এ-যুগে নজরুলকাব্যের প্রাসঙ্গিকতা

বিনয় বর্মন | ২৫ মে ২০১৭ ৫:১৬ অপরাহ্ন

nazrul-1যুগদ্রষ্টা কবি নজরুল তাঁর উন্মাতাল সৃষ্টিশীলতায় সমসাময়িক সাহিত্যমানসে কেটেছিলেন তীব্র আঁচড়। বাংলা কবিতা ও গানে তিনি অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর কাব্যপ্রতিভা যুগের দাবি মিটিয়েছে এবং এ কালেও তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। তিনি আমাদের জাতীয় সাহিত্য পরিচয়ের বড় আধার, আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্রের উজ্জ্বল আকরচিহ্ন। তাঁকে ছাড়া বাঙালি ও বাংলাদেশ দিশা পায় না, বাংলা সাহিত্য গতি পায় না। তাঁর কবিতার মেঘগর্জন বাংলা সাহিত্যে যেমন আধুনিকতার অংকুর উদগম করেছিল, তেমনি জাতিগত বিভেদের মধ্যে মিলনের পথ প্রশস্ত করেছিল। তাঁর কবিতার উত্তাল তরঙ্গ মানসকূল প্লাবিত করে, দুর্বার অভিঘাতে পাঠকসমাজকে আবেগাকুল করে। কাব্যে তাঁর রুদ্ররস, প্রেমরস ও ভক্তিরস যে-কোন পাঠককে স্পর্শ করে, বিমোহিত করে, শুভাদর্শে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর ঝংকৃত, সুধাময়, সুখপাঠ্য কবিতা গৌরবতরণীতে বিংশ শতাব্দী পাড়ি দিয়ে একবিংশ শতকে এসে পাঠকের কাছে হয়েছে আরো আদরণীয়।

নজরুলের কাব্যপ্রতিভার বিপুল স্ফূরণ ঘটেছে তাঁর মানবতাবাদী চেতনার স্তরে স্তরে। তিনি চিরকাল গেয়েছেন মানবতার গান; উড়িয়েছেন মানবাত্মার জয়ধ্বজা। পাশ্চাত্যের শেক্সপিয়ারের মতো তিনি মানুষকে স্থাপন করেছেন পৃথিবীর তাবৎ কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রভূমে, মানুষকে দিয়েছেন সুউচ্চ মর্যাদা। মানুষের সক্ষমতার উপর ছিল তাঁর অবিচল আস্থা। মানবতার ধর্মকেই তিনি করেছেন আরাধ্য, এর মধ্যে দেখেছেন পরমের প্রকাশ। তিনি একাগ্র প্রত্যয়ে মানুষ হওয়ার সাধনা করেছেন, অন্যকেও অনুপ্রাণিত করেছেন সেভাবে। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন: ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ লালনের মতো তিনি ভজনা করেছেন মানুষকে; রামকৃষ্ণের মতো মানুষের সেবাতেই খুঁজেছেন আধ্যাত্মিক মুক্তি। আর্তের সেবাকে তিনি প্রার্থনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন। ‘মানুষ’ কবিতায় অনাহারী ভিক্ষুকের প্রতি সহমর্মীতা জানাতে ব্যর্থ মন্দিরের পূজারী এবং মসজিদের মোল্লাকে তিনি ভর্ৎসনা করতে ছাড়েননি। ভিক্ষুকের কণ্ঠে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আক্ষেপ ধ্বনিত হয়:

আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুদার অন্ন তা’বলে বন্ধ করনি প্রভু
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী!

কাব্যগানে নজরুলের এই মানবতার সাধনা বর্তমান অমানবিক সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মের মর্মতলে যে মানবতার সেবার সুর গুঞ্জরিত হয়, নজরুল তাঁর জলদগম্ভীর কন্ঠে সেটাই আমাদের শুনিয়ে দেন।

মানবতার আদর্শে অটল থেকে নজরুল তাঁর কাব্যগানে প্রচার করেছেন সাম্যের বাণী। তিনি দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে দেখেছেন একই চোখে, দিয়েছেন একই মূল্য। তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ মেনে নেননি। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রীস্টানের মধ্যে জাতিগত অনৈক্যের দেয়াল নির্মাণের বিরোধী ছিলেন তিনি। কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক চিন্তা তাঁর মনকে কখনো কলুষিত করতে পারেনি। এ অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর সাহিত্যিক জীবন থেকে ব্যক্তিগত-পারিবারিক জীবনেও প্রসারিত হয়েছিল। প্রমীলা দেবীকে নিয়ে তাঁর সংসারকর্ম ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে। এমনকি বিয়ের সময় তিনি প্রমীলাকে ধর্মান্তরিত করেননি। এই বিবাহ নিয়ে তাকে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে চরম হেনস্থা হতে হয়। তিনি গতানুগতিক ধর্মের চর্চা করেননি, করেছেন কাল্টের চর্চা। তিনি যে কাল্টের অনুশীলন করেছেন তার মধ্যে ছিল তান্ত্রিক যোগসাধনা তথা কালীধ্যান। ভক্তিভাবে তিনি চালিয়ে গেছেন শ্যামাসঙ্গীতের চর্চা। ‘মা’ ও ‘মানব/মানবী’ এই দুইকে তিনি একাকার করেছেন, একরূপে তাদের আরাধনা করেছেন। তিনি যে হাত দিয়ে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছেন, সে হাত দিয়েই লিখেছেন গজল ও ইসলামী গান। তাঁর প্রতিভার স্বর্ণস্পর্শে হিন্দু ও মুসলমানী উভয় ধারার ভক্তিগীতি সমৃদ্ধ হয়েছে। মা ও মানবীকে তিনি কিভাবে একত্রিত করেছেন তার নমুনা দেখি নিচের লিরিকে:

অঞ্জলি লহো মোর সঙ্গীতে
প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম
তোমারে সুন্দর বন্দিতে সঙ্গীতে।

তোমার দেবালয়ে কী সুখে কী জানি
দুলে দুলে ওঠে আমার দেহখানি
আরতী নৃত্যের ভঙ্গীতে সঙ্গীতে।

পুলকে বিকশিল প্রেমের শতদল
গন্ধে রূপে রসে করিছে টলমল।

তোমার মুখে চাহি আমার বাণী যত
লুটাইয়া পরে ঝরা ফুলের মত
তোমার পদতল রঞ্জীতে সঙ্গীতে।

আবার অত্যাচারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ধরনী থেকে অসুরশক্তি হটাতে তিনি আনন্দময়ী মায়ের আগমন প্রত্যাশা করেন:

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?

(‘আনন্দময়ীর আগমনে’)

নজরুল ছিলেন একান্তরূপে মানুষ, ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত উত্তম ও উদার বাঙালী। তিনি একজন মুসলমান হয়েও হিন্দুদের সম্যকভাবে বুঝতেন। হিন্দু শাস্ত্রে ছিল তাঁর গভীর পা-িত্য, হিন্দু সমাজপ্রথা সম্বন্ধে ছিল বিশদ জ্ঞান। তিনি হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ও ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সে লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করেছেন তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে। তিনি বলেছেন: ‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’ তাঁর সেকুলার কর্মাদর্শের বলিষ্ঠতা দিয়ে তিনি সংকীর্ণ হিন্দু-মুসলমান উভয়কেই লজ্জিত করেছেন। তাবৎ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নজরুলের মতো অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব আর দ্বিতীয়টি নেই, না কোন হিন্দু না মুসলমান। বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ যখন ধর্মের নামে মানুষ হত্যায় প্রবৃত্ত হয়, তখন নজরুলের আদর্শ আমাদের রক্ষা করতে পারে। নজরুল সবাইকে ধর্মপরিচয়ের উর্ধ্বে উঠতে বলেন; তিনি মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন: ‘মূর্খরা সব শোনো,/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো। … তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়/ ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!’ তরুণ সমাজ যত তাঁর কবিতা পড়বে, ততই তারা কূপম-ুকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে, নিজের মধ্যে অন্য মানুষের (অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের) ছায়া দেখতে পাবে। সে বুঝতে পারবে ধর্মের ভেদ আপাত, মানবতার বন্ধনই আসল। মানুষের প্রকৃত পরিচয় সে মানুষ। মানুষে মানুষে কোন পার্থক্য নেই। সকল মানুষ সমান। ‘নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,/ সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি’ (‘মানুষ’)। ‘সাম্যবাদী’ কবিতায়ও একই সুর ধ্বনিত:

গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান
যেখানে মিশছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।

মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।

নজরুল স্বীকার করেননি ধনি-গরীবের ব্যবধান, উচ্চ-নিচের বৈষম্য। এদিক দিয়ে তাঁর চিন্তাচেতনা ছিল সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের। তিনি দরিদ্রকে ঘৃণা করেননি, দারিদ্র্যকেও নয়। আদতে তিনি নিজেই আজীবন সংগ্রাম করেছেন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। তাঁর কলম চিরে বেরিয়েছে: ‘হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান, তুমি মোরে দানিয়ছ খ্রিস্টের সম্মান।’ তিনি নারী-পুরুষের প্রথাসিদ্ধ গতানুগতিক ভূমিকাকেও মেনে নেননি। তিনি নারীকে ঘরবন্দি করার বিরোধী ছিলেন। নারীর প্রতি অবহেলা-অমর্যাদা প্রদর্শন এবং তাকে অবদমিত করে রাখাকে তিনি অন্যায়-অনাচার মনে করতেন। এজন্য তিনি সমাজকে ধমকেছেন, এর দৃষ্টিভঙ্গি সুধরাতে বলেছেন। নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি উচ্চারণ করেন: ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যানকর/ অর্ধেক তার গড়িয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ (‘নারী’)। কবি নারীর মহীমাকীর্তন করেন এভাবে: ‘এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,/ নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল। … জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,/ সুষমা-লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি।’ কবি নারীকে প্ররোচনা দেন বন্দিত্ব ঘোচানোয়: ‘চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,/ মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!’ নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দিলে, নারীকে উচ্চাসন দিলে সমাজের কোন ক্ষতি নেই, বরং লাভ। দু’য়ে মিলে সমাজকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়। প্রকৃতপক্ষে নজরুলের কাম্য ছিল সমাজে নারীপুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠ: ‘সাম্যের গান গাই/ আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই! … সেদিন সুদূর নয়/ যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!’ নজরুলের এই প্রগতিশীল চিন্তার মাধুর্যটি এখনো আমাদের কাছে প্রভূত আবেদন নিয়ে হাজির হয়। নারী-স্বাধীনতা ও নারীবাদী আন্দোলনের যুগে নজরুলের কবিতা অধিক প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

মানবমুক্তির প্রয়াসে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতোয়ারা কবি নজরুল। তাঁর জীবনোল্লাস এ যুগেও নবসৃষ্টির প্রণোদনা দেয়। ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে/ মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে/ আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।’ এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাশরি এবং আরেক হাতে রণতূর্য নিয়ে নজরুল কবিতার ময়দানে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি প্রেমের কবিতা লিখেছেন; পৃথিবীকে প্রেমময় করে তুলতে চেয়েছেন। তাঁর পেলবুষ্ণ উচ্চারণ: ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দিবো খোপায় তারার ফুল।’ কিংবা ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়া সেকি মোর অপরাধ?’ তাঁর প্রেমপংক্তির ছন্দ হৃদয়ে আলোড়ন তোলে, তাঁর কোমলগান্ধার নিরন্তর অন্তরে গোলাপের কোমল সৌরভ ছড়ায়। কবি আশা করেন প্রকৃতির সন্নিধানে তিনি স্বপ্নে দেখা রাজকন্যার দেখা পাবেন:

হয়ত তোমার পাব দেখা,
যেখানে ঐ নত আকাশ
চুমছে বনের সবুজ রেখা।
ঐ সুদূরের গাঁয়ের মাঠে,
আলের পথে বিজন ঘাটে
হয়ত এসে মুচকি হেসে
ধরবে আমার হাতটি একা।

(‘আশা’)

বনপথে একাকী হাঁটতে গিয়ে কবি তাঁর প্রিয়ার দেখা পান: ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে/ কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি/ তুমি কেন হায় আসিলে হেথায়/ সুখের সরগ হইতে নামি।’ প্রিয়ার চোখে জল দেখে তিনি গেয়ে ওঠেন: ‘এত জল ও কাজল চোখে/ পাষানী আনলে বল কে?/ টলমল জল মোতির মালা/ দুলিছে ঝালর পলকে।’ কিংবা ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল/ ফুল নেবো না অশ্রু নেবো ভেবে হই আকুল।’ বিরহী দিনে তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন: ‘আজও মধুর বাঁশরী বাজে/ গোধুলী লগনে বুকের মাঝে।/ আজও মনে হয় সহসা কখনো/ জলে ভরা দুটি ডাগর নয়ন/ ক্ষণিকের ভুলে সেই চাঁপা ফুলে/ ফেলে ছুটে যাওয়া লাজে।’ নজরুলের কবিতা ও গানে উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ অতুলনীয়। ‘চাঁদ হেরিছে চাঁদমুখ তার সরসীর আরশিতে/ ছোটে তরঙ্গ বাসনাভঙ্গ সে অঙ্গ পরশিতে।’ চাঁদনি রাতের এই যে চিত্রকল্প এবং চাঁদের ব্যক্তিত্ব রূপায়ন তা শিল্পমাধুর্যে উচ্চাঙ্গ ও উচ্চকিত। বর্তমানকালে যে কোন কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখেন নজরুলের প্রেমবাণী পাঠ করে আনন্দে শিহরিত হতে বাধ্য।

কিন্তু প্রেমের বাণী যখন ব্যর্থ হয়, তখন তিনি দ্রোহে ফেটে পড়েন। তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে; যুদ্ধে আহ্বান করেন হন্তারককে। তিনি বিশ্বচরাচরে জানিয়ে দেন তাঁর অস্তিত্বের কথা, তাঁর অমিত অহম ‘ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া/ খোদার আসন আরশ ছেদিয়া’ চিরবিস্ময়ের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। কোন শাসক-শোষকের ভ্রূকুটির কাছে তিনি মাথা নত করেন না, কারণ বীরের মাথা কখনো নত হয় না। তিনি কালবৈশাখিরূপে প্রলয়নাচন নেচে যান, অত্যাচারের অচলায়তন ভেঙে চুরমার করেন। তিনি নৃত্যপাগল ছন্দে দুর্দম গতিতে এগিয়ে যান; তিনি শত্রুর সাথে গলাগলি করেন এবং মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েন। এ ছুটে চলার শেষ কোথায়? কবির বয়ান: ‘মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত,/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না/ বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।’ ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় মিথের যে বিপুল সম্ভার (হিন্দু ও ইসলামী মিথ মিলিয়ে) তা সত্যি বিস্ময়কর। যে কোন আধুনিক পাঠক-কবি তা দেখে মুগ্ধ হবেন এবং রীতিমত ঈর্ষাবোধ করবেন। এ কবিতায় যে মিত্রাক্ষর সমঅসমপংক্তির ছন্দ তাতেও রয়েছে নিপুণ কারিগরি। আমরা পাঠ করি নিচের কয়েকটি লাইন:

আমি বজ্র আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার
আমি ইগ্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।

‘বিদ্রোহী’র যে ‘আমি’ তা মানবমনের অবচেতনে বসে থাকা অপরাভূত দ্রোহীসত্তা; এটি হুইটম্যানের গণতান্ত্রিক সর্বজনীন নম্রসত্তা নয়। নিরন্তর অগ্নিস্ফূলিঙ্গেই তার প্রকাশ। ‘আমি ছিন্নমস্তা চ-ী আমি রণদা সর্বনাশী,/ আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!’ কবির এ রুদ্ররূপ কল্যানাদর্শে উদ্বুদ্ধ। বিদ্রোহ ও লড়াইয়ের মাধ্যমে কবি হয়ে ওঠেন মঙ্গলের প্রতিভূ, স্রষ্টার প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন/ আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!’ কবিও হিসেবেও তিনিও যে স্রষ্টা। তাঁর সৃষ্টি মৌলিক ও সত্য। সেই আত্মসত্যে তাঁর জাগরসত্তা বিলীন হয়ে যায়। তিনি লাভ করেন বুদ্ধের সমাধি। নজরুলের কবিতায় প্রেম ও দ্রোহের যুগলবন্দি এক অপরূপ নান্দনিক সুষমায় ধরা পড়ে পাঠকহৃদয়ে। সত্য-শিব-সুন্দরের আরাধনায় সুস্থ-সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় এখনো নজরুলের কবিতাই হয়ে ওঠে আমাদের বড় ভরসার তরী।

মানুষের জীবন কেটে যায় আশানিরাশার দোলাচলে। জীবনে চলতে চলতে কখনো সে পথ হারায়, হতাশ হয়। আবার সে আশার আলো দেখে, পথ খুঁজে পায়। পথ হারানোর দৃশ্যটি নজরুলের কবিতায় ফুটে ওঠে এভাবে: ‘হঠাৎ তাহার পথের রেখা হারায়/ গহন বাঁধায় আঁধার-বাঁধা কারায়,/ পথ-চাওয়া তার কাঁদে তারায় তারায়/ আর কি পূবের পথের দেখা পাবে/ উদাস পথিক ভাবে’ (‘পথহারা’)। নজরুলের কবিতার শৈলিবৈশিষ্ট্য তাঁর ভাষাতেই ব্যক্ত করা যায়: ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম, ঝরনার মতো চঞ্চল, বিধাতার মতো নির্ভয়, প্রকৃতির মতো সচ্ছল। দিব্য আভার মতো একটি সহজ-স্বচ্ছ বৈভব নজরুলের কবিতায় সবসময় জেগে থাকে। এটি তাঁর কবিতার অন্তঃস্বরূপ, অন্তরঙ্গ প্রাণরস। নজরুলের কবিতায় একটি তরঙ্গায়িত হৃদস্পন্দন আছে যা কখনো ম্রিয়মান হয় না। বর্তমান সময়ে এবং আগামিতেও তার আবেদন অক্ষুন্ন থাকবে।

নজরুল আজীবন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তাঁর সাহিত্যজীবনের বড় লক্ষ্যই ছিল অন্যায় শাসন-শোষণের অবসান। ইংরেজরা তার কবিতাগানে তুষ্ট ছিল না। তাই তাকে জেলে পুরেছেন, নির্যাতন করেছেন। তিনিও দমে যাননি। শপথ নিয়েছেন স্বদেশবাসীর মুক্তির। গানে-কবিতায় হুশিয়ার করে দিয়েছেন কা-ারিকে, গেয়েছেন শিকল ভাঙার গান। ‘প্রভাতের ভৈরবী’ হয়ে নৃত্য করেছেন পথে-প্রান্তরে, বাজিয়েছেন তাঁর ‘বিষের বাঁশি’। তাঁর ‘নবযুগ’ ও ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবু তিনি বারবার ফিরে এসেছেন পাঠকের কাছে নতুন নতুন রূপে। কেবল ইংরেজ শাসন অবসানে নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও নজরুলের কবিতা ও গান মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এজন্যই তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা। তার গান ‘চল চল চল উর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত। তিনি মিশে আছেন ব-দ্বীপের উর্বর পলিমাটিতে, স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকায়, মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায়, কোটি মানুষের প্রাণের গভীরে। নজরুল আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক ছিলেন এবং প্রাসঙ্গিক থাকবেন চিরকাল।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com