উপেক্ষিত সমুদ্রের টানে

আনিসুর রহমান | ১৯ জুলাই ২০১৭ ৯:৫৯ পূর্বাহ্ন


somudra gupta
কবি সমুদ্র গুপ্তের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল ১৯৯৭ সালের দিকে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; কবিযশপ্রার্থী। পরিচয়ের শুরুতেই তিনি এমনভাবে কথা বলছিলেন তিনি যেন কত আপন আত্মীয় আমার।
একদিন তিনি হঠাৎ করে বললেন – সমুদ্র গুপ্ত আমার লেখক নাম। আমার ভালো নাম কি বল তো?
-জানি না।
আবদুল মান্নান বাদশা।
জন্ম তাঁর সিরাজগঞ্জে। আমার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে। যমুনার দুই ধারের দুই প্রজন্মের দুই জন আমরা। একদিন তিনি বললেন- তুমি তো আমার এলাকার পোলা।
কেমনে?
অই অইলো, নদীর এইপার আর অইপার।
তাঁর ব্যক্তিগত আলাপচারিতা এমনই আপন করে নেয়ার তাগিদ-ভরা ছিল।
এরপর যতবার কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে, সিরাজগঞ্জ-টাঙ্গাইলের মেশানো আঞ্চলিক টানে কথা বলতেন।
কবিতা উৎসবের অনেক ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি ছোটবড় অনেক কবির কাঙালপনা আমাকে পীড়া দেয়। এই পীড়ায় সমুদ্রদাও পীড়িত ছিলেন। এসব আবার তিনি শিশুর মত করে বলতেন।
দেখলে তো?
কি হলো?
আমার দেখা দুজন কবি, যারা ঢাকা শহরের সাহিত্য পরিম-লের অলঙ্কারের মত। যারা প্রথমত কবি, তাদের জীবনে যাপনে বলনে, চলনে, ধ্যানে, জ্ঞানে, শয়নে, স্বপনে, নিদ্রায় আর জাগরণে। এদের একজন হলেন আমাদের নির্মলেন্দু গুণ। অন্যজন ছিলেন সমুদ্রদা। গুণ দা এবং সমুদ্রদার কবি পরিচয় ছাড়া আর কোনো পরিচয়ের দরকার নাই। দরকার ছিল না। তারা যেন নগরের অবৈতনিক আবাসিক কবি, পয়েট লরিরেট ।
একজন ব্যক্তি মানুষ, একজন কবি- কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে কবিতায় সংসার সাজাতে পারে, নির্মম এই ঢাকা শহরে টিকে যেতে পারে তা এই কবিদ্বয় দেখিয়েছেন।
সমুদ্রদা আজ বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো সত্তর এবং তিনি ৭১-এ পদার্পণ করতেন। তিনি ২০০৮ সালে অকালে চলে গেলেন পরপারে আমাদের সকলকে ছেড়ে।
সমুদ্রদার সাথে আমার বয়সের ব্যবধান ছিল তিন দশকের বেশি। কিন্তু যখন স্নেহের হাতটা কখনো কাঁধের উপর রাখতেন তখন বয়সের পার্থক্য ভুলে যেতাম। এরকম বেশিরভাগ হতো যখন হঠাৎ করে তাঁর সঙ্গে আজিজ সুপার মার্কেটে দেখা হয়ে যেতো। এখন আজিজ মার্কেটে গেলে মনে হয় নাই, অনেক কিছু নাই, যা ছিল আগে, বইয়ের দোকানগুলোও যাই যাই। আজিজ মার্কেট হয়ে গেছে এক বারোয়ারি বাজার। আজিজ মার্কেটে যে যশ হারিয়েছে তা হলো আহমদ ছফা এবং সমুদ্রগুপ্তের মত সৎ নিবেদিত লেখক। আহমদ ছফা, সমুদ্র গুপ্তরা চলে গেলে অনেক কিছুই চলে যায়। আমরা কি তা টের পাই ঢাকা শহরের এই কর্পোরেট নির্ভর বেনিয়া সাহিত্যচর্চার সময়ে?
একবার বড়লোক এক সহকর্মীর বিয়ের দাওয়াত পেয়েছি। অনুষ্ঠান গুলশানে। অফিসের সকলের দাওয়াত। পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নাই। গিয়েছি আজিজ মার্কেটে। দেখা সমুদ্রদা’র সঙ্গে। তুমি এখানে কি করো? একটু ঝামেলায় পড়েছি, কি করব বুঝতে পারছি না। তোমার আবার কিসের ঝামেলা? আমাকে বলো।
বড়লোকের ছেলের বিয়ের দাওয়াত। কি দেব? অত সামর্থ্যও নাই। আবার আত্মমর্যাদা আর সামাজিকতাও রক্ষা করতে হবে।
– তা ঠিক। বড় লোকের তো সবই আছে। যা নাই আক্কেল। এক কাজ করো কয়েকটা বই কিনে নিয়ে যাও। বইগুলো পড়ে কিছুটা যদি আক্কেল হয়।

তিনি একবার তার প্রকাশিত সাতটি কাব্যগ্রন্থের সমন্বয়ে সাত সমুদ্র নামে একটা বই প্রকাশ করলেন। সুন্দর এক প্রকাশনা, বইটির বেশকিছু সংখ্যা তিনি নিজে চেনাজানা লোক ও অফিসে বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন। এটা তাঁর সংসার চালানোর একটা উপায়। তিনি বেশ সফলও হয়েছিলেন। বইটার দাম ছিল ৩৫০ টাকা। তিনি আমাকে বইটা দিতে চাইলেন, আমি বললাম, দাদা আমি এটা কিনতে চাই, এখন তো ৩৫০ টাকা নাই।

তিনি বললেন- রাখো একটা। আমি বললাম- আমি নেব।

মনে করে নিও কিন্তু। এখানে বলে নিই আমি যে সময়ের কথা বলছি ওই সময়ে আমি জহুরুল হক হলে থাকতাম এবং এক হাজার টাকায় একজন ছাত্রের মাস চলে যেত। ৩৫০ টাকা আমার আলাদা করে জমানো আর হয়ে ওঠে না, বইটাও নেয়া হয়ে ওঠে না।
সমুদ্রদার সঙ্গেও সংকোচে আর যোগাযোগ করি না। কম বয়সী লাজুকতা।
এরপর ছাত্রাবস্থায় চাকরিতে যোগ দেবার কারণে আমার আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার কারণে সমুদ্রদার সঙ্গে যোগাযোগের উন্নয়ন ঘটে নি।
একদিন সামাদ স্যার বললেন, সমুদ্রদার সঙ্গে তোমার যোগাযোগ নাই? আমি বললাম-অনেক দিন হলো যোগাযোগ করতে পারি না।
স্যার বললেন- পারো না মানে ওনার বাসায় যেও। ফোন করো। কোনো কাজে টাজে লাগলে সমুদ্রদাকে বলো যাতে উনি কিছু টাকা পয়সাও পেতে পারেন। উনি তোমাকে পছন্দ করেন।
এর পর একদিন ওনার কলা বাগানের বাসায় গিয়ে হাজির। ফোন না করেই গিয়েছি। ইচ্ছে করেই, সমুদ্রদার বাসায় যাবো- ফোন করে যেতে হবে? গিয়ে দেখি, উনি বাসায় নাই। ভাবি বললেন- তুমি বসো, উনি এসে যাবেন। আমি বসলাম।
একটু পরে উনি আসলেন, ভাবি দরজা খুলে বললেন- আনিস এসেছে। তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে।
আমাদের আনিস?
ওকে চা টা কিছু খেতে দিয়েছো? এই বলে তিনি আমাকে মাথায় হাত দিয়ে বললেন- কতদিন দেখা হয় না। তুমি কেমন আছো? দাদাকে ভুলে গেছ? পড়ালেখা কেমন চলছে? লেখালেখি কেমন চলছে? চাকরি কেমন লাগছে? তারপর দীর্ঘক্ষণ সমুদ্রদার বাসায় মেঝেতে বসে কথা। নানা জেলার গল্প তাঁর মুখে। উনি জাপান থেকে ফিরেছেন, সেই গল্প।
তিনি বললেন বিদেশের জীবন বটে। বিদেশে কেউ যায়? আর বলো না যন্ত্রের জীবন। ভুলেও এ কাজ করো না, লেখালেখি করতে চাও তো দেশেই থেকে যেও। তারপর আমি চলে আসবার জন্য উঠেছি- উনি দরজা পর্যন্ত এলেন বললেন- তোমার দাদাকে মনে রেখো বলে রাখলাম কিন্তু।
আরেক দিন সমুদ্রদার সঙ্গে দেখা আজিজ সুপার মার্কেটেই। তিনি ক্লান্ত শ্রান্ত বিধ্বস্ত। দাদা, কেমন আছেন? ভালো আছি, খুব ভালো আছি। না, দাদা, আপনি ভালো নাই। কি হয়েছে বলুন, অনেকটা অধিকারের জোরে চেপে ধরলাম। আমার আন্তরিক চাপাচাপিতে তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরেছিল। বাকিটা তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন ছোটভাইয়ের মত বিশ্বাস করে, আমি সে বিশ্বাস ভঙ্গ করব না।
একজন মানুষ কতটা স্পর্শকাতর হলে তার চলায় ও বলায় নগরের পথে হাসি ও অশ্রু ঝরে। তার উদাহরণ আমাদের সমুদ্রদা, কবি ও মানুষ বটে।
কবিতার জন্যে জীবন উৎসর্গ করা সেই সমুদ্রদাকে এই ঢাকা শহর চিনে নি। মূল্যায়ন করে নি। আহমদ ছফার মতো তাঁকেও বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয় নি। এটা তাঁর প্রাপ্য ছিল। না পাওয়াতে তাঁর নিজের কোন খেদ ছিল না।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shopno samudra — জুলাই ১৯, ২০১৭ @ ১:৩৮ অপরাহ্ন

      আপনার লেখা পড়ে ভাল লাগল…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Offer in Bangladesh — জুলাই ১৯, ২০১৭ @ ২:১৫ অপরাহ্ন

      Ei adhonok jibone manush kobita pore na porte chaina…… abar dorkare kobitar doi ekta line bole manush ke impresse korar jonno……..nije gani ebong valo manush shajar jonno…….je kahe kobir sristy kobitar mullo nai …….shekahne kobir abar mullayon……Amra kokhonoi srijonshil manushder mullayon kori na…….ar bideshi kew kiso korle tar udahor dey je or moto hoto hobe……..but amader keow nijer moto kiso korle tar mullayon na kore …tar icha ke domiye dey………

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Al Amin Chowdhury — জুলাই ১৯, ২০১৭ @ ৫:৩৮ অপরাহ্ন

      Somodro da, He was my senior associate. We work at News agency Media syndicate. He was like my teacher. In my eye he was a brilliant Editor. I learn more word from. I always use it. I donot forget him. Allah Sohay hone….

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dilruba Shahana — জুলাই ২২, ২০১৭ @ ৭:৪৮ অপরাহ্ন

      Lekhati valo laglo bol le kom bola hobe khub valo legechhe. Kobi shomporke janlam.Thanks to bdnews and author

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com