নজরুলের নারী ও ‘নারী’ কবিতার ব্যক্তিগত ভিন্নপাঠ

ঝর্না রহমান | ২৫ মে ২০১৭ ৫:২৬ অপরাহ্ন

Nazrul-2কাজী নজরুল ইসলাম নামটির সাথে ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাটি এমনভাবে এঁটে বসেছে, যে এ অভিধা ছাড়া তাঁর নাম লেখা বা উচ্চারণ করাটাই এখন কবিকে প্রায় খণ্ডিত করার শামিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু নজরুল যে ছিলেন অতিশয় রোমান্টিক কবি, প্রেমিক কবি, বিরহী কবি, তাঁর সেই আত্মার আবেগধ্বনি যেন তাঁর দ্রোহের উচ্চারণের ঢালতরোয়ালের ঝনঝনানির কলরোলে অনেক সময়ই চাপা পড়ে যায়। অবশ্য অতি ব্যবহারে ক্লিশে একটি উদাহরণ দিয়ে নজরুলকে প্রেম ও দ্রোহের সব্যসাচী বানিয়ে আলোচনার রণাঙ্গণে নামিয়ে দেওয়া হয়, সেটি হলো, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই বিখ্যাত চরণ “ মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরী আর হাতে রণ তূর্য।” বাঁকা বাঁশের বাঁশিটি তাঁর ত্রিভঙ্গমূরারি শ্যামকালিয়ার বংশি, এইখানে কবি প্রেমিক কৃষ্ণ, রাধা তাঁর আরাধিকা। আর রণতূর্য তো যুদ্ধের দামামা বটেই এবং বিদ্রোহ যেখানে যুদ্ধ আছে সেখানে।
দ্রোহ আর যুদ্ধ অনেক ক্ষেত্রেই সমার্থক, রূপকার্থেও দ্রোহই যুদ্ধ বা যুদ্ধই দ্রোহ। কিন্তু কবির দ্রোহের কবিতা Ñ শুধু কবিতা নয় এমন কি ‘আমি সৈনিক’, ‘দুর্দিনের যাত্রী’ বা ‘যৌবনের গান’ ইত্যাদি অবশ্যপাঠ্য প্রবন্ধের মধ্যে তাঁর যে সৈনিকচেতনাভাস্বর দ্রোহাকাক্সক্ষা অথবা দ্রোহাকাক্সক্ষাচালিত যৌবনচেতনার জয়ধ্বজা উড্ডীন হয়েছে তারও মূলে আছে প্রেম। আছে প্রেমের রোমাঞ্চ ও বেদনা। তাঁর দ্রোহভাষ্যের কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’তে তাই দেখি কবির দুরন্ত দুর্মদ বেপরোয়া চিত্ত ‘বন্ধনহারা কুমারীর বেণী’র ছোবলে, ‘গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি’র লক্ষভেদী মধুর আঘাতে, ‘চপল মেয়ের’ কাঁকন চুড়ির ঠিনিঠিনি ঝংকারে আর ‘যৌবনভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর’-এর তীব্র নরম স্পর্শে জেগে ওঠে, শক্তিমত্ত হয়ে ওঠে। বলতে পারি, দ্রোহের আড়ালের এই প্রেম দেশের জন্য, জাতির জন্য, মানুষের জন্য, স্বাধীনতা-মুক্তি-সাম্য-মৈত্রীর জন্য দুর্মর আকাক্সক্ষায় অভিষিক্ত, আর তার অন্তঃস্তলে প্রেরণার উৎসরূপে অধিষ্ঠিত আছে নারী।

নারী তাই শুধু নজরুলের মানসপ্রিয়াই নয়, তাঁর রোমান্টিক কবিচিত্তের অতলস্পর্শ অজস্র অনুভূতির আশ্রয়। তিনি নারীকে প্রিয়ারূপে দেখছেন, দেখছেন বিজয়িনীরূপে, দেবীরূপে, জননীরূপে, জয়লক্ষ্মী রূপে, সন্ন্যাসিনীরূপে। আবার তাকে আক্রমণে আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত করে বলেছেন লোভী, অতৃপ্ত মানবী। পরক্ষণেই, সেই নারীর কাছেই চলে কড়জোড়ে কবির প্রণয় প্রার্থনা। আত্মসমর্পণের মনস্তাপ আর আত্মনিবেদনের সকরুণ আকুতিতে ভরে উঠতে থাকে তাঁর কবিতার খাতা। কিন্তু নারী যতক্ষণ প্রেমদাত্রী-সেবাদাত্রী, দুঃখসহা-সুখবহা, কামিনী-রমণী, সব বিলিয়ে সন্ন্যাসিনী-ভিখারিণী, সর্বত্রাতা দেবী, শুচিস্নাতা পূজারিণী ততক্ষণই পুরুষের কাছে নারী গণ্য, আদরণীয়, পূজ্য, গ্রাহ্য। কবিও তাঁর ব্যতিক্রম নন। নারী যেই তার ইচ্ছাকে মূল্য দিল, পুরুষের প্রেম প্রত্যাখ্যান করলো, ভালো-লাগা না-লাগাকে প্রাধান্য দিয়ে এক প্রেম প্রত্যাখ্যান করে অন্য প্রেম গ্রহণ করলো, প্রতিবাদ করলো, বিস্মৃত হলো তখনই নারী আর মানসপ্রিয়া থাকে না। থাকে না কাব্যলোকের রোমাঞ্চশিহর জাগানিয়া কোনো স্বপ্নময়ী। নারী যখন রাগে ক্রোধে লোভে লালসায় ক্ষুধায় তৃষ্ণায় মোহে মাৎসর্যে সাধারণ মানুষ, তখন নারী পুরুষের কাছে গ্রহণ-অযোগ্য, ত্যাজ্য, সমালোচিত, তিরস্কৃত, ঘৃণিত। কবি নজরুলের নারী চেতনার আড়ালে কি পুরুষতান্ত্রিক এই মানসিকতা খুব বেশি প্রচ্ছন্ন থেকেছে? ‘পূজারিণী’ কবিতায় তাই কবি চরম নগ্নভাবে তীক্ষè ভাষার ছুরি দিয়ে নারীকে ফালাফালা করেছেন।
এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় আরো।
ইহাদের অতি লোভী মন
একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে খুশি নয়,
যাচে বহুজন।…..

প্রকৃতপক্ষে, পুরুষের কাছে নারীর হৃদয়ধর্ম কোনো ধর্মই নয়, তা লিখিত, পঠিত চর্চিত হতে হবে পুরুষের করা পাঠ্যসূচি অনুযায়ী। কোনো ‘এক’, সে যত দুর্জন, দুরাচারই হোক না কেন, নারীর জীবনে যদি আসে তাকে বাদ দেওয়া চলবে না, অন্য কোনো হৃদয়কে আহ্বান করা যাবে না, একবার নারী প্রেম করলে, চিরকালের জন্য তার হৃদয়কে সেই মানুষের কাছে বন্ধক দিয়ে ফেলতে হবে, তা না হলেই নারী লোভী, ভোগী। লোভ-কামনা, ভোগ-বাসনা মানবিক বৃত্তি। তা শুধু পুরুষেরই একচেটিয়া হবে? নারী শুধু থাকবে দেবীর মহিমা নিয়ে! আর পুরুষ পুজারীর ছলে ভোগবাসনার মণ্ডপে মণ্ডপে পূজা নিয়ে বেড়াবে?
‘পূজারিণী’ কবিতায় নজরুল যখন প্রণয়িণীর প্রত্যুপেক্ষা পেয়েছেন তখন প্রেম উবে গেছে। তখন সেই প্রেমিকা হয়ে গিয়েছে ছলনাময়ী, মায়াবিনী, দুষ্ট, মিথ্যাময়ী। পুরুষতন্ত্র নারীর মানুষ-মানসিকতাকে চিরকাল পুরুষবাদী ব্যাকরণতন্ত্রে এসব অপমান আর অবমাননাকর শব্দে চিহ্নিত করেছে। নজরুলও করেছেন। নারীকে সম্মান করা মানেই নারীকে মানুষ থেকে দেবী হয়ে উঠতে হবে। ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’ জননী হয়ে উঠতে হবে। হয়ে উঠতে হবে দুঃখভোগী, দুঃখযোগী, দুঃখজয়ী, দুঃখময়ী সর্বংসহারূপিণী।

‘নারী’ কবিতাটি শুধু কবি নজরুলেরই নারীচেতনা কিংবা নারীকে পুরুষের সমান এবং মহিমান্বিত দৃষ্টিতে দেখার অন্যতম অবলম্বন নয় বরঞ্চ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অধিকার, নারীর বহুমাত্রিক ও সহস্ররশ্মিবিকিরণকারী চরিত্রের উদাহরণ হিসেবে গৃহীত ও সমাদৃত।
কবি স্থির চিত্তে ধীরোদাত্ত কণ্ঠে একটি প্রায় অমোঘ সাম্যবাদী সিদ্ধান্ত দিয়ে কবিতাটি শুরু করেছেন
সাম্যের গান গাই
আমার চক্ষে পুরুষ রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।

সারা কবিতা জুড়ে কবি দৃষ্টান্তের পর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন কীভাবে দেশে দেশে কালে কালে, মানবসভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত নারী আর পুরুষ সম্মিলিতভাবে সমাজসভ্যতা কৃষ্টিসংস্কৃতি নির্মাণ করে চলেছে। আবার মানবপ্রবাহে পাপ ও বেদনা আনয়নের জন্যও কবি নারীপুরুষকে সমানভাবেই দায়ী করেছেন। পাশাপাশি পুরুষকে দোষারোপও করেছেন। পৃথিবীতে পাপ অনাচার আর রিরংসাবৃত্তির জন্য তীব্র অভিযোগের আঙুল তুলেছেন পুরুষের দিকে। তবে তার আগে সম্ভবত পুরুষকে ‘পাপ-পটিয়ান’ অভিধা থেকে মুক্তি দেবার জন্যই, পাপীকে বলেছেন ‘ক্লীব’। পাপী না-নারী না-পুরুষ। সে এক নির্লিঙ্গ সত্তা। নারী অথবা পুরুষ যাকেই পাপের ক্লীবসত্তা দখল করে নেয়, তখন সে আর কোনো নরমানুষ বা নারীমানুষ থাকে না। সে হয়ে যায় ক্লীব। পাপীকে ক্লীবত্ব দেয়ার মহত্ত্ব নজরুলের দ্বৈতচেতনা থেকে উদ্ভুত। এক হলো ‘পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করো’ ধারণা, দ্বিতীয়ত, পুরুষ পাপীর পার পেয়ে যাওয়ার সমাজধারণা। নারীকে দেবত্ব দিয়ে মাতৃত্ব দিয়ে মহত্ত্ব দিয়ে মহীয়ান গরীয়ান করে তোলা যায়। পুরুষকে সেভাবে করার যো নেই। পাপীকে ক্লীবত্ব দিলে লৈঙ্গিক পরিচয় থেকে পৃথক রাখা যায়।
এই ক্লীব তত্ত্বটির শুরু বোধ হয় এভাবে উদাহরণটা নিচ্ছি ‘পাপ’ কবিতা থেকে
আদম হইতে সুরু করে এই নজরুল তক্ সবে
কম বেশি করে পাপের ছুরিতে পুণ্যে করেছে জবেহ!
……………………………………
বিশ্ব পাপস্থান
অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান”

‘নারী’ কবিতায় এই অর্ধেক শয়তান হলো ‘নর’। উদারণ নিচ্ছি

“নরককুণ্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয় জ্ঞান
তারে বল আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান
অথবা পাপ যে Ñ শয়তান যে নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে তাই নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে।

সারা কবিতায়ই নারীর গগনচুম্বী মহত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে। মহৎ নারী, উদার নারী, লক্ষ্মী নারী কবির বাণীবন্দনা লাভ করেছে। নারী জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী, সুষমা লক্ষ্মী। নারী যামিনী শান্তি সমীরণ, দরদী, মহীয়ান।
নারীর যে সত্তা মমতাময়ী, সমতাময়ী, সততাময়ী, সুধাময়ী, করুণাময়ী, দাত্রী, ধাত্রী, মহান, উদারÑ সে সত্তাই নারীকে পৃথিবীতে পরিচিত করেছে। বসুন্ধরা যেমন বীরভোগ্যা, বীর তথা পুরুষশাসিত পৃথিবীও নারীআত্মার ঔদার্য আর উৎসর্গের ফসল ভোগ করতে চায়। ‘নারী’ কবিতায় নারীর এই মহান রূপ, আর উদার গরিমার কথা কবির হৃদয়োৎসারী অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সৌরভে সিক্ত হয়ে নিবেদিত হয়েছে। পুরুষের পাপ-তাপ, অবজ্ঞা-অবহেলা, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা Ñ যা শুধু নারীকে নয়, সমাজেকে ঠেলে দেয়ে বিশৃঙ্খলার মধ্যে Ñ সেখানেও নারীই এসেছে উদ্ধারকর্তৃ হয়ে, এসেছে পুরুষের সহায় হয়ে, সাহস দিতে, উৎসাহ দিতে। এমন কি নিষ্ঠুর হৃদয়হীন পুরুষের ভেতরে স্নেহপ্রেম-মায়ামমতা জাগ্রত করার জন্য নারী তার হৃদয়ের অর্ধেকও দান করেছে!
পুরুষ হৃদয়হীন
মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ।

তাই সমাজের মৌল শক্তিরূপিণী এই নারীকে যতদিন পুরষ অবহেলা করবে, বঞ্চিত করবে, পীড়ন আর লাঞ্ছনায় অবমানিত করবে, ততদিন সমাজের উন্নতি নেই, পুরুষেরও আত্মমুক্তি নেই। কবি শোনালেন এক চিরন্তন বাণী
“নর যদি রাখে নারীরে বন্দী তবে এ র পর যুগে
আপনারি রচা কারাগারে ঐ পুরুষ মরিবে ভুগে।”

তারপরে উপসংহারে এলো নারীর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাজ্ঞাপক সেই সম্বোধন মা, জননী।
ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি।

মাতৃমূর্তিই নারীসত্তা! নারী তখনই সার্থক যখন সে মা, জননী। যুগে-যুগে পুরুষ সমাজ নারীর মধ্যে দেবত্ব আর মাতৃত্ব আরোপ করে নারীর মানুষ সত্তাকে হরণ করেছে। নারী নিজেও নিজেকে জননীরূপেই সার্থক বলে ভাবে। নারীর মনমাটিতে এই চৈতন্যবৃক্ষ একদিনে বেড়ে ওঠেনি। বহু কালের পরিচর্যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ‘বীরপ্রসবিনী নারী’র বীরপুত্রগণ নারীকে এই মহিমার রঙে রাঙিয়েছে। মহৎ মানবিক অনুভূতির সাথে লোভ-লালসা-রাগ-দ্বেষ-ক্রোধ-উচ্চাকাক্সক্ষা-উপেক্ষা-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ইত্যাদি ইচ্ছা-লিপ্সা-বাসনা-স্পৃহা নিয়ে যে নারী সম্পূর্ণ নারী সম্পূর্ণ মানুষ, তাকে কখনো স্বীকার করা হয়নি। ‘নারী’ কবিতায় কবি নারীপুরুষের সাম্যের গান শোনালেও মূলত মহৎ নারীর জয়গানই গেয়েছেন, মানুষ নারীর নয়।

২৪.৫.১৭
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com