মোস্তফা তারিকুল আহসানের এক গুচ্ছ কবিতা

মোস্তফা তারিকুল আহসান | ২৭ এপ্রিল ২০১৭ ৮:৪৩ পূর্বাহ্ন

জ্ঞানকাণ্ড

কতটা ঘেন্না জমা হলে মেয়েরা আত্মহত্যা করে তা জানে না চঞ্চল খরগোস; কতটা ম্লানিমা
জমা হলে মনে, মরে যেতে ইচ্ছে করে হাটবার দিন লোকচক্ষুর আড়ালে জানে
না হাটুরে স্বামী। শুধু মরণের হলুদ প্রজাপতি ডানা মেলে চোখের তারায় ;ক্ষণে ক্ষণে বায়ু
আসে তপ্ত আগুন নিয়ে । ছেলেধরা দুজন গতকাল যারা পালিয়ে গিয়েছিল তারা মাঝরাঙা
চোখ নিয়ে আবার ফিরেছে আজ। তুমি কী ভালো করে বলতে পারবে মরার পর আলী বাবা
কীভাবে সেলাই করেছিল মৃত মানুষের চামড়া? কতটা নুন লেগেছিল তার? কিংবা কতটুকু
ধার দেয়া ছিল সোনালি কাস্তেতে? সভ্যতা মানুষের ইতিহাস লেখে,ব্যক্তিগত মৃত্যুর রহস্য
জানে না কেউ। অক্ষম ঈশ্বর কিছু গল্প জানে শেয়ালপণ্ডিত জানতে পারে গোটাকতক শ্লোক
আত্মহত্যার পরিসংখ্যান নিয়ে কতিপয় সমাজ বিজ্ঞানি যেসব উপপাদ্য জড়ো করেছে তা ডাহা
মিথ্যের বেসাতি। আমাদের অভিজ্ঞানসূত্র বলে মরণের মিথ নিয়ে বড় বেশি পাকা নয় পাশ্চাত্য পণ্ডিত।
Murtaja Baseer


শৈশব

কোথাও বৃষ্টি হয়েছে এখন; তার সৌরভ মিশে আছে জানালার গরাদে পুরাতন
শৈশবের মতো। যেমন ফিরে আসে কাকাতুয়া শুকনো জারুলের ডালে আর আমাদের
লোনাধরা দিনের ছবি আমরা তীর্যক গেথে ফেলি বিকেলের এক ফালি আকাশে
ভীরুতার গান কিংবা যৌবনের ভ্রুকুঞ্চন আর বান্ধবীর নরোম চোখ আমাদের কল্পনার রাজ্যে
ঘুরপাক খায়। ধানের খেতের মতো রুপালি উঠোনে আমরা আর সমবেত হব না জানি
কপালের ঘাম মুছে, নাকের শুকনি ফেলে আমি ছুটে যাবো না নরহরি কাকার গল্পের আসরে
অথবা মৃত সায়রে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে কতিপয় বন্ধুর সাথে মেতে উঠবো না পুরাতন তর্কে।
ফেলে আসা দিন স্বভাবতই উজ্জ্বল মনে হয় আর আমরা খুঁজে ফিরি শৈশবের সাদা কালো
পাণ্ডুলিপি,বাঁশবাগানের ধারে, নয়নজুলির কিনারে আমাদের অবিমিশ্র আনন্দযোগ আমাকে
ডাকে ঈশারায় চেনা তক্ষক বলে সব ঠিক-ঠাক ছিল। সব আকাক্সক্ষার ডালপালা বিস্তৃত ছিল
সন্ধ্যার প্রগাঢ় রঙে দারুণ শৈশবে সে তো আজো দিগন্তে উঁকি দিয়ে ডাকে পুরনো সোদা গন্ধের মতো।

কপিলাবস্তু

কপিলাবস্তু যাবার পথে আমাকে শুধায় কাকাতুয়া,আর কতপথ বাকি? আর
কত ধুলো রুখুমুখ কর্কটক্রান্তির ঘোর? আমি নিরুত্তাপ থাকি। আমাদের
কালখণ্ডে পথই তো একমাত্র উপায় সামান্য প্রলোভনের; চোখের তারার রঙ
মুছে যাবার আগে যতটা পারা যায় অঞ্জন মেখে নিতে হবে; পুরাতন
গ্রীস্মের লালরঙের জলের পুকুরে উবু হয়ে কাঁদায় আমরাও হাঁসের
মতো বসে থাকবো অজস্র দিন। আমরা অতল গভীরে নামার আগে ভেঙে
ফেলতে চাই আলস্যের নির্বেদ, ভ্রুকুটি সন্ধ্যের রাগেআমরা সারগাম ঠিক
করে নিতে চাই ভাতখণ্ডে। নালন্দার বারন্দায় বসে গোটাকতক ভিক্ষু
আমাদের নতুন পৃথিবীর যাদুবাস্তবতা থেকে মুখ সরিয়ে নিতে বলে। বলে,
কাছে পিঠের আমসত্বে মজে যেও না বাছা ,বরং চোখ রাখো ওপরে সমুদ্র
নদের ধারে বসে প্রাণ ভরে বাতাস নাওÑ বুঝে নাও জীবনের মর্মাথ।
কাকতাড়ুয়া রাজা হবার আগে তুমি শেষ চেষ্টা করে দেখ পার কিনা
মানুষ আর মানবতা নিয়ে চাঁদ সওদাগর তো বাণিজ্যে যায় নি কোনদিন।
তাহলে তোমরা থাম একটু বাপু। আমি হাঁটতে থাকি মন্দ্র বাতাসের সাথে।
আরো কিছু নর-নারী মৃদুমন্দ তালে আমাদের পিছু নিতে চায়।

স্কুলের খাতা

তোমার স্কুলের খাতা বাতাসে উড়ে গেলে তুমি কী খুব কষ্ট পেতে?
কবিতা নাকি দুটো ছড়া লেখা ছিল সে খাতায়,কাকেরা নিয়ে
খেলত,তার নিচে ঘেউ ঘেউ করতো কয়েকটি কুকুর। তোমার
উদ্বিগ্ন মুখ দেখে আমি বেশ বিষন্ন হয়েছি ; না তোমার কবিতা
না তোমার ছড়া, তোমার রৌদ্রবর্ণ মুখে হারিয়ে যাওয়া কবিতার
অক্ষর বর্ণ যতি চিহ্ন খেলা করে হালকা দুপুরে জামরুলের
মতো তোমার নাক উত্তেজিত হয় মুখ ফুলে যায়। তুমি কীভাবে কবি
হয়ে উঠলে কবে আমি জানতে পারিনি, তবে তোমার
রৌদ্র কবিতার সুবাস পেতাম; তোমার লাল ফ্রকে কবিতার রঙ
আর লালিমা লেগে ছিল ঘণ আস্তরণে। একে কোন নাম দিই নি
আমি। তুমি যখন উবু হয়ে মাটিতে বসে নিচু বেঞ্চে পংক্তি লিখে যেতে
আমি আনমনে বানান দেখার অজুহাতে উঁকি দিতাম; নীল রঙের
তোমার স্কুল খাতার কাভারপেজ আকাশের সাথে একাকার
হয়ে যেত। তোমার সেই খাতা কী তুমি ফিরে পেয়েছিলে?
আমার মনে নেই। তুমি কী শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ কবি হয়ে
উঠেছিলে? আমি জানি না। তবু সেই নীল স্কুল খাতা অথবা
তার কয়েকটি লাইন আমাকে নীল অবগাহনে ভাসিয়ে নিয়েছিল সেদিন।

চোখ

চোখের ভেতরে কী চোখ আছে? তা না হলে চোখকে চোখ দেখে
কী করে? কীভাবে অঞ্জন মাখে? কীভাবে ভেতর থেকে কান্নার
তরল নেমে আসে পাতায়? সমুদ্রের লবণজল কীভাবে উঠে আসে চোখে
চোখ কী তা জানে? প্রথম আদিম চোখ দেখতো যতটুক পৃথিবী
আজ দেখে তার সহস্রগুণ তার চোখের জানালায় কত চোখ জমা
হলো,কত সভ্যতার নুন,ধুলোবালি কাঁদা! বস্তুত, চোখ তৈরি করেছে
আমাদের চলার পথ। মানবকে মুলত চোখের প্রতিশব্দ ভাবে কবি
তুমি জানালায় বিকেল রোদ নিয়ে খেলা করার সময় বৃষ্টির
কারুকাজ দেখে হয়তো শুষে নিচ্ছ কবিতার দ্যোতনা: তুমি রাতের
মদিরা থেকে পাতার শব্দ শুনে খুঁজে নিচ্ছ হয়তো তোমার কবিতার পদ
পদের ভেতরে পদ- চোখর ভেতরে চোখ যেন; আরো গভীরে যাবার
জন্য তোমার যে কারসাজি তাকে কী করে ব্যাখ্যা দেবে? কোন নৈনিতালে
গিয়ে তুমি শিখে এসেছ প্রকৃতিবিদ্যা? কে তোমার সহচর ছিল?
গাইড নাকি দুটো চোখ? তুমি কী জানো নালন্দার পথে পথে ভিক্ষুরা
অন্ধ ছিল কিনা? অন্ধ হলেও ফলাফল ভিন্ন হতো কী? তুমি দেখ,
তোমার মস্তিষ্কে হাজার হাজার চোখের কোষ তোমাকে নিয়মিত পরামর্শ
দিয়ে চলে; রাতে দিনে নক্ষত্রে বাতাসে সে অহমের ছবি তৈরি করে
দেখতে পাও কী চোখের ভেতরে চোখ? আরো গভীর থেকে
তাকিয়ে আছে তোমার দিকে?

দস্তান

অন্তত এভাবে সব শেষ হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি কবি
রাতের সমুদ্র পেরিয়ে সে সাহারায় ঘুর পাক খায়,কথা বলে
বান কি মুনের সাথে: ভাসমান মানুষের জন্য তার জামার বুক
পকেটে বালি ভরে,নুড়ি খোঁজে আর কর্কট ক্রান্তি থেকে
তাপদগ্ধ বাদুড়ের ডানা ভেজে জমা রাখে আস্তিনে
অতঃপর সাগর পাড়ি দিতে দেখে ভাসমান সারি সারি নৌকোÑ
অভুক্ত মানুষ পৃথিবীর প্রথম দাস স্পার্টাকাস তার চোখের
সামনে হি হি করে হাসেÑ আমাকে শেষ করে দিতে পার নি
মানব, আমি আবার সদলবলে ফিরে এসেছি। ডানপাশে দেখে
মার্কস মহাশয় লজ্জায় মুখ অন্ধ করে বসে আছে;
ক্ষমা চেয়ে বলে,প্রবল লোভের কাছে মানব হেরে যাবে আমি
ভাবতে পারিনি আমি স্কীকার করছি আমি যা বলেছি সব
ঠিক ছিল না। মানবতা নিয়ে সবচেয়ে বড় ব্যবসায় যার সেই
ওবামা ভাই দাঁত বের করে বলে, আমি আগের পক্ষেই বলে
ছিলাম এই সব মানুষকে আমরা মর্যদা দেব। সে বলে, তোমরা
জান নিশ্চয়,শকুন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবার পর সমস্ত সমর্থ
মানুষ শকুন হয়ে ফিরে এসেছে পৃথিবীতে। সব প্রান্তিক মানুষকে
ওরা ভাগাড়ে নিয়ে চেটে পুছে খাবে। কেউ কোন কথা বলে না
দেখে কবি বলে,তোমরা পৃথিবীকে একটি দস্তানে পরিণত করেছ
যা বলছ তাই সত্য। এভাবে এই মানুষর দঙ্গলে আমি কবি হতে
চাইনা । আমাকেও তোমাদের দস্তানে ভরে ফেল।

প্রজাপতি

প্রজাপতির ইতিহাস পড়েছি বাল্যকালে অথচ কাল সে আমাকে তার
মিথবৃত্তান্ত মুখস্ত বলে গেল; আমি তো হতবাক,এত গল্প ঐটুকু মথের
কুণ্ডলে? রঙ আর আলো নিয়ে কিংবা উড়ালপর্ব নিয়ে তোমরা যারা
আসমানদারী করে চলেছ তারা শোন: তোমরা জাননা প্রজাপতির
জন্ম রহস্য; বস্তুত প্রগাঢ় আলোর নীচে গৌতমের মৌনমুখ
ন্যাড়ামাথা আর হনুতে লেপ্টে থাকে শতাব্দীর ঘোলা জল-নুন
চাঁদের বুড়ির শুকনো মুখটা ভালো করে দেখেছে পৃথ্বীরাজ? অথবা
সাপের লড়াইয়ের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা কী সোজা? সারাদিন শৃঙ্গারপর্ব
শেষ করে যখন বিশ্রামে গেল কেউটে, তার তলপেট দেখেছ কখনো?
আসুন সবকিছু শুরু করি তলানি থেকে নদীর তলদেশে জমে থাকা
গোপন অভিসার;নাবিকের বৈঠার জোর আসে কোথা থেকে জেনে
নেই ঈশ্বরীপাটুনির কাছে,ফিঙের কাছে শিখে নেই শেষ অন্তরা
অথবা গলার কারুকাজ শিখে নেই ব্যস্ত কোকিলের কাছে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com