ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় অরুন্ধতী রায়ের নতুন উপন্যাস

মুহিত হাসান | ১৪ জুন ২০১৭ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

Author‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’– আজ থেকে বিশ বছর আগে নিজের প্রথম উপন্যাস তথা প্রথম বই গড অফ স্মল থিংকস প্রকাশ পাবার পর অরুন্ধতী রায় এরকম প্রশংসাবাণীতেই ভেসে গিয়েছিলেন। মাত্র এক মাসের মধ্যে বইখানার চার লক্ষ কপি তখন বিক্রি হয়েছিল। সমালোচকদের বাহবাও জুটেছিল অফুরান। পরে অরুন্ধতী নিজের এই পয়লা উপন্যাস দিয়ে জয় করে নেন দুনিয়াখ্যাত বুকার প্রাইজ। কিন্তু কথাসাহিত্যের ক্ষেত্র থেকে তিনি যেন সরেই গিয়েছিলেন এরপর। এমন রাজকীয় অভিষেকের পর কেন তাঁর কলম থেকে বেরুচ্ছে না আরেকটা উপন্যাস–এই প্রশ্ন তাড়িয়ে ফিরেছে ভক্ত-পাঠকদেরও। অবশ্য লেখালেখি তাঁর থেমে থাকেনি, সামাজিক-রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে ঝাঁঝালো-তর্কপ্রবণ প্রবন্ধ-নিবন্ধ-কলাম লিখেছেন প্রচুর। সেসব গদ্যলেখা এক করে বইও হয়েছে একাধিক। পাশাপাশি ঠোঁটকাটা অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে আবির্ভূতও হয়েছেন ওইসব ঘটনা-প্রসঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে।
সুখবর হলো, কথাসাহিত্যের দুনিয়ায় বিশ বছর নীরব থাকার পর গত ৬ জুন অরুন্ধতী রায় হাজির হয়েছেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস নিয়ে। গত বছরের অক্টোবরে পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউজের তরফ থেকে বইটি আশু প্রকাশ্য এমন বিবৃতি আসা মাত্রই পাঠকদের মধ্যে আগ্রহ ও অপেক্ষার সূত্রপাত ঘটে। আগ্রহের আগুনে আরো ঘি পড়ে যখন পেঙ্গুইনের দুই প্রতিনিধি সিমন প্রসের ও মিরু গোখলে প্রকাশিতব্য বইটি সম্পর্কে বলেছিলেন : “এই বইটি প্রকাশ করতে পারাটা একইসাথে আনন্দের ও সম্মানের। কী অবিশ্বাস্যরকমের বই এটি–একাধিক স্তর থেকে; সাম্প্রতিককালে আমাদের পড়া নিখুঁত বইগুলোর একটি। এর লেখনী অসামান্য, সাথে চরিত্রগুলোও ঔদার্য ও সহানুভূতির সাথে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে…”। তাঁরা আরো বলেছিলেন, বইটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে যে শব্দরাও জীবন্ত। অরুন্ধতী নিজের মন্তব্য ছিল এমন “ আমি এটা জানাতে পেরে খুশি যে উন্মাদ আত্মারা(এমনকি যাঁরা অসুস্থ তারাও) এই উপন্যাসের মাধ্যমে পৃথিবীর পথ খুঁজে পাবে, যেমন করে আমি পেয়েছি আমার প্রকাশককে।” আর তাঁর প্রকাশনা-এজেন্ট ডেভিড গুডউইনের প্রতিক্রিয়া ছিল উচ্ছ্বাসমুখর : “একমাত্র অরুন্ধতীই এই উপন্যাসটি লিখতে পারতেন। একদম খাঁটি। এটা নির্মিত হতে লেগেছে কুড়ি বছর, এবং এই অপেক্ষা সার্থক।”

কাকতালীয় হলেও, অরুন্ধতী রায় গত কুড়ি বছরে যেসব ঘটনায় সরব হয়েছিলেন প্রতিবাদে, সেসবের প্রসঙ্গ এই নতুন উপন্যাসের কাহিনির শিরা-উপশিরায় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কোনো কোনো সমালোচক এ বিষয়ে বলছেন, গড অফ স্মল থিংকস-এর জগৎ থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন তিনি। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসের সাথে বরং মিল পাওয়া যাবে তাঁর নন-ফিকশন গদ্যরচনার সংকলনগুলোর সাথে। যেন সেসবের একরকম কাহিনিরূপ হাজির হয়েছে উপন্যাসের মলাটে।
উপন্যাসটিতে দেখা যায় বিচিত্র চরিত্রের সমাগম। যাঁরা আবার জড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ের ছাপ ফেলে যাওয়া একাধিক ঘটনার সাথে। আছেন আনজুম নামের এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি, যাঁকে জন্মের সময় পুরুষ ভেবে বাবা-মা নাম রেখেছিলো আফতাব। ঘটনা পরম্পরায় যাঁকে দেখা যায় গুজরাট রায়টের সময় নিজের আস্তানা থেকে পালিয়ে দিল্লির এক কবরখানায় দিনযাপন করতে করতে। এর পাশেই দেখি মর্গকর্মী দয়াচাঁদ চামারকে, যে নিজেকে বলে ‘সাদ্দাম হোসেন’। আর পাই এস. তিলোত্তমা তথা টিটো নামের কেরালার এক মধ্যবিত্ত মহিলার। যাঁর চেহারার বর্ণনা আবার মিলে যায় অনেকটা অরুন্ধতীর সাথেই। তিলোত্তমাকে এই বইয়ের মূখ্য চরিত্র বলা যায়। আশির দশকে কলেজে স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার সময় যাঁর ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ ঘটে তিন যুবকের সাথে। উপন্যাসে এই তিনজনকেই পরে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় কাশ্মীর উপত্যকায় চলমান সংঘর্ষের সাথে। একজনকে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে, একজনকে সাংবাদিক হিসেবে, আরেকজনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে।

border=0বস্তুত সমকালীন ভারতের ইতিহাসের বহু প্রসঙ্গ নিজের নবতম উপন্যাসে একত্রের প্রয়াস নিয়েছেন অরুন্ধতী। ইন্দিরা গান্ধীর আমলের জরুরী অবস্থা, ভূপালের গ্যাস-দুর্ঘটনা, শিখ-বিরোধী দাঙ্গা, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, মাওবাদীদের তৎপরতা, কাশ্মীরের সংঘর্ষ, গুজরাট দাঙ্গা, আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন থেকে আরম্ভ করে বিজেপি জামানার গোরক্ষা কর্মসূচি ও মৌলবাদীদের আস্ফালনের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে এতে। অনেকেই নাকি এজন্য উপন্যাসটিকে ‘আ নভেল এবাটউ এভরিথিং’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ।

অরুদ্ধতীর উপন্যাসের জগৎ ও বুননের এই ভোলবদলকে কেউ কেউ দেখেছেন ইতিবাচকভাবে, কেউ বা আবার সন্তুষ্ট হতে পারেননি। টাইম ম্যাগাজিনে বইটি নিয়ে বেশ ইতিবাচক একটি আলোচনা লিখেছেন সারাহ বেগলি, তাঁর মতে এই উপন্যাস সাম্প্রাদায়িক সহিংসতাকে জোরালোরূপে প্রশ্নের সম্মুখীন করে এর স্বরূপ বের করে আনতে চেয়েছে। কারা এসবে মদদ জোগায়, সরকার থেকে জনগণ সবার ভূমিকা তা যেন খুঁটিয়ে বিচার করতে চেয়েছেন লেখক। আর যেহেতু এক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাময় সময়ে উপন্যাসটির প্রকাশ, তাই তা হয়ে উঠেছে এই সময়ের জন্য অবশ্যপাঠ্য। মানবপ্রকৃতি দেখার অন্তর্দৃষ্টি, স্মরণীয় চরিত্রের সমাহার ও আনন্দদায়ক গদ্যের কারণে বিশ বছরের অপেক্ষা সার্থক করেছেন অরুন্ধতী রায়, এই হলো তাঁর উপসংহার।

তবে এতটা প্রসন্ন নয় হাফিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত সোমক ঘোষালের আলোচনাটি। তাঁর মতে, অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাস অত্যন্ত মেধাবী এক রচনা হলেও তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসটি সেই মানের থেকে ঢের ঢের দূরে। এবং এর অন্তর্গত সুর ও বুনন প্রায় অবোধ্য। নিজেকে অরুন্ধতীর ‘স্বঘোষিত ভক্ত’ বলে দাবী করে সোমক আরো বলেছেন, এই সুবাদে প্রচুর আশা ও ধৈর্য্য থাকা সত্ত্বেও বইটি পড়ে গিয়ে তিনি কয়েকবার হোঁচট খেয়েছেন। অরুন্ধতী একটি চমৎকার উপন্যাস লেখার সম্ভবনা সত্ত্বেও কেন চরিত্রগুলো সমকালীন ইতিহাস লেখার কাজে লাগালেন এই ভেবে তিনি হতাশ : ‘আমরা তাঁর কাছ থেকে একটি শ্রেয় উপন্যাস পেতে পারতাম, স্রেফ আধুনিক ভারত ও এর ন্যায়বিরুদ্ধতা নিয়ে এক প্রকান্ড হ্যান্ডবুক নয়।”

বইটি নিয়ে আরো আক্রমণাত্মক একটি আলোচনা লিখেছেন নন্দিনী নায়ার, ওপেন ম্যাগাজিনে। অরুন্ধতীর প্রতিবাদী-সত্তাকে তাঁর নিকট শ্রদ্ধেয়, কর্তৃত্বপরায়ণতার সঙ্গে তাঁর লড়াই নিয়েও দ্বিমতও নেই। কিন্তু তবু পাঠান্তে হতাশ হয়ে তিনি লিখেছেন : “তাঁর(অরুন্ধতীর) রাজনীতি প্রায় অনেক সময়ই কাহিনিকে ছাপিয়ে যায়, যা এর কাঠামোকে দুর্বল করে তোলে। দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ প্রতিভার ঝলক আছে, আছে এমন সব লাইন যা আপনার দমবন্ধ করে ছাড়বে। কিন্তু উপন্যাসটি শেষ করার পর আপনার মনে হবে, এটা যতটা না উপন্যাস তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রকল্প।” উপন্যাসটি তাই অরুন্ধতীর কথাসাহিত্যিক-সত্তার প্রতিনিধিত্ব শেষমেশ করে না। বরং যে অরুন্ধতী ক্ষমতা-বিরোধী, শাসক-বিরোধী, প্রাতিষ্ঠানিতা-বিরোধী ভয়ডরহীন এক কর্মী– সেই সত্তার আদলই এতে ফুটে ওঠে। তাই উপন্যাসটির চরিত্রগুলোও একসময় মানুষের বদলে হয়ে উঠেছে মিছিলের প্ল্যাকার্ড। ফলে যেসব পাঠক উপন্যাসের প্রথমাংশে চরিত্রগুলোর প্রতি সহানুভূতি পোষণ করছিলেন, তাঁরাও শেষাংশে এসে অবসাদগ্রস্ত ও বিরক্ত হয়ে উঠতে পারেন।

এছাড়া নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত করন মহাজনের আলোচনাটি মোটামুটি সন্তুষ্ট মনোভাবের। তবে তিনিও অরুন্ধতী রায়ের কাছে যা প্রত্যাশা ছিল ঠিক তেমন কিছু পাননি বলে খানিক খেদ করেছেন। তাঁর মতে, অরুন্ধতী রায় প্রতিবাদের পাল্টা সংস্কৃতির বৃহত্তর চিত্র ধরতে চাইলেও বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করতে পারেননি। ভারতের প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোর মনোজগতের ভেতরকার জটিল চিত্র এই উপন্যাসে অনুপস্থিত। তাই অরুন্ধতীর কাছে করনের চাওয়া এই, তিনি যেন “বৃহৎ প্রতীকের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত না বরং আর একবার ক্ষুদ্র জিনিসগুলোর(স্মল থিংকস) দিকে তাকান।” গার্ডিয়ান-এ ডেক্কা এটকিনহেডের রিভিউও অনেকটা এমনই বিমিশ্র। বহু খন্ডিত কাহিনি দিয়ে অরুন্ধতীর উজ্জ্বল ‘মোজাইক’ গড়বার ক্ষমতার প্রশংসা তিনি করেছেন। কিন্তু একইসাথে বহু চরিত্রের ও স্বরের সমাগম উপন্যাসের চলনকে লঘু করে দিয়েছে বলেও ডেক্কা মনে করেন।

অরুন্ধতী রায়ের উপন্যাসটি গোটা দুনিয়ার ইংরেজি পড়তে জানা পাঠকদের কাছেই বহুল প্রতীক্ষিত ছিল, সন্দেহ নেই। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে সহমর্মী পাঠকেরাও কেউ কেউ তাঁর নতুন উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন। হয়তো মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস শেষমেশ সেই পুরোনো তর্কই আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনবে, সাহিত্য কি রাজনীতির সাথে মিশ খাবে? খেলে কতটা? কীভাবে?
সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, টাইম, ওপেন, হাফিংটনপোস্ট

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com