মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাকের নয়টি কবিতা

মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক | ৯ জুলাই ২০১৭ ১১:৪৭ অপরাহ্ন

কবিতার ঈশ্বর

লাবণ্য দেয়নি তারে নীলিমার নীল জলছায়া
পথগুলো হারিয়েছে পথ। শপথের কথা ভুলে
বনলতা সরে গেছে দূরে। সময়ের পালতুলে
অশ্বত্থ ডুবেছে জলে রেখে গেছে এক ছল-মায়া।

হাজার বছর ধরে পথে পথে খুঁজেছেন কবি
জীবনের সাদা ছবি। আমলকি–কাঁঠালের তলে
লুকিয়েছে অহংকার। কবিতার শব্দে–কথাচ্ছলে
করেছে প্রণাশ প্রশ্ন। পায়নি কিছু হারিয়েছে সবই।

অবিরাম পিপাসার ভারে, অন্ধ চেতনার ঘোরে
নির্বাক পৃষ্ঠায় খুঁজেছে চৌকাঠ। পৃথিবী খোলেনি
তবু তার দ্বার। কামাক্ষার কুঞ্জে কখনো দোলেনি
মহুয়ার আধা রাত। সত্যসূর্য ওঠে নাই ভোরে।

অতঃপর কমলা বিকেলে ওঠে এলোমেলো ঝড়
পথে পড়ে থাকে এক কবিতার অচেনা ঈশ্বর।

জলভাঙা যমুনার জল

চেয়েছিলে শর্তহীন সমর্পন। অসীম সমুদ্র হয়ে বয়ে গেছি আকাশের বুকে। কখনোবা মৃত্তিকার পরতে করেছি গন্ধমের সুবাস সন্ধান। নিষিদ্ধ নগরে হেঁটে খুঁজেছি অবাক রোদের ঝংকার। পোড়ামাটি মন নিয়ে আঁচলের উত্তাপ পেরিয়ে দাঁড়িয়েছি মাঝ দরিয়ার পিড়ামিডে। উড়িয়েছি ফসলের ধ্বনি, প্রতীক্ষার রথে বসে দেখেছি সকাল- দেখেছি রাতের রাঙা ঠোঁট। নির্জনে একাকী বসে ধুপকাঠি জ্বেলে করেছি অনেক মৃত্যুর উৎসব। কত কলরব উড়ে গেছে আশপাশে, পরবাসে চলে গেছে দুপুরের ঢেউ। পেরিয়েছে মহাকাল বালুচরে কেঁপেছে নদীর নথ। পথগুলো হয়ে গেছে ঝড়ো হাওয়া। এ বেলায় ও বেলায় এ পাড়ায় ও পাড়ায় হয়েছে অনেক লুকোচুরি খেলা, তীর্থপথে হেঁটে হেঁটে নগ্ন পায়ে বিঁধিয়েছি সুতাহীন একতারা। তারপরও একে একে ভেঙে গেছে শ্রাবণের শত গ্রাম। জলের পরশে পুড়ে গেছে পুঁথিমালা। অতঃপর পেছনে তাকিয়ে দেখি পথে পথে পড়ে আছে অযুত-নিযুত প্রশ্নের পালক। হঠাৎ জানতে ইচ্ছে করে–এখনো কি অপলক চেয়ে থাক জলভাঙা যমুনার দিকে?

অনুত্থান

সূর্যের ফুটো দিয়ে উঁকি দ্যায় অন্ধকার। ভেঙে পড়ে পরিযায়ী পাখিদের ঘর। কুপির আলোতে কৃষাণীর চোখ দ্যাখে লাঙলের সর্বহারা হবার ঐশ্বরিক উপাখ্যান। ছেঁড়া শাড়িগুলো প্রসারিত হতে হতে হয়ে ওঠে পাহাড়ি পাথর। ওগুলো কখনো হতে পারে নাই কাথার শরীর। এই অবসরে নাগরিক কবিগণ মস্তিষ্কের কোষগুলো সচল করতে ছোটে কোম্পানির কাচ ঘরে। সাদা চশমার পরতে পরতে কালো পর্দা সেটে দ্যায় পুরাতন পুরোহিত। চেতনার চারদিকে গল্প ছড়ায় পানিখোর পাবলিক। অলসতা ভেঙে রূপকথা ফের কথা বলে প্রদোষ বেলায়। চাঁদ মামা গুডবাই বলে শুয়ে পড়ে নিরাকার বিছানায়। অবাক করার মত বহু ঘটনাই ঘটে এ ঘাটে সে ঘাটে সকাল দুপুর ও সন্ধ্যারাতে। রাতেরা লুকিয়ে থাকে রাতের গুহায়। পত্রিকার পাতাজুড়ে লিখা হয় আদিম গল্পের ইতিকথা। ছাপাখানা হয়ে ওঠে ছাও পোষা কারখানা। ছাপ্পান্ন হাজার বাঁশঝাড়ে জেগে ওঠে জিন্দাবাদ। বিপ্লবের পাঠশালায় পড়ানো হয় পাট ক্ষেতে সঙ্গমের সাদামাটা গল্প।

পথ হারাবার গল্প

পথের মাঝে পথটা গেলো হারিয়ে
দেয়নি পথে হাতদুটো কেউ বাড়িয়ে
জলগুলো যায় জলের জীবন মাড়িয়ে
পথের মাঝে তাও থাকি তো দাঁড়িয়ে

দাঁড়িয়ে পথে দেখতে থাকি পথের শতরূপ
পথ হয়ে যায় পথের মতো নিতান্ত— নিশ্চুপ
শিশিরমাখা সকাল বেলায় পথ হয়ে যায় গুম
পথের বুকে নাচ করে না নবান্ন মৌসুম

লতার মত সবকিছু যায় ছাড়িয়ে
আগ বাড়ালে দেয় তখন-ই তাড়িয়ে
কোথায় যাব ধরবো কাকে জড়িয়ে
জীবনটা যায় গড্ডালিকায় গড়িয়ে

কাকাতুয়ার কাফনটাকে পরিয়ে
পরিশেষে
পাঠিয়ে দিলো গাধার পিঠে চড়িয়ে

প্রত্যয়

আগন্তুক সময়ের কাছে আজ আর নেই কোনো
পার্থিব প্রার্থনা। সময়ের সোজা বাঁক ঝরে যাক
সময়ের স্রোতে। স্নানের পূর্ণতা নিয়ে উড়ে যাব
ঊষর মৃত্তিকা থেকে দূরে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে।

পরিযায়ী পাখি হবো মেঘেদের পেয়ারা বাগানে
ছড়াব শ্লোগান। একছত্র প্রেমপত্র চোখে এঁকে
বাজাব ট্রেনের অদ্ভূত হুইসেল। পথ হারা পথে
একিপোলাসের কন্যাদের কাছে শুনব মিথ্যে গান।

মৃত্যুর দেয়াল ভেঙে দাঁড়াব মৃত্যুরই উপকূলে
সমুদ্রের কুমারিত্ব কেড়ে ওড়াব শস্যের রঙ
পূর্ণিমার পাখা মেলে আঁকাব সন্ধ্যার কথামালা
পরিত্যক্ত বরমাল্যে পুনর্বার ছোয়াব শিশির।

শরীরের ঘাম খুলে পাল তুলে ছোটাব সাম্পান
জলের আগুনে নেমে এই ঠোঁটে জ্বালাব চুরুট।

সবকিছু বদলে যাবে

সব কিছু বদলে যাবে। বিদ্যাবান পতিগণ হবে গতিহীন গ্রহ বিত্তহারা হয়ে তারা খেলার লাটিম হবে। গ্রন্থের নির্ভার প্রচ্ছদেরা হবে মূত্রালয়। মুদ্রণের ভ্রƒণ ভেঙে জাগবে না সাদাশিশু। পবিত্র পিতার আঙুল ওড়াবে দিন বদলের ভঙুর কলস। রাখালের গৃহকোণ হবে গৌরবের গোরস্থান। মানুষের সঙ্গে মানুষের কথা হবে জনহীন জনপদে। অলস প্রহরে গরম পেয়ালা ছেড়ে চা-পাতারা উড়ে যাবে চণ্ডালের চালাঘরে। মহুয়ার ডালপালা হবে পৃথিবী ছাড়ার পদ্মাসন। পোড়া বাড়ি কাঁধে তুলে মাঠের মজুর হবে স্লোগানের ভাড়াখাটা বন। বিদ্যাবান পতিদের প্রতিশ্রুত মন্ত্রপড়া মাগিগণ হবে সকালের কালোবাতি।
সবকিছু বদলে যাবে অনুভবে উড়বে না উপনিষদের শুভ সমাচার। আচারের ভাণ্ড ভেঙে তেলগুলো হবে প্রশিক্ষকদের বিদ্যাপীঠ। বিদ্যায় বিমুদ্ধ নারীগণ হবে আর্যত্বের আশ্চর্য ভাস্কর্য তাদের মাতৃত্ব বুক হবে ঘুঘু মারা ফাঁদ। তাদের আহ্লাদ হবে আসনের আসবাব। যে নারী কবিতা লিখে যে নারী ফুলের শেকড়ে জাগায় জীবন যে নারী বৃষ্টিকে আঁচলে বেধে করে সৃষ্টির উৎসব তার ছায়াপথে বিনির্মিত হবে পতিত্বের কালো সন্ধ্যা। প্রাচীন প্রাচীরে সমাহিত তার উপবাসী ওষ্ঠ ফেটে হবে পথিকের উষ্ট্রযান। সবকিছু বদলে যাবে, গোলাকার পৃথিবীটা হবে চ্যাপ্টা তক্তপোষ। ওখানে কখনো জন্মাবে না নাইট কুইন কিংবা চন্দনের চাঁদমাখা গ্রাম।

ভাবনার ভগ্নাংশ

ইচ্ছে হলে হাতিভর্তা দিয়ে ভাত খাব। কলমি শাকের সাথে মাখাব রাতের অন্ধকার। পূর্ণিমার প্রান্ত ভেঙে নগ্ন নখাগ্রের শীর্ষে ওড়াব প্রেমের পাঠশালা। নামতার পুস্তিকা মুখস্থ করে এক এক্কে এক না বলে বলবো এক গুন এক সমান সমান তিন ছয় কিংবা নয়। পাঁচ পায়ে হেঁটে হেঁটে উড়ে যাব কৈবর্ত পর্বতে। সূর্যের জলের সাথে সন্ধি করে মেঘস্রোতে ভাসব সাম্পান। পথে পথে থেমে দিব্যকের পিতৃত্বের পায়জামা খুলে গালি ছুড়ে দিব চারিদিকে। মৃৎপাত্রের মৃত্তিকার তাপে পুড়ে পুড়ে হব ইন্দ্রের স্টিমার। গৌতম ঋষির পদচিহ্ন মুছে অহল্যার নির্জন শয্যায় হব সমর্পিত। গানের আসর ফেলে সমুদ্রের ঢিলেঢালা জলে ছুড়ে দিব জলচোখ। ইচ্ছে হলে কাঠ বাদামের খোসা দিয়ে বানাব বনেদি প্রাসাদের আবদ্ধ খিরকি। ঈশ্বরের ছায়াপথে ওড়াব ট্রাম্পের টাটকা হাসি। পাখিসব যদি করে কলরব তাদের তস্কর চোখে ছুড়ে দিব খাপছাড়া ধূলি। অতঃপর কোনোদিন যদি কর্ণফুলি এসে দাঁড়ায় সমুখে তার ভাঙা বুকে রেখে দিব এক টুকরো আগুনের নিভে যাওয়া গল্প।

সাদা রঙের কালো মানুষ

বাঁশঝাড় ভেঙে যাক কানিবক পাপিয়া-পেঁচার ঝাঁক খুঁজে পাক মরুভূমি বিল। ক্লান্তির বিকেল বেলা কেড়ে নিক পৃথিবীর ঝাড়বাতি। আকাশের তারাগুলো এলোমেলো পথ ধরে ডুবে যাক হকিন্সের কালো কূপে¬আমার টেবিলে শুধু জেগে থাক একহালি চাঁদ। পথগুলো ভেঙে ভেঙে হয়ে যাক পাহাড়ের ফাঁদ। নারীত্বের সমস্ত আহ্লাদ খসে যাক জোয়ার ভাটার নগ্ন স্রোতে আমার পালঙ্কে শুধু পড়ে থাক রাঁধুনির লাল শাক। কবিতার কথামালা ছন্দের সতেজ ধ্বনি সাফ হয়ে যাক শ্রাবণের বাধভাঙা জলে শুধু বেঁচে থাক আমার পাঠের ঝর্নাধারা। বনের বৃক্ষেরা সব উড়ে যাক মাটির বন্ধন খুলে উলুবনে উড়ুক অজস্র শূন্যতার ধূলিঝড় আমার বাগানে শুধু মেঘেদের মন ছুঁয়ে সবাক দাঁড়িয়ে থাক আমরূপালির ঝাঁক। মাঠে ঘাটে রাজ্যপাটে সব কলরব হয়ে যাক বরফের মত নিশ্চুপ-নীরব। বিতর্ক সভার সভাসদগণ চলে যাক আমরণ অনশনে। প্রেমিক ও প্রেমিকার ফিসফাস হয়ে যাক ডুবন্ত লঞ্চের ক্ষয়িষ্ণু প্রলাপ শুধু বেঁচে থাক আমার সংলাপ। ফসলের সোনালি অঙ্কুর নোঙর করুক সমুদ্রের লাশ ঘরে ক্ষুধার উৎপাতে কাঁদুক শিশুর ঝাঁক ভেঙে যাক ভুট্টাদানা ভেঙে যাক পুঁই পালঙের শিশির রাঙানো রাত আমার পাতিলে শুধু পড়ে থাক দেবতার দেয়া মুঠো মুঠো দুধভাত।

পূর্ণলিপি

তখন শূন্যতা হয়ে ওঠে শারদীয় স্বরলিপি
পিপিলিকা প্রহরেরা ভুলে যায় সব অবহেলা
পুশকিন দাঁড়ায় সমুখে পাশের জানালা এসে
কথাকয় একগাল হেসে সমাধিতে ওঠে ঝড়

তখন শূন্যতা হয়ে ওঠে নীলিমার লাল টিপ
ব্যস্ত জনপদে বদ্বীপের বেদনারা হয়ে ওঠে
বহমান জলের উজান একঝাঁক কপোতাক্ষ
ছুটে এসে শোনায় স্নানের মাঙ্গলিক গল্পকথা

তখন শূন্যতা হয়ে ওঠে শ্রাবণের সন্ধ্যা-তারা
মৃত্তিকার ভেজাগন্ধ লুফে আত্মহারা মন ছোটে
রাবীন্দ্রিক রাঙাবনে ফুল বালিকার ভুল পথ
খুঁজে পায় প্রতিশ্রুতি তিথিদের টেরাকোটা চাঁদ

তখন শূন্যতা হয়ে ওঠে পূর্ণতার নভোযান
পথে পথে ওড়ে শুধু নির্মাণের অজস্র প্রণাম।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিনয় বর্মন — জুলাই ১০, ২০১৭ @ ১:৫৯ অপরাহ্ন

      কাব্যনবরত্নের কোমল দ্যুতি ছড়িয়ে পড়লো অন্ধকার মানসকোষে। জাগ্রত হলাম ধীরে ধীরে। এক নিবিড় ভালোলাগার অনুভূতিতে আবিষ্ট হলো সত্তা। ধন্যবাদ কবি মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক। ধন্য আপনার কবিতাপ্রয়াস।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হামীম ফারুক — জুলাই ১১, ২০১৭ @ ৩:৩৭ অপরাহ্ন

      অনবদ্য! প্রকৃতি, অনুভূতি, সৌন্দর্যবোধ মিলে মিশে একাকার। মন ছুঁয়ে গেল, কবি। আপনি ফেসবুকে আমার সঙ্গে যুক্ত আছেন, কিন্তু আগে আপনার লেখা পড়েছি বলে মনে পড়ে না। আবারো, মুগ্ধ!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — জুলাই ১৩, ২০১৭ @ ৯:২০ অপরাহ্ন

      এক কথায় চমৎকার! খুব ভাল লেগেছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com