শাপলা সপর্যিতার কবিতা: কনফেস

শাপলা সপর্যিতা | ১১ জুন ২০১৭ ৮:১৬ অপরাহ্ন

Jahanara Abedin Collectionআমার কি আছে বলুন তো?
ধ্বংসেরও কিছু স্মৃতি থাকে শেষ থাকে
কষ্টেরও কিছু ক্ষত থাকে
যেখানে চলে নিয়ত ক্ষরণ
তারপরও সেখানেও কিছু থাকে বিধাতার দান।

আমার বিবাহের শাড়িটি ছিল ৫ কেজি ওজন
দারুণ ঐতিহ্যে বেনারসী কাতান জড়ি পুতি চুমকীর বাহারে
হারিয়েছে যে নিজেরই বেশ।

আমি তখন ইথিওপিয়া থেকে এসেছি কেবল
বয়স পঁচিশ কি ছাব্বিশ
রুগ্ন হাড় জিরজিরে শরীরে
বয়স কমে দেখতে হয়েছিল আমাকে বিশ কি বাইশ
দেখুন না, এই দেখুন আমার বিবাহের সেই ছবি
এখনো জ্বলছে শাড়িতে নিয়ত আগুন
সিঁদূরে লাল, তাতে গাঢ় ঘন জমাট রক্তের ছোপ ছোপ
সত্যি করে বলি আজ আপনাদের
শাড়িটি লেগেছিল বড় ভার।

তবু আমি আমার রক্ত খেতে দিয়েছি এক মানুষ

নাড়িতে নাড়ি বেঁধে যখন ছুটে বেড়িয়েছি
পূর্ব থেকে পশ্চিম আর উত্তর থেকে দক্ষিণ
আমার পায়ে বেঁধে জল সরে গেছে কেবল দূর দূর আর দূর
যখন দশ হাতে সন্তান পেটে বেঁধে উড়েছি দৌঁড়েছি
লাফিয়েছি, ঝড় আর ঝঞ্ঝার ধরেছি চেপে টুঁটি
আমার তখনো লাগেনি ভার গর্ভের সন্তান।

তবু সংসার ভার লাগেনি
সত্যি করে বলছি শুনুন, ভার লেগেছিল মানুষ।

দুপায়ে চাকা লাগিয়ে যখন ছুটে বেড়াই দিক দিগন্তে
অনাহারে ক্লিষ্ট যখন সন্তান তখন আমি
অবোধ ঘুমে থাকিনি কোনোকালে অচেতন
তখনো আমার লাগেনি ভার জীবন সংসার
ভার লেগেছিল ভালোবাসাহীন সঙ্গম
রসহীন যৌবনের আস্ফালন
সঙ্গীবিহীন দারুণ যাযাবর জীবন
হায় জীবন…
দুরন্ত প্রাণবানের কাছে এক খোলশ জীবন
সত্যি করে বলি আপনাদের
ভার লেগেছিল আমার স্খলিত পৌরুষ
ভার লেগেছিল দুঃসহবাস।

জানুন, বিধাতা কৃপণ নন
আমায় দিয়েছেন অনেক….দুর্গম পথ দুঃসাহসী রথ
অপার নিঃসঙ্গতা আর অসীম শূন্য, অসীম…..
দেননি কেবল রথের সারথী পথের রেখা
দুহাত ভরে দিয়েছেন জল, উষর জমিতে ফসল ফলাবার দারুণ মন্ত্রযোগ
নিদারুণ তাপে গলিত তরলের মতো যখন যে পাত্রে রাখা
তারই আকার ধারণের দূর্বার সাহস।
ভেতরে দিয়েছিলেন গলিত তরলের মতো এক মানুষ
তাই গলে গেছি, সরে গেছি
আকার বদলেছি কেবল নিজের – আকার ।

তবু জানুন আপনারা, শুনুন প্লিজ
এই আমি করেছি কি ভুল
কনফেস করি আজ আপনাদের দারুণ ভালোবাসার কাছে –
আমি ছিলাম রাজদুলারী, রাজরক্তে কেবলই উদীয়মান অখর্ব অহং
দুহাতে ভরেছি অঞ্জলি আর উড়ায়েছি তারে
অবোধে দুর্বলে হৃতচিত্তে ব্যভিচারীরে অসম দুঃসাহসে
দিয়েছি উড়াতে পাল দিক দিগন্তে ওই দুর্বল মানবেরে

হায় হায় হায়, আমি ঈশ্বরে করেছি অপমান ।

ওই দেখুন তাকিয়ে
বিবাহের শাড়ি আমার উড়েছে শূন্যে
লাল রক্তের ছোপ আগুন ফণা
ক্রমাগত গ্রাস করছে জীবন ভালোবাসা দুরন্ত দুঃসাহস
ধেয়ে আসছে পেছনে মুছে দিতে এখান থেকে সেখানে আমার মুখ
যে পদচিহ্ন এঁকেছে আকাঙ্ক্ষা ঊর্ধ্ব থেকে অধঃ, ঈশান থেকে নৈর্ঋতে
আজ তা মুছে দিতে ধেয়ে আসছে ঝড়
রক্তে আঁকা ছেঁড়া পালে দুরন্ত আর উড়ন্ত জীবন
উদ্ধত দুই হাত যা কেবলই জাপটে ধরছে এতকাল বাসুকির ফণা
কেবলই খুবলে খেয়ে নিচ্ছে আজ তা বুকের পাঁজর

গলিত লাশের মতো পড়ে রয়েছি, গলিত লাশ…
জীবিত গলিত লাশ দেখেছেন কোনোদিন
জানেন কি কেউ রক্তপাতবিহীন ক্ষরণের যাতনা ?
জানেন ভালোবাসাহীন সঙ্গমের যাতনা?
কাটেনি কোথাও জীবাণু নেই তবু দগদগে ঘা
ক্যান্সার । নহন্য অসুখ।
ওপারে জীবন এপারে মৃত্যু
মাঝখানে ঝুলে থাকা অর্ধযুগ, যুগ
এবং যুগেরও অধিক কিছু কাল
ডানাকাটা পরীর গল্প শুনুন আজ
ঘরে অস্থির সন্তান ঘুমে অচেতন বিভোর সময়
ঘরে শূন্য হাড়ি ঘুমে অচেতন ছিন্ন হৃদয়
ঘরে সাদা ভাত অচেতন অথর্ব দারুণ যৌবন
একটি চালার নিচে চারটি ঘর
ঘরের খুঁটি কেবল আমার দুটি পা
জানুন আজ সেই রক্তাক্ত পায়ের বেদনা
মধ্যরাতে যখন শিরশিরে কাঁপন তুলে
অপাপবিদ্ধ যাতনায় জেগে থাকে মহাকাল আমার পায়ের অস্থিতে মজ্জায়
সত্যি করে বলি বিশ্বাস করুন
আমি বিধাতার কাছে আর একটা জনম চাই
ভিক্ষে চাই আমার দুটি পা
নিয়তির মতো কোন এক ছিদ্রপথে পায়ের ভেতরে
ঢুকে পড়ে কবে যে হাইবারনেশনে গিয়েছে এক কালসাপ
জানতেও পারিনি, হায়, আমার দু’টি পা
এই পায়ে জড়িয়েছে কত মায়া
অতল বৃক্ষ দিয়েছি যে ছায়া কত এই পায়ে দিয়ে সব ভার
দারুণ বর্ষায় হাঁটুজল ভেঙে ছুটেছি অনাগত সন্তান সাথে
ঘুমাতে দিয়েছি অবসন্ন বরষায় পরাণের পাখিটিরে তবু,
আহা পরাণের পাখি!! পরাণের পাখি আমার খেয়ে গেছে সব ধান
শেষ হয়েছে কবে কোনো প্রদোষে সব লাল রক্ত কণা
এক হিম হয়ে থাকা নিথর সময় অপ্রেমে প্রতারণায়
খেয়ে গেছে আমার অমেয় সব বিষ
তবু আমার ক্লান্ত লাগেনি জীবন
ক্লান্তি আসেনি রাত জেগে চাঁদের কপালে দিতে চাঁদের টিপ
পরম ভালোবেসে চোখে পরেছি কাজল খোঁপায় জড়িয়েছি প্রিয় বেলী ফুলের মালা
তবু আমি অপেক্ষায় থেকেছি পূর্ণগর্ভে কোনো উজ্জ্বল মানুষের।
আর নিজেরে সমর্পণ করেছি নিতান্ত নিরুপায়, আকাশের সবচেয়ে
অনুজ্জ্বল তারাটির কাছে। হায় মানুষ। ভুল মানুষ
আমি উদ্ধত আমি দূর্বার আমি অসীম কোনোদিন হার না মানাই যার স্বভাব
ছুটে বেড়িয়েছি নারী থেকে নারীতে মানব থেকে মানবে
আমি ছুটে বেড়িয়েছি পূণ্য থেকে পাপে
ক্ষরণ থেকে স্খলনে, তবু ভুলিনি চাঁদের মুখ
ভুলিনি দুধের বাটি ভাবিনি দারুণ ক্ষতি
ভুলিনি মায়ের ভাষা শূন্য করিনি পূণ্যরত্নগর্ভ আমার
চিরকাল যা রেখে দিয়েছি মানুষেরই জন্য, আহা মানুষ…

তবু আজ ‘হেল কিচেনের’ গল্প শুনি প্রিয় প্রতিবেশির মুখে
মায়ের শেষ স্মৃতিচিহ্ণ লুট হয়ে যায় আমারই সাজানো ঘর থেকে
আমার মায়ের সিঁথির সিদূর পরণের লাল শাড়ি
চুরি করে নিয়ে যায় কোনো লোলুপ স্বার্থবাজ
মদের গ্লাস ক্রিষ্টাল ক্লিয়ার ভালোবাসা ।
পরে থাকে কিছু লাস্যহীন ছবির প্রহর
দুটি আত্মজার কোমল প্রাণ।

মিথ্যা নয় এ দীর্ঘ ধর্মগ্রন্থের ভাষা
সাজানো নয় এর কোনো বর্ণ কি অক্ষর
কবিতায় মিথ্যে বলি না বিশ্বাস করুন প্রিয় মানুষ আমার
মানুষের প্রতি অটল বিশ্বাসে চলেছি রক্তপিছল পথে আজও
ভয় নেই আমার, নির্দ্বিধা চিরকাল সাথী
পূণ্যের পথে তাই প্রতারণারে ভাবি না স্খলন কোনোদিন
বুকে ছুরি বসিয়েছে যে মানুষ চিরকাল তারেই দুহাতে তুলে নিয়ে
পরম পুজায় জানিয়েছি নমষ্কার । মস্তক আমার নুয়ে গেছে তাদেরই কাছে
যারা দিয়েছে জীবনের পরম আয়ু গতি দ্রোহ
পথের পরে দিয়েছে পথেরও ঠিকানা
কারো তো পথই থাকে না, বলুন?
কারো কারো পা থাকে না। কারো জীবন থাকে না
কারো হয়তো গতি থাকে না
আমার তো সকলই আছে।
চলেছি আরও কোনো মানুষেরই পানে
আবারও জন্ম দেব
ঈশ্বর যদি আমার ক্ষমা করেন, অপমান
মানুষকে ভালোবাসবার পরম অপরাধ
তবে কথা দিচ্ছি আজ
আপনাদের ভালোবাসার বিনিময়ে
আবারও জন্ম দেব
জন্ম দেব এ আমারই গর্ভে
মানুষেরই আরও কোনো দুর্বার অমেয় সন্তান।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Rashed Shah — জুন ১২, ২০১৭ @ ১:৫৬ পূর্বাহ্ন

      অসাধারণ! অসাধারণ!
      এত দীর্ঘ কবিতা, তবু একটানে শেষ অবধি টেনে নিয়ে গেল এর ছন্দ, শব্দের জাদু আর এক গভীর বেদনাবোধের মায়া।
      এমন পাঠে আত্ম-উপলব্ধি ঘটে।
      অসংখ্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অলিক — জুন ১২, ২০১৭ @ ১২:২৯ অপরাহ্ন

      কবিতা জীবনের প্রতিচ্ছবি কিন্তু জীবন কবিতার মতো হয়না কেন, কখনো? তবে কি আজন্ম থেকে যাবে কবিতা আর জীবনের বৈরিতা ?
      পাওয়া না পাওয়ার চমৎকার এই স্বরলিপিতে সুর এসে বাসা বাধুক সেই প্রত্যাশা ও শুভ কামনা। সেই সাথে ভালোলাগা রেখে গেলাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু রাকিব — জুন ১২, ২০১৭ @ ১২:২৯ অপরাহ্ন

      ‘ক্রমাগত গ্রাস করছে জীবন ভালোবাসা দুরন্ত দুঃসাহস’! এক জীবনের ভালোবাসা কিংবা ভালোবাসাহীনতা! অসাধারণ । গল্পের মতো। দীর্ঘ কবিতায় জীবনকে পাওয়া যায় । ভালোবাসা পাওয়া যায়। ‘হায় মানুষ। ভুল মানুষ’ ভালোবাসার এই এক ক্রান্তি! কবিকে ধন্যবাদ ও শুভকামনা।- আবু রাকিব।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — জুন ১৩, ২০১৭ @ ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন

      A panoramic canvas in the background, narrative natural to carry on with as it flows in with an unstoppable rhythm. It’s worth reading.
      Congrats Shoporzeeta! ( Is the spelling correct?)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — জুন ১৩, ২০১৭ @ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

      A panoramic canvas in the background, a narrative natural to carry on with as it flows in with a smooth rhythm. It’s worth reading.
      Congrats Shoporzeeta! ( Is the spelling correct?)
      Shams Hoque

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন zannatul ferdous — জুলাই ১৭, ২০১৭ @ ২:১৩ অপরাহ্ন

      I felt like I was reading my own thoughts,feelings from another person in most unique, appropriate words!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com