উৎপলকুমার বসু পেইন্টার ছিলেন

মাজুল হাসান | ১০ জুন ২০১৭ ১২:১৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম দেখে চমকানোর কিছু নাই। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কবি উৎপলকুমার বসুর পেইন্টিং-এর কোনো গোপন মহাফেজখানা আবিষ্কৃত হয়নি। তবু তাকে চিত্রশিল্পী বলছি। কেনো? কারণ, তিনি তার কবিতাকে ব্যবহার করেছেন পেইন্টিং-এর ক্যানভাস হিসেবে।
utpal যেখানে বিচিত্র সব চরিত্র, ঘটনা, রূপক, সেগুলোর নির্মাণ-ভাঙচুর-পুনঃনির্মাণ- এমন ইশারাভাষ্যে খোদিত যে তা কোনো অংশে পেইন্টং-এর চেয়ে কম মূর্ত-বিমূর্ত নয়। আধুনিক চিত্রকলায় শিল্পীর ছবিতে যতটুকু দৃশ্য মূর্তমান, শিল্পী যে চিন্তা থেকে যতটুকু দর্শককে দেখাতে চান, দর্শক-বোদ্ধাদের সেটির বাইরেও নতুন অর্থ তৈরি করতে পারেন। এটিই হচ্ছে ব্যক্তিগত স্পেস, যা পেইন্টিং দিয়ে থাকে। যে কারণে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মোনালিসার হাসি নাকি গোমরা মুখ এঁকেছেন, তা দর্শকের মন-মর্জি, দৃষ্টিভঙ্গীভেদে বদলে যায়। মানে দর্শক সেই ছবিতে নিজের রঙ চড়াতে পারেন। সেই সুযোগ থাকে বলে মূর্ততা ভেঙে বিমূর্ত, আবার বিমূর্ত থেকে মূর্ততায় পৌঁছায় বোধ। উৎপলকুমার বসুর কবিতাও তেমনি। এই যে ক্রাফট, সেই ব্যাপারটা উৎপল কিন্তু শিখেছেন দৃশ্য ও বস্তুজগৎ থেকে, উনি নিজ মুখেই বলেছেন- ‘ব্যাপারটা বাংলা ট্রাডিশনাল কবিতা থেকে পাওয়া নয়।’- এই বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষী তার কবিতা।

চৈত্রে রচিত কবিতায় বাক্য ও দৃশ্য অবতারণায় জীবনানন্দীয় স্কুলিং-এর ছাঁচ থাকলেও পুরী সিরিজ থেকে আমরা যে উৎপলকে পাই সে অনন্য। বলছি না শ্রেষ্ঠ, ভালো- কী মন্দ। বলছি- অনন্য; অন্যের মতো নয়। এই অনন্যতা তার পর্যবেক্ষণ ও কবিতার ফর্মে ভাংচুর ও নীরিক্ষার ফসল।

উৎপল, দু’দিক থেকে আলাদা। প্রথমত- ফর্ম, দ্বিতীয়ত- ভাষা। এই দু’টো বিষয় আবার পরিপূরক। একটি অন্যকে অবধারিতভাবে পাল্টে দেয়, প্রভাবিত করে। উৎপলের কবিতায় কনটেন্ট সচেতনতার চেয়ে ফর্ম সচেতনতা বেশি। এমনটাই তিনি বলেছেন এক সাক্ষাতকারে। উনি বলছেন-
‘আমি ফর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। সেটা হয়তো এই কারণে যে লেখায় আমি কনটেন্টের দিক থেকে আসিনি, এসেছি ফর্মের দিক থেকে। যতোক্ষণ পর্যন্ত না আমি একটা লেখাকে ভিসুয়ালাইজ করতে পারি যে পাতায় কেমন দেখাবে, ছাপায় কেমন দেখাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমার নিজের পক্ষে লেখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এখন যে পর্যন্ত আমাদের ‘যোগসূত্র’ উল্টে-পাল্টে দেখছি, ‘পঁচিশটি কবিতা’ কীভাবে ছাপা হবে সে বিষয় নিয়ে কিছু আলোচনাও হয়েছে। আই ট্রাই মাই বেস্ট টু ভিসুয়ালাইজ- সেটা ওই ক্রাফট-এর চিন্তা থেকে।’ (১)
এই ভাব ও বিষয়গত জায়গার চেয়ে বিভ্রম ও পুননির্মাণের প্রতি পক্ষপাত উৎপলকে বাধ্য করেছে একজন চিত্রকর-কবি হয়ে উঠতে। যেখানে তিনি সবসময়েই পাঠকের জন্য একটি স্পেস রেখে দেন, যাতে কবিতাটিতে তারও অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে, যেন ক্যানভাসের মুর্ত-বিমূর্ত শূন্যস্থানগুলোয় দর্শক নিজ গরজেই ভরে দেবেন রং, অর্থ। ফলে উৎপলের কবিতা ন্যারেটিভ ভেঙ্গে বহুঅর্থবোধকতার দিকে দৌড় দেয়। এই মাল্টিডাইমেনশন দেয়ার কাজটি উৎপল করেন কিভাবে? করেন- বাক্যে, করেন- বাক্য বিন্যাসে, করেন- শব্দ চয়নে, করেন- চরিত্র চিত্রায়ণে। আর এই সূচনাদার উপাদানগুলো তিনি একটির উপরে আরেকটি মার্চ করিয়ে দেন কখনো কখনো। ফলাফল- বিভ্রম, পুননির্মাণ, অনন্যতা।


দুই.

কবিতায় অহম-আমিত্বই প্রধান। কবিতায় ‘অন্যরা’ও আসলে ‘জারিত আমি’। তবু কিছু কিছু চরিত্র কোনো কোনো কবির ট্রেডমার্ক হয়ে ওঠে। যেমন- জীবনানন্দ দাসের বনলতা সেন, শ্রাবস্তীর কারুকার্য হয়ে ফুটে আছে বঙ্গসাহিত্যে। সুনীল গাঙ্গুলীর নীরা, বিপ্লবের পথে যে নারী ঈ-কারের মতো হয়ে আছে বাধা। উৎপলে এমন চরিত্রের দেখা মেলা ভার। এর কারণ, চরিত্রের প্রতি তার অনীহা নয়, বরং তার কবিতায় এতো এতো চরিত্র, এতো এতো স্বর যে কাউকেই আলাদা করে চেনা মুস্কিল। মনে হয়, উৎপল তুলে আনছেন একটা রেলস্টেশনের ছবি-শব্দ, ওখানে বাক্সপোটলা নিয়ে বসে থাকা মহিলাটি যেমন আছে, তার মাথার ওপরে ঘণ্টায় শ্যাওলাপড়া, বাদামঅলার তিন-দানা বাদাম বিক্রি, লাইনে পড়ে থাকা বিষ্ঠা- সবই এতো উপর্যুপরি ঢুকে পড়ে যে কাউকে আলাদা করে চেনা যায় না। কিন্তু একটি সামগ্রিক ছবি তাতে ফুটে ওঠে- ‘ইহা হয় রেলস্টেশন’। তবে উৎপল যদি রেলস্টেশনের কথা বলেন, তবে তার ট্রেনগুলোর কামরায় কতটুকু আলো জ্বলবে, কোন রঙের আলো বের হবে জানালা দিয়ে- সেগুলো একান্ত উৎপলের এখতিয়ার। এই স্বাধীনতা ও সৃষ্টিশীলতা শেষ পর্যন্ত অসংখ্য চূর্ণমুহূর্ত ও ভগ্নঘটনাংশ থেকে পূর্ণতার দিকে যাত্রা করে। সেই যাত্রায় পাঠক নিজেও মিলিয়ে নিতে পারেন নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, সাজাতে পারেন ট্রাভেল ব্যাগ। তবে উৎপলের কবিতায় একেবারে যে জ্বলন্ত চরিত্র নেই তা বলা ঠিক হবে না। উল্লেখ করতে চাই- ‘পুরী সিরিজের ‘বোনের সঙ্গে তাজমহলে’ কবিতাটির কথা।
এবার অদিতি আমি তোমারই কোলের কাছে সরাসরি পড়ে যেতে থাকি
ধর্মচ্যুত, আশ্রয়হীন,
নিজের বোনের প্রতি যৌনতা ও উপদ্রপ আমি লক্ষ করি
নক্ষত্রসন্ধির প্রতি ঝুঁকে পড়ে শাহীবাগ গম্ভীর আগুন
নিয়ে ক্রূড়াশীল, ক্ষমা নেই, নির্দেশ অপরাধবোধ
দেখাও অদিতি।

খুবই পষ্পাপষ্টি বক্তব্য। চরিত্র স্পষ্ট। লুকাছাপার কিছু নাই। অদিতির প্রতি যৌনবোধই মুখ্য। এই কবিতায় উৎপলের বহুচরিত্রের চাপ নেই। কিন্তু উপমা ও দৃশ্যকল্পের মুহুর্মুহু চাপ আছে। আবার পুরী সিরিজ-এর ‘চিঠিপত্র’ কবিতায় চকিতে দেখা পাই অদিতির- ‘দিতি-অদিতির কোলে মাথা রেখে ডুবে যায় শেষরজনীর চাঁদ’। ‘আমারই প্রাণের দিকে চেয়ে দেখি’-তে অদিতিকে আমরা দেখি টুকরো চরিত্র হিসেবে। তবে কবিতাটিতে যে ‘বোনের সঙ্গে তাজমহলে’-এর এক্সটেনশন ইনফরমেশন আছে তা পরিস্কার।

বনের ভিতর আজ সকালের উদ্দেশ্যহীন দমকল একা একা ঘুরছে আমাকে টেনে নিয়ে চলো ঐ অগ্নিনির্বাপক ক্ষমতা আমারও আছে স্ত্রী আছেন পুরুষের আয়ত্তে যেমন ফুল আছে দানবীয় আয়ত্তে যেমন আমার কয়েকদিন ব্যথা হল বাঁ চোখে এবং আতঙ্ক হলো অন্ধতা আমার বেশিদূর যাবে কি যৌবনে- নাহয় গাড়ির টায়ারচিহ্ন ধরে চলেছি এবার গভীর বনের দিকে দমকল কিছু আগে গেল

যেখানে মরণশীল উদভ্রান্ত মোরগ ক্রমে উড়ে যায় মৃত্যুর পরেও লাল টালি বারান্দায়

– ঐখানে অদিতির কণ্ঠস্বর শুনি। সে বলে- যুবক নষ্ট করো না বীজ

– ঐখানে নভোরশ্মি সাদা জরিপোশাকের দিকে তাকিয়ে বুঝেছি আমি- ‘যায় দিন, গ্রীষ্মের দিন যায়, যায় সূর্য, যায় দুর্ঘটনা’

এই হলো উৎপল, অবলীলায় সব গিলে ফ্যালেন, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখেন চিন্তাসূত্র- আপনি জুড়ে নিন। বাক্যের দাড়িকমা তুলে দিয়ে শব্দের গোলকধাঁধায় নিক্ষেপিত আপনি, কোনখানে শুরু করবেন বাক্য, একটু উনিশ-বিশ হলে তথ্য ও গল্প যায় পাল্টে। দিতি হয়ে যায় অদিতি। তবে ক্ষতি নেই- পাঠকের জন্য অপেক্ষা করছে শেষরজনীর চাঁদ, নিটোল কবিতা। সেটা যতখানি উৎপলের চাঁদ ততোখানি পাঠকেরও। যেটা যতখানি দিতি’র ততোখানি অদিতিরও।
অর্থাৎ-
১. বাক্যে শব্দের মধ্যে গোলকধাঁধা, ব্যকরণগত ভাংচুর- পাঠক আপনি বুঝে নিন নিজস্ব স্পেস
২. ঘটনার মধ্যে লেপ্টে যাচ্ছে ঘটনা- পাঠক আপনি জেনে নিন নিজস্ব টুকরো আখ্যান
স্মর্তব্য: বনের মধ্যে উদ্দেশ্যহীন দমকল, অন্ধ হওয়ার ভয়, (মাস্টারবেশন?),- ঐখানে অদিতির কণ্ঠস্বর শুনি। সে বলে- যুবক নষ্ট করো না বীজ
৩. চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে চরিত্র- পাঠক নিজেকে খুঁজে নিন জনাকীর্ণ রেলস্টেশনে।

তিন.
উপরোক্ত ৩ অনুসিদ্ধান্তের তিনটেই প্রমাণিত। তারপরেও ৩ নম্বর অনুসিদ্ধান্তটি আরেকটু বিষদভাবে, পরিস্কার করে আলোচনার দাবি রাখে। কারণ এই শেষ গুণটিই শেষ পর্যন্ত ‘ফর্ম-প্রধান’ উৎপলকে এই জনপদের মৃত্তিকলগ্ন করে রাখে বলে আমার অনুমান। না হলে ফর্ম-টেকনিকের মতো যান্ত্রিক বিষয় দিয়ে একজন কবি এতো প্রভাবসঞ্চারী হতে পারতেন না। পারতেন না দীর্ঘ বিরতির পর আরও সাড়ম্বরে ফিরে এসে বাংলা কবিতার গতিপথ পাল্টে দিতে। এই যাত্রায় উৎপলকে সাহায্য করেছে বঙ্গজনপদ ও বিশ্বচরাচরের এক অক্লান্ত পর্যটকের নস্টালজিক মব-সাইকোলোজি। সেই সঙ্গে পাঠকের সঙ্গে বাকবন্ধী খেলাতো আছেই। উৎপল সবসময় পরীক্ষা নিয়েছেন পাঠকের। বলেছেন- ‘আমি চাই পাঠক তার প্রাণপণ চেষ্টা করুক। পাঠকের সঙ্গে সব সময় আমার একটা দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক থাকে। আমি একটা জিনিস তৈরি করে পাঠককে দিলাম, আর সে খেয়ে নিল। সেটা আমি চাই না। আমি চাই যে সে নিজেও কিছু কন্ট্রিবিউট করুক। আসলে এটা আমাদের যৌথ, দ্বৈত উদ্যোগে লেখা একটি কবিতা।’ (২)

১.
হস্তচালিত প্রাণ তাঁত সেই আধোজাগ্রত মেশিনলুম আমাদের হুর রে
‘বসন্তে এনেছি আমি হাবা যুবকের হাসি’
ছিল ভালোবাসা
ছিল অনিশ্চিত রেলডাক ছিল মেঘের তর্জন
ছিল আঠারো/উনিশ মাইল টিকিট অথচ বেড়ালাম অনেক অনেক অভিজ্ঞতা হল
হস্তচালিত প্রাণ তাঁত সেই আধোজাগ্রত মেশিনলুম আমাদের হুর রে
ছিল উচাটন উট ছিল তানপ্রধান রেডিও আমার শুনেছিলাম
চিতচোর মনচোর জলে যেতে সই পারবো না লো তখনই তোমার চিঠি এল
পেলাম অনিশ্চিত ডাক পেলাম উপহার সেবার জন্মদিনে রিবনেবাঁধা রবীন্দ্রনাথ
পড়ি নি এখনো সময় কোথায় বাবা
যতদিন কালুবাবু জীবিত আছেন চিন্তা নেই বুঝে নেব রক্তকরবী
কখনো না কখনো নিচু গলায় ওঁকেই বলতে শুনবো ধন্যবাদ আজ
হস্তচালিত প্রাণ তাঁত সেই আধোজাগ্রত মেশিনলুম আমাদের হুর রে
আজ গন্ধক মেশানো জলে স্নান করে জেলঘুঘুদের আত্মা
আর কি চাইতে পারো কলকাতায় তাঁতকল ছাড়া তুমি চেয়েছ কবিতা

পুরী সিরিজ-এর ভূমিকা

২.
আলোক ও আলোপাতার চোখরাঙানি,
রেখদেউলের প্রতি ভালোবাসা ছিল ও থাকবে,
ভোরের দোয়েলপাখি- বাক্যবন্ধটি পাঠে কেউ কেউ উদ্বিগ্ন হবেন,
রাখি রায়কে শেষ হাওড়া স্টেশনে তার কাকা দেখেছিল,
কলকাতা ক’য়ের অনুষ্ঠান যান্ত্রিক গোলযোগে বিকল,
মেসবাড়ির দরজার চাবিটা হারিয়ে গেছে

– কবিতাক্রম-৪, মীনযুদ্ধ

পুরী সিরিজ-এর ভূমিকা কবিতাটি বিভিন্ন দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা একইসাথে উৎপলের কবিতা ভাবনা, কবিতা টেকনিক, নন্দনতত্ত্ব, প্রচলিত কাব্য-ভাষাকে খারিজ এবং নতুন নির্মাণের পূর্বাভাস। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে- এই কবিতায় যে কতো প্রসঙ্গ, একটা শেষ হতে না হতেই চলে আসছে আরেকটা। কতো নাম, কত চরিত্র, ঘটনা! দ্বিতীয় কবিতাংশটিতেও দেখি বেশ কিছু টুকরো ঘটনা, হয়তো পরস্পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, রাখি রায়ের সাথে মেসবাড়ির দরজার চাবিটি হারিয়ে ফেলা মানুষটির (যুবক না যুবতী?) হয়তো পরিচয় আছে, হয়তো নেই। এই খোলা পঙক্তির কবিতা অনেকটা টিভি স্ক্রলের মতো। একটার পর একটা খবর চলছে। আপাত বিচ্ছিন্ন খবর সেগুলো। কোনোটি ঘটনা পরম্পরাযুক্ত, কোনোটা ফলোআপ, কোনোটা স্রেফ একলা ঘটনা। কিন্তু এগুলো সবই সেই দিনের নিউজ, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দিনের কোনো ঘটনার সাথে তার সংযোগ হয়তো চকিতে আবিস্কার করা যেতে পারে। যেমনি, হঠাৎ প্রসঙ্গান্তরের মতো চলে আসে নানা চরিত্র। হতে পারে শিবনাথ শাস্ত্রী, ইডেন উদ্যান, রাজভবনের সিঁড়ি, ত্রিপল গড়িয়ে আসা বেকারত্ব, হকারের লাইসেন্স, তপনের শালির গান। এই যে, বিচিত্র চরিত্রের সমাবেশ ও ব্যাক্তিছাঁচের বিষয়টি নিয়ে জীবদ্দশায় বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন উৎপল। জবাবটা কম-বেশি একই রকম-
‘আমি বরাবরই প্রান্তিক লোকজনের সঙ্গে মেলামেশি করেছি, কথাবার্তা বলেছি। আমি কবিতাকে যখন যেখানে খুশি বেমালুম তাদের কথা ঢুকিয়ে দিয়েছি। আবার যেখানে যা পড়েছি তাও কোনোরকম ঋণ স্বীকার ছাড়াই ঢুকিয়ে দিয়েছি। সবাই মুক্ত হস্তে দান করে আমি মুক্ত হস্তে গ্রহন করেছি। (হা হা) … আসলে কত ধরনের মানুষ, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা, আমি আবাক হয়ে যাই। সবই তো কবিতায় আসা দরকার। একবার কে একজন বলেছিল, কথা কইলেন বিশ্বেশ্বর তা শুনে রেগে গেলেন শিবঠাকুর, আর হাসলেন মহাদেব, যিনি বললেন তিনিও হাসলেন। (হা হা) ’ (৩)

এই যে অন্যের হয়ে কথা বলা, সেটি কিন্তু একরৈখিক নয় উৎপলে। এরমধ্যে অসংখ্য চরিত্র, ঘটনা এমনকি চেয়ার-টেবলের মতো বস্তুও হাজির হয় রক্তমাংসের আধারের মতো। ফলে একটা কোলাজ ও সারকারামার সৃষ্টি হয় ওর কবিতায়। চেনা বস্তুও তখন অচেনা ঠেকে। কারণ উৎপল দৃশ্যজগৎ থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করলেও সেটি যখন ডেলিভারি দেন তখন সেটি তার কাব্যভাষনে পরিপাক হয়ে অন্য মাত্রায় পৌঁছায়, সেগুলো তখন উৎপলের কবিতারই চরিত্র, দৃশ্য, বোধ। ‘কইলেন বিশ্বেশ্বর তা শুনে রেগে গেলেন শিবঠাকুর, আর হাসলেন মহাদেব, যিনি বললেন তিনিও হাসলেন’-এর মতো ব্যাপারটা। চরিত্রটা শুরু হয় যেখানে, মাঝপথে অন্য এক বা একাধিক চরিত্র তাতে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে, তৈরি হয় নতুন একটি আবহ- স্পেস। স্মরণ করি: মাইকেল মধুসুদনকে তিনি কীভাবে পুননির্মান করছেন। উৎপল বলছেন-
‘মধুসূদনের কবরের উপর আমি এক বৃষ্টির দিনে ছাতা খুলে বসেছিলাম। আমার পায়ের নীচে ধক্ ধক্ করছিল মাটি- ট্রাম যাচ্ছিল পথ কাঁপিয়ে। আজ যাঁরা নিজেদের কবর নিজেরা খুঁড়ছেন তাঁরা জেনে রাখুন- হাতঘড়িটি সঙ্গে নিতে ভুলিবেন না।’
এই ঘড়ি কিসের প্রতীক? মধুসুদনের বিদেশমুখীতার বিড়ম্বনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আজকের কবিদের সতর্কবার্তা? পাঠক ভাবছেন, কবিরা ভেবে নিন। এই যে উৎপলের ডিকন্সট্রাকশন বা পুনঃনির্মাণের বিষয়টি, একটু আগেই যে সাক্ষাতকারের কথা বললাম সেটিরই একটি অংশে উৎপল বলছেন, যখন তিনি এই ডিকনসট্রাকশন করে চলেছেন, তখন কিন্তু বিষয়টির তাত্ত্বিক দিক তার জানা ছিল না। তারপরেও করলেন কি করে? অই যে বলছিলাম- ‘চিত্রকর উৎপল’। এটা অনেকটা ক্যানভাসে বিভিন্ন চরিত্র ও শব্দরং ঠুসে দেয়ার মিশন ছিল ওর কাছে। উৎপলের কারুপ্রীতি ও শৈশব থেকে কাঠ খোঁদাই কিংবা হাতের কারুকাজের প্রতি যে আগ্রহ, সেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে কবি উৎপলে। পেইন্টিং আর নিজের কবিতার সম্পর্ক নিয়ে উৎপলের ভাবনা কি ছিল তা অবশ্য আমরা জানি না। তবু বিষয়টি যে তিনি ভেবেছেন তা অনুমান করা যায়। এ প্রসঙ্গে ২০০৪ সালের একটি সাক্ষাতকারের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করতে চাই। সেবার কৃত্তিবাস পুরস্কার পাওয়ার পর সুজিত সরকার সেই সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন। তো সেই সাক্ষাতকারের শেষ দিকে ‘এখন কী লিখছেন’ জিজ্ঞাসা করায় তিনি ডায়েরি থেকে একটি কবিতা পড়ে শোনান এবং পড়ার আগে, স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বলেন- ‘আর্টিস্টরা যেমন স্কেচ করে, তেমনই সব আমার ডায়েরির পাতায়…’
সেদিন সুজিত সরকারকে কবি শুনিয়েছিলেন – ‘ভোরবেলা পার্কে বেড়াতে গিয়ে কী দেখব কে জানে- এই ভয়ে/ রাত থেকে কাঁপি, ভুল পায়ে জুতো পরি, ছাতা নিতে/ মনেই থাকে না, হায় সেই দুর্ঘটনার গাড়ি থানার/ সামনে তেম্নিউ পড়ে আছে, মরচে ধরছে, চাকায় বাতাস নেই,/ গাছ থেকে ঝুলন্ত দড়িটা ওখানে কী ভাবে এল, ফাঁস নাকি,/ লক-আপের জানালা থেকে দুটো পাখি উড়ে আসে,/ ভাঙাচোরা এঞ্জিনে ওদের বাসা, আপাতত ডিমহীন, নীড়ে,/ শাবক আসেনি, আজ ঝড়ের আঁধার মেঘের দিন শুরু,/ – এলোমেলো বৃষ্টি নামছে।’
এই কবিতা পড়ে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে সুখ-দুঃখের সাথী কাব্যগ্রন্থে। এখানে রোজকার দৃশ্য ধরে রাখার চেষ্টা দেখি আমরা। যেন স্কেচ। সত্যিই সেই সময়ের লেখাগুলো স্কেচই বটে; পেইন্টিং নয়। কারণ এইসব দৃশ্য বড় সহজ-সরল ন্যারেটিভে আক্রান্ত। অনেকে হয়তো স্বীকার করবেন, শেষ দিকে অনেক সহজ হয়ে এসেছিলেন উৎপল, যদিও তাতে জাত-পেইন্টারের ভাবমূর্তি খুব একটা খুন্ন হয় না। সুখ-দুঃখের সাথীর এই ৩২ নম্বর কবিতার পরের কবিতায় দেখা পাই আধুনিক চিত্রকর উৎপলের, যিনি মূর্ত-বিমূর্তের মাঝে নিক্ষেপ করেন পাঠককে- ‘মহিমা, আত্মস্থ কুণ্ড, নুনজল নিজেই ফুটছে, শোধনযোগ্য, যদি আজ আমাকেও রান্না করো।’- এই হলো শব্দ-চিত্রকর উৎপল- যন্ত্র ও নান্দনিকতার এক অভূত মিশেল, সদাসচল এক নীরিক্ষণযন্ত্র। তাই তিনি অবলীলায় বলতে পারেন- ‘হয়তো দুর্বিনীতের মতো শোনাবে, বাংলা কবিতায় সিনটেক্স ভাঙার ব্যাপারটি আমিই প্রথম করেছি।’-এমন ঔদ্ধত্য কেবল উৎপলকেই মানায়। কারণ ওর কবিতা পড়তে, কাব্যপিপাসার বাইরে প্রয়োজন একজন মাইক্রোবায়োলজিস্টের চোখ, চিত্রকরের মনন, ভিন্ন ব্যকরণ। শেষ করবো তার কবিতা দিয়েই-
বামুন ঘোড়ার পিঠে ন্যস্ত হয়ে কবিতার ব্যাখ্যা চেয়ো না
সস্তা ও কোমল তরিতরকারিময় দেশে ভালোমন্দ খাও দাও
তোমার পেছনে কোনো গোয়েন্দার চোখ নেই। শুধু কবিতার
যে-কোনো ব্যবস্থা তুমি করে যাও।…

তথ্যসূত্র:

(১) লেখায় আমি কনটেন্টের দিক থেকে আসিনি, এসেছি ফর্মের দিক থেকে। উৎপলকুমার বসুর সঙ্গে অজিত চৌধুরী, উপল দত্তগুপ্ত, বিনয় ঘোষ, বাঘব বন্দ্যেপাধ্যায়ের বৈঠকি, ছোটকাগজ যোগসূত্রে প্রকাশিত, ১৯৯৪

(২) জহির হাসান ও জহির হাসান মাহমুদের সাথে কথপোকথন; ২০০৬

(৩) কবিতা লেখার পর কবিতা আর কবির থাকে না; গৌতম মণ্ডলের নেয়া উৎপলকুমার বসুর সাক্ষাতকার ।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com