আমাদের বেবী আপা

আনিসুর রহমান | ২৫ জুলাই ২০১৭ ৮:৩৮ পূর্বাহ্ন

baby.gifবদরুদ্দোজা মোঃ ফরহাদ হোসেন সংগ্রাম ভাইর সঙ্গে রিক্সায় করে সেগুনবাগিচায় একটি ছোট ছিমছাম দালানের দোতলা বাসায় আমরা গিয়ে হাজির। বেবী আপা বাসায় নেই। বাসায় আছেন বুয়া, বেবী আপার ছোট ছেলে পুটু, সম্ভবত বুয়ার ছেলে আনোয়ারও ছিল। পুটু মানে কি বেবী আপার পরিচিত সকলেই তার মামা। আমাদের দেখেই পুটুর উৎফুল্ল কথার ঝুড়ি- মামা আসেন, বসেন। আম্মুতো বাসায় নাই। কিন্তু এসে যাবেন শীঘ্রই। খানিকক্ষণ পর বেবী আপা আসলেন। বাসায় ঢুকার আগেই পুটুর মাধ্যমে খবর পেয়ে গেলেন- আমরা এসেছি। বেবী আপা বাসায় ঢুকলেন পরিচয় পর্বের পরে বললেন চা টা কিছু খাও। আজ তো রাত হয়ে গেছে। তুমি বরং ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে এসো। ওখানে বঙ্গবন্ধু যাদুঘরে আমার খোঁজ করো; দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ শেষ করে এসো। ক্লাশ মিস করো না।
পরের দিন যথারীতি আমি যাদুঘরে গিয়ে হাজির। পাশের বাড়ির একতলা একটা ভবনে বেবী আপার সঙ্গে আমিও গেলাম। ভবনের একটা কক্ষে একটা টেবিল আর গোটা কয়েক চেয়ার। তিনি আমার খোঁজ খবর জানলেন। তারপর বললেন-
বন্ধ হয়ে যাওয়া সাপ্তাহিক বিচিত্রা আমরা নতুন ব্যবস্থাপনায় বের করব। তার প্রস্তুতি হিসেবে আসন্ন জাতীয় শোক দিবসে ১৫ আগস্টে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ নামে একটা স্মরণিকা প্রকাশ করব। আমার সঙ্গে তেমন কেউ নাই; কম্পিউটার কম্পোজের জন্যে আছে চম্পক। পুরো কাজটা আমি আর তুমি মিলে করব। আসলাম সানীও আমাদের সঙ্গে থাকতে পারে। তোমার কাজ হবে জুতো সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ। শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং বিচিত্রা দুটোরই সম্পাদক থাকবেন শেখ রেহানা। আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আপা শ্রদ্ধাঞ্জলির কাজের সঙ্গে আমি থাকব। কিন্তু বিচিত্রার কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া আমার জন্যে কঠিন হবে। সে দেখা যাবেনি। ও নিয়ে ভেবো না।
বেবী আপা, সানী ভাই আর আমি, আমরা তিনজনে মিলে দৌড়ঝাপ করে নানা জনের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করে ১৫ আগস্টের আগেই শ্রদ্ধাঞ্জলির কাজ গুছিয়ে আনলাম। প্রুফরিডিং, ডামি এই কাজগুলো বেবী আপা আমাকে হাতে ধরে শেখালেন। প্রতিষ্ঠিত বরেণ্য নামীদামী লোকের কাছ থেকে স্বল্প সময়ে লেখাগুলো সংগ্রহ করতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল।
শ্রদ্ধাঞ্জলির কাজে আমরা সেগুনবাগিচায় মুস্তাফা জব্বারের আনন্দ কম্পিউটারে বসে বসে প্রুফ দেখতাম। ট্রেসিং বের হতো কি হতো না, কম্পিউটারের অবস্থা ভালো ছিল না। ১৫ আগস্ট এসে যাচ্ছে, আমরা ভয় পেয়ে যেতাম। নাওয়া খাওয়া রেখে আমরা কাজ করতাম। মাঝে মাঝে বেবী আপা ব্যাগ থেকে টাকা বের করে সানী ভাই আর আমাকে বলতেন যাও গিয়ে সিঙ্গারা নিয়ে এসো।
শ্রদ্ধাঞ্জলি বের হলো। আমরা প্রথম পরীক্ষায় পাশ করে গেলাম। ১৫ আগস্টে বেবী আপার চোখেমুখে কি উচ্ছল হাসি হাসি ভাব। ১৫ আগস্টে আমিও গিয়েছি ৩২ নম্বরে। তিনি আমাকে ইশারায় কাছে ডেকে নিয়ে বললেন- কালকে ক্লাশ শেষ করে এখানে চলে এসো। দরকারি কিছু কথা বলব তোমাকে। শ্রদ্ধাঞ্জলি বের হবার পরে আমি অনেকটা হালকা বোধ করতে শুরু করেছি। পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করব। দুই একটা টিউশনি করে পেট চালিয়ে নিব কোনো মতে; ওই সময়ে ১৫০০ টাকায় দিব্যি আমার মাস চলে যেত। ১৬ আগস্ট আমি এসে হাজির। বেবী আপার সঙ্গে ৩২ নম্বরে সাপ্তাহিক বিচিত্রার অফিসে দেখা।
তিনি আমাকে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন, সেখানে সাপ্তাহিক বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে বেবী আপার স্বাক্ষরে একটা নিয়োগপত্র।
আপা, আমার নিয়োগপত্রের দরকার নাই। আমি চাকরিতে যোগ দিতে চাই না। পড়াশোনাটা ভালোভাবে শেষ করতে চাই।
তোমার চাকরিতে যোগ দিতে হবে না। কাগজটা রাখো। ক্লাশ শেষে দুপুরের পরে ঘন্টা দুয়েকের জন্যে এখানে আসবে। সবাইকে তো আর বিশ্বাস করা যায় না। তোমার মত বিশ্বস্ত একজন আমার খুব দরকার। সকালের দিকটায় আমি থাকব। বিকালের দিকটায় আমি ইত্তেফাকে চলে যাব। এখানে উল্লেখ্য বেবী আপা তখনও দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করতেন। ‘মহিলা অঙ্গন’ বিভাগটি উনিই সম্পাদনা করতেন। কাগজটা হাতে নিয়ে দেখি তিনি আমার বেতন ধরেছেন ৩৩০০ টাকা। একজন প্রভাষকের বেতন তখন ২৮০০ টাকা স্কেলে। আমি তো অবাক। এতো অনেক টাকা।
বেবী আপার কথা মতো ভালোই চলছিল। সেপ্টেম্বরে এক তারিখে প্রশাসন যাদুঘর থেকে এসে নতুন যোগ দেয়া রাশিদা বেগম আসমা আমাকে ডেকে নিয়ে ১৬৫০ টাকা ১৫ দিনের বেতন দিলেন। আমি বললাম কিসের বেতন? বেতন তো পাবার কথা সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে। তিনি বললেন- আমি কিছু জানি না। বেবী আপা দিতে বলেছেন।
এরপর দিন যায় আমার কাজ বাড়ে আর বাড়ে। পড়াশোনা লাঠে উঠার অবস্থা। বেবী আপা অন্য কারও উপর নির্ভর করতে ভয় পান। আমাদের অফিস ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে, ব্যাংক মতিঝিলে। প্রতিদিনের ব্যাংকে যাওয়া আমার কাজগুলোর একটা। বেশির ভাগ দিন বেবী আপা একটা স্কুটার নিতেন ইত্তেফাকের জন্যে, আমাকে বলতেন ওঠো। আমাকে মতিঝিলে ব্যাংকের সামনে নামিয়ে দিয়ে উত্তেফাকে চলে যেতেন। এর মধ্যে বিচিত্রা অফিস জমে উঠেছে; বারোয়ারি কারখানা হয়ে গেছে। বেবী আপা কান কথা সহজেই বিশ্বাস করে ফেলতেন। এটা টের পেতে আমার বেশ কিছুদিন লেগে গেল। ঠিকঠাক মতো কাজ শেষ করে হলে চলে যেতাম। কেউ একজন বেবী আপাকে ফোন করে বলতো- ছেলেটা কাজটা শেষ না করেই চলে গেছে। এরকম বেশ কবার হবার পরে বেবী আপা আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন। আমি ব্যাপারগুলো বুঝিয়ে বললাম। উনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন, এরপর যতদিন ছিলাম বিশ্বাসের হেরফের হয় নি। এরপর যেই আমার বিরুদ্ধে ওনার কাছে কেউ কিছু বলতো তখন উনি বলতেন- তোমাদের যা বলার বলো; ছেলেটা সৎ এবং বিশ্বস্ত।
সালটা ১৯৯৮-১৯৯৯। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী যিনি বেবী আপার ঘনিষ্ট বান্ধবী। প্রেসক্লাবে অনেকেই এ নিয়ে বেবী আপাকে শুনিয়ে টিপ্পনী কাটতো, জাফর ওয়াজেদ তো দৈনিক মুক্তকণ্ঠে ‘আপু তোমার বান্ধবী’ নামে একটা কবিতা প্রকাশ করে ফেললেন। কেউ কেউ পিএম এর সাথে মিলিয়ে বিএম বলে উনাকে ঠাট্টা করতো। বেবী আপা কোনো কিছুই গায়ে মাখতেন না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে কোনো অযাচিত সযোগ সুবিধা নিতেন না।
বিচিত্রায় মাঝে মাঝে মজাদার রান্না হতো। বেবী আপা রান্নাবান্নার তদারকি করতেন। সেই খাবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর জন্যে পাঠাতেন। কে নিয়ে যাবে সে খাবার? তিনি আমাকে নির্বাচন করলেন। বেবী আপা অন্য কারো উপর ভরসা করতে চাইতেন না। বেবী আপার স্নেহ ও আস্থা থাকার পরও বিচিত্রার পরিবেশে আমার মন উঠে গিয়েছিল। একবার এক উর্ধ্বতন সাংবাদিক তার টেবিলের সামনে বসিয়ে লেখা সংশোধন করতে করতে আমাকে একটা ভুল ধরিয়ে দিয়ে বললেন এটা কি লিখেছেন? আমি বলেছি, দুঃখিত ভুল হয়ে গেছে। তিনি বললেন- শুনুন, ভুল এক জিনিস, আর বদমায়েশী আরেক জিনিস।
তখন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, না, এই পরিবেশে আর কাজ করা যায় না। উর্ধ্বতনদের ক্ষোভ একটাই–বেবী আপা আমাকে এত বিশ্বাস করে কেন? ছেলেটা দুই ঘন্টার জন্যে এসে মাস মাস বেতন নিয়ে যাবে? একদিন পদত্যাগ পত্র লিখে বেবী আপাকে কাঁপা কাঁপা হাতে দিলাম।
বেবী আপা কাগজটা হাতে নিয়ে ছিড়ে ঝুড়িতে ফেলে দিয়ে বললেন- তোমার সমস্যাটা আমি বুঝেছি। যখন ছুটির দরকার ছুটি নেবে। পড়াশোনার যাতে ক্ষতি না হয় সেই দিকটা খেয়াল রেখো। অন্য কোনো সমস্যা থাকলে আমি দেখব।
বেবী আপা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্টজন হবার কারণে নানা জন নানা ফন্দি ফিকিরে বিচিত্রা অফিসে আসতো। এরকম অনেকেই বেবী আপার সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। সেই তারাই আবার বেবী আপার অগোচরে তাঁর বদনাম করেছে।
১৯৯১-১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে একটা কেলেংকারির দায়ে সরকারী আমলা আবু আলম শহীদ খান শাস্তি ভোগ করছিলেন। উনি বেবী আপার পেছনে লেগে থেকে সেই শাস্তি থেকে পার পাবার চেষ্টা করছিলেন। আলম ভাইর লেখার হাত ছিল চমৎকার। উনি অনেকটা শ্রম দিয়েছিলেন বিচিত্রিার জন্যে। কিন্তু মানুষ হিসেবে ওনাকে খুব চতুর মনে হয়েছিল। আলম ভাইর সহকর্মী আমলা উবায়দুল মুতাদির চৌধুরী, আফরোজা বেগমসহ আরো অনেকেই ভিড় করতেন বেবী আপার চারপাশে। সেই আলম ভাইর আকাশের মেঘ কেটে গেল, তিনি পূর্ণ সচিব হিসেবে অবসর নিলেন। বেবী আপা আক্ষেপ করে বলেছিলেন- এই আলম আমার কোনো অনুরোধ শুনে না। এরকম হাজারো ঘটনা তদবিরের অনেক বদনাম বেবী আপার বিরুদ্ধে। কিন্তু আদতে তো কিছু রেখে যান নি তিনি। যে বাসায় শেষ জীবনে থাকতেন ওটা পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত। স্বস্তিদায়ক সত্য হলো যাদেরকে কেন্দ্র করে বেবী আপার বিরুদ্ধে এত রটনা সেই শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জানতেন বেবী আপা কতটা নির্মোহ ছিলেন।
নানা সংগ্রাম, চড়াই উৎরাইয়ের কারণে বেবী আপার ব্যবহারে অনেকে সহজেই ভুল বুঝে ফেলত।
শেষতক আমি বিচিত্রা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপরও আমার স্ত্রী রাশিদা বেগম আসমা বেবী আপার খুব কাছের স্নেহভাজন হবার কারণে রাশিদার কাছ থেকে অনেক খবর পেতাম। হঠাৎ করে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন। তিনিও আমার স্ত্রীর কাছ থেকে আমার খোঁজখবর জানতেন।
শেষ দিকটায় উনি ক্ষমতার খুব কাছাকাছির হবার কারণে আমি ইচ্ছা করেই ওনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি নি। আজ বুঝি- বেবী আপার সঙ্গে পরিচয় না হলে- জীবনের একটা অধ্যায় অজানা থেকে যেত, ভালো কি মন্দ সে প্রশ্ন নয়। অই সময়, অই দরদী স্নেহমাখা সময় ও বেবী আপার কাছে আমি ঋণী। কথাটা বেবী আপাকে বলা হলো না।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জয়দত্ত বড়ুয়া — জুলাই ২৫, ২০১৭ @ ১২:০০ অপরাহ্ন

      কৃতজ্ঞতা স্বীকার একটা বড় গুণ। লেখককে অনেক ধন্যবাদ। এই সময়ে বেবী মওদুদের মত মানুষের খুবই প্রয়োজন ছিল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com