ফিরোজ এহতেশামের একগুচ্ছ কবিতা

ফিরোজ এহতেশাম | ১১ মে ২০১৭ ৭:০২ অপরাহ্ন

আর কোনো সংশয় নাই

Mohammed Kibriaআর কোনো সংশয় নাই
চারিদিকে নীল জলরাশি
তোমার যতটা রোশনাই
তত বুকে বেজে ওঠে বাঁশি

সুন্দর স্তনের মতো ফুলে
ফেঁপে উঠে আসে ঢেউগুলো
তোমার স্মৃতিতে উঠি দুলে
কালো চোখ আর কালো চুলও

আমাকে ঝাপটা মারে এসে
কোন ঢেউ কে বলতে পারে!
তুমি কি এখন মৃদু হেসে
দাঁড়িয়েছ খাদের কিনারে?

পাথরে নুড়িতে ঠোকাঠুকি
বালুর ওপরে কিছু লেখা
তাইতে তোমার দিকে ঝুঁকি
ডাঙা ও পানির ভেদরেখা

অনির্ণেয়, প্রেম আর ক্রোধ
একক আধারে মিশে আছে
সমস্ত ঠুনকো অবরোধ
ভেসে যায়, ঢেউয়ে ঢেউয়ে, নাচে

একাকী জাহাজ দেখি দূরে
আত্মমগ্ন, কুয়াশা-মলিন
আনন্দ-যাতনার সুরে
রাতে বাজে গুঢ় ম্যান্ডোলিন

তোমার বিরহ বয়ে এনে
কেঁদে ফেরে মাস্তুলের হাওয়া
প্রকৃত সাঁতার না-ই জেনে
হবে কি তোমার কাছে যাওয়া!

মহাজাগতিক কোনো ভুলে
অপার্থিব গন্ধ ভেসে আসে
তুমি কি খোঁপার চুল খুলে
উড়িয়েছ আমার বাতাসে?

তোমার সামনে তবু ক্ষুদ্র
তুচ্ছেরও আত্মসম্মান জাগে
আমি তো প্রস্তুত, হে সমুদ্র
ডাক দিও, যদি একা লাগে

শশব্যস্ত নগরীতে

চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই
লোকচক্ষুর আড়ালে আড়ালে
গভীর অরণ্যে কোনো অচেনা গাছের নিচে
ছায়াঘন স্নিগ্ধ জলাশয়
তাতে, পাতা আর ফুল ভেসে আছে
সবকিছু ভুলে গিয়ে সে পানিতে নেমে
আত্মমগ্ন হয়ে ধীরে ধীরে মরে যাওয়া যেত যদি
আর এই ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা দৃশ্যের ওপর
ভেসে থাকত ঝরা পাতা, ফুল
মাঝেমধ্যে দু’একটা পাখির পালক
নিত্য বহির্জগতের কাছ থেকে তারা
আমাকে সমাহিত করে দিত
অনন্তের দিকে…

শশব্যস্ত নগরীতে রাস্তা পার হতে গিয়ে
জংধরা দ্বিতল বাসের নিচে চাপা পড়ে যেতে যেতে
এই সব মনে হলো আজ…

দিগন্ত

যেনবা ধার করা জাদুর কার্পেটে
সওয়ারি হয়ে তুমি চলে গেছ
যেনবা পিছুডাক অসম্ভব

এখনও বর্ষায় লুপ্ত স্মৃতিগুলো
চমকে ফিরে আসে বিদ্যুতে
শ্রাবণ মেঘে মেঘে অসন্তোষ

প্রকারভেদে ওড়ে তোমার পাখিগুলো
কেউবা মগডালে নিমগ্ন
তাদের ঘিরে রাখে দিগন্ত


সন্ধ্যা নদীতিরে, বিকালবেলা

সন্ধ্যা নদীতিরে জাগছে চরগুলো
চরের মাটি যায় ইটভাটায়
সে ইট দিয়ে হয় আমার ইমারত
নদীর বুকে বুকে যথেচ্ছ
তুমি সে নদীতিরে, ব্যাহত নদীতিরে
বেড়াতে এসে এই বসন্তে
দেখছ কাদাখোঁচা ও পানকৌড়িটি
কেমন উদাসীন, আনমোনা
স্মৃতিতে ভারাতুর ক্লান্ত পাখা মেলে
এ-নদী থেকে আজ, ও-নদী থেকে আজ
বিকালবেলাতেই উড়ে গেল।


বন্ধু!

কুহেলিকাময়
শশব্যস্ত শহরের ফুটপাতে
মুখোমুখি হওয়ার আগেই
আমার দেহের ঠিক পাশ কেটে চলে গেলি তুই।
তোকে উদভ্রান্তের মতো দেখাচ্ছিল
আমার ছিল যে অফিস যা্ওয়ার তাড়া
তোর চোখ দুইটা চকচক করছিল
আমার যে ছিল নতুন বন্ধুদের সাথে আড্ডা
কাচাপাকা একমুখ দাড়িগোঁফে তোকে টিপিকাল
বিষণ্ন কোনো বিপ্লবীর মতো লাগছিল
আমার ছিল তো বাজারের ফর্দ আর পকেটে টাকা কম
তাই কি তোকে দেখেও দেখলাম না
এই রহস্যতাড়িত সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে,
বন্ধু!


এ মম বাংলার প্রান্তরে

এখনও জেগে আছি, রাত্রিকাল
শব্দ এসে লাগে কর্ণতে
ঝিঁঝিঁরা ডেকে যায় অনর্গল
বাতাস ছুঁয়ে যায় জানলাকে

এমন ফাঁকা মাঠ, গণ্ডগ্রাম
হঠাৎ পড়ে আছে রেললাইন
এমন ঝিঁঝিঁ-ডাকা রাত্রিকাল
ট্রেনটা চলে যায় বর্ণহীন

নানান লোক যায় ট্রেনে চেপে
ভবিষ্যত কারো কুয়াশাময়
কেউবা ফেলে আসে বর্তমান
যেনবা ভুল করে বসন্তে

ব্যপ্ত কুয়াশাকে ভেদ করে
ট্রেনটা ছুটে যায় আনমোনা
কখনও ধান ক্ষেত, দিগন্ত
আবার কখনও কি আসব না

এ মম বাংলায়, বিশ্বতে
কত যে জটাজাল, খুনসুটি
কত যে বিন্দুতে অনন্ত
ট্রেনটা ছুটে যায় দিগন্তে…

যদিও শালবনে বাতাস বয়
আমার নয় সে তো আমার নয়
গাছের পাতা নড়ে, শরতকাল
স্বপ্ন দেখে গাছ–করাত কল

এ নহে গান তব বসন্তে
যাচ্ছেতাই আর অনর্গল
চকিত হাসিমুখ ভেসে ওঠে
সূর্য ডুবে যায় দিগন্তে

জীবনে দেখা হলো রক্তরাগ
তোমার চোখে আর প্রকৃতিতে
তাই কি জাগতেছে ফুলে পরাগ
এ নহে গান মোর বসন্তে

এরূপ সংগীত কেন বাজে
উত্তরের কোনো দখিন নাই
পূর্ব থেকে রাগ প্রকাশিছে
অনর্গল আর যাচ্ছেতাই

এদিকে রাত কাটে আতঙ্কে
ঝঞ্ঝাহত কোনো জাহাজ ওই
ডুবতে ডুবতেও ডুবল না
আর্তচিৎকার যাত্রীদের

বহন করে নিয়ে বাতাস বয়
গভীর রাত্রির বন্দরে
উড়ছে ডানা মেলে শঙ্খচিল
এ মম বাংলার প্রান্তরে


যুগলবন্দি

প্রচণ্ড বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে জানালার কাচে
আর আমি ঘরের ভিতর টুংটাং শুনি জলতরঙ্গ
শনশন করে পাতা, উপ্রে যাচ্ছে গাছ, শেকড়সমেত
এদিকে বাজছে এস্রাজ আর সানাইয়ের যুগলবন্দি
কোথাও চিৎকার, আকাশ বিদীর্ণ করা মর্মন্তুদ আর্তনাদ
এরই ফাঁকে লহর বইয়ে দিচ্ছে তবলাবাদক
তীব্রতর উলুধ্বনি, শাঁখের আওয়াজ
আল্লাহু আকবর বলে মুয়াজ্জিন দিচ্ছে আজান
শোনা যাচ্ছে আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের
অভূতপূর্ব কোনো গান।

ছেলেটি

যেন এই আলো রাতের পাহারাদার
যেন এই বায়ু দূর হতে আসিয়াছে

কবিতা হারানো কাঁদো কাঁদো মুখ- এ ছেলেটি তবে কার
ভূতুড়ে আলোয় নদীতীরে বসে আছে?

কখনও কি সেও নীল ছবি দেখেছিল
দরজা কিংবা বেড়ার ফোকর দিয়ে?

বাঁকা করা গ্রীবা, গ্রীবায় একটি তিলও
ছেলেটি দেখেছে বন্ধুকে সাথে নিয়ে?

২.
আজ তবে ফাঁস হোক সকল গোমর
পাত্র হতে ছলকে ওঠে পানি
পার্শ্ব সংঘর্ষে মাতে কোমরে কোমর।

৩.
দেখে সমরাস্ত্র তোর
বাজে প্রণয় সঙ্গীত
ওঠে রক্তে কলোরল
নাচে শান্ত জলধি

যাবে যে চলে যাবার
তবু তার কাছে গিয়ে
বলি যা আছে বলার
চলো বিদেশ বিভুইয়ে

একি তোমার চিঠিই
পড়ে আছে কার ঘরে
সে কি এখনও সেরূপ
কথা কয় মৃদু স্বরে

অতি দূর পৃথিবীতে
জেগে বসে আছ একা
ঢেউয়ে ভাসা তরনীকে
হলো বাঁকা চোখে দেখা

গাঢ় দিগন্তরেখায়
জাগো ঘোর সন্ধ্যাবেলা
দেখো তোমার শৈশব
সেথা করতেছে খেলা

এই তিল ধারণের
যদি কোনো গাত্র পাই
তবে চিবুকের নিচে
এঁকে রেখে যাব ভাই

তুমি সেই স্মৃতিটিকে
স্বপ্নে বহ আজীবন
আমি অভিশাপ দিই
যেন আমার মরণ

হয় তোমার পাশেই।
হয় তার অগোচরে…

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (16) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আল মামুন — মে ১১, ২০১৭ @ ১০:৩৩ অপরাহ্ন

      সুন্দর শব্দ চয়ন ও সার্থক ভাবের একগুচ্ছ কবিতা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — মে ১২, ২০১৭ @ ১:০৫ পূর্বাহ্ন

      কী সুন্দর সব কবিতা! অভিনন্দন ফিরোজ ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গনী আদম — মে ১২, ২০১৭ @ ৩:৪১ অপরাহ্ন

      ভালো লাগলো, খুব ভালো, প্রথম কবিতাটি। অনেক দিন পর একটি পরিণত কবিতার সাক্ষাৎ পেয়েছি মনে হলো।

      আমি অন্ত্যমিলের কবিতা ভালোবাসি, কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় মিল বজায় রাখতে গিয়ে অপ্রসঙ্গ বা বেমানান কিছুর আমদানি ঘটে যায়। “আর কোনো সংশয় নাই” এ থেকে মুক্ত, আগাগোড়া একক ভাবটি ধরে রেখে দারুণ ছন্দোময়।

      এরপর বলা যায় ‘ছেলেটি’র কথা। এটিও চমৎকার কবিতা।

      আগে বোধহয় পড়িনি আপনার কবিতা… নাকি পড়েছি? মনে করতে পারছি না।

      মাভৈঃ ফিরোজ এহতেশাম।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Iman Ruhi Ruhin — মে ১২, ২০১৭ @ ৯:৩২ অপরাহ্ন

      কবি,আপনাকে অভিনন্দন ও ভালোবাসা জানাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — মে ১৩, ২০১৭ @ ২:৪৫ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ আল মামুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — মে ১৩, ২০১৭ @ ২:৪৬ পূর্বাহ্ন

      শিমুল, অনেক ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — মে ১৩, ২০১৭ @ ২:৪৮ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ গনী আদম। মনে হয় আমার কবিতা আগে পড়েন নাই। পড়লে তো মনে থাকত :)

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — মে ১৩, ২০১৭ @ ২:৫০ পূর্বাহ্ন

      Iman Ruhi Ruhin আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুনতাসীর — মে ১৭, ২০১৭ @ ৮:০৮ পূর্বাহ্ন

      প্রতিটা কবিতাই অনেক ভালো লাগলো।
      বিশেষ করে প্রথম ও শেষটি। প্রথম কবিতা “আর কোনো সংশয় নাই” এর এই লাইনগুলি সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার- “তোমার সামনে তবু ক্ষুদ্র
      তুচ্ছেরও আত্মসম্মান জাগে
      আমি তো প্রস্তুত, হে সমুদ্র
      ডাক দিও, যদি একা লাগে”
      কবি ফিরোজ এহতেশামের জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশাফা সেলিম — মে ২৪, ২০১৭ @ ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

      ভালো হয়েছে তোমার কবিতাগুলো ফিরোজ। ঠিক আগের মতোই। এ যেন স্বাভাবিক, তোমার হাতে। ভালো হোক আরো। আরো ভালো ভালো…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আতোয়ার হোসেন — জুলাই ১, ২০১৭ @ ১০:১৬ পূর্বাহ্ন

      পড়লাম।
      শুভকামনা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — জুলাই ৪, ২০১৭ @ ২:০৮ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ মুনতাসীর, আপনার আন্তরিক প্রতিক্রিয়ার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — জুলাই ৪, ২০১৭ @ ২:১০ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ আশাফা সেলিম ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফিরোজ এহতেশাম — জুলাই ৪, ২০১৭ @ ২:১০ পূর্বাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ আতোয়ার হোসেন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিল্লাল মেহদী — সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭ @ ৯:৩৮ পূর্বাহ্ন

      ‘আর কোনো সংশয় নাই’, ‘শশব্যস্ত নগরীতে’ ও ‘ছেলেটি’ অদ্ভুত ভালো লাগার কবিতা সকল।
      ফিরোজ এহতেশাম আমার পছন্দের কবিদের একজন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com