। অন্তত, যুদ্ধে যাবার জন্য সেই সব ছেলেদের কলরব আর এভাবে নিজেদের নিঃশেষ করে দেয়া? কারণ এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছিল যা সেই সামরিক আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করেছে। এবং তাদেরকে এই বলে অনুপ্রাণিত করা হচ্ছিল যে দেশের জন্য যুদ্ধ না করলে জীবনটাই অসম্পূর্ণ। জন কিপলিং (এবং কল্পিত মাইকেল)-এর মতো লাখ লাখ ইংরেজ বালক পুরোপুরি দেশপ্রেমের উন্মাদনায়ময় পরিবেশে বেড়ে ওঠে। এই পরিবেশের সুযোগ রুডইয়ার্ড কিপলিং কেবল তার লেখায় কাজেই লাগাননি, বরং এটি তার সৃষ্টিকে সহায়তাও করেছে। এবং যুদ্ধ ঘোষণার পর, ষাট লাখ ইংরেজ পুরুষ, যাদের অনেকেই বয়েসে ছিল খুবই তরুণ, যুদ্ধে যোগ দেয়; এদের প্রায় দশ লাখ হননের শিকার হন। আহত হয় তারচেয়ে ঢের বেশী।
“দ্য গার্ডেনার” একেবারে শেষ পর্যায়ে কিপলিং-এর এই সুতীব্র শোক এবং অন্তঃসারশূন্যতাকে ধারণ করে। মুহূর্তের জন্য তিনি এমন এক আশা লালন করেন যে তখনও বুঝি জন বেঁচে রয়েছে, সম্ভবত তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যদিও এই বিকল্প চিন্তাটিও ছিল খুবই ভয়াবহ। কারণ ধরা পড়লে জনকে কিপলিং-এর ছেলে হিসেবেই সনাক্ত করা হবে। জার্মানদের প্রতি ঘৃণার ব্যাপারে কিপলিং ছিলেন খুবই উচ্চনাদী। সেই সঙ্গে তিনি তাদেরকে জ্বরের লক্ষণ যুক্ত বলে উল্লেখ করতেন। তাই তার ছেলেকে অবশ্যই নিষ্ঠুর নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে। যে করেই হোক, বছর খানেক অনুসন্ধান অব্যাহত থাকে। এবং অতি মহান এই ব্যক্তির ছেলেকে উদ্ধারে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হয়। জনকে যুদ্ধে পাঠাবার জন্য কিপলিং নিজেও সক্রিয় ছিলেন। আর এবার তার দেহাবশেষ অনুসন্ধানে তাকেও অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়। অবশেষে, একজন সৈনিক এই সাক্ষ্য দেন যে সে জনের গায়ে একটি শেল-এর আঘাত লাগতে দেখেছে। সেই আঘাতে তার মাথার খুলি ভেঙে টুকরো হয়ে যাবার কারণে সন্দেহাতীতভাবে সে যুদ্ধে নিহত হয়েছে।
আমার মনে হয়েছে, গল্পটির সামর্থ্য নিহিত রয়েছে এই শিল্পীর নিজস্ব উপাদান আঁকড়ে থাকার মাঝে। যখন বুঝতে পারি নিজের অনুভূতির কাছাকাছি যেতে এবং গভীর একটি সত্য তুলে ধরতে গিয়ে তাকে কী করতে হয়েছে। এই উপদান ব্যবহারের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, ননফিকশন বা স্মৃতিকথা হিসেবে জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে কেবল সেই গল্পটিই বলা। কিন্তু জীবনী এবং গোটা নয় কি দশ পৃষ্ঠার মাঝে চূড়ান্তভাবে যা যা উন্মোচিত করতে হবে তার সঙ্গে এর বড় ধরনের একটি পার্থক্য রয়েছে। এখানে আপনারা জীবনকে শিল্পে রূপান্তরিত হতে দেখছেন। এভাবে লিখতে হলে এমন একটি নির্মিতির সন্ধান করতে হবে, কল্পনার চোখে দেখবার আগ পর্যন্ত নিজেই যা জানতে পারবেন না। আপনি জানেন আপনাকে একটি দরজা খুলতে হবে। আর এটি হলো তালা আঁটা সেই দরজার চাবি খোঁজার মতো। হুবহু, নানা ধরনের তালা খোলা যায় এমন কোন চাবির পাল্টা-প্রকৌশল অনুসন্ধান।
নিজের যে মিথ তাকে যুদ্ধের মাঝে টেনে নিয়ে গেছে তার থেকে মুক্তির অনুসন্ধানই কিপলিংকে খুব শৈল্পিকভাবে সঞ্চালিত হতে দেখা যায়।
বেশীরভাগ লোকের মতো, আমিও আমার অভিজ্ঞতার খোঁজ করি। আর আমার আবেগও সেই সব অভিজ্ঞতার প্রতি সাড়া প্রদান করে। হোক তা আকর্ষণীয় বা রহস্যময়, এমনকি খানিকটা অপমার জনক হলেও, এবং তা খানিকটা বিরক্তিকরও হতে পারে। একজন লেখক হিসেবে, আমি আমার অনুভূতি আর অভিজ্ঞতাগুলোকে পুরোপুরি ভিন্নভাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করি। এধরনের কিছু একটা আমাকে এর ওপর কর্তৃত্বপরায়ণ করে তুলে এবং অন্য লোকেদের কাছেও তা অর্থবহতা সৃষ্টি করে।
কিন্তু যখনই আপনি আপনার অভিজ্ঞতাগুলোকে কল্পনায় রূপায়িত করবেন। সেগুলোকে টেনে বড় বা ছোট করতে যাবেন, তখনই আপনাকে প্রাজ্ঞতার সোপানে পা রেখে, সর্বোচ্চ সম্ভাবনার খেলায় মেতে উঠতে হবে। তখনই আপনার স্মৃতির ওপর অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আপনি আপনার নিজস্ব কল্পনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবেন। যখনই আমি আমার বিগত জীবনের কথা কল্পনা করতে বসি এবং ভবি আদতেই বাস্তবে কী ঘটেছিল, তখনই সেই সব ঘটনা অবলম্বনে তৈরী আমার গল্পেরা এসে আমার স্মৃতিকে অস্পষ্ট করে ফেলে। গল্পের মাঝে, যেভাবে বাস্তবতা মিশ্রিত হয়, তারই ফল সরূপ কখনো সখনো তা বাস্তব জীবনের চেয়ে সত্য বলে অনুভূত হয়।
কিপলিং-এর ক্ষেত্রে, তিনি কখনই সমাধির খোঁজ পাননি। কিন্তু হেলেনের ক্ষেত্রে, মালী হয়ে, প্রভু যিশু তাকে পথ দেখিয়ে সেখানে নিয়ে গেছেন। কিপলিং-ও কি তার গল্পের নায়িকার মতো তাদের ছেলে হারাবার যৌথ দায়দায়িত্বের অপমান আর অবদমন থেকে এমন বৃথা ও অর্থহীনভাবে কোন প্রায়চিত্তের খোঁজ করছিলেনÑ সঙ্গে যুদ্ধকালীন আর সব লাখ লাখ মৃতের জন্য? বলা যেতে পারে সকল স্বশস্ত্র সংঘাতই জীবনের এক হাস্যকর এবং অপমান জনক অপচয়। কিন্তু নিষ্ফলা ইতিহাসে প্রথম বিশ^যুদ্ধের বিশেষ একটি স্থান রয়েছে। সুষ্পষ্ট কোন কারণ ছাড়াই, এই যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সারা বিশ^কে খুব ভয়ানক একটি অবস্থানে নিয়ে দাঁড় করায়। যা আমাকে “দ্য গার্ডেনার” গল্পটির মাঝে সঞ্চালিত করে। ঠিক একইভাবে কিপলিং খুব শৈল্পিকভাবে এর থেকে উপশমের সন্ধান করেছেন। যে অতিকথার (মিথ) দুষ্কর্মে সহযোগিতা তাকে যুদ্ধের দিকে ধাবিত করেছে তার থেকে ত্রাণের উপায় খোঁজেন।
এই গল্পের মাঝেই এর আভাসগুলো এবং একটি বোধ নিমজ্জিত রয়েছে। পড়বার সময় বার বার আমার মনে হয়েছে মাইকেল বুঝি হেলেনের নিজেরই ছেলে। তবে এমন পাঠকও রয়েছেন যারা হেলেনের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে মাইকেলকে আগাগোড়াই হেলেনের ভাইয়ের ছেলে বলে বিশ্বাস করে যাবেন। সেই সব পাঠকের জন্য, এই গল্পের মালীকে বলতে শোনা যায়, “আমি আপনাকে আপনার ছেলের কাছে নিয়ে যাব,” এই বলার মাঝে ভিন্নতা থকার পরও, এর অকাট্য প্রভাবে : প্রভু যিশু আমাদেরকে বলেন যেসকল সমাধি চিহ্নিত বা অচিহ্নিত রয়েছে, সেসব আমাদের ছেলেদেরই ধারণ করে আছে, সেই লোকশান এবং শোক সার্বজনীন এবং সীমানাবিহীন।
বাস্তবসম্মতভাবে গল্পটির উপস্থাপন এবং এর মাঝেই একেবারে শেষ মুহূর্তে প্রভু যিশুর আবির্ভাব, এই দুদিক দিয়েই আমাদেরকে সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। যদি শুধু পন্ডিতদের কথাই পড়ে থাকেন এবং গল্পটি পড়া না থাকে, তাহলে আপনিও একথা বিশ্বাস করবেন যে কারো কারো কাছে গল্পের শেষ অংশটুকু যথেষ্ট বিরক্তিকর বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে “দ্য গার্ডেনার” গল্পটিকে পুরোপুরি হৃদয়বিদারী বলে মনে হয়েছে। এবং এর সবশেষ অনুচ্ছেদে প্রভু যিশুর আবির্ভাব ধ্বংসহীন একটি বিশ্বের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাকে পুরোপুরি বোঝাতে সক্ষম হয়।
এই মালী একটি স্মারক। এটি এমন একটি স্মারক যাকে শিল্প খুব কমই রাজনৈতিক তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে। এবং এধরনের গল্পগুলো তাই কালোতীর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

দ্য আটলান্টিক ডেইলি অবলম্বনে
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com