রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

রাজু আলাউদ্দিন | ৩ জুন ২০১৭ ৬:১২ অপরাহ্ন

Razu-Ronobi-1
কাগজ এবং ক্যানভাস–দুয়েই তার স্বাচ্ছন্দ্য । কাগজে তিনি আঁকেন তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে এমন এক ভাষায় যা চিত্রল গুণে ঋদ্ধ। অন্যদিকে ক্যানভাসে তিনি তুলে ধরেন রংয়ের সেই বর্ণময় সম্ভার যা কথার অমরাবতী হয়ে উঠেছে। বর্ণ ও বর্ণমালা অভিন্ন মর্যাদায় রফিকুননবীর কাছে উদ্ভাসিত, তারা একে অপরের বিরুদ্ধে না গিয়ে শিল্পী রফিকুননবীকে অনন্য করে তুলেছে। চিত্রশিল্পী, কার্টুনিষ্ট, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, শিল্পসমালোচ এবং চিত্রকলার শিক্ষক এখন পরিচয়ের ব্যাপ্তির কারণে কেবলই ‘রনবী’ নামে সুপরিচিত, যিনি অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেছেন টোকাই নামক এক চরিত্রের জন্ম দিয়ে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই লেখক-শিল্পীর জন্ম ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়৷ পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় স্থায়ী হন তাঁরা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর৷ ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি৷ পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৫৯ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি৷ এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসানসহ খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন৷
পড়াশোনা শেষ করে রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ শুরু করেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক পূর্বদেশ পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম কাল পেঁচার ডায়েরীতে৷১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি৷ আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হলেন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ৷ পড়াশোনা করলেন প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর৷ ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি৷ শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ ফাইন আর্টস-এর ড্রইঙ ও পেইন্টিং বিভাগে প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই ইন্সটিটিউটের পরিচালক।
রফিকুন নবী পেয়েছেন একুশে পদক, চারুকলায় জাতীয় সম্মাননা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার, বুক-কভার ডিজাইনের জন্য ১৩ বার ন্যাশনাল একাডেমি পুরস্কার৷২০০৮ সালে তাঁর আঁকা খরা শীর্ষক ছবির জন্য ৮০টি দেশের ৩০০ জন চিত্রশিল্পীর মধ্যে ‘এক্সিলেন্ট আর্টিস্টস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে মনোনীত হন।
লেখক-শিল্পী রনবীর দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয়েছিল গত ১৫ এপ্রিল শনিবার ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রক-এ।
কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনের সাথে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রনবী তার শিল্পী ও লেখক জীবনের নানাদিক তুলে ধরেন। ভিডিওতে ধারণকৃত এই সাক্ষাৎকারের লিখিত রূপটি তৈরি করেছেন গল্পকার সাব্বির জাদিদ। সাক্ষাৎকারটি ভিডিওতে ধারণ ও আলোকচিত্র গ্রহণে ছিলেন নয়ন কুমার। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: নবী ভাই, আঁকা এবং লেখা দুটো মাধ্যমেই আপনি অগ্রগণ্য শিল্পীদের একজন। এর অর্থ এই যে আঁকার শিল্পী হিসেবে যেমন, তেমনি লেখার শিল্পী হিসেবেও অনন্য। আপনি শিল্পকলার ছাত্র ছিলেন। পরে শিক্ষকতাও করেছেন। অতএব, ছবি আঁকবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হলো কিভাবে? সেটা কি এই জন্য যে পড়াশোনা শেষ করেই আপনি যুক্ত হলেন সেই সময়কার পত্রিকাগুলোর সঙ্গে? এটা কি একটা কারণ, নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যেটা আমরা জানি না?
রফিকুন নবী: এটা ঠিক, তবে হয় কি যে, বাড়িতে বইপত্র রাখার পড়ার একটা আগ্রহ ছিল পরিবারে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার আব্বা তো ছিলেন একজন পুলিশের কর্মকর্তা।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ পুলিশের কর্মকর্তা, কিন্তু উনি বই কালেকশন করতেন, বই পড়তেন। তারপর আমার মামাদের দেখেছি, মামিদের দেখেছি একটা পারিবারিকভাবে….
রাজু আলাউদ্দিন: পাঠের একটা আবহ ছিল।
রফিকুন নবী: পাঠের একটা আবহ ছিল। তো সেই কারণে পড়ার একটা সুযোগ ছিল। মানে পারিবারিকভাবে বইয়ের একটা সম্ভার থাকলে অটোমেটিক্যালি ওইদিকে পড়ার একটা ঝোঁক তৈরি হয়। তারপর এই যে বাইরের বই, আদার দ্যান পাঠ্যপুস্তক, পাঠ্যপুস্তকের যে ব্যাপার সেইটার বাইরে বেশি বেশি পড়া হতো। লুকানো ছাপানোর কোনো ব্যাপার নেই। অনেকে যেমন ছিল যে বাবা-মা রাগ করে, বাইরের বই পড়তে গেলেই লুকিয়ে পড়ত, সেটাও না। আমাদের পড়ার একটা আবহ ছিল। বাড়িতে যে পড়ার আবহ সেইখান থেকে ওইটা পড়তে পড়তেই নিজে কিছু লেখালেখি। হতো কি সেই সময় বাড়িতে পত্রপত্রিকা দেখতাম। অবিভক্ত ভারতের, তখনকার আমলের কিছু পত্রপত্রিকা জমানোই থাকত। আমার ছোটবেলা তো খুব বেশি দূরে না ওইখান থেকে, সাতচল্লিশের পরপরই যখন একটু একটু জ্ঞান হচ্ছে মানে স্কুলে পড়ছি, তখন ওইখানকার পত্রপত্রিকা তখনও আসত ঢাকায়। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, বসুমতী–এই ধরনের সব পত্রিকা আসত। তারপরে কোলকাতা থেকে বেরত মোহাম্মদী, সেইটা আসত। ছোটদের লেখা ইয়ে আসত– শনিবারের চিঠি। এইগুলো পড়ার অনেক অনেক সুযোগ ছিল। তো সেইসব করতে করতে কবে কবে নিজে লেখালেখি শুরু করলাম ছোটদের মতোন করে। এবং একটা মজা ছিল যে, সাথে আবার ছবি আঁকার হাত আছে এর একটা প্রচারণা ছিল পাড়ায়, পরিবারে, স্কুলে… যে সে ছবি আঁকতে পারে। দেয়াল পত্রিকা করা হতো পাড়ায়, স্কুলেও হতো। যেহেতু আমি ছবি আঁকতে পারি অতএব ওইটার পুরাটা ভার থাকত আমার উপর (মানে শিল্প, অলঙ্করণ এইগুলোর–রাজু) ওই সুযোগে আমি আমার কিছু লেখা ওর মধ্যে দিয়ে দিতাম। ছড়াটড়া ইত্যাদি সুযোগ পেলেই দিয়ে দিতাম। ছাপানো যেত না কিন্তু ওতেই খুশি। এটাকে যদি শুরু ধরা হয় তাহলে এটা একটা শুরু। আমার প্রথম লেখা ছাপা হয় ইত্তেফাকে, গ্যাগারিন যখন মহাশূন্যে গেল, এইটার উপরে একটা লেখা ছাপা হয়েছিল প্রথম। ওইটা একটা বক্স করে ছাপানো হয়েছিল–আমার একটু একটু মনে আছে। বেশ উদ্বুদ্ধ হওয়ার মতোন অবস্থা।
Rafiqun Nabi_01
রাজু আলাউদ্দিন: তখন আপনার বয়স কত?
রফিকুন নবী: আমি তখন ক্লাশ নাইনে পড়ি বোধহয়। এই ছাপা অক্ষরের প্রথম আমার একটা লেখা। রূপকধর্মী, বলব যে একটু রঙময়; বিজ্ঞানের কল্যাণে মহাশূন্যে চলে গেল মানুষ, তারপরে অসীম বিশ্বের মধ্যেও মানুষের যে…. এইসব নিয়ে কী যেন লেখাটা। তো সেইটা ছাপা হলো, তারপরে তো অহরহ এদিকে ওদিকে লিখেছি, এখন আর অতো মনেও নাই। কালেকশনও নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: এক অর্থে লেখা এবং আঁকা প্রায় আপনার একই সময়ে শুরু।
রফিকুন নবী: আঁকা আরো আগেই শুরু হয়েছে, কারণ আমার বাবা ছবি আঁকতেন। তো বাবা ছবি আঁকতেন, উনি পুলিশের চাকরি করতেন এটা মিসফিড তার জন্য। এবং তার ডিপার্টমেন্ট থেকেও বলা হয়েছিল তুমি খামাখাই পুলিশের লাইনে এসছ। যার জন্য উনাকে সব সময় সাদা পোশাকে ঢাকায় কেরানির মতো থাকতে হতো।
রাজু আলাউদ্দিন: স্বস্তিবোধ করতেন না।
রফিকুন নবী: স্বস্তিবোধও করতেন না এবং ডিপার্টমেন্টও মনে হয় খুব একটা…
রাজু আলাউদ্দিন: চাপ দিতেন না তারে?
রফিকুন নবী: না চাপও না। এটাকে কী বলে! ডিপার্টমেন্টও খুব খুশি থাকত না এই নিয়ে। যাই হোক তাকে এইখানে অলমোস্ট এসবিতে ছিলেন সাদা পোশাকে, সারা জীবন, অফিস স্টাফের মতো। যাই হোক, উনি ছবি আঁকতেন। অফিস শেষ করে বাড়ি ফিরলেই তার সব সরঞ্জাম রেডি থাকত, ছবি আঁকতেন আমি দেখতাম। আমিও আঁকতাম। ছবি এঁকে একজন শিল্পীই যে হব এমন কোনো প্রতিজ্ঞা ছিল না। কিন্তু ‘হাত আছে ওর হাত আছে’–শুনতে শুনতে বাবা বলতেন যে আর্ট কলেজে ভর্তি করতে হবে। আমি জানতাম না যে আর্ট কলেজ ঢাকায় আছে কিনা। কোলকাতায় আছে এটে জানতাম। মেট্রিক পাশ করে ঢুকতে হয়। যাই হোক, এমনিই আঁকতাম। তবে ইলাস্ট্রেশন টিলাস্ট্রেশন এগুলা যেমন দেখতাম বিভিন্ন জনের, কোলকাতর শিল্পীদের, অন্যান্য বিদেশি শিল্পীদের, তারপরে এই যে বসুমতী, প্রবাসী, ভারতবর্ষ– এইসবের মধ্যে কোনো কোনো পত্রিকায় রিপ্রোডাকশন ছাপা হতো বড় বড় শিল্পীদের। রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বিনোদ বিহারী, যামিনী রায়, মহেন্দ্রনাথ সবার ছবি ছাপা হতো। সেইগুলা দেখার একটা অভিজ্ঞতা ছিল। কিন্তু আর্ট কলেজে কী লেখাপড়া হয় বা আর্ট কলেজ কী জানা ছিল না একেবারেই। ৫৯ সালে আমি মেট্রিক পাশ করলাম। আমার কপাল খুব ভালো যে আমাদের ওই ব্যাচটাতে প্রায় পনেরো ষোলজন ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছিল। কেউ কেউ প্লেস করেছিল। তখন তো বিশাল বোর্ড। আমার ফার্স্ট ডিভিশন হয়ে যাবে এটা খুব কঠিন ছিল তাও না। কারণ যেইভাবে সবাই পেয়েছিল আমিও পেয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কিন্তু আমি জানি যে আমার অঙ্কটঙ্ক বেশি সুবিধা হয়নি পরীক্ষায়। যার জন্যে ফার্স্ট ডিভিশনটা ফস্কে গেল। এই ফস্কে যাওয়াটা আমার জীবনের জন্য একটা ভালো বিষয়। এটা একটা লাক ফেবার করল। নয়তো বলত তুমি নটরডেমে ভর্তি হও। পরিবার থেকে না বললেও আশেপাশে পারিবারিক শুভানুধ্যায়ী থাকে না! আরো তো গুরুজন ছিল। মামারা ছিলেন নানা ছিলেন। তো এটা একটা লাক। সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করার কারণে আমার ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হলো। ইচ্ছাটা আবার আমারও যেমন আছে তেমনি আমার বাবারও ছিল। শিল্পকলার শিক্ষার জন্য যদি যেতে চায়, শিল্পী যদি হতে চায়– যাক, এই রকম। তারপর ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। পাশ করলাম। পাশ করে তারপর এই যে শুরু হয়ে গেল এখনো পর্যন্ত চলছে।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো সেই ব্যাচের, যিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন জয়নুল আবেদিনকে, তারপরে…
রফিকুন নবী: জয়নুল আবেদিন তো তখন ছিলেন না, ছিলেন অধ্যক্ষ হিসেবে।
রাজু আলাউদ্দিন: ছিলেন না মানে ক্লাশ নিতেন না!
রফিকুন নবী: হঠাৎ হঠাৎ নিতেন। কোনো শিক্ষকের এবসেন্সিতে উনি গিয়ে ক্লাশ নিতেন। তখন আমার মনে হয়েছিল আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই যে এ কোন রাজ্যে চলে আসলাম! এটা একেবারে অদেখা রাজ্য। দশ বছর যে স্কুলে পড়লাম সেই লেখাপড়ার সাথে তো এটার কোনো সম্পর্কই নাই। একমাত্র সাহিত্যের সাথে– বাংলা বলি ইংরেজি বলি– এই সাহিত্য যেটুকুন পড়েছিলাম টড়েছিলাম, তার সাথে একটা ভাবগত ব্যাপার স্যাপারের মিল আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আর অন্যসব বিষয়ে তো তেমন মিল নেই।
রফিকুন নবী: না। না অঙ্ক, না বিজ্ঞান– ওইভাবে তো আর নাই। তাতে করে হলো যে একেবারে বিশাল এক সমুদ্রের মধ্যে পড়ে গেলাম। ছবি আঁকা, আঁকতে পারা, প্রাকটিস করা এইটা একটা দিক। কিন্তু কেন আঁকছি কী জন্যে আঁকছি, কার জন্যে আঁকছি (কীভাবে আঁকছি— রাজু) এইটা হলো আরো অনেক বড় বিষয়। ভাবের সাথে এইটার একটা ব্যাপার আছে। ওইদিকটাই স্যারেরা শেখাতেন। ছবি আঁকা তো একটা সাবজেক্ট বসিয়ে দিতেন, মানুষ বসিয়ে দিতেন যে এটাকে আঁকো, গ্রামারের দিকগুলো শেখাচ্ছেন, ঠিক আছে, কিন্তু তার সাথে এই শিল্পতে কেন আসলাম, কেন ছবি আঁকব– এইদিকটাতে সবাই, সব স্যারেরাই, জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে তখনকার কনিষ্ঠতম শিক্ষক কাজী আব্দুল মতিন– সবার মুখে এই দেশ, সময়, তারপরে দেখা এইসব…. দেখ! দেখ মানে কী দেখব! চিরকাল দেখে আসলাম আবার কী দেখব! (এরপর আর কী দেখার আছে!— রাজু) ইনার সাইড দেখতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি আপনার বেশ কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে আপনি লিখেছেন। যেমন আনোয়ারুল হক, তারপরে আপনার সফিউদ্দীন আহমেদ, তারপরে কিবরিয়া, সেখানে আপনি উল্লেখ করছিলেন সফিউদ্দীন আহমেদই আপনাকে পাঠিয়েছিলেন গরু দেখার জন্য!
রফিকুন নবী: না না, জয়নুল আবেদিন।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ জয়নুল আবেদিন আপনাকে পঠিয়েছিলেন যে..পরীক্ষা।
রফিকুন নবী: বলতেন যে গরু আঁকাটাই বড় না। কার গরু..
রাজু আলাউদ্দিন: কার গরু, সেই গরুটির সামাজিক অবস্থান কী, খেতে পায় কি না!

রফিকুন নবী: গরু যদি খেতে না পায়, তার মানে তার মালিক খেতে পায় কি না। দেখ, ভালো করে দেখ। সে কি হাড্ডিসার না ইয়ে। তো বলেছিলেন যে আদর্শ গরু খোঁজার দরকার নেই। ওটা রচনাতে থাকে। তার দুইটা শিং আছে দুইটা কান আছে, লেজ আছে, চারটা পা আছে, খুর আছে– এটা তো হলো আদর্শ গরুর পরিচয়, তার সাইজ হবে এমন, নাদুসনুদুস– এটা দরকার নাই। গরু ভালো করে দেখ। একজন শিল্পী যখন দেখবে তখন কী কী দেখবে! তার হাড়হাড্ডি, তার পরিবেশ, কোথায় খায়, কোথায় ঘোরে, কোথায় চরে বেড়ায়, কার গরু– এইগুলা দেখ। এইসব বলেছিলেন। এইগুলো ছিল তখন লেখাপড়ার একটা বিষয়। দেশ, আমাদের দেশের অবস্থাটা কী, দেশের মানুষের অবস্থা কী, আর্থিক অবস্থা, আমাদের দেশের ভৌগলিক অবস্থা, তারপরে রঙ, অন্য দেশের সাথে কতটা মিল কতটা অমিল নানান কিছু। তাতে করে হলো কী যে, ছবি আঁকার যে একটা উল্লাস ছিল সেইটা থিতিয়ে গেল সাথে সাথে। এ তো কঠিন জায়গায় এসে পড়েছি। এত সহজ তো ব্যাপারটা না। রস আহরণ করতে হবে। প্রথমেই বলে দিলেন স্যারেরা যে, দেখ শিল্পী কিন্তু বানানো যাবে না তোমাকে। শিল্পী হওয়ার সমস্ত গুণাবলী নিজেকে অর্জন করতে হবে নিজের ভেতর থেকে। এইটার কোনো গ্রামার নাই। আমরা শুধু আঁকার গ্রামারটা ধরিয়ে দিতে পারি যে একটা পাখি আঁকতে গেলে তার ভঙ্গি এইসবগুলা শেখানো যাবে। কিন্তু এটাকে কত রসোত্তীর্ণ করবে, কী রস তুমি এই পাখির মধ্যে দেবে, শালিক আঁকলে তো হুবহু শালিকই হলো, এটা করবে না, আরও কিছু করার আছে..লাইন (রেখা) কী, লাইনের ভিতরের রস কোথায়, এরমধ্যে কিভাবে রস আনতে হবে– এইসব গভীর গভীর সব ভাবনা।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার শিক্ষকরা তো অসম্ভব যত্ন নিতেন ছাত্রদের।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ এখনো এখনো। এখনকার শিক্ষকরাও নেন। শিল্পকলার ছাত্রদের শুরুটা কিন্তু ওইভাবে করিয়েই দেয়। চোখ খুলে দেয়ার মতো।
রাজু আলাউদ্দিন: যেমন আনোয়ারুল হক শিক্ষক সম্পর্কে আপনি লিখেছিলেন যে, আপনাদেরকে আঁকতে নিয়ে গেল একটা জায়গায়। ( হ্যাঁ, কক্সবাজারে– নবী) ভুলে চা বোধহয় নিয়ে যাওয়া হয়নি।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ, চা সিগারেট এইগুলা না হলে স্যারের হয় না। এজন্য আমাদের চায়ের ইয়ে করতেন। এই, এখন চায়ের ব্রেক হোক। চা খাও। এইসব ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তারপর যে পাহাড়ে উঠেছিলেন সেই পাহাড় থেকে নেমে গিয়ে উনি নিজে ছাত্রদের জন্য…
রফিকুন নবী: হ্যাঁ যেহেতু আমরা পাহাড়ে কাজ করছিলাম, সেটা অনেক দূর, উনি নামলে দেখলাম এতটুক দেখা যায়। গেলেন, গিয়ে আবার চা ওখান থেকে নিয়ে আবার আসলেন। এসে বললেন, খাও চা খাও। ততক্ষণে বেলা বেড়ে গেল। রোদে.. ছবিটা আর আঁকা হলো না।
Razu-Ronobi-9
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার শিক্ষক জায়নুল আবেদিন উনি আপনাকে বলতেন যে, বিদেশে গেলে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন সেসব দেশের শিল্পাঙ্গন এবং সেখান থেকে গ্রহণ করতেন প্রয়োজনীয় রসদ। তো এইটা আমি একটু জানতে চাই, উনি যে বিদেশে গিয়ে বিদেশি শিল্পকর্ম দেখতেন এবং রসদ আহরণ করার কথা যেটা আপনি উল্লেখ করেছেন, সেটা উনার ছবিতে কিভাবে আছে? আমরা তো দেখি যেমন তার ছবিগুলো দেশজতা বা ধরেন কালের একটা চিহ্ন থাকবে, দেশের একটা চিহ্ন থাকবে– এইটা কি আপনি বিশ্লেষণ করবেন?
রফিকুন নবী: উনি কী দেখেছেন, কেমন দেখেছেন সেটা থেকে কিছু নিয়েছেন কি না বা কোনো প্রভাব এসেছে কি না, আমি নিজে অনেক খোঁজার চেষ্টা করেছি, পাইনি। উনি উনার মতো করে করতেন। দেখেছেন অনেক। এক্সপেরিয়েন্স নিতেন। এখন ধরেন এই যে আমরা বলি একাডেমিক শিক্ষাপদ্ধতি, গ্রামার– সেইটা তো ব্রিটিশ আমলের ব্যাপার সেইটা তো উনি শিখেছেন, জেনেছেন। একই জিনিস যতবারই দেখুন কিন্তু ছবির যে রস তিনি ওইটা….বলতেন, গেলাম, দেখলাম শিল্পীরা কী ভাবছে, ভাবাটাও তো…এটাকে কী বলব!
রাজু আলাউদ্দিন: লক্ষ করার বিষয়।
রফিকুন নবী: কী ভাবছে? কেন ভাবছে? যেমন উনি গোইয়ার খুব ভক্ত ছিলেন (ফ্রান্সিস্কো গোইয়া?–রাজু)। গোইয়া, সাংঘাতিকভাবে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ছিল তার। রাজ পরিবারের সাথে যুক্ত থেকেও উনি বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছেন। এটা তার ছবিতে আমরা দেখি– রিপ্রেশন, তারপরে অত্যাচার-নিপীড়ন এইগুলা তার ছবিতে আঁকতেন, দুঃখ-দুর্দশা। আবার রোমান্টিক ছবিও আঁকতেন। ন্যাকেড। একেবারে রোমান্টিক একটা মহিলা, ন্যুড, শুয়ে আছে। এই সেন্সটা ধরা। ছবির এসেন্স আর ভাবের সেন্স। এইগুলোকে দেখে উনি (আবেদিন) বলতেন। কিন্তু তার কাজ যখন করতেন তখন তার দেশ উপস্থিত হতো। প্যালেস্টাইনে গেলেন। প্যালেস্টাইনের যুদ্ধ, ধ্বংস ইত্যাদি দেখে সেইগুলা এঁকেছেন। এটা আবেদিন স্যারের একটা অদ্ভুত মানবিক একটা দিক ছিল। আমাদের মনপুরা নিয়ে এঁকেছেন। দুর্ভিক্ষ নিয়ে তার তো অসাধারণ কাজ আছে। সব স্যারই আলাদা বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে আসা। এডভান্স স্টাডিজ বা উচ্চশিক্ষা সবারই আছে বিদেশে। কেউ আমেরিকা কেউ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, আমি নিজেও গ্রিসে গিয়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: একটা ব্যাপার হলো যে, বাইরের শিল্পীর বা তার আগের শিল্পীর প্রভাব কোনো কোনোভাবে থাকতে পারে কিন্তু সেগুলো কে কতটা হাইড করে রাখতে পারে, কে কতটা লুকিয়ে রাখতে পারে বা অদৃশ্য করে ফেলতে পারে আর কি; সেটা কি একটা গুণ হতে পারে, মানে…
রফিকুন নবী: আমার মনে হয় না, অদৃশ্য করলে তো অদৃশ্য হয়েই গেল। শুধু ভাবটা নিতে পারে (ভাবটা নিতে পারে–রাজু)। সব শিল্পীরই নিজের হাত কখনোই কিন্তু অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় না হতে পারে না। আমি বলব যে প্রত্যেকে আজন্ম স্বকীয়তা নিয়েই জন্মায়। নকল করতে গেলে তো সেটা অন্য জিনিস। কিন্তু যখন আমি সৃজনশীল কাজে যাচ্ছি তখন কিন্তু কখনোই হুবহু আসবে না। দ্বিতীয় জয়নুল আবেদিন হওয়া যাবে না। দ্বিতীয় রফিকুন নবী চেষ্টা করলেও হবে না কেউ। কারণ আমার ছবিতে এমন কিছু থাকবে আমি ছবি আঁকতে গেলে অটোম্যাটিক্যালি ওইটা চলে আসবে। এইরকম হয়। পিকাসো এবং ব্রাক তারা যখন কিউবিস্ট হলেন, কিউবিজমের উপর কাজ করছেন, তখন ব্রাক এবং পিকাসো দুজনই কিন্তু একই সাবজেক্টের নিয়ে করেছেন কিন্তু পিকাসো পিকাসো হয়েছেন, ব্রাক ব্রাক হয়েছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা ঠিক।
রফিকুন নবী: এই রকম কখনো হবে না। আমি বিশ্বাস করি না আর কি। আমি দেখিনি এখনো।
রাজু আলাউদ্দিন: না আপনি ঠিক আছেন।
রফিকুন নবী: এবং অমুক অমুক স্যারেরা এই ধরনের মনোভাব নিয়ে কাজ করেছেন এইটা মাথায় ঢুকতে হবে। যেমন জয়নুল আবেদিন ড্রইং-প্রধান কাজ করতেন। অবনীন্দ্রনাথ ড্রইংএর কাজ করেছেন। তাদের ড্রইং সাংঘাতিক পাকা। কিন্তু আবার আমাদের মোহাম্মদ কিবরিয়া এসে উনি ফর্ম নিয়ে কাজ করলেন, টেক্সটার নিয়ে কাজ করলেন, রঙ নিয়ে কাজ করলেন, শুধুই রঙ একটা সাবজেক্ট। উনি জাপান গেলেন, গিয়ে সেইখানকার এ্যাবস্ট্রাক্ট…প্রভাবিত না, (উদ্বুদ্ধ হলেন–রাজু) উনি ওইগুলো শিখলেন, উদ্বুদ্ধ হলেন। প্রকৃতির থেকেই তো রঙ নিতে হয়। আমরা তো রঙ বানাতে পারব না। কী যেন বলে..
Rafiqun Nabi_02
রাজু আলাউদ্দিন: সৃষ্টি করতে পারব না।
রফিকুন নবী: সৃষ্টি করতে পারব না। কোনোটাই আমরা ইয়ের বাইরে যেতে পারিনি। কোনো ফর্মও আমরা অদেখা কিছুর মধ্যে যেতে পারিনি। যে যতই বলুন, আমরা কিন্তু চেনা ফর্মের মধ্যেই ঘুরি। চেনা রঙের মধ্যেই আমাদের চলাফেরা। এবং ওইখান থেকেই আমরা সব নিই। টোনাল ভেরিয়েশন্স দিয়ে…. শিল্পীরা তখন বৈচিত্র তৈরি করতে পারে। কিন্তু তাও প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিলে তো পারবে না। কোনোদিনই পারবে না। হবে না। নেভার পসিবল। এই চেষ্টাটা তো কম করেনি শিল্পীরা। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান শিল্পীরা কম করেনি। ওরা আঙুরকে আঙুর এরকম টসটসে করে ফেলল, ঝট করে দেখলে মনে হয় যে, আসল, অরজিনাল। কিন্তু তাতে কী হয়েছিল, আমরা বুঝতে পেরেছি তার দক্ষতা আছে খুব। আঁকার দক্ষতা, দেখার দক্ষতা, ধরার দক্ষতা। খুবই দক্ষ শিল্পী এইটা আমরা বুঝতে পারলাম। কিন্তু কেন উনি আঙ্গুর আঁকলেন সেইটা কিন্তু সবাই দেখবে না। আমরা স্টিল লাইফ কেন করি এটা কিন্তু সবাই বুঝবে না। যাইহোক এইগুলো সব তাত্ত্বিক বিষয়। আমাদের কথা হলো, আমরা দেশবিদেশে ঘুরি, যেইখান থেকে কথাটা এসেছিল, জয়নুল আবেদিন উনি ঘুরেছেন। আবেদিন স্যার বছরখানেক কাজ করেছিলেন লন্ডনে। লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে ওইখানে উনি এক বছর কাজ করেছিলেন। ইয়ে করেছিলেন, কী বলে ওই যে এডভান্স স্টাডিজের ছাত্র হিসেবে কাজটাজ করেছিলেন। তখনো তিনি দেখেছেন বড় বড় শিল্পীদের, শিল্পীদের দেখেছেন, তাদের কাজ দেখেছেন, ওঠাবসাও করেছেন। যেমন সফিউদ্দীন স্যারে তাই করেছিলেন। হেইটারের অত্যন্ত ভক্ত আমাদের সফিউদ্দীন স্যার। তার কাছ থেকে আঁকার ধরন ধারনের কিছু ব্যাপার দেখেছেন। ওগুলো নেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আবার সফিউদ্দীন হ্যাজ বিকাম সফিউদ্দীন এ্যাজ এ টোটাল।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস সেটা হলো যে, আপনি ভালোই জানেন, যখন কোনো শিল্পী রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি তীব্র হয়ে ওঠেন তখন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না? এই প্রশ্নটা আসছে, অনেক সময় ধরেন কোনো কবি যখন রাজনীতি দ্বারা বেশি আক্রান্তু হন তখন তার কবিতা শ্লোগানধর্মী হয়ে যেতে পারে। এর উদাহরণও আছে।
রফিকুন নবী: ব্যাপারটা আপেক্ষিক।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে উঠতে পারে কি না এই প্রশ্ন থেকে যায়।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ হতে পারে। রাজনীতি একটা ক্রুড সাইড অফ মি। ওই যে গোইয়ার কথা বললাম। তিনি রোমান্টিক ছবি আঁকতেন। তিনি টিপিকাল চিত্রকলার একেবারে রস দিয়ে যা যা করার করতেন। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলোর খারাপ জিনিসগুলোকে নিয়ে যখন তিনি কাজ করেছেন, সেইখানে উনি কিন্তু শিল্পরসটা…. একহাত দিয়েই তো বেরোচ্ছে। শিল্প থাকত। কিন্তু বিষয় রাজনীতি। দুর্ভিক্ষের ছবি আমাদের আবেদিন স্যার এঁকেছেন, সেটা কিন্তু অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে এক সময়। উনি এঁকেছেন রসোত্তীর্ণ করে। শিল্পকলার যা যা উপাদান থাকলে ভালো হয়– স্পেইস রাখবেন, ব্লাক ড্রইং করবেন, কম্পোজিশন এইভাবে সাজাবেন, সেই সাথে ড্রইংয়ের মধ্যে যে ইয়ে রয়েছে, কী যে বলে….
রাজু আলাউদ্দিন: ছন্দময়তা?
রফিকুন নবী: শক্তি, সেইগুলাও তার হাত দিয়ে এসেছে। এক্সপ্রেশন্স মানুষের কেমন হতে পারে, এই দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের, সেইটাও রেখেছেন। ইলাস্ট্রেটিভ ব্যাপারটা থাকা উচিত, সে দিকও রেখেছেন। আবার রসোত্তীর্ণ ভাবটা অটোম্যাটিক্যালি শিল্পীর হাত থেকে আসছে বলে সেটাও রয়ে গেছে। এইটা থাকে। কিন্তু আমি বলব, আমাদের কামরুল হাসান, উনি অত্যন্ত রাজনীতি সচেতন মানুষ। আবেদিন স্যারও তাই। সবাই বলতে গেলে, শিল্পীদের এই একটা গুণ রয়েছে তারা যেহেতু দেশ নিয়ে ভাবে, সমাজ নিয়ে ভাবে, সমাজের সুখদুঃখ নিয়ে ভাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা আপনারও আছে। শাহাবুদ্দিন আহমেদের, মুর্তজা বশীর, সবারই আছে।
রফিকুন নবী: সবারই আছে। এখন হয় কি, সবারই আছে, আমরা ফিল করি বটে, তবে… এই যে কামরুল ভাইয়ের কথা বলছিলাম। উনি কিন্তু নিজের একাডেমিক, সবকিছু মিলিয়ে একটা ভাবনাচিন্তা এবং দক্ষতা তৈরি করে একটা কাজ শুরু করেছিলেন তার মতো করে। যেমন কামরুল ভাইয়ের কাজ দেখলেই বোঝা এটা কামরুল ভাইয়ের কাজ।
রাজু আলাউদ্দিন: খুবই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
রফিকুন নবী: তার মধ্যে রোমান্টিকতা আছে। এইসব ছবি খুবই শক্তিশালী ছবি। এ্যাজ ড্রইং, কিংবা পেইন্টিং, এ্যাজ গুড এ্যাজ হি। যেকোনো বড় শিল্পীদের, যেমন জয়নুল আবেদিন স্যার, ইউরোপীয় বা ওয়েস্ট যেকোনো বড় শিল্পীদের একেবারে সমকক্ষ। কামরুল ভাইয়েরও কিন্তু সেইটা আছে। তিনি রাজনীতি সচেতন মানুষ। তার ছবিতে খুবই প্রচ্ছন্নে মাঝেমধ্যে হয়ত কিছু কিছু রাজনীতির এলিমেন্টস দিয়েছেন। কিন্তু তিনি তাকে দুটো ভাগ করে এঁকেছেন। রাজনীতির জন্যে যদি শ্লোগানধর্মী কিছু করতে হয়, রাজনীতির পক্ষে, দেশমূলক, মানুষ নিয়ে তখন অন্য ভাষা ব্যবহার করা উচিত। এবং সেই কাজটি তিনি পোস্টারে করেছেন, কার্টুনে করেছেন, সেখানে সরাসরি কথা বলা যায়। ছবির যে রস, শৈল্পিক রস, শৈল্পিক রসটাকে ব্যাহত করে খালি রাজনীতি দিবেন, এইটা করেননি। এইটা, গোইয়ার কথা বললাম তার ছবিতেও তাই। আবেদিন স্যারের দুর্ভিক্ষের ছবিতেও তাই।
রাজু আলাউদ্দিন: কিংবা আপনারটায় আমরা যদি যাই…
রফিকুন নবী: আমরা যখন কার্টুন শুরু করলাম ওইটাও রাজনীতির কারণেই শুরু হয়েছে। আমার তো কার্টুন শুরুই হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। কারণ পঞ্চাশ দশক আমরা স্কুলছাত্র অর্ধেক পর্যন্ত। তারপর আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম যখন তখন ষাট দশক শুরু হয়ে গেছে। সামরিক জান্তা আইয়ুব খান এসে হাজির হলো। তার আমলের নানান ঝুটঝামেলা, নানান নিপীড়ন– এইসব শুরু হলো। রবীন্দ্রনাথ থাকবে না। বাঙালিত্ব খর্ব করো। বায়ান্ন থেকে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন সেটা ক্রমে দানা বাঁধতে বাঁধতে ষাট দশকে অনেক আন্দোলনের মধ্যে ছড়াল। এইটা গুটিয়ে আসল মুক্তিযুদ্ধ। সব আন্দোলন কিন্তু এক সময় ছয় দফা আন্দোলনে গেল। ছয় দফা থেকে এগারো দফা। নানান ছিটানো আন্দোলন সব। তারপরে এইগুলা সব গুটিয়ে একখানে চলে এসে ঊনসত্তরে সব এক জায়গায় হলো। তারপরে মুক্তিযুদ্ধে এসে (বিস্ফোরিত হলো–রাজু) বিস্ফোরিত হলো। এই যে সময়টা, ষাট দশকে আমার তখন…
Rafiqun Nabi_03
রাজু আলাউদ্দিন: উত্থান!
রফিকুন নবী: (হেসে) না উত্থান বলব না, আমার ধীরে ধীরে জ্ঞান হচ্ছে: দেশ-কাল-রাজনীতি চতুর্দিকে, এবং অজান্তে জড়িয়ে পড়ছি। কিভাবে মিছিল হবে, একটা পোস্টার করো। তো সেই পোস্টার করতে গিয়ে একটু কার্টুনেস পোস্টার, এই মোনাইম খানের ক্যারিক্যাচার, আইয়ুব খানের ক্যারিক্যাচার করো। তখন পত্রিকায় এগুলো ছাপবে না। যতই আমি কার্টুন প্রাকটিস করি না কেন। ইউজুয়াল যেসব ড্রইং পেইন্টিং করতাম তার বাইরে এমনি এক্সারসাইজ হিসেবে কার্টুনগুলো করতাম। এক্সারসাইজ জাস্ট। খসড়া।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো ছাত্র অবস্থায় আপনি করছিলেন।
রফিকুন নবী: ছাত্র অবস্থায়। তখনই পোস্টার টোস্টারগুলোতে ইয়ে লাগানো শুরু হলো। একটু ড্রইঙ করো। আমাদের দাবি মানতে হবে বললেই তো সবটা হলো না। এটা আরেকটু ইন্টারেস্টিং করতে হবে। এই করতে করতে প্রাকটিস করতে করতে ঢুকেই পড়লাম কার্টুনের মধ্যে। তারপর একটা সময়ে দেখি যে সবার নজরে পড়ে যাচ্ছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার শুরু বোধহয় হয়েছিল ওই যে আব্দুল গনি হাজারীর ‘কালো পেঁচার ডায়রি’, ওখানে বোধহয় আপনার প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত ড্রইং শুরু হলো?
রফিকুন নবী: ওখানে শুধু ড্রইং। উনি আমাকে বলতেন কিছু একটা করে দিতে। আমি করতাম। করতে করতে সচিত্র সন্ধানীতে কিছু এমনি রসালো গ্যাগস, বিদেশি…। রাজনৈতিক না। তো সেইভাবে কিছু কাজ করে ফেললাম। এই কার্টুন ছাপা হলো। তখন আইয়ুব খানের আমলে রাজনৈতিক কার্টুন, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে কোনো পত্রিকা ছাপবে এই সাহস বা এই দুঃসাহস দেখানোটা আত্মহত্যা করার মতো হবে। কেউই ছাপবে না। একমাত্র মর্নিং নিউজ নামে একট পত্রিকা ছিল তখন, রাষ্ট্রীয় পয়সায় চলত, সেইটা সরকারি পত্রিকা, সরকারি বলতে ওইটা পুরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারা আজিজ নামে এক কার্টুনিস্টের ছবি রাখত, আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল, জয়নুর আবেদিন স্যার তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই আজিজের একমাত্র পলিটিক্যাল কার্টুন ছাপা হতো কিন্তু সেইটা বেশিরভাগই দেশকেন্দ্রীক না। তাদের বেশিরভাগ কার্টুনই হলো ইন্ডিয়া ভার্সেস পাকিস্তান, পাকিস্তান ভার্সেস ইন্ডিয়া। এইসব কার্টুন। আমার যদ্দুর ধারণা হয়েছিল উনি পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষ তো, ভাবভাবনা ইত্যাদি পাকিস্তানি। পাকিস্তানি বলতে একেবারে আইয়ুব খানপন্থী। আমার কার্টুন আবার এমন না। ওই যে কামরুল ভাই, কামরুল হাসান, এই বিষাক্তকে হত্যা করো… (এইসব জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে–রাজু)। উনি ভাগ করে নিয়েছিলেন। কার্টুন করতেন। ওইটাও একটা কার্টুন পোস্টারই। খুবই ফলপ্রসূ একটা অস্ত্র।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এইটা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রফিকুন নবী: তো শিল্পীদের কাছে রাজনীতি…. আমাদের চোখকান কিন্তু ঠিকই খোলা থাকে। হয়ত টকশোতে খুব সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে পারব না। বাংলাদেশের একটা দিক হলো, বাংলাদেশের মানুষ যে একেবারে নিম্নবিত্ত, বিত্তহীন, তিনিও কিন্তু রাজনীতির ধারণা রাখেন। বাংলাদেশের রাজনীতির অবস্থা কেমন, কোথায় কী হচ্ছে সব জানেন। সে রকম আমরা শিল্পী হিসেবে চোখকান আমাদের খোলা, আমরা জানি কোথায় কী হচ্ছে, কে মিছে কথা বলছে, কে ভালো কথা বলছে, কে ভালো কথা বলে পরবর্তীতে কিছু করবে না, কে খারাপ কথা বলে — এইগুলো আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু আমরা আমাদের ছবিতে, আমি অন্তত, আমার যে চিত্রকলা চর্চার মূল দিক, সেইখানে কখনো আমি ওইভাবে আনি না। আমি মাঝে মধ্যে… যেমন টোকাই-এর একটা এক্সিবিশন করলাম, সেই এক্সিবিশনে কার্টুন করিনি। টোকাই এ্যাজ রিয়েলিটি। সেইখানে কোনো ডায়ালগস নাই, কিন্তু ছবিটা আছে, ওইখানে ইচ্ছে করলে মানুষ রাজনীতি খুঁজে পেতে পারে। কারণ আমি ওটা রাজনৈতিকভাবেই উপস্থাপন করেছি। যেমন একটা ব্যারিকেড, প্রশস্ত রাজপথ সেখানে ব্যারিকেড আছে, পুলিশের কাঁটাতার, কাঁটাতারের ব্যারিকেড আর সেখানে কিছু স্যান্ডেল জুতা পড়ে আছে। এইটা খুবই… তবে কেউ ডাইরেক্টও বলতে পারে, তবে খুবই প্রচ্ছন্নে রাজনীতি আছে। হোয়াই ব্যারিকেড? ওই স্যান্ডেলগুলো ওখানে পড়ে রইল কেন? ওর মালিক গেল কোথায়? এই রকম রাজনীতি।
রাজু আলাউদ্দিন: ইঙ্গিতময়তার মধ্য দিয়ে..।
রফিকুন নবী: কারণ খুলে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাও যদি রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করি, সামাজিক যে অবস্থা, সমাজ এবং রাজনীতি দুটো অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটা আরেকটার উপর নির্ভর করে। এটা আমার ধারণা। এই যে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকে সেইটা আমরা বুঝতেই পারি। আর সেইটা ডাইরেক্টলি আঁকলে এতে মজা নেই।
Rafiqun Nabi_04
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার শিক্ষক জয়নুল আবেদিন আপনাকে একটা পরামর্শও দিয়েছিল যে, ফ্রেসকো করবা। কিন্তু এই মাধ্যমে তো আপনি কখনো কাজ করেননি।
রফিকুন নবী: না আমি ফ্রেসকো করিনি। ম্যুরাল করেছি। এক্সপেরিমেন্টাল হিসেবে ম্যুরাল করেছি। এই তো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের একটা ম্যুরাল করলাম, জল্লাদখানা। এগুলো অনুরোধে– আচ্ছা ঠিক আছে করব দেখি। এইরকম ম্যুরাল করেছি। রিলিফওয়ার্কের মতোন। ফ্রেসকোটাও শিখতে বলেছিলেন, যে তুমি বিদেশে যাচ্ছ, উনার ধারণাই ছিল ইতালি আর গ্রিসে গেলে ফ্রেসকো শিখতে পারব। তো গ্রিসে গিয়ে ফ্রেসকো শিখতে চেষ্টা করেছিলাম, সেইটা আবার মনাস্ট্রিতে(খৃষ্টানদের উপাসনালয়) গিয়ে শিখতে হবে। মনাস্ট্রিতে যেগাযোগ করা হলে তারা বলে, না, মুসলমান হবে না। আর ফেক নাম দিয়ে তো হবে না। পরে ওই লাইনেই আর যাইনি। আর এমনি গ্রিসে টুকরা টাকরাভাবে শিখলে শেখা যেত। কিন্তু আমি তো টিচার হিসেবে স্কলারশিপ পেয়ে ওখানে গিয়েছি। তো আবার প্রাইমারি থেকে শুরু করা তো আর সম্ভব না। এই রকম সব ঘটনা।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস, সেটা হলো আপনি ‘টোকাই’ সিরিজ শুরু করলেন বিচিত্রায় সাতাশি সালে তাই না?
রফিকুন নবী: না সাতাত্তর আটাত্তরে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো টোকাইয়ের ব্যাপারটা হলো এর মধ্য দিয়ে আপনি রাজনৈতিক সামাজিক পরিস্থিতিগুলোকে উপস্থাপন করেছেন।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ এটা পলিটিক্যাল এসপেক্টস। এগুলো অত বুদ্ধি-ফিকির করে রাখা না। কিছু কথা ইনোসেন্টলি বলে দেয়া। টোকাই কিছু কথা ইনোসেন্টলি বলে। তারমানে আমাকেই বলতে হয়। আমিই টোকাই। ওই যে বললাম বাংলাদেশের সব মনুষ রাজনীতি বোঝে, ওখানে আমি কী বললাম বুঝে ফেলেছে। তো সেজন্যই টোকাই একসেপ্টেড ক্যারেক্টর।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার দেশ সেরা জগত সেরা শিল্পীকথা বইয়ে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পী সম্পর্কে আপনি লিখেছেন, কারো কারো শিল্পকর্মের চমৎকার ব্যাখ্যাও আপনি দিছেন। (আমি আমার মতো করে দিয়েছি– নবী) তাদের টেকনিক সম্পর্কে বলেছেন। শিল্পী সুলতান সম্পর্কে আপনি লিখেছেন, কিন্তু আমার মনে হলো যে তার টেকনিক নিয়ে আলোচনা করেননি খুব একটা। অন্য শিল্পীদের টেকনিক নিয়ে আলোচনা আছে।
রফিকুন নবী: সুলতান ভাইয়ের টেকনিক মূখ্য ছিল না। এবং এটা বলার মতো কিছু মনে হয়নি আমার কাছে। কারণ উনি যা কাজ করেছেন, ডাইরেক্ট তুলি এবং রঙ দিয়ে কাজ করেছেন। এখানে খুব বেশি টেকচার দেয়া, এখানে ই দেব ওখানে ওটা দেব অতকিছু ভাবেননি। এমনকি পার্সপেক্টিভ নিজের মতো করেছেন। ইউজুয়াল পার্সপেক্টিভ রাখেননি। সেই জন্য টেকনিক নিয়ে বলার কিছু নেই। তার ছবি নিয়ে কিন্তু মানুষের অত ভাবনা নেই। ভালো করে খেয়াল করে দেখেন, সুলতান ভাইয়ের কাজ কিন্তু ছবি। আমরা যত শিল্পীরা, আর্টিস্টরা, উচ্চ পর্যায়ের শুভানুধ্যায়ী, বোদ্ধা, তাদের কাছে অনেক মূল্যবান। অনেক চিন্তাভাবনা করি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে, নড়াইল যদি যান তাহলে বুঝবেন, সাধারণ মানুষের কাছে সুলতান টেকনিক ফেকনিক না, তার জীবনে চলার যে টেকনিক, কিভাবে চলেছেন উনি, সাধু সাধু ভাব, সুফি সুফি ভাব, এই রকম একটা বেপরোয়া জীবন। পোশাক আশাক সবকিছু মিলিয়ে তার যে ইমেজ সেইটা পাবলিককে কিন্তু আকৃষ্ট করেছে বেশি। অসাধারণ। এবং তিনি সব চাইতে ভাগ্যবান বলব আমি, খুবই বড় মাপের একজন শিল্পী হিসেবে যে মানুষের কাছে গণ্য হয়ে কী বলব..
Rafiqun Nabi_06
রাজু আলাউদ্দিন: স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন..
রফিকুন নবী: স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন সেইটা কিন্তু অন্য কেউই অমন পায়নি, জীবদ্দশায়। তার নিজের শহর নড়াইল গেলে বুঝতে পারা যাবে যে মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কী রকম। সুলতান বলতে তারা পাগল। সুলতানের জন্য কী কী করবে না করবে… এই জিনিসটা কিন্তু অন্য কারো ক্ষেত্রে হয়নি। আবেদিন স্যার খুবই শ্রদ্ধার পাত্র কিন্তু তার দেশের মানুষ, জনসাধারণ, তারা কিন্তু তাকে নিয়ে খুব একটা…..(তারা তাকে খুব একটা চেনে না–রাজু) তাকে ওইভাবে চেনে না। নড়াইলিরা বলে, আমার, আমাদের সুলতান! কিন্তু আপনি ময়মনসিংহ কিশোরগঞ্জের ওইদিকে ‘আমাদের জয়নুল’ শুনবেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আপনি যেটা বলতে চাচ্ছেন, সুলতানের ছবিটি, এটা এভাবে তুলনা করা যায় কিনা, যেমন আপনি একট উপন্যাস পড়ছেন, কোনো উপন্যাসে শিল্পকুশলতা অনেক বেশি থাকে। সঙ্গে আবার একটা স্টোরিও থাকে আখ্যানও থাকে। আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে সুলতানের ছবিতে শিল্পকুশলতা বা বড় ধরণের আবিষ্কার এরকম কিছু নাই বলতে চাচ্ছেন?
রফিকুন নবী: না না তা না। আবিষ্কার তো আসলে তখনই স্বীকৃত হয় যখন চট করে বুঝে ফেলে যে এটা অমুক শিল্পীর ছবি। তারমানে এমন কিছু আছে ছবিটায় যেইটা দেখলে বোঝা যায় এটা অমুক শিল্পীর। তার হাতের ড্রইং, তার হাতের রঙ, তার হাতের বিষয় বিন্যাস। তার হাতের অন্যান্য উপাদান এলিমেন্টস। এই সমস্ত কিছু মিলে একটা স্টাইল তৈরি হয়। নিজের থেকে বুদ্ধি করে করে স্টাইল তৈরি হয় সেটাও আমি বলি না। অটোম্যাটিক্যালি একটা তৈরি হয়ে যায়। সুলতান ভাইয়ের ভিতর এরকম একটা স্টাইল আছে। একটা ধরন। তিনি গ্রামের মানুষ নিয়ে কাজ করেছেন। এই আামাদের কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ, তাদের গ্রাম, অবাধ মাঠ (চাষবাস–রাজু) চাষবাস, তাদের গৃহিণীরা, তাদের সংসারের বউঝি– এইসবকে নিয়েই কাজ করেছেন। মা ও ছেলেপেলে নিয়ে কাজ করেছেন। যে ফসল ফলায় স্বস্থ্যবান পুরুষ এঁকেছেন। এইগুলো তো একটা স্টাইলের মধ্যে পড়ে গেছে। একটা ধরনে পড়ে গেছে। সুলতানের ধরন। ধরেন আমি একটা চাষী আঁকলাম, মাসল টাসল দিয়ে স্বাস্থ্যবান কিছু। তুলনা আসবে যে, সুলতান সাহেবের মতো চেষ্টা আছে। তাহলে সুলতান সাহেবের মতো মানে কী! সুলতান সাহেবের একটা স্টাইল আছে। বা জয়নুল আবেদিনের।
রাজু আলাউদ্দিন: বা কামরুল হাসানের।
রফিকুন নবী: সবার। সফিউদ্দীন আহমেদ, সবার। সেইক্ষেত্রে সুলতানের ধরন একবারে পাকাপোক্ত নিজস্ব একটা ধরন। সেই ধরনটা বুঝতে হবে। কেন এমন, বুঝতে হবে। যারা শিল্পকলা সারা সময় দেখছে তারা বুঝতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অতসবের ভেতরে যায় না। ওদের কথা হলো সুলতান আমাদের মানুষ, আমাদের শিল্পী, উনি আমাদেরকে নিয়ে ছবি এঁকেছেন। আমাদের গ্রামবাংলার ছবি এঁকেছেন। এই খুশিতে তারা আত্মহারা। রসোত্তীর্ণটা যে কোথায় এতকিছু তারা ভাবে না।
Razu-Ronobi-3

Shepherd
রাজু আলাউদ্দিন
: নবী ভাই, যেমন এই ছবিটির স্পেইস( ‍Shepherd, Mixed media on paper, 146x 80 cm, 2016) কেউ কেউ অনেক স্পেইস ছেড়ে দিয়ে তারপরে ছবি আঁকে। কেউ হয়ত ওই স্পেইসটাকে অন্যভাবে ব্যবহার করে। যেমন আপনার এখানে, এই যে এখানে দূরে কতগুলো গরু ছাগল…
রফিকুন নবী: রাখাল আছে, ছাগল রাখা আছে, দূরে অবারিত মাঠ, দিগন্ত পর্যন্ত। কিন্তু এইখানে কম্পোজিশনের খাতিরেই হোক অথবা এইটার প্রয়োজন আছে, দূরের স্পেইসটাকে ইয়ে করার (দৃশ্যমান করার— রাজু) সেইখানে অনেক গরু ছাগলও রয়েছে। আর সাজানোটা, আমার বেশিরভাগ ছবিতে কম্পোজিশনটা কোথাও একটু ড্রামাটাইজ থাকবে। ক্যামেরার মধ্যে যা দেখলাম তা না। তা না আবার সাজিয়ে তুললে এটা আবার বোঝা যায়। আমি তো সাজাচ্ছি, দেখা জিসিটাকেই এখানে তুলে আনছি। আমার তো ক্লিক নাই। এতবড় একটা স্পেইস, যা ইচ্ছে তাই করতে পারি, তাই না? আমি এখানে রঙ রাখব ওইখানে রঙ রাখব না। ওইখানে লাইন থাকবে, এইখানে লাইন রাখব না। আমার ইচ্ছা। ছবির কারণে ক্রমশই এটা অটোম্যাটিক্যালি হতে থাকবে। ছেলেটা রিয়েলিটি। ছাগলগুলাও রিয়েলিটি। মাঠ কিন্তু নকশি। মানুষ বুঝবে গাছ আছে, ক্ষেতের আইল আছে, গরু আছে, দূরে। কিন্তু সবই আমার মতোন করে আবার সাজাবো। মাঠের যে ব্যাপারটা সেটাও রিয়েলিটি কিন্তু চারপাশটা ও ওর মতো নকশি করে দেখুক। ( সেইটা কিন্তু এই ছবিতে আছে–রাজু)
Razu-Ronobi-4
এই এলিমেন্টস, এই ছাগল এইগুলো রিয়েলিটি। খোলা চোখে দেখলে সব রিয়াল। অত রিয়াল না কিন্তু। মানুষ তো এই রকম না। (ভেতরের অদৃশ্য একটা বাস্তবতা যা আপনি কম্পজিশনে..রাজু) এই যে সাজানো, একটা নকশি ভাব আছে। এরমধ্যে অনেক বিভাজন অনেক ভাগ টেক্সটার আছে। এর মধ্যে একটা প্লেইন দেয়া হলে ভাল্লাগবে না। কিন্তু ওরমধ্যে সব এলিমেন্ট দিলে ভালো লাগতে পারে। এইগুলাকে সাজানো আর কি।

রাজু আলাউদ্দিন: আমি স্পেইসের কথাটা আনলাম এই জন্য যে জয়নুল আবেদিন ছাত্রদেরকে স্পেইস ছেড়ে দিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিতেন অনেক সময়।
রফিকুন নবী: উনি বলে না, আবার সব শিল্পীকে দিতেন–অমন না। ক্যানভাসে একটা স্পেইস আমাকে দেয়া হলো, এরমধ্যে তুমি ছবি আঁকো। এখন আমি ইচ্ছা করলে পুরা স্পেইস ভরাট করে কাজ করতে পারি। স্পেইসকে ভরিয়ে ফেলা। কিন্তু যা দিয়ে করলাম সেইখানে আমাকে ওই রঙের মতো স্পেইস রাখতে হচ্ছে। আমি এইদিকে তাকালাম না, এই যে এদ্দূর পর্যন্ত। এখানে স্পেইস রইল। আমি রঙ দিয়ে স্পেইস ভরলাম বটে কিন্তু স্পেইটা কিন্তু থেকে গেল।
Razu-Ronobi-5 স্পেইসটা কিন্তু থাকছেই। ওই ছবিতে যে বিষয়টা মা ও বাচ্চা, পিছনে যে স্পেইস রয়ে গেল ওই স্পেইসে আবার কাজ হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি দেখেছি যে আপনি স্পেইসটা ওইভাবে রেখে দেন– অমন কিন্তু না। কিছু না কিছু দিয়ে ভরাট করে দেন।
রফিকুন নবী: আকাশ তো পুরা স্পেইস। তো আকাশ দিলে ছবির বিষয়ের যদি ব্যাপার থাকে তখন এই পুরা স্কাই সাদা ছেড়ে দিব কি দিব না সেটা ভাবতে হয়। সেই আকাশে যদি দুটো মেঘ দিয়ে দিই, একটা ব্রেক হয়। আবার বৃষ্টি দিলে সেটা আবার স্পেইসে হারিয়ে যায়। খোলা স্পেইস, অতবড় স্পেইসকে রেখে দিলাম। একেবারে ব্লাঙ্ক স্পেইস, ওতে আমি একটা রংধনু দিলাম। এটা আমি যদি পছন্দ না করি তাহলে ভেঙে দিতে পারি। কারণ বিষয় তো থাকতেই পারে।
রাজু আলাউদ্দিন: পপ আর্টিস্টদের অনেককে দেখা যায় বিশাল স্পেস একদম ব্লাঙ্ক রেখে দিছেন।
রফিকুন নবী: ব্লাঙ্ক রেখে দিছে। মানে স্পেইস একটা ঘটনা আমাদের ছবিতে। এটা একটা বিরাট ব্যাপার। যা এলিমেন্টস দিচ্ছি স্পেইসে সেইটা যদি ভুলভ্রান্তির মধ্যে হয়ে যায় তাহলে কিন্তু পুরাটা ভণ্ডল হয়ে যাবে। ভাল্লাগবে না। ভরাট করার একটা ব্যাপার আছে। আমি সব জায়গায় এই কথাটা বলি। পাবলো পিকাসোকে একবার নাকি জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ছবি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এতো ভাবনাচিন্তা কিভাবে করেন? উনি বললেন যে দেখ, ক্যানভাস সেটা যতবড় হোক বা যত ছোট হোক, এইটা যখন সামনে নিয়ে বসি যত বড়ই হোক যত ছোটই হোক, এতটুকুন যেমন আমার কাছে মহাসমুদ্রের মতোন মনে হয়, তেমনি অত বড় হলেও তাই মনে হয়। এবং এইটা অত ভেবেচিন্তে.. একটা স্পেইস সামনে আছে, এক সময় বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ শুরু করে দিই, এপার থেকে শুরু করি একটা সময় এসে সমুদ্রের ওইপারে চলে যাই। তখন পেইন্টিঙটা শেষ হয়। আমি সেমিনারে কথা বলে ফেলছি আসলে হাহাহা।

রাজু আলাউদ্দিন: না না, ঠিক আছে। আরেকটা ব্যাপার আপনি কিবরিয়া স্যারের কথা বলেছিলেন আর কি, উনি নাকি বলতেন, ছবি আঁকতে গেলে বিশ্বের নানা অংশের সাহিত্য যেমন পড়া উচিত তেমনি চলচ্চিত্রসহ শিল্পকলার অন্যান্য মাধ্যমকেও বোঝা থাকা উচিত!
রফিকুন নবী: উনি বলতেন, আমরাও বলেছি। পরবর্তীতে তাদের কাছ থেকে এসব কথা শুনে শিখে আমরাও তো সেই একই কথা বলি। চারপাশ না দেখলে হবে না। আমরা সাহিত্যের কথা বলি। সাহিত্য বলতে শুধু উপন্যাস পড়তে হবে তা না। নানাদিক সেখানে। কবিতা অত্যন্ত কাছাকাছি আমাদের চিত্রশিল্পের।
রাজু আলাউদ্দিন: মার্ক শাগাল সম্পর্কে আপনি বলছিলেন।
রফিকুন নবী: হ্যাঁ মার্ক শাগালের ছবি কিন্তু অনেক কাব্যিক। এইগুলা জানতে হবে পড়তে হবে দেখতে হবে। রস গ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে। আবার অনেকেই আছেন যারা কিছু না দেখেও কিন্তু…. গুহাচিত্রের শিল্পীরা কার ছবি দেখেছিল আর কার লেখা পড়েছিল! তারা তো জীবন থেকে নিয়ে এই কাণ্ড করেছে। আর আজও পর্যন্ত এখনো পর্যন্ত সেগুলো অসাধারণ। ওইখান থেকে আমরা বেরোতে পারিনি কিন্তু খুব বেশি দূর। উদ্যোগ করছি নানা রকম ফর্ম এনে, দেশি বিদেশি সব শিল্পীদের তত্ত্বাবধানে। যুগ যুগ ধরে মানুষ এঁকে আসছে, করছে নানান কিছু। কিন্তু গোড়াটা হলো সেইখানে। একদম আদি। কিবরিয়া স্যার যেটা বলেছেন সেইটা সব শিল্পীরাই বলেন। লেখাপড়া করা, সিনেমা দেখা, খালি ভালোই দেখতে হবে আমি বিশ্বাস করি না। যতক্ষণ খারাপ ছবি না দেখবে ততক্ষণ ভালো ছবি বুঝতে পারবে না। খালি সত্যজিৎ দেখলেই কিন্তু সত্যজিৎকে… (সত্যজিৎকে চেনা যাবে না–রাজু) হ্যাঁ, খালি সত্যজিৎ দেখলাম তো বুঝলাম হ্যাঁ সত্যজিৎ-র ছবি এমন। পচা ছবি থেকে খারাপ ছবি থেকে সত্যজিৎ কেন এতদূরে, তার কী আছে সেইটা কিন্তু যাচাই করার ব্যাপার তখন আর হয় না।

রাজু আলাউদ্দিন: মানে তূল্যমূল্য বোধটা তৈরি করার জন্যই এটার দরকার আছে।
রফিকুন নবী: অতএব ওইদিকটা থাকতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: জানতে চাইছি, আপনি বলছিলেন যে শিল্পী আমিনুল ইসলামের সাথে লাতিন আমেরিকার এক শিল্পীর সম্পর্ক ছিল, তারা বন্ধু ছিলেন। আমাদের এখানে তো খুব কম শিল্পীরই ওই জগতের শিল্পীদের সাথে সম্পর্ক, খুব কম। বা সম্পর্ক গড়ে ওঠেইনি ঘটনাক্রমে।
রফিকুন নবী: লেখাপড়ার সুবাদে ইতালিতে ফের্নান্দো বোতেরোর সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে পরবর্তীকালে বিশ্বের অন্যতম সেরা শিল্পীদের একজন হয়েছেন। আমাদের দেশ বলে কথা। আমাদের নিজ বাড়িতেই যা কিছু। আমিনুল ইসলাম অসাধারণ একজন শক্তিধর শিল্পী। উনি পরবর্তীতে তো বিশ্বের অন্যান্য ইসে… তো ওই পর্যন্ত আমাদের পক্ষে পেঁছনো কঠিন। তাদের অন্য একসেপ্টেন্স তৈরি হয়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি বলছিলেন যে ম্যুরাল কিছু করেছেন।
রফিকুন নবী: ম্যুরাল করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন যে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক যে জায়গায় আমরা পৌঁছে গেছি, আমি বলতে চাচ্ছি মানুষ এখন অনেক বেশি ধর্মমুখী, আচারনিষ্ঠ, ধর্মীয়ভাবে আচারনিষ্ঠ অনেক বেশি। এবং আপনি যদি বলেন তাহলে কিছুটা মৌলবাদিতার দিকেও কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে অনেকে। সেক্ষেত্রে ম্যুরাল অনেক বেশি বাইরের, অনেক বেশি উন্মোচিত এক শিল্পকর্ম। সেই অর্থে ম্যুরালের সম্ভাবনা কতটুকু মনে হয় আপনার কাছে, আমাদের এই সাংস্কৃতিক অবস্থায়?
রফিকুন নবী: না, হচ্ছে তো। ম্যুরালে সব সময় একটা পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপার থাকে। আমি ব্যক্তিগত খরচ করে পেইন্টিং করি–ঠিক আছে। ব্যক্তিগত ইচ্ছায় ঘরের মধ্যে বসে বা স্টুডিওতে বসে কাজ করছি। কিন্তু একটা ভাস্কর্য একটা ম্যুরাল এর পেছনে যে খরচখরচা তারপর এটাকে কোথায় রাখা হবে– সবকিছু মিলিয়ে এর পেছনে একটা পৃষ্ঠপোষকতা লাগে। এই পৃষ্ঠপোষকরা যতদিন পর্যন্ত সাপোর্ট দিবে এটা হতেই থাকবে। পৃষ্ঠপোষক যদি সরে যায় তাহলে ভাস্কর্য নিজে নিজে আর্টিস্টরা আর কয়টা করবে!

রাজু আলাউদ্দিন: আমি প্রশ্নটা করছিলাম এই জন্য যে, ধরেন, পৃষ্ঠপোষক থাকার পরেও এখনকার এই সাংস্কৃতিক অবস্থায় কি সেইগুলো সম্ভব হবে? যেমন ধরেন যে অনেক মূর্তি ভেঙে দেয়ার জন্য বলা হয়। আদালতের সামনে যে মূর্তি তৈরি করা হয়েছে সেটিও কিন্তু ভেঙে দেয়ার জন্য দাবি উঠছে।
রফিকুন নবী: মূর্তি না, আমি মূর্তি বলি না, ভাস্কর্য (হ্যাঁ ভাস্কর্য— রাজু), অনেক ভাস্কর্য আছে গুণেমানে খুব পচা, সেইগুলা তো আমিও বলি যে এইগুলা খামাখা কেন রাখা হয়! এখন আমাকে ওই ভাস্কর যদি বলে মৌলবাদী, তাহলে তো বিপদ। কিন্তু মৌলবাদিতা তো ধর্মের কারণে যেটা বলে। সেইটা হলো খুব খতরনাক সাইড। ওইটা ঠিক না। আরে শিল্পকলা চলবে শিল্পকলার পথে। আমরা শিল্পকলার যে আঁকাআঁকি করি এই ট্যালেন্টটা তো আল্লাহ দিয়েছেন। সবাইকে দেয়নি। যে গান গায় এটা ট্যালেন্ট। সবাই তো গান গাইতে পারে না। একজন পারে। কী কারণে পারে? তার ভেতরে ওটা রয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আবার ওরা যে বলে ছবি আঁকা ইসলামে নিষেধ, এখন আপনি বলছেন যে আল্লাহ দিয়েছেন এই ট্যালেন্ট!

রফিকুন নবী: আল্লায় যদি না দেয় তাহলে তো হবে না। কী হবে! যদি আমি ওইভাবে কথা বলি, তাহলে কিন্তু বলতেই হবে যে, এই পুরা প্রশংসার দাবি হলো সৃষ্টিকর্তার, যিনি এইসব গুছিয়ে গাছিয়ে দেয় যে একে গানের ইয়েটা দিয়ে দাও। কোটি কোটি মানুষ, সবাই কি গান গাইতে পারে! পারে না। কেউ কেউ পারে। কী করে শিখেছে! বাবা গান গাইত। বাবার উপর এটা ছিল। ছেলের মধ্যে সেইটা আবার এসছে। জিনের ব্যাপার আছে। এইগুলাকেই আধুনিককালে ওইভাবে বলে হবে না। যেই সময়ে ওসব কথা বলা হয়েছিল, সেটা তো আজ থেকে বহুকাল আগের কথা। তখন এইটা তাদের কাছে কোনো না কোনোভাবে প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল যে এর মধ্যে ডুবে থাকলে তো হবে না। আরে বেটা যুদ্ধ তো করতে হবে। খেটেখুটে খেতে হবে। এমন বাস্তব ব্যাপার ছিল। এখন সেইগুলা ধরে থাকলে তো হবে না। এটা তো কাউকে ক্ষতি করছে না। এটা কাউকে ক্ষতি করছে?
রাজু আলাউদ্দিন: না, করছে না তো। তাহলে তারা কেন এইগুলি নিষেধ করতে চায়!
রফিকুন নবী: এইটা হলো একটা অংশ, তারা এই জিনিসগুলা একেবারে…. কী বলে এটাকে (খুবই কট্টর অবস্থান থেকে— রাজু) খুবই কট্টর অবস্থান থেকে বিশ্বাস করে তারা তাদের লাইনে এইসব করছে। আমরা তো তাদেরকে শেখাতেও পারিনি। শেখানোর একটা ব্যাপার আছে। শেখানোটা যদি অর্গানাইজ করা যেত! এটা একা তো কেউ পারবে না। এইটা তাদেরকে বোঝানোর, একটা শিক্ষনীয় ব্যাপার আছে। আমার বাচ্চা যখন ছোট ছিল, স্কুলে ড্রইং ট্রইং করতে হতো, বাড়িতে ড্রইংগুলো করে কিন্তু আরবি পড়তে হতো, মৌলবি স্যার ওকে আরবি পড়ায়, তো জানে যে বাবা শিল্পী, তো তিনি আবার ওর খাতায় খেজুর গাছে মানুষ উঠে খেজুরের রসের হাঁড়িপাতিল পাতছে এই ছবি এঁকে বলে যে বাবাকে দেখাবা! তিনিও তো হুজুর। এইটা একেবারে ইচ্ছার উপরে। আবার অনেকের মতে ছবি আঁকা খারাপ। তাদেরও ভালো লাগে কিন্তু দমন করে রাখে ইচ্ছাটা।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি বলতে চাচ্ছি এদেরকে আসলে শিক্ষা দেয়া হয় না, শিক্ষা পায় না বলে এই অবস্থা। এবং এদেরকে বিচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে বলে এরা এইসব শিল্পকর্মের বিপক্ষে।
Rafiqun Nabi_07
রফিকুন নবী: সঙ্গীতকে তারা মানা করে। আরে এই যে আজানটা দেয় (এটা তো সুরের উপরেইÑরাজু) মানুষকে আকৃষ্ট করার মতে সুরের কারণ আছে। এই যে যারা মুয়াজ্জিন, একেক জনের একে রকম গলা। একেকজন একেক সুরে আজান দিচ্ছে। এটা তো সঙ্গীতেরই মতো। আরব বললেই আমাদের মনে হয় যেন তারা জায়নামাজে পড়ে থাকে সব সময়। তাদের সবই আছে। কালচার আছে। ছবি আঁকছে, মানুষ আঁকছে, ন্যুড আঁকছে। সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে আমরা তাদের ক্যাটালগ দেখেছি। অনেক কিছুই করছে আমরা দূর থেকে এগুলো বুঝতে পারি না। কূয়ার মধ্যে আছি। এই যে ইরাক, সিরিয়া এইসব অঞ্চলে বেদুইনদের কিছু মিউজিক আছে। কাফেলা যায়, মরুদ্যানে পৌঁছাল, রাতে রেস্ট, তাবু খাটালো, তখন কিছু গানটান গায়। ওগুলো তো ধর্মীয় গান না। ওগুলো প্রকৃতিপ্রেমের গান, রোমান্টিক গান।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি যেইটার কথা উল্লেখ করছেন মোকাম, আপনাকে কেউ গিফট করছে।
রফিকুন নবী: অসাধারণ শৈলী। আমাদের অনেক রাগ আছে যেগুলা আরব থেকে এসছে। ওই রাগরাগিনি, আমার অবশ্য এগুলোর উৎস সম্পর্কে ধারণা নাই তবে এগুলো আরব থেকে এসছে। তো এগুলো হলো অনুভূতির ব্যাপার, ফিলিঙের ব্যাপার। আপনি একশ বছর বা আশি বছর বাঁচবেন, আশি বছর বাঁচতে গেলে আপনি তো বোর হয়ে যাবেন। খালি ছবি আঁকলেই তো হবে না। আরো তো সাইডে তাকাতে হবে। আমার নিজের জন্যও তাকাতে হবে। খেতে গেলেও ওটা মিনিকেট চাল না অন্য চাল পছন্দ করে তারপর তো নিব!
রাজু আলাউদ্দিন: মানে অনেক কিছু লাগে বেঁচে থাকতে গেলে।
Rafiqun Nabi_08
রফিকুন নবী: আশেপাশে অনেক কিছু দেয়া হয়েছে। নদী রয়েছে, পাহাড় রয়েছে। সমভূমি রয়েছে। মালভূমি রয়েছে। নদীর স্রোত আছে তাতে মাছ আছে। এগুলো এ্যাপ্রিশিয়েট করতে হবে তো। এই এত সুন্দর প্রকৃতি, তাদের কথাই যদি ভাবি, এত সুন্দর প্রকৃতি, এই আকাশ, এই তারকা যাবতীয় যা কিছু আছে আমাদের জন্যই কিন্তু রাখা হয়েছে। না হলে মানুষ বোর হয়ে যেত। এক বছরের মধ্যে বলত– আল্লাহ তুমি আমারে নিয়া যাও। আমার এই পৃথিবী ভাল্লাগে না। আমরা যারা শিল্পী, গান গায়, ভাস্কর্য করে, কবিতা লেখে– তারা কিন্তু ওই প্রশস্তিটাই গায়।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি মেক্সিকোতে গিয়েছিলেন টোকাইকে নিয়ে। তো সেখানকার বড় বড় শিল্পীদের কাজ আপনি দেখেছেন। কেমন লেগেছে সেইসব কাজ?
রফিকুন নবী: এ তো অসাধারণ। আগে তো রিপ্রোডাকশন দেখেছি ছোট্ট ছোট্ট। তো ওইখানে যাওয়ার পরে বিশেষ করে তাদের যে ম্যুরাল, যে ফ্রেসকো, পুরনো রাজপ্রাসাদের সাথে যেটা করা মিনি স্কয়ারের, সেটা দেখেছি আর রিভেরার থেকে শুরু করে সবার কাজ আছে। এছাড়াও এমনিতেও কিছু কাজ দেখেছি- ওরোস্কো, সিকিউরেস, ফ্রিদা কালো– সবার অরিজিনাল কাজ দেখতে পাওয়া এটা বড় ব্যাপার। আমার কাছে অবাক লাগে মেক্সিকো সাউথ নর্থের মাঝামাঝি একটা অঞ্চল। গরিব দেশ। আসটেক, ওই সময় থেকে এখনো আসটেকরা আছে। খেলাধুলা দেখিয়ে পয়সা কামায়। সেইখানে চলাফেরার মধ্যে, অভ্যাসাদির মধ্যে আমাদের মতোনই অনেক ব্যাপার আছে। কষ্ট আছে বলেই মনে হয় ম্যাক্সিকোতে বড় শিল্পীদের জন্ম হয়েছে।
Razu-Ronobi-6
রাজু আলাউদ্দিন: সেটা তো আমাদেরও আছে।
রফিকুন নবী: সেটা তো আমাদেরও আছে। জয়নুল আবেদিনরা তো বেরিয়েছেন। কিন্তু ইউরোপ আমাদের ওইভাবে একসেপ্ট করেনি। কিন্তু সামহাউ আমেরিকা কাছে ছিল বলে মেক্সিকান শিল্পীদের প্রজেকশনটা হয়েছে। পরবর্তীতে আমেরিকা কী করেছে? তারা প্রথমেই এদেরকে কিনেছে। সবাই তো প্রোগ্রেসিভ রাজনীতিতে বিশ্বাসী প্রবলভাবে। রিভেরা, তারা ওঠাবসা করেছে ট্রটস্কির সাথে, ওঠাবসা করেছে চে গেভারার সাথে । কিউবান লাইন টাইন এইগুলো তাদের সাংঘাতিক… এইখানে একটা নেতৃত্বও ছিল। তাদেরকে খর্ব করার জন্য তো আমেরিকার চোখ পড়ল। এই বড়লোকরা, রকফেলাররা তাদের দিয়ে ম্যুরাল করাল। এই যে পাবলিসিটিটা হচ্ছে, হতে হতে হতে হতে তারা বিরাট হয়ে গেল। রিভেরাদের কাজ শেষ। পরবর্তীকালেও কিন্তু ওই পর্যন্তই। আমাদের উপর বৃটিশ ছিল। তবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার অবস্থাটা হয়নি। আমি নষ্টই বললাম। রিভেরার ফ্লোটা নষ্ট হয়ে গেল। আমি যখন মেক্সিকানদের সাথে আলাপ করি তখন কিন্তু ওই রিভেরা ওই ওরোস্কো ওই ফ্রিদা কালো–এইখানে গিয়ে ঠেকি।

রাজু আলাউদ্দিন
: তো যেই টোকাই আপনাকে সুদূর মেক্সিকোতে নিয়ে গিয়েছিল সেই টোকাইয়ের জন্য কি কোনো স্মৃতিকাতরতা বোধ করেন?
রফিকুন নবী: আমাকে যে কেন পছন্দ করেছিল সবাই আমি জানি না, বাংলাদেশ থেকে আমি যাব– এইটা ওয়ার্কার্স পার্টি তারা একটা নাগরিক কমিটি টমিটি করে সিলেকশন করেছিল। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে একটা কোর্ট বসেছিল মেক্সিকোতে। তো টোকাই শিশুশ্রম করেনি। কোনো কাজই করেনি। ও তো খায়দায় পথেঘাটে ঘোরে, খেতে পেলে খায় না পেলে নাই। কিন্তু কোনো চাকরি বাকরি করেনি টোকাই। তারপরেও শিশু বলে শিশুশ্রমের প্রতীক ধরে তারা আমাকে নিয়ে গেল ওইখানে। গিয়ে তো আমি অবাক হয়ে গেলাম এটাও একটা মক কোর্টরুম। বিশাল অডিটোরিয়াম।
রাজু আলাউদ্দিন: ওটা কি মেক্সিকো সিটিতে?

রফিকুন নবী: একদম সিটিতে। সেই পুলিশ টুলিশ দিয়ে ঘেরাও টেরাও করে সিরিয়াস অবস্থা। সব দেশের প্রতিনিধি আসছিল। তো সেইখানে আমার কিছু টোকাই, কিছু অন্যান্য কার্টুন এগুলা ওইখানে এক্সিবিট ছিল। ওই একটাই এক্সিবিশন ওখানে ছিল সেটা বাংলাদেশ থেকে…। অন্যরা অন্য রকম সব ইয়ে টিয়ে নিয়ে গেছে। তো ওইখানেও আই ওয়াজ ওয়ান অফ দ্যা জাজেস। সেখানে শিশুশ্রমের যে কোর্ট বসেছিল সেখানে আমি সাতজন জজ সাহেবের একজন।
Razu-Ronobi-8
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি লিখেছেন ওটা আপনার বইয়ে। আপনি তো প্রচুর বইয়ের অলঙ্করণ করেছেন, প্রচ্ছদ করেছেন। এইসব কাজ করতে গিয়ে আপনার বড় কাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে হয়নি?
রফিকুন নবী: এইটা অনেক সময় পরিপূরকের কাজও করে। ছোট কাজ করি বটে। কিন্তু ওইটার যেমন একটা আনন্দ আছে, অন্য রকম প্রাপ্তি আছে, তেমনি যখন বড় কাজ করি তখন কিন্তু ওইগুলোকেই এখানে আবার রিপ্রেজেন্ট করি। কিন্তু ওই (ছোট কাজ) কাজ করি বলে এই কাজে (বড় কাজে) সাহসটা পাই।
রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে ক্ষতি করছে না কোনো।
রফিকুন নবী: ক্ষতির কোনো প্রশ্নই আসে না। কারণ দুটোই কাজ। একটা বড় ক্যানভাস একটা ছোট ক্যানভাস। তফাৎটা এখানে।
রাজু আলাউদ্দিন: অনেক ধন্যবাদ নবী ভাই। দীর্ঘ সময় দিলেন এজন্য কৃতজ্ঞতা।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — জুন ৪, ২০১৭ @ ২:১০ পূর্বাহ্ন

      স্যালুট রাজু ভাই। অসাধারণ কাজ। আপনার ও নবী স্যারের জন্য ভালোবাসা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শেখর দেব — জুন ৫, ২০১৭ @ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগলো। এরকম পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার খুব দরকার। কবি ও সম্পাদক রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।