দু’বার চেষ্টা করেও শহীদুল জহিরকে পুরস্কার দিতে পারি নি: হাসান আজিজুল হক

অলাত এহ্সান | ৫ জুলাই ২০১৭ ৭:৪৪ অপরাহ্ন

Hasan-3বাংলাদেশের অগ্রগণ্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ ও গণমানুষের সংগ্রামের রূপকার হিসেবে বাংলা সাহিত্যে তিনি প্রাতঃস্মরণীয়। বাংলা ছোটগল্পের রাজপুত্র অভিধায় তাকে খ্যাত করেন কেউ কেউ। তার সাহিত্য চর্চায় ছোটগল্পই প্রধান। এ ছাড়া তিনি লিখেছেন প্রবন্ধ, গদ্য, স্মৃতিকথা। তার প্রধান উপন্যাস ‘আগুন পাখি’। অনুবাদ করছেন হেমিং ওয়ের গল্প। দীর্ঘদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপনা করেছেন তিনি। থাকেন সেখানেই। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ আয়োজিত এক সেমিনারে অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। সেখানে দুইপর্বে সম্পন্ন হয় এই দীর্ঘ আলাপ। প্রথমে পর্বে দর্শন বিভাগ অধ্যাপকের রুমে সাক্ষাৎকার পর্বে তিনি অংশ নেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে তার থাকার জন্য গেস্ট হাউসের রুমে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি সাহিত্য, সাহিত্যিক, সাহিত্য তর্ক, সমালোচনা, উভয় বাংলায় সাহিত্যের বর্তমান লেখা ও লেখক, নিজের সাহিত্য কর্ম, অন্যকে নিয়ে লেখা, অনুবাদ, বিশ্বসাহিত্য প্রসঙ্গ, পুরস্কার ও শহীদুল জহির নিয়ে কথা বলেছেন।
এই দীর্ঘ আলাপে অংশ নেন তরুণ গল্পকার অলাত এহ্সান। তার সঙ্গে ছিলেন তরুণ লেখক কে এম রাকিব।—বি.স

প্রথম পর্ব : দর্শন বিভাগ

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার চার খণ্ডে আত্মজীবনী প্রকাশ হয়েছে, এটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, বোঝা যায়, এটা আরো এগুবে। তো, পরবর্তী খণ্ড নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না?
হাসান আজিজুল হক: এই চার খণ্ড কেমন করে পাঠকরা নেয়, দেখি। তারা পছন্দ করে কিনা।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আত্মজীবনী নিয়ে আমাদের দেশে যে রকম অনেস্টি, তা নিয়ে হুমায়ূন আজাদ একটা কথা বলেছিলেন, যেন ফেরেশতা হয়তো শয়তানের আত্মজীবনী লিখছে। আপনি লেখাতে, জীবনে যে রকম একটা অনেস্টি মেইনটেইন করে এসেছেন…। সাধারণত হয় কি, আমাদের আত্মজীবনীগুলো নস্টালজিয়ায় বেশি আক্রান্ত, ভাবাবেগ সম্পন্ন হয়ে যায়। ওইটা আপনার আত্মজীবনীতে নেই।
হাসান আজিজুল হক: হুমায়ূন আজাদ কি বলেছেন?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : একজ্যাক্ট কোটটা আমার মনে নেই। সেটা এমন ছিল যে, বাঙ্গালির আত্মজীবনী পড়লে মনে হয় যে, এটা হচ্ছে শয়তানের জীবন কিন্তু ফেরেশতার মত লেখা।
হাসান আজিজুল হক: ওই লোকটা অত্যন্ত অপ্রিয় কথা বলতেন, কিন্তু সব সময় অপ্রিয় সত্য কথা বলতেন না। অপ্রিয় সত্য কথা অনেক সময় বলতে হয়। প্রিয়ং ব্রুয়াত, অপ্রিয়ং অব্রুয়াত—প্রিয় কথা বলব, অপ্রিয় কথা অব্রুয়াত—বলো না। আর অপ্রিয় সত্য বলা দরকার। অপ্রিয় কথা শুধু অপ্রিয়, এতে সত্য-মিথ্যার কোনো ব্যাপার নাই, একটা মন্তব্য আর কি।

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এবং তাঁর কথা বলার যে ভঙ্গি আর লেখার যে ভঙ্গি এমন একটা ইউফোরিজমের মতো ছিল যে খুব চমকপ্রদ—শুনতে ভাল লাগে, অনেক সময় ক্ষতি করে। এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য সম্পর্কে এক লাইনের একটা মন্তব্য করে দিয়েছিলেন যে—আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য হচ্ছে, নির্বোধের হস্তমৈথুন আর কুকুরের সঙ্গম। এই রকম টোটাল সাহিত্যটাকে সংক্ষেপে নিয়ে আসাটা লেখকের জন্য খুব দুঃখজনক।
হাসান আজিজুল হক: অতিশয় বাজে কথা। হুমায়ূন আজাদ এই সব কথা বলেই লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন। কিন্তু হুমায়ূনকে কখনো কোনো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে হয়নি, বিবেচ্য মানুষ বলে মনে হয়নি, দম্ভোক্তি করাটাই ছিল তার একমাত্র কাজ।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সেটা হচ্ছে একটা—এ রকম মন্তব্যগুলো করার কারণেই তার সময়ে তিনি বেশি আলোচনায় থেকেছেন।
হ্যাঁ, এটা শুনতে কিন্তু খুব চমকপ্রদ লাগবে যখন কেউ বলে যে, ইলিয়াসের ‘উৎসব’ গল্পটাতে কুকুরের সঙ্গম আছে, কিংবা ‘চিলেকোঠার সেপাই’তে ওসমানের হস্তমৈথুন আছে। কিন্তু এ রকম সরলীকরণ কি লেখকের প্রতি অবিচার করা হয় না?
হাসান আজিজুল হক: হুমায়ূন আজাদ বাদ দিয়ে আলাপ কর। হুমায়ূন আজাদ নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যাথা নেই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তো, সে অর্থে যদি সাক্ষাৎকার শুরু করতে হয়, তাহলে তো মনে পড়ছে আপনার একটা গল্পই আছে ‘সাক্ষাৎকার’। গল্পের প্রসঙ্গটা সেখান থেকে শুরু করতে পারি যে, আমি একজন বিখ্যাত লাতিন নাট্যকারের একটা কথা জানতাম যে, শুরুতে মানুষ ঈশ্বরের দিকে চোখে রেখেছে। পরবর্তীতে পুরোহিতরা দেখাল যে ঈশ্বর তাদের ওপর চোখ রাখছে। এর মধ্যে দিয়ে পুরোহিতরা মানুষের ওপর চোখ রাখত। এখন মানুষের ওপর চোখ রাখছে বন্দুকের নলগুলো। আপনার ‘সাক্ষাৎকার’ গল্পটা আমাদের দেখাচ্ছে যে, বন্দুকের নলগুলো আমাদের উপর চোখ রাখছে।

…………………………………………………………
যৌনতার একটা দিক হচ্ছে জৈবিক দিক। সেটা নিয়ে কথা বলা আমার তো কোনো দরকার নেই। বলবো, যদি প্রেমের জায়গায় আসে। অর্থাৎ যেখানটায় এটা আর জৈবিক থাকছে না। জৈবিক দিকটা অপ্রয়োজনবোধে আনি না।
…………………………………………………………

এই সময়ের জন্য খুবই প্রসঙ্গিক এই গল্পটা। এটা আপনার অনেক আগের লিখা কিন্তু এসময়ে খুব প্রাসঙ্গিক। এই যেমন র‌্যাব গুম করছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে—এগুলো পত্র-পত্রিকায় তো আসছে। সে সময় এটা লিখতে গিয়ে আপনার কি কোনো ভয়ের মুখোমুখি হতে হয় নি? এই ‘সাক্ষাৎকার’ লেখাটা বেশ ঝুঁকির ব্যাপার ছিল।
হাসান আজিজুল হক: ‘সাক্ষাৎকার’ লেখা ঝুঁকির ব্যাপার ছিল, ‘পাতালে-হাসপাতালে’ লেখাটা ঝুঁকির ব্যাপার ছিল, ‘খনন’ গল্পটা লেখা সে সময় যথেষ্ট ঝুঁকির ব্যাপার ছিল, ‘পাবলিক সার্ভেন্ট’ লেখার সময় ঝুঁকির ব্যাপার ছিল। কারণ এটা তো ছিল সরাসরি লেখা। এতে সাংঘাতিক সাংঘাতিক কথা বলা হয়েছে। আমি লেখক জীবনে মোটামুটি ঠিক করেছি যে, নিজে যে জায়গাটা আমি সঠিক বলে মনে করেছি, চিহ্নিত করব বলে ঠিক করেছি, সেটা আমি চিহ্নিত করবই। লেখকের প্রথম শর্তই হচ্ছে তাই—সে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন। অন্য সবদিকে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, মানতে হয়, মেনে চলতে হয়। লেখক এই অর্থে বাধ্যবাধকতা হচ্ছে তার নিজের কাছে। অন্য কারো কাছে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটা যে লেখক ভাবেন না তার লেখায় কন্ডিশন নেই, অর্থাৎ শর্তাধীন হয়ে যাবে। শর্তাধীন যে লেখক তাকে আমি পুরোপুরি লেখক বলে মানতে পারি না। আগেকার কথা আলাদা, যখন সম্রাট ছিল সম্রাটের বিরুদ্ধে, একটা কথা লেখা যেত না। (মানে রাজ দরবারে লেখক—অলাত এহ্সান)। তাদের কোন রাস্তাই ছিল না। আকবর বাদশার বিশাল ভারতবর্ষের একটা লোকও কি তার সমালোচনা করে কথা বলতে পারতো? সেটা সম্ভব ছিল না, কল্পনাও করা যেত না। কাজেই সেই অর্থে লেখক হওয়ারও কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। সেখানে প্রশংসাকারী থাকতে পারে, ভাঁড় থাকতে পারে, বিদুষক থাকতে পারে অথবা ঠিক যা লিখেছেন তাই, আইন-ই-আকবর বা আবুল ফজলের যেগুলো, খুব ডিপেনডেবল, অর্থাৎ অতিরিক্ত কিছু না বলে মোটামুটিভাবে বলা, মন্তব্য না করা।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : ‘এনলাইটনমেন্ট’র পূর্ববর্তী সময় ফরাসি সাহিত্যিকদের মধ্যে কেউ কেউ লিখেছেন, যেমন ভল্টেয়ার, রুশো; তখন তো তাদের ওখানে ডেমক্রেসি বা ফরাসি বিপ্লব আসে নি। তাঁরা তো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, যেটা বলছিলেন—বলা সম্ভব কিনা। স্যার, এখানে একটা বইয়ের নাম কি মেনশন করব, সেটা হচ্ছে যে, ভল্টেয়ারের ‘কেনডিদ’ বা ‘কাদিদ’ বলে যেটা, স্যাটায়ার বটে, তবে সেটা তো ফিকশন-ই। মানে সেটা তো সম্ভব।
হাসান আজিজুল হক: এখানে আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করতে হবে, সেটা হলো সময়টা; রাজতন্ত্র এবং প্রিস্টহুড যতক্ষণ পর্যন্ত আষ্ঠেপৃষ্ঠে জনগণকে জড়িয়ে রেখেছিল তখন এই সব কথা বলা সম্ভব ছিল না। কিন্তু খেয়াল করতে হবে ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব হল। ফরাসি বিপ্লর হওয়ার আগে তার তো একটা পটভূমি আছে। লোকজন একটু ভিন্নভাবে ভাবতে শুরু করেছে—যা আছে কপালে আমরা তার বিপক্ষে যাব।আমাদের ভাষা আন্দোলন যেমন ছিল—যা আছে কপালে আমরা বিরুদ্ধে যাব, দেখি কি হয়। ফরাসি বিপ্লব, মানে ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলিউশনে যে জিনিসটা হয়েছিল তারও তো—একটা ব্যাপারটা বলছিলাম যে—সন্ধ্যে বেলা প্রদীপ জ্বালাতে গেলে বিকেল বেলা সলতে পাকাতে হয়—তেমনি ওই ঘটনা ঘটবার আগে সংশোধন করতে হবে তো, মানে তখন ওগুলো সবই সমাজ ডিমান্ড করছে তাদের কাছে ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’। রুশো যেমন চাইতেন জেনারেল উইল, আমার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ তোমার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ। এই স্বাধীনতা বলতে একটা হচ্ছে তোমার সৎ ইচ্ছা, ব্যক্তিগত নয় সৎ ইচ্ছা। সকলের সৎ ইচ্ছা যদি কোন দিন একত্রিত করা যায়, সেটা হবে জেনারেল উইল। জেনারেল উইলটা-ই হবে আমাদের রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। এই সব কথা তো বলেছেন উঁনি। ভল্টেয়ারও ঠিক তাই, উঁনি মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন যে, এখন সুখে থাকো, আনন্দে থাকো আর কাজ কর্মের কোন দরকার নেই। সবাই নিজ নিজ বাগানে মন দাও, সবাই নিজ নিজ ফুল চাষ করবে। এই যে ‘নিজ নিজ’, শ্লেষাত্মক কথাটা। এইসব শ্লেষাত্মক কথা চাবুকের মতো মনে হয়। এইগুলো মানুষকে চাবুকের মত সচেতন করবে, জাগিয়ে তুলবে। যা বলছিলে-
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার ‘সাক্ষাৎকার’ গল্প থেকে শুরু করেছিলাম কথাটা। সে দিক দিয়ে আপনি সাক্ষাৎকার অনেক দিয়েছেন, আপনার সাক্ষাৎকার নেয়ার অভিজ্ঞতা কী রকম।
হাসান আজিজুল হক: প্রচুর এবং কখনো কখনো বিরক্তিকর। অনেকের (আমার) সাক্ষাৎকার নিয়েছে নিতে হয় বলে। অনেকের মনে হয়েছে, লোকটির খ্যাতি হয়েছে একটু সাক্ষাৎকার নেই। আমার সাক্ষাৎকার নিতে গেলে আমার কার্যকলাপের সঙ্গে মোটামুটি পরিচয় থাকতে হবে তো। হয় আমাকে নিন্দা করতে হবে, না হয় আমাকে প্রফুল্ল করতে হবে, না হয় আমাকে গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি কখনো আমার কোনো কিছু না পড়ে সাক্ষাৎকার নিতে আসে তখন আমার বিরক্ত লাগে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কখনো কি সে অর্থে আপনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কিনা? আপনার সাক্ষাৎকার নেয়ার অভিজ্ঞতাটা কেমন?
hasan -1হাসান আজিজুল হক: তাও কখনো কখনো নিয়েছি। সে সময় অমর পাল ছিলেন, অসাধারন গান করতেন তিনি। সেই সময় আমি অমর পালের একটা সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম আরকি, মনে আছে। আরেকবার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম মহাশ্বেতা দেবীর। মহাশ্বেতা দেবী তখন আমার বাড়িতে গিয়েছিলেন। সবাই বললো যে, আমাদের তাঁর সঙ্গে একটা কথোপকথন পাঠান। আমাদের কথোপকথনের মতো করে আমি একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সে হিসেবে দু-একজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার সাহিত্য জীবনটা দীর্ঘ। মানে আপনার অতিবাহিত জীবনকাল যদি ভাগ করা হয়, সে জায়গায় আপনার জীবনের বড় অংশ সাহিত্যিকের। (এখন পর্যন্ত তাই, বলতে পারি—হাসান আজিজুল হক)। আমরা যদি এই প্রশ্ন করি যে, খোদ সাহিত্যের ভবিষ্যৎটা কী? স্যার, আমরা যদি একটু সহজ করে দেই যে এখন অনেক প্রযুক্তি চলে এসছে, বিনোদনের অনেক মাধ্যম; সিনেমাতে তো শব্দ, দৃশ্য, ইমেজ কত কিছু সাহায্য করছে। তার (দর্শক) জন্য এটা খুব সহজবোধ্য । কিন্তু একটা বই, কালো কালো অক্ষর পড়তে গেলে তাকে কল্পনা করতে হয়, অন্যরকম একটা ফিকশনাল রিয়ালিটিতে চলে যেতে হয়। মানুষের জন্য সিনেমা দেখা থেকে বই পড়া একটু কঠিন তুলনামূলকভাবে; তো সেই ক্ষেত্রে এত বেশি বিনোদন মাধ্যম, এত প্রযুক্তি ছেড়ে পাঠক বই পড়বে কিনা ভবিষ্যতে….সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কী?
হাসান আজিজুল হক: এই সব জিনিস ভাবতে হবে। ফটোগ্রাফিতে কি করে, সমাজের অবিকল চিত্র দিতে পারে। অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে সেটা দিতে পারে। দুর্ভিক্ষের ছবিতে, জয়নুল আবেদিন যেটা এঁকেছেন, সেটা আর ফটোগ্রাফি কি এক? (এমনকি স্বাভাবিক অবস্থা আর দুর্ভিক্ষের ফটোগ্রাফি এক না)। ওইটাই খেয়াল করতে হবে যে, ব্যক্তি নিজেকে কি রকম করে প্রকাশ করে, সেটা ইউনিক, এই ইউনিক শব্দটাকে ব্যবহার করতে হবে, সেটা একেবারে অনন্য। এটা আর কারোর পক্ষেই আর সম্ভব নয়। সাহিত্য ঠিক তাই, সাহিত্য হচ্ছে ইউনিক জিনিস। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, যতই তাকে অন্যরূপে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, সিনেমা করা হোক কি থিয়েটার করা হোক, উপন্যাস যেটা বা কথাসাহিত্য সেটার কোন পরিবর্তন নাই। অর্থাৎ ওর বদলে ওটা—এটা করা যাবে না। কবিতাও যেমন, ঠিক তেমনি করে সাহিত্য মাত্রই তাই। এখন যদি লোকের মনে হয়—চিন্তা-ভাবনা কিছু করবো না, ওসবের কিছু নেই, সব ‘আলালের ঘরের দুলাল’, এমন যদি হয়, তাহলে একটা করে মোবাইল নিয়ে কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে এই সমস্ত করবে। আমি বলছি তাতে সব হবে, ইনফরমেশন হবে, হয়তো নলেজও কিন্তু উইসডম হবে না কোনো দিনও। তাই সেই জন্যে ওটা মোটেই গ্রন্থের বা ছাপা আক্ষরের বদল বা রিপ্লেস করে টেকনলজি দেবে—এট একদম ঠিক না। এবং এটা করতে শুরু করেছে, মানুষ নতুনত্ব-টতুনত্বটা খুব চায়, তরুণরা খুব বেশি করে চায় আরকি, অত কষ্ট করতে কে চায়, তাতে তাদের ডিপেনডেন্সও বাড়ে। কিন্তু আমি কখনোই, আমার খুব প্রিয় পড়ার জিনিস আমি ইন্টারনেট থেকে পড়ব না। আমি এখনো পর্যন্ত ছাপা বই পেলে সেটা পড়ি। তখন বইটাকে মনে হয়, বলা যায়, আমার একটা দৈহিক যোগাযোগ হচ্ছে আরকি। এটা আমি স্পর্শ করতে পারছি। তা ছাড়া নিরবে পড়ছি ততগুলি অক্ষরে, আর তা থেকে ছবি ভাসছে, তা থেকে আমার অদ্ভুত ধরনের উপলব্ধি তৈরি হচ্ছে এটা সাহিত্য ছাড়া হবে না। তুমি সেই মুহূর্তে ফটোগ্রাফি করতে যাবে না, অমনি সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে, প্রযুক্তিও তাই। সিনেমা আলাদা একটা মাধ্যম, কিন্তু একটা-আরেকটার বদলে নয়। অসাধারণ হতে পারে ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র সিনেমা, কিন্তু সেটা ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র রিপ্লেস হবে না। সাহিত্য ইররিপ্লেসেবল, আধুনিক প্রযুক্তি এটাকে রিপ্লেস করবে পারবে না। আধুনিক প্রযুক্তি তো প্রশ্নই উঠে না। আধুনিক প্রযুক্তি খুব সহজে, অতিদ্রুত খটখটে হয়ে যাবে। মানুষ প্রথমে অভ্যস্ত হয়ে যাবে এরপর বিরক্ত হবে। কারণ আমরা তৈরি করেছি এটা, এ আমাদের তৈরি করেনি। কিন্তু সাহিত্য? আমি যে সাহিত্য করবো সেটা তোমাকে তৈরি করবে বা তোমাকে ভাঙ্গবে, কিছু একটা করবে। প্রযুক্তি তো সেই কাজ করতে পারবে না। সেই জন্য, প্রযুক্তির প্রভু হচ্ছে মানুষ, মানুষের প্রভু কোনদিন প্রযুক্তি নয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : একটা সময় সাহিত্য, শুধুমাত্র সাহিত্য বিনোদন মাধ্যম, প্রধান বিনোদনও ছিল। যখন টিভি ছিল না, টলস্টয় বা দস্তোয়েভস্কির যত বই, ওগুলো তো শুধুমাত্র মানুষ বিনোদনের জন্য পড়েনি, জ্ঞানার্জনের জন্যও পড়েছে।
সেই ক্ষেত্রে, এখন এই যুগে মানুষের অ্যাটেনশন স্প্যান অনেক কমে গেছে। এই যুগে তো নিশ্চয় মানুষ সাহিত্য ওই রকম পড়বে না।

…………………………………………………..
‘ইমিগ্রেশন’ নয়, ‘ভৈরব’ উপন্যাস হয়ই নাই। এক আত্মকথা ধরনে, আত্মকথা সব সময়ই ইন্টারেটিং হয়। সালমা বানীর আত্মকাহিনী কোনটা, ওই কানাডায় যাওয়া, ওই ‘ইমিগ্রেশন’টা? ওটা আত্মকাহিনীও নয়। ও আবার একটা অদ্ভূত জিনিস। তারপর আবার কিছুদিন আগে লিখেছে আর একটা জিনিস। আমি বললাম, সালমা এটা কেন করো তোমরা? তুমি কেন মনে কর খোলা বর্ণনা দিলে, তুমি মেয়ে, তোমার হাতে সেক্স অঙ্গের এমন খোলা বর্ণনা তুমি যে করছো, তুমি কি মনে কর, এতে তোমার সাহিত্যের কোন উন্নতি হচ্ছে।
…………………………………………………..

হাসান আজিজুল হক: বিনোদনেরও তো ধরন আছে, কারো হচ্ছে ভাল করে তেল মেখে গোছল করে এসে খেতে বসা, তার কাছে ওর চাইতে ভাল কিছু হয় না, হা হা হা। কেউ গান শুনে বিনোদন করে, কেউ কবিতা পড়ে বিনোদন করে। বিনোদনেরও তো ধরন আছে, সেই জন্য সাহিত্য পড়াটাকে বিনোদন বলা ঠিক না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : বিনোদন বলতে স্থুল ধরনের কিছু বলছি না। এটা সঙ্গে সঙ্গে আলোকিতও করে।
হাসান আজিজুল হক:তাই যদি হয়, তাহলে সাহিত্যের প্রয়োজন তো কখনোই ফুরোবে না। আমি মনে করি যে, শ্রেণি সম্বন্ধে আমরা কথা বলতে পারি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই রকম মনোভাব। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রত্যেকটি লোককে যদি ধরি, প্রত্যেকটা লোক প্রত্যেকটা থেকে আলাদা। এখানে মার্কসের একটা অসুবিধা রয়েছে। কার্ল মার্কস শ্রেণির আর শ্রেণি চরিত্রের কথা বলেছেন। কিন্তু শ্রেণির মধ্যে যে ব্যক্তি আছে সেই ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছলেই দেখা যায় এক শ্রেণিভূক্ত লোকেরাও নানান জাতের আছে। গড়পড়তা কিছু বলা যাবে না। এজন্যই বলবো, প্রত্যেকটা মানুষ যেহেতু একেবারেই স্বতন্ত্র সে জন্য গ্রন্থেও কিন্তু স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ ছবি (ফিল্ম) দিয়ে চিহ্নিত করা যাবে না, নাটক দিয়ে করা যাবে না। ও (গোরা) ওই প্রিন্টিং মিডিয়ামের ভেতর দিয়ে, অক্ষরের ভেতর থেকে যে এসেছে—ওর আনন্দ, ওর উপভোগ, ওর আন্ডাস্ট্যান্ডিং—ওটা কখনো শেষ হবে না। সে জন্য লোকে যা-ই বলুক না কেন, বই যতই কম পড়ুক, বই মুছে যাবে, বই চলে যাবে–এটা আমি মনে করি না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার সাথে এই কথোপকথন ধরেই মনে হল যে, আপনি কথা বলতে গেলে প্রচুর হিউমার থাকে, একধরনের রসবোধ থাকে। আপনার বক্তুতায় তাই, আমি আপনার অনেক বক্তৃতা শুনেছি, কিন্তু যখন আপনার সাহিত্য পড়তে যাই, তখন সহজাত বা চাপা যা-ই বলি না কেন, এই হিউমারের অনুপস্থিতি আছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : মনে হয় আপনি হয়তো নিজেকে কিছুটা সাপ্রেস (অবদমন) করে নিচ্ছেন। আপনার এই যে কথা বলা, আপনার বক্তৃতা—আপনার বক্তৃতা এর আগেও আমি শুনেছি, বক্তৃতার বইও পড়েছি বিভিন্ন সময়। (আবদুশ শাকুর আপনার বক্তৃতার বই সম্পাদনা করেছেন)—এত চমৎকার যে আগ্রহ ধরে রাখে, মনে হয় আগ্রহ নিয়ে শুনি বা পড়ি। কিন্তু যখন আপনার গল্প বা উপন্যাস পড়ি, তখন মনে হয় এই যে ‘বক্তৃতার আমি’তে আপনার যে রসবোধ এটাকে কিছুটা চেপে রাখছেন।
হাসান আজিজুল হক: এটা আমার লেখার যে বিষয়টা—মানুষ কত ঠাট্টা কত হাসি করছে কিন্তু ভাল করে চিন্তা করলে হয়তো দেখা যাবে যে, আজ এত হাসছে, আজ এত উৎফুল্ল কেন? তখন তুমি জানতে পারলে যে, গতকাল তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। (হেসে) পুষিয়ে নিচ্ছে। কাজেই ‘বাহিরে যার হাসিখুশি ভেতরে তার জল’, সেটা বুঝতে হবে। সাহিত্য সেই জায়গাটাতেই মোচড় মেরে দেয়, চোখ দিয়ে তোমার পানি বার করে দেয়। যে মানুষকে তুমি ইয়ার্কি করছো, কথা বলছো, সব কিছু করছো, সেই মানুষটাই, সেই কথাগুলোই তুমি শুনছো বাইরে, যখন বইয়ে পড়ছো তখন দেখবে গল্পটা অন্য এক রকমের। সে জন্যই সিনেমাতে দেখলেও তলস্তয়ের বই পড়া শেষ হবে না। আর যা-যত কিছু করো না কেন, ‘ওয়ার এন্ড পিস’ তোমাকে পড়তেই হবে, এটা অনন্য একটা মাধ্যম। একে একটু এদিক-ওদিক করে দিলে, এমনকি ভাষান্তরও যদি করা যায় তা একই। ভাষান্তরেও ক্ষতি, আমরা সেই ক্ষতি স্বীকার করে নিয়েই ইউরোপের সব কিছু পড়ি। ইংরেজি ভাষা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। বাংলা পড়লে তো আরো অন্য রকম হয়ে যাবে। আমরা সেই জন্যে বলি—বই খুব ইউনিক, অত্যন্ত ঈর্ষাপরায়ণ, বুঝলে? সে আর কাউকে সহ্য করে না। হে হে হা হা হা (সবাই)
Hasan-2সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হ্যাঁ, বই নিয়ে বসলে বিনোদনের আর কিছুই সঙ্গে নেয়া যায় না।

তলস্তয়ের গল্পের প্রসঙ্গ উঠলো যখন, তাঁর গল্প-উপন্যাসগুলো নিয়ে কথা বলছিলাম, যেমন আপনার গল্প নিয়ে কথা বলছিলাম। তাঁর (তলস্তয়) সাহিত্যগুলোতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সে অর্থে, যৌনতার প্রসঙ্গটাও একেবারে পষ্টাপষ্টি আছে। আপনার কাছে আসলে সাহিত্যের যৌনতার ধারণাটা কি রকম? আপনি সাহিত্যের ভাষা নিয়ে অনেক লেখা লিখেছেন, বিশেষ করে আপনার ‘অপ্রকাশের ভার’, এটা তো ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট্। কিন্তু সাহিত্যে যৌনতা, যৌনতার উপস্থাপন নিয়ে আপনার খুব বেশি লেখা নেই বা আদৌ নেই।
হাসান আজিজুল হক: না, হয়ে ওঠে নি, লেখা নেই। যেমন ধর, একটু মোটা দাগের কথাই বলি। তুমি মল ত্যাগ বা মূত্র ত্যাগ নিয়ে কোনো কথা বল? (এটা তো প্রকৃতিক, শারীরিক ক্রিয়া—সাক্ষাৎকারী)। হ্যাঁ, শারীরিক ক্রিয়া। যৌনতার একটা দিক হচ্ছে জৈবিক দিক। সেটা নিয়ে কথা বলা আমার তো কোনো দরকার নেই। বলবো, যদি প্রেমের জায়গায় আসে। অর্থাৎ যেখানটায় এটা আর জৈবিক থাকছে না। জৈবিক দিকটা অপ্রয়োজনবোধে আনি না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কিন্তু এটা তো জীবনের অংশ, সমাজে অনেক বড় ক্রীড়ানক।
হাসান আজিজুল হক: হোক জীবনের অংশ। ওই তো বলছিলাম, কুইন এলিজাবেথও তো বাথরুম করতে টয়লেটে যায়, তাকে তো যেতে হয়। এটা চিন্তা করলে তোমার কি মনে হয়—আরে! তাহলে দেখ। কাজেই আমার আননেসেসারি এই জিনিসগুলো নিয়ে কচলা-কচলি করতে ইচ্ছে না। প্রয়োজন হলে আমি করেছি। দরকার হলে যে করি নি, তা না। যৌনতা ছাড়া ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ হতো? শেষে তো সেখানে একেবারে রীতিমতো ‘ইয়ে’…। ‘মুনতার সংহিনী’, তারপর ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ তো একটা রেপ করা, উপর্যুপরি-পুনঃ পুনঃ রেপ; বিনা যৌনতায় হচ্ছে সেটা? কাজেই, যৌনতা আমার কাছে মনে হয় যে, বাপের বিয়ে দেখার দরকার নেই। হা হা হা (সবাই)
সাক্ষাৎকারগ্রহিতা : যৌনতা প্রসঙ্গে আপনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন। আপনি এখানে বলেছিলেন যে, বাস্তবতা সবসময় যে সাহিত্যে হুবহু চলে আসবে, এমন না। সব সময় বাস্তবানুগ হতে হবে এমনও না। আপনি এখানে একটা উদাহারণ দিয়েছিলেন যে, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় শশীকে যখন কুসুম বলে—ছোট বাবু, ছোট বাবু, আপনাকে দেখলে আমার শরীর কেমন করে। তখন আবার শশী বলে—তোমার মন নাই কুসুম? আপনি সেখানে লিখছিলেন, বাংলাদেশের একটা সাধারণ মেয়ে হয়তো এরকম কথা কখনো বলবে না। কিন্তু মানিক যখন ফিকশনে ওইটা সৃষ্টি করেছে, তখন ওইটা বাস্তব হয়ে গেছে। সেটা হচ্ছে সাহিত্যের বাস্তবতা।
হাসান আজিজুল হক: ‘শরীর শরীর, তোমার মন নেই কুসুম।’ আর এসবের পরবর্তীকালে শশী যখন বলছে, কুসুম চলো, আমরা চলে যাই এখান থেকে। তখন কুসুম কি বললো—কতবার যেতে চেয়েছি, এই কামনা কতবার করেছি। কখনো মুখ ফুটে বলতে পারি নাই। কিন্তু আজকে আর যেতে পারবো না। এটা হচ্ছে যে, হিউম্যান নেচারটাকে একেবারে আগাপাছতলা দেখতে পাওয়া। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো এমন তীক্ষ্ণ চোখওয়ালা মানুষ যে, কল্পনা করা যায় না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তো সেই প্রসঙ্গ ধরে এই প্রসঙ্গ তুলেছিলাম এই জন্য যে, দেখা যায় যে স্যার, সামাজিক ইস্যু, বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক বই লেখা হয়। সেইগুলোর ক্ষেত্রে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যভাবে করেছেন, বা তাঁর ছোট্ট একটা উপন্যাস আছে ‘চতুষ্কোণ’ নামে, যৌনতা নিয়ে চমৎকার বই, সেখানে সাহিত্যে যৌনতার বিষয়টি অনায়াসে বের করে এনেছেন। লেখকরা যখন কোনো বাস্তব ইস্যু তার বইয়ে বা ফিকশনে নিয়ে আসবেন সেক্ষেত্রে বাস্তবতার প্রজেনটেশনটা কি রকম হবে? সেটা নিশ্চয় প্রতিবেদন হবে না।
হাসান আজিজুল হক: না, নিশ্চয় প্রতিবেদন হবে না। তুমি নিজেই বুঝতে পারবে সবটা বলা হয়ে গেল। রাহেলা বলে যে মেয়েটি ছিল, স্কুলশিক্ষয়ত্রী আর সেই ছেলেটা, কেবল মাত্র একটুখানি বড় হয়েছে মাত্র, সে একদিন গেল; হঠাৎ করে সেই মহিলা ওকে ধরে চুমু খেল এবং মোটামুটি ‘ই’ করলো। আমি পুরোপুরি লিখেছি, সেখানে ওই যে চিত হয়ে ঘুমচ্ছিল মহিলা তার ইয়ের বর্ণনা, মানে কোনো কিছু চেপে লিখি নাই। কিন্তু খুব বেশি দূর আমি এগোই নি। ‘সাবিত্রীর উপাখ্যান’ও তাই। রেপের বর্ণনা আছে, রেপ করা হচ্ছে এই বর্ণনাও আছে। এখন রেপ চলছে সে বর্ণনা ডিটেইলসেই আছে। কিন্তু চিন্তা করে দেখ, আমার সেখানে কারোর প্রতি কোনো রিরংসা জাগানোর মতো কোনো বাক্য আমি লিখি নাই। যাতে করে পড়লে আমারও মনের মধ্যে রিরংসা জেগে উঠে। আর সেভাবে আমি করি না কাজ, করা উচিতও নয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তাহলে সাহিত্যে সেক্সকে কোনোভাবে এনজয়েবল করাটা আপনি কি মনে করছেন? সিম্পলি এনজয়েবল করাটা…
হাসান আজিজুল হক: যদি তেমন বিষয় হয় তাহলে করবো। যদি মনে করি এই বিষয়টা শুধুমাত্র সেক্স নিয়ে তাহলে আমি সেভাবেই করবো। সেটার আমি একটা রাস্তা বার করবোই করবো—ঘুরিয়ে হোক আর সরাসরি হোক। কিন্তু কখনো আমার মনে হয় না এগুলো করার জন্য নারী-পুরুষের যৌনাঙ্গের বিবরণ বা ইত্যাদি দেয়ার কোনো দরকার আছে। এগুলোর তো কোনো দরকার নেই। ঠিক জিনিসটা কি, এগুলো তো বলার কোনো দরকার নাই। কেউ বলে না, বলবে কী জন্যে, বলার কোনো দরকার নাই। জৈবিক ব্যাপার কেউ বলে! বাথরুমে গিয়ে কেউ বলে—কি করলো না করলো, বলো তো? হয় না ওটা।
কিন্তু আমি সুচিবায়ূগ্রস্ত লোক বলে মনে করার কিছু নাই। আমি নিজেও সাড়া দেব, সব জায়গায় দেব। আমাকে এখনো যদি কেউ, একটা নির্জন গৃহে কোনো কুমারী যদি আমাকে জড়িয়ে ধরে, তা আমি একদম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো, এটা কি মনে হয় তোমাদের? হা হা হা
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এই প্রসঙ্গে (গাব্রিয়েল গার্সিয়া) মার্কেস একটা বলেছেন যে, যৌনতাকে যখন সাহিত্যে নিয়ে আসা হয়, তখন এটা খুব কঠিন হয় যে, সেটা কমিক হয়ে যায় না হয় ট্র্যাজিক হয়ে যায়। আপনি তো আপনার সাহিত্যে যৌনতা বিষয়টিকে অনেকবার ব্যবহার করেছেন, সেক্ষেএে আপনার সমস্যা বা আপনার অভিজ্ঞতা কী রকম?

………………………………………………..
দেশের রায় বললেন, সালমা আমার খুব স্নেহের পাএী, দিন না লিখে। আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে, লিখে দিলাম। সালমাও আমার বেশ স্নেহের। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, লেখা এক জিনিস আর মানুষটা আলাদা জিনিস। সালমা আমাকে খুব শ্রদ্ধা-ভক্তি করে বা, আমিও তারে খুব স্নেহ করি। কিন্তু সেই কারণে তো তার বই নিয়ে লেখা যায় না।
………………………………………………..

হাসান আজিজুল হক: আমার অভিজ্ঞতা হল কখনো এটার কমিক হয়ে যায়, কখনো এটার আগাগোড়া ট্র্যাজিক হয়ে গেছে এই তো। ‘সাবিত্রীর উপাখ্যান’র মধ্যে এটা ট্র্যাজিক হয়ে গেছে। অথচ এটার মধ্যে একটা রেফ আছে দেখবে—হয়েন সি ইনজয় ইট। ওটা তোমরা পড়েছো কি না জানি না। উপন্যাসের মাঝামাঝি একটা জায়গায়, একটা পরিত্যক্ত স্টেশনে একেবারে ধুলোর উপরে, তখন ওখানে বিবরণ দেয়া আছে—মাঠে অজস্র প্রজাপতি উড়ছে, জমির নাড়ার আড়ালে যে দু’শ-আড়াইশ’ পাখি খায়, তাড়া খেলে এক সাথে ঝাঁক ধরে উড়ে যায়—ও তা-ই দেখতে পাচ্ছে। অর্থাৎ সেক্সও যে উপভোগ করার আছে, এটা ক্লেদ ও গ্লানিকর বিষয় যে নয়, এটাও ব্যবহারের ব্যাপার আছে আরকি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কিন্তু আপনার সাহিত্যেই এটা কম কেন যে, বিশেষ করে আপনার ‘সাবিত্রীর উপাখ্যান’ যখন আমরা পড়ছি, তখন মনে অস্বস্তি হচ্ছে—আপনি ইচ্ছে করে পাঠককে ডিস্টার্ব করতে চাচ্ছেন কোনো কোনো জায়গায়। আপনি পাঠককে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে দিচ্ছেন, এটা কেন করছেন। আপনার পাঠকেরা কিন্তু খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়ে।
হাসান আজিজুল হক: তা, আমি যে মানুষ বাছাই করি। যে কোনো লেখকই লেখবার সময় বাছাই করে লিখে, কি করবে সে। সত্যিকারের লেখক যদি হয়। আমি যে মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো, যেমন—দারিদ্র্য, আমার জীবনে লেখার মধ্যে বিরাট জায়গা আছে, ‘আমৃত্যু আজীবন’ থেকে শুরু করে ‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’ পর্যন্ত। ‘আমৃত্যু আজীবন’র কথা চিন্তা করো, সেখানে একটা গরু মারা গেছে, একটা ষাঁড় মারা গেছে, স্ত্রী বলছে—তাহলে লাঙ্গলের আরেকটা দিকে আমি বই। স্ত্রী নিজেকে অফার করছে। আমি তো তোমার সংসার টানছি, তোমার সব করছি, তুমি কাঁদছো কেন! আমি পারি না তোমায় সাহায্য করতে? বুঝতে পেরেছো, নানাভাবে আমি মানুষকে ব্যবহার করেছি। সেক্সকেও ঠিক ওই ভাবে ব্যবহার করেছি। একটা চরিত্র আরম্ভ করার জন্যে যখন দরকার হয়েছে তখন খুব অশ্লীল কথাও ব্যবহার করেছি। ‘পাতালে হাসপাতালে’ প্রথম দিককার লেখা, ওখানে ব্যবহার করা আছে। রোগীরা গিয়ে চিৎকার করছে, সেখানেও নানা রকম অশ্লীল কথাবার্তা আছে। আমি যেগুলো ডিমান্ড করে, ওই পর্যন্তই। ওটা নিয়ে কচলা-কচলি কোনো ধরনের কিছু করি নি। আমার তো ওই ধরনের ই আছে, ক’জনের আছে বলো যে, গ্রামীণ পরিবেশে ছেলে আর মেয়ে তাদের গ্রামীণ ধরনের প্রেম এবং তাদের গ্রামীণ ধরনের রিঅ্যাকশন। মেয়েটি (ছেলেটিকে) রাতে আসতে বলে তারপর লোকজন ঠিক করে রেখে, তার জামাইকে বলে দিয়ে আচ্ছা মতো করে তাকে ধোলাই খাওয়াল। তারপরে সব শেষের বাক্যটা কি—যে তোর ছেলে রইলো আমার পেটে। (মুনতার সঙ্খিনী)।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কিন্তু সাহিত্যে সেক্সের বিষয়টা হচ্ছে যে, মানুষের বর্তমান সময়ে রূচির পরিবর্তন, অন্তত মানুষের কাছাকাছি থাকার সঙ্গে যুক্ত। একটা সময় তো এটাকে অচ্ছুত রকম দূরে রাখা হতো। পরে এটাকে নিয়ে আসা হল মানুষের কাছাকাছি থাকার একটা প্রচেষ্টা হিসাবে। তো কথা হচ্ছে, সাহিত্যকে মানুষের কাছাকাছি রাখতে বিশ্ব জুড়ে লেখকরা এখন কী করছেন?
হাসান আজিজুল হক: যা পারছে তাই করছে। একেক লোকে একেক রকম করছে। (মিগুয়েল ডি) সার্ভেন্তিসের মতো বড় লেখক ওসব সেক্স-টেক্স নিয়ে মাথা ঘামায় নি। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের মতো এত বড় লেখক, বোঝাই তো যায় অনেক জায়গায় সেক্স আছে,সেক্সুয়াল ঈর্ষা আছে, তা না হলে খুনটা হবে কেন, তাই না। প্রাচীন গ্রীক নাটকে ইনসেস্ট আছে, ভুল করে মায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়া। কিন্তু সুড়সুড়ি দিয়ে সেক্স জাগানোর কোনো চেষ্টা নাই। কোনো দরকারও নাই। আমি ঠিক সেটাই অনুসরণ করি। ঠিক যেমন-যেমন, তেমন; সেটা নিয়ে আমি কচলা-কচলি করতে যাব না। যদি যাই, যদি তেমন কোনো জায়গা থাকে; আদার ওয়াইজ আমি করতে যাব কেন! এই যে আমি জামা-কাপড় পরে আছি, তুমি জামা-কাপড় পরে আছো, না থাকলেও তো পারতো। ও এমন কিছু খারাপ না। হা হা হা…
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তাহলে যৌনতাকে অনেক বেশি সামনে আনেন, যেমন—হেনরি মিলার, ডি এইচ লরেন্স বা ভ্লাদিমির নভোকব যিনি ললিতা লিখেছিলেন। এদেরকে বা এই বইগুলো আপনি কীভাবে দেখেন?
হাসান আজিজুল হক: এর মধ্যে কিছু কিছু বই আছে খুব ভাল। ডি এইচ লরেন্সের কথা ছেড়ে দাও, তিনি একজন অসাধারণ লেখক। হ্যাঁ, তাঁর ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’, এখানে এই সমস্ত দৃশ্যের বর্ণনা পাতার পর পাতা আছে আরকি। ওরকম হলে পর বাগানের যে মালী বলছে, এক জায়গায় আছে দেখ—when you come we fuck. তখন ওই মহিলা বলছে—male do not fuck, animal fuck. আবার তাঁর ‘The horse dealers daughter’-এ, তুমি কি আমাকে দেখে ফেলেছো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়? ‘হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছি তোমাকে, তোমার জামা-কাপড় খুলে ফেলেছো।’ ‘you saw my honour, then you must marry me now.’ মহিলা বলছে—তুমি আমার সম্মানটা যখন দেখে ফেলেছ, এই সম্মান দেখার অধিকারই হল স্বামীর, বিয়ের পরে। আমাকে বিয়ে করতে হবে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তারপর ভ্লাদিমির নভোকব বা হেনরি মিলার এদের কি…
হাসান আজিজুল হক: নভোকবকে আমি কখনো পাত্তা দেই নাই, ফিল্মও দেখেছি, তার ‘ললিতা’কেও আমি পাত্তা দেই নাই। ওর যে ইনসেস্ট, গায়ের জোরে চাপানো জিনিস সব।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এদিক দিয়ে হেনরি মিলার নিশ্চয় তা নয়। তার ‘Tropic of Cancer’, ‘Sex Us’, ‘The World of Sex’, ‘Crazy Cock’ বা ‘Black Spring’?
হাসান আজিজুল হক: আমি হেনরি মিলার খুব ভাল করে পড়িনি। আমার কিছু কিছু পক্ষপাতিত্ব আছে তো সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বিশাল পৃথিবী বিশাল জনগোষ্ঠী, মানুষ, লেখার বিষয় অন্য। সে জন্য এইসব বিষয়গুলো ইনসেস্টিবল, কোনো এক বিশেষ বেখাপ্পা জিনিস নিয়ে লিখলে পড়ি আমি বটে, কিন্তু পড়ে আমি কোনো আনন্দ পাই না এবং পড়ার জন্য কোনো আগ্রহও তৈরি হয় না। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের) সমগ্র ‘গোরা’তে একটা আজেবাজে কথা লেখা নাই। আছে কোথাও?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এটা এমন হতে পারে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ব্রাহ্ম বা মার্জিত রুচির বাইরে যান নাই।
হাসান আজিজুল হক: তোমরা সবাই তাই মনে করো? তখন বলতে হয়, মার্জিত রুচি কি খারাপ?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : না, আবার তা বটেও। কারণ ওটা একটা অবস্থানকে স্থির রাখে, ‘নীচুদের’ স্বীকৃতি দেয় না।
হাসান আজিজুল হক: মানুষের আচরণে উন্নততর রূপ হচ্ছে তার মার্জিত, কী খারাপ মানুষের একটা উন্নত রূপ হচ্ছ মার্জিত চেহারা, উন্নত রূপ। রবীন্দ্রনাথ যদি একটু উন্নততর মানুষ হন তাহলে তো সেরকম করবেন, আমরাও সে রকম হওয়ার চেষ্টা করবো। ‘গোরা’তে কোত্থাও নেই, তা নয়, আছে; ‘ও-রকম’ ভাবে তো নাই। সুচরিতা’র প্রতি তার আকর্ষণ তো আর কম নাই, কিন্তু একটা সময় ললিতা তো বিনয়’র প্রতি আসক্ত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ওখানে কিন্তু খুব কাঁচা জিনিস লিখেছেন কিংবা রবীন্দ্রনাথের কুমু ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে, কী সাংঘাতিক ব্যাপার দেখেছ এটা কিন্তু একটা—বলা যায় যে, সমাজের একটা চেহারা শেষ এবং আরেকটা শুরু। অর্থাৎ সামন্তবাদী সমাজ বিদায় নিচ্ছে, আর ব্যবসায়ী শ্রেণি সমাজে জায়গা নিচ্ছে। মধুসূদন কিন্তু পুঁজিবাদী শ্রেণির একজন লোক আর কুমু ক্ষয়িষ্ণু জমিদার শ্রেণির লোক। তাদের মধ্যে যোগাযোগটা দুর্ঘটনাবশত হলেও হচ্ছে এবং কুমু আর কোনো দিনই যাবে না, কিন্তু যখন শুনলো তার সন্তান হবে, তখন তার সন্তানটাকে কোথায় দেবে সে? তার বাবার কাছেই দেবে। তার মানে তাকে আবার ফিরে যেতে হবেই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সাহিত্যসূত্রে আমরা ‘বিশ্বমানব’ এই শব্দটা ঘুরে ঘুরে শুনি। এই বিশ্বমানব ধারণাটা আসলে কী? এটা এখন দিনে দিনে কিভাবে প্রস্ফুটিত হচ্ছে?
হাসান আজিজুল হক: ‘বিশ্বমানব’ ব্যাপারটা হচ্ছে, ওটা একটা কনসেপ্ট। (কখনো কখনো আপনি নিজেও এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলেছেন—এহ্সান)। হ্যাঁ, ভীষণ ভাবে বলেছি। ওটা একটা কনসেপ্ট, একটা জেনেটিক টার্ম। জেনাস আর স্পিশিজ বলে দুটো আছে, জানো তো? জেনাসের ডিনোটেশন আছে কিন্তু কন্টিনিউশন নাই আর স্পিশিজের ডিনোটেশন আর কন্টিনিউশন-দুটোই আছে।
ওই যে ‘বিশ্বমানব’ আছে না, এটা একটা জেনাস। ওটা একটা বিশাল মানবগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়েছে আরকি। আর ‘বিশ্বমানব’ বলে কোনো বস্তু নাই। আমরা কল্পনায় তৈরি করি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার কাছে এটা কি মনে হয়? বিশ্বমানবের বৈশিষ্ট্য কেমন হবে?
হাসান আজিজুল হক: না না, আমি ওটা নিয়ে ভাবিই না। বিশ্বমানবের কোনো দরকার নেই তো। যে মানুষ আছে না এরাই যথেষ্ট, এরাই উৎকর্ষ, অনুৎকর্ষ করবে, যা করবার তা-ই করবে। আমরা ‘বিশ্বমানব’ বলতে বুঝিটা কি? কে বিশ্বমানব হবে? হু রিপ্রেসেন্টস অল? কিসে?
বিশ্বমানব যদি হয় কেউ, তাহলে তাকে কি গরীব মানুষের খাবার যোগাতে হবে? তাদের প্রত্যেককে বাড়িঘর করে দিতে হবে? আমরা যারা মনে করি যে মানুষ, সাধারণভাবে যে কথা মানুষ সম্পর্কে প্রযোজ্য সেইগুলোই তারা হাইলাইট করে, সামনে নিয়ে আসে, ওই ছোটকে ধরে বড়, অনুর মধ্যেই সমগ্র বিশ্বকে ধারণ করা। এটাকেই আমি মনে করি বিশ্বমানবের কনসেপ্ট। মানে, মানুষকে আমি তা-ই হতে বলি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমার মনে পড়ছে, ২০০৭-০৮ সালে প্রথম আলো সাহিত্য সাময়িকীতে দুই পর্বে আপনার একটা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল ‘সাহিত্যের সমালোচনা কি সম্ভব’-এই শিরোনামে। এবং আপনার এই লেখা পরবর্তিতে প্রায় পাঁচ-ছয় জনের প্রতিক্রিয়া লিখেছিলেন, অনেকেই লিখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দিয়ে প্রতিক্রিয়া ছাপা বন্ধ হয়েছে যে, এর পরে আমরা আর কারো লেখা ছাপবো না। তো আমাকে এটা বলুন যে, আপনি লিখলেন তারপর তারা প্রতিক্রিয়া জানালেন, আপত্তি তুললেন। এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? মানে এর উত্তরে তো আর আপনি কিছুই লিখেন নি।
Hasan
হাসান আজিজুল হক: শোনো, ওই যখন শিল্প-সাহিত্যের নানা রকমের তত্ত্ব বের হলো না—পোস্ট-কলনিয়ালিজম, পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজম, পোস্ট-মর্ডানিজম, সাব-অল্টার্ন—এসব যখন বের হলো তখন আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ওরা যখন ওইসব জিনিস পড়ে, তখন শুধু মনে হয় যে, টেক্সট থাকবে মানুষ থাকবে না, হেন থাকবে তেন থাকবে না। তা দিয়ে তোর দরকার কী! টেক্সট থাকবে মানুষ থাকবে না, তার মানে কি—আমি যেটা লিখব আমি মরে যাওয়ার পরেও সেটা থাকবে। টেক্সট দাঁড়িয়ে যাবে, হাসান আজিজুল হক থাকবে না, ব্যস। টেক্সট রিমেইন, দ্যা অথর ইজ ডেড, ওকে তা হোক, ভাল কথা। কিন্তু টেক্সট আগে না পরে, অথর যেমন আগে আর সমালোচক যেমন পিছনে সেখানে আমি ওদেরকে বলতে চেয়েছি যে, এত বাহাদুরি কোরো না, পেছনে থাকো। ওই স্রষ্টা যদি কিছু লেখে তবেই পোস্ট-মর্ডানিস্ট কিছু আলোচনা তুমি করতে পারবে। যদি কিছুই জানা থাকে, তাহলে তু্মি কী নিয়ে আলোচনা করবে! সেজন্যেই বলে ছিলাম—সমালোচনা কি সম্ভব। তখনই সম্ভব যখন লেখক থাকেন, যখন ক্রিয়েটর থাকে, যখন ক্রিয়েটেট গ্রাউন্ড থাকে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এটা একটা দারুণ বিষয় যে, আপনার সেই লেখার পরবর্তিতে সেলিম রেজা নিউটন সেটার দীর্ঘ একটা আলোচনা করে ছিলেন। পুরো সাহিত্য ধরে কথা বলে ছিলেন। আপনারা দু’জন তো একই ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন। সেদিক দিয়ে এই লেখা এবং লেখার পরবর্তিতে আপনাদের সম্পর্কটা যদি বলতেন।
হাসান আজিজুল হক: সম্পর্ক আবার, ও তো আমার স্নেহের পাত্র। বললো যে, স্যার আমি এসব লিখেছি। তো লিখেছ বেশ করেছ। বলে যে, আপনার বিরুদ্ধে লিখেছি। লিখেছ, আরে কি মুশকিল, লিখবে না কেন, ছাপতে দাও!
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তার ক্রিটিসিজম সম্পর্কে যদি বলেন। তার সমালোচনার বিষয় যদি বলেন যে, সে যখন সমালোচনার সঙ্গে আপনি অ্যাগ্রি করেন কি না?
হাসান আজিজুল হক: না না, কোনো ভাবেই না। ওর স্ট্যান্ডটা প্রোপার নয়। ও হলো উটকো মর্ডান। ওই মর্ডানিজম, মর্ডানিজম নয়। ওরা সবাই আরকি। এরা তত্ত্ব কেন্দ্রিক। এরা হঠাৎ করে কিছু সাহিত্য তত্ত্ব-টত্ত্ব পড়েছে, আঁদব্রে ব্রেতো, রেনে দেকার্দ পড়েছে। (এখানে জ্যাক দেরিদার কথা উল্লেখ ছিল—সাক্ষাৎকারী)। হ্যাঁ, দেরিদা, অনেক কিছুই পড়েছে। ওর আর কই কি, দেকার্ত মনে হয় না, অত সহজ না। যাই হোক, এ জন্য ও যে লিখেছিল, তার আর আমি কোনো জবাব দেই নি। আরেকজন কে যেন বলেছিল যে, স্যার জবাব দেয়ার দরকার নাই, আমরাই কেউ লিখে দেব। ষাঁড় দেখে আসার পরে ব্যাঙের মা জিজ্ঞেস করছে ব্যাঙকে যে, ‘কত বড় জিনিস দেখে আসলি?’ উত্তরে ব্যাঙ বলে যে, ‘অনেক বড়।’ ‘আমার চাইতে বড়?’ ‘হ্যাঁ, তোমার চাইতে অনেক বড়।’ তারপর ফুলতে শুরু করলো না, ক্রমাগত—এর চাইতে বড়? এর চাইতে বড়? এর চাইতে বড়? অবশেষে ফুটেই গেল। আমি নিউটনকে বলি যে, ফুলবি তুই? ফুলতে ফুলতে তুই ফেটে যাবি। আমি ওর কোনো জবাব-টবাব দেই নি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এরপরেও বোধ হয়, আমি যদি ভুল না করে থাকি, আপনি সম্ভবত সেলিম রেজা নিউটনের একটা বই ছিল এমএন রায়ের(মানবেন্দ্র নাথ রায়) ওপর ‘নয়ামানবতাবাদ’ নামে, ওই বইয়ের ফ্ল্যাপে আপনার একটু ভূমিকাও ছিল যে, নিউটন অনেক পড়ুয়া? (হ্যাঁ, অনেক পড়ুয়া—হাসান আজিজুল হক)। আপনার সমালোচনা, বলতে গেলে আপনার কঠোর সমালোচনা করলেন, তারপরও তার প্রতি আপনার বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই।
হাসান আজিজুল হক: না, তার প্রতি আমার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। বলি যে, বলবে না কেন, আমার বিরুদ্ধে বললে অসুবিধাটা কি! একদিন আমি একটা সেমিনারে কথা বলে আসলাম, ও (নিউটন) একটা প্রবন্ধ পড়বে, সেটা প্রায় পঞ্চাশ কি ষাট পৃষ্ঠার প্রবন্ধ। আমি উঠে পড়ে বললাম যে, এতবড় প্রবন্ধ সংক্ষেপ করা, আমার মনে হয় যে যারা এই সেমিনারটা করেছেন, তাদের কাণ্ডজ্ঞানের অভাব, আর যিনি পড়তে এসেছেন এক সাথে আশি পৃষ্ঠা তারও কাণ্ডজ্ঞানের অভাব। আমি এতক্ষণ থাকতে পারছি না—বলে আমি উঠে চলে এলাম। আমি যখন উঠে চলে আসছি তখন বলছে যে, স্যার আপনি চলে গেলেন! শুনলেন না স্যার, আপনার তো অনেকেই আছে, প্রথম আলো আছে, এ আছে তা আছে, আমাদের তো সেভাবে কেউ নেই, সে কারণে তো এভাবে পড়তে হয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমার লেখার আরেকটা সামালোচনার কথা মনে আছে যে, আপনার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা না ব্যবস্থার বিরোধিতা নিয়ে সুবিমল মিশ্র কিন্তু একটা বড় লেখা লিখেছেন, আপনি কী দেখেছিলেন ওটা।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, সুবিমল লিখেছিল। সুবিমলের কথা থেকেই বলে ছিলাম, সুবিমল বলেছিল আমরা সবাই প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখক এবং সে সমস্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত লেখক যারা আছেন, আনন্দবাজার বা এইসব পত্রিকায়, তাদের আমরা প্রস্রাব করি। তখন আমি আবার লিখেছিলাম যে, প্রস্রাব তুমি করতে পারো, প্রস্রাব করলেও ওই প্রস্রাব করাই সার হবে। অ্যা, আর একবার প্রস্রাব করলে আরেকবার প্রস্রাব করার জন্য কয়েক ঘন্টা সময় লাগে, মাঝখানে গ্যাপ দিতে হয়। কিন্তু আনন্দবাজারের বিল্ডিং যেমনটা তেমনই থাকবে। হা হা হা…। প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করে কোনো লাভ নেই। আমি বললাম যে, মুগুরটা দেখছো, মুগুরটা যে মারছে তাকে দেখতে পারছো না! তোমার মাথায় মুগুর পড়ছে, এই মুগুরের বিরুদ্ধে তোমার লড়াই করে কি হবে?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তাহলে, আমরা কলকাতার আনন্দবাজার-এর কথা বলি আর আমাদের এখানের প্রতিষ্ঠানগুলো কথা বলি, এদের ব্যবস্থার সমালোচনা করে কোনো ভাল আছে নাকি? তাহলে বিরোধিতা কী করে সম্ভব?
হাসান আজিজুল হক: লাভ এইটুকুই, যদি প্রতিষ্ঠানকে ভাঙা যায়। বলতে হবে ভাঙার কথা, না ভাঙলে নতুন গড়ার কথা উঠবে কোত্থেকে? আমি তো মার্কসিস্ট, অধিকাংশ লেখাকে তো তা-ই মনে করে, তাহলে আমি ভাঙার কথা বলবো না? মার্কসবাদের প্রথম কথাই হচ্ছে, প্রথমে ভাঙো, তারপরে গড়। ভাঙতে তো হবেই। না ভাঙলে হবে কেমনে? তা না হলে আমি রবীন্দ্রনাথের মতো লিখবো? নাকি ভাঙবো, বল? আমি কি শরৎচন্দ্রের মতো লিখবো? নাকি ভাঙবো, বল?

………………………………………………
কলকাতায় তেমন বড় লেখক দেখি না তো। যদি করতে হয় তাহলে সাধন, অমর, স্বপ্নময়–এদের নামই করবো এবং খুব অসাধারণ কিছু নয়।
………………………………………………….

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনি তো প্রথমেই ভাঙবেন।
হাসান আজিজুল হক: ভাঙবো। আমার পরে যারা লিখবে তারা আমাকে ভাঙবে না? আমাকে জায়গা দিতে হবে। জায়গা দিতে গেলে আমাকে যদি ঘুসি-ঢুসি-কুনই মারতে হয়, আমাকে তাহলে করতে হবে সেটা। সেজন্যই ওই কথা বলেছি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সেদিক দিয়ে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, মানে যে প্রতিষ্ঠানগুলো অচলায়তন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার সমালোচনার দরকার আছে অবশ্যই। কিন্তু সমালোচনা করে তার কি কোনো বদল ঘটনানো সম্ভব, নাকি বিকল্প সন্ধান বা গড়ে তুলতে হবে?
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, তার বিরুদ্ধে লেখ। কিন্তু ওই কথা কেন, ওখানে আমি যাবো না—এই ভঙ্গিটা নিল। কই, সুবিমল মিশ্র কি প্রতিষ্ঠান ভাঙতে পেরেছে। সুবিমল মিশ্র কোথায় এখন! তুমি কি সাহিত্য করবে, না তুমি বলবে যে, প্রতিষ্ঠান বিরোধী লেখা লিখব, অ্যা?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : একবার অরুন্ধতী রায়কে এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আপনি যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লিখছেন, কিন্তু সেই রকমই একটা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে বই প্রকাশ করছেন। তার উত্তর হচ্ছে, আমার বার্তাটা পাঠকের কাছে পৌঁছানো দরকার। যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানগুলো তল পর্যন্ত আছে তাই এই পাইপ লাইন দিয়েই বার্তাটা আমি সেখানে পাঠাচ্ছি। (উপায় নেই তো—হাসান আজিজুল হক)। এটা ছিল তার মন্তব্য। আপনার মন্তব্যটা কি?
হাসান আজিজুল হক: প্রায় কাছাকাছি। আমি কি করবো, ধর- আমি কি হাতের লেখা বই, একটা কপি করে কিছু করতে পারবো? আমাকে প্রেসের কাছে যেতে হবে, প্রিন্ট করতে হবে। তারপর প্রিন্ট করে সেগুলো যদি ঘরের মধ্যে রেখে দেয়, তার কোনো লাভ আছে। তাহলে আমাকে কী করতে হবে? আমাকে বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যেই, যেটুকু আমি বেশি প্রকাশ করতে পারবো, যতটা অংশে, সেইটা আমাকে করতে হবে।
আমাকে অনেকে বলেন, আপনি প্র্রথম আলোতে লিখেন, অমুক ‘ই’তে লিখেন! এর দালাল-টালাল, ইত্যাদি। বলি যে, দালাল সবাই। এটা হচ্ছে বোঝার ভুল যে প্রথম আলো’র দালাল। যেটা হচ্ছে, এই রাষ্ট্রটাই হচ্ছে এর ভুক্তভোগি। এই রাষ্ট্রটাই তাদের, তারাই মালিক।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এই বিরোধিতার জায়গা থেকে, আমরা যতটা বুঝি, এক সময় তো আপনি লেখক শিবিরে যুক্ত ছিলেন। এমন আরো কিছুতে…
হাসান আজিজুল হক: কোনটার সঙ্গে ছিলাম না বলো? লেখক শিবির বল, প্রগতি লেখক সংঘ বল, তারপর সব চেয়ে বড় কথা, জাহানারা ইমামের ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ সেটায় তো খুব কঠিনভাবে ছিলাম রাজশাহীতে। আমি সমাজের সামান্য কাজে লাগতে পারি এরকম জায়গা পেলে নিজের একাত্মতা ঘোষণা করি এবং তাদের সঙ্গে থাকি। হয়তো বলবে এটা তো লেখকের কাজ নয়। আমাকেই অনেকে বলেছে—আপনার তো এই কাজ নয়। আমি বললাম—না, এই কাজগুলো আমার। লেখক কি সমাজের বিচ্ছিন্ন কোনো জীব নাকি? তা তো নয়, কাজেই আমাকে থাকতেই হবে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সেদিন আপনার অনুবাদে হেমিং ওয়ের গল্প পড়ছিলাম। আপনি অনেক দিন যাবত হেমিং ওয়ের অনুবাদ করছেন। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে আপনি আমাকে জানিয়েছিলেন, আপনি তাঁর সমগ্র গল্পই অনুবাদ করতে চাচ্ছেন। উৎসাহের জায়গাটা যদি বলতেন।
হাসান আজিজুল হক: হেমিংওয়ের একটা গল্পই অনুবাদ করেছিলাম মূলত। সেটাই লোকে একটু বেশি মনে রেখেছে, Old Man at the Bridge. এটার অনুবাদ আমি প্রথম করেছিলাম এবং সেটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এবার একটা ছাপা হল বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার-এ।
হাসান আজিজুল হক: এবার একটা ছাপা হয়েছে উত্তরাধিকার-এ, আরেকটা ছাপা হয়েছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কালি ও কলম-এ। কালি ও কলম-এ THE SNOWS OF KILIMANJARO ছাপা হয়েছে, আর উত্তরাধিকার-এ বোধ হয় (আমি এখনো পাই নাই) ‘শ্বেতহস্তীর মতো দেখতে পাহাড়গুলি’(Hills Like White Elephant)। এর সঙ্গে আর কয়েকটি গল্প আছে—THE FEBLE OF THE GOOD LAON (এটার অনুবাদও পাক্ষিক অন্যদিন-এ বেরিয়ে গেছে), তার পরে হচ্ছে A SMALL CLEAN WELL LIGHTED PLACE. THE CAPITAL OF THE WORLD-এটা করিনি, THE SHORT HAPPY LIVE OF FRANCIS MACOMBE-এটাও করিনি, এটা অনেকেই করেছে। বোধ হয়, সুনীল গাঙ্গুলিও করেছে। আমার বড় গল্পটা হচ্ছে THE SNOWS OF KILIMANJARO, বিশাল গল্প। তো এই সবগুলো নিয়ে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন বই করছে। আমি হেমিং ওয়ের উপর একটা প্রবন্ধ লিখছি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার অনুদিত A SMALL CLEAN WELL LIGHTED PLACE-এটা কি অনুবাদ করেছেন?
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, ওটা অনেক আগেই বেরিয়ে গেছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার THE OLD MAN AT THE BIDGE অনুবাদটা পড়ছিলাম। অনুবাদের ক্ষেত্রের যত্নটা চোখে পড়ার মতো। পড়তে অনেক আনন্দ লাগে। আমি এমনও অনুবাদ পড়েছি, বাংলাদেশের ‘অতি বিখ্যাত’ অনুবাদক কবীর চৌধুরী হেমিং ওয়ের ছয়টা গল্প এবং নাদিম গার্ডিমারের ছয়টা গল্প নিয়ে একটা বই করেছিলেন। সেখানে হেমিং ওয়ের A SMALL CLEAN WELL LIGHTED PLACE গল্পটায়, দু’জন বৃদ্ধলোক যে বারে আসে এবং চুপ করে বসে থাকে আর বারের দুজন তরুণকে যে স্প্যানিস ভাষায়-নাদা নাদা (নাথিং নাথিং-বলে। কবীর চৌধুরী অনুবাদে ওই অংশ বাদ দিয়ে গেছেন। যেন ওটুকু কিছুই না। এমন হয়েছে যে প্যারা বাদ দিয়ে গেছেন। তো, ওই স্প্যানিস অংশ তো টিকা-টিপ্পনি দিয়েও তো বলা যেত। তিনি তো খুব নামি অনুবাদক আমাদের দেশে, তাহলে অনুবাদের এই অবস্থা কেন?
হাসান আজিজুল হক: উনি বাদ দিয়ে গেছেন! কী যেন। বাংলাদেশে অনুবাদের অবস্থা খুব খারাপ। উনি সংখ্যায় অনেক করেছেন, অনেক রকম করেছেন, যেগুলো কেউ করে নাই। ওর অনুবাদ ভাল নয়—সোজা কথায়, এটা আমার মন্তব্য। অনুবাদ যেটুকু করেছেন সৈয়দ শামসুল হকের অনুবাদ ভাল ছিল। তিনি শেক্সপিয়রের অনুবাদ করেছেন, তাছাড়া ‘শ্রাবণ রাজা’ (RAIN KING) করেছেন, তিনি ইচ্ছে করলে ভাল অনুবাদ করতে পারতেন।
হাসান আজিজুল হক : আর আমার খুব আগ্রহ আছে হেমিং ওয়ে অনুবাদ করা, রবার্ট ফ্রস্ট করা।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার চমৎকার অনুবাদ আছে কবি শামসুর রাহমানের।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, আমি আরো করেছি ফ্রস্টের, ওঁর গুলো আমি করিনি বরঞ্চ। তার আমার কাছে এডগার এলান পো’র দুটো কবিতা আছে, TO HELEN. জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’-এর মতো। জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ও কিন্তু দুটো কবিতা আছে। ‘বনলতা সেন’-এর তার চেহারার বর্ণার মতো ওখানেও ঠিক তেমনি। কবিতায় যেমন-‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা… [‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, / মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ‘পর / হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা / সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,’], ওখানেও আছে যে, সামুদ্রিক ঝড়, লতাপাতা আছে সেগুলো তারা নিয়ে যাবে, গাছের ছাল নিয়ে যাবে, সমুদ্র পেরুবে, তার নারীদের দিবে–এ রকমটা দিক আছে। [‘On desperate seas long wont to roam, / Thy hyacinth hair, thy classic face, / Thy Naiad airs have brought me home / To the beauty of fair Greece, / And the grandeur of old Rome.’]
আমি কবিতা পড়ি লোকে জানে না, আমি যথেষ্ট কবিতা পড়ি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ি তারপর ত্রিশের দশকের কবিদের পড়েছি একটু ভাল করে। একালের কবিতা তেমন একটা পড়া হয় না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : একালের বলতে, ঠিক কাদের পর্যন্ত এসে মিশেছে?
হাসান আজিজুল হক: শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী, আল-মাহমুদ, বেলাল চৌধুরী। এর পরে আর পড়িনি বলবো না, এদেরকে যেমন আমি ডিস্টিংগুইস্ট করতে পারি, কিন্তু এখন যারা লিখছে তাদেরেকে নিজের সঙ্গে পরিচিত করতে পারি না যে। হ্যাঁ, তারা এই লিখছে, এর মুদ্রাদোষ এ রকম, ওর মুদ্রাদোষ ওই রকম। প্রত্যেক মানুষেরই মু্দ্রাদোষ আছে। মুদ্রাদোষই মানুষের স্বাতন্ত্র। ওই মুদ্রাদোষটা একালে যারা লিখছে তাদের কাছ থেকে ঠিক পাচ্ছি না।
কামাল চৌধুরীর কবিতা পড়ছি। দেখি কিছু আছে কি না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কেমন লাগছে পড়ে?
হাসান আজিজুল হক: ওর কবিতায় কিছু আছে মনে হয়। আর বাকি কবিদের বেশির ভাগই আমি পড়তে পারছি না। তোমাদের কি ওপেনিয়ন জানি না, কি পড় জানি না। কার কবিতা পড়তে হবে তেমন করে কেউ বলেও নি আমাকে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনি মুদ্রাদোষের কথা বলছিলেন যে, প্রত্যেক লেখকেরই মুদ্রা দোষ আছে যা তাকে স্বাতন্ত্র দেয়। লেখকদের মধ্যে কেউ কি আপনাকে কেউ বলেছে যে, হাসান আজিজুল হকের এই এই মুদ্রাদোষ আছে।
হাসান আজিজুল হক: আমি জানি না সেটা। মুদ্রাদোষ নিশ্চয়ই আমারও আছে। ‘শুধু কি আমারই মুদ্রাদোষে আজ অতিথি একেলা…’
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হেমিংওয়ের কথা বলছিলাম। তার প্রতি আপনার এই আগ্রহ কেন?
হাসান আজিজুল হক : হেমিংওয়ে আমি পছন্দ করি অনেক অগে থেকে। এক সময় পার্ল পাবলিকেশন ছিল, সেটা এক সময় আমেরিকান ইউএসআইএস-এর ঢাকাতে বিরাট লাইব্রেরি ছিল। নানা জায়গায় ইউএসআইএস-এর লাইব্রেরি ছিল। সেখানে সমস্ত বই পাওয়া যেত। রাজশাহীতে যখন পাওয়া যায় তখন আমি সেইখানে পেয়েছিলাম THE OLD MAN AND THE SEA, আর পেয়েছিলাম A FAREWELL TO ARMS. সে খুব উন্নত সংস্করণ। তারপরে তো পেঙ্গুইন-টেঙ্গুইন বের করেছে। হেমিংওয়ের সেই A FAREWELL TO ARMS-এর মধ্যে অনেকগুলো পেন্সিল ঘষা স্কেচ আছে। সেগুলো আমাকে খুব টানতো। তারপরে আমি দেখলাম যে, হেমিংওয়ের মতো এমন খটখটে গদ্য খুব কমই লিখে, এতটুকু ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব নেই এবং ওভার স্টেটমেন্ট নেই। বরং বড় বড় ঘটনাকে আন্ডার স্টেটমেন্ট দিয়ে কড়া করে লিখেছেন। খুব বড় ঔপন্যাসিক হয়েছেন যে—সে নয়। কিন্তু তিনি আমার খুব পছন্দের ঔপন্যাসিক, খুব খুব খুব পছন্দের। A FAREWELL TO ARMS-এর শেষ দৃশ্যগুলো, ক্যাথরিনের সঙ্গে তার ভালবাসার দৃশ্য, ওর আহত হওয়ার অভিজ্ঞতা, দুইজনই যেহেতু যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছে তাই ধরা পড়বে ধরা পড়বে অবস্থা, ওরা সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে গেল, ক্যাথরিনের পেটে বাচ্চা, প্রসবের সময় হলো, হসপিটালে দিয়ে এলো, হসপিটালে উঠলো নিজে, তার একদিন পরে খবর পেলো যে তার স্ত্রী প্রসব করতে গিয়ে মারা গেছে, বাচ্চাটিও মারা গেছে। শেষ কথাগুলো খুব করে মনে পড়ে যখন নার্সদের ঠেলে ভেতরে এসে দেখে স্ত্রী ক্যাথরিন নিথর শুয়ে আছে, তার সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলছে-It was like say good bye… হেমিংওয়ের এই স্টাইল আমার ভাল লাগলো। উইলিয়াম ফকনারকে আমার ভাল লাগে নাই। ফকনার খুব গভীর লোক। তাঁর The Bear, A rose for Emili-এর মতো কিছু কিছু গল্প ভাল লাগে। The Bear-এর একটা এনলার্জড ভার্সন আছে, ১ শ ৩৬ পৃষ্ঠা।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমরা ছোটটা পড়েছি, বড় যে আছে তা জানতামই না।
হাসান আজিজুল হক: তোমরা হয়তো ছোট্টটা পড়েছো, ৯-১০ পৃষ্ঠা। তার ‘গো ডাইন মোজেস’-এর মধ্যে বড়টা আছে। আমার আসলে, এছাড়া আর পড়তে ধৈর্য হয় নাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সেদিক দিয়ে, সবাই যেটা বলে যে, ফকনার পড়াটা একটু কষ্টকর, হেমিংওয়ের চেয়ে।
হাসান আজিজুল হক: বটেই বটেই। ডিফিকাল্ট তো বটেই। হেমিংওয়ে পড়া খুব আনন্দদায়ক, বিশেষ করে তার ‘দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’। আমার ইচ্ছে আছে এর একটা অনুবাদ করা। এর একটা-দুটো অনুবাদ বেরিয়েছে, বাংলাদেশে ১টা, পশ্চিমবঙ্গে একটা-দুটো বেরিয়েছে। তবু আমার মনে হয় যে, আমি একবার করে দেখবো। একটা-আধটা ছাপা হলে মানুষ যদি মনে করে যে চমৎকার হয়েছে, তাহলেই পুরোটা করবো। তা না হলে আমি অনুবাদ করতে গিয়ে ‘দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’ নষ্ট করতে চাই না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনি যে মুগ্ধতার কথা বলেন যে, তাঁর আন্ডার স্টেটমেন্ট বা বাক্য গঠনে যে জার্নালিস্টিক প্রোজ বলা হয়, হেমিংওয়ের পরে ধারাই হয়ে গেছে জার্নালিস্ট ধারা—অল্প কথায় অনেক বেশি কথা বলা। এটাই কি আপনার স্টাইল তৈরিতে সাহায্য করেছে।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, এই জন্য দেখ না, আমি কি খুব বেশি কথা বলি লেখাতে? গ্যাজাই শুধু শুধু? আমি কিন্তু করি না সেটা। হ্যাঁ, বর্ণনা বেশি আছে আমার, হেমিংওয়ের বর্ণনাও খুব আছে, কিন্তু ওরকম বর্ণনা নয় আরকি। হেমিংওয়ের A FAREWELL TO ARMS আছে, NOW THERE THS SOMEONE COME, RIVERS ARE FULL, WE CAME IN THE RINE.
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হেমিংওয়ের THE CAMP গল্পটা পড়লে, আমার কাছে, ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মানুষের জন্ম’ গল্পটার কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, দুটো প্রায় প্যারালাল পড়া যায়।
হাসান আজিজুল হক: ওহ্, ওর মতো কতগুলো গল্প হেমিংওয়ের আছে। তার মধ্যে HE DID NOT FILL LIFE, আর ওই গল্পটা ‘সেতুর ধারের বুড়োটি’, এগুলোতে যুদ্ধ পরবর্তীকালে বিধ্বস্ততা চোখে পড়ে। নির্জন মানুষ, হয়ত স্ত্রী মারা গেছে, মেয়েরা ছোট করে চুল রাখছে, বড় চুল আর রাখছে না কেউ। এগুলো তাদের মেয়েলিপনা যেটা, সেই মেয়েলিপনাটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার্ধক্যে পৌঁছেও প্রচুর ভূমিকা লিখছিলেন। তাঁর স্নেহাস্পদ, তাঁর অনুগতদের, তাঁর থেকে অনুপ্রাণিতদের– তাদের বইয়ে লিখছিলেন। সেটা হচ্ছে তাঁর সাহিত্যে অভিভাবকত্বের বিষয় ছিল। তিনি তাদের জন্য প্রচুর লিখেছেন, ভূমিকা হিসেবে কবিতা লিখে দিচ্ছিলেন। এই ভূমিকাটা কখনো কখনো আপনাকে নিতে হয়। অভিভাবক হিসেবে আপনি তরুণদের কীভাবে উৎসাহিত করেন।
হাসান আজিজুল হক: জঙ্গল একটা, তুমি ঢুকছো, নিজের রাস্তা নিজে কাটো। এছাড়া কোনো ব্যবস্থা নাই। এটা রেডিমেড কোনো ঔষধ খেয়ে হবে না, কোনো কিছুতেই হবে না। তারপর আর বলতে হবে না কিছু।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার উপন্যাস শুরু করার আগে পুরো সময়টাই গেছে গল্পের মধ্যে। এই সময় যারা তরুণ লিখছে তাদের নিয়ে আপনার কী মন্তব্য।
হাসান আজিজুল হক: তার আগে প্রবন্ধ, বাচ্চাদের জন্য লিখেছি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছি। এই সময় যারা লিখছে তাদেরকে ওই কথাটাই বলবো। আর এই মুহূর্তে যারা গদ্য লিখছে তাদের সবার নামই তো জানি না আমি। কে লিখছে—আহমাদ মোস্তফা কামাল, শাহীন আখতার, শাহনাজ মুন্নী, আকিমুর রহমান? কই কই? আমি তো দেখছি না, বলো। এরা তো কেউ নিয়মিত লেখক না। যেমন আহমাদ মোস্তফা কামাল, হবার কথা ছিল, কিন্তু লেখেনি সে বেশি আর। স্বকৃত নোমান আবার লিখতে শুরু করেছে। আমি বলবো যে, এদের লেখা খারাপ হচ্ছে না। কারো লেখা খারাপ আমি বলব না। কিন্তু এরা স্টিক করছে না, আর ডুব মারছে না। একবার দীঘিতে ডুব দিলে দীঘির উপরের দুই হাত পানি খুব গরম হয়ে আছে। দু’হাত নিচে নামলে হিম ঠাণ্ডা। আমাদের বিরাট দীঘি ছিল, একদম যখন তলায় গিয়ে পৌঁছতাম তখন আমি বসে থাকতাম অনেকক্ষণ, তারপর ভুস করে উঠতাম। আমি লেখকদের প্রতি সেই কথাই বলি। একদম ডুব দাও নিজের মধ্যে, একদম তলায় পৌঁছে যাও। তারপর গিয়ে লেখ। তা না হলে শুধু শুধু নিজেকে ভারাক্রান্ত করে লাভ কী আছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এখন হচ্ছে, বই মেলাতে গেলে আমরা যেটা টের পাই—হাসান আজিজুল হক স্যার কোনটার ভূমিকা লিখল বা ভূমিকাটা কে লিখল, এটা একটা গুরুত্বপুর্ণ ইস্যু। আপনি যাদের ভূমিকা লিখছেন তাদের সম্পর্কে মন্তব্য কী আপনার? সব বই নিশ্চয় পড়ে লিখেছেন?
Hasan-4হাসান আজিজুল হক: কি করবো, এসে বলে যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা হচ্ছে—অনুরোধের ঢেঁকি গেলা, ওটা কোনো ব্যাপার না। ভূমিকাটা লিখব খুব কম লিখেছি। ইচ্ছে করে, হ্যাঁ, এই যে আমি ভূমিকা লিখব, এরকম ভূমিকা খুব কম লিখেছি, লিখিই নাই বলতে গেলে। আমার এক বন্ধু একবার অনুবাদ করে ছিলেন আফ্রিকার গল্প, ‘ফিরে এসো আফ্রিকায়’ এই নাম দিয়ে। তিনি ছিলেন শাহীন আখতারের শ্বশুর। এই বইটার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলাম, এই দেড় পাতা। এরকম কিছু কিছু বই আছে তা নিয়ে ইচ্ছে করে লিখেছিলাম। তা ছাড়া বাকী সবই জানবে যে, অমুকে ধরেছে—স্যার দু’লাইন লিখে দেন। তাদের লেখা পড়াও হয় না ভাল করে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কিন্তু আপনি যখন ভূমিকা লিখছেন, যখন আলোচনা লিখছেন বইটার সেটা তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হাসান আজিজুল হক: আলোচনা কই লিখছি?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমরা এর আগে পড়লাম, কাজী শাহেদ আহমেদের ‘ভৈরব’ উপন্যাস নিয়ে একটা বড় লেখা ছিল আপনার।
হাসান আজিজুল হক: ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ। বেচারা শাহেদ লিখেছে। কাজী শাহেব টেলিফোন করছে, বলছে—ভাই, বড় ভাই আপনি আমার, আমার এই ‘ভৈরব’ নিয়ে কিছু লেখেন। তখন আমি দেখলাম যে, খুব খারাপ লেখেনি ভৈরব সে। সে তার বাল্যকাল নিয়ে লিখেছে। ভৈরব নদীটা হচ্ছে খুলনার মধ্যে। এই নদী আমিও চিনি, এই নদী আমিও সাঁতরে পার হয়েছি। নদীর আশেপাশের বাজার, সেই সব বাজারে মাল-টাল নিয়ে যেত হতো, আমার তখন ওইসব জায়গাগুলো বেশ ভাল লেগেছিল। সেই জন্যে লিখেছিলাম আরকি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কিন্তু উপন্যাস হিসেবে ‘ভৈরব’ কতটা হয়ে উঠেছে?
হাসান আজিজুল হক: ওটা আমি উপন্যাস বলি না, ওটা একটি স্মৃতি মিলিয়ে আরকি। তারপর আমি সরাসরি বল্লাম, ভাই ওটা আবার কী জিনিস হল? রাজাকার আপনার বাড়িতে এসেছে, আপনার ছেলের বৌ খোঁজ করছে, আপনি ঢুকলেন, ঢুকে দেখলেন যে কারা কারা আছে। দেখলেন স্ত্রীর মৃতদেহ পড়ে আছে না কি যেন মনে পড়ছে না, তখন সেখানে একটা টুল ছিল, ওই টুল দিয়ে সেই লোকটার মাথাটা দু’ভাগ করে দিল। করে দিয়ে বললো যে, যা হিন্দুস্থান-পাকিস্তান করে দিলাম। এই বলার পরই সে এক গ্লাস পানি নিয়ে বাড়ির সামনে যে তেঁতুল গাছ ছিল সে তেঁতুল গাছের মগডালে উঠে পড়লো। মগডালে উঠে তারপরে বলল যে, প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে, এতক্ষণে পানি খাইনি। এইবার আমি পানি খাব। ডগ ডগ ডগ ডগ করে পনি খেয়ে নিয়ে আপনা আপনি, ইচ্ছে করে ওখান থেকে নিচে পোড়ে গেল। আমি বললাম—ভাই, এই মেলোড্রামাটা কেন করতে গেলেন? সে বলল, আমার ও-রকম মনে হল, দেই ও-রকম। হা হা হা। লোকটা খুব মজার। বললো, আমার কোনো কথা শুনলো না, সোজা উঠে পড়লো আরকি। আমি কি করবো! আমিও তেমনি উঠিয়ে দিলাম এবং মেরেও দিলাম।
লোকটা খুব মজার মজার গল্প করতো। জিজ্ঞেস করতো, বাড়ি কোথায়? ‘রংপুর’। ‘রংপুর! বা বা বাহ্। রংপুর অনেক ধান চাষ হয়, পাট চাষ হয়।’ (রংপুরে তো মঙ্গা লেগে থাকে!—সাক্ষাৎকারী)।
তারপর জিজ্ঞেস করলো, তোমার বাড়ি কোথায় ভাই? ‘আমার বাড়ি বগুড়া।’ ‘বগুড়া! বগুড়া তো, ওহ্, কি সুন্দর আলু হয় বেগুন হয়।’ (আলু তো হয় সিরাজগঞ্জ-যশোরে!—সাক্ষাৎকারী)
আপনার বাড়ি কোথায়? বললো যে, ‘কুষ্টিয়া।’ ‘কুষ্টিয়া! কুষ্টিয়াও তো খুব সুন্দর জায়গা।’ তারপর জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ ‘আমার বাড়ি ঢাকায়।’ ‘ওওও, আচ্ছা ভাই, ঠিক আছে, ঠিক আছে, দরকার নেই, দরকার নেই।’
মানে জন্মস্থান ঢাকা। হা হা হা। এতটা খচ্চর না ও! হা হা হা । সেজন্য লিখেছিলাম মজা করে। তারপর আবার ওটার ইংরেজি অনুবাদ বেরিয়েছে। তখন আর আমি কিছু করি নাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : ‘ভৈরব’ তো একটা পুরস্কারও পেয়েছে। এবং এটা গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে, আমরা যখন দেখি হাসান আজিজুল হক এটার ভূমিকা লিখছেন, সুতরাং এটা আমাদের পড়তে হবে, ভেতরে ভেতরে গুরুত্ব দেয়ার বিষয় আছে।
হাসান আজিজুল হক: তেমন বই নয়, তবে পড়ে দেখতে পারো, র জিনিস, র।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কিন্তু আমরা তো তাকে ব্যবসায়ি ও সাবেক সামরিক আমলা হিসেবে চিনতাম। আপনার লেখা তাকে লেখক গুরুত্ব দিয়েছে। তাহলে সালমা বানী উপন্যাস ‘ইমিগ্রেশন’ নিয়ে কি বলবেন? এই উপন্যাস নিয়েও তো আপনার একটা আলোচনা বেরিয়েছিল।
হাসান আজিজুল হক: বেরিয়েছিল? (হ্যাঁ, কানাডা প্রবাসী লেখিকা, ধনাঢ্য বলেও প্রচার আছে—সাক্ষাৎকারী)। দেবেশ রায় আমার খুব পুরনো বন্ধু। দেবেশ রায় আমাকে বললো, সালমা বানীকে নিয়ে একটু-আধটু লিখে দেন। আমি বললাম, ঠিক আছে, দিমানি। আমি তো খুব কঠিন ধাতের লোক নই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তাহলে আপনার লেখায় দেখা জীবন, আর ব্যক্তিজীবনের দেখার মধ্যে ফারাক আছে অনেক।
হাসান আজিজুল হক: ফারাক নাই কিন্তু। আমাকে সব সময়ই হাসি-খুশি মনে হয়।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার বক্তৃতা যখন শুনছি, সাক্ষাৎকার পড়ছি, আলাপ করছি খুব আমুদে লোক মনে হয়, কিন্তু কথাসাহিত্য যখন পড়ছি, খুব সিরিয়াস লোক মনে হচ্ছে। তাই আপনি যখন সালমা বানীর উপন্যাস নিয়ে লিখলেন, তা তো আমাদের কাছে গুরুত্ব বহন করে।
হাসান আজিজুল হক: ঠিকই। আমার উপরের যে পানিটা আছে না, ওটা হচ্ছে গরম পানি, বুঝলে। সেখানে হাত না দিয়ে শরীর দিয়ে ডুব দিতে হবে, তবে ঠাণ্ডা পাওয়া যাবে। দেখ, আমি এত মজা করি, কিন্তু আমার চেয়ে কষ্টের কথা আর কেউ লিখেছে কি? হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ‘পাতালে হাসপাতালে’, ‘আমৃত্যু-আজীবন’ সেই সাপ তার লক্ষ্যে ফনা ধরে আছে; ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘শকুন’ : আমার কোনো গল্পের শেষটা তো মধুর নয়। প্রেমের গল্প একটা লিখেছি, কিন্তু সেটাও প্রেমের গল্প নয়, প্রেমের চাইতে ওর কঠিন দিকটাই দেখতে হবে। তাই করুণা আমি ক্কখনো করতে চাই না কাউকে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : যখন আপনি এদের বই নিয়ে লিখছেন, তখন করুণা হয়ে যাচ্ছে না? মানে আমরা যখন দেখি হাসান আজিজুল হক ওমুক বইয়ের আলোচনা লিখেছে, সেখানে যার বইয়ের আলোচনা লেখা হচ্ছে, তিনি কিন্তু অনেক বেশি এক্সপোজড হন। পাঠক-সমালোচকদের নজরে আসেন, আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। কারণ হাসান আজিজুল হক দেশের একজন কৃতি কথাশিল্পী ও নিবিষ্ট সাহিত্য কর্মী। তিনি যখন কাউকে ভাল বলছেন, তখন সেটা অনেক বেশি আগ্রহ বৃদ্ধি করে। সেই ভাল বলাটা যদি এমন হয় যে, আসলেই খুব ভাল না, আপনি যেমন আখারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে প্রথম দিকে আপনি খুব সিরিয়াস আলোচনা করেছেন। (হ্যাঁ, চারবার লিখেছি—হাসান আজিজুল হক)। তাঁকে তেমন আইডিন্টিফাই করতে পারে নাই তখনো। এমনও হয়েছে আপনার দ্বারা কিছু কিছু পাঠক তাকে চিনতে পেরেছে। তাই আপনি যখন সালমা বাণী বা কাজী শাহেদ আহমেদ-এদের নিয়ে লিখছেন, এরা কী সেরকম গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য?
হাসান আজিজুল হক: সে রকম কেউ পড়ে নাই। অনুরূপ ভাবে আমার কিচ্ছু মনে নাই কি লিখেছি সালমা বানী সম্বন্ধে। কি লিখেছি আমি জানি না। সালমা বানী টেলিফোন করে—হাসান ভাই, আপনার গদ্য কি সুন্দর! আমি বলি—তা হতে পারে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তো, দেবেশ রায় বলার পর আপনি লিখলেন।
হাসান আজিজুল হক: দেশের রায় বললেন, সালমা আমার খুব স্নেহের পাত্রী, দিন না লিখে। আচ্ছা, আচ্ছা, ঠিক আছে, লিখে দিলাম। সালমাও আমার বেশ স্নেহের। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, লেখা এক জিনিস আর মানুষটা আলাদা জিনিস। সালমা আমাকে খুব শ্রদ্ধা-ভক্তি করে বা, আমিও তারে খুব স্নেহ করি। কিন্তু সেই কারণে তো তার বই নিয়ে লেখা যায় না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এটা কি স্রেফ বন্ধুর অনুরোধে লেখা, নাকি বইটাকে যতটা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, ততটা ছিল।
হাসান আজিজুল হক: দেখ, আমাকে যতটা কড়া লোক মনে হয়, আমি ততটা কড়া লোক নই তো, জানো না তোমরা।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার লেখাটা কতটা গুরুত্ব দেয়া হয় তার একটা প্রমাণ বোধ হয়, ‘কালি ও কলম’-এ একটা ঘটনা ঘটেছিল। জনৈক একজন নিজেই নিজের লেখা উপন্যাসে একটা আলোচনা আপনার নামে ‘কালি ও কলম’-এ পাঠিয়েছে এবং তারা এটা ছেপেছে। ছাপার পর যখন গদ্যের সাথে মিলেনি এবং যতটুকু জানি আপনার কাছে জিগ্যেস করা হয়েছিল, আপনি কি এটা লিখেছেন? আপনি যখন লেখার কথা নাকচ করলেন, তখন বেরিয়ে গেল সে, সে চিট করে কাজটা করেছে। ঘটনা হচ্ছে, আপনার লেখা, নাম থাকাটা তো গুরুত্বপূর্ণ। এটা সালমা বানীর ক্ষেত্রে হোক বা কাজী শাহেদ আহমেদের বেলায়ই হোক।
হাসান আজিজুল হক: হা হা হা, এরপর আমি বলবো, Unless see my sign writing তোমরা এটাকে বিশ্বাস করো না। হাতের লেখার তো একটা sign আছে। সেই sign না হলে হবে না। কিন্তু ওগুলোতে তো সিগনেচার দেইনি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তার মানে হচ্ছে, আপনার লেখায় যে প্রশংসাটা ছিল, তার মানে মনে হয়নি, আসলেই ভাল মানের ছিল বই দুটো– সালমা বা কাজী শাহেদ আহমেদের। অনুরোধ বা স্নেহ যাই হোক, এর বাইরে আপনার কী মনে হয় ভালমানের বই ওদুটো?
হাসান আজিজুল হক: ‘ইমিগ্রেশন’ নয়, ‘ভৈরব’ উপন্যাস হয়ই নাই। এক আত্মকথা ধরন, আত্মকথা সব সময়ই ইন্টারেস্টিং হয়। সালমা বানীর আত্মকাহিনী কোনটা, ওই কানাডায় যাওয়া, ওই ‘ইমিগ্রেশন’টা? ওটা আত্মকাহিনীও নয়। ও আবার একটা অদ্ভূত জিনিস। তারপর আবার কিছুদিন আগে লিখেছে আর একটা জিনিস। আমি বললাম, সালমা এটা কেন করো তোমরা? তুমি কেন মনে কর খোলা বর্ণনা দিলে, তুমি মেয়ে, তোমার হাতে সেক্স অঙ্গের এমন খোলা বর্ণনা তুমি যে করছো, তুমি কি মনে কর, এতে তোমার সাহিত্যের কোন উন্নতি হচ্ছে। তুমি যে সম্প্রতি লিখলে, গ্রাম থেকে একটি ছেলে শহরে এসছে, সেখানে তার ভাই ছিল বিদেশে আর ভাইয়ের বৌটা বাড়িতেই ছিল। ন্যাচারলি, বৌটা হয়তো তার জৈবিক তাড়নায় বারবার ওই ছেলেটিকে ডেকেছে। ছেলেটি বার বার সেখানে গিয়েছে। তারপর ওই ছেলেটির মনে হচ্ছে যে—না, এটা উচিত হচ্ছে না। ছেলেটি কাজের খোঁজে শহরে গিয়েছে। শহরে যাওয়ার পরে তাকে পুরুষ বেশ্যা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কলকাতায় এমন পুরুষ বেশ্যা আছে, ওরা বলে জুগুল। আমি জিজ্ঞেস করি, হোট ইজ ইউওর পয়েন্ট? তুমি লিখছটা কী? কেন লিখছ? তারপর ধরো, সে সমকামী মানে হোমো হয়ে যাচ্ছে, তুমি কেন লিখলে, বল? মানুষের সমাজ আছে, সংসার আছে, কত কাজ আছে। সেখানে ঐসব বাদ দিয়ে এই সব লেখার দরকারটা কী? ও চুপ করে থাকে, বলে—বুঝতে পারছি, আমার এসব লেখা ঠিক হয় নাই। আমি বলি, না, এসব লিখ না। ওই বঙ্কিমচন্দ্রের মতো, ‘যদি মনে করেন, লিখিয়া সৌন্দর্য্য সৃষ্ট করিতে পারিবেন অথবা কল্যাণ করিতে পারিবেন তবেই লিখবেন। অন্য কোন উদ্দেশ্যে লেখনি ধরা পাপ।’
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনি গত ২০১৬ সালে ‘এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হূমায়ুন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার’ নিলেন। সেখানে একজন লেখককেই তো পুরস্কার দিচ্ছে, হূমায়ুন আহমেদ-এর নামে দেয়া হচ্ছে না অন্য কারো নামে দিচ্ছে এটা ভিন্ন প্রসঙ্গ না। আপনি বক্তৃতায় হূমায়ুন আহমেদ নিয়ে বলতে গিয়ে যখন খানিকটা প্রশস্তি করছিলেন তাতে দর্শকদের অনেকেই মোটামোটি একটু অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিলেন। হূমায়ুন আহমেদকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তা কি তার প্রাপ্য ছিল, নাকি প্রশস্তি?
হাসান আজিজুল হক: তাই কি নিয়ে গিয়েছিলাম বক্তৃতায়? বক্তৃতায় তা নিয়ে যাই নি। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কের কথা বলেছি, সে আমাকে কতটা শ্রদ্ধা করতো, সেটা বলেছি। তার সঙ্গে যেখানে যেখানে গিয়েছি আগে বলেছি, স্যার বলবে, আমি পরে বলব। আমি যখন নিউ ইয়র্কে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লাম, তখন সে শাওনকে নিয়ে হসপিটালে আমাকে দেখতে গিয়েছে এবং বলেছে, হাসান ভাই কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। এই যে মানবিক সম্পর্কগুলো ছিল আমি এটার মূল্য দেব না?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এর বাইরে কি তাঁকে সাহিত্যিক হিসেবে আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না বাংলাদেশে?
হাসান আজিজুল হক: না না না, গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। একটা দুটো লেখা হতে পারে, দু-একটা গল্প আমাকে স্পর্শ করে—একটা লেংটা লোক ঘুরে বেরাছে আর পেছনে লোক বলছে, ভাই কাপড় পরেন। বোধ হয় মুক্তিযুদ্ধে পাগল হয়ে গেছে। কিছু কিছু গল্প বেশ ভাল।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : তার লেখা অনেক পড়া হয়েছে নিশ্চয়।
হাসান আজিজুল হক: না, আমি পড়েছি ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ছাড়া আর কোন উপন্যাস পড়েছি বলে মনে হয় না। আমাকে কে যেন বলল ‘মাতাল হাওয়া’ নাকি খুব ভাল। (উনসত্তুরের প্রেক্ষাপটে—সাক্ষাৎকারী)। এটা আমাকে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বলেছিল। জ্যোতি তো খুব সিরিয়াস লেখক।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এটা কি তাদের সম্পর্কের মূল্যায়ন? মানে আমি বলতে চাচ্ছিলাম, তাদের ভেতর খুব ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। (ছিল কি?—হাসান আজিজুল হক)। হ্যাঁ, ছিল। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদ যখন নিউ ইয়র্কে চিকিৎসা করাতে যেতেন সেখানে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত’রা টেক-কেয়ার করতো। এমন কি হুমায়ূন আহমেদের অসুস্থকালীন সময় ও পরবর্তীতে তারা হুমায়ূনের আলোয় নিজেকে আলোকিত করার চেষ্টা করেছেন বলে বয়ান আছে। তো, আপনি সেটা পড়তে শুরু করলেন?
হাসান আজিজুল হক: আচ্ছা। তো ও আমাকে পড়তে বলল ‘মাতাল হাওয়া’, আমি পড়তে শুরু করলাম। তারপর দেখা গেল অযাচিত কিছু শব্দ-টব্দ বিনা কারণে ব্যবহার করেছে, আমার সেগুলো রুচিতে বাধে আরকি। আমার একটা রুচি আছে। সেই রুচি তো আমি জানি। যা স্পষ্ট, যা পরিষ্কার, যা দিনের আলোর মত, যা সত্যি তা লিখতে একটুও কলম কাঁপবে না। যা মানুষকে সুরসুরি দিবে তা আমি কখনো লিখবো না। সুরসুরি দিয়ে হাসানো বা চুলকানো এটার তো কোন অর্থ হয় না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : শুধু হাসানো সাহিত্যের কাজ না। কিন্তু সাহিত্যে হাসানোর প্রসঙ্গ আছে। সুকুমার রায় তো হাসাতেন, হাসাতে হাসাতে সিরিয়াস কথাটাই বলে দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ এমন উদাহরণ তো আমাদের কাছে আছে।
হাসান আজিজুল হক: ওহ্, সুকুমার রায়! ওরকম ‘বাবুরাম সাপুড়ে’, ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘পাগলা দাশু’, ‘আবোল তাবোল’—
‘ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না / সত্যি বলছি কুস্তি ক’রে তোমার সঙ্গে পারব না।–’ সব শেষে বলছে, তবু যদি কাছে না আসো, ‘ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না / সত্যি বলছি কুস্তি ক’রে তোমার সঙ্গে পারব না।’ হা হা হা…
সুকুমার রায়ের কোনো তুলনা আছে! ‘একা শুয়েতে তলাতে বারে বারে খিদে কেন পায় রে।’ আহ্, ‘দাদা গো! দেখ্ছি ভেবে অনেক দূর— / এই দুনিয়ার সকল ভালো, / আসল ভালো নকল ভালো, / শস্তা ভালো দামীও ভালো, / তুমিও ভালো আমিও ভালো’, এভাবে অনেকগুলো লিখে বলছেন, ‘কিন্তু সবার চাইতে ভালো— / পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়।’ হা হা হা…(সবাই)
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : রাষ্ট্র ও অচলায়তনকে ধাক্কা দেয়া, প্রশ্ন বিদ্ধ করার জন্য রম্য, রসবোধের জন্য হিউমার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে সাহিত্যে সিরিয়াসনেস আনতে গিয়ে হিউমার হারিয়েছি, আবার রম্য লিখতে গিয়ে সিরিয়াসনেস হারিয়েছি। বাংলা সাহিত্যেও তার সম্ভাবনা খুবই ছিল। মার্ক টোয়েনের মতো বড় লেখক রম্য লেখক ছিলেন।
হাসান আজিজুল হক: নাই, একদম নাই। মার্ক টোয়েনের মা কি বলতো জানো, ‘What is he says is 90% false, but the 10% is pure gold.’ অসাধারণ লেখক। হেমিংওয়ে বলেছেন, …
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস নিয়েও একটা লেখা লিখেছিলেন। এটা আমাদের দেশে মার্কেস বহুল পঠিত হয়ে ওঠার আগে।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, ‘মহাদেশের কথন’ বলে লেখা লিখেছিলাম। উঁনি যাদুবস্তবতা-টাদুবাস্তবতা ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারও করেননি। মরবার আগেও কোনো দিন করে যাননি। আর আমরা যাদুবাস্তবতা, পোস্ট মর্ডানিজম নিয়ে মাথা ঘামিয়ে ফেলাম আরকি। এটা তো কোনো কাজের কথা হলো না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার কাছ থেকে কনটেমপোরারি লিটারেচার হিসেবে ন’গুগি ওয়া থিওঙ্গ নিয়ে প্রথম আপনার একটা লেখা লতিফ সিদ্দীকীর ‘রোদ্দুর’ ম্যাগাজিনে বের করেছিল।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, ‘কেঁদ না, বাছা’ ‘Weep Not, Child’ আমি এটার অনেক বড় ভূমিকা লিখে ছিলাম, সঙ্গে আফ্রিকান সাহিত্য।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এখনকি বাইরের কন্টেম্পরারি লেখকদের লেখা পড়া হয়?
হাসান আজিজুল হক: পড়ি, দেখি। হারুকি মুরকামি পড়ে দেখছি, জে এক কোয়েটজি পড়ে দেখছি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কেমন সেগুলো, বিশেষ করে মুরাকামি?
হাসান আজিজুল হক: খুব ভাল নয়। তেমন নয় সেগুলো। তারপর মার্ককুস জোসাক (দ্যা বুক থিফ-এর লেখক), কিসেভাল (ভাটাইগো, ইমিগ্রেশন উপন্যাসের লেখক)।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এই সময় যেসব কনটেম্পরারি লেখকের লেখা পড়ছেন, তার মধ্যে কাকে ভাল লাগছে, বা ভাল লিখছে?
হাসান আজিজুল হক: বাইরে কই, আমি উপন্যাস তো তেমন পাচ্ছিই না। মার্কিন উপন্যাস…
কে এম রাকিম : মার্কিন ঔপন্যাসিকদের মধ্যে যারা স্বীকৃত ফিলিপ রথ, টমাস পিনচন, ম্যাকার্থি এরা।
হাসান আজিজুল হক: তোমরা পড়েছো তাদের, ভাল? আমি পড়িনি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সেদিক দিয়ে কলকাতার ইংরেজি ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ, বিক্রম শেঠ আছে।
হাসান আজিজুল হক: এদের পড়েছি, বিক্রম শেঠ পড়েছি, অমিতাভ ঘোষও পড়েছি। ভালই তো। কিন্তু তারা যদি বাংলায় লিখতো, তাহলে সাধারণ মানের লেখক, তার চেয়ে বেশি নয়। তারপর ‘MID NIGHT CHILLDEN’ সালমান রুশদি’র, তাও একটু পড়েছি। বরং ওদের তুলনায় অনিতা দেশাই অনেক সিরিয়াস লেখক।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : ঝুম্পা লাহিড়ী?
হাসান আজিজুল হক: ঝুম্পা? হ্যাঁ, পড়েছি। ঝুম্পা কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের বেশ ভাল ছবি এঁকেছে স্বচ্ছন্দ ভাষাতে; কিন্তু যদি বল কত বড় উপন্যাস, বলবো—না, মাঝারি মাপের।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এই সময়ের বড় লেখক কে আসলে? এইসময়ে গুরুত্বপূর্ণ বা পড়া উচিত, বাংলা-ইংরেজি যে ভাষায় লিখুন না কেন, আপনি যাদের লেখা পরে সম্ভাবনা দেখছেন যে—না, খুব ভাল না হোক, গ্রেট না হোক ভাল সাহিত্যিকের গুণাবলী আছে, এমন।
হাসান আজিজুল হক: ভারতীয় সাহিত্যে তেমন মনে হচ্ছে না, আমিও হয়তো পড়ি নি এমনও হতে পারে; যে হ্যাঁ, উল্লেখ করতে পরি অসাধারণ হয়েছে। ভারতীয় সাহিত্য তো অনেক ভাষায় লেখা, অনেক রকমের লেখা তাদের সবার নাম-তালিকাও তো করতে পারি না। ব্রিটিশদের মধ্যেও উল্লেখ করতে পারি না। এখন আমার মনে হয়, সাহিত্যের কেন্দ্র আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আফ্রিকায় এখন আপনি কাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। এসময়ে বেন ও’করি আলোচিত।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, চিনুয়া আচেবে (সম্প্রতি মারা গেছেন), ওলে সোয়েঙ্কা, এদের লেখা পড়ে ভাল লেগেছে, খারাপ লাগেনি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমার কাছে যে, আপনাদের সময়, মানে আপনারা যখন বেড়ে উঠছেন, তখন তো চিনুয়া আচেবে-এরাও লিখছেন। ওই সময়ের লেখার যে ট্রেন্ড তার থেকে এখনকার ট্রেন্ডের বড় বদল হয়েছে। এটা যদি কলকাতার বিক্রম শেঠ, অমিতাভ ঘোষ থেকে শুরু করে আফ্রিকার বেন ও’করি, জাপানের হারুকি মুরাকামি—এদেরকে ধরি, দেশ হিসেবে নয়, সময় হিসেবেও ট্রেন্ডে বিস্তর বদলে গেছে। আপনাদের সময়ের যে কনটেক্সট, যেমন ধরুন আপনার লেখা, চিনুয়া আচেবে, নওগুগি ওয়া থিওঙ্গ, (পর্তুগালের জোসে সারামাগো—হাসান আজিজুল হক) এদের লেখার বিষয়বস্তু মোটামুটি কাছাকাছি ছিল, একটা অন্তরগত মিল ছিল। নগুগির লেখা এদের লেখা মোটা মোটি ধরা যায়। হোসে সারামাগো তাদেরটা মোটামোটি কাছাকাছি ছিল।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, ছিল। জোসে সারামাগোর ‘দ্যা ব্লাইন্ডনেস’ লেখাটা খুবই ভাল লাগে, অসাধারণ লাগে। The Gospel According to Jesus Christ (যীশু খ্রিস্টের একান্ত সুসমাচার), Baltasar and Blimunda (বালতাসার এন্ড ব্লিমুন্ড), The Cave, Cane, This World and the Other, Death with Interruptions, Raised from the Ground, The Stone Raft? লাতিন লেখকদের মধ্যে হুয়ান রুলফোর মতো তুলনীয় লেখক খুব কম আছে। গল্পই লিখেছেন তিনি, আর একটা ছোট্ট উপন্যাস ‘পেদ্রো পারামো’ লিখেছে, আর তেমন কিছু লিখেন নি। ওর যে গল্প একেকটা—‘কোনো কুকুর ডাকে না’। (পাতানো মায়ের পাহাড়, মাকারিও, জ্বলন্ত প্রান্তর, তালপা—সাক্ষাৎকারী)।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হোর্সে লুই বোর্হেস, মিলান কুন্দেরা—এদের?
হাসান আজিজুল হক: মিলান কুন্দেরাকে আমি একদম পছন্দ করি না। খুব চালবাজ লেখক।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : চালবাজ কেন মনে হলো?
হাসান আজিজুল হক : হ্যাঁ, ওঁ চমক সৃষ্টি করতে চায়। বিশেষ করে ওঁ যে ফিকশন বা নভেলের উপর একটা বই লিখেছে না ‘THE ART OF THE NOVEL’, এই বই পড়ে আমি খুব বিরক্ত হয়েছি। মনে হচ্ছে, আমি যেমন করে বলছি, এমন করে না দিলেই নয় এখন। সে আমার প্রিয় না। আর কি যেন?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : (হোর্সে লুইস) বোর্হেস, আর্জেনটাইন লেখক। আমাদের দেশে রাজু আলাউদ্দিন চার ভাগে তার ওপর অনুবাদ ও সম্পদনা করেছেন।
হাসান আজিজুল হক: ও, বোর্হেসের কথা বলছো! বোর্হেস তো বড় লেখক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ছোট্ট ছোট্ট লেখা, কী শক্তিশালী, খুব ভাল। হুয়ান রুলফো বরাবরই খুব ভাল, রুলফো পড়া খুব দরকার। আলেহো কার্পেন্তিয়ার খুব ভাল; (মারিও ভার্গাস) য়োসা আছে। (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া) মার্কেস, তার কথা তো ছেড়েই দিলাম। মার্কেসের এক-একটা গল্প ভোলা যাবে না!
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কলকাতয় এই মুহূর্তে কার লেখা আপনার ভাল লাগে, গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়? এখানে দেবেশ রায়কে আপনার প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে রাখছি। অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী এরা?
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেবেশ আমারই বয়সি, বরং আমার থেকে বড়। কলকাতায় তেমন বড় লেখক দেখি না তো। যদি করতে হয় তাহলে সাধন, অমর, স্বপ্নময়–এদের নামই করবো এবং খুব অসাধারণ কিছু নয়। বাংলা সাহিত্যের যা হয়েছে, ওই যে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি যা করেছেন তার সঙ্গে তুলনা করলে আর বড় বলে তেমন কিছু থাকে না। অমর মিত্র খুব লেখে।  রবিশংকর বল? চলে না। তবে স্বপ্নময়ের লেখার মধ্যে একটা সার্পনেস আছে। সপ্নময় কিছু অনুগল্প-টল্প লেখে। ও আনন্দ পুরষ্কারও পেল। দেখা হয়েছিল আমার সঙ্গে। সপ্নময় মোটামুটি আর অমর মিত্র খুব সিরিয়াস লেখক। তার দাদা (মনোজ মিত্র) যেমন নাটকের মধ্যে নাম করেছে, অমর মিত্রও তাই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমরা প্রথমেই কথা বলছিলাম সাহিত্য আর সিনেমা নিয়ে। আমাদের দেশেও ভাল গল্প-উপন্যাস নিয়ে ভাল সিনেমা হয়েছে। আপনার গল্প নিয়ে কিছুদিন আগে ‘মন তার শঙ্খিনী’ নাটক হল। এছাড়া আমরা দেখি না। এর কি কোনো বিশেষ কারণ আছে? মার্কেস যেমন তার ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের সিনেমার অনুমতি দিতে চান নি। তার মতে ভাল উপন্যাস সিনেমায় ভাল রূপান্তর দুরুহ ব্যাপার, অনেক সময় তা সাহিত্যকে মেরে ফেলে। আপনার কি মত?
হাসান আজিজুল হক: নাটক হয়েছে ‘মন তার শঙ্খিনী’। আমি একটা নাটক ভাষান্তর করে ছিলাম ‘চন্দর কোথায়’ বলে, সেটা মঞ্চে দেখান হয়েছিল। এখন তো একটা সিনেমাই হয়েছে, ‘খাঁচা’ বলে আমার একটা গল্প আছে না, একটা হিন্দু ফ্যামিলি এ্রখানে আটকা পড়ছে, সেটা নিয়ে আকরাম খান ছবিটা করে ফেলেছে। রিলিজ এখনো হয়নি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : সেন্সর বোর্ড বা অনুদান বিষয়ে একটা বিষয় হচ্ছে যে, একবার ফিল্ম মেকার ও ফিল্ম আন্দোলনের অগ্রণীদের একজন মুহাম্মদ খসরু, তিনি আপনার ‘ফেরা’ ও ‘পাতালে-হাসপাতালে’ গল্প নিয়ে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করে বারবার সরকারি অনুদানের জন্য জমা দিয়েছেন। কিন্তু এর থেকে অনেক দূর্বল গল্প ও চলচ্চিত্রকার অনুদান পেয়েছেন, কিন্তু অনুদানের অভাবে এখনো সিনেমার সেই স্ক্রিপ্ট আটকে আছে। অনেকে মনে করেন, সেটা আপনার গল্প থেকে বলেই তা আটকে আছে।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, সেটা আটকে আছে এবং খসরুর শরীর-টরির এখন আর ভাল নেই। ‘নামহীন-গোত্রহীন’ নাম দিয়ে সে করতে চেয়েছিল। সবই গোলমাল হয়ে গেল।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার প্রবন্ধগুলো সাহিত্য রিলেটেড, একটা আমি ব্যতিক্রম দেখেছি, সক্রেটিসের উপর একটা বই বেরিয়েছে।
হাসান আজিজুল হক: সক্রেটিসের জীবনের ওপর ওটা একমাত্র বাংলা বই। পশ্চিমবঙ্গে সক্রেটিসের ওপর আলাদা করে বই লিখে নাই। ওটা সেখানে অসম্ভব প্রিয় বই আর এখানে তো এডিশনের পর এডিশন বেরিয়েই যাচ্ছে। অথচ বইটি লেখা ষোল দিনে। তার কারণ মুনজুরে মওলা (বাংলা একাডেমি’র তৎকালিন পরিচালক) আমাকে বললো, ১০১টা বই করবো, আপনি একটা লিখে দেন। আমি বললাম, এখন তো সময় নেই। তখন বললো, আপনাকে ১৫ দিন সময় দেয়া হলো। এর মধ্যে লিখে দিতে পারলে আমি এই ১০১টার মধ্যে দিয়ে দেব।
তখন আমি বাড়ি গিয়ে লিখতে শুরু করলাম। খুলনা নিউজ প্রিন্টে মোটা দাগের পেন্সিল আর বল পেন দিয়ে লিখলাম। এখন তো দেখি বাহ্, লোকে বেশ পছন্দই করেছে। আমি পড়ে দেখেছি, আমি শ্রেফ ওই তথাকথিত জীবনী তো লিখি নাই। গ্রীক দর্শনের পটভূমি, গ্রীক জাতির কিছু বৈশিষ্ট্য, নগর সভ্যতা সম্পর্কে কিছু কথা, তারপরে সক্রেটিসের কন্ট্রিবিউশনটা কোথায় দেখিয়েছি।
Hasan-5সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : ফিলোসফির কথা উঠলো। আমাদের গল্প বা সাহিত্যে দর্শনের জায়গা যেটা, সেখানে হয়তো একটা বিশেষ সংকট চলছে। এখন তাবৎ পৃথিবী জুড়ে দর্শনের সংকট চলছে। পৃথিবী এতটাই টালমাটাল যে, কোনো একটা দর্শন স্থির হয়ে উঠতে পারছে না। আমাদের ভাবতে হচ্ছে ওই ভঙ্গুরতা-অস্তিরতার ওপর দাঁড়িয়েই।
হাসান আজিজুল হক: আবুল বারকাত একটা বই লিখেছে সে লিখেছে ‘আর্থনীতিতে দর্শনের দারিদ্র।’
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এমন তো হয় যে, আপনার খুব বিখ্যাত গল্পগুলোর মধ্যে… মানুষ যখন হাসান আজিজুল হকের গল্প নির্বাচনের কথা বলে তখন শুরুতেই তারা ‘আত্মজা ও একটি করবীগাছ’-এর কথা বলে। অনেক গল্পই খুব বেশি বিখ্যাত হয়। আপনার নিজের কখনো এমন মনে হয় না যে, আমি এই গল্পটা লিখেছি, তবু লেখাটা অনেকটা আন্ডাররেটেড, আবার কিছু গল্প ওভাররেটেড।
হাসান আজিজুল হক: আমি অনেক জাগায় বলেছি, আমার নিজের গল্প আমি পড়ি না, আমি জানি না। ভালও লাগে না। বসে বসে নিজের গল্প পড়ব–এ আমি কোনো দিনই করি নি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : বা কখনো কি আপনি সারপ্রাইজড হন নাই যে, এই গল্পটা আমি অনেক দ্রুত লিখে ফেলেছি। সেটা করতে পারিনি ।
হাসান আজিজুল হক: কোনো কোনো লেখা মনে হয়েছে, বাহ বেশ তৃপ্তি পাওয়া গেল। সারপ্রাইজটা অনেক সময় হয়েছে। দু’দিনের লেখা ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ এত নাম করে ফেলল। ‘শকুন’ খুব অল্পদিনে লেখা। তখন গরম, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে রাজশাহীতে এতটুকু একটা ঘর, বুকের তলায় তক্তপোস, তক্তপোসের ওপর ম্যাট-ফ্যাট কিছুই নেই, তখন গরিব মানুষ আমি, বুকের তলায় বালিশ গুঁজে লিখলাম ‘শকুন’ গল্পটি। সেই গল্পটা বেরুনর পর তো মোটামুটি চলে গেল। অবাকই হয়ে গেলাম, বাহ্, বেশ ভাল তো।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আবার এমন মনে হয় নি যে, অনেক পরিশ্রম করে একটা গল্প লিখলাম, এটা খুব বেশি আলোচনায় আসল না অন্যগুলোর মতো?
হাসান আজিজুল হক: আমার ‘বিধবাদের কথা’–এটা কেন আলোচনা হয়নি আমি জানি না। ‘বিধবাদের কথা’ লিখে আমি তৃপ্তিও পেয়েছিলাম, যথেষ্ট সিমপ্যাথির সঙ্গে লেখা হয়েছে, এই দুই বিধবার প্রতীক বাংলাদেশ। তারপর সুন্দরবনের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘মা-মেয়ের সংসার’ মোটামুটি আলোচনা হয়, কিন্তু ‘বিধবাদের কথা’ বেশি কিছু কথা হয় না। কেন হয় না, তোমরা সচেতন পাঠক হিসেবে বিচার করবে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আপনার অবজারভেশন কি? আমাদের সাহিত্য সমালোচকদের এ রকম প্রবণতা আছে যে, তারা এই এই জিনিস গ্রহণ করে, এই এই জিনিসে তাদের আগ্রহ নাই। এমন মনে হয়েছে কি?
হাসান আজিজুল হক: তেমন কই? সমালোচনা সাহিত্যটাই তো আমাদের এখানে গড়ে উঠলো না। সবাই আবার সাহিত্য সমালোচক নন, কেউ কেউ প্রাবন্ধিক। যেমন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি সাহিত্য সমালোচক নন। তিনি প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন, নামও করেছেন, নতুন জিনিস-নানা বিষয় নিয়ে এসেছেন, গুরুত্বপূর্ণ লেখা। আর সম্প্রতি দেখলাম শেকসপিয়রের ওপর লিখেছেন ‘শেকসপিয়রের মেয়েরা’ বইটি। আবার উনি অনেক ধরনের কাব্যতত্ত্ব অনুবাদ করেছেন। হেনরিক ইবসেনের নাটকের অনুবাদ করেছেন। তারপর রবীন্দ্রনাথের কোনো একটা বিষয় নিয়ে লিখেছেন।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হ্যাঁ, ‘রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি’ লিখেছেন, একই রকম ‘লেনিন কেন জরুরি’ লিখেছেন, নজরুলকে নিয়েও লিখেছেন। তার ‘সাহিত্য শ্রেণি সমাজ’ ভাল বই। তার দারুন কাজ হচ্ছে ‘জাতীয়তাবাদ, সম্প্রদায়িতকতা ও জনগণের মুক্তি’ বইটা।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, উঁনি আছেন। একমাত্র উঁনাকেই দেখি কথা-টথা বলতে। কিন্তু উঁনি সাহিত্য নিয়ে কথা কম বলেন।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হ্যাঁ, সমাজ নিয়ে তার মূল কাজ। তিনি নিজেও কথাসাহিত্যিক। ‘ভাল মানুষের জগৎ’, ‘দরজাটা খোলো’ নামে তার গল্পের বই আছে, ‘শেষ নেই’ নামে তার উপন্যাসও আছে। আপনার বোধ হয় উঠার সময় হলো।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, তবে আমি কোত্থাও যাচ্ছি না।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : হয় কি, আমাদের এখানের এলিটরা শিল্পী-সাহিত্যিকদের পেট্রনাইজ করে তৃপ্ত হন। এর আগে একটা লেখায় গুলশানে এক সাহিত্য বা সাহিত্যিক আড্ডার বিরূপ অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন যে, ওখানে সাহিত্যটা হচ্ছে কোথায়? ওখানে কেবল লোকজনের সমাবেশ ঘটাচ্ছে।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, তাই তো। তোমাদের কি ধারণা গদ্য সাহিত্য বা কথাসাহিত্য নিয়ে?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : আমরা মনে হয় একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড চলছে। নতুন ভাবধারার কিছু আসবে, কিছু কিছু এসছে-এ রকম। হয়তো এখনো আহামরি কিছু হয়ে ওঠেনি। আপনাদের প্রজন্ম যেভাবে আমাদের সাহিত্যে এক ধরনের ওয়েব (ঢেউ) নিয়ে এসেছিলেন, আপনাদের চিহ্নিতও করা যায়, কিন্তু আপনাদের চলে যাওয়ার পর আমরা মনে হয় ওইভাবে কিছু পাইনি। অনেকে ভিন্ন স্বরে লিখছেন। শাহাদুজ্জামান লিখছেন, কাজল শাহনেওয়াজ লিখছেন। কবি ও গল্পকার সুমন রহমানের ‘নিরাপরাধ ঘুম’ নামে একটা গল্প আলোচিত হয়েছে। তার কারণ গল্পটার অনুবাদ কমনওয়েথ পুরস্কারের শর্ট লিস্টে এসেছিল। তবে আপনাকে নানা অভিধায় উল্লেখ করা হয়, বাংলা ছোটগল্পের বরপুত্র বা রাজপুত্র।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ, অনেক কথা বলে আরকি। আর আমার বয়স তো আশি হতে চললো। স্মৃতিকথা চার খণ্ডে লিখলাম না? সময় কি যায়নি এতে, অনেকটা সময় গেছে। আর এই স্মৃতিকথা পড়ে তোমাদের কি মন হয়, এটা না লিখলেও চলতো?
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : না, বরং আপনার সময় এবং রাঢ়বঙ্গ ও বরেন্দ্র অঞ্চল বোঝার জন্য আপনার স্মৃতিকথা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আপনার স্কুল স্মৃতি এমন আগ্রহ তৈরি করে যে ভুলবার না। আপনার শিক্ষকদের মধ্যে কালি কুনকার বাবু বলছেন যে, তোকে রাস্টিকেট করে দেব, তোকে রাস্টিকেট করে দেব। ওই বর্ণনাগুলো খুব মনে আছে। আত্মকথা বা স্মৃতিমূলক লেখার মধ্য এটা উল্লেখযোগ্য বলা যায়। কিন্তু আপনি ফিকশন এখন আর সে ভাবে লিখছেন না কেন, ভাল লাগছে না?
হাসান আজিজুল হক: ‘তোকে রাস্টিকেট করে দেব, তোকে রাস্টিকেট করে দেব। দেব, তোর মাথাটা দেয়ালে ঠুকে দেব।’ আমি বললাম দেন স্যার। হা হা হা…
ফিকশন তো দুটো লিখলাম। কিন্তু আমি তো উপন্যাস লিখে ফেললাম। আবারও লেখার ইচ্ছে আছে। ‘বিধবাদের কথা’ প্রায় উপন্যাসই একটা। কিন্তু ‘বিধবাদের কথা’ নিয়ে কেন আলোচনা হলো না। আমি তো খুব দরদ দিয়ে লিখেছিলাম।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এমনও হয়েছে যে একটা বই প্রকাশ করতে চান নি, যেমন ‘বৃত্তায়ন’ বলে আপনার উপন্যাসিকাটা প্রকাশ করতে চান নি, কিন্তু প্রকাশের পর আলোচিত হয়েছে।
হাসান আজিজুল হক: হ্যাঁ। ‘শামুক’ উপন্যাস, কথাপ্রকাশ গায়ের জোরে বের করে ফেলেছে। কোনো মানে হয়! যেমন ‘ছোবল’ বলে একটা উপন্যাস লিখেছিলাম কত আগে, আমি ডিসঅ্যাপ্রুভ করেছি, কিন্তু ‘অন্যদিন’ বের করে ফেলেছে।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এটা হয়তো, পাঠকের আগ্রহ বেশি যে লেখক সম্পর্কে, ফেস ভ্যালু আছে, বাজার ধরার বিষয় আছে, তাই তার অপ্রকাশিত বা অনানুমদিত লেখাও প্রকাশ করে ফেলে। যেমন শহীদুল জহির মারা যাওয়ার আগে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, ‘সে রাতে পূর্ণমা ছিল’, ‘মুখের দিকে দেখি’ এই উপন্যাসগুলো লিখেছেন। জীবদ্দশায় কোনো পুরস্কার পান নাই। কিন্তু মারা যাওয়ার পর প্রথম আলো পুরস্কার পেলেন যে বইটার জন্য, তার প্রথম দিকের লেখা ‘আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু’, এটার মধ্যে আলবেয়া কামুর প্রভাব আছে, এটা উঁনি লিখে ফেলে রেখেছিলেন, প্রকাশই করতে চান নাই। অথচ তার আগে প্রকাশিত গল্প-উপন্যাসের জন্য তাকে সম্মানিত করা হয় নি।
হাসান আজিজুল হক: তোমরা দেখ, শহীদুল জহিরের ওপর আলোচনা কেউ করে নাই, তখন আমি দীর্ঘ আলোচনা করেছি ‘সোনায় মোড়া কথাশিল্পী’ এই নামে। শহীদুল জহির খুব শক্তিশালী লেখক ছিল। একটু ম্যাজিক রিয়ালিটির ধার ঘেঁষে লিখতে চেষ্টা করেছিল। তার গদ্য ভঙ্গিও অন্যদের থেকে আলাদা। ঠিক প্রমিত জিনিসটা ওভাবে নেয় নি। তার ‘ডুমুর খেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প’ ভাল লেগেছিল, উপন্যাসগুলোও। ছিল, তবে খুব অকালে মারা গেল। আর আমি কখনো কখনো বাংলা একাডেমি পুরস্কার কমিটির, শেষ যে পাঁচজন পুরস্কারটা ঠিক করেন আরকি, সেখানে ছিলাম।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এটা প্রচলিত আছে যে, আপনি রিকমেন্ডশন করলে যে-কেউ পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন।
হাসান আজিজুল হক: হা হা হা, মোটেই না। দু-একবার ছিলাম ঠিকই।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : কোথায়, বাংলা একাডেমিতে? তাছাড়া সমকাল-ব্র্যাক, প্রথম আলো–এদের পুরস্কারের যে কমিটি হয়, এই কমিটিতে ছিলেন কখনো?
হাসান আজিজুল হক: না, ছিলাম না। শুধু বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ‘কালি ও কলম’ পুরস্কারের কমিটিতে কয়েকবার ছিলাম।
আর বাংলা একাডেমিতে তো বহুবার, শেষ বিচারের যারা বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের নেয়া, তাদের মতামতগুলো সিলগালা ভেঙ্গে সেগুলো দেখে দেখে বিচার করি, সেখানে ছিলাম। আমি তো সেখানে শহীদুল জহিরকে নির্বাচিত করতে যাচ্ছিলাম। তখন ইয়ে বেঁচে, কিছুদিন আগে মারা গেল…। (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস?—সাক্ষাৎকারী)। ইলিয়াস নয়, ইলিয়াস কখনো কমিটিতে থাকতে চানও নাই, থাকার চেষ্টাও করেন নাই। ছড়াকার এখলাস উদ্দিন আহমেদ। এখলাস উদ্দিনও আমাদের মধ্যে ছিল। ও-ই আমাকে বলল—থাক হাসান, এবার ইয়েকে দেই, এবার ওকে দেই, এই করে করে শহীদুল জহির মিস করে গেলে।
শেষবার (২০০৭ সালে) আমি শহীদুল জহিরকে দিতামই। শহীদুল জহিরের মৃত্যুর ঠিক আগে, আমি একেবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম শহীদুল জহিরকে দেব। কিন্তু হলো কি জানো, শেষ মুহূর্তে একটা ওপেনিয়ন এলো। (এ রকম আমাদের লেখকদের অভ্যেস আছে)। তো শেষ মুহূর্তে রিকমেন্ডশন এলো আবুল হোসেন—নব্বই বছরের কাছাকাছি কবি, বয়সের কারণেও তাঁকে শ্রদ্ধা করি—সেই মুহূর্তে খুলে দেখলাম তিনি একজন কবির নাম পাঠিয়েছেন। কবিরও অনেক বয়স, তিনি এখনো জীবিত (অনুরোধ ক্রমে নাম উহ্য রাখা হয়েছে)। তার ওপর কবি আবুল হোসেন রিকমেন্ড করেছেন, তাই সে বছরও শহীদুল জহির বাদ গেল। পরের বছর তো আর সুযোগ পেলাম না। এই আফসোসটা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারবো না।
কোনো সমস্যা ছিল না। ওকে দিয়েই ফেলতাম। কিন্তু আবুল হোসেন নাম্বার ওয়ান, নাম্বার টু ওই কবিরও বয়স অনেক হয়ে গেছে। সে আর কোনোদিন কোনো পুরস্কার পাবে বলে মনে হয় না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা তাকে পুরস্কৃত করি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এসব ক্ষেত্রে কি আপনাদের (কমিটির লোকদের) নিকট রিকমেন্ডশন কার্যকর? এমন কি হয় যে, ভেতরের লোক ঠিক করে দিল বা ওমুকে রিকমেন্ডশন করে দিল, তাই ঠিক হয়ে গেল।
হাসান আজিজুল হক: না না না। তা কখনো হয় না। আমি যে কয়বার ছিলাম ও সমস্ত আউট কোনো কিছু নেই না। আমরা সাধারণত মতামতগুলো গুনি। কার পক্ষে কতটা মত এসেছে। একটাও নমিনেশন আসে নাই, তাকেই দিয়ে দিলাম, এটা কখনো হয়নি। আমরা নিজেরাই বসে ঠিক করলাম, এটা হয় না। (পুনঃসম্পাদিত)
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (19) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ranjan Nandy — জুলাই ৫, ২০১৭ @ ৯:৪৮ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটিকে অযাচিত ভাবে হাসান আজিজুল হক কে হুমায়ুন আজাদ এর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছে । দুএকটি আলাপ পর হাসান আজিজুল হক তাই বিরক্ত হয়েই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে চেয়েছেন । অথচ সাক্ষাৎকারের শিরোনামও করা হয়েছে ওই প্রথম দুএকটি কথা থেকেই । আরেকটি ব্যাপার চোখে পড়ে – সাহিত্য আলোচনা প্রসঙ্গে অন্যদের ক্ষেত্রে সম্মানসূচক “লিখেছেন” লেখা হলেও হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রে “বলেছিল” “দিয়েছিল” ব্যবহার করা হয়েছে । এতে ধারণা পাওয়া যায় সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীগণ কোন কারনে হুমায়ুন আজাদের উপর রুষ্ট এবং সেই ব্যক্তিগত রুষ্টতা সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েও লুকাতে পারেননি । হাসান আজিজুল হক এর মত একজন বড় মাপের মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের আরো প্রাপ্তমনষ্ক ও পক্ষপাতহীন হওয়া প্রয়োজন ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুতুব হিলালী — জুলাই ৫, ২০১৭ @ ৯:৫২ অপরাহ্ন

      হ্যাঁ, আমার কাছে হাসান আজিজুল হক আসলে একজন বড়ো মাপের রসের ভাঁড়ার। তাঁর লেখা আমাকে আর্দ্র করে। চালিত করে। এই সাক্ষাৎকারও তাই। তবে হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন আপেক্ষিক হয়ে থাকলো। যেমনটা আছে হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা। সাহিত্যে শত ফুল ফুটুক না শত জর্জরে দ্বিধাময় আরো শতমুখী হয়ে। এবং তরুণদের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য সত্য বটে। তলায় যেতে রাজি নয় কেউ। ধন্যবাদ অলাত এহসানকে, এত ধৈর্য ধরে হাসান স্যারের সাক্ষাৎকার নিতে পারার জন্য্।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনার্য মুর্শিদ — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ২:৩২ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারপ্রদানকারী বলছেন ‘হুমায়ূন আজাদ বাদ দিয়ে আলাপ কর।’ এ বাক্যই বলে দিচ্ছে বিষয়টা তার আলোচনার সাবজেক্ট না। অবজেক্টকে সাবজেক্ট করে শিরোনাম করাটা বিডিনিউজের উদ্দেশ্যমূলক কাজ নয় কি?
      হাসান স্যার হুমায়ুন আজাদের একটি বদগুণ নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু তাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেননি। বিডি নিউজ এই শিরোনামের মাধ্যমে হুমায়ুন আজাদকে খারিজ করার চেষ্টা করছে নাকি হাসান আজিজুল হককে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। আমাদের বোধোদয় হচ্ছে না। তবে সাক্ষাৎরটি চমৎকার ছিল, নিঃসন্দেহে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোজাফফর হোসেন — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৩:৩৯ অপরাহ্ন

      এই সাক্ষাৎকারের মূল বিষয় তো দূরে থাক গৌন বিষয়ও হুমায়ুন আজাদ নন। কথার পিঠে বিরক্ত হয়ে হাসান আজিজুল হক এমন মন্তব্য করেছেন। কিংবা হতে পারে তিনি আজাদকে পছন্দ করেন না। যাই হোক, পাঠক টানার জন্য অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে এটাকেই সাক্ষাৎকারের মূল বিষয় করা হলো! শেষপর্যন্ত সাক্ষাৎকারগ্রহীতা এবং বিডিআর্টসই সফল। হেরে গেলেন হাসান আজিজুল হক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোজাফফর হোসেন — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৩:৪৪ অপরাহ্ন

      [বিডিনিউজে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটির সূত্র ধরে কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক এই কথাগুলো স্বকৃত নোমানকে বলেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রকাশ করার অনুমতি দেন।]

      “অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজে প্রকাশিত আমার সাক্ষাৎকারটির এরকম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিরোনাম আমার দেওয়া নয়। আমি মাটির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলি, মাটির নিচে দাঁড়িয়ে নয়। আমাকে না জানিয়ে এই ধরনের শিরোনাম দেওয়াকে সমর্থন করছি না। আমি কখনোই একবাক্যে এক কথায় কাউকে বাতিল করে দেওয়ার মানুষ নই। দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যে কাজ করার ভেতর দিয়ে আমার এই প্রচেষ্টা কি এদেশের মানুষের চোখে পড়েনি? আমি সাক্ষাৎকারগ্রহীতার কথার পিঠে হুমায়ূন আজাদ সম্পর্কে কথাটা বলেছি।
      হুমায়ূন আজাদের বরাত দিয়ে আমাকে সাক্ষাৎকারগ্রহীতা যখন বলেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য হচ্ছে নির্বোধের হস্তমৈথুন আর কুকুরের সঙ্গম।’ এই কথার পিঠে, অর্থাৎ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যকে হুমায়ূন আজাদ এইভাবে এক কথায় একবাক্যে বিচার করায়, আমি হুমায়ূন আজাদ সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছি। করলেও সেটা কথার পিঠে কথা। সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় সাক্ষাৎকারদাতা অনেক কথাই কথার পিঠে বলে থাকেন। তার পরিপ্রেক্ষিত থাকে, যা স্বরাঘাত এবং শব্দের ওপর ঝোঁকের কারণে, ধ্বনিগত ব্যঞ্জনায় ভিন্ন হয়ে ওঠে, যা লিখিতভাবে অনেক সময় আনা যায় না। ফলে এক্ষেত্রে ভুলবোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এছাড়াও আমার কোনো সাক্ষাৎকার যখন কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হবে, তখন সেটা আমাকে না দেখিয়ে প্রকাশ করাটা অনুচিত বলে মনে করি।
      অনেক ব্যাপারে হুমায়ূন আজাদের একগুঁয়েমি ছিল, তাঁর অনেক বক্তব্যের সঙ্গেও আমি একমত নই। কিন্তু বাংলাদেশের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যে কয়জন লেখক জোরালো ভূমিকা রাখেন, তাঁদের মধ্যে হুমায়ূন আজাদ একজন। অত্যন্ত তীব্রভাবে তিনি মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার সমালোচনা করেছেন, যা আমাদের পক্ষে করাও সম্ভব হয়নি। আমার মতে, হুমায়ূন আজাদ প্রকারান্তরে দেশের জন্যই প্রাণ দিয়েছেন। একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধমুক্ত জাতি গঠনের জন্য তাঁর অবদান অতুলনীয়।
      কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সারা জীবন তিনি যা লিখেছেন, যা বলেছেন, তা একবাক্যে এক কথায় আমাকে স্বীকার করে নিতে হবে। তিনি এবং স্বয়ং আমি, কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নই। আবার একইসঙ্গে সেই সমালোচনা গঠনমূলক হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমি এজন্য সাক্ষাৎকারগ্রহীতাকে বলেছিলাম, ‘হুমায়ূন আজাদ বাদ দিয়ে আলাপ কর।’ বাংলাদেশের সাহিত্যজগতের পরম্পরায় ইলিয়াস ও হুমায়ূন আজাদ একই সমান্তরালে যান না―এটা যদি কেউ ভেতর থেকে বুঝতে না পারেন, তাহলে সত্যিই বড়ই বিড়ম্বনার ব্যাপার। সব কথা কি আর কথা দিয়ে বোঝানো যায়?
      কাউকে বাতিল করার পক্ষপাতী হওয়া-না-হওয়ার অধিকার যেমন আছে, তেমনি কাউকে স্বীকার বা অস্বীকার করার অধিকারও তো যে-কারো থাকতে পারে। কিন্তু সেটি, আবারও বলি, যুক্তিযুক্ত পরিপ্রেক্ষিতসহ হতে হবে। একবাক্যে নয়। ফলে এমন একবাক্যে যে কথাটা হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে এই সাক্ষাৎকারে উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি যথাযথ বলে মনে করছি না।”
      ―হাসান আজিজুল হক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাকুর মজিদ — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৪:০০ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারগ্রহিতা : আপনার চার খণ্ডে আত্মজীবনী প্রকাশ হয়েছে, এটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, বোঝা যায়, এটা আরো এগুবে। তো, পরবর্তী খণ্ড নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না?
      হাসান আজিজুল হক: এই চার খণ্ড কেমন করে পাঠকরা নেয়, দেখি। তারা পছন্দ করে কিনা।
      – এই উত্তর হুমায়ূন আহমেদকে মানায়, হাসান আজিজুল হককে না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খালিদ সাইফ — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৪:০৬ অপরাহ্ন

      হাসান স্যারকে ধন্যবাদ দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাজী চপল — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৪:১৯ অপরাহ্ন

      এ শিরোনাম দেয়াটা ঠিক হয়নি, উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে হয়েছে। মনে হল যেন খুচিয়ে খুচিয়ে কথাটা বের করে আনা হয়েছে। যা সাক্ষাৎকারের মহৎ উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাহিদুল আলম — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৬:২৯ অপরাহ্ন

      হুমায়ুন আযাদ সম্পর্কে বক্তব্যা একপেশে হয়ে গেল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অনুপম রায় — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৭:০১ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীগণের প্ররোচনায় পা’দিয়ে অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে তিনি যা বললেন তা আমাদের ব্যথিত ক’রেছে। তাঁর উদ্ধৃতি ব্যবহার করে এটিকে আরও জটিল ক’রে তোলা হবে।
      নমস্য হুমায়ুন আজাদের শেকড় আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে – অনেকেই বাংলাদেশের শেকড়জাত নন তা ভুললে চলবে না। আমাদের দেশের লেখকদের আত্মজীবনী লেখা সম্পর্কে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের বক্তব্য যথার্থ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কুমার দীপ — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৭:০৩ অপরাহ্ন

      একসময় সাপ্তাহিক গণমত না কি যেন নামে একটি পত্রিকা ছিলো, সেখানে বিরাট অক্ষরে খবরের শিরোনাম হতো।
      ‘অবশেষে খালেদার বিয়ে’
      ‘এরশাদের কোমর ভেঙে গেল’
      ‘হাসিনার চোখে জল’
      …এরকম চটকদার শিরোনাম দেখে ঢুকেই দেখতাম, কোনো এক পাড়া-গাঁ’র খালেদার বিয়ের গল্প, কোনো এক রিকশাচালক এরশাদের এক্সিডেন্টের কথা, কোনো এক অসহায় নারী হাসিনার আবেগের গল্প !
      বিডিনিউজ একটি নামী এবং ভালো অনলাইন পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আমি তার নিয়মিত পাঠক। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার নিয়ে তাঁর যে শিরোনাম, তা আমাকে অনেকটা সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিলো।বলা ভালো, প্রশ্নকারীর প্রশ্নের ধরণ ইতিবাচক ছিলো না।
      কিন্তু তার চাইতে খারাপ লাগছে, এই শিরোনামের সূত্র ধরে সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ হাসান আজিজুল হককে একেবারে জলের দামে বিকিয়ে দিতে চাইছেন ! তাঁর লেখার মান সম্পর্কেও প্রশ্ন তুলছেন !
      আমি বলি, আপনারা পুরো সাক্ষাৎকারটি পড়ুন, হাসান আজিজুল হকের সারাজীবনের অসামান্য সব গল্পের দিকে তাকান। আগুনপাখির মতো উপন্যাসের দিকেও তাকান। আর হুমায়ুন আজদের অসাধারণ সব গবেষণা-প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচানবলীর দিকে তাকান।
      দুজনই অসামান্য লেখক। অসাধারণ গুণীজন। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে দুজনের স্থানই অনেক উচ্চে। আমরা যারা তাঁদের পাঠক, তারা কেন তাঁদেরকে তুচ্ছ করে দেখবো ? একই সময়ের লেখক হিসেবে তাঁদের ভেতরে যদি কোনো সমস্যা থাকে থাক না। আমরা তো অতীতের অনেক পরস্পরবিরোধী লেখককেও সমান মর্যাদা দিয়েছি। এখন অভিন্ন প্রগতির ধারক হাসান-আজাদকে কথার পিঠে বলা একটি কথা দিয়ে মূল্যায়ন করবো কেন ? তাতে যে আমাদের নিজেদেরই অকল্যাণ হবে। শিল্পের জন্য অকল্যাণ হবে।
      শিল্পের মানুষদের থেকে সবসময় শৈল্পিক সহিষ্ণুতা প্রত্যাশিত, অসহিষ্ণু আবেগনির্ভর মন্তব্য নয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল — জুলাই ৭, ২০১৭ @ ১২:২৮ অপরাহ্ন

      বিভাগীয় সম্পাদক, শিরোনাম কি পাল্টানো হয়েছে?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — জুলাই ৭, ২০১৭ @ ৯:৪৮ অপরাহ্ন

      হাসান আজিজুল হক স্যারের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে ধন্যবাদ জানাই; ভাল লেগেছে সাক্ষাৎকার। প্রথমবারেই এই পরিমার্জন প্রয়োজন ছিল। লেখার সারবস্তু থেকেই টাইটেল নিতে হবে বিষয়টি এমন নয়; সাক্ষাৎকারের বাইরে থেকেও হতে পারতো। উদ্দেশ্যের প্রণোদনা ইতিবাচক হোক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন HSC Result 2017 — জুলাই ৮, ২০১৭ @ ৩:৩৮ পূর্বাহ্ন

      অনেক ভালো লাগলো পড়ে। খুব ভালো ভাবেই উপস্থাপন করেছেন। অসংখ্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফ আহমেদ — জুলাই ৮, ২০১৭ @ ৮:১২ অপরাহ্ন

      এই আসরে সাহিত্য নিয়ে মন্তব্য করার মত আমার পড়াশোনা নেই বললেই চলে। তবে হাসান আজিজুল হকের আত্মজীবনীর প্রথম খণ্ডটি সহ আরো দুয়েকটি বই পড়েছি সম্প্রতি। আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। পড়ার পরপরই কয়েকজনের সাথে কারো সাথে আলোচনাও করেছি। তাঁর সততার প্রশংসা করেছি।
      এই সাক্ষাতকারটি দীর্ঘ এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ – সবটা পড়লেও পুরোপুরি হজম করতে পারিনি নিজের সীমাবদ্ধতার কারণে। কিন্তু একটি ব্যাপার আমার কাছে স্ববিরোধী মনে হয়েছে। আমার যদি বুঝতে ভুল হয়ে থাকে তবে কোন বিজ্ঞজন তা ধরিয়ে দেবেন আশা করি।

      “সাক্ষাৎকারগ্রহিতা : আপনার চার খণ্ডে আত্মজীবনী প্রকাশ হয়েছে, এটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, বোঝা যায়, এটা আরো এগুবে। তো, পরবর্তী খণ্ড নিয়ে কিছু ভাবছেন কি না?”

      “হাসান আজিজুল হক: এই চার খণ্ড কেমন করে পাঠকরা নেয়, দেখি। তারা পছন্দ করে কিনা”।

      এই কথোপকথন থেকে বোঝা যায় দায়বদ্ধতা না থাকলেও পাঠকের পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব আছে তাঁর কাছে। পাঠক পছন্দ না করলে বা সমালোচনা করলে তিনি আত্মজীবনীর পরের খণ্ড নাও লিখতে পারেন। অর্থাৎ তিনি আদৌ শর্তহীন লেখক নন!

      কিন্তু হুমায়ুন আজাদ নিয়ে কথা শেষ হতেই অন্য প্রসঙ্গে লেখক বলছেনঃ
      “…লেখকের প্রথম শর্তই হচ্ছে তাই—সে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন। অন্য সবদিকে কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে, মানতে হয়, মেনে চলতে হয়। লেখক এই অর্থে বাধ্যবাধকতা হচ্ছে তার নিজের কাছে। অন্য কারো কাছে তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এটা যে লেখক ভাবেন না তার লেখায় কন্ডিশন নেই, অর্থাৎ শর্তাধীন হয়ে যাবে। শর্তাধীন যে লেখক তাকে আমি পুরোপুরি লেখক বলে মানতে পারি না।“

      হতে পারে আমার বোঝার ভুল, কারণ প্রথমেই যেমন বলেছি, সাহিত্য-জ্ঞান আমার একেবারেই নেই। পুরো সাক্ষাতকারে যেসব গুরু গম্ভীর আলোচনা হয়েছে, আমি সেখানে নিতান্তই এক মূর্খ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফ আহমেদ — জুলাই ৮, ২০১৭ @ ৮:৪৯ অপরাহ্ন

      “প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শাকুর মজিদ — জুলাই ৬, ২০১৭ @ ৪:০০ অপরাহ্ন
      – এই উত্তর হুমায়ূন আহমেদকে মানায়, হাসান আজিজুল হককে না।”

      শাকুর মজিদের মন্তব্যের বরাত দিয়ে বলছি, (বিজ্ঞ বা স্বল্প জ্ঞানের) পাঠক কোন লেখা গ্রহন না করলে বা অগ্রাহ্য করলে লেখকের কি সেদিকে মনযোগী হওয়া উচিত নয়? পাঠক না থাকলে লেখার স্বার্থকতা কোথায়? কোন লেখক নিজেকে সর্বজ্ঞ মনে করে তাঁর লেখার সমালোচনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা তো আত্মম্ভরিতার শামিল মনে করি। কিছু লোককে জানি তাঁরা ‘লেখক’ নন, কিন্তু অতি জ্ঞানী-পণ্ডিত এবং সমালোচক। সেই অর্থে পাঠক অবশ্যই। কাজেই হাসান আজিজুল হকের ‘…কেমন করে পাঠকরা নেয়, দেখি। তারা পছন্দ করে কিনা’ উক্তিটিকে যথার্থ বলেই মনে করি।

      ভাল লেখকের অবশ্যই পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা ভাবা উচিত। না পড়ে বইটি ভাল বা মন্দ তা বোঝার উপায় নেই। কাজেই বইটি পড়ে পাঠক আত্মার তৃপ্তি, জ্ঞান, বিনোদন (হাসান আজিজুল হক তা মনে করেন না), অথবা চিন্তার খোরাক পাবে কিনা তা লেখকের ভাবা উচিত। পাঠকের সময় বা পয়সার অপচয় হলো কিনা তাও ভাবা উচিত।

      সাহিত্যে অজ্ঞ আমি তাই মনে করি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তপন বাগচী — জুলাই ৯, ২০১৭ @ ১:০৩ পূর্বাহ্ন

      `তো শেষ মুহূর্তে রিকমেন্ডশন এলো আবুল হোসেন—নব্বই বছরের কাছাকাছি কবি, বয়সের কারণেও তাঁকে শ্রদ্ধা করি—সেই মুহূর্তে খুলে দেখলাম তিনি একজন কবির নাম পাঠিয়েছেন। কবিরও অনেক বয়স, তিনি এখনো জীবিত (অনুরোধ ক্রমে নাম উহ্য রাখা হয়েছে)। তার ওপর কবি আবুল হোসেন রিকমেন্ড করেছেন, তাই সে বছরও শহীদুল জহির বাদ গেল। পরের বছর তো আর সুযোগ পেলাম না। এই আফসোসটা আমি কোনো দিনই ভুলতে পারবো না।’ কবি আবুল হোসেন সুপারিশ করেছেন একজন কবির নাম। তার কারণে কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির বাদ পড়বেন কেন? বাদ পড়বেন একজন কবি। কবিতা আর কথাসাহিত্য তো ভিন্ন ক্যাটাগরি। তাই কবির কারণে কথাসাহিত্যিক বাদ পড়ার সুযোগ নেই। ২০০৭ সালে কথাসহিত্যে কাউকেই পুরস্কার দেয়া হয়নি। কবিতায় মনজুরে মওলা, প্রবন্ধে যতীন সরকার, শিশুসাহিত্যে লুৎফর রহমান রিটন পেয়েছেন। এখানে হাসান আজিজুল হকের বক্তব্য সত্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোথাও একটা ফাঁক রয়ে গেছে। সাক্ষাৎকারগ্রহীতার দায়িত্ব ছিল পুনরায় প্রশ্ন করে এই ফাঁক পূরণের।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজীবুল হাসান — জুলাই ২৮, ২০১৭ @ ৮:৫২ অপরাহ্ন

      সাক্ষাৎকারগ্রহীতা পোক্ত কিছু বাস্তব চিত্র আনতে চেষ্টা করেছে………….ধন্যবাদ

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com