দীপিত আশার বঙ্গীয় বদ্বীপ

রুখসানা কাজল | ২৯ জুন ২০১৭ ১০:০৭ অপরাহ্ন

border=0একটা সময় ছিল বাংলাদেশ ডুবে যাবে মহাসমুদ্রের কোলে এটা ভাবলেই প্রচন্ড ভয় পেতাম। আর যাই হোক নাকেমুখে খাবি খেতে খেতে পানিতে ডুবে মরা খুব একটা ভালো মানের মৃত্যু নয়। আমি প্রবাহিত নদীপারের মেয়ে। নদীর নানা রকম মনখেয়ালের সাথে বেশ ভালো জানাশোনা আছে আমার। নদী যে মানুষের কতটা আপন আবার কত বৈরি হয়ে উঠতে পারে তার সাক্ষী নদীপারের এই আমরা। একেক সময় দেখতাম আমাদের চেনা ছোট নদীটাই কেমন অচেনা রাক্ষুসীর মত গিলে গিলে খাচ্ছে পরিচিত নদীপাড়, জমি, ফসলের মাঠ, এমনকি ঘরবাড়ি, সখের বাগান। আবার কখনো কখনো দেখেছি নদীর জলে পূজোর ফুলের সাথে ভেসে আসা অপার সৌন্দর্যকে। শান্ত স্নিগ্ধ প্রিয় বন্ধুর মত। আবার কখনোবা উত্তাল নদীর খর স্রোতধারার সাথে ভেসে আসত মানুষ, গরু, ছাগলের লাশ। সব লাশের পেট থাকত ঢোলের মত ফোলা আর ঊর্ধ্বমুখী। তাতে কাক শকুনের হল্লা। এই তো বছর কয়েক আগে দেখতে গিয়েছিলাম ফরিদপুরের কিছু গ্রাম। পদ্মার ভাঙনে দিন রাতের যে কোনো সময়ে তলিয়ে যাচ্ছে গ্রামগুলো। কয়েকদিন আগেও যেখানে ছিল মুখর জনপদ, জীবনের শত সহস্র কলরব, সেখানে এখন অজস্র ফণা তুলে মহা আনন্দে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে জলদানবের উর্মি ও স্রোতধারা। সেই সময়, পদ্মার ভাঙনে ডুবে যাওয়া একটি নারকেল গাছ দেখেছি, হিজল পানির নীচে সবুজ হাত পা ছড়িয়ে সটান দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, পরমূহূর্তেই দুলে দুলে অদৃশ্য হয়ে গেলো গভীর থেকে মহাজলের গভীরে। এমন নদীর জলে পা ধুতেও কেঁপে ওঠে প্রাণ। অথচ নদী এক মহানির্মাতাও বটে। সহস্র পলি সঞ্চিত করে নির্মাণ করেছে বাংলাদেশ নামের এই বদ্বীপটাকে। আর আশ্চর্য এই তথ্যটি জানতে পেরেছি লেখক দীপেন ভট্টাচার্যের বিজ্ঞান ভিত্তিক বই বঙ্গীয় বদ্বীপের অতীত ও ভবিষ্যৎ পড়ে।

আবহাওয়া আর জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন, প্রকৃতির নিয়ম আর প্রকৃতির উপর মনুষ্য-সৃষ্ট অজাচার অত্যাচারে বহু বছর ধরেই চর্চিত হচ্ছে একটি ভয়। যে কোনো সময় মহাজলের তলে ডুবে যেতে পারে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি রাষ্ট্র। কখনো কখনো পত্রিকায় এমন খবরও পড়তাম যে আর অল্প কিছু বছর পরেই বদ্বীপের এই বাংলাদেশ, দেশের মানুষরা তাদের ভূমিসহ তলিয়ে যাবে অসীম জলের গভীরে। ভাবলে ভয় পেতাম বৈকি। এই ভয় থেকেই আমি আবহাওয়া, প্রকৃতি, পরিবেশ, ভূ-বৈচিত্র্যের পরিবর্তন, মনুষ্য কর্তৃক প্রকৃতিকে আঘাত, প্রকৃতির প্রত্যাঘাত আর চিরকালীন পরিবর্তনের অমোঘতা সম্পর্কে লেখা পেলেই পরম আগ্রহ নিয়ে তা পড়ে ফেলি। মাঝে মাঝে দু একটা আলোচনা সভায় যাই। সেখানে “ধরিত্রী বাঁচাও” সম্পর্কে বিদগ্ধ জনের সারগর্ভ আলোচনা শুনে চেষ্টা ধরিত্রীকে কি করে বাঁচানো যায় তা জানতে এবং বুঝতে । কয়েকবার মনুষ্য কর্তৃক প্রকৃতি বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে মানব বন্ধনেও অংশ নিয়েছি। সেই আগ্রহ থেকেই এবারের বইমেলায় প্রকৃতি-পরিচয়ের স্টল থেকে কিনে ফেললাম দুটি বিজ্ঞানভিত্তিক বই, তরুণ লেখক ফারসীম মান্নানের, থাকে শুধু অন্ধকার মহাবিশ্ব ও ধীমান সত্তার ভবিষ্যৎ এবং বঙ্গীয় বদ্বীপের অতীত ও ভবিষ্যৎ, লেখক দীপেন ভট্টাচার্য।
বঙ্গীয় বদ্বীপের অতীত ও ভবিষ্যৎ পড়ে আমি চমৎকৃত হয়েছি। কেনো সেটি বলার আগে প্রথমে জেনে নিই বইটির লেখক সম্পর্কে। লেখকের নামটি খুব সাদামাটা সাধারণভাবে লেখা। তাই বলে তিনি আমাদের মত আর দশটা সাধারণ মানের মানুষ নন। আদতে তিনি একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাসার গার্ডাড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক, বর্তমানে ক্যালিফোর্ণিয়ার রিভারসাইড কলেজের পদার্থবিদ্যার নামী অধ্যাপক। স্বদেশের প্রতি আন্তরিক মমতায় জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের সাথে। সেই সাথে সাহিত্যের সংগেও রয়েছে তার সহজ সাবলীল নিবিড়ঘন আত্মীয়তা। এমন মানুষের লেখা বই পড়ে জানার পরিধি ঋদ্ধ হওয়াটা যথেষ্ট স্বাভাবিক ও আনন্দের বৈকি।
Dipen-1বইটি পড়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি, গঠন, স্বভাব, বৈশিষ্ট্য–এর অতীত বর্তমান জেনে খুবই ঋদ্ধ হওয়া গেলো। ভূগোল বইতে পড়েছি, বাংলাদেশ পলল দ্বারা গঠিত। কিভাবে সেটা সম্ভব এটা জেনে অবাক হলাম এই বইটি পড়ে। মূলত নদীবাহিত বিন্দু বিন্দু পলি সঞ্চয়ের ফলে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বের ভূতাত্ত্বিকদের কাছে গঙ্গা ব্রম্মপুত্র মেঘনা অববাহিকার এই দেশটি বেঙ্গল বেসিন নামে পরিচিত। উত্তরে হিমালয় ও মেঘালয়ের মালভূমি, পূর্বে নাগা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চলের মাঝে বঙ্গোপসাগরের বুকে সবুজ আর্দ্র হৃদয়ের মত প্রস্ফুটিত হয়ে রয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। কোনো এক সময় ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া ছেলের ক্লাশ ফোরের জিওগ্রাফি পড়াতে গিয়ে জেনেছিলাম বাংলাদেশের মাটি নাকি স্পঞ্জ টাইপের। মাটির খাঁজে খাঁজে পানি জমে ভাসিয়ে রেখেছে এই পলল দ্বীপকে। তাই এখুনি সাবধান না হলে অসীম জলের উপর ভেসে থাকা দেশটি যে কোন সময় ভুস করে ডুবে যেতে পারে মহাজলের অতল তলে। কি ভয়ংকর ভবিষ্যৎ বার্তা। পত্রপত্রিকায় এইসব খবর পড়ে মাঝে মাঝে ঘুমের ভেতরেও ভয় পেতাম, ডুবে যাচ্ছি না তো! এমনিতে আজকাল ঘন ঘন ভূমিকম্প কাঁপিয়ে দিচ্ছে জনজীবনসহ গোটা দেশকে। বিশ্বের সর্বাধিক ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে। কি জ্বালা! বইটি কয়েকবার পড়ে কিছুটা শান্তি পেলাম। বিশ্বের মানচিত্র থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ত হবে না বাংলাদেশ। জানতে পারলাম দেশের কোথাও কোথাও জলের বুকে জমাট বাঁধছে পলি। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন ভূমিখন্ড। চমৎকার আশা জাগানিয়া বই।
একই সাথে এদেশের প্রায় সত্তর থেকে আশি অংশ পলিবিধৌত অংশের ভবিষ্যৎ বিপদ সম্পর্কে লেখক গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন। পড়তে পড়তে মনে হয়েছে সরকার এবং হাইরাইজ নির্মাতাদের যদি এই বইয়ের পাঠক হিসেবে পাওয়া যেত তবে হয়ত এখুনি আগাম বিপদের মোকাবিলা করার কোনো কৌশল বের করা সম্ভব হত। সম্ভব হত নূতন মাটিতে বসত গড়া বাংলাদেশ নামের বদ্বীপের ভৌগোলিক সাম্যাবস্থা বজায় রাখা। কিন্তু তাদের কি সময় আছে বইটি পড়ার!
তবে এটা ঠিক অনিবার্য মহাসামুদ্রিক আঘাত সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষ এবং সরকারকে একটি সুস্থির সিদ্ধান্ত নিতে বইটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রকৃতির অনিবার্যতাকে স্বীকার করে “জন বিপনন” অর্থাৎ উপকূলীয় অঞ্চল হতে জনগনকে সরিয়ে নিলে ভৌগোলিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব বলে লেখক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সেক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতনভাবে তিনি কিন্তু জানিয়ে দিতে ভুলে যাননি বিশ্বব্যাপী হাজার কোটি বছরের অসফল রাজনৈতিক অসুস্থতা, অনুদার অমানবিক সম্পর্কের হলাহল আর অসম্ভব স্বার্থপরতার কথা। তিনি সতর্ক করে বলেছেন এই বৈরিতা থাকার ফলে এই আশা পূরণ, স্বপ্ন মনে হলেও অসম্ভব নয় মোটেও। মানুষ তো মানুষের জন্যে।
বইটি পড়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি লাভবান হয়েছি। অনার্সের স্টুডেন্টদের বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে দেশের ভূ-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট, অবস্থান, নদী ও জলখাত সম্পর্কে জানাতে বেশ সাহায্য করেছে এই বইটি। ওদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে ঘটমান অনিবার্যকে মেনে নিয়ে কিভাবে দেশ ও জনগণকে বাঁচিয়ে নিজেদের বাঁচানো যায় এই চিন্তা। ছোট ছোট প্রশ্ন করেছে, বইটির চিত্র দেখে বোঝার চেষ্টা করেছে। আর দেশের নিম্ন সমতলবাসি স্টুডেন্টরা খুব বেশি ভাবনায় পড়েছে। যদিও বইতে দেওয়া চিত্রগুলো আরেকটু স্পষ্ট এবং বড় করে দিলে ছাত্রছাত্রীসহ আমাদের মত পাঠকদের বোঝার জন্যে আরো ভালো হত।
একটি বইয়ের সঠিক সার্থকতা হচ্ছে এখানেই। আমার ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানের নয় বলে বৈজ্ঞানিক ব্যাপার স্যাপারগুলো বাদ দিয়ে বিপর্যয়ের মহাসংকেত আর সমাধানকে খুব গুরুত্বের সাথে বুঝতে চেয়েছে। সহজ সরলভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তুলে ধরে লেখক ছাত্রছাত্রীদের মন জয় করতে পেরেছেন নিঃসন্দেহে। সহজে বহনযোগ্য বইটির বাঁধাই ভালো। ভ্রমণে, অবসরে, কাজের ক্লান্তি দূর করতে বইটি পড়তে কিম্বা শুধু নেড়েচেড়ে মূল বিষয়টা সহজেই জেনে নেওয়া সম্ভব। বিজ্ঞান আমি একেবারে বুঝিনা তাই প্রচ্ছদকে নকশা হিসেবেই দেখছি। বেশ ভাবগম্ভির আর সাংকেতিক প্রচ্ছদ। তবে এটুকু বুঝেছি এই মূহূর্তে বাঁচার প্রয়োজনে বইটি আমাদের পড়া দরকার। অসংখ্য ধন্যবাদ লেখককে এমন একটি দরকারি বই উপহার দেওয়ার জন্যে। বইটি পাঠকদের জন্যে মেলে দিয়েছেন বলে প্রকৃতি-পরিচয় প্রকাশনীকেও অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com