‘রাজনীতি’ উপন্যাস: পুরস্কারটা প্রাপ্য ছিল মাজহার সরকারের

হাবিব ইমরান | ১৭ জুন ২০১৭ ৩:২৫ পূর্বাহ্ন

Majhar-Book-cover (1)নি:সন্দেহে মাজহার সরকারের ‘রাজনীতি’ বইটির ‘দেহ’টা উপন্যাসের, কিন্তু প্রাণ ‘কবিতা’র। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আধুনিক কবিতার ঢংয়ে লেখা একটি ‘উপন্যাস’, ‘কাব্য উপন্যাস’ বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হয় না।
সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে লেখা উপন্যাস পড়তে খুব একটা আগ্রহ জাগার কথা নয়। কিন্তু মাজহার সরকারের কাব্যিক উপস্থাপন শুরুতেই আগ্রহ তৈরি করে!
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রাজনীতি’ বলতে যে ধরনের চিত্র- খুন, জখম, চাঁদাবাজি, গণরুম, বেঁচে থাকা ও টিকে থাকার লড়াই ভেসে ওঠে, এ উপন্যাসের উপজীব্য সেটাই। তবে গল্প বলার কাব্যিক ভঙ্গি তৈরি করেছে বৈচিত্র্য। মনে হয়েছে ছোটো ছোটো কবিতা জোড়া লাগানো হয়েছে।
‘রাজনীতি’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যার বর্ণনা এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, পাঠকের মনে হবে আসলে সে একটি গ্রাম দেখতে পাচ্ছে। লেখক উপন্যাসের চরিত্রগুলো এমনভাবে বেছে নিয়েছেন যাদের নিয়ে আসলে পুরো একটা তরুণ সমাজের চিত্র আঁকা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এল’ শেইপের একটি আবাসিক হল দিয়ে উপন্যাসটি শুরু। ওই হলের ক্ষমতায় থাকা ছাত্র সংগঠনের সভাপতি হুমায়ুন। সে হলের প্রেসিডেন্ট, কিন্তু মাজহার সরকার তার চরিত্রটি এমনভাবে এঁকেছেন, যেন তিনি একটা দেশের প্রেসিডেন্ট, এমনকি দুনিয়ার। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তরা জানেন, আসলে হলের প্রেসিডেন্টের এমন চরিত্র আঁকার ব্যাপারটি মোটেও অতিরঞ্জিত নয়, বরং প্রতীকি।
হুমায়ুনের জন্মদিন দিয়ে উপন্যাসের শুরু। মাজহার লিখেছেন- “জন্মদিন উপলক্ষ্যে আজ হলের পুকুর থেকে বড়শি দিয়ে মাছ ধরেছে। এটাই তার একমাত্র শখ।….

“হুমায়ুন আজ শখ করে মাছ ধরেছে। ক্যান্টিন ম্যানেজার মতিনকে ডেকে বলেছে, লাল লাল ঝোল ঝোল করে রান্না করা চাই। ছাত্রজোটের ছেলেরা আজ সভাপতির সাথে রাতের খাবার খাবে।…”
সংগঠনের সভাপতির সাথে মাছ খাওয়ার গল্পটি দিয়ে মাজহার চাটুকারিতা, রাজনৈতিক পদলেহনের যে দৃশ্যকল্প হাজির করেছেন সেটা এককথায় পুরো দেশের রাজনীতির সামগ্রিক অবস্থা তুলে ধরেছে। ‘রাজনীতি’ উপন্যাসটির ব্যাপৃতি তাই প্রথম থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে মোড় নিয়েছে।
উপন্যাসে উঠে এসেছে আটপৌরে গণরুমের চিত্র। এটা স্রেফ একটা ছাত্রাবাসের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের চিত্র মনে হয়নি, বরং পুরো বাংলাদেশ জুড়ে আবাসনের সঙ্কটের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। এক জায়গায় লেখক লিখছেন-
“গত রাতে আমাদের রুমে আরও ২ জনকে ওঠানো হয়েছে। রুমে জায়গা না পেয়ে তারা বারান্দায় ঘুমিয়েছে। ১১৪ নাম্বার গণরুমের এখন সদস্য সংখ্যা ২৬।
সারারাত ছেলেগুলো কিছু মেঝেতে কিছু বিছানায় লেপ্টে চাপ্টে ঘুমিয়ে সকালে ক্লাসে যায়। কত জনমের দুর্ভাগ্য যে তাদের! রুমের চার কোনে কেঁচোর মতো ক্যাচকি মেরে এগিয়ে সাপের মতো মতো পেঁচিয়ে শুয়ে থাকে। মাটির সানকির ভেতর এক দাগা লেডা কেঁচোর মতো কিলবিল করে। গোঙায়, স্বপ্ন দেখে, হাসে, কাঁদে।…”
এসেছে আবাসিক হলের গেস্টরুমে রাজনীতি চর্চার পুরো দৃশ্য। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে আমাদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, গ্রামে গ্রামে, ইউনিয়নে ইউনিয়নে, শহরে নগরে সবখানে রাজনীতি চর্চার একই দৃশ্য। প্রভাবশালী নেতার চারপাশ ঘিরে রয়েছে কর্মীরা, কোনও এক ব্যাপারে হয়তো বিচার সালিস হচ্ছে নিরাপরাধ মানুষের, বাকিদের অনেক কিছু বলার থাকলেও আসলে বলতে পারছেন না। কেউ একজন নেতার সামান্য বিরক্তির কারণ হলে শাস্তি পেতে হচ্ছে।
শামস, নুরুল-দীন, কাজল, নেলসন, রাতুল, সজল, হাসান- এরকম আরও কিছু চরিত্রের কাব্যিক ছোট দৃশ্যকল্প রচনা করে লেখক তার উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। লিখেছেন- তরুণ কবি নুরুল-দীনের সঙ্কট, তার উপর বিনা কারণে অত্যাচার, এবং সবাইকে এমনকি হলের প্রেসিডেন্টকেও পুচ্ছ প্রদর্শনের মাধ্যমে হল থেকে বিতারিত হওয়ার দৃশ্য।
হল দখলের মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত করে রাখার যে রাজনীতি সেটা উপন্যাসে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। একজায়গায় মাজহার লিখেছেন মধুর ক্যান্টিনের একটি দৃশ্যকল্প। ওখানে বলা হচ্ছে, ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে ছাত্রজোট নামের সংগঠনটির হল সভাপতি হুমায়ূন পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার ব্যাপারে একবার কথা বলেই আবার ঘুরিয়ে নেয়!
আসলে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়েন তারা ছাড়া এটি বোঝা খুব কঠিন। নতুন কমিটি হলে সংগঠনে ভালো পোস্ট পাওয়া যাবে, একটা ভালো থাকার জায়গা হবে, শঙ্কার জীবন থেকে কিছুটা মুক্তি মিলবে- এরকম আরও অনেক আশাতেই রাজনীতি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা উন্মুখ হয়ে থাকে, রাজনীতির প্যাচে পড়ে!
হুমায়ুন সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার আভাস দেওয়ার পরমুহূর্তেই যখন কথা ঘুরিয়ে নেয়, সে অবস্থাটা লেখক মাজহার সরকার বর্ননা করেছেন অনেকটা এভাবে- “ভূমিদাসের মতো নির্লিপ্ত নীরব চাহনি নিয়ে হুমায়ুনের চারপাশ ঘিরে থাকে ছাত্রজোটের নেতারা।”
হলের সেক্রেটারি কাদের। সংগঠনের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিবিড়ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কাদেরের মধ্য দিয়ে। তবে পুরো উপন্যাসে হল রাজনীতিতে কাদেরকে অনেকটাই নিষ্প্রভ দেখিয়েছেন লেখক। তারপরও কাদের ক্ষমতা ভোগ করে কারণ ছাত্রজোট নামের সংগঠনটি যে মূল দলের লেজুড়বৃত্তিতে জড়িত তার বড়নেতার সঙ্গে কাদেরের লবিং ভালো।
মাজহার দেখিয়েছেন- যে মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রজোট নামের সংগঠনটির উপরে উপরে খাতির, তলে তলে সেরকম রাজনৈতিক দলের সাথেই তাদের গোপন আঁতাতের চিত্র। কর্মীরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়লেও সভাপতি হুমায়ুনসহ বাকি নেতাদের নিষ্প্রভতা উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে রাজনৈতিকভাবেই।
বিরোধী আরেক বড় ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্রমঞ্চে’র সাথে হল দখলের লড়াই, রাজনীতি নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে লড়াই, রাজনীতির কারণে প্রেম বিসর্জন কী নেই- ছোট পরিসরের ‘রাজনীতি’ উপন্যাসে।
এর একটি প্রধান চরিত্র কাজল। মূলত কাজল চরিত্রটি উপন্যাসের একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে। ছাত্রজোটের আদর্শ কর্মী কাজল, এমনকি দলের কারণে গুলিবিদ্ধ হয়। মৌলবাদের সঙ্গে সরাসরি লড়াইয়ে যুক্ত হয়। আর এর বদলে কাজলকে বরণ করতে হয় করুণ পরিণতি। নিজের প্রেমকেও হারাতে হয় ।
‘রাজনীতি’ উপন্যাসে প্রেম, কাম ও পরকীয়া এসেছে কাজল চরিত্রের মধ্য দিয়েই। তবে উপন্যাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অংশটি এসেছে খুব ছাড়াছাড়াভাবে। তা হতেই পারে, কেননা ‘রাজনীতি’ এর প্রধান উপজীব্য।
হল প্রভোস্টের চরিত্র দিয়ে মাজহার এঁকেছেন পুরো জাতীয় রাজনীতিরই আমলা চরিত্র।
ছেলেদের ছাত্রবাসকেন্দ্রিক উপন্যাসটিতে নারী শিক্ষার্থী এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের উপেক্ষা করা হয়েছে বলেই মনে হয়েছে।
নেলসন নামের এক অদ্ভুত চরিত্র এসেছে, যে কিনা মারা গিয়েছিলো! কবর থেকে ফেরত আসা নেলসনকে কিছুটা প্রগতিশীল রাজনীতির চরিত্র মনে হয়েছে।
এ উপন্যাসে বুর্জোয়া দলগুলোর ছাত্রসংগঠন নিয়ে কথা বলা হলেও আসেনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর কথা, যাকে এর সবচেয়ে বড়ো ঘাটতি বলে মনে হয়েছে। যেকোনও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর আন্দোলন সংগ্রাম ছাত্র-রাজনীতির একটি বড় অংশ।
এছাড়া উপন্যাসের প্রথমদিকে প্রথমবর্ষের ছাত্রদের মুখ থেকে যে ধরনের সংলাপ এসেছে- সেসবকে একটু বেশি ‘পরিপক্ক’ বলে মনে হয়েছে।
সাধারণ গল্পই উপন্যাসে বলেছেন মাজহার সরকার। তবে ভাষারীতিটা চমকে দেওয়ার মতো। উপমা আর দৃশ্যকল্পগুলো মুগ্ধ করেছে। লেখক সবচেয়ে বড়ো যে কাজটি করতে পেরেছেন তা হলো- উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত একটা টানটান উত্তেজনা রেখে একের পর এক গল্প কবিতার ঢংয়ে বলতে পেরেছেন।
আবাসিক হলের ছাত্র ‘রাজনীতি’ নিয়ে এধরনের উপন্যাস সমসাময়িক সময়ে পড়িনি। অথচ গুরুত্বের বিচারে রাজনীতি, বিশেষত ছাত্ররাজনীতি- এদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতাপ পাদাবদল, মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অতীতের মতো এখনো সবচেয়ে বড়ো ভূমিকাই রাখছে।
সমসাময়িক লেখকদের একটি বড়ো অংশকে দেখেছি ‘রাজনীতি’, বিশেষত মূলধারার ছাত্র রাজনীতি এড়িয়ে বা পাশ কেটে গল্প লিখতে। সেদিক দিয়ে মাজহার সরকারের এ উপন্যাসটি বিশেষ প্রশংসার দাবিদার।
আর এসব দিক থেকে বিবেচনা করলে তরুণ লেখক হিসেবে ‘ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার’ পাওয়াটা মাজহার সরকারের প্রাপ্য বলেই মনে হয়েছে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com