অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদের সাথে একদিন

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ২৩ মে ২০১৭ ৯:০৫ পূর্বাহ্ন

1. সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ ও শিমুল সালাহ্উদ্দিন
চিত্র: সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ ও শিমুল সালাহ্উদ্দিন
অপরাজেয় বাংলায় ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদের প্রয়াণে শোকাচ্ছন্ন শিল্পজগৎ। খালিদের চলে যাওয়ার বেদনা ছুঁয়েছে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। ইতিহাসের এমন অগ্নিপুরুষকে হারিয়ে ভারাক্রান্ত সর্বস্তরের মানুষ। শোকে স্তব্ধ। শ্রদ্ধায় অবনত। চেতনার শৈল্পিক নির্মাতা আব্দুল্লাহ খালিদের জন্য শুধুই হাহাকার। অঙ্কুর, ডলফিন, অঙ্গীকার, মা ও শিশুসহ আরো অনেক ভাস্কর্যের স্রষ্টা আব্দুল্লাহ খালিদ। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে ঘুরে-ফিরে আসছে অপরাজেয় বাংলার নাম।

দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন এই ভাস্কর। ঢাকার বারডেম হাসপাতালে ৭৫ বছর বয়সে ২০শে মে ২০১৭, অর্থাৎ গত শনিবার রাত ১১.৪৫ মিনিটে মারা গেছেন এই শিল্পী, এমন তথ্য আমাকে প্রথম জানায় শিল্পীর পুত্র সৈয়দ আবদুল্লাহ্ জহীর। প্রথমে চারুকলা অনুষদে ও পরে অপরাজেয় বাংলার সামনে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদকে রবিবার বিকেলে দাফন করা হয়েছে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যের প্রতীক (পড়ুন আইকন) অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ্ খালিদের জন্ম পহেলা সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সালে সিলেটের কাজী ইলিয়াস মহল্লার সৈয়দ বাড়িতে। পিতা সৈয়দ আহমেদ মুজতবা ছিলেন বিদ্যানুরাগী, জ্ঞাপপিপাসু, সংস্কৃতিমনা। আবদুল্লাহ খালিদের চারুকলায় পড়ার ব্যাপারে পরিবারের আর সবার মত না থাকলেও, ছিলো পিতার উৎসাহ।

পিতার সম্মান রাখতেই বুঝি কঠোর পড়াশোনা আর নিজের মেধার ব্যবহারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে ১৯৭৪ সালে বেরিয়েছিলেন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। অথচ এই খালিদই পাকিস্তান আমলে, সেসময়ের ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস এন্ড ক্রাফটস, বর্তমানে যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, সেখান থেকে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়ে, কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, পড়তেন অঙ্কন ও চিত্রাঙ্কন বিভাগে, কিন্তু সারাদিন ভাবতেন ভাস্কর্য নিয়ে। চট্টগ্রামে গিয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র পেয়েছিলেন ভাস্কর্য চর্চার, ফলত এই উত্তম ফলাফল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন আর্টসের প্রফেসর ছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ। স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে প্রথম হয়ে ১৯৭৪ সালে এই বিভাগেই শুরু করেছিলেন কর্মজীবন, নিভৃতচারী এ শিল্পী অবসরেও গিয়েছিলেন এ বিভাগ থেকেই।

অপরাজেয় বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশ, একসূত্রে গাঁথা। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের জীবন্ত এক ক্যানভাস। ভিনদেশি আগ্রাসন, অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি এই তিন মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের এই ভাস্কর্য বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও সাম্যের প্রতীক। এ শিল্পকে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করতেন ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ।

বাংলাদেশের ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলতে গেলেই আসে অপরাজেয় বাংলার নাম। যুগ যুগ ধরে সংগ্রামী জনতাকে প্রেরণা দেয়া এ শিল্প সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদকে করেছে অমর। শুধুমাত্র অপরাজেয় বাংলা নয়, তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে আরো, অপরাজেয় বাংলার কারণে যেসব পড়ে গেছে আড়ালে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের রামপুরা কেন্দ্রের ভেতরে একটি যৌথ (গ্রুপ ওয়ার্ক) টেরাকোটা রিলিফ ম্যুরাল ‘আবহমান বাংলা’ করেন সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে। ৪৪৭ বর্গফুটের এরকম বিশাল টেরাকোটা বাংলাদেশে খুব বেশি নেই আর। টঙ্গীর স্কুইব ফার্মাসিউটিক্যালস এর কমিশনওয়ার্ক হিসেবে করেছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মরণে ভাস্কর্য ‘অঙ্কুর’ (The Bud)। ১৪×৩৫× ৪৬ ফুটের এ ভাস্কর্যকেও সমালোচকরা খুব ভালো ভাস্কর্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার, দৈনিক ইত্তেফাক ভবনে বিধ্বস্ত বাংলা, বাংলাদেশ নেভাল একাডেমির ডলফিন, গুলশানের বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রিজ বিল্ডিং এ ‘ইটারনাল বেঙ্গল’, বাংলাদেশ ব্যাংক সদরদপ্তরে ৬×২৪ ফুটের মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য বাংলাদেশের ভাস্কর্য চর্চার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছেন সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।

২০১৪ সালে জানুয়ারির কথা, বহুদিন ধরেই এ প্রজন্মের আলোচিত ভাস্কর তেজস হালদার যশ আমাকে বলছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদের একটি সাক্ষাৎকার যেনো আমি নিয়ে রাখি। এশিয়ান বিয়্যেনেলে পুরস্কৃত এই ভাস্করকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করার সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বাংলাদেশের কোন অগ্রজ ভাস্করকে আপনি কাজের দিক দিয়ে শ্রদ্ধা করেন? গুরু মনে করেন? তিনি বলেছিলেন সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদের নাম।

2. অপরাজেয় বাংলার সামনে সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ, ছবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন
চিত্র:অপরাজেয় বাংলার সামনে সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ, ছবি শিমুল সালাহ্উদ্দিন
সাক্ষাৎকার নেওয়া একটি সমস্যা হয়ে দেখা দিলো অসুস্থ সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ চট্টগ্রামে বসবাস করায়। বিনয়ের সাথে তাঁকে বললাম আমি একটি সাক্ষাৎকার নিতে চাই, ফোনে বললাম। তিনি বললেন ঢাকায় এলে আমাকে জানাবেন। প্রতি সপ্তাহে যেনো আমি তাকে মনে করিয়ে দেই, ঢাকায় এলে আমাকে জানাতে হবে। ফেব্রুয়ারি গেলো, মার্চ যাচ্ছিলো। দিনটি ছিলো ২৭শে মার্চ, ২০১৪। কথা ছিলো এমন, পান্থপথ এর একটু সামনে কমফোর্ট মেডিকেলের সামনে থেকে ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদকে নিয়ে যাবো আমি অপরাজেয় বাংলার সামনে, সেখানেই কথা হবে।

ঢাকার জ্যামের কথা আর বলতে! অফিস থেকে ঘন্টাদেড়েক আগে বেরিয়েও আধাঘন্টার পথ মনে হলো সাতসমুদ্র তেরো নদী। সোনারগাঁ হোটেলের সিগন্যালে যখন আমরা, তখনই সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ স্যার ফোন করলেন, তোমরা কোথায়? আমিতো দাঁড়িয়ে আছি!

তারও আধঘন্টা পর পৌঁছলাম, এই রোদের শহরে তখন একজন কিংবদন্তি দাঁড়িয়ে আছেন জ্যামের রাস্তায়। নিয়তিকে শাপশাপান্ত করে যখন তাঁর সামনে পৌঁছলাম আমার প্রায় কান্নাকান্না দশা। বললাম স্যরি স্যার, আমাদের ভুল হয়ে গেছে, অন্তত আড়াইঘন্টা আগে বেরুনো দরকার ছিলো। তিনি বললেন নো প্রবলেম। কথা শুরু হলো—

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, আপনি তো ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন, বামপন্থী ছিলেন! এখনো বামপন্থী?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: তুমি জানলা কিভাবে? এখন তো আর এইটা কেউ বলে না। তখন সাম্যবাদে উদ্বুদ্ধ ছিলাম। পরে আর রাজনীতি করি নাই। এসএসসি পরীক্ষার পর এলাকার বড়ভাইরা বললো, ছাত্র ইউনিয়নের সবার সাথে বন্ধুত্ব হলো। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টও ছিলাম কিন্তু! নইলে তো তোমরা চিটাগাং ইউনিভার্সিটি শুনলেই শিবির বলতা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হা হা হা, না স্যার, অপরাজেয় বাংলা যে বানায় সে শিবির হয় কেমনে! এসএসসি পাশ করলেন কত সালে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: নাইনটিন সিক্সটি ফাইভে মনে হয়।
3. অপরাজেয় বাংলার সামনে দুজনের আলাপ
চিত্র: অপরাজেয় বাংলার সামনে দুজনের আলাপ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অপরাজেয় বাংলার প্রথম নকশাটা করলেন বা ডিজাইন করলেন, এইটা কত সালে? প্রস্তাবটা কাদের ছিলো?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
: ১৯৭৩ সালে মনে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছিল, ডাকসুও ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার কাছে প্রস্তাবটা স্যার কারা নিয়ে আসে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: সেলিম ছিল, ঐ যে মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম। আরও কে কে জানি। নামটা দিছিলো সালেহ্ চৌধুরী।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মডেল কাউরে দেখাইছিলেন? আগে দিতে হইছে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আমার কিছু বন্ধুবান্ধব দেখছে, আর ডাকসু দেইখাই পছন্দ করছে, ওরা মূলত ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের একটা ভাস্কর্য স্থাপন করতে চাইছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা স্যার। মডেলদের কী এইখানেই দাঁড়া করায়া করছিলেন কাজটা? কোন সমস্যা হইছিল?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: হ্যাঁ। সমস্যা একটাই। এতক্ষণ দাঁড়াতে চায় না আর কি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মডেল কারা ছিলো স্যার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আর্ট কলেজের স্টুডেন্ট ছিলো, মুক্তিযোদ্ধা মাঝখানে যিনি, বদরুল আলম বেনু। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে যার, ঐটা সৈয়দ হামিদ মকসুদ, ফজলে ডাকতাম আমরা ওরে। আর মেয়েটার মডেল ছিল হাসিনা আহমেদ।আমার এক কাজিন হাসিনা। ওর হাসব্যান্ড ক্যানাডায় চলে গেছে.. তারপরে ও ক্যানাডায় চলে যাবে মেডিকেল টেস্টের লাইগা দুই মাস… মেডিকেল টেস্টের লাইগ্যা নানান জায়গায় যাওয়া লাগে তার। মিডিলের মধ্যখানের ফিগারটা বারো ফিট। বারো ফিট, ওই ফিগারটা আবার তিন ফিটের স্কেলে, মডেলটা তিন ফিট ছিল আর কি। হাইয়েস্টটা ধরে আর কি। চার ইঞ্চি ব্লোআপ করছি চার ইঞ্চি কইরা কইরা। ওয়ান ইস্টু ফোর।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা, ব্লো আপটা কেন স্যার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: একটু উঠানোর জন্য। তো চার ইঞ্চি কইরা আমি দিছি। তখন প্লাস্টার অফ প্যারিস ঢাকাতে ছিল না। থাকলেও খুব কষ্টের ছিল। তাইলে হয়ত অন্যরকম হইত আর কি। তো শহীদুল্লাহ সাহেব বললেন, তুমি এই প্রোসেসে করো।

4. অপরাজেয় বাংলার সামনে আমি ও সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
চিত্র: অপরাজেয় বাংলার সামনে সাক্ষাৎকারগ্রহিতা ও সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: রড দেখা যাচ্ছে, বের হয়ে আসছে। ভেঙে গেছিল বোধহয় মাঝখানে একবার।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না না, এইটা ভাঙ্গে নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঠিক আছে স্যার, কিন্তু ডাকসু যখন আপনাকে এইটা করার প্রস্তাব দেয়, কঠিন কাজ তো স্যার ছিলো, এত বড় কাঠামো—
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এইটা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল, এই ফাঁকগুলার মধ্যে বাঁশ ঢুকায়া ঢুকায়া, ঢুকায়ে স্টেজ করে করছিলাম। ব্যালেন্স রাখার লাইগ্যা। ভয়ঙ্কর অবস্থা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: উপাদান কি ছিলো স্যার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: দুই সুতা রড, এক সুতা রড, এক সুতা না দুই সুতা যাই হোক; এগুলো তো ভেঙ্গে যাবে আপনার।
শেষ হওয়ার পরে অমার খুব ভালো সময় যায়নি। আমার উপর এক ধরণের অত্যাচার করা হইছে আর কি। এ কারণে আমি এখানে আসি না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: কেমন অত্যাচার স্যার, আপনি বললেন আপনার উপর অত্যাচার করা হয়েছে, কেমন অত্যাচার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না, এইগুলো পলিটিক্যাল ব্যাপার। আমি তো মনে করছিলাম জামাত শিবিররা বাধা দেবে, তা দেয়নি। আসছে ঠিক অন্য জায়গা থেকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেমন স্যার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: যেখান থেকে বাঁধা আসার কথা ছিল না, সেখান থেকে আসছে। থাক এইগুলা।
5. সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায়
চিত্র: সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায়
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না স্যার, আপনি যদি স্যার মনে করেন, প্রয়োজনে আমরা অন-এয়ার করব না। কিন্তু স্যার এইগুলো ইতিহাসের সাক্ষী, এইটা স্যার আপনার বলা উচিত। বাঁধা কোত্থেকে আসছে স্যার!
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: যাই হোক বাদ দেন এটা। এই প্রসঙ্গটা বাদ দেন। হয়া গেছে, এইটা দাঁড়ায় আছে, এইটা একটা পপুলার কাজ, এইটেই আমাকে আনন্দ দেয় আর কি। টেলিভিশন খুললেই নানান সময় এইটার প্রতিরূপ দেখা যায়। এইটা সুন্দর আর কি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, টোটাল স্ট্রাকচারটা, মানে আপনার প্লানে কি এই হাইটের মধ্যেই ছিল, না আরো হাইট করতে চেয়েছিলেন আপনি?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না, আর হাইট করতে চাইনি আমি। বেশি হাইট করতে চাইলে আরো বড় স্কয়ার দরকার হয়। এইটা যেমন একটা, গেইট থেকে ঢুকে, সহজে নিজের একটা আয়ত্তের মধ্যে আছে দেখার। এর উপরে করলে আর ইয়ে হইত না আর কি। ভলিউমটা বড় হয়া যাইত বেশি। তো প্লাস্টার আমি পাইনি। প্লাস্টার পাইলে একেকটা মডেল কইরা কইরা প্লাস্টার দিয়া মোল্ড কইরা করতে পারতাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এইটা পুরা সিমেন্ট দিয়ে করা?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: টু ইস্টু ওয়ান। সিমেন্ট এক, স্টোনথিপ দুই আর বালি দিয়া।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, কাজটা আপনি ওপেন করলেন কখন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এইটা ওপেন হইছে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৯।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে কাজটা আপনি শুরু করলেন, তেহাত্তরে প্রস্তাবনা, চুয়াত্তরে শুরু করলেন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: হ্যাঁ, চুয়াত্তরে। তার মধ্যে বঙ্গবন্ধু মারা গেলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তখনই আমার খুব দঃসময় গেছে আর কি। এই কাজটা পলিটিক্যাল কারণে বন্ধ করে দেওয়া হইল। কর্তৃপক্ষের আর কোন উদ্যোগ নেওয়া হইল না। যার ফলে কাজটা বন্ধ হয়া যায়। তখনই আমার খুব দঃসময় গেছে আর কি। মোল্লারা ভাঙতে আসে এইটা। সিগনেচার ক্যাম্পিং করতে আসে জামাতরা।
6. সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায়
চিত্র: সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায়
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাদের বক্তব্য কী ছিল?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: মূর্তি রাখা যাবে না ইসলামিক দেশে। কয়েকজন রাতে কালি মারতে আসছিল, ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা তাদের ধরছে। ধইরে চুল ন্যাড়া কইরা দিছে। মাথায় চুনকালি দিছে। গলায় জুতার মালা দিয়া ইয়ে করাইছে। তারপর এদের মধ্যে কেউ কেউ চলে যায়। তখন ট্রাক দিয়া লোকরা আসে। ছেলেরা হকিস্টিক নিয়ে ইয়ে করে আর কি। বাঁধা দেয়।সাধারণ জনগণের ততদিনে একটা মায়া হইছে, চেতনা হইছে এবং এইটার একটা বিদ্রোহী চেতনাবোধ তার মধ্যে আছে। এটাই সুন্দর জিনিস।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, এইটা পপুলার হওয়ার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? এটা কি একটা কারণ নয় যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটা জায়গায় এটা হওয়ার কারণে আসলে প্রচুর স্টুডেন্ট এখানে বিভিন্ন সময় পড়াশোনা করেছে।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এখানেই আমি ভাগ্যবান। এইটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে এই কাজটা স্থাপন পাওয়ায় এই কাজটা তার বিশেষ মর্যাদা লাভ করছে। এইটা বড় জিনিস আর কি। এবং এইটার যে কম্পোজিশন, এইটার আইডিয়া; এইটা ইউনিক, আমার মনে হয় আর কি। আমার নিজের কাজ আমার নিজের বলা ঠিক না।
7. অপরাজেয় বাংলার সামনে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, ছবি জাফরিন গুলশান
চিত্র:অপরাজেয় বাংলার সামনে সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, ছবি জাফরিন গুলশান
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি বলেন স্যার।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: তিনটা ইয়ে নিয়ে, তিনটা ফিগার নিয়ে কম্পোজ করা, যেখানে দুইটা ফিগার নিয়েই পাওয়া যায় না! তিনটা ফিগার নিয়ে কম্পোজ করা, তার মধ্যে কম্পোজিশিনটা ইয়ে করা, ইউনিক। তো এই কম্পোজিশনটা খুব ইন্টারেস্টিং। দেখলে মনে হয় স্থবির। আবার দেখলে মনে হয় চলতেছে। এই ধরণের একটা গতিও আছে। এমন কাজ করা কঠিন আমারটার পর অন্য কারও জন্যও।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম সাহেবের কথা বললেন, তারা প্রস্তাব দেয়ার পরে নাকি…..
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না, স্বাধীন হওয়ার পরে আমি নিজেই ভাবতেছিলাম একটা কিছু করার। স্বাধীতার উপর কিছু করব। তো এরা প্রস্তাবটা দেওয়ায় সোনায় সোহাগা হল আর কি। প্রস্তাবটা আসলে ঢাকসু দিছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ! স্যার, এই কম্পোজিশনটা কবে ভাবলেন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই মাথায় ঘুরতেছিল আর কি।
8. অপরাজেয় বাংলার কাজ করছেন শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
চিত্র:অপরাজেয় বাংলার কাজ করছেন শিল্পী সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যে আইডিয়ার কথা বললেন যে, এটা একটা ইউনিক আইডিয়া; এই আইডিয়াটা ডেভেলপ করেছেন কোন বিশেষ কোন ঘটনা থেকে, চিন্তা থেকে? মুক্তিযুদ্ধের কোন ছবি—
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না, আমি তো যুদ্ধের সময় ঢাকাই ছিলাম। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধে যাব তখন আবুল বারাক আলভী, আমরা একসাথে যাওয়ার কথা ছিল, ও চলে গেল এক ফ্রন্টে, আমাকে না জানায়ে। তো আসল যখন, আবার দশ পনেরো দিনের ভেতর ফিরে আসছে, তো আইসা বলল অমাদের ওখানে লোক এতো বেশি হয়া গেছে, সেখানে যাওয়ার দরকার নাই। আমাদের এখানে লোকালি ইয়ে করতে হবে, লোকালি জায়গা ঠিক করতে হবে, কোথায় এসে থাকা যায়, কী করা যায়, অস্ত্র রাখা যায়, এগুলা আর কি। কিংবা মিটিং কোথায় করা যায়। তো তখন থেকেই আমি ঢাকায়। ঢাকা থেকে আর যাওয়া হয়নি আমার। তো আমার সবচে বড় ব্যাপার হইল এই হোল্ড করা আর কি! যুদ্ধটাকে ধারণ করার মতো বয়স ছিল আমার। আমার বয়স তখন পঁচিশ ছাব্বিশ ছিল আর কি। যেতেও চাইছিলাম, প্রস্তুত ছিলাম, ডাক আসার অপেক্ষায় ছিলাম, পাই নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: মানে একদম টগবগে তরুণ।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: হ্যাঁ টগবগে তরুণ। আলম, বাকের, শাহাদৎ চৌধুরী এরা আমার অফিসে আসত। অফিসে বসে ওরা ইয়ে, মিটিং করত আর কি, সিদ্ধিরগঞ্জ পাহাড় স্টেশন কিভাবে উড়ায়ে দেওয়া যায়— এইগুলার প্লান করা, লোকদেরকে আইন্যা ট্রেনিং দেওয়া, তারপরে গোলাগুলিগুলা হওয়া— তো এই জিনিসগুলা তখন থেকেই আমার মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া তৈরি করছিল, হইছিল আর কি, মানে যুদ্ধটা কী জিনিস! তো আরো বেশি কাজ হওয়ার উচিত ছিল আর্টিস্টদের। যে পরিমাণে আমাদের স্ট্রাগলটা ছিল ওই পরিমাণে মুক্তিযুদ্ধের উপরে কাজটা কম হইছে।
9. আবক্ষ ভাস্কর্যের জন্য সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদকে সিটিং দিচ্ছেন বরেণ্য শিল্পী কামরুল হাসান
চিত্র: আবক্ষ ভাস্কর্যের জন্য সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদকে সিটিং দিচ্ছেন বরেণ্য শিল্পী কামরুল হাসান
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি নিজেও তো স্যার চিটাগং বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গিয়ে আসলে আল্টিমেটলি অনেক কম কাজ করেছেন। আমাদের সামনে হাজির আছে এই কাজটা, নেভাল একাডেমিতে আপনার একটা কাজ আছে, চিটাগং বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ মিনার করেছেন আপনি। ঢাকায় আসলে আপনার কাজ খুবই কম। এই একটা ছাড়া বোধহয় আর নাই।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: ঢাকায় নাই। আমার জয়দেবপুরে ছিল একটা। স্কুইব মেডিসিন মেডিকেল ফার্ম, এখানে শহিদ মিনার আছে একটা, অঙ্কুর। আর আছে চাঁদপুরে— অঙ্গীকার। এটা দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে একটা হাত, হাতের মধ্যে স্টেইন। আর এমনে আছে গলফ ক্লাবের গলফার, তারপরে আপনার নানান মুর্যা ল আছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংলগ্ন ভবনে আমার মুর্যা ল আছে, ইয়েতে আছে, ওই এবি ব্যাংকে, তারপর ব্রাক হেড অফিসে আছে আমার কাজ। ইত্তেফাক অফিসে আছে আমার কাজ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সবগুলো কাজের স্যার কোনো ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টারি কি স্যার আপনার কাছে আছে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না, ডকুমেন্টারি নাই। একটা ফিল্ম করছে প্রশিকা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, ভাস্কর্যসহগ সংস্কৃতি হওয়ার জন্য করণীয় কাজগুলো, কী কী? সেটা কি স্যার আমাদের শিক্ষক হিসেবে, ভাস্কর্যশিল্পের পথিকৃত মানুষ হিসেবে আপনি কি স্যার আমাদের বলতে পারেন? কী কী করলে আসলে এই জায়গাটা তৈরি হতো?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আপনার যারা বোদ্ধা কিংবা যারা ওই ধরণের স্বাবলম্বী অর্থকড়ির দিক দিয়া, তাদেরকে আরেকটু আগায় আসতে হবে। গার্ডেন ক্যাপসার করা, রোয়িঙের লাউঞ্জগুলা আছে, কর্পোরেট লবিগুলাতে কাজ রাখা— এইগুলা আর কি।
10. শিল্পী কামরুল হাসান ও তার আবক্ষ ভাস্কর্য, ছবি নেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ্ খালিদের ফেসবুক পেজ থেকে
চিত্র:শিল্পী কামরুল হাসান ও তার আবক্ষ ভাস্কর্য, ছবি নেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ্ খালিদের ফেসবুক পেজ থেকে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা তো হল স্যার কাজের জায়গা তৈরি হওয়া, অনেক বড় বড় জায়গায় বা বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে কাজের জায়গা তৈরি হওয়া। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে বা বিভাগগুলার আগ্রহের জায়গা থেকে স্যার ভাস্কর্য নিয়ে আর কী করা যেতে পারে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: সরকারী পর্যায়েও আগায়ে আসা উচিত আর কি। আমলারা তো মূর্খ, শিল্পসাহিত্য বোঝে এমন আমলা তো নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কিন্তু স্যার ভাস্কর্য নিয়ে আমরা ভয়ঙ্কর কিছু জিনিস দেখতে পেয়েছি। যেমন স্যার মেহেরপুরে ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের দলিল সিগনেচার করার কাজ, ওটার একটা ভাস্কর্য সেখানে তৈরি করা হচ্ছিল, কিন্তু সেখানে স্যার আমরা দেখতে পাচ্ছি রমনা রেসকোর্স ময়দানে সেই আত্মসমর্পণের জায়গায় বঙ্গবন্ধু নিজে ছিলেন না, কিন্তু যে ভাস্কর্যটা বানিয়েছেন মৃণাল হক, ওইখানে স্যার বঙ্গবন্ধু নিজে বসে আছেন। এই যে দশা, এই দশার ব্যাপারে স্যার আপনি কী বলবেন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এইটা অজ্ঞতা। অজ্ঞতা কিংবা খুশি করা। এক ধরণের খুশি করা। আওয়ামী লীগকে খুশি করা। বঙ্গবন্ধুকে দিয়া দিলাম আর কি। এইটা খুব দুঃখজনক ব্যাপার। এটা উচিত না। ইতিহাসকে বিকৃত করা ঠিক না।
11. সপরিবারে সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
চিত্র: সপরিবারে সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একজন ভাস্কর স্যার, কেন আরেকজনকে খুশি করতে চাইবে বা একজন শিল্পী কেন চাইবে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: অজ্ঞতা! অজ্ঞতা!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: স্যার, আপনি মিডিয়ায় সেভাবে আসেন না, অনেক বেশি প্রচারবিমুখ আপনি, আমরা দেখেছি যে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা আমাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলাম, আপনি উনার সাথে কথা বলতে চান নাই। এই যে স্যার প্রচারের বাইরে থাকা, এটা কি স্যার আপনার নিবিষ্ট শিল্পচর্চার কারণে, শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ করার কারণে, কেন স্যার আপনার এটা পছন্দ না?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আমি প্রচারটা ঠিক পছন্দ করি না। ভালোও লাগে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কেন স্যার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ: লাইফে অনেক অভিজ্ঞতা হইছে, তিক্ত অভিজ্ঞতা। প্রত্যাশা ছিল আরো বড় কাজ করব, আরো ভালো কাজ করব। সেটার সুযোগ হয়ে ওঠে নাই নানান কারণে। আর চিটাগাঙে থাকার কারণে আমি ঠিক কমিউনিকেশনগুলা মেনটেইন করতে পারি নাই। এখন মনে হয় যেন এই প্রচার করে আর লাভটা কী! কাজই বা কতটা করছি আর এই প্রচার করে কী হবে!
12. একটি পারিবারিক আয়োজনে, স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
চিত্র:একটি পারিবারিক আয়োজনে, স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেগুলো করেছেন সেগুলো তো একভাবে, মানে যারা আপনার পরবর্তী জেনারেশন, যারা স্টুডেন্ট, বা যারা কাজ করেই যায় তারা তো সেগুলা খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখে। বা সেগুলো নিয়ে যথেষ্ট রসোত্তীর্ণ আলোচনা আছে। তো সেই জায়গায় কি নিজেকে সফল মনে হয় না?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: সফল মানে এই কাজটা তো গ্রহণ করেছে লোকজন। এটা তো বলতে পারি। এটার গ্রহণযোগ্যতা আছে, সেখান থেকে নিজেকে কিছুটা সাকসেসফুল মনে হয় আর কি। তবে আমার এখানে ফেইলুরস আছে। আমি ম্যাটেরিয়ালসের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে চাইছিলাম। লে-আউটে যে রকম ছিল আমি ঠিক হুবহু তা করতে পারিনি। এখানে ম্যাটেরিয়াল যেমন রড, কংক্রিট– এইগুলা চিন্তা করে দেখেন একটা জায়গায় ঢালাইটা কমবেশি হইছে কিংবা ঢালাইটা আসে নাই কিংবা আরো ডিটেলস করার দরকার ছিল, সেটা আমার ইয়ে, হয় নাই আর কি, সম্ভব হয় নাই আর কি।
13. ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ও তেজস হালদার যশের সাথে
চিত্র: ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ ও তেজস হালদার যশের সাথে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এটা কি স্যার পীড়া দেয় এখন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না পীড়া দেয় না। এইটাও একটা বিউটি। এটা খদ্দরের কাপড়, এটা ঠিক কটন না। খদ্দর খদ্দরই। তো এটা কংক্রিট কংক্রিটই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, ডাকসুর এক ধরণের আমন্ত্রণে কাজটা করেছেন। আপনি যেমন বলছিলেন সোনায় সোহাগা হয়েছে, কাজটা মিলে গেছে। আপনিও ভাবছিলেন, ডাকসুও চাচ্ছিল এখানে এরকম একটা ভাস্কর্য করতে, দুইটা মিলে গেছে। কিন্তু স্যার দীর্ঘ সময় তো ডাকসু অকার্যকর। ফলে এই কাজটার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তো কোন মা বাপ নাই। মানে এই কাজটার রক্ষণাবেক্ষণে কি আপনি তৃপ্ত?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না, এইটার রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। একদম না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, এই যে সর্বশেষ আপনি যে রেনোভেশন করলেন, সেটার অর্থায়ন স্যার কারা করেছে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এটা বিশ্ববিদ্যালয়, সম্পূর্ণ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় দিছে। এটা হওয়ার সময় ডাকসু বলছিল, মতিন সাহেব বলছিলেন তোমারে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিবা। আমি এক লাখ টাকার বাজেট দিছিলাম। ডাকসু প্রকৃতপক্ষে কোন টাকা দেয় নাই।
14. ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ ও জাফরিন গুলশানের সাথে
চিত্র:ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ ও জাফরিন গুলশানের সাথে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে টাকাটা কারা দিলো স্যার?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ, এন্টায়ারটাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ঋণী। কারণ আমাকে তারা ডিউটি লিভ দিয়া আনছেন। আমার ভাইস চ্যান্সেলর আবুল ফজলুল সাহবকে চিঠি দিয়ে মতিন সাহেব আমাকে আনছেন।
18. সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ, যৌবনে
চিত্র: সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ, যৌবনে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তার মানে তখন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে ফেলছেন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: হ্যাঁ, হ্যাঁ। তখন আমাকে তারা চিঠি দিয়ে আনছেন। তো বন্ধ থাকার পর যখন সেভেনটি নাইনে আবার যখন কাজটা শুরু করলাম, তখন আবার উনি আমাকে চিঠি দিয়ে আনছেন। তখন ফজলুল আলীম চৌধুরী সাহেব ছিলেন ভাইস চ্যান্সেলর, উনি আমাদের ভাইস চ্যান্সেলর করিম সাহেবকে চিঠি দিয়ে আমাকে আনছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি আমাকে ডিউটি লিভ না দিতো তাহলে অনেক কষ্ট হইত আর কি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি জয়েন করলেন কবে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: সেভেনটি থ্রিতে আমি পরীক্ষা দিয়া আমার রেজাল্টটা তখনও হয়নি, লে-আউটটা করছি আর কি। আর সেভেনটি ফোরে রেজাল্ট হল, আমি সেভেনটি ফোরে জয়েন্ট করলাম। আমি ভালো করছিলাম, ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হয়ে গেছিলাম।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: উদ্বোধন কবে হইলো স্যার? সেই ওপেনিঙের দিনটার কথা যদি আমাদেরকে বলেন। আপনি বলছিলেন যে ছয়জন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: ছয় ছয় বারো জন। এটা করছিল তখন ডাকসু। ডাকসু তখন আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হইছে। মান্না সাহেব আর আকতার সাহেব ছিলেন, আকতার সাহেব ছিলেন জেনারেল সেক্রেটারি, মান্না সাহেব ছিলেন এটার ভিপি। উনারা এই ওপেনিংটার দায়িত্বে ছিলেন। এবং উনারা অনেক সাহায্য করছেন আর কি। অনেক সাহায্য করছেন।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যেমন স্যার? সাহায্যগুলোর মধ্যে কী ধরণের সাহায্য অন্তর্ভুক্ত ছিল?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আছে। বেশ সাহায্য করছেন উনারা।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওপেনিংটা স্যার উনআশি সালে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: ঊনআশি সালে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তারিখটা স্যার মনে আছে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আরেকটা গ্রুপ ১৪ তারিখে ওপেন করছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বুঝি নাই স্যার।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: ১৪ ডিসেম্বর ওপেন করছে।
19. সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ, পূর্ণাঙ্গ বয়সে
চিত্র: সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ, পূর্ণাঙ্গ বয়সে
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একই জিনিস?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: একই জিনিস।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে ওই সময় স্যার দুইটা গ্রুপ ছিল?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এক গ্রুপই। এক গ্রুপেরই ছোট আরেকটা গ্রুপ তারা এইটা করছে আর কি। আমি এখন আর তাদের নাম বলছি না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: তার মানে আপনার ভাস্কর্য দুই দুইবার ওপেনিং হইছে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: হ্যাঁ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই বিষয়টা যদি বলেন স্যার।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: থাক! এইটা আর বলব না। এখন অনেকে বলে তারা এইটার মডেল ছিল। এমনও হইছে তিনি ঢাকায় ছিলেন না তেহাত্তর সালে। এখন উনি বলতেছেন মডেল। তো এখানে আঠারো ফিট উঁচা, মাথা বান্ধা, এখানে উনি মডেল দেবেন ক্যামনে! এখানে দিনের পর দিন দাঁড়ায়া মডেল দেয়া সম্ভব! লে-আউট ছাড়া আমি কোন মডেল নিই নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সর্বশেষ যে প্রশ্ন স্যার, থাকেন তো স্যার বেশিরভাগ সময় চিটাগং, ঢাকায় যখন আসেন, কিংবা এমনে ধরেন আপনে হাঁটতে আসেন, এই কাজটা দেখলে আপনার কেমন মনে হয়? নিজের অনুভূতির কথা আমি জানতে চাই।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: আমি এদিকে পারতপক্ষে আসি না। আপনি প্রোগ্রাম করলেন সেই কারণে আসা। আর আমি দেখতে আসি না। কারণ আমার যে স্ট্রাগলটা গেছে, মন খারাপ হয়ে যায়। কাজটা আপনি ওপেনিঙের কথা বললেন, কাজটা আমি ভালো মতো দেখি নাই। মা প্রসব করে তার বাচ্চাটারে দেইখা পেইনটা ভুলে যায়। আমি এটার দিকে তাকাতে পারিনি। আমার উপর এতো ইয়ে গেছে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই পেইনটা কেমন স্যার? কী পেইন? এই সমস্যাগুলো কেন হল?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: এই সমস্যাগুলো হইছে, যারা অতিলোভী লোক তারা তাদের নাম চাইছেন, এখানে থাকুক। জয়েন্ট দিয়ে চাইছেন। ক্রেডিট চাইছেন। আমি দেব কেন!

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার নামও তো নাই স্যার কোনখানে?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: নামের দরকার নাই। সবাই জানে অপরাজেয় বাংলা আমি বানাইছিলাম। ঢাকসু তখন চায় নাই। নিজের নাম দেয়ার ব্যাপারে আমারও আগ্রহ নাই, ছিলোও না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: স্যার, যে রকম বাংলাদেশ চেয়েছেন সে রকম বাংলাদেশ পেয়েছেন?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্বপ্নটা কেমন ছিল?
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: স্বপ্ন ছিল আরো প্রোসপোরাস হবে, আরো ইয়ে হবে, গ্লোরিয়াস হবে, এগুলা হয়নি আর কি। এখনো তো রাজাকারদের বিচারই হয়নি। দেখা যাক কী হয়। শরীর খারাপ লাগতেছে, শেষ করো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: ইটস ওকে, শেষ স্যার। অনেক ধন্যবাদ যে আপনি আমাদের অনেক সময় দিলেন।
সৈয়দ আবদুল্লাহ্ খালিদ: থ্যাংক ইউ।

শ্রুতিলিপি সহায়তা: তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আনজাম আনোয়ার — মে ২৩, ২০১৭ @ ১০:১৯ পূর্বাহ্ন

      অসাধারন কাজ শিমুল। আমাদের শিল্পকলার ইতিহাস চিরদিন আপনার কাছে ঋণী হয়ে রইবে। আপোষহীন প্রচারবিমুখ বরেণ্য ভাস্করের জন্য আনত শ্রদ্ধা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আহমেদ কামাল — মে ২৩, ২০১৭ @ ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

      সকালটা রাঙিয়ে দিলেন শিমুল। আর্টস ও আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কষ্ট হচ্ছে, এ সাক্ষাৎকারটি খালিদ স্যার দেখতে পেলে কত যে খুশি হতেন!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হৃদয় পাল — মে ২৩, ২০১৭ @ ১:৪৭ অপরাহ্ন

      আর্টস ও এর সম্পাদককে ধন্যবাদ। দুর্লভ সব ছবিগুলি দারুন আনন্দ দিলো। সাক্ষাৎকারটাও স্বতস্ফূর্ত ও প্রাঞ্জল। শিমুল সালাহউদ্দিনকে অনেক ধন্যবাদ শিল্পীর কালের সাক্ষী হবার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খালেদ হুমায়ূন — মে ২৩, ২০১৭ @ ১০:১৭ অপরাহ্ন

      অসামান্য কাজ করেছেন শিমুল ভাই। অভিনন্দন তাকে। বড় বেশি অভিমান নিয়ে চলে গেলেন অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর।

      এত এত চলে যাওয়া! কবে যে আমরা শিল্পীদের সম্মান দিতে শিখব!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com