সি. পি. কাভাফির কবিতা

কুমার চক্রবর্তী | ২৯ এপ্রিল ২০১৭ ১০:৪২ পূর্বাহ্ন

Cavafyগ্রিক কবিতায় অবিস্মরণীয় এক নাম কনস্তানতিন কাভাফি ১৮৬৩ সালের ২৯ এপ্রিল আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কর্মসূত্রে তিনি ছিলেন সরকারি চাকুরে, ১৮৯২ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে তিনি যে পদ পান এবং সেখানেই অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। একই সময়ে তিনি লেখালেখি করতে থাকেন, তাঁর প্রথম দিকের লেখালেখিতে গ্রিক ইতিহাস, পুরাণ, ধ্রুপদি ও হেলেনীয়, বাইজানটীয় বিষয়বস্তুর প্রাধান্য ছিল। তিনি তাঁর মা হারিক্লেইয়া-র সাথে রাতের খাবার খেতেন, তারপর অধিকাংশ সময়ে পালিয়ে শহরের সমকামী পল্লিতে ঢুকে যেতেন। এই বিষয়টি তাঁর লেখাকে ঋদ্ধ করেছে। মানবকামের গূঢ়ৈষা তাঁর অভীপ্সিত ছিল। আজীবন ধুমপায়ী কাভাফি ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৩২ সালের গ্রীষ্মে চিকিৎসার জন্য আথেন্সে এসে পরে ফিরে যান তাঁর প্রিয় আলেকজান্দ্রিয়ায়, সেখানেই পরের বছর সত্তরতম জন্মদিনে মারা যান। তাঁর সম্পর্কে ই. এম. ফরস্টার বলেছিলেন: ‘খড়ের টুপি মাথায় কিছুটা বাঁকা হয়ে একবারে স্থাণুবৎ জগতে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রিক ভদ্রলোক।’ কাভাফি ছিলেন অনবদ্য এক আধুনিক। প্রাচীন বিশুদ্ধ ভাষা আর জনভাষাকে তিনি অতি শৈল্পিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন তাঁর লেখায়, কাথেরঔসাকে দেমোতিকের সাথে নিজের ইচ্ছামতো বিমিশ্রিত করেছেন তিনি। পুরোদস্তুর অভিজাত এবং শহুরে হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক জীবনের প্রতি তাঁর এক গোপন ঘৃণা ছিল, ধ্রুপদি অতীতের প্রতি ছিল তাঁর এক মোহ ও প্রত্যাগমনাভিলাষ। যেহেতু তাঁর স্বপ্নের জগৎ ছিল অতীতের জগৎ, তাই প্রাচীন ভাষার ব্যবহার তাঁর কবিতায় লক্ষ্যণীয় কিন্তু তা বোধগম্য এবং উপযোগীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। গোপনীয়তায় লেখালেখি করে গেছেন তিনি, চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর প্রতিভার আঁচ টের পাওয়া যায়নি। একান্ত ব্যক্তিগত সীমারেখায় তিনি কবিতা লিখে যেতেন, আর তখন ফরস্টার ও অল্পসংখ্যকই তাঁর কবিতার গুণগ্রাহী ছিলেন। ১৯৩৫ সালের আগে তাঁর কবিতা প্রকাশ্যে বেরও হয়নি। তাঁর সমকামীবন্ধু ফরস্টার ১৯২২ সালে তাঁর গাইড টু আলেকজান্দ্রিয়া বইয়ের মাধ্যমে তাঁকে সারাবিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেন যেখানে তাঁর কিছু কবিতার অনুবাদও ছিল। পেগানবাদ এবং খ্রিস্টানত্বের সম্মিলন কাভাফির লেখায় পরিলক্ষিত। তাঁর প্রসিদ্ধ কাজগুলো হলো, ইথাকা, ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ানস, দ্য গড অ্যাবানডন্স অ্যান্টনি।
এমন এক বিষন্নতার ভেতর থেকে তিনি লেখেন, যিনি তাঁর যুগ এবং ধূসর সৌন্দর্যের সাথে একাত্ম হতে পারেন না: হে কাব্যশিল্প, আমি তোমার কাছে ফিরে আসি / যেহেতু তোমার আছে নিদানের স্ববিশেষ জ্ঞান: / ভাষা আর কল্পনার সুনিশ্চিত নিদ্রাবটিকা।

ভূমিকা ও তর্জমা: কুমার চক্রবর্তী

শিল্পে এনেছি আমি

বসে বসে ভাবি। শিল্পে এনেছি আমি
অনুভূতি আর কাঙ্ক্ষাবোধ―আবছা আভাস কিছু
দেহ কিংবা রেখা; অপূর্ণ প্রেমের কিছু অনিশ্চিত স্মৃতিচিহ্নরাশি।
একে আমি দিয়ে যাই তাই।
তা জানে আকার নিতে মাধুর্যের রূপ;
প্রায় অগোচরে, জীবন হয়েছে তবে উথলিত,
বিদ্ধ করে অভিব্যক্তি, করে বিদ্ধ দিনরাশি, একাকারে।

অসম্ভব ব্যাপার

শুধু একটাই তো আনন্দ, কিন্তু তা অপরূপ
কষ্টের মাঝে একমাত্র সান্ত্বনা
কত ঠাসাঠাসিময় ইতর দিন,
ফসকে গেল শেষ হয়ে; কত যে নির্বেদ।
এক কবি বলল: সেই গানই মধুর
যা কখনও হয়নি গীত।
আমি ভাবি, সেরা জীবন তো তা-ই
যা থাকে একেবারে অযাপিত।

কবিতার জন্ম

এক রাতে চাঁদের স্নিগ্ধ আলো
প্লাবিত করে দিল আমার ঘর…কল্পনা, কিছু একটা যেন
নিয়ে নিল জীবন থেকে: অপ্রতুল কিছু একটা–
এক দূরবর্তী দৃশ্য, দূরবর্তী তূরীয় আনন্দ–
নিয়ে এল নিজস্ব শরীরী সংকল্প
আত্মরূপকল্প এক শরীরী শয্যায়…

আনন্দ

আনন্দ আর সৌগন্ধ তো জীবনসময়স্মৃতি
পেলেই তা তুলে ধরি মহানন্দে, যেমনটা চেয়েছি আগে।
জীবনের প্রীতি আর সুগন্ধ আমার,
কোনো নিয়মের বিনোদনে, ছিল না যার কোনো অপব্যবহার।

সামোসবাসীর এপিটাফ

দাঁড়াও পথিকবর, গঙ্গার এই ধারে শুয়ে আছি আমি
এমন একজন– দুঃখ, শ্রম আর বিলাপে কেটেছে যার সমগ্র জীবন;
সামোস দ্বীপের অধিবাসী, সমাপ্ত করেছি জীবন, নির্মম বর্বর ভূমিতে।
নদীটির ধারে আমার সমাধি আজ ভরে আছে সমগ্র সন্তাপে।
লিপ্সা ছিল অনিবারণীয়, স্বর্ণের সন্ধানে তাড়িত হয়েছি তাতে
জড়িয়েছি অভিশপ্ত বানিজ্যের ঘোরসন্ধিতে।
ঘটেছে জাহাজডুবি হিন্দুস্থান উপকূলে, ফলত বিকিয়ে গেছি
দাসরূপে। মৃত্যুবধি কাজ করে করে হয়েছি বিধ্বস্ত একেবারে।
সামোসের উপকূল থেকে দূরে গ্রিক বচনের বঞ্চনায়
এখন যে দুঃখকষ্ট তা নয় মোটেই ভীতিকর আর;
দুঃখ ছাড়াই হেদিসের দিকে মোর অভিযাত্রা এখন আবার।
সেখানে করব বাস স্বদেশীয়দের সাথে হেথায়।
চালিয়ে যাব যে কথা চিরতরে গ্রিক ভাষায়।

শরীর, মনে রেখো

শরীর, কতটা প্রণয় পেলে তা নয় শুধু, কোন সে শয্যায়
হলো শোয়া তা-ও শুধু নয়,
মনে রেখো, তোমারই জন্য সেই কামনাসাগর যা চিকচিক করেছিল চোখে,
আর কেঁপেছিল কিছু-একটা এই কণ্ঠস্বরে–
আর কিছু দৈব বাধা জেগে ওঠে ভেস্তে দিল তাকে।
এখন সবই অতীত
অনেকটাই মনে হয়, যেনবা কামনা তুমি দিয়েছিলে নিজেকেই,
তবু–মনে রেখো চিকচিক ঔজ্জ্বল্যে ভেসে ওঠা সেই চোখ
যা চেয়েছিল তোমারই দিকে,
কীভাবে যে কেঁপেছিল কণ্ঠ, তোমারই জন্যে, তা যদি জানতে;
মনে রেখো, শরীর।

[ অনূদিত কবিতাগুলো ড্যানিয়েল মেন্ডেলসনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে করা।]

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com