মাতৃভূমি ত্যাগ করা আত্মহত্যার শামিল: শহীদ কাদরী

প্রদীপ কর | ১ জুন ২০১৭ ৭:৪৫ অপরাহ্ন

cover-page“একজন প্রকৃত কবি প্রতিনিয়ত পরম সুন্দরকে নিত্য আবিষ্কার করতে চান। তাকে পেতে চান এবং না পাওয়ার বেদনায় কবির হৃদয়ে রক্তপাত হয়। বেদনার চিরন্তন এই বোধ প্রতিটি মানুষের জীবনেই কম বেশি থাকে। আমরা সবাই একধরণের অন্তঃসারশূন্যতায় ভুগি। তখন আমাদের ইচ্ছা জাগে কোনো সুন্দরকে পাওয়ার, তাকে ধারণ করার। আর সেই না পাওয়ার বেদনা থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের তীব্র জীবন পিপাসা।”

কবি শহীদ কাদরীর এই উপলব্ধি, এই জীবনবোধ আমাদের ভিন্নভাবে জীবনের তাৎপর্য বোঝায়। কীভাবে বাঙালির প্রবহমান জীবনে নাগরিক চেতনা এসে কড়া নাড়ে আর দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে নাগরিক অভিশাপও। বাংলাকবিতার পরম্পরায় সরল গ্রাম্য মহাকাব্যিক জীবনপ্রবাহে পঞ্চাশের দশকই প্রথম নাগরিকতার উত্তরাধিকার নিয়ে উপস্থিত হয়। যদিও এই সময়ের নগর বলতে ইউরোপের কসমোপলিটন রঙচঙে বিষন্নতা আমাদের তৈরি হয়নি। শার্ল বোদলেয়র যেভাবে কবিতায় নগর জীবনের যন্ত্রনাময় ক্লেদাক্ত নারকীয় উল্লাস রচনা করেছেন, বাংলা কবিতায় পঞ্চাশ সেভাবে নগরকীর্তন করেনি।

এইক্ষনে আঁধার শহরে প্রভু, বর্ষায়, বিদ্যুতে
নগ্নপায়ে ছেঁড়া পাৎলুনে একাকী
হাওয়ায় পালের মতো শার্টের ভেতরে
ঝকঝকে, সদ্য, নতুন নৌকার মতো একমাত্র আমি,…

‘উত্তরাধিকার’ গ্রন্থে বৃষ্টি বৃষ্টি কবিতায় এভাবেই স্পষ্ট হচ্ছেন শহীদ কাদরী। বাংলাদেশের কবিতার সূচনালগ্নে, পঞ্চাশের দশকে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী প্রমুখ কবিদের কবিতায় বাংলাদেশের পরিবেশ প্রকৃতি দেশভাগ পরবর্তী সংগ্রাম যেই বোধ বা চেতনার আলোয় আলোকিত হয়েছে সেই সামগ্রিক ভাবনায় থেকেও শহীদ কাদরী ¯^তন্ত্র হয়ে উঠেছেন নগরিক জীবনচিত্র বর্ণনায় শব্দচয়ন রূপক ব্যবহারে অবচেতনের নিহিত অন্তরালে লোকজীবনের অনুষঙ্গ রচনায়। ফলতঃ সকলের মধ্যে থেকেও একা এই মানুষটিকে চিনে নিতে অসুবিধা হয়নি বাংলা কবিতার পাঠকদের।

সময় যত জটিল হবে এই কবিকে প্রয়োজন হবে ততোই। দীর্ঘজীবনের উপর দাঁড়িয়ে এই কবির কবিতা রচনা খুব বেশি নয়। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘উত্তরাধিকার’ (১৯৬৭) দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ ও ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ এ। ২০০৯ এ তাঁর চতুর্থ এবং শেষ কবিতার বই প্রকাশিত হয়, ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ এই চারটি কবিতার বইয়ে সর্বমোট কবিতার সংখ্যা ১২২টি! প্রকৃত কবিই হয়তো বুঝতে পারেন, কী লিখবেন আর কী লিখবেন না। অসংখ্য অ-কবিতার চেয়ে অল্পসংখ্যক কবিতা লেখাই ধীসম্পন্ন কবির কাজ। আবেগের সংহত, সংযত প্রকাশ। কবি শহীদ কাদরী এই কারণেও অনন্য; জীবনে প্রায় ২৪ টি বছর কবিতায় সম্পৃক্ত থেকেও কবিতা না লিখে কাটিয়েছেন। তবুও বাংলাদেশের কবিতা চর্চায় তিনি অপরিহার্য, ক্রমশ অবশ্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবেন। তার বিদেশ চলে যাবার পরও এদেশের কবিতাভুবনেই শুধু নয় সংস্কৃতি অঞ্চল জুড়েই ছিল তার বিষয়ে নানান আলোচনা, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেও তিনি আমাদের কাছেই থেকে গেছেন তার সৃজন বৈভবে। ¯^াভাবিক কারণেই তাই মৃত্যু পরবর্তী সময়ে তাকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনা মূল্যায়ন শুরু হবেই।

যদিও মাহফুজ পাঠক ইকবাল মাহফুজ সম্পাদিত ‘শক্সখচিল’ পত্রিকা তার জীবিতকালেই উদ্যোগ নিয়েছিল কবিকে আরো বিশদভাবে জানার এবং জানানোর। ২৪ জুন ২০১৬ তারিখে ‘প্রিয় অগ্রজ’ সম্বোধনে কবিকে পত্র পাঠিয়েছিলেন… “আপনার মধ্যে দ্রষ্টব্য তো অনেককিছুই ছিল তবু কেন একটা অতৃপ্তি নিয়ে এক বোহেমিয়ান জীবন পার করলেন। অথচ আমাদের কাছে কতটা বর্ণাঢ্য মনে হয় আপনার এ চলে আসা। এমন কত কিছুইতো আমরা জানতে চাই। আপনারও কি ইচ্ছে করে জীবনটাকে একবার ফিরে দেখতে? জীবনের এইসব খসড়া আমরা এক মলাটে দেখতে চাই।…” তবুও কবির জীবিত অবস্থায় প্রকাশিত হয়নি এই সংকলন। প্রকাশ পেল জানুয়ারি ২০১৭ তে অর্থাৎ কবির মৃত্যুর চারমাস পর।

একজন এরকম প্রাণবন্ত বৈচিত্রপূর্ণ মানুষকে সম্পূর্ণরূপে কীভাবে বোঝা যাবে দুই মলাটে ? ৭৪ বছরের কবির জীবনকে কতটুকু ধরে রাখা সম্ভব ৩৫০ পৃষ্ঠায় বা ৭০০ পৃষ্ঠায়? তবুও শক্সখচিলের উদ্যোগ অপূর্ব। নানান দৃষ্টিকোণ থেকে নানাভাবে আলো ফেলে উদ্ভাসিত করেছেন এই কবির দর্শন।

সুন্দর অলংকরণ, শিল্প সজ্জায় সমৃদ্ধ এই সংকলনে নানান স্তরে উন্মোচিত হয়েছে মানুষ শহীদ কাদরী কবি শহীদ কাদরীর ভিন্ন ভিন্ন সত্তা। ১৭টি পর্বে বিন্যস্ত এই আধারে হয়তো পুরোপুরি বুঝবো না কবিকে, তবে তার অন্তর্লোকে প্রবেশ করার অধিকাংশ সংকেত হয়তো স্পষ্ট হবে।

প্রথমপর্ব ‘স্মৃতিমেঘ’, কবির ঘনিষ্ঠ ১৩জন তাদের স্মৃতিতর্পণে নিজ¯^ ভাষায় নিজ¯^ মেঘভার অর্পণ করেছেন। আল মাহমুদ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, নির্মলেন্দু গুণ, কবীর সুমনসহ প্রত্যেকেই ¯^ক্ষেত্রে যেমন প্রতিষ্ঠিত, তেমনই তাদের এই মেধাবী সান্নিধ্যের স্মৃতিকথাও আন্তরিক স্পর্শকাতর।

কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত লেখেন: “শহীদ কাদরীও যে কোনো প্রথম দেখার উদ্দীপন মুহূর্ত থেকে নিজের কবিতার জগৎটিকে নিরাসক্ত উপায়ে আগলে রাখতেই চান। একদিকে চিকন লাজুক, অন্যদিকে দৃঢ় চিবুকের অনুশাসনে এক লহমায় তামাম দুনিয়ার ধ্যানধারনার মানচিত্র পালটিয়ে দেবার জন্য উদ্যত, স¦ভাবজাত এই বিরোধাভাষের উদ্ভাসনে শহীদকে সহজেই আমি শনাক্ত করতে পেরেছিলাম।… উপলব্ধি করতে পেরেছি, উচ্চারণের সৌকর্যে এক একটি বীজমন্ত্র প্রণয়নের এলাকায় শহীদের ক্ষমতা কীরকম অপ্রতিম। নিখিল বিশ্ব যখন আর্তনাদে আপ্লুত, যখন ‘অশ্রুভরা বেদনা দিকে দিকে জাগে’, মতদর্শী একজন ভাবি কথক কী অপরিমেয় দুঃসাহসে বলে উঠতে পারেন, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই!”

স্ত্রী নীরা কাদরী অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় যাপনচিত্রের পাশাপাশি শুনিয়েছেন কবির চতুর্থ এবং শেষ কবিতা বই ‘আমার চুম্বনগুলি পৌঁছে দাও’ এর নির্মাণের গুপ্ত ইতিহাস। কবির বড়ভাই শাহেদ কাদরীর জ্যেষ্ঠকন্যা সাদাফ কাদরী এবং মেজ কন্যা সিমন কাদরী ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথায় এক মায়াবী মানুষের গল্প শুনিয়েছেন। একজন কবির দর্শন বুঝতে গেলে এই মায়া আমাদের সহায়ক হবে।

দ্বিতীয় পর্ব ‘জলছায়া’। হুমায়ূন আহমেদ এর ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ দিয়ে এই বিভাগের সূচনা। এক টলটলে লেখায় তিনি লিখছেন:

“এই মুহূর্তে দেশের একজন প্রধান কবি পড়ে আছেন নিউইয়র্কের জ্যামাইকায়। কোনো মানে হয়? তিনি কি তাঁর দেশের অপূর্ব জোছনা দেখবেন না? তাঁর গায়ে কি বর্ষার প্রথম জলধারা পড়বে না? তিনি কি আর কোনোদিনও হাতে নেবেন না বাংলাদেশের বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল?”…

“গভীর সাহিত্যবোধ এবং নিবিড় পঠন-পাঠন, সেইসাথে ইতিহাসের বড় টানাপোপড়েন ও পারিবারিক বিপর্যয়ে খড়কুটোর মতো ভাসমান হয়ে শহীদ কাদরী যেভাবে জীবন অবলোকন করেছিলেন তার মধ্যে এক ভিন্নতা ছিল। আমুদে আড্ডাবাজ মানুষটির ভেতরে ছিল বিষাদময়তা, আর ছিল এমন এক নিস্পৃহতা, জীবনসংলগ্ন হয়েও জীবনবিচ্ছিন্নতা, যা তাকে দিয়েছে অন্য দৃষ্টি, অন্য ¯^র।” মফিদুল হক লিখেছেন কবির সম্পর্কে তার অনুভবকথায়। এই একই বক্তব্য, একই অনুভব উঠে এসেছে তার সম্পর্কে অধিকাংশ রচনায়। শহীদ কাদরীর কবিতায় শহরের ছবি কীরকম তার বর্ণনা পাই রিফাত চৌধুরীর কলমে। আলফ্রেড খোকন ‘নশ্বর জোছনায় প্রেমিক অথবা কবি’ শীর্ষক আলোচনায় এক অমোঘ সত্যোচ্চারন করেছেন, “অগ্রজ কবি শহীদ কাদরীর কবিতা পাঠ করতে করতে নিরঙ্কুশ বিষন্নতায় মর্মরিত হয় মানবিক অন্তর। আলোড়িত করে অসহায় করে কাব্যশ্রী অস্ফুট ইশারায় জানিয়ে যায়, আমরা সবাই বিষাদের ছেলেমেয়ে, বিষাদের ভাইবোন।” এই বিষাদবৃষ্টিস্নাত নতুন প্রজন্মের কাছে তাই শহীদ কাদরী এক চেতনার আশ্রয় হয়ে উঠেছেন।

“কবিতার সঙ্গে যেন মাঝেমধ্যে জীবনের বাস্তবতা ছাড়িয়ে গিয়ে ‘হওয়া উচিত’ এমন জীবনের অদ্ভুত যোগাযোগ তৈরি হয়, যে কারণে কবিতার কোনো কোনো পঙ্ক্তি আচমকা আমাদের জীবন অভিজ্ঞতাকে নাড়িয়ে যায়। হঠাৎ হঠাৎ-ই মনে পড়ে কোনো কোনো কবিতার লাইন। কবিতার সূত্র ধরেই আমরা ঢুকে পড়ি কখনও কখনও ‘যদির পৃথিবীতে’। ‘যদির পৃথিবী এমন এক জগৎ যা আমরা কামনা করি কিন্তু বাস্তবে হয়নি; হলে মন্দ হতো না। এজগতের ভাবনা থেকে শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরী কেউই বিচ্ছিন্ন নন।” লিখেছেন ফেরদৌস মাহমুদ। আসলেই তো, কবির হাত ধরেই তো আমরা সেইখানে যেতে চাই, যেখানে যাওয়ার ইচ্ছে আছে কিন্তু সাহসে কুলোয়না।

শহীদ কাদরীর কবিতা ‘সেলুনে যাওয়ার আগে’ অবলম্বনে কেন নির্মিত হল নাটক ‘চুল’ সেই বিষয়ে লিখেছেন নির্মাতা আশুতোষ সুজন।

“পড়তে হবে এবং পড়ব, এই বোধ থেকেই প্রচুর পড়তাম। তবে আড্ডাও এর পেছনে কাজ করত। আমাদের আড্ডা হতো শিল্প সাহিত্য নিয়ে। একটা বিষয় নিয়ে রাতের পর রাত আমাদের আড্ডা হতো। সে কারণে আমাদের প্রচুর পড়াশোনাও করতে হতো। পড়াশোনার জন্য হলেও আড্ডার প্রয়োজন আছে।” এরকমই ভাবতেন কবি শহীদ কাদরী। আর তাই আড্ডা এবং শহীদ কাদরী শব্দদুটি যেন সমার্থক হয়ে উঠেছে বিউটি বোর্ডিং থেকে বাংলা কবিতায়। এদেশের সাহিত্য আড্ডা কবির অনুপস্থিতিকে এখনো ভীষণভাবে উপস্থিত করে রেখেছে। কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আড্ডা মানে দুনিয়ার শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে আড্ডা। শক্সখচিল এর এই সংখ্যার আড্ডা অংশটিও তাই অনিবার্য ছিল। সৈয়দ শামসুল হক নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টে নেমেই ‘আড্ডা’ দিতে ছুটেছিলেন শহীদ কাদরীর বাসায়, সেই ২০মিনিটের আড্ডার কিছু অংশ দিয়েই এই বিভাগের শুরু। কবি বেলাল চৌধুরীর কলমেও আড্ডার নানাদিক উঠে এসেছে। শুরুতেই সেই আক্ষেপ, “শহীদ কাদরী যে ঢাকায় নেই বা শহীদ বিহীন ঢাকা শহর এটা দেখছি শহীদের শত্রæমিত্র সবার কাছেই সমান আক্ষেপ ও বেদনার, নানা সময়ে এবং প্রসঙ্গে অনেককেই বলতে শুনেছি, আহা শহীদ যদি থাকতো এখন, বেশ হতো।” কবি সাংবাদিক শিহাব সরকার লিখেছেন, “শিষ্য ও অনুরাগীদের সঙ্গে গ্রিক দার্শনিকদের নিয়মিত বৈঠক সম্পর্কে যেমন শোনা যায়, শহীদ কাদরীর সহজাত প্রাণফুর্তির কারণে তার আড্ডায় ভারী ভাবগম্ভীর বিষয় নিয়েও একটানা আলোচনা বড় একটা ঠাঁই পেত না। সর্বজনীন লঘু এক আবহ বিরাজ করত ওখানে। ব্যঙ্গবিদ্রুপ এবং নির্মল হাস্যরসেরও একটা বড় ভূমিকা ছিল ওসব আড্ডায়।… একসময় সকলের অজান্তে ঝলকে উঠতে শুরু করত জ্ঞাননির্ভর মেধার দ্যুতি, হালকা তাত্তি¡ক আলোচনা ইত্যাদি। উপস্থিত কবিরা, বিশেষ করে যারা তরুণ, প্রতিশ্রæতিশীল এবং মেধাবী, ওসব আলোচনা শেষে কোনো না কোনোভাবে ঋদ্ধ হয়ে ফিরতেন।” কবি ও প্রাবন্ধিক ইকবাল হাসান আড্ডার ভেতর দিয়ে কবির নানা দিক তুলে ধরেছেন। এই পর্বের শেষ লেখা কবির স্ত্রী নীরা কাদরীর। প্রবাসে তাদের বাসায় কবিতা সন্ধ্যার সেই নানারঙের দিনগুলির কথা শুনিয়েছেন।

পরের ‘সাক্ষাৎকার’ পর্বে কবির তিনটি সাক্ষাৎকারসহ রয়েছে ষাটদশকের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও কবির প্রিয় বন্ধু মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার। বলাই বাহুল্য সাক্ষাৎকারটি কবি শহীদ কাদরীকে নিয়েই। এই চারটি সাক্ষাৎকারে কবির নানাদিক উন্মোচিত। তবু বিষন্ন বেহালার মতো একটি সুর যেন বারবার ঘুরে ফিরে আসে ‘মাতৃভূমি ত্যাগ করা আত্মহত্যার শামিল।’

“শহীদ বলো তো বন্ধু সেইসব দুপুর গোধূলিবেলা আর
সন্ধ্যারাত, মধ্যরাত মার্কিনমুলুকে
ঢেউ হয়ে স্মৃতিতটে আছড়ে পড়ে কি
কখনও সখনও? বলো, পাতাল ট্রেনের কামরায়
তন্দ্রাচ্ছন্ন মুহূর্তে চকিতে জেগে ওঠো নাকি বিউটি বোর্ডিং
আর লক্ষীবাজারের ঘ্রাণে?

কবির প্রিয়মানুষ, প্রিয় কবি শামসুর রাহমান লিখছেন শহীদ কাদরীকে নিয়ে ‘সুদূরের অনন্য প্রবাসী’ কবিতায়। কবিকে ‘নিবেদিত কবিতা’ পর্যায়ে কবিতা লিখেছেন আবুল হাসান, শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, সিকদার আমিনুল হকসহ ২১ জন কবি। কবিকে নিয়ে দীর্ঘকবিতা লিখেছেন ২জন এবং ২টি নিবেদিত সনেটসহ ২৫জন কবির আন্তরিক কাব্য উচ্চারণে মিশে আছে ভালোবাসা শ্রদ্ধাসহ কবির প্রতি মুগ্ধতাও, রয়েছে কবিকে হারানোর শোক।

‘প্রতিকৃতি’ পর্বে প্রিয় কবিকে নিয়ে রেখাঙ্কণে চিত্রে নিজেদের ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, মূর্তজা বশীর, মাসুক হেলাল, নাজিব তারেক, রাজীব দত্ত, সোহেল আশরাফ এবং আলমগীর জুয়েল। কবির নানান মুডের প্রতিকৃতিতে কবির মানসপ্রকৃতি প্রস্ফুটিত। ‘চিত্রকাব্য’ অংশে কবিতার অবলম্বনে রয়েছে ৮টি চিত্র। ‘চিত্রকথা’ বিভাগে বিশিষ্ট আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ করেছেন ‘আটলান্টিকের তীরে শহীদ কাদরীর মুখোমুখি’ সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি অসাধারণ আলোকচিত্র। কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবীর সুমন, ইমদাদুল হক মিলন এবং শহীদ কাদরী কয়েকটি আলোকচিত্র সম্পর্কে পরিচিতি দিয়েছেন।

‘সংগীত’ অংশে কবীর সুমন সংক্ষিপ্ত পরিসরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আক্ষেপ করেছেন যে, “আমার দুঃখ ওর সামনে বসে গানটা আমি গাওয়ার সুযোগ পাইনি।” তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা এবং রাষ্ট্র এই দুটি গান মুদ্রিত হয়েছে। মনোসরণির প্রধান ভোকাল মুয়ীজ মাহফুজ স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তাকে নিয়ে সংগীত রচনা করেছেন ‘হোমসিক’। ‘নীরার দু’চোখে বেদনার ছায়া’ শিরোনামে সংগীত মুদ্রিত হয়েছে, যার কথা সুর ও কণ্ঠ তাজুল ইমাম এর।

বেশ চিত্তাকর্ষক বিভাগ হয়েছে ‘অনুগল্প’ অংশটি। শহীদ কাদরীর কবিতা অবলম্বনে ৭ জন কবি গল্পকার অনুগল্প লিখেছেন। “ইমানে কই হালিকই লাগাও কি পুলিশই লাগাও এত্তো বছর বাদে একবার যখন আইছি শিউলিরে আমি খুঁইজা বাইর করুম। আইজ হারাদিন রিকশা ভাড়া কইরা শিউলিরে খুঁজুম। আইজ না পাইলে কাইল খুঁজুম। কাইল না পাইলে পরশু। পরশু না অইলে তরশু…” কবির ‘আজ সারাদিন’ কবিতা অবলম্বনে ‘শিউলির খোঁজে’ অনুগল্প লিখেছেন মুম রহমান। ‘সঙ্গতি’ কবিতা অবলম্বনে অনুগল্প লিখেছেন তৈমুর খান। ‘যাই যাই’ গল্পটি লিখেছেন আফসানা বেগম। ‘স্বপ্নে দুঃস্বপ্নে একদিন’ কবিতা অবলম্বনে ‘কফিন’ অনুগল্প লিখেছেন আনিফ রুবদ। ‘একা’ কবিতা অবলম্বনে আনজুম সানি লিখেছেন ‘চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ এবং ‘নীল জলের রান্না’ কবিতা অবলম্বনে ইলিয়াস বাবর ‘নেই আলো নেই ইতিহাস’ অনুগল্প লিখেছেন। এই উদ্যোগটি আকর্ষনীয় হলেও বিশেষ সাবধানতাও জরুরী; কেননা যতই ‘অবলম্বনে’ হোক সাহিত্যের দুটি ভিন্ন আঙ্গিকে, দুজন ভিন্ন মানুষ যখন অভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখেন, স্বাভাবিকভাবে তুলনা চলেই আসে। আর চিরপরিচিত কবিতা নিয়ে অন্য কিছু নির্মাণ ভীষণই সংবেদনশীল। কোনও সূক্ষ্ণ কারণে, কোনও সুর বা স্বর সামান্য ইতরবিশেষ হলেই কানে লাগে, মনে লাগে। কবিতা কাব্য পাঠকের কাছে নানা ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়, অনুগল্পের ফ্রেমে তাকে বাঁধতে গেলে কি সীমাবদ্ধ হয়ে যায় না? আরেকটি কথা, এই বিভাগের প্রথমেই কুলদা রায়ের ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই, শহীদ কাদরী’ স্মৃতিচারণটি কেন অনুগল্প হিসেবে ছাপা হল ঠিক বোঝা গেল না!

“বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, শেক্সপিয়ারের সনেট অনুবাদ করার জন্য বাংলাভাষায় একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি সুধীন দত্ত। প্রথম শ্রেণির একজন কবির লেখা যদি তৃতীয় শ্রেণির একজন গদ্য লেখক অনুবাদ করেন তার পরিনাম তো শোচনীয় হবেই।” শহীদ কাদরীর এই কথাগুলিই ‘অনুবাদ’ বিভাগের প্রবেশকে ছাপা হয়েছে। তবুও বলতে হয় ফরিদা মাজিদ, শওকত হুসেইন এবং সৈয়দ আবুবাকর কৃত ৫ টি কবিতার অনুবাদ যথেষ্ট সুখপাঠ্যই।

মৃত্যুর পরই শুরু হয় কবির প্রকৃত মূল্যায়ণ। একটি ছোটোপত্রিকা যখন বিশেষ সংখ্যার আয়োজন করে, সাধারণত দেখা যায়, স্তব স্তুতি ইত্যাদিতেই পূর্ণ হয়ে থাকে। কিন্তু আসলেই তার সৃজনকর্মকে নানান আলোকে দেখা, দেখানো সেই তো প্রকৃত কাজ। শক্সখচিলের এই পর্বটিও সেকারণেই বেশ মনোযোগ দাবী করে। ১৮জন কবি প্রাবন্ধিক নানান দৃষ্টিকোণ থেকে শহীদ কাদরীকে মূল্যায়ন করেছেন। তার একটি কবিতা নিয়ে আলোচনা, এক একটি কবিতা গ্রন্থ নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা যেমন আছে, তেমনই সার্বিকভাবেও তার সৃজনপ্রতিভার পর্যালোচনা রয়েছে।

“জীবন-বন্দনার জন্যে শহীদ কাদরীকে যেকোন প্রচলিত মতবাদের সস্তা সরলতায় সমর্পিত হতে হয়নি তা তাঁর পরিণত মানসতারই পরিচায়ক। চল্লিশের সমাজশ্লিষ্ট শৌখিন মজদুর কবিদের অতি সরলীকৃত সমাধান ও চিৎকারের ব্যর্থতা সম্পর্কে খুব স্বাভাবিকভাবেই সচেতন তিনি”- কবি প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দ এভাবেই দেখিয়েছেন কবি শহীদ কাদরীর মানসলোক। কবি অধ্যাপক কায়সার হক লেখেন, “The acedia, subjectivism and nihilism which formed the emotional base of the poetic edifice of uttaradhikar have been exchanged for impersonality, extroversion and commitment.” অধ্যাপক বায়তুল্লাহ কাদেরী মনে করেন, “শহীদ কাদরী মূলত প্রথম ধারারই একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর কবিতা আক্ষরিক অর্থেই নেতিবাদী জীবন, বোহেমিয়ান নাগরিক ক্লেদ, গ্লানি পঙ্কিলতায় আত্ম-বিধ্বংসীমূলক। এ কারণেই শহীদ কাদরীর কবিতায় জীবনবোধ, নাগরিকতা নারীপ্রেম এমনকি প্রকৃতিচেতনাও কার্যকর থেকেছে তাঁর এই নেতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে”। সত্যিই কি তাই? কবি শহীদ কাদরী কি প্রকৃত অর্থেই নেতিবাদী? শূন্যতার হাহাকারে তিনি কি বাজাননি পূর্ণতার বাঁশি?

“লোকজীবন সৃষ্টিশীলদের চেতনায় নানাভাবে প্রভাব ফেলে। কেউ আবেগসত্তার তাড়নায় লোকজীবনকে কাব্যভাবনায় সমীকৃত করেন। কেউ পাঠ-অভিজ্ঞতায় স্নাত হয়ে লোকজীবনের চিত্র অঙ্কন করেন। কেউ আবার পাশ্চাত্যগঠনের দ্বারা মননের শাসনে কাব্যচর্চা করেন; কিন্তু তাঁদের অবচেতনে ঐতিহ্যের উপমানচিত্র পৌনঃপুনিক আবহ নিয়ে ফিরে আসে। শহীদ কাদরী শেষোক্ত বৈশিষ্ট্যের কবি।” অনু হোসেন তার প্রবন্ধে নাগরিক কবিকে ঐতিহ্যের আচ্ছাদনে দেখিয়েছেন। নগর জীবন এবং গ্রামজীবনের পরম্পরা দুই-ই ছিল আসলে এই কবির দুই ডানার মতো। যদিও, আঁখি সিদ্দিকা তা মনে করেননি। তিনি তাঁর প্রবন্ধে কবিকে পুরোদস্তুর আধুনিক নাগরিক কবি বলেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন– “আধুনিক নগরভাবনার কবি শহীদ কাদরী ১৯৪৭ পরবর্তীকালে বাঙালি কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, যিনি নাগরিক জীবন সম্পর্কিত শব্দচয়নের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় নাগরিকতা ও আধুনিকতাবোধের সূচনা করেছিলেন। যে কারণে তিনি নগরচেতনার দিক থেকে বাংলা কবিতায় অন্যদের থেকে আলাদা।” ৩৫০ পৃষ্ঠার এই শঙ্খচিলের আয়োজনে কবিকে বিবিধভাবেই নানান ভাবনায় দেখানো হয়েছে। তবু বিশ্বকবিতায় যে মানুষটির আগ্রহ ছিল অপরিসীম, এই কবির কবিতা বিশ্বকবিতার নিরিখে কোথায় ¯^তন্ত্র, প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কিত রচনা থাকা জরুরী ছিল। উচিৎ ছিল হাজার বছরের বাংলা কবিতার চিরন্তন ধারায় কবি শহীদ কাদরীর অবস্থান, অবদান এবং ভূমিকা কীরকম সেই সম্পর্কে বিশদ আলোচনার। তবুও যা পাওয়া গেছে, তা অনেকটাই। মূল্যায়নের অপর পর্বে অন্যদের কবিতা সম্পর্কে শহীদ কাদরী কীরকম মূল্যায়ন করেছেন, তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়। ঠিক একইরকম উপস্থাপনায় শহীদ কাদরী সম্পর্কিত মতামত রয়েছে বাংলাভাষার বিশিষ্টজনদের; সংক্ষিপ্ত আকারেই।

‘ডাকঘর’ বিভাগে শহীদ কাদরীকে লেখা, শহীদ কাদরীর লেখা বেশ কিছু চিঠিপত্রের সঙ্গে কবিকে লেখা খোলা চিঠিও। ‘কবির ভুবন’ পর্বে বুদ্ধদেব বসু, পাবলো নেরুদা, ইয়ান্নিস রিৎসস প্রমুখ কবিদের নিয়ে শহীদ কাদরীর প্রবন্ধ, কবির বেশকিছু অগ্রন্থিত কবিতা, গ্রন্থিত কিছু প্রিয় কবিতার নীচে কবিকৃত কবিতা রচনার মুহূর্ত প্রসঙ্গ, উৎসর্গিত কবিতা, প্রথম প্রকাশিত কবিতা এবং সর্বশেষ কবিতাসহ কবির সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি।

কবি শহীদ কাদরী নিঃসন্দেহে বাংলাভাষার খ্যাতিমান তো বটেই অত্যন্ত শক্তিশালী গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি। যত দিন যাবে, ততই একথা স্পষ্ট হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে। ‘শঙ্খচিল’ সেই মূল্যায়ণের বিস্তৃত সূচনা করে বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে ধন্যবাদার্হ হয়ে রইল।

মাহফুজ পাঠক ইকবাল মাহফুজ সম্পাদিত শঙ্খচিল\
কবি শহীদ কাদরী সংখ্যা\ জানুয়ারি ২০১৭ \ মুল্য ১৫০ টাকা

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসিফ চৌধুরি — জুন ১, ২০১৭ @ ১০:১৯ অপরাহ্ন

      দারুণ একটি লেখা। বই সমালোচনার প্রায় প্রতিটি দিকই ছুঁয়ে গেছেন লেখক সুন্দরভাবে। এই যে ছোট ছোট প্যারাগ্রাফ করে লেখা, এতে পাঠকের আরাম হয়। একটি ছোট মন্তব্য হল, লেখাটি কিঞ্চিৎ হ্রস্ব হলে বোধ করি আরও ভালো হতো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজকবি — জুন ১, ২০১৭ @ ১১:০৫ অপরাহ্ন

      কে বললো?, মাতৃভূমি ত্যাগ করা স্মার্টনেসের লক্ষন। বিদেশে ডলার পাঊণ্ড, কামাবা, সোশ্যাল বিনা খরচায় থাকবা আবার দেশের জন্য ছিঁচকাঁদুনেপানা করবা তাতো হবেনা! চিকিতসার এত্ত খরচাতো সব আমেরিকাই দিলো, সময়মত দেশে ফেরত গেলেই হতো? সব ভণ্ডামি!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com