আন্ত:ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনধারণ

ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় | ১০ মে ২০১৭ ১০:১৯ অপরাহ্ন

buddhaশুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা বিশ্ববৌদ্ধদের সবশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। এ দিবসটি বিশ্ববৌদ্ধদের নিকট পবিত্র ও মহিমান্বিত দিন। ভগবান বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার বিশাখা নক্ষত্রে রাজকুমার সিদ্ধার্থ রূপে কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ব্দ্ধু বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে আলোকপ্রাপ্ত অর্থাৎ সর্বতৃষ্ণার ক্ষয় সাধন করে বোধিজ্ঞান লাভ করে জগৎ পূজ্য বুদ্ধ হয়েছিলেন। বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনে মহাপবিত্র ত্রি’স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের নিকট অতি গৌরবের ও মহাপবিত্র দিন হিসেবে উদযাপিত হয়। শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার আলোকে শান্তি, সম্প্রীতিতে মানুষ বসবাস করতে পারে সে বিষয়ে কিছু আলোচনা করা হলো।

শুধু বিশেষ আকার বা একটি কাঠামোর জন্য মানুষ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হন না। মানুষ হিসেবে আমাদের রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিশেষ একটি গুণ যার ধর্ম হলো যেকোনো বিষয়ে আমাদের আমার বিচারিক ক্ষমতা বা মূল্যায়নের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও পূর্বে এ ভূভাগে জন্ম নেয়া তথাগত বুদ্ধ দাবী করেছিলেন সর্ব জীবের স্ব স্ব স্থানে স্বাধীন অবস্থান। শুধু মাত্র মানুষের জন্য নয় তাঁর মৈত্রী ভাব পৌঁছে গিয়েছিলো দৃষ্টিগোচর হয় এবং দৃষ্টিগোচর হয় না এমন সকল প্রাণীর কাছে। তাই তো তিনি বলেছিলেন “সব্বে সত্ত্বা সুখিতা হোন্তু” অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বোধের অমৃত অবগাহন হলে প্রাজ্ঞদের সকলে স্বীকার করেন, জাতপ্রথা, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বিভাজন নিষ্ফল, নিরর্থক! বোধের বাতায়ন রুদ্ধ থাকার দরুন অন্ধ প্রকোষ্ঠে মানুষ মানুষের সাথে, ধর্ম ধর্মের সাথে, গোত্র গোত্রের সাথে, পিতা পুত্রের সাথে, পুত্র পিতার সাথে, ভাই ভাইয়ের সাথে, বন্ধু বন্ধুর সাথে নানান স্বার্থের বশে কলহরত। মহান বুদ্ধ বলেন: কলহে জর্জরিত অন্ধ মানুষ জানে না, সে নিজেই যেখানে নিজের নয়, অন্যকে অধীনে, হাতের মুঠোতে বশ করতে চায় কি করে? বুদ্ধের শিক্ষা বা দেশনা পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায়, জীব মাত্রেই স্বাধীন। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিয় ও ধর্মীয়ভাবে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সকলেই স্বাধীন অংশগ্রহণ, স্বতন্ত্র জীবন যাপনের অধিকার রাখে। এখানে কোন প্রকার বৈষম্য দেখা দিলে তা বুদ্ধধর্মের পরিপন্থি বলেই গন্য হবে।

মানুষ হিসেবে আমাদের বাড়তি কিছু সুযোগ সুবিধা রয়েছে ….. শুধুমাত্র আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করাই নয়, অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের প্রতি সবিশেষ মনোযোগ, সৎ ও নিষ্ঠার সাথে পালনীয়। সর্বজীবের প্রতি মানবিক কর্তব্য পালনের জন্য কারো নির্দেশের অপেক্ষায় থাকাটাও অনেক সময় অমানবিক। আমরা মানুষ হিসেবে, মানুষের গরজে মঙ্গলকর কর্তব্য পালন করবো এটা মা, মাটি মানুষের ধর্ম, এটা জগত ও জীবের প্রকৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ ধর্ম। আমরা স্মরণ করতে পারি, এ বিষয়ে তথাগত বলেছেন: “মা” যে-ভাবে সকল আপদ-বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে বুকে জড়িয়ে রাখে, রক্ষা করে তোমরাও সেইরূপ মৈত্রীভাবে সকল জীবের প্রতি পোষণ করিও।’

বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত জনবহুল একটি দেশ। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ আমাদেরও এই মাতৃভূমি। নাতিশীতোঞ্চ আবহাওয়ার কারণে আমাদের সামগ্রিক অবস্থায় বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ঐতিহাসিক ভাবে যদি দেখি বৌদ্ধরা কখনো ধর্মীয় উম্মাদনায় আস্থাশীল নয়, তারা জ্ঞানের বাহনে চড়ে এ জীবন যাপন করতে আগ্রহী। এ দেশ চারশত বছর বৌদ্ধরা শাসন করে (পাল রাজাগণ) যাকে ঐতিহাসিকগণ বাংলার স্বর্ণযুগ বলেই মত দেন। পালদের রাজত্বকালে সকল ধর্মের সহাবস্থান বাংলার যে-কোন সময়কে স্থান করে দিয়ে আজো সোনার মত ঔজ্জ্বল্য ছড়াতে থাকে। আমরা বুদ্ধের এ কথা কখনো ভুলি না যে কর্ম সু ও কু ফলদায়ী, যার যার কর্ম স্ব স্ব অবস্থানে ভোগ করবে। জীব মাত্রেই কর্মের অধীন। এমতাবস্থায় আমরা বিশেষ ধর্মের বাণী অথবা ব্যক্তিগত মতামত জোর করে, প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কারো উপর প্রতিষ্ঠা করতে পারি না। প্রত্যেকেই নিজের মত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রাখে যা মতামতের ভিত্তিতে খণ্ডনও করা যায়। আমি যেরূপ আমার নিজের মতো মতপ্রকাশ করতে পারি, করতে চাই অন্যেরও ঠিক একই ভাবে তার মতো করে মতপ্রকাশ করার একান্ত স্বাধীনতা শতভাগ রয়েছে। জ্ঞানদৃষ্টি বা মানবিক দৃষ্টিকোণ, যেখান থেকেই বলি না কেন দেখা যাচ্ছে যে, ধর্ম বা মতবাদ মানা না মানা ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছার উপর নির্ভর করে কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান নিরাপদ, সুনিশ্চিত করতে হবে।

ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ছাড়াও এই ছোট্ট দেশটিতে রয়েছে নানা দেব-দেবীতে বিশ্বাসী অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী যাদের প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, জীবনাচরণ ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সংখ্যালঘু এসব সম্প্রদায় সেই প্রাচীন কাল থেকেই মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। মসজিদ, মন্দির, বিহার, গীর্জার পাশাপাশি উপাসনালয় রয়েছে নানা ধর্মবিশ্বাসীদের। হিন্দুর মন্দিরের শাঁখ কিংবা কাসর ঘন্টার আওয়াজ যেমন কখনো অন্যান্য ধর্মের লোকের কানে বেসুর ঠেকেনি তদ্রূপ মুসলিমদের ইবাদত, বন্দেগী, আযানের ধ্বনিও ভিন্ন মতালম্বীর কানে বিকট ঠেকেনি। বৌদ্ধদের বন্দনা গীতি, খ্রীস্টানদের ভজনা ও প্রার্থনা যে কাউকেই প্রীত করে। পীড়িত করে এসবের মাঝে যখন অপ্রত্যাশিত ভাবেই ঐক্যতানে ছেদ পড়ে তখন আমরা বিপন্ন বোধ করি।
আমাদের ভুলে গেলে উচিৎ হবে না, এদেশের মানুষের কাছে নানান ধর্ম ও মতবাদ আসার আগেও আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলো, আমরা তাদেরই উত্তরাধিকারী হয়ে ধর্ম ও মতের বিভক্তিতে রক্ত আর সংস্কৃতির বিচ্ছেদ করতে পারি না। এটা যথাযোগ্য অনুধাবন না করতে পারলে কোন জাতি সে যতই সমৃদ্ধশালী হোক না কেন, সময়ের পরিক্রমায় ধ্বংস তার অনিবার্য।

সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনধারণ: বৌদ্ধধর্ম

ধর্মপদে বুদ্ধের উপদেশ “যে কেউ সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোনো বিরোধ মীমাংসা করলে সেটি অন্যায় হবে। জ্ঞানীরা কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ সেটা গভীর ও শান্তভাবে বিবেচনা করে দেখেন। যিনি অহিংস উপায়ে, সুন্দর পথে অন্যদেরকে পরিচালিত করেন তাকে সত্য, জ্ঞান ও ন্যায়ের অভিভাবকরূপে গণ্য করা যায়।” (ধম্মপদ, ২৫৬-৫৭)
“অতি মূল্যবান পোশাকে সজ্জিত না হয়েও যিনি শান্ত, সমাহিত, সৌম্য, সংযমী, আত্মনিয়ন্ত্রিত, পবিত্র জীবনাচারী, সুপ্রতিষ্ঠিত, অহিংস নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী, মৈত্রীময় জীবন যাপনে অভ্যস্ত ও সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী-করুণাভাব পোষণকারী তিনিই প্রকৃতপক্ষে পূত-পবিত্র-ত্যাগী; তিনিই প্রকৃত ভিক্ষু- প্রকৃত সন্ন্যাসী তিনিই ।” (ধম্মপদ, ১৪২)

মৌমাছি যেভাবে ফুলের রঙ ও সুগন্ধের কোনোরূপ ক্ষতি না করে মধু আহরণ করে জ্ঞানী সজ্জন ব্যক্তিরাও সেভাবে অপরের অনিষ্ট না করে আশেপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলে এবং সবার সেভাবে চলা উচিত (ধম্মপদ, ৪৯)

একদিন এক ভিক্ষু বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভন্তে, কার মেধা দিনে রাতে বৃদ্ধি পায়? কে ধার্মিক, কে পুণ্যবান বা পুণ্যবতী যে স্বর্গে গমন করতে পারে?” বুদ্ধ উত্তর দিলেন-যে সকল লোক গাছ লাগায়, কুঞ্জবন তৈরি করে, উদ্যান সৃষ্টি করে, সেতু নির্মাণ করে, পুকুর খনন করে, মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করে ইত্যাদি তাদের মেধা দিন দিন বিকশিত হয়-এসব ধার্মিক লোকেরা স্বর্গে যায়। (বনরোপা সূত্র)

ঘৃণা, বিদ্বেষপূর্ণ কথা, প্রতিহিংসা ও আত্ম-বিশ্লেষণের গুরুত্ব: বৌদ্ধধর্ম

“তারা আমাকে অপমান করেছে; আমাকে আহত করেছে; আমাকে পরাজিত করেছে; তারা আমাকে প্রতারিত করেছে-যার চিন্তার মধ্যে এগুলো স্থান পেয়েছে তার মন থেকে কখনো বিদ্বেষ দূরীভূত হবে না, তার মনের ক্লেশ-দ্বেষ কখনো শেষ হবে না। তারা আমাকে অপমান করেছে; তারা আমাকে আঘাত করেছে; তারা আমাকে পরাজিত করেছে; তারা আমাকে প্রতারিত করেছে-এ ধরনের চিন্তা যারা মনে স্থান দেয় না তাদের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা চিরতরে দূরীভূত হয়ে যাবে। হিংসা- বিদ্বেষ-ঘৃণা দ্বারা কখনো ঘৃণা-বিদ্বেষ জয় করা যায় না। ঘৃণা-বিদ্বেষ উপশম হয় মৈত্রী দ্বারা। এটাই শাশ্বত নিয়ম। (ধম্মপদ)

অন্যকে দোষারোপ করে কটূ বাক্য, অন্যকে অপমান করে বিদ্রুপাত্মক বা দম্ভাত্মক বাক্য বর্ষণ- এ ধরনের আচরণে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা উৎপন্ন হয়। এখান থেকেই দ্বদ্ব-সংঘাত উৎপন্ন হয়; এভাবেই মানুষের মনে বৈরী চিন্তা ও মনোভাব তৈরি হয় (ধম্মপদ, ৮)

“অন্যের দোষ ধরো না, অন্যের ছিদ্র অন্বেষণ করো না, অন্যেরা কোনটা করেছে বা করে নি-সেটা দেখো না, তুমি নিজে কোনটা করেছ বা করো নি সেটা বিচার করো।”(ধম্মপদ, ৪.৭)

নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি ভাল বা অন্যের চেয়ে বেশি হীন বা অন্যের সমান এরকম কাউকে মনে করতে দিও না; অনেক মানুষের দ্বারা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে কারো সামনে নিজেকে জাহির করতে দিও না। (সুত্ত নিপাত, ৯১৮) বুদ্ধ বলেছেন, “কোনো নির্দিষ্ট মতের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়া বা বেশি সংশ্লিষ্ট হওয়া এবং অন্যের মতকে হীন হিসেবে অবজ্ঞা করাকে জ্ঞানীরা মনের সংকীর্ণতার বেড়াজালে আবদ্ধতা বলেন।” (সুত্ত নিপাত ৭৯৮)

বুদ্ধের সাথে একবার পরম বিত্তশালী ব্যক্তি উপালির সাক্ষাৎ হয়েছিল। উপালি ছিলেন অন্য ধর্মের অনুসারী। উপালি বুঝতে পারেন নি বুদ্ধের সাথে কীভাবে আচরণ করতে হবে। তখন বুদ্ধ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, অন্যান্য সকলের সাথে যেভাবে ব্যবহার করেন তাঁর সাথেও ঠিক একইভাবে ব্যবহার করবেন। সারা জীবন ধরে বুদ্ধ মানুষকে সকল ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও।
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com