মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ৭)

অদিতি ফাল্গুনী | ৪ মার্চ ২০০৮ ৫:২৮ অপরাহ্ন

paiকিস্তি:

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

১ম অধ্যায়: সাধারণীকৃত শাস্তি

(গত সংখ্যার পর)
a-gathering1.jpg
Jean-Honoré Fragonard-এর ‘A Gathering at Woods’ Edge’ (১৭৬০-৮০)

zz-1700-02.jpg
চিত্রকলায় আঠারো শতকের ফরাসি ক্যাথলিক নারীরা খেতের মধ্যে পড়ে থাকা শস্য কুড়াচ্ছে

সামাজিক স্তরবিন্যাসের প্রতিটি অংশই এই প্রয়োজনীয় বেআইনী কার্যক্রমের কিছু নির্দিষ্ট প্রকরণ নিজের ভেতরে ধারণ করতো। ফলে, বেআইনী কার্যক্রম একধরনের স্ববিরোধিতার আবর্তে পড়ে যায়। নিম্নস্তরের বেআইনী কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবেই শণাক্ত করা হতো। অর্থাৎ, অপরাধ থেকে তাকে নৈতিক ভাবে না হোক, বিচারগত ভাবে পৃথক করাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াত। আর্থিক অনিয়ম হতে শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়ম, চোরাচালান, লুণ্ঠন, সরকারের শুল্ক প্রতিনিধিদের সাথে সশস্ত্র লড়াই হতে শুরু করে পরবর্তী সময়ে খোদ সৈন্যদের সাথে লড়াই ও শেষমেশ বিদ্রোহ…এসব কিছুতেই ছিল একটি ধারাবাহিকতা। আর, এভাবেই অপরাধ ও বেআইনী কার্যক্রমের মাঝে সীমারেখা টানা কঠিন হয়ে পড়ে। ধরা যাক ভবঘুরেপনার কথা। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ভবঘুরেপনার জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত থাকলেও এই অধ্যাদেশ কখনোই বাস্তবায়িত হতো না। এই ভবঘুরেপনার সাথেই লুণ্ঠন, শোচনীয় চুরি এবং এমনকি খুন করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়াটা বেকারদের জন্য ছিল এক ধরনের কর্মসংস্থান। যেসব কর্মী তাদের মালিককে কিছুটা অমীমাংসিত অবস্থায় রেখেই কাজ ছেড়েছে বা যে গৃহভৃত্যদের মালিকের কাছ হতে পালানোর কিছু যৌক্তিক কারণ ছিল, মন্দ ব্যবহার পাওয়া শিক্ষানবিশী কর্মী, পলাতক সৈন্য বা জোর করে সশস্ত্র বাহিনীতে ভর্তি করার কাজে নিয়োজিত দলগুলোর হাত এড়াতে চাওয়া ব্যক্তিদের সবার জন্যই ভবঘুরেপনা ছিল এক ধরনের কর্ম সংস্থান। সুতরাং, অপরাধ এক ব্যাপকতর অর্থে বেআইনী কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গণ্য হতো। আর, সাধারণ মানুষ কিšত্ত লঘু স্তরের বেআইনী কার্যক্রমকে তাদের বেঁচে থাকার শর্ত হিসেবে দেখতো। অন্যদিকে গুরুতর বেআইনী কার্যক্রমকে দেখা হতো অপরাধ বিস্তারের পেছনে এক চিরস্থায়ী কারণ হিসেবে। এভাবেই জনতার ভেতর বেআইনী কার্যক্রম বিষয়ে ছিল দ্ব্যর্থকতা বোধ। অপরাধী–ধরা যাক যে একজন চোরাচালানকারী বা একজন চাষী যে তার প্রভুর খাজনা আদায়ের হাত হতে পালিয়েছে, তার প্রতি জনতার সহানুভূতির জোয়ার বয়ে যেত। তার সন্ত্রাসী কাজকে দেখা হতো অভিজাত শ্রেণীর সাথে নিম্নবর্গের পুরণো লড়াই হতে সরাসরি উদ্ভুত কার্যক্রম হিসেবে। আবার, যে ব্যক্তি কিনা জনতার সমর্থিত বেআইনী কার্যক্রমের আওতায় জনতার বিরুদ্ধেই কোনো অপরাধ করতো–যেমন কোনো ভবঘুরে ভিক্ষুক যদি ডাকাতি ও খুন করতো, তবে সে সহজেই বিশেষ ঘৃণার পাত্র হতো। কেননা, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে বেআইনী কার্যক্রম প্রয়োজন, তার ভেতর সবচেয়ে কম সমর্থনযোগ্য কাজই সে করেছে। এভাবেই, অপরাধকে ঘিরে একইসাথে মহিমা প্রদান ও নিন্দাবাদের একটি বলয় গড়ে উঠেছিল। বেআইনী কার্যক্রমে লিপ্ত এই ক্রমাগত পালাবদলকারী জনগোষ্ঠির প্রতি তাই সাধারণ মানুষ কখনো বাড়িয়ে দিত কার্যকর সাহায্যের হাত। আবার কখনো ছুঁড়ে দিত ঘৃণা। যেহেতু সাধারণ মানুষের মনে সবসময়ই এই ভয় থাকতো যে বেআইনী কার্যক্রমে জড়িত মানুষেরা সামাজিক অবস্থানের দিক হতে তাদের খুব নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও তারা যে কোনো সময় অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এভাবেই জনপ্রিয় বেআইনী কার্যক্রম আবৃত করে রেখেছে অপরাধের জীবকোষ। আর, অপরাধই ছিল বেআইনী কার্যক্রমের চূড়ান্ত প্রকরণ এবং অন্তর্নিহিত বিপদ।

গভীরতর নানা বেআইনী কার্যক্রম এবং অপরাপর বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণীর ভেতরে পুরোপুরি সম্মিলন যেমন ছিল না, তেমনি ঘোরতর কোনো বিরোধও ছিল না। সাধারণ ভাবে বললে, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠি বা শ্রেণী যাদের প্রত্যেকে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের বেআইনী কার্যক্রমে জড়িত ছিল, তাদের ভেতর পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। এবং এই সম্পর্ক শুধুই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব বোঝাতো না। বরং পারস্পরিক সাহায্য ও দুষ্কর্মে সহযোগিতা করাও বোঝাতো। যেমন, কৃষক যখন রাষ্ট্র বা যাজক শ্রেণী কর্তৃক আরোপিত কোনো বিশেষ কর পরিশোধ করতে চাইতো না, তখন এর পেছনে জমির মালিকের প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকতো। আবার, ক্ষুদ্র কারিগর শ্রেণী যখন পণ্য প্রস্তুতকরণ সংক্রান্ত আইন মানতে চাইতো না, তখন নয়া উদ্যোক্তারা এই পদক্ষেপকে সমর্থন করতো। চোরাচালানের ক্ষেত্রে মান্দ্রিনের (Mandrin) কথা বলা যেতে পারে। দেশের সব মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছে। তাকে প্রাসাদে গ্রহণ করা হয়েছে এবং খোদ সংসদ তার নিরাপত্তা যুগিয়েছে। এটাই প্রমাণ করে মান্দ্রিনের পেছনে জড়িত বিপুল জনসমর্থন। সতেরো শতকের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি কেউ দেখতে পাবেন তা হলো আর্থিক বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তের ভিন্ন ভিন্ন নানা প্রত্যাখ্যান বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত সামাজিক নানা শ্রেণীকে গুরুতর বিদ্রোহে এক সূত্রে গেঁথে দিচ্ছে। সংক্ষেপে, বেআইনী কার্যক্রমের নানা পারস্পরিক আন্তঃক্রিড়া সমাজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে গঠন করেছিল। অথবা, সমাজে এসময় সংঘটিত নানা পরিবর্তন আইনের সেই শৈথিল্য সম্ভব করে তোলে যা প্রতিদিনকার জনপ্রিয় নানা বেআইনী কার্যক্রমের মাধ্যমে আরো প্রসারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোলবার্টের (Colbert) অধ্যাদেশের নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কথা বলা যায়। ফলে, রাজ্যের ভেতর শুল্ক বাধা অমান্য হতে থাকে, গিল্ড বা সামাজিক নানা সমবায় সমিতির অনুশীলন ভেঙে যায়। বুর্জোয়া শ্রেণীর জন্য এই পরিবর্তনগুলো খুব দরকারি ছিল। কেননা, এই পরিবর্তনের দরুনই আর্থিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল। এভাবে, নানা অনিয়মের প্রতি সহনশীলতা অনিয়মকে সমর্থনের তুল্যমূল্য হয়ে দাঁড়ায়।

আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, গোটা প্রক্রিয়া উল্টে যেতে শুরু করে। প্রথমত, সম্পদের স্বাভাবিক বিস্তার এবং সেই সাথে জনসংখ্যারও হঠাৎ বৃদ্ধির সাথে সাথে জনপ্রিয় বেআইনী কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য যতটা না অধিকারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তার চেয়ে বেশি পরিচালিত হয় সম্পদ বা সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে। যেমন, অতীতের মতো চোরাচালান বা কর আদায়কারী কর্তৃপক্ষের সাথে সশস্ত্র সংঘর্ষের জায়গা নিয়ে নেয় চুরি ও লুটতরাজ। এবং এই হিসাবে, চাষী, কৃষক এবং কারিগররা ছিলেন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণী। লো ট্রসনে (Le Trosne) নিঃসন্দেহে কোনো অতিশয়োক্তি করেন নি যখন তিনি এই বাস্তব প্রবণতাটি ব্যাখ্যা করেন যে কীভাবে ভবঘুরেদের চাঁদাবাজির কারণে কৃষকরা যন্ত্রণা সয়েছে। খোদ সামন্ত প্রভুদের কর আদায়ের সময়ও এত কষ্ট সয় নি তারা। ক্ষতিকর পঙ্গপালের আস্তরণের মতো চোররা তাদের আক্রমণ করে। চোররা চাষীদের শস্যের গোলা লুটতরাজ করে এবং ফসলের ক্ষতি করে (লো ট্রসনে, ১৭৬৪, ৪)। এটা অবশ্য বলা যেতে পারে যে আঠারো শতক নাগাদ জনপ্রিয় এই বেআইনী কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সঙ্কট দেখা দেয়। বিপ্লবের সূচনালগ্নে সৃষ্ট আন্দোলনগুলো (যেমন, সিনোরিয়াল কিম্বা অভিজাতদের অধিকার প্রত্যাখ্যান করার আন্দোলন) বা পরবর্তী কালের আন্দোলনগুলোর কোনোটাই পুনরায় সমন্বিত বেআইনী কার্যক্রমকে পুরনো দিনের মত স্বাগত জানায়নি। বিপ্লব পরবর্তী এই আন্দোলনগুলোর ভেতর ছিল সেই সব সংগ্রাম, যেসব সংগ্রামে সম্পত্তির অধিকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছিল। সেই সাথে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও প্রচুর প্রতিবাদ তোলা হয়েছিল। এবং জোর করে নাগরিকদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধেও জনমত গঠন করা হয়েছিল। বুর্জোয়া শ্রেণীর একটি বড় অংশই তেমন একটা হৈ চৈ ছাড়াই অধিকারের আইনহীনতার ব্যাপারটি মেনে নিয়েছিল। তবে, তাই বলে তার নিজের সম্পত্তির অধিকারের বিরুদ্ধে কোনো বেআইনী কার্যক্রমকে সমর্থন করাটা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আঠারো শতকের শেষভাগে এবং বিশেষতঃ বিপ্লবের পরে কৃষক অপরাধের চেয়ে এই সমস্যার প্রতিনিধিত্বকারী দৃষ্টান্ত আর হয় না (বের্সে, ১৬১)। কৃষিখাতের নিবিড়তর বিকাশমুখী পরিবর্তনের কারণে অতীতে গ্রামের সবার জন্য সাধারণ ভাবে কিছু জমি ব্যবহারের অধিকার, বিভিন্ন অভ্যাসের প্রতি সহনশীলতা, মেনে নেওয়া ছোট ছোট নানা বেআইনী কার্যক্রম ক্রমাগতই মুখোমুখি হচ্ছিল প্রচুর নিয়ন্ত্রণ ও চাপের। এছাড়াও, বুর্জোয়া শ্রেণী কর্তৃক আংশিক ভাবে অর্জিত অধিকার হিসেবেই এতদিন ধরে জমির উপর যে সমস্ত সামন্ত বোঝা চেপে ছিল, সেগুলোও উঠে যাওয়ায় ভূমিজ সম্পত্তি হয়ে দাঁড়ায় একচেটিয়া সম্পত্তি। ফলে, এতদিন ধরে যেসব অধিকার চাষীদের অধিকার বা সংরক্ষণে ছিল (যেমন, পুরনো দেনা হতে অব্যাহতি বা নানা ‘বেআইনী’ আচরণের ঘনীভূত রূপ: মুক্ত পশুচারণের অধিকার, কাঠ কুড়ানো প্রভৃতি), নতুন মালিকরা সেসব পুরনো অধিকার বাতিল করে দেন অথবা এসব অধিকারকে স্রেফ চুরি হিসেবেও সাব্যস্ত করেন। নতুন মালিকদের এই আচরণ সাধারণ মানুষকে প্রতিক্রিয়ার এক শৃঙ্খলের দিকে ঠেলে দেয় যার প্রভাবে মানুষ আরো বেশি হারে নানা বেআইনী এবং অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। যেমন, ক্লোস (গির্জা, মঠ বা স্কুল ইত্যাদির চারপাশের জমি-সংলগ্ন ভবনসমূহ)-এর জমিতে অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু চুরি বা হত্যা, অগ্নিসংযোগ, দৈহিক আক্রমণ, খুন প্রভৃতি (দ্রষ্টব্য, ফেস্টি এবং আগুলহোন (Festy and Agulhon)। ‘অধিকারের আইনহীনতা’, যা প্রায়শঃই বঞ্চিততম মানুষের বেঁচে থাকা বোঝাতো, সম্পত্তির এই নতুন মর্যাদা অর্জনের সাথে সাথে ‘সম্পত্তির আইনহীনতা’য় পর্যবসিত হয়। ‘সম্পত্তির আইনহীনতা’র অপরাধে অপরাধীকে শাস্তি পেতেই হতো।

এবং জমির মালিকানাকে কেন্দ্র করে এই যে ‘আইনহীনতা’কে বুর্জোয়া শ্রেণী এত ঘৃণা করতো, বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত মালিকানার ক্ষেত্রে সেই ‘আইনহীনতা’ ছিল একেবারেই অসহ্য। বন্দরের বিকাশ, বড় বড় গুদামে ¯তূপীকৃত পণ্যসামগ্রি, বড় বড় কারিগরী প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব বেআইনী কার্যক্রম কঠোরভাবে দমনের প্রয়োজনীয়তাকে অনিবার্য করে তোলে। উল্লেখ্য, এই গুদামগুলোতে ছিল বিবেচনাযোগ্য পরিমাণের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং নানা তৈরী পণ্যের সমাহার। উল্লেখ্য, শিল্পোদ্যোক্তারা ছিলেন এসব কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রীর মালিক এবং এত জিনিসপত্রের যথাযথ দেখভাল করাটা ছিল কঠিন। অতীতের চেয়ে অনেক বড়সর মাপে সম্পদ বিনিয়োগকৃত হবার প্রক্রিয়ার লক্ষণ এসময় দেখা যায়। ফলে, পণ্য এবং যন্ত্রোপকরণ এ উভয় ক্ষেত্রেই বেআইনী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে একটি নিয়মতান্ত্রিক এবং সশস্ত্র অসহনশীলতা লক্ষ্য করা যায়। যেসব খাতে অর্থনৈতিক বিকাশ সর্বোচ্চ ছিল, সেসব খাতে এই অসহনশীলতার ব্যাপারটি সর্বোচ্চ প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে। কলকুহৌন (Colquhoun) রীতিমতো পরিসংখ্যানযোগে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে কেন ক্রমাগত হারে বৃদ্ধি পাওয়া অসংখ্য বেআইনী আচরণ রোধ করাটা জরুরি। উদ্যোক্তা ও নানা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে আমদানিকৃত দ্রব্যাদি এবং টেমস নদীর পাড়ে বিভিন্ন গুদাম হতে চুরির পরিমাণ বাৎসরিক ২৫০,০০০ পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, এক লন্ডন বন্দরেই প্রতিবছর প্রায় ৫০০,০০০ পাউন্ডের সমপরিমাণ দ্রব্যাদি চুরি যায়। এই হিসাবের ভেতর কিন্তু বন্দর সদরের বাইরের অস্ত্রাগার ও গুদামঘরগুলোর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় নি। শুধু লন্ডন শহরে চুরি যাওয়া পণ্যের মূল্য হিসেব করলেই ৭০০,০০০ পাউন্ড দাঁড়ায়। এই অব্যাহত লুটতরাজের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান প্রেক্ষিত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে কলকুহৌন মনে করতেন। প্রেক্ষিতত্রয় হলো: প্রথমত, কেরানি, ওভারসিয়ার বা শ্রমিক সর্দার, ফোরম্যান এবং মজুরদের পারস্পরিক দুষ্কর্মে সহায়তা ও সক্রিয় অংশীদারিত্ব। ‘যখনি প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক এক জায়গায় মিলিত হয়, তাদের ভেতর প্রচুর খারাপ মানুষ জড়ো হতে বাধ্য।’ দ্বিতীয়ত, বেআইনী বাণিজ্য সংগঠনের অস্তিত্ব। এই বেআইনী বাণিজ্য শুরু হতো কারিগরের কারখানায় বা বন্দরে। সেখান হতে চলে যেত গ্রাহকের কাছে। পাইকারি গ্রাহক, যাদের ছিল বিশেষ কিছু পণ্যের কেনা-বেচায় দক্ষতা, তাদের কাছে যেত এসব পণ্য। আবার, খুচরা গ্রাহকরাও এসব পণ্য পেত। খুচরা গ্রাহকদের স্টলগুলো প্রদর্শন করতো ‘পুরনো লোহা, ছেঁড়া কাপড় এবং ন্যাকড়ার জরাজীর্ণ শোভা, যখন কিনা এই দোকানগুলোর পেছন দিকে থাকতো নৌবাহিনীর বহুমূল্য গোলা-বারুদ, যুদ্ধোপকরণসহ প্রচুর লুকনো সম্পদ, তামার বল্টু ও স্ক্রু, ঢালাই লোহার টুকরো ও নানা দামি ধাতু, ওয়েস্ট ইন্ডিজ হতে আসা নানা পণ্যসামগ্রী, আসবাবপত্র এবং শ্রমিকদের কাছ হতে আসা সব ধরনের দ্রব্য।’ খুচরা গ্রাহকদের দোকান হতে উপরোক্ত দ্রব্যসামগ্রী আবার যেত ব্যাপারি বা কারবারি এবং ফেরিওয়ালাদের কাছে। যারা এসব চোরাই মাল সারা দেশে এমনকি গ্রাম অব্দি ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করতো (কলকুহৌন, ১৭৯৭; ষষ্ঠ, সপ্তম এবং পঞ্চদশ অধ্যায়ে এই গোটা প্রক্রিয়ার তিনি একটি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন)। তৃতীয়ত, অর্থ বা মুদ্রা জাল করা। ইংল্যান্ডে এসময় গোটা দেশ জুড়ে চল্লিশ কি পঞ্চাশটি জাল মুদ্রা তৈরির সদা সক্রিয় প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে, লুণ্ঠন ও প্রতিযোগিতাসম্পন্ন এই বিপুলায়তন টাকা জাল করার কাজটি সম্ভব হতো মূলতঃ বেআইনী কার্যক্রমের প্রতি কিছু সহনশীলতার জন্য। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুষ্কর্ম করতে পারা যেন অধিকার অর্জনের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন, জাহাজের আশপাশ হতে লোহার টুকরো বা দড়ি সংগ্রহ করার অধিকার কি চিনির ফেনা পুনরায় বিক্রি করার অধিকার। এছাড়াও ছিল দুষ্কর্মের প্রতি এক ধরনের নৈতিক অনুমোদন। যেমন, লুটতরাজকারীরা নিজেরা তাদের চোরাচালানের কাজকে ‘কোনো গুরুতর অপরাধ বলে মনে করতো না।’

সুতরাং, উপরোক্ত বেআইনী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন রুজু করাটা জরুরি হয়ে দাঁড়াল। দুষ্কর্মগুলো সংজ্ঞায়িত হওয়া এবং অধিকতর হারে শাস্তি পাওয়ার কাজটি শুরু হলো। এই বিপুলায়তন অনিয়মের পিণ্ড হতে (যার কিছু হয়তো সহ্য করা হতো আবার কিছু অপরাধের মাত্রানুযায়ী সাজা দেওয়া হতো) খুঁজে বের করতে হতো যে কোন অপরাধটি অসহনীয় মাত্রার এবং অপরাধীদের সামনে হাজির করে শাস্তি দিতে হতো। পুঁজির নতুন সঞ্চয়ের সাথে উৎপাদনের নতুন সম্পর্ক দেখা দিল এবং সম্পত্তির নয়া মর্যাদার উদ্ভব হলো। অধিকারের আইনহীনতাকে কেন্দ্র করে অতীতের জনপ্রিয় যত অভ্যাসকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্পত্তির আইনহীনতায় হ্রাস করা হয়। অধিকারের এসব আইনহীনতা হয় নিঃশব্দভাবে এবং দৈনন্দিন জীবনে সহনীয় আঙ্গিকে বিরাজ করতো। নয়তো কখনো কখনো ভয়াবহ আকারেও দেখা দিত। যে আন্দোলন বিচারগত ও রাজনৈতিক নানা দায়ে আচ্ছন্ন তদানীন্তন ফরাসী সমাজকে শ্রমের উপকরণ ও উৎপাদন আত্মসাৎ করার সমাজে পরিণত করে, সেই আন্দোলনে আইনের বড় ফাঁকগুলোর ভেতর চৌর্যবৃত্তির স্থান ছিল সর্বাগ্রে। অথবা, ভিন্ন ভাবে বললে, আইনহীনতার অর্থনীতিকে পুঁজিবাদী সমাজের বিকাশের সাথে সাথে পুনর্গঠন করা হয়। সম্পত্তির আইনহীনতাকে অধিকারের আইনহীনতা হতে পৃথক করা হয়। এই পৃথকীকরণ এক ধরণের শ্রেণিবিরোধকেই মূর্ত করে তোলে। কারণ, এক দিক হতে দেখলে, সমাজের নিম্নবর্গের কাছে যে বেআইনী কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি অভিগম্য হওয়ার কথা, সেটা ছিল সম্পত্তি বিষয়ক বেআইনী কার্যক্রম। কিন্তু, অন্য দিক থেকে দেখলে, ঠিক এ সময়েই মালিকানার ভয়াবহ বদলের কারণে, বুর্জোয়া শ্রেণী তার নিজের কাছে অধিকারের আইনহীনতা রেখে দিতে চায়। এভাবেই, বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেই নিজের তৈরি অধ্যাদেশ ও আইনের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার সম্ভাব্যতা তৈরি করে। আইনের ফাঁকগুলোর দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে বুর্জোয়া শ্রেণী অর্থনৈতিক সঞ্চালনের এক অপরিসীম খাত নিজের জন্য নিশ্চিত করে। মূলতঃ আইনের নৈঃশব্দ্য এবং আইনশাস্ত্রে যা-ই লেখা থাকুক, বাস্তবে বা হাতে-কলমে বেআইনী কার্যক্রমের প্রতি সহনশীলতার মাধ্যমে আইনের এ ফাঁকগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এবং বেআইনী কার্যক্রমের এই বিশাল আকারের পুনর্বণ্টন আবার আইনী নানা আবর্তের বিশেষায়নের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে হতো। সম্পত্তি সংক্রান্ত বেআইনী নানা কার্যক্রমের জন্য ছিল বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থাপত্র। যেমন, চুরির জন্য ছিল সাধারণ আদালত এবং সাধারণ শাস্তির নিদান। আবার, অধিকার সংক্রান্ত নানা বেআইনী কার্যক্রম, যেমন, প্রতারণা, কর ফাঁকি, অনিয়মিত বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড প্রভৃতির জন্য ছিল বিশেষ কিছু আইনী প্রতিষ্ঠান। শেষোক্ত আইনী প্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের লেনদেন, আপোসরফা, হ্রাসপ্রাপ্ত জরিমানা বিষয়ে কাজ করতো। বুর্জোয়া শ্রেণী অধিকার সংক্রান্ত আইনহীনতার ফলদায়ী ক্ষেত্রটি নিজের হাতে রেখে দেয়। এবং, একই সময়ে যেহেতু অধিকার ও সম্পত্তির আইনহীনতার ভেতর একটি ভাঙন দেখা দিয়েছিল, সম্পত্তি সংক্রান্ত আইনহীনতা বা বেআইনী কার্যক্রমের উপর নজরদারি করার জন্য ক্রমাগত পুলিশী তৎপরতার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। শাস্তিপ্রদানের ক্ষমতা সম্পন্ন পুরনো অর্থনীতি হতে মুক্তি পাওয়াটা জরুরি হয়ে ওঠে। যে পুরনো অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের বিভ্রান্ত এবং অপর্যাপ্ত বহুত্বের নীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। গড়ে উঠেছিল বাস্তবিক নিষ্ক্রিয়াবস্থা এবং অপরিহার্য সহনশীলতার সাথে সম্পর্কযুক্ত ক্ষমতার বণ্টন এবং কেন্দ্রীকরণ, প্রদর্শনীতে জমকালো এবং প্রয়োগে বিশৃঙ্খল শাস্তির উপর ভিত্তি করে। শাস্তির এক নয়া রণনীতি ও কৃৎকৌশল সংজ্ঞায়িত করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। যাতে করে খরচ ও অপচয়ের অর্থনীতির স্থানে ধারাবাহিকতা এবং স্থায়িত্বের অর্থনীতি স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। সংক্ষেপে, দণ্ডমূলক সংস্কার যেন সার্বভৌম সম্রাটের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং অর্জিত ও মেনে নেওয়া বেআইনী কার্যক্রমের অবকাঠামো মূলক ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সংযোগস্থলে সৃষ্টি হয়েছে। এবং, যদি দণ্ডমূলক সংস্কার নিছকই পরিস্থিতিগত বিপদের মুখোমুখি হওয়ার সাময়িক ফলাফলের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটা হয়েছে মূলতঃ সম্রাটের সার্বভৌম ক্ষমতা ও বেআইনী কার্যক্রমের অবকাঠামোমূলক ক্ষমতার ভেতর নানা ধরনের সম্পর্কের একটি সমগ্র নেটওয়ার্ক বা সংশ্রয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে। সার্বভৌম সম্রাটের দিকে এক ধরনের জমকালো, অপরিমিত, ব্যক্তিগত, অনিয়মিত এবং ধারাবাহিকতাহীন ক্ষমতার বাড়তি বোঝা চাপানোর মাধ্যমে রাজকীয় সার্বভৌমত্বের বিশেষ আঙ্গিক প্রজাসাধারণকে বরং এক ধরনের ধারাবাহিক আইনহীনতা চর্চার সুযোগ করে দিয়েছে। এই আইনহীনতা ছিল এই রাজকীয় ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। সম্রাটের নানা ধরনের বিশেষ অধিকারকে আক্রমণ করার মাধ্যমে কেউ কেউ আইনহীনতার সক্রিয়তাকেও আক্রমণ করছিলেন। দুটো উদ্দেশ্যেরই এক ধরনের ধারাবাহিকতা ছিল। এবং বিশেষ পরিস্থিতি বা কৌশল অনুসারে, সংস্কারকরা কখনো সম্রাটের বিশেষ অধিকারের উপর আবার কখনো আইনহীনতার সক্রিয়তার উপর বেশি জোর দিয়েছেন। লো ট্রসনে, যিনি অরলিয়ন্সের রাষ্ট্রপতি আদালতে বিচারক হিসেবে কাজ করেছেন, এ ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্ত হতে পারেন। ১৭৬৪ সালে তিনি ভবঘুরেপনার উপর একটি স্মারকলিপি প্রকাশ করেন। ভবঘুরেপনা হলো খুনী ও চোরদের জন্ম দেবার সেই ‘উত্তপ্ত শয্যা’ যারা ‘সমাজের সদস্য না হয়েই সমাজে বসবাস করে’ এবং যারা ‘সমাজের সর্বশ্রেণীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে।’ এবং সেই সাথে ‘যারা আমাদের মাঝে সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে বেঁচে আছে যা সুশীল সমাজ তৈরির আগে বিরাজ করতো বলে কেউ অনুমান করে থাকেন।’ চোর ও খুনীদের বিরুদ্ধে লো ট্রসনে সবচেয়ে কঠিন সাজা দেবার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন। চোরাচালানকারীদের তুলনায় তাদের কেন তুলনামূলক বেশি প্রশ্রয় দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে তিনি বিস্ময়ও প্রকাশ করেন। তিনি চান যে পুলিশকে অনেক বেশি কর্মতৎপর হতে হবে। জনতার সাহায্যে সদাজাগ্রত পুলিশ বাহিনীকে ধাওয়া করে ফিরতে হবে এই চোর ও খুনীদের যারা জনতার সম্পদ লুণ্ঠন করে। তিনি দাবি করেন যে ‘অপ্রয়োজনীয় এবং বিপজ্জনক মানুষদের রাষ্ট্র কর্তৃক পাকড়াও করার পর প্রভু যেমন ক্রিতদাসদের স্বত্বাধীন করে রাখে, তাদেরও তেমন স্বত্বাধীন করে রাখা প্রয়োজন।’ এমনকি প্রয়োজন হলে বনে এই চোর বা খুনীদের ধরার জন্য অভিযান সংগঠিত করতে হবে এবং যে তাদের ধরতে পারবে, তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। ‘একটি নেকড়ে ধরার পুরস্কার হয়ে থাকে দশ পাউন্ড সমপরিমাণ অর্থ। একজন ভবঘুরে সমাজের জন্য আরো অনেক বেশি পরিমাণে, অপরিসীম ভাবে ক্ষতিকর।’ (লো ট্রসনে, ১৭৬৪, ৮, ৫০, ৫৪, ৬১-২)। ১৭৭৭ সালে Vues sur la justice criminelle -এ (ভু সুহ লা জাস্টিস ক্রিমিনেল–ফৌজদারি অপরাধ বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি) এই একই লো ট্রসনে দাবি তোলেন যে সম্রাটের বিশেষ অধিকার কমানো হোক, দোষী প্রমাণিত না হওয়া অবধি অভিযুক্তকে নিষ্পাপ হিসেবে বিবেচনা করা হোক, অপরাধী এবং সমাজের ভেতর বিচারক শুধুমাত্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অবস্থান করুন, আইন হোক ‘স্থির, ধারাবাহিক, সবচেয়ে পরিমিত পন্থায় নির্ণিত।’ যাতে করে প্রজারা জানতে পারে যে ‘তাদের সামনে কী অপেক্ষা করছে’ এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা ‘আইনের অঙ্গ’ ব্যতীত বেশি কিছু নয়। (লো ট্রসনে, ১৭৭৭, ৩১, ৩৭, ১০৩-৬)। লো ট্রসনে এবং তার সময়কার অনেকের মতেই, শাস্তি প্রদান ক্ষমতার সীমানা নির্দেশের সংগ্রাম সরাসরিভাবেই জনপ্রিয় বেআইনী কার্যক্রমকে কঠোরতর এবং অধিকতর ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণের অধীনস্থ করার প্রয়োজনীয়তার কথা সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিল। এটা সহজবোধ্য ব্যাপার যে দণ্ডবিধি সংক্রান্ত সংস্কারে প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডের সমালোচনা যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। কেননা, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ডই ছিল দৈহিক শাস্তির সেই নির্দিষ্ট আঙ্গিক যাতে সার্বভৌম সম্রাটের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সদা সক্রিয় বেআইনী কর্মকাণ্ড সবচেয়ে দৃশ্যমান আকারে রূপ লাভ করেছে। মামলার রায়ে মানবতার অংশটুকু ছিল শাস্তি ব্যবস্থার সেই নীতি যা একইসাথে সম্রাটের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সদা সক্রিয় বেআইনী কর্মকাণ্ড…এ উভয় বিষয়ের উপরেই কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপন করতে চেয়েছে। মামলার রায়ে দণ্ডিতের মানবীয় যে সত্ত্বাটির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শন করা হতো, তা যেন উপরোক্ত দ্বিবিধ নিয়ন্ত্রণকে বিচারগত এবং নৈতিক আঙ্গিক প্রদান।

তবে, যদিও এটি সত্য যে শাস্তির তত্ত্ব এবং দণ্ড প্রদান ক্ষমতার কৃৎকৌশল হিসেবে, সংস্কার উপরোল্লিখিত উভয় উদ্দেশ্যের আকস্মিক যোগাযোগের বিন্দুতে আকার লাভ করেছে, দু’টো উদ্দেশ্যর ভেতর দ্বিতীয়টিকেই দীর্ঘ সময় ধরে অগ্রাধিকার দেওয়ায় পরবর্তী সময়েও আইনী সংস্কার টিঁকে যায়। যেহেতু জনপ্রিয় বেআইনী কার্যক্রমের উপর চাপ সৃষ্টির ব্যাপারটি বিপ্লবের সময়, এবং তারপরে সাম্রাজ্যের আমলে, এবং সবশেষে গোটা উনিশ শতক জুড়ে একটি জরুরি কর্তব্যে রূপ লাভ করে, সেহেতু এই সংস্কার তার প্রাথমিক সময়কার প্রকল্প পর্যায় হতে প্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট কিছু আচরণ অনুশীলনে পর্যবসিত হয়। নতুন অপরাধ সংক্রান্ত আইনে তুলনামূলক লঘু শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে, একটি স্বচ্ছতর বিধিবদ্ধকরণ, স্বৈরাচারের চিহ্নিত হ্রাস, দণ্ডপ্রদান ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে একটি অধিকতর গৃহীত ঐক্যমত্য (এর চর্চায় অধিকতর বাস্তব কোনো বিভাজনের অভাবে) প্রভৃতির মাধ্যমে এই নতুন অপরাধ সংক্রান্ত আইন বাস্তবে টিঁকে যায়। টিঁকে যায় বেআইনী কার্যক্রমের সনাতনী অর্থনীতির খাতে আকস্মিক পরিবর্তনের দরুন এবং এই নয়া আইনের নতুন যত অভিযোজন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের ফলাফল হিসেবে। একটি শাস্তি ব্যবস্থাকে নানাপ্রকার বেআইনী কার্যক্রম ভিন্নতার সাথে পরিচালনা করার এক কৃৎকৌশল হিসেবে দেখতে হবে। শাস্তি ব্যবস্থা কখনোই সব ধরনের বেআইনী কার্যক্রমকে নির্মূল করে না।

উদ্দেশ্যর খাত ঘুরিয়ে দাও এবং পাল্লা বদলাও। নয়া কৌশলগুলো সংজ্ঞায়িত করো। এতে করে সমাজদেহে অধিকতর প্রসারিত তবে সূক্ষ্মতর মাত্রা অর্জন করা যাবে। সমাজদেহে শাস্তিকে অভিযোজিত করার জন্য নয়া কৌশল খুঁজে বের করো এবং শাস্তির প্রভাবগুলোও খাপ খাইয়ে নিতে দাও। শাস্তির শিল্পকে নিয়মিত করা, পরিমার্জনা করা এবং সর্বজনীন করার জন্য নয়া নীতি প্রণয়ন করো। এর প্রয়োগকে সমধর্মী করো। শাস্তির কার্যকারিতা বাড়িয়ে এবং এর আবর্ত বহুগুণ করে এর অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক খরচ কমাও। সংক্ষেপে, এক নয়া অর্থনীতি এবং দণ্ড প্রদান ক্ষমতার নয়া প্রযুক্তি গঠন করো। মূলতঃ এগুলোই ছিল আঠারো শতকের শাস্তি সংক্রান্ত সংস্কারের জরুরি কারণ।

নীতির স্তরে, এই নয়া কৌশল চুক্তির সাধারণ তত্ত্বের আওতায় সহজেই পড়ে। সমাজের আইন মেনে নেবার মাধ্যমে নাগরিক যেমন একবারে চিরতরের জন্য এই আইন দ্বারা নিজের শাস্তি পাবার বিষয়টিও মেনে নেয়। এভাবেই একজন অপরাধী বিচারগতভাবে এক উদ্ভট ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। সে চুক্তি ভেঙেছে। কাজেই, সে সার্বিকভাবে সমাজের একজন শত্র“। কিন্তু তাকেই প্রদত্ত শাস্তিতে সে আবার অংশগ্রহণ করে। ন্যূনতম মাত্রায় অপরাধ সংঘটন সমগ্র সমাজকে আঘাত করে। এবং, সমগ্র সমাজই আবার–খোদ অপরাধীসুদ্ধ ন্যূনতম শাস্তিতে উপস্থিত থাকে। দণ্ডমূলক শাস্তি তাই একটি সাধারণীকৃত কাজ যা সমাজদেহের সক্রিয়তা এবং এর প্রতিটি উপকরণের সাথে সমমাত্রায় পরিব্যপ্ত। মূলতঃ এ বিষয় হতেই শাস্তির মাত্রাগত সমস্যা এবং শাস্তি প্রদান ক্ষমতার অর্থনীতির উদ্ভব।

প্রভাবগত দিক বিবেচনা করলে, একটি অপরাধ গোটা সমাজের চোখে অপরাধীকে সমাজ বিরোধী করে তোলে। তাকে শাস্তি প্রদানের জন্য, অপরাধীকে পুরোপুরি মাত্রায় বিরোধিতা করার অধিকার সমাজের আছে। এটা এক অসমান সংগ্রাম। একদিকে সমস্ত শক্তি, ক্ষমতা, অধিকার আর অপরদিকে অপরাধী একা। এবং এমনটাই হওয়া উচিত। যেহেতু শাস্তি প্রদানের সাথে অপরাধীর বিপরীতে সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির আত্মরক্ষার প্রশ্ন জড়িত। এভাবেই, অপরাধী সমাজের সাধারণ শত্র“ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দরুন শাস্তি দানের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি, অপরাধী যেন সমাজের শত্র“র চেয়েও খারাপ কিছু একটা। কেননা, সমাজের ভেতরে থেকেই সমাজকে সে আঘাত করে। কাজেই, এক ‘বিশ্বাসঘাতক’ বা ‘দানবে’র চেয়ে কম কিছু সে নয়। কীভাবে এটি সম্ভব যে অপরাধীর উপর সমাজের কোনো বিশেষ অধিকার থাকে নি? কীভাবে সমাজ অপরাধীর বিনাশ দাবি না করে পারে? একথা সত্য যে শাস্তির নীতি অপরাধীকে আক্রমণ করার জন্য সমাজের চুক্তির অন্তর্গত। তা সত্ত্বেও কিন্তু সমাজের প্রত্যেক নাগরিকই যৌক্তিকভাবে অপরাধীদের জন্য চূড়ান্ত শাস্তি মেনে নিতে না-ও পারে। যদিও এই অপরাধীরা একযোগে নাগরিকদের আক্রমণ করে। ‘প্রত্যেক দুষ্কৃতিকারী, সামাজিক অধিকারগুলো আক্রমণ করার মাধ্যমে এবং তার করা অপরাধের মাধ্যমে, দেশের প্রতি এক বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়। দেশের আইন-কানুন ভঙ্গ করার মাধ্যমে সে দেশের সদস্যপদ হতে খারিজ হয়; সে দেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এমন এক ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রের সুরক্ষা অপরাধীর নিজস্ব অবস্থানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয়। এবং এমন অবস্থায় যেকোনো একজনকে ধ্বংস হতে হবে। অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে আমরা আসলে কোনো নাগরিককে নয়, বরং একজন শত্রুকে জবাই করি। এভাবেই দণ্ডপ্রদান ক্ষমতা সম্রাটের প্রতিহিংসা হতে সমাজের প্রতিরক্ষার খাতে বদলে যায়। কিন্তু, তার পরপরই এই দণ্ডপ্রদান ক্ষমতা কিছু জোরালো উপকরণের সাথে এমনভাবে পুনরায় সমন্বিত হয় যে তার ভীতিকর দিকটি আরো বেড়ে যায়। অপরাধী এমন এক হুমকি হতে বেঁচে গেছে যা স্বভাবতঃই অতিরিক্ত। কিšত্ত, সে এমন এক শাস্তির মুখোমুখি যার আপাতঃদৃষ্টে কোনো সীমা নেই। এটা এক ভয়ঙ্কর ‘বড় শক্তি’র কাছে প্রত্যাবর্তন। এই প্রত্যাবর্তন আবার শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার জন্য এক ধরনের সংযমী নীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তাও তার সাথে সাথে বয়ে আনে।

‘ইতিহাসে অসংখ্য ভয়ানক ও অর্থহীন অত্যাচারের খবর পড়ে কে না কাঁপে? যে অত্যাচারগুলো ঠাণ্ডা মাথায় উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করেছে যত দানব, যারা পরে সন্ত নাম নিয়েছে? (বেক্কারিয়া, ৮৭)। কিম্বা আবারো: ‘আইন আমাকে অপরাধের চূড়ান্ততম শাস্তি দিতে বলে। আমি তখন ক্রোধে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠি। এই ক্রোধ আইন আমার ভেতর জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু, কী এই ক্রোধ? দণ্ডের উদ্ভাবকরা এই ক্রোধকেও ছাপিয়ে যায়…ঈশ্বর, যিনি আমাদের হৃদয়ে আমাদের নিজেদের এবং সতীর্থদের যন্ত্রণার প্রতি বিরূপতা খোদাই করে দিয়েছেন, যিনি মানুষের মন এত দুর্বল ও সংবেদনশীল করে গড়েছেন, সেই মানুষের ভেতর থেকেই কারা এত বর্বর অথচ পরিশীলিত নির্যাতন চালু করেছে?’ (লাক্রেতেল্লে, ১২৯)। শাস্তিতে পরিমিতির নীতি প্রথম উচ্চারিত হয় আত্মার ভাষণ হিসেবে। এমনকি যখন সমাজদেহের শত্রুকে শাস্তি দেওয়া হয়, তখনো পরিমিতির নীতিকে আত্মার ভাষণ হিসেবেই দেখা হয়। অথবা, পরিমিতির এ নীতি শরীর হতে কান্নার মতো সামনে ছুটে চলে। যেহেতু অতিরিক্ত নিষ্ঠুরতার দৃশ্য দেখলে বা এমনকি কল্পনা করলেও শরীর বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। শাস্তির ‘মানবিক’ হবার নীতিটি সংষ্কারকরা উত্তম পুরুষে দাবি করেছেন। যেন স্বয়ং বক্তার সংবেদনশীলতা সরাসরি প্রকাশিত হচ্ছে। যেন বা জল্লাদ এবং দণ্ডপ্রাপ্তের ভেতর খোদ দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক সশরীরে হাজির হয়েছেন। সশরীরে হাজির হয়েছেন তার নিজের আইনকে প্রতিষ্ঠা করা এবং শাস্তির সামগ্রিক অর্থনীতির উপর এই আইন প্রয়োগ করার কাজে। এই গীতল কোমলতা কি দণ্ডের অর্থনীতির জন্য একটি যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পেতে তার অক্ষমতা প্রকাশ করে না? যে চুক্তিমূলক নীতি অপরাধীকে সমাজ হতে বহিষ্কার করে এবং প্রকৃতির বমন হতে উদ্ভুত ‘দানবে’র চিত্রকল্পের মাঝামাঝি জায়গাটাতেই যে কেউ একটি সীমারেখা খুঁজে পেতে পারেন। যদি এই সীমারেখা প্রকাশিত মানব-চরিত্রে খুঁজে না পাওয়া যায়–যদি খুঁজে না পাওয়া যায় আইনের কঠোরতায় কিম্বা অপরাধীর নিষ্ঠুরতায়–তবে কোথায় আর তাকে পাওয়া যাবে? যৌক্তিক মানুষের সংবেদনশীলতার কোমল জায়গাটুকুতে ছাড়া? যে যৌক্তিক মানুষ আইন রচনা করে আবার অপরাধও করে!

তবে, যৌক্তিক মানুষের ‘সংবেদনশীলতা’য় এই আশ্রয় খোঁজা কোনো তাত্ত্বিক অসম্ভাব্যতাকে হুবহু প্রকাশ করে না। বস্তুতঃ এই ‘সংবেদনশীলতা’ তার নিজের ভেতরে ধারণ করে এক ধরনের হিসাব-নিকাশের নীতি। শরীর, কল্পনা, যন্ত্রণা, ‘যে মানব হৃদয়’কে শ্রদ্ধা করার কথা সংস্কারপন্থীরা বলেন, তা’ কিন্তু আসলে অপরাধীর শরীর, কল্পনা, যন্ত্রণা বা ‘মানব হৃদয়’ নয়। বরং এসবই যেন সেইসব মানুষের শরীর বা হৃদয় যারা সামাজিক চুক্তি রচনায় অংশীদার। যাদের অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন পরিষদের ক্ষমতা চর্চার সুযোগ আছে। শাস্তিকে একফোঁটা খর্ব না করার ফলে যে যন্ত্রণা অনুভূত হয়, তা বিচারক এবং দর্শকরা কঠিন হৃদয় সত্ত্বেও অনুভব করতে পারেন। পরিচিতির মাধ্যমে প্রবর্তিত যাবতীয় নিষ্ঠুরতা অথবা উল্টোদিক হতে বললে করুণা ও অসংযমের মন্দ অনুভূতি: ‘ঈশ্বরকে সেই যত শান্ত ও সংবেদনশীল আত্মার জন্য ধন্যবাদ যাদের মনে নিষ্ঠুর যত মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করাটা এক ধরনের নির্যাতনের মতো মনে হয়।’ (লাক্রেতেল্লে ১৩১)। দণ্ড প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের উপর দণ্ডের ফিরে আসা প্রভাব এবং যে ক্ষমতা সে চর্চা করে বলে দাবি করে তা গোছানো এবং গণনা করা প্রয়োজন। এখানে দণ্ড প্রদান নীতিটি মূলতঃ এই আপ্তবাক্যের উভর নির্ভরশীল যে কারোরই কখনো কোনো অপরাধীকে ‘অমানবিক দণ্ডে’ দণ্ডিত করা উচিত নয়। এমনকি যদি সেই অপরাধী প্রতারক এবং দৈত্যও হয়। যদি ‘প্রকৃতি বহির্ভুত’ কোনো অপরাধীর প্রতি আইন ‘মানবিক’ ব্যবহার করতে চায়, তবে সেটা অপরাধীর অন্তর্গত কোনো গভীর মানবতার কারণে নয়, বরং ক্ষমতার প্রভাবের কিছু প্রয়োজনীয় বিধিবিধানের কারণে। এ সেই ‘অর্থনৈতিক’ যৌক্তিকতা যা অবশ্যই শাস্তির হিসাব করবে এবং যথার্থ কৌশল নির্দেশ করবে। ‘মানবতা’ হলো শাস্তির অর্থনীতি এবং তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবকে দেওয়া নাম। ‘শাস্তির প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানেই মানবতার নির্দেশে এবং নীতির বিবেচনায় ন্যূনতম শাস্তির কথাই বলা হয়েছে।’

সুতরাং, শাস্তির এই প্রযুক্তি-রাজনীতি বুঝতে হলে, আমাদের বরং চূড়ান্ত মামলাগুলো গ্রহণ করতে দিন। চরম কোনো অপরাধের দৃষ্টান্ত আমরা বিবেচনা করতে পারি। যে ধরনের অপরাধ সমস্ত আইন-কানুন ভঙ্গ করে। এহেন অপরাধ এমনি অসাধারণ পরিস্থিতিতে, এতটাই গোপনীয়তার সাথে সৃষ্টি হয় এবং এমনি বল্গাহীন যেন সম্ভাব্যতার সীমায় সে উপনীত। এর চেয়ে অদ্ভুত কিছু যেন সে আর হতে পারত না। কেউ একে নকল করতে পারত না বা কেউ এই অপরাধকে দৃষ্টান্ত হিসেবে টানতে পারত না। অথবা, কেউ এমনটাও বোধ করতে পারত না যে এমন অপরাধ সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে সংঘটিত হওয়া উচিত। দিকচিহ্নহীন মুছে যাওয়াই যেন এর নিয়তি। নয়া শাস্তির নিকট ‘চরম অপরাধে’র এই রূপকথা সেই প্রাপ্যই অর্জন করে যা আদি পাপ করেছিল পুরনো শাস্তির কাছ হতে। অপরাধের সেই বিশুদ্ধ আঙ্গিক যাতে শাস্তির কারণগুলো দেখা দেয়।

এমন চূড়ান্ত অপরাধের কী শাস্তি পাওয়া উচিত? কোন ধরনের হিসেব অনুযায়ী শাস্তি প্রাপ্য হয়ে ওঠে? দণ্ডপ্রদান ক্ষমতার অর্থনীতিতে শাস্তির উপযোগ কী হতে পারত? শাস্তি ঠিক ততটুকু মাত্রাতেই উপযোগী হতে পারত, যতটুকু মাত্রায় সে ‘সমাজের প্রতি সাধিত ক্ষতি’-র পূরণ করতে সক্ষম। (প্যাস্টোরেট, ২, ২১)। এখন, কেউ যদি কঠোর বস্তুগত ক্ষয়-ক্ষতি একপাশে সরিয়ে রাখে–এমনকি এই ক্ষয়-ক্ষতি যদি খুনের মতো অপূরণীয় মাত্রার কিছুও হয়ে থাকে–অপরাধের ফলে যে বড় আঘাতটি সমাজদেহ পায়, তা হলো বিশৃঙ্খলা। বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি অপরাধ আরো জন্ম দেয় কলঙ্ক, শাস্তি না পেলে অপরাধ পুনরায় সংঘটিত হবার উত্তেজনা এবং অপরাধ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্যতা। উপযোগী হবার জন্য, শাস্তিকে অবশ্যই তার উদ্দেশ্য হিসেবে অপরাধের প্রতিক্রিয়া থাকতে হবে। অর্থাৎ, শাস্তি নিজেই যেসব বিশৃঙ্খলার উদ্যোগ নিতে সক্ষম। ‘শাস্তি এবং অপরাধের মানের ভেতরকার সম্পর্ক মূলতঃ নির্ণীত হয় চুক্তিভঙ্গের যে প্রভাব সামাজিক শৃঙ্খলার উপর পড়ে তার আলোকে।’ (ফিলাঙ্গিয়েরি, ২১৪)। কিন্তু, একটি অপরাধের প্রভাব আবশ্যিক ভাবে সে অপরাধের ফলে সৃষ্ট আতঙ্কের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সমানুপাতিক নয়। যে অপরাধ বিবেককে আতঙ্কিত করে, প্রায়শঃই তার প্রভাব সেই অপরাধের চেয়ে কম হয়ে থাকে। এ ধরনের অপরাধ সবাই সহ্য করে এবং অনুকরণ করতে রীতিমতো প্রস্তুত থাকে। বড় মাত্রার অপরাধ কিন্তু সমাজে খুব বেশি সংঘটিত হয় না। আবার অন্য দিক থেকে দেখলে, প্রতিদিনের ছোট-খাট মাত্রার অন্যায় কাজগুলোর সংখ্যা সমাজে বহুগুণ বাড়তে পারে। সুতরাং, একজন অবশ্যই অপরাধ ও তার শাস্তির ভেতর কোনো গুণগত সম্পর্ক খোঁজ করবেন না। আতঙ্কের সমানুপাতিকতা খোঁজাটাও সঠিক হবে না। ‘অতীতের গভীর হতে নির্যাতনে দুর্দশাগ্রস্ত কারো কান্না কি ফিরে আসতে পারে? যে কান্না ইতোমধ্যে সংঘটিত কোনো কাজকে ফিরিয়ে দিতে পারে না?’ (বেক্কারিয়া, ৮৭)। শাস্তিকে অপরাধের নিরিখে নয়, বরং তার সম্ভাব্য পুনরাবৃত্তির নিরিখে বিচার করা প্রয়োজন। অতীতের অন্যায় নয়, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলাই যাচাই করা প্রয়োজন। সবকিছু এমন ভাবে গোছানো প্রয়োজন যেন অপরাধকারীর ভেতর অপরাধকর্ম পুনরাবৃত্তির বাসনা তৈরি না হয় এবং এর অনুকরণকারীও তৈরি হবার কোনো সম্ভাবনা যেন না থাকে।১০ শাস্তি, অতঃপর, হয়ে দাঁড়াবে এক প্রভাবের শিল্প। অপরাধের বিশালতার বিপরীতে শাস্তির বিশালতাকে দাঁড় করানোর বদলে অপরাধ হতে উদ্ভূত দু’টো সিরিজের একটিকে অপরটির সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা অবশ্যই করবে। একটি বংশহীন অপরাধ কোনো শাস্তি দাবি করে না। বরং একই উপকথার অপর সংস্করণ অনুযায়ী, ভাঙন ও হারিয়ে যাওয়ার মুখোমুখি দাঁড়ানো সমাজের বধ্যমঞ্চ স্থাপনের অধিকার থাকবে। শেষ অপরাধ কখনোই অদণ্ডিত যেতে পারে না।

এটা ছিল একটা পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি। আঠারো শতকের সংস্কারের বহু পূর্বেই শাস্তির সক্রিয়তার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। সেই শাস্তি ভবিষ্যৎমুখী। এবং গত কয়েক শতাব্দী ধরে শাস্তির অন্ততঃ একটি প্রধান কাজ হলো অপরাধ রোধ করা। অপরাধ রোধ করাটাই দণ্ডপ্রদান ক্ষমতার সাম্প্রতিক যৌক্তিকতাগুলোর একটি। তবে, পার্থক্য ছিল যে শাস্তি এবং বধ্যমঞ্চের প্রভাব হিসেবে অপরাধ নিরোধ হওয়াটা শাস্তির প্রভাব হিসেবে আশা করা হয়েছিল। সেকারণেই শাস্তির বাড়াবাড়ি তার অর্থনীতির সূত্র এবং ন্যায্য বণ্টনের পরিমাপক হয়ে ওঠে।

কিস্তি ৮

তথ্যনির্দেশ


৭. সার্বভৌম সম্রাটের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সদা সক্রিয় বেআইনী কর্মকাণ্ড – অনুবাদক।

৮. রুশো, ২৮। বিশেষ দ্রষ্টব্য এই যে রুশোর এই ধারণাগুলো সংসদে কিছু ডেপুটি উত্থাপন করেন যারা খুব কঠোর শাস্তির একটি ব্যবস্থা রক্ষা করতে চেয়েছেন। এবং, যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক ভাবে, সামাজিক চুক্তির নীতিমালা অপরাধের নিষ্ঠুরতা ও দণ্ডের ভেতর পুরনো যোগাযোগকে সহায়তা যোগানোর কথা বলেছেন। ‘নাগরিকদের প্রাপ্য নিরাপত্তার জন্যই অপরাধের নিষ্ঠুরতা অনুযায়ী শাস্তির পরিমাপ হওয়া উচিত। এবং মানবতার নামে মানবতাই প্রয়োগ হওয়া উচিত। স্বার্থত্যাগ নয়।’ (ম্যুজিনস দ্যু রোকফোর্ট যিনি সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট হতে এই অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত করেছেন। ম্যুজিনস, ৬৩৭)।

৯. দ্যুপোর্ট, আর্কাইভস পার্লেমেন্তেয়ের্স (Duport, Archives Parlementaires) ১০, ৭৪৪। বক্তব্যের সমর্থনে আঠারো শতকের শেষ নাগাদ বহু বিদ্বৎসমাজ এবং আকাদেমিগুলোতে প্রস্তাবিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতার কথা বলা যায়: ‘কিভাবে এসব তদন্ত এবং শাস্তিগুলোর মৃদুতা এক ধরণের ত্বরিত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সাথে মেলানো যায়, যাতে করে সুশীল সমাজ স্বাধীণতা ও মানবতার জন্য সর্বোচ্চ সম্ভাব্য নিরাপত্তা খুঁজে পায়?’ (বার্ণের অর্থনৈতিক সমিতি – Economic Society of Berne), ১৭৭৭)। মারাত তাঁর প্ল্যান দ্যু লেজিসলেশন ক্রিমিন্যাল (Plan de Legislation Criminelle)-এ উত্তর করেছেন। ‘জননিরাপত্তার কোন ক্ষতি না করেই ফ্রান্সে কি ভাবে দণ্ডমূলক আইনের কঠোরতা বিলোপ করা যায়?’ (এ্যাকাডেমি দ্যু শালো-সুহ-মার্ন – Academie de Chalons-sur-Marne) ১৭৮০; এই প্রশ্নোত্তরে জয়ী হয়েছিলেন ব্রিসো এবং বার্ণাদি; ‘আইনের চূড়ান্ত কঠোরতা কি একটি দুষ্কর্মে রত জাতিকে তার অপরাধের সংখ্যা ও ব্যপ্তি কমানোর প্রবণতা ধারণ করে?’ (একাডেমি দ্যু মার্সেই, ১৭৮৬; জয়ী হয়েছিলেন এইমার।

১০. জি. টার্গেট, অবসার্ভেশিও সুহ লো প্রজেত দ্যু কোড পেনাল, লক্রে ৭-৮ (G.Target, Observations sur le projet du Code Penal, in Locre, 7-8)। কান্টের বিপর্যাস আঙ্গিকে এমনটি খুঁজে পাওয়া যায়।

a_falgun@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com