আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর কবিতা

ওমর শামস | ১ জুলাই ২০১৭ ১:৫২ অপরাহ্ন

mannan-m১. ভূমিকা:

১৯৬৫-তে নিউ-মার্কেটের নলেজ হোম-এ থেমস্ হাডসন প্রকাশিত কিছু আর্টের বই আসে – পিকাসো, দালি, পাওল ক্লে, হার্বাট্ রিড-এর মডার্ন পেইন্টিং, কিউবিজম, ফভিজম, দাদাইজম ইত্যাদি। একটি বই ছিলো প্যাট্রিক ওয়াল্ডবার্গ-এর সুররিয়ালিজম। ওই গ্রন্থ থেকেই পরাবাস্তবতার মৃদু-মন্দ হাওয়া বেরোতে থাকলো – হাওয়া থেকে বাতাস, বাতাস থেকে প্রভঞ্জন, প্রভঞ্জন থেকে চৈত্রের পাতা-ঝরানো ঝড় হয়ে গ্রিন রোডের আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর শিরে বইতে শুরু করলো। বইটি আমৃত্যু সৈয়দ-এর কাছে ছিলো, আমার কাছেও এক কপি আছে। ওই সময়ে এবং তার পরে সমকাল, কণ্ঠস্বর-এ সৈয়দ-এর কবিতা পড়েছি, মনে আছে, যেমন- ‘রক্তের পলাশবনে কালো ফেরেশতা’। এই সময়কার কবিতা ১৯৬৭-তে জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ নামের বইতে প্রকাশ পায়। লেখা আছে, রচনাকাল : ১৯৬২-৬৬। কিন্তু বেশির ভাগ লেখা ১৯৬৫ থেকে। শওকত ওসমান সমালোচনা করে লিখেছিলেন, “মান্নান আঙ্গিকের দিক থেকে পুরোপুরি পরাবাস্তববাদী বা সুররিয়ালিস্ট। চিত্রকলার মাধ্যমেই তার ভাবজগত নির্মিত। মান্নানকে ভুল-বোঝাবুঝির তাই যথেষ্ট অবকাশ আছে। কিন্তু ইউরোপীয় কাব্যধারার সঙ্গে পরিচয় থাকলে, এমন হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা কম। সংকুচিত পৃথিবীতে শিল্পের ভাববস্তু (content) হোক জাতীয়, আকার প্রকার বা গড়ন (form) হোক আন্তর্জাতিক। গ্রাম্যতা সর্বতোভাবে বর্জনীয়। নতুন টেকনিক আমদানী কোন অপরাধ নয়। শুধু প্রশ্ন, তার সাফল্য দেশী ঐতিহ্যে কতটুকু সুসঙ্গতি লাভ করেছে। মান্নান এই ক্ষেত্রে আশ্চর্যরকমে সফল।”


২. সুররিয়ালিজম, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ ও অন্যন্য:

সুররিয়ালিজম-এর মন্ত্র হচ্ছে : Surrealism is based on the belief in the superior reality of certain forms of association heretofore neglected in the omnipotence of dream, and in the disinterested play of thought. পরাবাস্তবতা অবচেতনের উন্মোচন। কবিতার ক্ষেত্রে আরো দুটো বক্তব্য স্মরণীয়। পিয়ের রির্ভেদি : The image is a pure creation of the spirit. It cannot be born of a comparison but by bringing together of two realities which are more or less remote. আঁদ্রে ব্রেতোঁ : Beauty will be convulsive or it will not be. এই পাঠের থেকেই জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছর জন্ম। কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাক :

“জ্যোৎস্না কী? – না, জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ডু, জোড়া-জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের একমুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার।”

[জ্যোৎস্না/জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ]

“এই বাতাস-নেই তারা-নেই ভোরবেলা- যখন মিসেস রহমান ষাঁড়ের মতো কাঁধের নাবিকের উপর চ’ড়ে বেরিয়ে আসে না আর, চীনে বাসনের উপর আপনাপন মুণ্ডু কেটে প্রেয়সীকে ক্লেশনাশন উপহার দেয়া শেষ হ’লো যখন, – আমি বাসের মধ্যেকার মানুষের মতো বোকা, ঠাণ্ডা, নামহীন থাকলুম ব’সে।

মনে করো সেইসব রাত, যদি মনে থাকে: সাইরেনের মতো টঙ্কার দিয়ে উঠছে মেয়েরা একেকটি কটিতলের পুরুষ উচ্ছ্রিত দেখে, রক্তাক্ত ধর্মযাজিকা, শিল্পী এককোণে তন্ময় নিজেকে তিনটি পায়ের আঁকতে – প্রতিটি শিল্পীর তিনটি পা থাকে, অথচ আবার বেশ্যার ছড়ায়ও যথেষ্ট আশবাব, রাত-শহরের উদ্ভাবিত নীল গলির মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে গান ধরলে যারা নদীতীরে, যেন আমরা সর্বদাই পরপারে থাকি। সেইসব মেয়ে ফানুশের অধিক মেয়ে মানুষেরা গড়ায়, ছড়ায়, ছড়াকাটে শপিং ব্যাগের মতো বিরাট একেক জোড়া ঠোঁট খুলে :

‘ইকড়ি মিকড়ি চামচিকড়ি

কেমন আছে মধ্যিখানের পা!

ইকড়ি মিকড়ি চামচিকড়ি

আমার কিন্তু ভীষণ বড়ো হা!’

উধাও রেনোয়াঁ, শুধু তোমারই নয়, প্রতিটি শিল্পই তৃতীয় পায়ের অপরাধে বিরচিত, এবং বেশ্যারা, একমাত্র বেশ্যারাই প্রতিটি শিল্পের দাম দিতে জানে”

[সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল : ৩ (অংশ)/জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ]

অংশের উদ্ধৃতি, কিন্তু পুরো জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ এমনই। বিসদৃশ বস্তুর তুলনায় ইমেজারি আছে, পড়হাঁষংরাব উপস্থাপন আছে, সিন্ট্যাক্সের স্খলন আছে (মিসেস রহমান ষাঁড়ের মতো কাঁধের নাবিকের উপর চ’ড়ে বেরিয়ে আসে না আর, চীনে বাসনের উপর আপনাপন মুণ্ডু কেটে প্রেয়সীকে ক্লেশনাশন উপহার দেয়া শেষ হ’লো যখন…)। কিন্তু এগুলো কি অবচেতনের স্তর, ফ্ল্যাশ? তা আমার বোধগম্যতার বাইরে।

মুভমেন্ট হিশেবে সুররিয়ালিজম পশ্চিমী ব্যাপার। চিত্রশিল্পের সুররিয়ালিজম এক রকম, গদ্য ও কবিতার সুররিয়ালিজম আরেক রকম। দালি, মিরো, চিরিকো- বিভিন্ন। র‌্যাম্বো, আলেইহান্দ্রে, নেরুদা, লোরকা প্রত্যেকে আলাদা। ফরাসী সুররিয়ালিজম, স্পানীশ-লাতিন সুররিয়ালিজম থেকে ভিন্ন মেজাজের। গ্লোবালাইজেশনে ঢেউ বাংলা ভাষায় স্বাভাবিকভাবেই আসে ও আসবে। কিন্তু টেকনিককে নিজের জীবনের আদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে যদি অভিজ্ঞতা ও কালের সারবত্তাকে স্বরূপ দিতে চাওয়া হয়। য়ূরোপীয়, লাতিন সংস্কৃতির পট আলাদা, তাদের ভাষা কাছাকাছি, জীবনযাত্রাও তুলনামূলকভাবে সন্নিকট। ভাষা, জীবন, দুই দিক থেকেই আমরা অনেকখানি দূরে। তবুও, উন্নয়ন-সংস্কৃতি-কাল নিরপেক্ষ থেকেও ভাষা কতোদূর, কি ভাবে শুধু ঘটনাকে নয় মনকে কতোখানি উন্মোচিত করতে পারে পারে, সে জিজ্ঞাসা সব স্থান-কালেই থেকে যায়। তাই ভাষা, চিত্রকল্প, বাগভঙ্গির অপারম্পার্য এগুলোই কবিতায় ব্যবহৃত হতে থাকে সব সময় অবচেতন চিহ্নিত না করা যেতে পারলেও। আমরা কি নির্ঘাত বলতে পারি যে, “পাখির নীড়ের মতো চোখ” অবচেতন থেকে উঠে এসেছে। পারি বা না পারি, এই বর্ণনা আমাদের বোধকে গভীরতায় টানে, আরো সংবেদনশীল করে। ক্রিটিকাল কথা হচ্ছে, ভাষা চিত্রকল্প যতোই ধূসর হোক পাঠকের মনকে টেনে রাখতে হবে, সম্পূর্ণ না বোঝালেও ইঙ্গিত দিতে হবে, তার মনকে খেলে বেড়াবার স্পেস দিতে হবে। এতেই সার্থকতা, এর অভাবে অসার্থকতা।

সরল কথায়, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এ আমি অর্থ দূরের কথা, ইঙ্গিতবহতা খুব কম পাই – ‘সারপ্রাইজ’ আছে যদিও, উত্তরণ করবার একটা অদম্য বাসনাও চোখে পড়ে। কবিতার নানাবিধ গুণ থাকা সত্ত্বেও বোধ-সংযোগের অভাব একটা অবশ্যম্ভাবী ফাঁক রেখে যায়।


৩. কবিতার কন্টেন্ট:

জ্যোস্না রৌদ্রের চিকিৎসা, ১৯৬৯-এর প্রথম কবিতা, ‘লণ্ঠন’। “সূর্যাস্ত ফেলছে নিঃশব্দে ফেরেশতাদের রঙচঙে কাপড়-চোপড়। উচ্চ- দোকানবীথি ফুলে-ওঠা ভিড়ে কোলাহলে বাল্বে বাতাসে এত খুশী যেন চাঁদে যাবে; জুতোর ফিতেয় প্রজাপতি উড়িয়ে লোকেরা যাচ্ছে লেকে-পার্কে-সিনেমায়”। সন্ধ্যার আরো বর্ণনা। “বৃহৎ জগৎ থেকে মার খেয়ে ফিরে এসে, দেখি আমি : কমলালেবুর একখানি কোয়া, নড়ছে তারার চাকা, আর পারা থার্মোমিটারের, বালিশের অড়, …কি ক’রে চিহ্নিত করি এই শতাব্দীতের ভুল-ক’রে-আসা আমি-টিকে? …তাই আজকাল সন্ধ্যা ব’সে-ব’সে মেজে-ঘ’ষে তুলেছি লণ্ঠন, একমাত্র লণ্ঠন আমার।” “শিউরে উঠে পাই টের: হায় পৃষ্ঠদেশে বিঁধে আছে চোখা, বাঁকা অবিশ্বাস! বিশ্ববাংলার ঘরে-ঘরে ক্রমে আলো জ্ব’লে ওঠে; আমি দীপহীন অন্ধকার ঘরে একা… নিজের আগুনে জ্বালিয়েছে লণ্ঠন আমার, এই শতাব্দীর সন্ধ্যাকালে।” কবিতা : হা কবিতা আমার, তুলে ধরি স্ফিংসের মতন দুর্বোধ্য কবিতা আমার। কবিতা শেষ হয় এই উক্তিতে, “আমার নিজের তৈরি, নিজের আগুনে জ্বালা লণ্ঠন কি সঙ্গে যাবে? লণ্ঠন কি সঙ্গে-সঙ্গে যাবে?”। লণ্ঠন সৈয়দের সৃষ্টির, কবিতার প্রতীক। এই কবিতাটিকে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের কবিতা বলা যেতে পারে। তার চেয়েও বেশি, কেননা মুক্ত নির্ঝরের গান-প্রতিষ্ঠা (লন্ঠন) নয় শুধু তিনি তাঁর আরো চারিত্রকে জানান দিয়েছেন- অন্যের “অবিশ্বাস”, “স্ফিংসের মতন দুর্বোধ্য কবিতা”, এবং বিশ্বাস-সন্দেহ’র দোলা- “লণ্ঠন কি সঙ্গে-সঙ্গে যাবে?” কবিতাটি অক্ষরবৃত্তে কিন্তু এর সুর, চলন, চিত্রকল্প তিরিশের কবিদের এবং ষাটের কবিদের থেকে পৃথক। সৈয়দ যে অন্য রকম, সে ব্যাপারে কোনো দ্বিত্ব নেই।

এই থেকেই তিনি অন্য ভঙ্গীর, শৈলীর কাব্য লিখেছেন – অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত (খুব কম), সনেট, বোধগম্য গদ্য-কবিতা, অ্যান্টিপোয়েট্রি, ছোট কাব্যনাট্য। তাঁর কবিতাকে টেকনিকের ছকে এবং কলকব্জায় ধরা যায় বেশি, কন্টেন্টের বিস্তারে কম। তবু তাঁর কবিতার বিষয় মোটা দাগে এই :

ক্স কবিতা নিয়ে উদ্যম-উদ্দীপনা, কবিতার প্রতিক্রিয়া

ক্স কিছু চরিত্র (জীবনানন্দ, ফররুখ, নজরুল, হেলালউদ্দিন ইত্যাদি)

ক্স মুক্তিযুদ্ধ (সামান্য ক’টি কবিতা)

ক্স বস্তু (আপেল, ইলিশ, চাঁদ, নারী, শব্দ, রাস্তা, গ্রীন রোড ইত্যাদি)

ক্স প্রতীক-বস্তু (মাছ সিরিজ)। পার্ক স্ট্রীটে এক রাত্রির কবিতাও এই ধাঁচের।

আল মাহমুদ এক সমালোচনায় লিখেছিলেন, সৈয়দ-এর কবিতার কোনো বিষয় নেই, কবিতার বিষয় কবিতা এবং তিনি নিজেই। এই মন্তব্যে আমি মোটামুটি একমত। তাঁর প্রত্যেক বইতেই কবিতার উদ্যম, কবিতার, শিল্পের প্রতিক্রিয়ার কবিতা আছে এবং তার সামগ্রিক পরিমাণ যথেষ্ট। এখানে আমি প্রতিটি বই থেকে নমুনা দিচ্ছি :

ক.

কবিতা আমার মুশকিল, কেন যে হলো না লোকায়ত ?

জিভের ডগায় তুমি ধরেছো মার্বেল,

তুমি কুমারীর সায়ার বিপন্ন গিঁট,

পিয়ানোর ভিতরে সমস্যা চুরি ক’রে চ’লে যাওয়া

[জ্যোস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা]

খ.

বাতাসে পোতা আছে আমার স্বপ্নের এন্টেনা

কারফ্যু শাসিত চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী হ’য়ে আমি আছি

কিন্তু আমার আত্মা হ’য়ে পাখি উড়ছে ঐ

তার ছোট পাতলা ঠোঁটে রাজদণ্ডের মতো ধ’রে আছে

[আমার স্বপ্নের এনটেনা/ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ]

গ.

একটি জ্বলন্ত পঙক্তি থেকে সারি-সারি শাদা

রক্তহীন ইন্দ্রিয়বিহীন পঙক্তি জ্বালিয়ে নিয়েছি।

বিদ্যুতের চেয়ে উৎসাহে ঘরে-বাইরে ছুটেছি দুদ্দাড়।

ইলেক্ট্রিসিটি নয় – আমার নিজের তৈরী অগ্নি জ্বলে

ঘরে ঘরে বারান্দায়, করিডরে

[আমার কবিতার শবে-বরাত/পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি]

ঘ.

আমি অনন্তের শাখা প্রশাখায় আটকে-যাওয়া পৃথিবী-ঘুড়ির মতো

আমি রুমালে বরফ প্রবল হাতুড়ি-ঘায়ে চূর্ণ করেছি

আমি গোলাপ-বাগের সাত-তলা প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে …

এন্টেনা পুঁতেছি আমি মাথার ভিতরে

স্পন্দির রাখাল আমি এক্টুখানি মুঠো খুলেই ছড়াই স্বপ্নের বীজ

[ছন্দ/ঘুমের ভিতরে নিদ্রাহীন]

ঙ.

এখানে কবিতা বানানো হয়।

সব ধরণের কবিতা।

রাজনীতিক কবিতা, সামাজিক কবিতা।

[কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড/কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড]

৪. কবিতার টেকনিক:

সৈয়দ তাঁর নিজের মনের উৎসারিত পরাবাস্তব কবিতা লিখেছেন। তাঁর প্রথম দিকের জ্যোস্না-রৌদ্রের চিকিৎসার প্রথম দিককার অক্ষরবৃত্তের কবিতা একটু ধ্বনিগতভাবে এবড়ো-থেবড়ো, অক্ষর গুণে হয়তো ঠিক, কিন্তু পড়া সহজ নয়। তিনি মাত্রাবৃত্ত লিখেছেন, একই গ্রন্থে ১৪ মাত্রার

সান্দ্র সন্ধ্যা গগনে ছড়ায় অমা।

তুমি কি এখন অশোকাভ কোনো ঘরে

অন্যমনস্ক গান গাও মৃদু স্বরে?

সোনালি তীরের মতো ছুটে যাও, রানি,

জানালায়, যবে আতীব্রক্রেংকার

কোনো যান থামে; রঙা ঝিলিমিলি-তোলা

সেই জানালায় তোমার যুগল পাণি

[তুমি ২/জ্যোস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা]

দু-একটি কবিতায় মাত্রার ভগ্নাংশিক বেমিল কানে পড়ে। সৈয়দ চিত্রকল্প প্রধান কবি এবং তাঁর ব্যবহারে ‘সারপ্রাইজ’ আছেঃ

১ তেলোর ভিতরে স্তন আর

বিছে পরাম্পরাক্রমে যাতায়াত করে কেন ? বলো!

২ গলিপথে চলতে চলতে

ভিড় দেখে রেগে টং শূন্যে উড়ে গেলো ঘোড়াগাড়ি

অতিকায় নক্ষত্রের মতো শব্জি, ঝুনো নারিকেল,

শশা, সাগর-কলা, আর আসলাম মিয়াকে নিয়ে ;

বই, বন্ধু, বাস্তবতা চাঁদে চ’ড়ে চ’লে যেতে থাকে।

৩ আজ আমি প্রথম শিশুর মতো

হারমোনিয়াম বন্ধকরার পরেকার বাতাসে লেগে থাকা সুরের মতো।

সৈয়দ কয়েকটি ছোট নাট্য-কবিতা লিখেছেন। ‘খোকা উড়ে গেল আকাশে ভালুকের নাচে – ঈশ্বরপ্রাপ্তির ছোট্ট গাথা’, ‘ভাঙি বিশ্বাসের তরু, তবু ফিরবে একদা জানি ওরা টেবিলে চেয়ারে আর নূতন আসবে ফিরে মানবিক আশবাবে’, ‘জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা’ – নাম যাই হোক না কেন এগুলো সবই কবিতা নিয়ে উদ্দীপনার কবিতা। “কবিতা আসছে, ছোট্ট, কিন্তু অসীম এক কবিতার টুকরো -এই মানুষ আর যন্ত্রের হ্রেষা-আর-ক্রেংকার-ভরা পথের মধ্যেই”। এক দৃষ্টিতে, যদি বলি – সৈয়দ জীবনে একটি বিষয়ের একটি কবিতা লিখেছেন- কবিতার উদ্দীপনার, ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের কবিতা’, তাহলে খুব অত্যুক্তি বা সত্যের অপলাপ হবে না।

তাঁর সবচেয়ে সহজ এবং সংবেদনশীল কবিতা গ্রন্থ হচ্ছে, ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ। সবগুলিই গদ্য-কবিতা। বিষয় প্রধানত একই, কবিতার জন্য উন্মাদনা, উদ্দীপনা। একটি মৃত্যুকে জয় করার কবিতা :

আত্মহত্যা আমি কোনোদিন করবো না আর

মৃত্যুকে

ঘরে-ওঠা অপরের মোরগের মতো

উড়ো-তাড়া দিয়ে সীমানা পার করে দিয়েছি।

এই বইতে একটি কবিতা আছে যেখানে তিনি জীবন-অস্তিত্ব-বোধ এর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত, “আম্মার জন্যে কবিতা”। “হঠাত অসুস্থ আম্মা শিটিয়ে উঠলো তাঁর মুখ”। “আমাদের পায়চারি-রত পদ-যুগ একবার শূন্যতার খাদের ভিতরে পড়ছে একবার পূর্ণতার পাতার উপর”, হাসপাতাল থেকে অবশেষে তিনি ফিরলেন, “উঠলো আনন্দ আমাদের উড়লো বুকের শহরের সব বাড়ির ছাদের উপরে সবুজ-লাল নিশান”।

ছন্দে লিখলেও, সৈয়দ-এর ঝোঁক গদ্য-কবিতায়। ভাষা, আঙ্গিকে তাঁর নিজস্বতা আছে এ ক্ষেত্রে।

৫. জীবন, বোধ ও কাল:

সৈয়দ শিল্পের জন্য শিল্পের কবি। তাঁর কবিতায় বহু লাইন আছে বস্তুগ্রাসের স্বপক্ষে। অর্থাৎ বস্তু, বাস্তবিকতার চেয়ে কবিতার আরাধ্য নির্যাস। “কবিতার বস্তুভূমি” শিরোনামে সৈয়দ-এর একটি প্রবন্ধ আছে। কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি, “বাস্তব ও কল্পনা- জীবন জুড়ে আছে এই দুই উপাচার। ……রূপান্তর কবিতার কাজ। কবিতা বাস্তব ও কল্পনা দুইকেই রূপান্তরিত করে। ……কবিতা প্রাথমিকভাবে ও শেষত এই বস্তুপৃথিবীকে কাজে লাগায়। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম – সমস্তই কবিতার বস্তুভিত্তি রচনা করে। কন্তু ঐ সমস্ত কবিতায় যখন আসে, আসে পরিশ্রুত হয়ে। এমন পরিশ্রুত যে, সে আর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ , দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম থাকে না – হয়ে ওঠে কবিতার পঙক্তি, কবিতার স্বর।” … “কিন্তু শুধু বিষয়ই কি কবিতার বস্তুভিত্তি রচনা করে? না। শব্দ ও ছন্দ, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ও প্রতীক – এক কথায়, কবিতার সমগ্র রূপ্পকল্পই কবিতার বস্তুভিত্তি রচনা করে। অর্থাৎ আধার ও আধেয় – দুই-ই কবিতার বস্তুভিত্তি রচনা করে।” বলেছেন ঠিকই। কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। সৈয়দ-এর শব্দ, “বস্তুভিত্তি” জিনিশটা কি? খুব স্পষ্ট হয় না তাঁর কথায়। কিন্তু তাঁর কবিতা পড়ে আমার এই ধারণাই হয় যে, তিনি বস্তুর থেকে প্রধানত শিল্পবোধের উতসারণকেই ধারণ করতে চান। অভিজ্ঞতা – জীবনের, ইতিহাসের, সাম্প্রতিক-বিগত রাজনীতি, সম্পর্ক, ক্ষুধা-তৃষ্ণা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এসব থেকে সঞ্জাত বোধ এবং মানুষকে চিনে নেবার দিকে ঝোঁকেন কম। “শব্দ ও ছন্দ, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ও প্রতীক” এর সঙ্গে বস্তুর সমীকরণেই সৈয়দ-এর “কবিতার সমগ্র রূপ্পকল্প”।

সেই জন্য অলংকরণের ভার ছেয়ে থাকে তাঁর কবিতায়। জীবনানন্দ’কে তাই তিনি টেকনিক এবং “ইজম” দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। “কবির জন্য সমাজকে বোঝা দরকার” “মানব সমাজকে চিনে নেবার ও চিনিয়ে দেবার মুখ্য প্রয়োজনে”। “যে কালে যে সমাজে ও যে বিসারে কবি রয়েছেন এবং যে সমাজে যে বিসারে তিনি ছিলেন না, কিন্তু তবু জিনিসগুলো রয়ে গিয়েছিল, আছে, থাকবে সে সবের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে”৬ আরো বেশি শিক্ষিত হয়ে তেমন কবিতা রচনা করা যা “আমাদের কবিতা জীবনে গভীর, না জ্ঞানে শুধু, না বুদ্ধি ও সংস্কারের রসে”-এই আলোকপাত কি আমরা সৈয়দ-এর কবিতায় পাই৭ ?

৬. মর্ম:

আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতার জন্য অবশ্যই মৌলিক এই অর্থে যে তিনি নতুন টেকনিক, সুরের অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর কবিতায় সারপ্রাইজ আছে, অবাক হতে হয়, পাতা বন্ধ করে ভাবতে হয়। কোনো সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “শেষ বিচারে এদেশের সাহিত্যবোদ্ধারা যদি আমাকে বৈজ্ঞানিক হিসেবে বিচার করে তবে বোধহয় আমার প্রতি কিছুটা সুবিচার করা হবে”। তাঁর টেবিলে নিউটনের ছবি ছিলো। কোনো সন্দেহই নেই যে সৈয়দ কবিতার নিউটন। তবে সেই স্থানকালে যদি শেক্সপীয়র-এরও সহাবস্থান হতো ?

টিকা ও গ্রন্থপঞ্জী :
১৯৬৫ সালকে আমি ধরি আমার সাহিত্য প্রবেশের বছর হিশেবে – প্রধানতম সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’ আর তৎকালীন তাবত তরুণদের হাতিয়ার ‘কণ্ঠস্বরে’ সে-বছর থেকে লিখতে শুরু করি…। – ষাটের দশকে আমরা, দরোজার পর দরোজা, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ১৯৯১।

শওকত ওসমান, সমকাল মাঘ-চৈত্র, ১৩৭৩।

আল মাহমুদ, নীলমিায় চাষবাশ, চারত্রি, ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩।

আবদুল মান্নান সৈয়দ, আধুনিক সাম্প্রতিক, সময় প্রকাশন, ২০০১।

জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা, সিগনেট প্রেস।

একটি উদাহরণ দিলে হয়তো আরেকটু পরিষ্কার হবে। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ-এ একটি কবিতা আছে, “এক-একটি দিন যেন এল- একটি সবুজভুক সিংহ”। ‘সবুজভুক সিংহ’, প্রথম ব্যবহার করেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক – “আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আদিম, অরণ্যচারী, সবুজভুক এক গোত্রের সমৃদ্ধা জননীর মতো” [নীল-সবুজ-লাল তমসা/ বুনোবৃষ্টির গান (১৯৫৯)]। কিন্তু শ্রেষ্ঠ ব্যবহার ঘটেছে আবুল হাসান-এর ‘মৃত্যু, হাসপাতালে হীরক জয়ন্তী’ কবিতায়, যেখানে উপমাটির সঙ্গে হাসান হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা এবং মৃত্যু-ভাবনাকে মেলাতে পেরেছেন। এখানেই চিত্রকল্পটি তার নিজস্ব সারবত্তা এবং সঙ্গতি পেয়েছে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mukul Mia Talukder — জুলাই ৫, ২০১৭ @ ৩:২২ পূর্বাহ্ন

      তিনি `সত্যের মতো বদমাস’ কবি ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com