জেগে উঠবো কোন অন্ধকারে

প্রকাশ বিশ্বাস | ৬ জুন ২০১৭ ২:২২ অপরাহ্ন

Shilpaguru Safiuddin ahmedবসন্ত বাউরির বাতাসে কোন লেবুফুলের গন্ধ ভেসে আসে। ভেসে আসে আমের বোল আর কাঁঠাল মুচির সুবাস ।সবুজ নরম এই ঘাসের বন, আর বহু প্রাচীন, বুড়িয়ে যাওয়া ছাল বাকলের বৃকোদর আম,কড়ই, শিমূল, নারকেল বৃক্ষের সারি। পলাশ আর পারিজাত গাছও চেখে পড়লো। এর পাশে কাজল পড়া অতি শান্ত ধীর স্রোতস্বিনী। এ নদীর পাড়ে ভূট্টা, গম আর যবের ক্ষেতনীচ থেকে উপরে উঠে গেছে।
আমি কেন এখানে এই পরিপাটি করে সাজানো ঘাস আর লতা গাছের বাগানে পড়ে আছি? আমায় এখোনে নিয়ে এল কে? শেষ বিকেলের নরম রোদ। এই রোদে গাছপালার ছায়া পড়েছে তীর্যক আর লম্বা হয়ে।
জায়গাটি কোথায় আর কেনই বা আমি এখানে আমি জানি না। আর কে আমাকে কেন কিভাবে নিয়ে এসেছে তাও জানি না।
কিন্তু এ জায়গা যেন অমরাবতী অথবা ইডেন গার্ডেন।
একি একটি কাঠবেড়ালি আমার পাতলুনের পকেটে মুখ ঢুকিয়ে দিচ্ছে কেন? মনে পড়ছে যে আমার পকেটে রয়েছে চিনাবাদামামের ঠোঙ্গা। স্মৃতির আবছা অস্পষ্ট আলোছায়ায় মনে পড়ছে আমাকে যে ঘোড়ার গাড়িতে করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে এক সহযাত্রী আমাকে জল খাবারের জন্য এ ঠোঙ্গা উপহার দিয়েছিল।
মিহি বাতাসে ঘুঘুর ডাকে করুণ মূচ্ছর্ণা, হঠাৎ নারকেল গাছের শীর্ষদেশের পাতার আন্দোলনে চোখ আটকে গেল। সাদা ওড়না জাতীয় কাপড়ে মোড়ানো একটি আবছায় মূর্তি । ভালো করে দেখার পর মনে হলো ওটা আমার মনের ভুল।

অনবরত ঘুঘু পাখিদের আর্তনাদ, কোকিলের করুণ ক্রন্দন। এর মধ্যে এই বৃক্ষ ও ফুল শোভিত বাগান থেকে হাঁটতে শুরু করলাম জায়গাটা ঠিকমতো চেনা জানার জন্য। এ সময় দূর থেকে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক চিৎকার শুনতে পেলাম। কুকুর এত জোরে কাকে দেখে অথবা কিসের জন্য এভাবে ডাকছে বুঝে উঠে পারছিলাম না।
ফাল্গুনের এই বিকেলে এ রকম নিসর্গ নিবিড় আয়োজনে কোন মহাকর্ষীয় কালে আমি দাঁড়িযেছি। আমি কে তাতো আমি বুঝে উঠতে পারছি না। মহাকালের কোন আচ্ছন্ন শ্রাবস্তীি অথবা উজ্জয়িনীপুরে কোন জন্মে আমি জেগে উঠলাম। আমি কি নিদ্রায় না জাগরণে?
সবুজ তৃণের এই আশ্রয় ছেড়ে আমি উঠে পড়লাম।

চোখে আটকালো একটি সাদা রংয়ের বাড়ির নিশানায়। চারদিকে গোল বারান্দা দেয়া একতলা বাড়িটি আমার সামনে যেন কাজলা নদীর বুক থেকে ভেসে উঠেছে। এ বাড়িটি কার? এটি কি কারো কোন কর্মালয় না আবাসন বুঝতে পারছিলাম না।
কোন জনমনুষ্যের দেখা মেলে কিনা জানার জন্য ব্যকুল হলেও কাউকে দেখতে পাচ্ছিনা।
অকস্মাৎ মনুষ্য কন্ঠের হাঁক শুনি। কই হ্যায় …
খাঁকি পোষাকে হাতে বন্দুক এক প্রহরীমতো লোকের অস্পষ্ট ছায়া আমার দিকে এগিয়ে আসছে যেন।
ভয় ও কৌতুহলে আমি পিছিয়ে যেয়ে গাছের আড়ালে চলে গেলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে এই প্রহরী কারো অস্তিত্বের বিষয় টের পেয়েই এখানে এসেছে। শিকারী কুকুরের মতো ঘ্রাণ শুঁকে এগিয়ে আসছে সে। কিন্তু হলুদ সবুজ গিরগিটি রংয়ের পোষাকের আড়ালে আমি খুব সহজেই ক্যামোফ্লেজ করে কোমড় সমান উঁচু অর্কিড, পাতাবাহার আর নীল গাছের আচ্ছাদনে শুয়ে পড়লাম।
কাউকে না দেখে না পেয়ে ফিরে গেল সে। সাময়িক মুক্তির নিশ্বাস আমার বুক চেপে বেরিয়ে আসলেও বরফ ঠান্ডা ভয়ের স্রোত ঠিকই আমার শিরদাড়া বেয়ে নেমে এল। ভয়ের অনুভূতি তাহলে আমার রয়েছে। আমি একটু আশ্বস্ত হলাম আর কি। আমি গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম। আমার মধ্যে আমি রয়েছি কিনা তা জানার জন্য। এভাবে কোটে যায় বেশ কিছুক্ষণ।
অকস্মাৎ ভেসে আসে গিটারের সুর। ভালো করে খেয়াল করে দেখি সামনের এ সুরের উৎসভূমি। তাহলে একজন দুজন নয়। অনেক লোকজনই আছে এখানে, আসেপাশে, যা আমি এতক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না, ধরতেও পরছিলাম না।
আমি সে যন্ত্র সঙ্গীতের সুর ধরে এগোতে থাকি এই বাগানের মাঝ দিয়ে ইট সুড়কি বিছানো পথ ধরে।
নারকেল গাছের সারির আড়াল ধরে ঐ দুধসাদা ভবনের দিকে এগিয়ে যাই। এবার ভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের অবিরল সুরের ধারা গলে আসছে ভেতর থেকে। হারমোনিয়াম,তবলা, বেহালা, সেতারের সুর মূচ্ছর্না ঝঙ্কারের সঙ্গে নাচের শবদ্ আসে। পায়ে মল পড়া কেউ নাচছে। সাবধানে জানালার খড়িখড়ির ফাঁকায় চোখ রাখি।
ভেতরে হাতে পানীয় গ্লাস, মুখে তামাকের পাইপ,হ্যাট কোট পড়া সাদা চামড়ার দুই ইংরেজ সাহেব বসে আছে নরম আসনের গদিতে। পাশে এ দেশীয় পারিষদ বর্গ। নাচ চলছে ঝড়ের মতো। ‘লাইক এ গ্লিটজ… ব্র্যাভো… হুররে’ বলে চিৎকার করে উঠলো এক সাহেব।
উপলব্ধি সঞ্জাত ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমায় জানান দিলো যে এ বাড়িটি আদতে একটি নীলকুঠি।
এ ঘরটার দেয়ালের শীর্ষে জানালা দিয়ে গোধূলির আলো পিছলে পড়েছে মসৃন মেঝেতে। আস্তে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে চারপাশে।
পাশের ঘর থেকে ছিটকে আসছে কুৎসিত উল্লাস ধ্বনি।
আমি এ কামরার জানালা থেকে একটু সরে পাশের ঘরের জানলায় চলে যাই। এ ঘরটি অন্ধকার। এ ঘরে গুমরে ওঠা চাপা কান্নার শব্দ কনে আসে। কে যেন কাঁদছে। কালো মতোন একটি অবয়ব একটি শেকলে বাধা আবছা দেহ কাঠামো নজরে আসলো। শরীর শিউরে উঠলো।
যুগপৎ ভয় আর বিমিষার উদ্রেকে আমি ক্লান্ত বোধ করতে থাকি। আমি উপলব্ধি করতে পারছি যে এখান থেকে আমার চলে যাওয় উচিৎ।
কিন্তু আমি কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িযে আছি । পা সরছিল না এ সব দৃশ্যের আবহ দেখে। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাকে জানান দিচ্ছিল যে আমি এখানে মোটেও নিরাপদ নই। এখান থেকে আমার পালিয়ে যাওয়া উচিৎ। এরা আমার কেউ বন্ধু বা মিত্র তো নয়ই বরং ভীষণ রকমের শত্রু। আমার জীবন হানিও ঘটাতে পারে এরা। মূহূর্ত দন্ড পল সরে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু নড়তে পারছিলাম না আমি। এ স্থানটিতে কি যাদু রয়েছে? আমি কি চেতনায় না অবচেতনায় রয়েছি। আমি কি নিদ্রায় রয়েছি না জাগরণে?
হঠাৎ পেছন থেকে শক্ত একটি হাত সাঁড়াশির মতো আমার ঘাড় চেপে ধরলো। আমি তার হাত থেকে ছুটতে চাইলাম। অমোঘ নিয়তির মতো মনে হচ্ছিল সবকিছু। আর কিছু আর মনে করতে পারছি না।
কখন কতক্ষন পর আমি আবার আবছা অস্পষ্ট চৈতন্যে ফিরে আসি বলতে পারবো না। আমাকে তোলা হযেছে একটি চলন্ত কোন গাড়িতে, সেটি গরু না ঘোড়ার গাড়ি বুঝা যাচ্ছিল না।
বুকের ছাতি ব্য্যথায় ছিড়ে পড়ছে। গলা শুকিয়ে গেছে, দম নিতে কষ্ট। শরীরে ভীষণ রকম ব্যথা অনুভব করছিলাম।
ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম ওরা আমাকে ভেবে নিয়েছে নীলচাষের বিরোধীপক্ষ হিসাবে। এদের একজন আমাকে বিশে ডাকাতের দলে ফেলে দিয়েছে। এবার প্রচন্ড লাথি এসে পড়লো শরীরে ।
আবার চেতন অচেনের বুদবুদ উঠে মিলিয়ে গেল। কিছু মনে পড়ছে না আর। শুধু ভাবছি ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমি আবার কোন অন্ধকারে জেগে উঠবো।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Siddhartha Sankar Dhar — জুন ৬, ২০১৭ @ ২:৪২ অপরাহ্ন

      পড়লাম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হিরক পাশা — জুন ৬, ২০১৭ @ ৪:২৭ অপরাহ্ন

      লেখার সময় লেখক তাড়াহুড়া করেছেন। গল্পটি পড়ে মনে হয়েছে তিনি রামায়ন যুগ থেকে হাঁটতে হাঁটতে পলাশীর যুদ্ধ যুগ পর্যন্ত এসছেন। আধুনিক সভ্যতায় এখোনো পা রাখেননি। তবে সবকিছূ ছাপিয়ে গল্প ভালো লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সানাউল ইসলাম টিপু — জুন ৬, ২০১৭ @ ৪:৪৩ অপরাহ্ন

      আমার বাড়ি মেহেরপুরে আছে কাজলা নদী। যার পাড়ে আমঝুপি নীলকুঠি । আমরা তো এখোনো মুক্তি পাইনি। যুগের অন্ধকারেই তো রয়েছি। পড়লাম। ভোলো লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shams hoque — জুন ৭, ২০১৭ @ ৩:৫৬ অপরাহ্ন

      পড়লাম i গতানুগতিক মনে হয়েছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সানাউল ইসলাম টিপু — জুন ৭, ২০১৭ @ ৩:৫৬ অপরাহ্ন

      গল্পের শুরুতে প্রকৃতির বর্ণনা শৈশবে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। এ কারণেই সৌভাগ্য বলছি, আজকের দিনে তা দেখার সৌভাগ্য অনেকেরই নেই। এটি পাঠককে নিয়ে যাবে অতীতের রোমন্থনে।

      মাঝের অংশের ভৌতিক বর্ণনায় উঠে আসা নীল বিদ্রোহকালের স্মৃতি ঐতিহাসিক। এটি মেহেরপুরের আমঝুপির নীলকুঠি। এটি যেমন ইতিহাসের শিক্ষায় আগ্রহ তৈরি করতে পারে তেমনি গল্পের পরিধিটি আরও বাড়ানো যেতে পারে। তা না হলে গল্পটি কবিতা হয়ে উঠবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সোহেল আহমদ — জুন ৮, ২০১৭ @ ৪:২২ অপরাহ্ন

      সাম্প্রতিক বাংলা কথাসাহিত্যের সৃজনশীলধারায় ভাটা লেগেছে – এই অভিযোগটি শুনতে শুনতে কান পচে গেছে; এরই মাঝে প্রকাশ বিশ্বাসের “জেগে উঠবো কোন অন্ধকারে” যেন হঠাৎ করে আত্মজাগানিয়া এক রচনা ! ইংরেজরা ক্রিকেট খেলে এটা আমরা সবাই জানি কিন্ত আমরা তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে ইংরেজরা নীলকুঠিও স্থাপন করেছিল শুধু কাজলা কেন অনেক নদীর পাড়ে ! অতীতের তাম্রলিপ্তি থেকে বা তারও আগে থেকে ইতিহাসের যাত্রা শুরু হতে পারে কিন্ত বর্তমানটা স্থবির ! এরই মাঝে “জেগে” ওটার কথা শুনতে কার না ভালো লাগে !

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ruma — জুন ১০, ২০১৭ @ ৫:৪১ অপরাহ্ন

      এটা গল্প! একটা বড় গল্প বা উপন্যাসের ভূমিকার বেশী মনে হচ্ছে না। লেখার ভাষা প্রাঞ্জল কিন্তু গল্পের কোন কাঠামো গড়ে ওঠেনি, দুঃখিত।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com