মান্টো এবং ইসমত কিংবা গল্পলেখক ও অশ্লীলতা

নাহিদ আহসান | ১১ জুলাই ২০১৭ ১১:২১ অপরাহ্ন

ismat-chugtai-main‘মনে হয় সাহিত্য কর্মটা এক ধরনের টেনিস টুর্নামেন্ট যেখানে মেয়ে ও ছেলেদের ম্যাচ আলাদাভাবে খেলা হয়।’ উর্দু সাহিত্যের বিখ্যাত লেখিকা ইসমত চুগতাই্কে ইংরেজী সাহিত্যের জর্জ এলিয়টের সাথে তুলনা করাকে ব্যঙ্গ করে, উর্দু সাহিত্যেরই একজন সমালোচক এই মন্তব্য করেছিলেন ।
যদিও বিখ্যাত গল্পকার সাদত হাসান মান্টো ইসমতের এই নারী সত্ত্বাকে প্রশংসা ও কিছুটা ঈর্ষার চোখে দেখতেন। তার মতে নারী হবার কারণেই তার গল্পগুলো এত লাবণ্যময়। মান্টোর মতে ইসমতের গল্পে নারী চরিত্রদের মধ্যে যেসব ছলাকলা আছে তা পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য নয় । স্হূল শারীরিক তৎপরতার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এসব আত্মিক ইঙ্গিতের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের বিবেক। সেই ইঙ্গিতের সাথে সাথে ইসমত চুগতাই নারীর দুর্বোধ্য কিন্তু ভিন্ন স্বভাবকে বাঙ্ময় করে তোলে
ইসমত চুগতাই বিশ শতকের উর্দু সাহিত্যের একজন অসামান্য গল্পকার ।
রাজেন্দ্র সিং বেদী, সাদত হাসান মান্টো এবং কৃষণ চন্দর এমন সব প্রতিভাবান লেখকদের মধ্যে নিজস্ব সত্ত্বা, শৈলী , ভাষা ও চিন্তাভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন। বিখ্যাত উর্দু কথাশিল্পী ইসমত চুগতাই ছিলেন বরেণ্য গল্পকার সাদত হাসান মান্টো ও কৃষণ চন্দরের সমসাময়িক। কৃষণ চন্দরের ভাষায়, “ইসমতের কথা শুনলে পুরুষ গল্পকাররা ভয় পেতেন।’ এর কারণ সম্ভবত তারা নতুন যুগ ও ভাষা সম্পর্কে সেকেলে মানসিকতা পোষণ করতেন।’

আগ্রার চুগতাই পরিবারে ইসমতের জন্ম (১৯১১-৯১) । তার বাবা একজন বিচারপতি ছিলেন । তার বড়ভাই আজিম বেগ চুগতাই ছিলেন সে কালের খ্যাতনামা উর্দু লেখকদের অন্যতম। তার বাবা মির্জা কাশেম বেগ চুগতাই ছিলেন একজন স্বনামধন্য বিচারপতি। ইসমত রীতিমত সমাজ পরিবারের সদস্যদের সাথে লড়াই করে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। তিনি লক্ষ্মৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.টি. পাশ করেন। এরপর তিনি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও স্কুল ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। বোম্বের বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক শাহেদ লতিফ-এর সাথে বিয়ের পর ইসমত চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন। এই সময়েই তিনি তার বিখ্যাত ছোট গল্পগুলো লেখেন। তার সময় থেকেই উর্দূ সাহিত্য রোমান্টিক ঘোমটার আড়াল সরিয়ে বাস্তবতাকে চাক্ষুষ করে।

তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, ইসমতের শৈশব কেটেছে ছেলেদের মত খেলাধূলা করে। তিনি ছিলেন টমবয়।এর পেছনে তার বাবার প্রশ্রয় ছিল। এমন কি কিছুটা বড় হয়ে তার বাবা ও বাবার বন্ধুদের সাথে তিনি কুরআনের আলোচনায় অংশ নিতেন।

তবে তার গল্পের ভেতর যে সজীবতা, সুগন্ধ তা তার ভেতরকার মেয়ে সত্ত্বা ও ছেলেদের মত মুক্ত জীবনযাপন –এই দুই থেকেই সৃষ্ট। মান্টোর ভাষায়, ‘ইসমতের নারী সত্তা এবং পুরুষ প্রকৃতির মাঝে আজব ধরণের জেদ ও অসঙ্গতি বিদ্যমান। হয়তো প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন কিন্তু প্রকাশ্যে অনীহা প্রকাশ করে চলেছেন। চুমোর জন্য হয়তো মন আকুতি জানাচ্ছে কিন্তু চুমোর বদলে সে গালে সুঁই চালিয়ে দিয়ে মজা দেখবেন।’

তার ভাষা উচ্ছল ঝর্ণার মত মজার অদ্ভূত সব মন্তব্যের নুড়ি পাথরে টক্কর খেতে খেতে চলে। ইসমত নিজেকে সবসময় বাস্তববাদী লেখক বলে দাবী করতেন। তার ভাই বিখ্যাত গল্পকার আজিম বেগ চুগতাই ও তার সমসাময়িক গল্পকারদের নরনারীর প্রেমঘটিত আবেগঘন রোমান্টিক উপন্যাস নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তার গল্পের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন তিনি দায়বদ্ধ বাস্তবের প্রতি এবং শিল্পের প্রতি ।
তার গল্পের চরিত্রের মধ্যে আছে তার পরিবারের সদস্যরা। যেমন তার ভাইকে নিয়ে লিখেছেন ‘দোযখী’ গল্পটি ।
পরিবারে সব সদস্যরা্‌ই পুতপবিত্র আদর্শ চরিত্রর নয়। পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু বলার রেওয়াজ আসলে উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিতে নেই।পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গ আসলেই সবাই সেন্টিমেন্টাল হয়ে ওঠে। তাদের সবসময় আদর্শায়িত করার চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে ইসমত প্রথা ভেঙ্গেছেন বলা চলে।
তার এই গল্প পড়ে তা যথার্থ বলে মনে হয় ।যদিও এনিয়ে তাকে অনেক হেনস্হা হতে হয়েছে। সবাই তাকে অভিযুক্ত করেছে আপন বড় ভাইকে নিয়ে উল্টো পাল্টা লেখার জন্য। কিন্ত গল্পটি পড়লে বোঝা যায় এর শিল্প মাধুরী। তার যক্ষা আক্রান্ত ভাইয়ের প্রতি মমতা তার গালাগালের ভেতরই লুকিয়ে আছে ।একজন শিল্পীই এমন মমতা ও নির্মমতার পান্ডুলিপি লিখতে পারেন।
“এমন সত্য, এমন মিথ্যা, এত নিষ্ঠর, অতি নাজুক, অতি স্নেহ ভরা , বাজে ও সুন্দর স্কেচ সত্যিই বিরল’- জাফর আলম
তার যে গল্প নিয়ে তুলকালাম ঘটে যায়, তা হচ্ছে ‘লেহাপ’। একজন বৃদ্ধের তরুণী স্ত্রী কিভাবে গৃহভৃত্যের সাথে সম্পর্কে পতিত হয় তার বর্ণনা। সেখানে আছে সমকামী প্রবণতার কথাও। এমন ভয়ংকর বিষয়ের গল্প যে শিল্পসম্মতভাবে পরিবেশন করা যায় তা ইসমতের এই গল্প না পড়লে বুঝতাম না।
লেখার সময় তিনি নারী না পুরুষ, কোন পরিবারে জন্ম, সামাজিক দায়িত্ব এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। হ্যাঁ , তার একমাত্র দায়িত্ব ছিল বাস্তবতা ও শিল্পের প্রতি।

মান্টো একবার ইসমতের সাথে ‘লিহাপ’ গল্প বিষয়ে কথা বলতে চান। মান্টোর উদ্দেশ্য ছিল তার এই প্রতিভাবান সহকর্মীর সাথে এই গল্পের কলকব্জা নিয়ে কথা বলা। তিনি গল্পের একটা অংশ উল্লেখ করে বলেন, ‘ইসমত এটা আপনি কেন লিখলেন?’
মান্টোর মনে হয়েছিল, এখানে ইসমত শিল্পের নিটোলতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারেননি। এই অংশটুকু কিছুটা যেন অশ্লীল। ইসমতের গন্ডদ্বয় লাল হয়ে উঠল ও তিনি প্রস্থান করলেন।
ইসমত সবসময় নিজেকে পুরুষের মত মনে করেন। অথচ তার একজন সহগল্পকার যখন তাকে পুরুষের মত মনে করে কথা বলতে চাইলেন, তিনি আবার পিছু হটলেন। পরে মান্টো দুঃখ করে তার বউকে বলেছিলেন, “হায়, সে তো তোমাদেরই মত। নেহাৎই লজ্জাবতী মেয়ে । আমি তাকে অন্যরকম ভেবেছিলাম।”

মান্টো ও তাার স্ত্রীর সাথে ইসমত ও তার স্বামীর চমৎকার পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। দুজনের বিরুদ্ধেই দু্টি গল্প লেখার জন্য মামলা হয়েছিল। কিন্তু দুজনের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন। মামলার পর মান্টো তার স্ত্রীকে নিয়ে ইসমত ও শাহেদ লতিফের বাসায় আসেন।

এই গল্প নিয়ে মামলায় ইসমতের সাথে তার স্বামীর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছিল। সামাজিক এই অসম্মান শাহেদ লতিফ সহ্য করতে পারেন নি। কিন্তু মান্টো তার বিরুদ্ধে আনা মামলার বিষয়টি অনেকটা খেলোয়াড়োচিত ভাবে নেন। তিনি লাহোরে থাকতেন। মামলার জন্য কোর্টেও দাঁড়াতে হবে সে শহরে। তিনি শাহেদ লতিফকে আহবান জানান লাহোরে কবিত্বপূর্ণ ভাষায়:
Shahid be a man and come with us… the winter in Lahore is very severe. Aha! Fried fish with whisky…..fire in the fireplace like the burning flame in a lover’s heart ….the blood red Maltas are like a lover’s kiss.
তার বউ সুফিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তাকে ধমক দিয়ে চুপ করান।

আসলেও ইসমতের জন্য ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। তিনি একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মুসলিম মহিলা, তার বাড়ীতে পুলিশেএসেছে। ইংরেজ সরকার তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি অশ্লীল গল্প লিখেছেন। শ্বশুর ভয় পেয়ে চিঠি লিখেছেন ছেলেকে ।
তার বাড়িতে পুলিশ আসার মজার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। যখন তাকে সমনে সাইন করতে বলা হল,
তখন তিনি বাচ্চাকে বোতলের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। তিনি মনের ভুলে পুলিশকে দুধের বোতল ধরতে দিয়ে তার হাত থেকে কলম নিয়ে সাইন করতে চান। পুলিশ অফিসার ভীষণভাবে চমকে ওঠেন।
সেসময় ইসমতের কাছে বিভিন্ন চিঠিপত্র আসত যা কুৎসিত ভাষায় লেখা। এই ব্যাপারটি নিয়ে ইসমত খুব বিরক্ত ছিলেন। এই চিঠিপত্রগুলো তার স্বামীর হাতে যাক তা তিনি চাননি । ইসমত ভয় পেতেন তিনি আবার ডিভোর্সের প্রসঙ্গ ওঠাতে পারেন এই ভেবে।
ইসমত এদিকে ভয় পাচ্ছেন, অন্যদিকে আবার জেলখানার জীবন কেমন, এটা দেখারও তার কৌতূহল হত। লেখক মাত্রই জানেন, জেলখানার জীবন নিয়ে চমৎকার সব গল্প, উপন্যাস লেখা যায় ।
তিনি আবার ক্ষমাও চাইবেন না কারণ তিনি কোন অন্যায় করেননি । ক্ষমা চাইলে ইসমতকে এই আদালত বা মামলার ঝামেলা পোহাতে হতো না ।

দ্বিতীয় পর্ব

লাহোরে যাওয়ার পরপরই ইসমত প্রচুর নেমন্তন্ন পান । সবাই ইসমতকে দেখতে চায় যেন তিনি অদ্ভূত কোনো প্রাণী। লাহোরে মামলার শুনানির ফাকে ফাকে, এই দুই লেখক শপিংও করলেন। মান্টোর সাথে শপিং করার সময় তাদের কথাবার্তার কিছু নমুনা দেয়া হলো যাতে তাদের অদ্ভুত সম্পর্ক সম্পর্কে বোঝা যায় ।
‘শুনানির পরবর্তী তারিখ পর্যন্ত আমরা মুক্ত, স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। মান্টোর সাথে জুতো কিনতে গেলাম। মান্টোর পদযুগল দেখে আমি মুগ্ধ হলাম এবং আমার কর্কশ পাগুলো দেখে আমার চোখ ফেটে কান্না আসতে লাগল।
ওদিকে মান্টো বলে কি, তার পাগুলো তার মোটেও পছন্দ নয়, কেমন যেন মেয়েদের মত।
‘আমি বল্লাম, আমি তো জানি তুমি মেয়েদেরকে পছন্দ কর।’
মান্টো বলল, “আমি মেয়েদের পছন্দ করি একটা পুরুষের মত। তাই বলে কি আমি মেয়েদের মত হতে চাইব?’
ইসমত তর্ক বিতর্ক পছন্দ করতেন। তিনি ঠিক শান্তিপ্রিয় ছিলেন ন। একরোখা ও জেদী ছিলেন।
‘বেহেসতী জেওর ‘এর লেখক জনাব আসলামের সাথে তার মামলা বিষয়ে তর্ক হয়। বিষয়টি বেশ মজার এবং গুরুত্বপূর্ণ।

আসলাম সাহেব ইসমতকে অশ্লীল গল্প লেখার জন্য কারণ দর্শাতে বললে, তিনি রেগে যান এবং উল্টো তাকেই অভিযুক্ত করেন ‘বেহেস্তী জেওরে’ অশ্লীলতা আমদানীর জন্য। আসলাম সাহেব অভিযোগ খন্ডাতে গিয়ে বলেন, ’আমিতো একজন পুরুষ।’ এটা শুনে, ইসমত আরও রেগে যান। তর্ক চলতে থাকে।
উনি বলেন যে, ‘আপনি একজন অভিজাত পরিবারের মুসলিম মহিলা হয়ে এমন গল্প লিখবেন কেন ? ইসমত উত্তর দিলেন, ‘আপনিও তো একজন অভিজাত পরিবারের মুসলিম পুরুষ। আর তাছাড়া শৈশব থেকে আমাকে কেউ বলে নি যে, এই বিষয়ে লেখা যাবেনা। আর আমি এমন কোন বইও পরিনি যেখানে বলা আছে যে, এ ধরনের রোগ ও বিবাাহ নিয়ে লেখা যাবে না।
আমি আপনার ‘বেহেসতী জেওর’ পড়েছি। এমন সব খোলামেলা কথা সেখানে আছে ! আমি যখন শৈশবে পড়েছি আমি রীতিমত মর্মাহত হয়েছিলাম। যখন আমি এটা আবার পড়েছি, বিএ পরীক্ষার পর। তখন মনে হয়েছে, এখানে কোন বিষয় অশ্লীল নয় – যা আছে সবই গুরুত্পূর্ণ্ যা একজন সেনসিবল মানুষের জানা দরকার। এসব বর্ণনা যদি অশ্লীল হয় ,তাহলে তো মেডিসিন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইও অশ্লীল বলে ধরা উচিৎ ।
ঝগড়া থামার পর খোশ মেজাজে গল্প গুজব শুরু হলো । আসলাম সাহেব ইসমতকে পরামর্শ দিলেন জাজের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারে। তাহলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব মিটে যাবে। ইসমত রাজী হলেন না। তিনি তাকে ফাইন শোধ করে ঝামেলা মিটিয়ে দেবারও পরামর্শ দিলেন।
ইসমতকে কোন বিষয়েই রাজী করানো গেল না। আসলাম সাহেবও আর তার চোখের দিকে তাকালেন না। শুধু বললেন,
‘আপনার জিহবা খুব ধারাল।’
আমার মাও তাই বলত, ‘ধারাল জিহবা ভোগান্তি ডেকে আনে ।’

আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, লেখকের উদ্দেশ্যের উপর অনেক কিছৃ নির্ভর করে। লেখক কি বাণিজ্যিক কারণে লিখছেন –খ্যাতি কিংবা অর্থের মোহে নাকি তার উদ্দেশ্য বাস্তবতাকে চিত্রায়িত করা?
………… যা অবশ্যই নগ্নভাবে নয়, শৈল্পিকভাবে ।
ইসমত স্বচ্ছল ছিলেন। স্বাধীন পেশাজীবি ছিলেন। তার প্রথম গল্পই ভাল পত্রিকায় ছাপা হয়। এবং খ্যাতিও আসে স্বাভাবিক ভাবে।
কাজেই বলা যায় বাস্তবতা ও শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তিনি এ গল্পটি লিখেছিলেন ।
তার আত্মজীবনীতে আছে, ‘মানুষজনের এ্‌সব আক্রমণে মান্টো রাগে দুঃখে পাগল হয়ে যেতেন। আমার ব্যাপার ছিল ভিন্ন। আমাকে মানুষ সহযোগিতাও করত না। বিরোধিতাও করত না। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখে যে রোজগার হত তাতে আমি ছিলাম সন্তুষ্ট। সাহিত্যিক হিসেবে আমার জন্ম বা মৃত্যু আমাকে অসহায় করে তুলত না।’

রিয়ালিজম থেকে ইম্প্রেশেনিজম এ উত্তরণের অন্যতম কান্ডারী শিল্পী এডুয়ার্ড মনেট, তার জীবনের গল্পটি এখানে উল্লেখ করা যায়। তিনি স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। সে সময়কার প্যারিসের অন্যান্য শিল্পীর মত লাগাম ছাড়া, উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতেন না। ছবি আঁকতেন মনের আনন্দে। ভাবতেন একসময় খ্যাতি আসবে স্বাভাবিক ভাবে।
কিন্তু তিনি ছিলেন প্রতিভাবান । তার ভেতরের তাড়নায় তিনি এঁকে ফেলেন অদ্ভুত এক ছবি । নারী পুরুষ বন ভোজনে গেছেন। পুরুষেরা পোশাকে সজ্জ্বিত কিন্তু নারীরা নগ্ন। এই নিয়ে প্যরিসের ‘বাতিলকৃত শিল্পীদের প্রদর্শনীতে’ ছিঃ ছিঃ পড়ে যায়।

কিন্তু ভিন্নমতাবলম্বীরা বলেন, ছবিটিতে কোন অশ্লীলতা নেই। কারণ অশ্লীলতা থাকে উপস্থাপনায়। এই ছবিটি শিল্পের ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছবি হিসাবে বিবেচিত।

বুদ্ধদেব বসু যখন তার উপন্যাস , ‘রাত ভোর বৃষ্টির জন্য’ কাঠগড়ায় দাঁড়ান, তখন বিপক্ষের উকিল তাকে প্রশ্ন করেন , “আপনি কি মনে করেন না , এই উপন্যাস পড়ে তরুণদের চিত্ত চাঞ্চল্য ঘটবে ?’
উনি উত্তরে বলেন যে, “দুঃখিত, আমি সে বয়স পেরিয়ে এসেছি ।’
সারা আদালতে হাসির হুল্লোড় পড়ে যায়।

বলা যেতে পারে , কোন লেখা অশ্লীল কি না তা বোঝার জন্য ম্যাচিওরিটিও একটা ব্যাপার যা সাধারণত আমজনতার থাকে না ।
লেখকের উদ্দেশ্য, উপস্থাপনা, শিল্পবোধ, পাঠকের মানসিক পরিপক্কতা এই বিষয়গুলো অশ্লীল সাহিত্য বিচারের মানদন্ড বলে ধরা যায়।

ইসমত ও মান্টোর গল্প নিয়ে মামলা চলা কালেও অনেক হাস্যকর ঘটনা ঘটে। তাদের পক্ষের উকিল যখন জানতে চাইলেন , গল্পের কোন শব্দগুলো অশ্লীল সরকারী পক্ষের উকিলরা জোরালো কিছু বলতে পারলেন না।

মান্টোর ‘ বু’ গল্প থেকে তারা পেয়েছিলেন ’নারী বক্ষ’ শব্দটি। মান্টো উত্তর দিলেন,‘ বক্ষকে তো বক্ষই বলতে হবে, অন্যকিছু বললে তো বোঝানো যাবে না।’বলা বাহুল্য আদালত প্রাঙ্গনে হাসির তরঙ্গ বয়ে যায় ।
ইসমতের গল্প থেকে তারা বের করল, ‘প্রেমিক সংগ্রহ’ শব্দটি। ইসমতের পক্ষের উকিল যুক্তি দেয়,‘ এটাতো বাজে মেয়েদের সম্পর্কে বলা হয়েছে যে তারা এটা করে। ভাল মেয়েদের সম্পর্কে তো বলা হয়নি।’
এ ধরণের উদ্ভট সব যুক্তি ও যুক্তি খন্ডনের মধ্য দিয়ে মামলা এগিয়ে চলল।

আদালতের বাইরে একসময় ইসমত জাজের সাথে কথোপকথনের সুযোগ পেলেন। তিনি ইসমতকে বল্লেন, ‘আপনার সব গল্পই আমি পড়েছি। তা আপত্তিকর মনে হয়নি। কিন্তু মান্টোর গল্পে প্রচুর আজেবাজে প্রসঙ্গ আছে।
ইসমত উত্তর দিলেন, ‘সমাজে বাজে জিনিসের অস্তিত্ব আছে দেখেই মান্টো তা লিখেছেন।’
‘লেখকের কাজ কি বাজে জিনিস জড়ো করে স্তূপীকৃত করা ?’
‘হ্যাঁ, কারণ তখন সেটা লোকের চোখে পড়বে। এবং তারা সেটা সরানোর চেষ্টা করবে।’
এবার বিচারক হেসে ফেললেন।
‘লিহাপ’ গল্প সম্পর্কে ইসমত বলেছেন, ‘লিহাপ’ আমাকে অস্থির করে তুলল জীবন সম্পর্কে। আমার গল্পের সমকামী নায়িকার কথা চিন্তা করলে এখনও মাথার চুল খাড়া হয়ে যায়। মানুষজন তাকে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে, আমি তাকে নিয়ে একটা গল্প লিখেছি।’
ইসমত তাকে এড়াতে চাইলেও এক পার্টিতে তার সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি কিন্তু খুব খুশী হলেন ইসমতকে দেখে। বললেন, ‘জান, আমি সেই নবাবকে কিন্তু তালাক দিয়েছি। আামি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছি এবং আমার একটি ছেলেও আছে ।’
ইসমতের মন আনন্দে ভরে উঠল। যেন এই ছেলেটি তার কলমেরও অবদান। যদিও প্রত্যক্ষভাবে লেখকেরা সমাজে কোন অবদান রাখেন না। তবু সমাজের সামগ্রিক সুস্থতায় অবশ্যই তাদের অবদান আছে।
তিনি চেয়েছিলেন, বেগম সাহেবার মত একজন অত্যন্ত সুশ্রী, পরিপূর্ণ নারীর স্বাভাবিক জীবনযাপন। সামাজিক চাপে তিনি একটি অসুস্থ জীবনে প্রবেশ করেছিলেন। ‘লিহাপ ’ গল্পে তো সেই বাজে জীবনের বর্ণনাই লেখক দিয়েছেন যার কারণেই এই মামলা।

জাজের সাথে কথোপকথনে- সমাজের যেসব রকমারি আবর্জনার স্তূপের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার কথা ইসমত বলেছিলেন, বেগম সাহেবার জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন যেন তারই একটি উদাহরণ।


মান্টো ও ইসমতের বিয়ের আগে তরুণ তরুণীরা আশা করত মান্টো ও ইসমতের বিয়ে হবে। কিন্তু মান্টোর ধারণা ছিল ভিন্ন। মান্টো মনে করতেন, ইসমতের সাথে বিয়ে হলে কাজী অফিসেই তাদের ঝগড়া শুরু হয়ে যেত। শেষমেষ ইসমত হয়তো বলত, ‘কাজী সাহেব আমি এই লোকটাকে বিয়ে করব না। যদি আপনার স্ত্রীর সংখ্যা চার না হয়ে থাকে তবে আপনার ঘরে আমাকে তুলে নিন ।’

মান্টো ইসমতকে যে খুব পছন্দ করতেন, তা ইসমত সম্পর্কে তার দীর্ঘ লেখা পড়েই বোঝা যায়। তার ‘দোযখী ‘ গল্পটি তিনি এত পছন্দ করেছিলেন যে তার বোনের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন , ‘তুমি যদি আমার মৃত্যুর পর এমন একটি গল্প লেখ ,তাহলে আমি মরতেও রাজী ‘
ইসমত মান্টো প্রসঙ্গে বলতেন যে, তার সঙ্গে কথা বলা এত উপভোগ্য সময় কখন পার হয়ে যায় বোঝাই যায় না।
একবার বোন পাতানো সম্পর্কে ইসমত মান্টোকে বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, কোন মেয়ের সাথে বোন পাতানো মানে তার নারীত্বের অবমাননা।’ মান্টো বিব্রত বোধ করলেন কারণ ইসমত তাকে মান্টো ভাই বলে ডাকেন।
কৃষণ চন্দর ইসমতের ছোট গল্প সংকলনের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘বিষয়বস্তু উহ্য রেখে পাঠককে বিস্ময় ও উদ্বেগের মধ্যে তলিয়ে দিয়ে আকস্মিক ভাবে সেই উদ্বেগ ও বিস্ময় আনন্দে রূপান্তরিত করার কলাকৌশলে ইসমত মান্টোর সমপর্যায়ে। এ ব্যাপারে খুব কম উর্দু গল্পকারই তার সাথে প্রতিদ্বন্দিতার ক্ষমতা রাখেন।’
তার ’তিল’ গল্পে ছটফটে এক মডেলের বর্ণনা আছে যে শিল্পের বিষয়বস্তু থেকে শিল্পীর জীবনের বিষয়বস্তু হতে উদগ্রীব ছিল। উন্নাসিক শিল্পীর উপর শেষ পর্যন্ত সে এক অভিনব প্রতিশোধ নেয়। এই প্রাণবন্ত মেয়েটির চরিত্র আসলেই একটি শিল্পকর্ম।

‘একজন স্বামীর জন্য’ গল্পে দেখা যায় , একটি অবিবাহিত মেয়ে ট্রেনে করে ইন্টারভিউ দিতে যাচ্ছে। কিন্তু তার সহযাত্রিনীরা সবাই তার স্বামীর পরিচয় ও সন্তানের সংখ্যা জানতে চেয়ে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে । মানুষের করুণা থেকে বাঁচার জন্য সে কল্পিত এক স্বামীর পরিচয় বর্ণনা করে ও সন্তানের কল্পনাপ্রসূত সংখ্যা বলে। কিন্তু বিভিন্ন মহিলার কাছে তার দেয়া বর্ণনা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মহাবিপদে পড়ে।

“ফেরিওয়ালা গরম গরম চা বিক্রি না করে যদি উপার্জনশীল বিত্তশালী স্বামী ফেরি করে বেড়াত, তাহলে যাত্রা পথের সুবিধার জন্য আমি অবশ্যই একজন স্বামী ক্রয় করতাম ।”
গল্পটি হাস্যরসাত্মক যদিও এর উদ্দেশ্য সিরিয়াস –একজন নারীর কাছে সমাজের কি প্রত্যাশা –তার বর্ণনা।
‘দুই রমণীর পেশা’ এক উন্নাসিক শিক্ষিকা তার প্রতিবেশিনীর চালচলন দেখে তাকে ও তার কন্যাকে পতিতা মনে করে তাদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করতেন। আসলে তার ধারণা ছিল ভুল। তার নিজের জীবন ছিল খুবই সাদামাটা। নিজের সর্ম্পকে উচ্চমন্যতা ও অতি সংযমের ফলে প্রতিবেশীনির উচ্ছল ও রঙিন জীবনযাত্রা তার কাছে পতিতাতুল্য মনে হয়েছিল।
‘তারা আসার পর প্রতিবেশিনীর ঘর থেকে উচ্চ হাসির শব্দ নদী তীরের বড় বড় চাইয়ের মত ভেঙ্গে পড়ছিল। ঘৃণা ভরে আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। মুখে বল্লাম, হতভাগিনীরা সব সময় অশোভন আচরণে ব্যস্ত থাকে।
কোথায়?
এখানে এক পতিতা থাকে। সবসময় তার ঠাট লেগেই আছে ।
পতিতা এখানে? কিন্তু এতো নিগারের আওয়াজ। মামাতো ভাই চমকে উঠলো ।….. শেখ আবদুল্লাহর স্ত্রী । স্যার আবদুল করিমের বংশধর।
তাহলে- তাহলে সেটা অন্য ফ্ল্যাট হবে । আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম।’

তার গল্পের বিষয়বস্তুগুলো আসলেই অভিনব।
‘লাল পিপড়া’ গল্পে আমরা দেখি , ছোটবেলা থেকেই মনু অপছন্দ করত তার মামাতো বোনকে। কিন্তু পারিবারিক চাপে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে বাধ্য হয়। পরষ্পরকে ঘৃণা করে তারা দীর্ঘ বিবাহিত জীবন ঝগড়া করে করেই পাড়ি দেয়। তাদের নাতিনাতনিরা তাদের ঝগড়া দেখে হাসত।
ইসমত চুগতাইর ভাষা তার নারী চরিত্রগুলোকে তাত্ত্বিকতার খোলস সরিয়ে রক্ত মাংসের মানুষ করে তোলে।
‘বাহ্ , আমি কেন তাকে বিয়ে করব ফুপু আম্মা । আসি সাজ্জু ভাইকেও বিয়ে করব না। সে কালো ,তাছাড়া সে আমার পুতুলের ওড়না চুরি করে। রফিক ভাইকেও বিয়ে করব না। রফিক ভাইয়ের নাক এত লম্বা। হিহিহি ।’এসব কথা শুনে সবাই হাসাহাসি করত। মনুর ইচ্ছে হত একটা ছড়ি আর এই মেয়েকে যদি পেতাম। যত্ত সব! সবাই যেন এই কুক্কুরীকে বিয়ে করার জন্য মরছে।’
ইসমত নারীবাদী তবে তার মধ্যে তিক্ততা কম। খেলাচ্ছলে এবং সহজভাবেই তিনি কঠিন কথা বলেন । যেমন তার আম্মা তাকে পুরুষদের সম্পর্কে কী উপদেশ দিয়েছেন তা তিনি পাঠককে জানিয়ে দেন:
`Make a boy so dependent on you that he feels embarrassed to sew his own button and would die of shame if he has to prepare his own meal.’
তার নিজের ধারণা হচ্ছে:
`If a wife stays with her husband simply because he is her provider than he is as helpless as a prostitute.’
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, শ্রেণী সচেতনতা, নতুন যুগের সাহিত্য, আধুনিক নারী বহু কিছু নিয়েই তিনি লিখেছেন। ইসমত চির আধুনিক কেননা তার লেখা চিন্তার গতিশীলতার জন্য কখনই পুরনো হবার নয়। মান্টো বলতেন, তার হাতের লেখা আকাবাঁকা ছিল তার চিন্তার দ্রুতগতির জন্য। তার ভাবনা ছিল ঘোড়দৌড়ের মত। লেখা তার পিছুপিছু ছুটতে গিয়ে হাপিয়ে উঠত ।‘টেরি লেখির’ নামে তার একটি গল্পও আছে। মান্টোর স্ত্রীর বর্ণনায়, ইসমত একহাতে আইসক্রীম খেতেন কড়মড় করে,অন্য হাতে লিখতেন ।

ইসমতের নিজের সম্পর্কে বলা তার কথাগুলো লেখক হিসেবে তার সত্তাকে যথার্থ ভাবে উপস্থাপন করে ।
“কলমের হাতে আমি অসহায়। আমার মন ও কলমের মাঝে কেউ দাঁড়াতে পারে না।’

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সালেহ ফুয়াদ — জুলাই ১২, ২০১৭ @ ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

      লেখাটি ভালো লেগেছে৷ লেখক ও সম্পাদককে ধন্যবাদ৷

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চাণক্য পণ্ডিত — জুলাই ১২, ২০১৭ @ ১:৩২ অপরাহ্ন

      সম্প্রতি রবিশংকর বল-এর লেখা উপন্যাস ‘দোজখনামা’ পড়েছি যেটি মির্জা গালিব ও সাদাত হাসান মান্টো’র মৃত্যু পরবর্তী কাল্পনিক কথোপকথন। সেখানে ইসমত চুঘতাই-এর সাথে মান্টো’র সম্পর্ক ও রসায়নের একটি বিস্তারিত বয়ান পেয়েছি। সেই সাথে তাঁদের উভয়ের সাহিত্যিক জীবনেরও নানা দিক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com