ভিনিসিয়াস ডি মোরায়েস: হুইস্কি, ভবঘুরে ও সুর-লহরির কবি

মাজুল হাসান | ৫ মে ২০১৭ ১:৩৫ অপরাহ্ন

Vinicius de Moraesপুরো নাম মারকিউস ভিনিসিয়াস দা ক্রুজ ই মেলো মোরায়েস। সংক্ষেপে ভিনিয়াস ডি মোরায়েস। যদিও ব্রাজিলিয়ান এই কবিকে সবাই চেনে ‘ও পোয়েটিনহা’ বা ‘দ্যা লিটল পোয়েট’ হিসেবে। জীবদ্দশায় তিনি পরিণত হয়েছিলের ব্রাজিলের আধুনিক কবিতা ও গানের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বে। একাধারে ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, নাট্যকার, শিল্পবোদ্ধা ও সমালোচক। কবিতায় গীতিময়তা, গানে কবিতাবোধ আর নাটকে এই দুয়ের সংমিশ্রণ- এই হলো ভিনিসিয়াসের মূল বৈশিষ্ঠ।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মানুষটির জন্ম ১৯১৩ সালের ১৯ অক্টোবর রিও ডি জেনিরিও’র শহরতলি গাভেয়ায়। সরকারি কর্মকর্তা বাবা আর শখের পিয়ানোবাদক গৃহিনী মায়ের সন্তান ভিনিয়াসকের শৈশব-কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। বাবার চাকরি বদলের কারণে এই ঘোরাঘুরির জীবন অক্ষুন্ন ছিল পরবর্তীতেও। ভিনিসিয়াস নিজেও ছিলেন একজন কূটনীতিক।

রিও ডি জেনিরো বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে পাঠ চুকে গেলে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় দুই দুটি কবিতার বই- ‘ক্যামিনহো পাথ এ ডিসটেন্সিয়া’ এবং ‘ফোর্মা ই এক্সেজেস’। ১৯৩৬ সালে চাকরি পান ব্রাজিলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফিল্ম সেনশরশিপ বিভাগে। দু’বছর পর ব্রিটিশ কাউন্সিলের ফেলোশিপ নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়তে চলে যান। সেখানেই পুরনো খোলস ভেঙে ‘ফ্রিভার্স’ ও ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ ফর্মে কবিতা লেখা শুরু করেন। ‘নোভেস পোয়েমাস’ বা ‘নিউ পোয়েট্রি’ অভিধায় লেখা কবিতাগুলো সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করে। মূলত এর মাধ্যমেই ‘জেনারেশন অফ ফোর্টিফাইভ’ মুভমেন্টের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিতে পরিণত হন তিনি।

১৯৪৩ সালে ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকরি পান ভিনিসিয়াস। ভাইস কাউন্সিলর হিসেবে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের লস এঞ্জেলস-এর ব্রাজিলিয়ান দূতাবাসে। সেখানে প্রকাশিত হয় ‘চিনচো এলিজিস’ (ফাইভ এলিজিস) এবং ‘পোয়েমাস, সনেটোস, বেলাডেস’ ( পোয়েমস, সনেটস এন্ড বেলাডস) শিরোনামের দু’টি বই। দীর্ঘ কূটনীতিক জীবনে কাজ করেছেন শিল্প সাহিত্যের রাজধানী প্যারিস ও ইতালির রোমসহ বিভিন্ন দেশে। রোমে থাকাকালীন ইতিহাসবিদ সার্জিও হোলান্দার বাড়িতে নিয়মিত গানের বৈঠকিতে যোগ দিতেন। তবে গানের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপিত ১৯৫৮ সালে। ভিনিসিয়াসের কথায় গানের অ্যালবাম বের হয় ‘এলিজেত কারদোস’ নামের এক গায়িকার। এরপর বিভিন্ন সময়ে বহু জনপ্রিয় গান রচিত হয় তাঁর হাত দিয়ে, বের হয় জনপ্রিয় সব অ্যালবাম।

নাট্যকার ভিনিসিয়াসও কম বিখ্যাত নন। অরফিউস ও ইউরিডিস গল্প অবলম্বে লেখা তাঁর ‘অরফিউস ডা কোনসিকাও’ নাটকটি প্রদর্শিত হয় রিও কার্নিভালে। পরে এটি নিয়ে ‘ব্ল্যাক অরফিউস’ নামে সিনেমা বানান ফরাসি পরিচালক মার্সেল কামু। ১৯৫৯ সালে, বিদেশী ভাষা ক্যাটাগরিতে সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এখানেই শেষ নয় চলচ্চিত্রটি কান ফেস্টিভেলে পাম ডি’ওর ও ১৯৬০ সালে ভূষিত হয় ব্রিটিশ একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে। ব্রাজিল-ফ্রান্স-ইতালি যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রে একটি গানও ছিলো ভিনিসিয়াসের লেখা। গানটির সহগীতিকার আন্তোনিও কার্লোস জোবিম। ‘এ ফেলিসিদাদে’ শিরোনামের এই গানটি ইন্টারন্যাশনাল হিটে পরিণত হয়। তবে ভিনিসিয়াস-জোবিম জুটির সেরা গান ‘এ গারোতা ডি ইপানেমা’ (দ্যা গার্ল ফ্রম ইপানেমা)। এই গানটির জন্য ঐতিহাসিক ও পর্যটক আকর্ষণে পরিণত হয়েছে রিও ডি জেনিরিও’র উপকণ্ঠের ইপানেমা সৈকতটি। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটন ভিড় করে সেখানে।

একজন ‘বহেমিয়ান আমলা’ হিসেবে পরিচিত ভিনিসিয়াস ছিলেন অ্যালকোহলিক। অতিরিক্ত মদ্যপান ও নানাবিধ রোগশোকে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮০ সালের ৯ জুলাই, ৬৬ বছর বয়সে, রিও ডি জেনিরিও’তে নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। রেখে যান- তাঁর অষ্টম ও সবশেষ স্ত্রী গিলডা মাত্তোসো, সদাবিশ্বস্ত গায়কবন্ধু আন্তোনিও পেসি টোকুইনহো, কবিতা-নাটকসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় শ’ খানেক বই, অসংখ্য গান আর তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিকে- Whisky is man’s best friend, it’s the dog in a bottle.

মহান এই কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, ২০১৪ সালে ব্রাজিলের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের অফিসিয়াল মাস্কটের নাম রাখা হয় ভিনিসিয়াস।–অনুবাদক।

এপিটাফ

এখানে শুয়ে আছে সূর্য
যিনি সৃষ্টি করেছেন ভোর
আর জন্ম দিয়েছেন দিবসের
করেছেন অপরাহ্নের প্রতিপালন

জ্যোর্তিময় হাতের আধিকারী
জাদুকর মেষপালক
যিনি গোলাপকে করেছেন উর্বর
আর উপড়ে ফেলেছেন পাপড়ি

এখানে শুয়ে আছে সূর্য
কোমল এবং সহিংস
উভলিঙ্গ যিনি

ধারণ করেন সমস্ত
নারীর প্রতিরূপ
আর সমাহিত হন সমুদ্রে

টুকরো

কে সে, জিজ্ঞেস করলো চেলোবাদক
কে আমাকে অমান্য করে?
কে সে, কে ঢুকেছে আমার রাজ্যে
ঘাটাঘাটি করেছে স্বর্ণ আমার?
কে সে, টপকে এসেছে দেয়াল
চুরি করেছে আমার গোলাপ?
কে সে, জিজ্ঞেস করলো চেলোবাদক
বাঁশি বললো: আমি-ই সেই জন

কিন্তু কে সে, জিজ্ঞেস করলো বাঁশি
কে এসেছিল আমার ঘরে?
কে সে, কে চুমু খেয়েছিল আমায়
ঘুমিয়ে পড়েছিল আমার বিছানায়?
কে সে, কে আমাকে করেছিল আত্মহারা
এবং বিভ্রান্ত?
কে সে, জিজ্ঞেস করে বাঁশি
বুড়ো চেলোবাদক মিটিমিটি হাসে।

ঘোষণা

মন্টিভিডিও
কুমারী! কণ্যা আমার
কোথায় ছিলি এতোদিন
নোংরায় মাখামাখি
তবু তোর শরীরে জুঁইফুলের ঘ্রাণ
তোর স্কার্টে লাল রজকের দাগ
কানের দুলের ঠুংঠুয়ানি
রিনঝিনঝিন?
মা আমার
বাগানে গিয়েছিলাম
আকাশ দেখব বলে
কিন্তু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম
ঘুম ভাঙলো যখন
পেলাম জুঁইফুলের ঘ্রাণ
আর একটা পরী আমার শরীরে ছিটিয়ে দিচ্ছে
ফুলের পাপড়ি…

বাড়ি

একটা বাড়ি
খুবই হাস্যকর বাড়ি
ছাদ নেই
কিছুই নেই
কেউ
পারে না ঢুকতে
কারণ ওর কোনো দরজা নেই
কারণ ওর কোনো মেঝে নেই
কেউ
পারে না ঘুমাতে হল’ রুমে
দোল বিছানায়
কারণ ওর কোনো দেয়াল নেই
কেউ
পারে না হিসি করতে
কারণ ওখানে নেই কোনো
মূত্রদানী
কিন্তু বাড়িটা তৈরি হয়েছিল
পরম যত্নে
বোকা ও বীরদের
শূন্য নম্বর সড়কে।

রিলকে স্মরণে

কোনো একজন যে দেখছে আমায় রাত্রি গভীর থেকে
রাত্তিরে জ্বলজ্বল করা স্থির চোখ
আমাকে চায়।

কোনো একজন যে দেখছে আমায় রাত্রি গভীর থেকে
(এক নারী ভালোবেসেছিল আমায়, হারিয়ে গেছে রাত্রি গহীনে?)
আমাকে ডাকে।

কোনো একজন যে দেখছে আমায় রাত্রি গভীর থেকে
(কবিতা, তুমি নাকি, রাত্তিরের নিশিপালক?)
আমাকে চায়

কোনো একজন যে দেখছে আমায় রাত্রি গভীর থেকে
(মৃত্যুও চলে আসে রাত্রির সরুভূমি থেকে…)
কে সে?

দ্বান্দ্বিক

এটা স্পষ্ট যে জীবন সুন্দর
আর সুখ, সেই একক অব্যাখ্যেয় আবেগ
এটা স্পষ্ট যে তোমাকে পেয়েছি রমনীয় রূপে
প্রশংসা করি তুচ্ছ জিনিসের জন্য তোমার ভালোবাসা
এটা স্পষ্ট যে আমি তোমাকে ভালোবাসি
আর সুখী হওয়ার সবকিছুই আছে আমার

কিন্তু বারবার হয়ে পড়ি বিষাদগ্রস্ত

ম্যানুয়েল বান্দিয়েরার জন্য প্রতীক্ষা

তুমি নিছক কোনো গোপন ব্যাপার ছিলে না
না কবিতার কিংবা আবেগের:
আমার নির্বাসিত জীবনে তুমি এক তারা—
কবি, বাবা! বদমেজাজী ভাই।

তুমি শুধু টেনে নাওনি বুকে
নিজের হাতও সঁপেছিলে আমায়
আমি; ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র—তুমি, নিয়েছিলে বেছে
কবি, বাবা! বদমেজাজী ভাই।

বিষাদ ও পবিত্র হৃদয়ের
স্বচ্ছ, দীর্ঘাঙ্গ ও যোগী বন্ধু:

নিজে নিজে কি এতো স্বপ্ন দ্যাখো তুমি—
কবি, বাবা! বদমেজাজী ভাই?
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com