দেবত্বের পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী | ১৭ মে ২০১৭ ১০:৫০ পূর্বাহ্ন

farseem-2ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি ইতিমধ্যে একজন কৃতবিদ্য অধ্যাপক এবং স্বনামধন্য লেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর পূর্বতন গ্রন্থ সেপিয়েন্স এরই মধ্যে পৃথিবীর চল্লিশটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, এমনকি বাংলা ভাষায়ও এর অনুবাদ প্রকাশের পথে। সে গ্রন্থটিতে মানবজাতির একটি পূর্বাপর ইতিহাস গ্রন্থিত হয়েছে। শুধু মানুষ বা মানুষের সভ্যতার উদ্ভব ও ক্রমবিকাশই নয়, ১৩৮০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্ব-সৃজনের মাহেন্দ্রক্ষণ থেকে আরম্ভ করে মানবসভ্যতার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে ঐ গ্রন্থে। মানুষের ক্রমবিকাশের এক চমৎকার ইতিকাহিনি ঐ গ্রন্থে পাওয়া যায়। উপরন্তু হারারি’র লেখার ঢঙটি এতো মজাদার এবং রসে টইটম্বুর যে বিজ্ঞানের কথাবার্তার মাঝেও তিনি ঠাট্টা-বিদ্রুপ এবং সমকালীন ভাষিক বিভঙ্গ ভালোই ব্যবহার করেন। তাঁর গদ্য ঝরঝরে, একটানা আনন্দের সাথে পড়ে ফেলা যায়। বিজ্ঞানের কথা, অথচ কী সুন্দর ভঙ্গিতে বলে চলেছেন তিনি। মাঝে মাঝে বিদ্রূপ ঠেসে দিয়েছেন, এমনসব বাক্য ব্যবহার করেছেন যা দীর্ঘ অনুধাবন ছাড়া সম্ভব নয়।

border=0২০১৫ সালে তিনি আরেকটি গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন। এটি হোমো ডেউস: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টুমরো। পূর্বোক্ত গ্রন্থটি যদি হয় মানুষের ‘মানুষ’ তথা হোমো সেপিয়েন্স হয়ে উঠার গল্প, এই গ্রন্থে সেই সেপিয়েন্সের দেবতা হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছেন। একুশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যেসব অভাবনীয় উন্নতি এবং অগ্রগতি আমরা দেখি, তার আলোকে মানুষের দেবত্ব প্রাপ্তির গল্পই হোমো ডেউসের মূল প্রতিপাদ্য।

বইটি শুরু হয়েছে ‘দ্য নিউ হিউম্যান এজেন্ডা’ দিয়ে। তৃতীয় সহস্রাব্দের এই সময়ে মনুষ্যত্বের তিনটি অর্জনকে তুলে এনে আলোচনা শুরু করেছেন হারারি। হাজার বছর ধরে মানুষের সভ্যতা দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে। যুগে যুগে ফসলহানী, মড়ক, অতিবন্যা, অতিবৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শস্যহানী ঘটেছে। এ সব কারণে কোথাও কোথাও খাদ্যভাব দেখা দেয়। এখনও, এই একুশ শতকেও, আমরা জানি আফ্রিকার কোথাও কোথাও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। খাদ্যভাব দেখা দিতে পারে যুদ্ধাবস্থার কারণে, অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক সঙ্কটের দ্বারা সৃষ্ট অবরোধের ফলে। কিন্তু ব্যাপক আকারের দুর্ভিক্ষ এখন আর দেখা যায় না। একইরকম ভাবে এমন সময়ও ইতিহাসে আছে যে মহামারীর আঘাতে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়েছে। লোকালয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, সভ্যতার পতন ঘটেছে, শরণার্থীদের মিছিল চলেছে এই মহামারী ও সংক্রামক ব্যাধির কারণে। চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতির কারণে আজ মহামারী প্রায় নিয়ন্ত্রিত – এ কথা বলা যায়। গুটিবসন্ত, যক্ষ্মা, কলেরা ইত্যাদি সংক্রামক মহামারী পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন খুব স্বল্প পরিসরে এবং দুর্বল সংক্রমণে যক্ষ্মা ও কলেরা দেখা যায়। গতবছর আফ্রিকায় এবোলা সংকট অত্যন্ত সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো দেখা যায় পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে সারস্‌/বার্ডফ্লু নামের রোগ ছড়িয়ে পড়ে। আধুনিক জেটপ্লেনের কল্যাণে এই ব্যাধি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বার্ডফ্লু’র কারণে একটি শহর পরিত্যক্ত হয়েছে এমন কথা শোনা যায় না। ফলে তৃতীয় সহস্রকে মানুষ মহামারীর ভয়াবহতা জয় করেছে। ওদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা পৃথিবী থেকে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও মধ্যযুগের মতো যুদ্ধমানতা থেকে, সার্বক্ষণিক ডাকাতির ভয় থেকে, মগ ও বর্গীসদৃশ দস্যুতা থেকে মুক্তি এসেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য একটি সার্বকালিক মাথাব্যথা। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আজো সুদূর পরাহত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খুব বড় কোনো যুদ্ধ পৃথিবীদেখেনি। চমকপ্রদ বিষয় হলো, ঠান্ডাযুদ্ধের সময়কালে আমেরিকা ও রাশিয়া যে হাজার হাজার অ্যাটম বোমা বানাল তার একটিও ফাটানোর প্রয়োজন পড়েনি, অন্তত আজো। হারারি জানিয়েছেন, ২০১০ সালে সশস্ত্র হামলা ও সন্ত্রাসীদের হামলায় ৭,৬৯৭ জন মারা গেছেন; অথচ সারা পৃথিবীতে স্থূলতা এবং তজ্জনিত রোগে মানুষ মরেছে ৩০ লক্ষ। কাজেই কোকা-কোলা এবং চিনির তুলনায় সন্ত্রাসীর গুলি-বোমা নিতান্তই অকার্যকর। হারারি, পিঙ্কার প্রমুখ গবেষকবৃন্দের একাধিক গবেষণায় তথ্য সহকারে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছে- অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে যুদ্ধজনিত মৃত্যু অনেক কম। ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত মেদবহুল খাদ্য, মৎস্য-মাংসাদি ইত্যাদিতে মানুষ এখন অনেক বেশী মারা যায়। কাজেই দুর্ভিক্ষ, মহামারী ও যুদ্ধজনিত মৃত্যুহার এই সহস্রকে অনেক কমে গেছে, একদম শূন্য না হলেও। আধুনিক মানুষ সকালে উঠে এটা এখন আর ভাবে না যে সে কোন অসুখে পড়বে বা কোন সন্ত্রাসীর গুলিতে মরবে। সে ভাবে, আজকে ফ্যাটি খাবার কীভাবে এড়ানো যাবে কিংবা আজকের শরীরচর্চা কীভাবে কখন সারবে, কিংবা দিনের হাফ-ডজন মিটিং সামলে সন্ধ্যের ডেটিং সম্ভব হবে কিনা। তাই এই সহস্রাব্দে মানুষের চ্যালেঞ্জ মৃত্যুঞ্জয়ী হওয়া। অমরতা, অনন্ত সুখ এবং দেবত্ব অর্জনের প্রক্রিয়ায় মানুষ তৃতীয় সহস্রাব্দে ব্যস্ত থাকবে। আর এই কাজে মানুষের সার্বাধিক সহায়-জেনেটিক কৌশল, বায়োটেকনোলজি, ন্যানো প্রযুক্তি, রিজেনারেটিভ মেডিসিন, বিগডেটা, আর্টিফিসাল ইন্টোলিজেন্স ইত্যাদি।

এইরকম একটা বিপ্লবোন্মুখ পরিস্থিতিতে মানুষের গত দশ হাজার বছর পরিক্রমার একটি সালতামামি এঁকেছেন হারারি। যদিও মনুষ্যবিকাশের এই পর্বটি বিশদে তাঁর পূর্বতন গ্রন্থ সেপিয়েন্স-এ আঁকা হয়েছে, হোমো ডেউস বইয়ে লেখক গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষির আবির্ভাব, তৎপরবর্তী সভ্যতার বিকাশ এবং তজ্জনিত সামাজিক প্রয়োজনের অংশ হিসেবে ধর্মবিশ্বাসের ক্রমবিকাশে। এই মানবমুখী ‘অ্যান্থ্রোপোসিন’ পর্বে কৃষিবিপ্লব যদি ধর্মকে পুনর্জাগরিত করে থাকে, তাহলে ৪০০ বছর আগে গ্যালিলেও’র সময় থেকে শুরু হওয়া জ্ঞানজগতের বিপ্লব থেকে জন্ম নিয়েছে নব্য মানবতাবাদ। এই মানবতাবাদী ভাবজগতে মানুষই মুখ্য। আমি কী ভাবলাম, আমার ‘মন’ কী বলল, হৃদয় কী চাইল- সেটাই মুখ্য। বাহ্যিক সমস্ত তথ্য যদি উল্টো কথাও বলে, যদি রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েও থাকে, তবু মন যদি চায় দুইপ্লেট দই-রসগোল্লা খেতে, তবে তাই খাওয়া হোক। ‘হিউম্যান স্পার্ক’ বলে কথা! এই ভাবনার বশবর্তী হয়ে মানুষে মানুষে সখ্যতা বাড়ে, করপোরেশন তৈরি হয়, কোঅপারেশন বাড়ে, সম্পর্ক ভাঙ্গেও। তবু এই মানবীয় সখ্যতাই মানুষকে মহাশূন্যে স্পেসশিপ পাঠাতে সাহায্য করেছে, গুগল-মাইক্রোসফটের মতো বড় করপোরেশন নির্মাণ করেছে। অনেক মানুষের মাথা একত্রে কাজ না করলে পরমাণু ভেঙ্গে তার একেবারে অন্দরমহল থেকে শক্তি বের করে আনা সম্ভব ছিল না। মানুষে মানুষে সখ্যতা শীতল গাণিতিক যুক্তি অনুসরণ করে না, করে উষ্ণ সামাজিকতার রীতিনীতি।

এই মানবমুখী সামাজিকতা নির্ভর করে এবং বেড়ে ওঠে নানান আইডেন্টিটির ওপর ভিত্তি করে। ধর্ম পরিচয়, কৌম পরিচয়, ভাষিক গোষ্ঠিতা, জাতীয়তা, রাষ্ট্র পরিচয়, আত্মীয়তা ইত্যাদির ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচয়। আত্মপরিচয়ের এই সকল সূত্র গাঁথতে প্রয়োজন হয় নানান কাহিনির। এইজন্য দেখা যায়, শৌর্য বীর্য গাথা এবং মহাকাব্যের কদর বহুকাল ধরেই মানুষের সমাজে স্বীকৃত হয়ে আছে। মানুষের বিকাশে ফিকশন বা কথনসাহিত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ৬০ কি ৭০ হাজার বছর ধরেই মানুষ কথা বলে চলেছে, কাহিনি নির্মাণ করেছে। কথা বলতে বলতেই তৈরি হয়েছে মানুষে মানুষে সখ্যতা, তৈরি হয়েছে পরিবার, তারপরযূথবদ্ধ কৌম, সমাজ, গ্রাম, নগর, রাষ্ট্র। এই সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান টেকসই করার জন্য দরকার ঐক্যমূলক কথনশিল্প। কথা ও কাহিনি মানবেতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মহাকাব্য, কবিতা, গাথা, মিথ, স্ক্রিপচার, ঐতিহ্য, সামাজিক ধারা- এসবই এই কথনসাহিত্যের সম্প্রসারিত ফর্ম। আর এই অভূতপূর্ব সক্ষমতা কেবল হোমো সেপিয়েন্সই ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। হারারি তাদের ‘কথকঠাকুর’ বা ‘স্টোরিটেলার’ অভীধায় নন্দিত করেছেন।

হারারি মানবেতিহাসকে বিজ্ঞান ও মানবতাবাদের মধ্যকার এক চুক্তি বা সমঝোতার মাধ্যমে দেখাতে চান। আধুনিক সমাজ মানবমুখী কিছু ডগমাকে তুলে ধরে এবং প্রত্যাশা করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এই আপ্তবিশ্বাসগুলোকে লালন করুক। তিনি মনে করছেন, একুশ শতকের পর এই সমঝোতা ভেঙ্গে পড়বে। তিনি বলেছেন, “আধুনিকতা একটি সমাঝোতা”। এই সমঝোতার ফলে মানুষ বোধগম্যতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিংবা জীবনের মানে খোঁজাকে বাদ দিয়ে সক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরে। আধুনিক-পূর্ব মানুষ ক্ষমতা চায়নি, চেয়েছে বোধগম্যতা, চেয়েছে মানে, চেয়েছে গুরুত্ব। সে মনে করত তার জীবনের একটা লক্ষ্য আছে, একটা উদ্দেশ্য আছে, কোনো একটা মানে আছে। সে একটা কসমিক ড্রামার অংশ। আধুনিক কাল কোনো নাটকে আস্থারাখে না, সেখানে কোনো নির্দেশক নেই, কোনো স্ক্রিপ্ট নেই। এখানে ধারাভাষ্য একের পর এক তৈরি হয়, কোনো পূর্বলক্ষ্য বা সমাপ্তি ছাড়াই। হারারি’র বিদ্রুপ লক্ষ করুন,
“যেহেতু কোনো স্ক্রিপ্ট নেই, তাই মানুষ কোনো মহানাটকের নটবর হতে পারে না। সাংঘাতিক সব ঘটনা আমাদের ওপর ঘটতে পারে, কিন্তু আমাদের বাঁচানোর জন্য কেউ নেই, আর আমাদের দুর্দশাও অর্থহীন। ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’, কিংবা খারাপ সমাপ্তি বলে কিছু নেই, আসলে কোনো সমাপ্তিই নেই। ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকে, ঘটে যায়। আধুনিক জগৎ উদ্দেশ্যবিহীন, এখানে শুধু কারণ আছে, লক্ষ্য নেই, অর্থ নেই। মডার্নিটির যদি কোনো স্লোগান থাকে, তা হলো ‘শিট হ্যাপেন্স’!”

farseem-3লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীন এই আধুনিকতার জন্য হারারি তৈরি করেছেন ‘আধুনিক সমঝোতা’, ‘দ্য মডার্ন কাভনেন্ট’। আধুনিকতা মানুষের সামনে তিনটি সম্পদ তুলে ধরে-কাঁচামাল, শক্তি, জ্ঞান। এই নতুন সম্পদশীলতা মানুষকে বিকল্প ভবিষ্যতের কথা বলে। নতুন ভাগ্য তৈরির কথা বলে। এইজন্য হারারি হিউম্যানিস্ট রিভোলুশনের কথা বলেন। এই বিষয়ে তাঁর এক বিশদ ন্যারেটিভ আছে।

আধুনিক মানবতাবাদী ভাষ্যের এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটে উদারনৈতিক ধ্যান ধারণার মাধ্যমে। উদারনৈতিকতা বা লিবারালিজম হাল আমলের এক দারুন ফ্যাশন, কেননা মানবতাবাদের রাজনৈতিক ভাষ্য লিবারালিজমের মাধ্যমে রূপায়িত হয়। এইজন্য দেশে দেশে উদারনৈতিক দলের এতো বাড়বাড়ন্ত। লিবারাল চিন্তাভাবনার মূল কথা সেই ‘মানুষ ভজো’। মানুষ যা ভাবে, যা মনে করে- সেটাই মুখ্য। তার স্বাধীনচিত্ত যা চায় সেটাই করা উচিত। কিন্তু মানুষের কি স্বাধীন চিত্ত আছে? বিজ্ঞান কী বলে?

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের মূলকথা হলো আমাদের সকল চিন্তাভাবনা, সকল কর্মকান্ড, সকল ইচ্ছার মূলে থাকে কোনো না কোনো নিউরনের সক্রিয়তা, একগুচ্ছ নিউরো-ট্রান্সমিটারের আদান-প্রদান, কিছু রাসায়নিক মিশ্রণের লেনদেন, আয়নপাম্পের পর্যাবৃত্ত অ্যাকশন ইত্যাদি। বিলিয়ন সংখ্যক নিউরনের ট্রিলিয়নসংখ্যক সংযোগ মস্তিষ্কের ভেতরে যে বৈদ্যুতিক আলোড়ন সৃষ্টি করে সেটাই আমরা ‘কনশাসনেস’ বলে জানি। এটি একটি হয়ে ওঠা প্রক্রিয়া- এমার্জিং প্রপার্টি। কাজেই, হারারির ভাষায়:
“উদারনৈতিকতার মধুর ভাষ্যে বাগড়া দেয় লাইফ সায়েন্সএই বলে যে, মুক্ত মানুষ বলে কিছু নেই, এটা আসলে একগুচ্ছ জৈবরাসায়নিক অ্যালগোরিদমের তৈরি এক অলীক‘কহানি’ ছাড়া আর কিছুই নয়।”

তবুও লক, রুশো, জেফারসনের তৈরি এই ভাষ্যকে কেউ ছাড়তে চাইছেন না। বিজ্ঞানসৃষ্ট নতুন নতুন ডিভাইস, হাতিয়ার আর নির্মাণ-কাঠামোর আবির্ভাবের মুখে ঐ উদারনৈতিক আবহ, যেটা আসলে নিউরাল ইলেকট্রিক স্টর্ম সঞ্জাত ‘মনের’ সৃষ্ট এক অলীক কল্পনা, টিকবে কি? কী হবে উদারনৈতিকতার সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টি গণতান্ত্রিক শাসন-কাঠামোর? খুব ডিটেইলে চিন্তা করলে গণতন্ত্রও মস্তিষ্কের বিবিধ আশ্চর্য জৈবরাসায়নিক ক্রিয়াবিক্রিয়ার অধীন এক অলীক তন্ত্র। এটা আমাদের ভাল লাগে, কেননা জৈবনিক হরমোন আর নিউরনীয় অনুভূতি আমাদের এক সুখকর অনুভূতি দেয়। আমরা কাকে ভোট দেব কাকে দেব না, কোন দলকে মহিমান্বিত করব বা কোন মিছিলে যাব অথবা যাব না, সেসবই নির্ভর করে আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরে উদ্ভূত নিউরো-বৈদ্যুতিক আলোড়নসঞ্জাত ধারণার উপর। এই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলোই আমাদের তাৎক্ষণিক মতামত তৈরি করে। কিন্তু নতুন নতুন ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ধীমান যন্ত্রপাতি আর তথ্যপ্রযুক্তির আগ্রাসনের মুখে গণতন্ত্র কি সত্যিই গণমানুষের মুক্তির হাতিয়ার হবে? গণমানুষের মুক্তি কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করে নিউরোকেমিকালের যুগে?

একুশ শতকের তিনটি ফলিত প্রয়োগ এই চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করছে-মেশিন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাবে অর্থনীতি ও সামরিকখাতে ব্যক্তিবিশেষের কদর কমবে, তবে সম্মিলিতভাবে মানুষের কদর থাকবে কৌশলগত কারণেই, কিন্তু কিছু অতিমানবীয় গুণাবলীর ব্যক্তিবিশেষ তৈরি হতে পারে যাদেরকে সিস্টেম খুব পছন্দ করবে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমৃদ্ধ স্মার্ট প্রোগ্রাম তৈরি হচ্ছে যারা দাবাখেলায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে হারাচ্ছে বা অন্যান্য গেমশো’তে মানুষকে হারিয়ে বাহবা কুড়োচ্ছে। অন্যদিকে মস্তিষ্ক গবেষণায় এমনসব ইমপ্ল্যান্ট বা ড্রাগ তৈরি হয়েছে যাদের ব্যবহারে মানুষের অতি-মানুষিক দক্ষতা বাড়ে যা স্বাভাবিকভাবে মানুষে দেখা যায় না। যেমন সাধারণ সৈনিক বিশেষ নিউরো-ড্রাগের প্রভাবে অস্বাভাবিক যুদ্ধ-প্রাখর্য দেখাতে সক্ষম হচ্ছে। এখন যেসব গুণাগুণ ড্রাগের সাহায্যে পাওয়া যাচ্ছে সেসব গুণাগুণকে স্থায়ীভাবে পাওয়ার জন্য ব্রেইন-ইমপ্ল্যান্টের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে যাবেই। এই সমস্ত হিউম্যান-মেশিন ইন্টারফেস, বা ধীমান যন্ত্র অথবা জেনেটিক প্রকৌশলের মাধ্যমে উন্নত ও শাণিত ‘সুপারম্যান’ আমাদের সমাজে প্রভাব ফেলবে। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে আমরা দেখি যেকোনো জৈবসত্তাই আদতে জৈবরাসায়নিক ক্রিয়াকারিতার ফসল। এইরকম রাসায়নিক নিয়ামকের অধীন মানুষ কখনোই পরিপূর্ণ মুক্ত-মানুষ হতে পারে না। তাদের হয়ে মূল সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় কোনো গুচ্ছকার নিউরনের সংকেতে তৈরি কোনো বৈদ্যুতিক আলোড়নের দ্বারা।এসব নিউরাল সংযোগের প্রকৃতি কেমন হবে সেটা নির্ভর করে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পারিবেশিক প্রভাবের ওপর। কাজেই মুক্তমন বলে যেটা নিয়ে আমরা গর্ব করি সেটা একটা অলীক বস্তু।

আধুনিক ধীমান অ্যালগোরিদম আমার শরীরকে অনেক ভালো বুঝতে সক্ষম হবে যেটা আমার লক্ষ বছরের পুরনো অ্যালগোরিদম নাও বুঝতে পারে। শরীরের বাইরে স্থাপিত স্মার্ট অ্যালগোরিদমের আছে দ্রুততার সাথে গণনার ক্ষমতা, ধীশক্তি, সুপ্রচুরতথ্য এবং তথ্য-প্রক্রিয়াকরণের নব নব প্রক্রিয়া। আমাদের দেহজ অ্যালগোরিদমেরও এসব আছে, তবে একটু কম কম। কিন্তু তার আছে লক্ষ বছর ধরে প্রকৃতিতে যুদ্ধ করে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা। এই দুয়ের মিশেল ভবিষ্যতে সুপারম্যানের জন্ম দেবে না, তা কে বলতে পারে?

আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর দুঃস্থকে সুস্থ করে না, রোগকেই মূলে বিনাশ করার কথা ভাবে। এটা বার্ধ্যককে বৃদ্ধ করে দিয়েছে এবং সুস্থকে আরো সুস্থ করে তুলতে বদ্ধপরিকর। মানুষের এখন চাই বেশী বেশী স্মরণ শক্তি, গড়পড়তার চেয়ে অধিক বুদ্ধিমত্তা আর অবারিত যৌন ক্ষমতা। বিশ শতকে লক্ষ লক্ষ সুস্থ সৈনিক লেগেছিল যুদ্ধ করার জন্য, দেশকে প্রতিরক্ষা দেওয়ার জন্য। দরকার হয়েছে হাজার হাজার বুদ্ধিমান আমলার, শিক্ষকের, লক্ষকোটি দক্ষ শ্রমিকের-কৃষকের। কিন্তু স্মার্ট সিস্টেম এসবই আরো ভালোভাবে যদি করতে পারে তখন অতো লক্ষ-কোটির দরকার কোথায়? বরঞ্চ তখন কেউ কেউ অন্যের তুলনায় বেশী যোগ্যতর হয়ে উঠতে চাইবে। এভাবেই মানুষ দেবত্বকে বরণ করে নেবে। এই নতুন ও বিচিত্র টেকনো-মানবতাবাদ মানুষকেই নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পারে।

Robot and human touching forefingers বইটির সর্বশেষ অধ্যায় ‘ডাটা-ইজম’ তথ্যের জয়গান দিয়ে শেষ হয়েছে। আধুনিক জীবন অতিরিক্ত তথ্যে ভারাক্রান্ত। এতো তথ্য দিয়ে দুইলক্ষ বছরের পুরনো মস্তিষ্ক কী করবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। সে অতো দ্রুত এতো বেশী তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করতেও পারছে না। অথচ আধুনিক হিউম্যান-মেশিন ইন্টারফেসগুলি আমাকে আমার চাইতে ভালো চেনে। ফেসবুক-গুগল যেভাবে আমাদের সার্বক্ষণিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে-আমরা কার সাথে বন্ধুত্ব করি, কী মুভি দেখি, কোন বইটা পড়ি, কোথায় যাই, কী গাড়ি চড়ি এসবই এই অ্যালগোরিদমগুলো জানে। অন্য সবার ক্ষেত্রেও সে এটা জানে। ফলে আমার পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে গুগল আমার চাইতেও ভালো জানে। অন্তত সম্ভাবনাটুকু জানে। ফলে কার সাথে প্রেম করতে চাইব, সেটা আমার চেয়ে ফেসবুক জাতীয় অ্যালগোরিদম আরো ভালোভাবে আন্দাজ করতে পারবে। কোন অঞ্চলের মানুষ কী পছন্দ করে, কী ধরনের গাড়ি চড়ে, কী ধরনের মুভি দেখে, কী খায়, কোন ধরনের রোগে ভোগে এসবই গুগল-জাতীয় ডেটাবেজ জানতে পারে। কারণ আমরা সকলেই আমাদের পছন্দনীয় জিনিস সম্পর্কে জানতে গুগল-সার্চ করি। এই ছোট ছোট তথ্য থেকে একটি ধীমান অ্যালগোরিদম সহজেই আমাদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে উক্ত বিশ্লেষণগুলো করতে পারে। এভাবে কোনো অঞ্চলে কোনো বিশেষ রোগের প্রাদুর্ভাব হলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার আগেই গুগল জেনে যায়। কারণ ডাক্তার ও রোগী উভয়েই ঐজাতীয় রোগের নাম দিয়ে এন্ট্রি খুঁজতে থাকে। অবশ্য আপনি যদি প্রাইভেসি চান তাহলে সকল প্লাগ খুলে, ফোন বন্ধ করে, বাতি নিভিয়ে থাকতে হবে। এর ফলে প্রাইভেসি আসবে, কিন্তু ক্ষমতায়ন হারাতে হবে। এটাই ডেটাধর্মিতার বৈশিষ্ট্য। এখানে অনুভূতি গৌণ, ডেটাই মুখ্য।

কাজেই আধুনিক,অত্যাধুনিক ও আধুনিকোত্তর কালে মানুষে দেবত্ব আরোপিত হতে চলেছে। লক্ষ বছরের জৈবনিক শৃঙ্খল ভেঙ্গে ধীমান মেশিনের সাথে সখ্য পাতিয়ে মানুষ দেবত্বে উন্নীত হতে চাইবে। এবং সেটা হাতের নাগালেই সম্ভব। আর এরকম এক পোস্ট-হিউম্যান বা আধুনিকোত্তর সমাজের ইশতেহারই উপহার দিয়েছেন ইয়ুভাল হারারি।‘হোমো ডেউস’ বইটির প্রতিটি পাতায় চিন্তার ধাক্কা খেতে হয়েছে। চিন্তার এতো এতো চ্যালেঞ্জ খুব কম বইতেই মেলে। বহুপুরনো ধ্যান ও ধারণা ধাক্কা খায়, বিশ্বাসে টাল ধরে, মানসিকতা পোড় খায়, মাথা খুলে যায়। এইরকমই এক বজ্রগর্ভ বই এই হোমো ডেউস

তবে হারারি’র সব মতের সাথে ঐক্যমত্য হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তিনি যেমনটি বলেছেন, ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তাঁর একটি বোধ আছে সেটা মানছি। কিন্তু একুশ শতকের দিকে তাকালে মানুষের এই ‘দেবত্ব’ দেখিনা। গত শতকের মানুষ, আমাদের, প্রত্যাশা ছিল একুশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সমাজের বৈষম্য দূর করবে, অসাম্য দূর করবে, বিজ্ঞান শিক্ষা বাড়াবে, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস দূর হবে, আন্তর্জাতিকতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কই? সারা বিশ্বেঅসাম্য বাড়ছে, আয়-বৈষম্য বাড়ছে, শিক্ষার মান দ্রবীভূত হচ্ছে, বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী কমছে, আঞ্চলিকতা বাড়ছে, সন্ত্রাস বাড়ছে, ঝুঁকি বাড়ছে, প্লেন দুর্ঘটনা বাড়ছে। এরপরও কি ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এনগর’ বলা যায়? কিন্তু তাহলে হারারি-কথিত উজ্জ্বল ‘টুমরো’র কী হবে? সেও তো কিছুমাত্র অবাস্তব নয়। দেবত্বের হাতছানি ফিরিয়ে দেবেন? হোমো সেপিয়েন্স কী বলে?
বইটি এনে দিয়েছে ‘বইয়ের জাহাজ’।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাহেদ মোতালেব — মে ১৭, ২০১৭ @ ৯:২৮ অপরাহ্ন

      ভালো আলোচনা। লেখককে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com