সালমান রুশদির ‘লজ্জা’ আর ‘মধ্যরাতের সন্তানেরা’

শামস্‌ রহমান | ৭ মে ২০১৭ ৮:৩৭ অপরাহ্ন

midতখন বিলাতে। সময়টা ১৯৮৮। সম্ভবত জুলাই মাস। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারের প্রধান দরজা দিয়ে ঢুকতেই ম্যগাজিন স্ট্যন্ডে একটি গ্লোসি ম্যগাজিন আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রচ্ছদের পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে ছবিটি – চেহারা আর গড়নে, উপমহাদেশের কেউ হবে বলে মনে ধরে। স্বভাবতই আগ্রহ জাগে জানার। প্রচ্ছদ কাহিনীর পৃষ্ঠা উল্টাতেই শিরনামে চোখে পরে – সালমান রুশদি। নামটা আমার কাছে তখনও অপরিচিত। প্রচ্ছদ কাহিনী রচয়িতা একজন বিলেতি সাহিত্য সমালোচক। লিখেছেন – ‘রুশদি এমন একজন উপন্যাসিক যে সে দ্বিতীয়বার Booker Prize না পেলে অতৃপ্ত থেকে যাবে তার আত্না’। উপমহাদেশের এত বড় মাপের একজন লেখক, অথচ তার লেখা পড়া তো দূরের কথা, কখনো নামই শুনিনি তার। কিছুটা অস্বস্তি লাগে নিজের কাছে।
এই ঘটনার কয়েক মাস পরেই প্রকাশিত হয় সালমান রুশদির বহুল বিতর্কিত গ্রন্থ –The Satanic Verses। গ্রন্থটি মুসলিম বিশ্বে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাসে আঘাতের অভিযোগে সমালোচিত ও আক্রান্ত হয়। প্রকাশিত হওয়ার কয়েক মাসের মাথায় বিলাতের ব্রাডফোর্ডে জনসমক্ষে বইটি পোড়ালে বৃটিশ সরকারের জন্য এটা একটি ‘burning issue’ হয়ে দাঁড়ায়। তারপর আসে খোমেনির ফাত্‌ওয়া। ফলে গ্রন্থটি হয় বাক্সবন্দি আর লেখক হন গৃহবন্দি।
যতদূর জানা যায় রুশদির প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ Grimus। বইটি কখনো দেখেনি, পড়িনি বা এর উপর কখনো কোন আলোচনা-সমালোচনাও শুনিনি। হতে পারে গ্রন্থটি ব্যাপক পটভূমি জুড়ে এক বিশাল কোন গল্প, নাতিদীর্ঘ কোন উপন্যাস, কিংবা জটিল কোন কাব্যগ্রন্থ। কে জানে। গ্রন্থটি খাটো করে দেখার কোন অভিপ্রায় আমার নেই, শুধু এটুকুই বলা যে রুশদি তখনো সাক্ষর রাখতে পারেননি একজন দক্ষ কিংবা সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে।

রুশদির প্রকাশিত দ্বিতীয় গ্রন্থ Midnight’s Children(জানা যায় এর আগের তিনটি গ্রন্থের পান্ডুলিপি কোনদিন ছাপাখানার দোড় গোড়ায় পৌঁছতে পারেনি)। গ্রন্থটি পাঠক-সমালোচকদের দারুনভাবে নাড়া দেয়। গ্রীক দেবতা Zeus-র মেধা ও গুণাবলী নিয়ে ‘Athene’ রূপে রুশদির যেন Midnight’s Children-এর মাঝে পুনঃজন্ম হয় ইংরেজি তথা বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে। সহজাত গুণাবলীর অধিকারী, রুশদি ঠাট্টার ছলে গল্প বলার এক বিশেষ দক্ষতা নিয়ে হঠাৎ যেন আবির্ভূত হন একজন শক্তিশালী লেখক রূপে। উপন্যাসটি Booker Prize সহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরষ্কৃত হয়। এরপর প্রকাশিত হয় তৃতীয় গ্রন্থ ‘Shame’। এই উপন্যাসটিও পাঠকদের প্রশংসা কুড়োয় এবং পুরষ্কৃত হয় বহুবার।
উপমহাদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আশির দশকের শুরুতে রচিত ও প্রকাশিত Midnight’s Children এবং ‘Shame-এর বিষয়বস্তু আজও প্রাসঙ্গিক। গ্রন্থ দুটির উপর আলোচনার এটাই কারণ।
midnightMidnight’s Children-এর বিষয়বস্তু ১৯৪৭’এ ভারত বিভাগের ঘটনাবলি, যা বর্ণিত হয় গ্রন্থের মূল চরিত্রের কন্ঠে, যার জন্ম ’৪৭’র মধ্যরাতে। অন্যদিকে, দেশ হিসেবে পাকিস্তান গড়ার নির্লজ্জ ও লোভী প্রয়াস হচ্ছে Shame-এর বিষয়বস্তু। স্বীকার্য যে উপন্যাস দুটির ঘটনা প্রবাহ ভিন্ন। উপন্যাস দুটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। তথাপি, এ দুই উপন্যাসের ‘রাগ’, ‘তাল’ ও ‘লক্ষ’ অভিন্ন। এ প্রসঙ্গে উপন্যাসিক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটি উক্তি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন – ‘লেখকদের একটিই গল্প, যা তারা বার বার বলে, তবে ভিন্ন ভিন্ন রূপে’। ভারত বিভাগ ও দেশ ত্যাগের ঘটনা অবলম্বে রচিত হয়েছে অনেক উপন্যাস, গল্প; তৈরি হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। রুশদিও এসেছেন সেই একই গল্প নিয়ে। Midnight’s Children বা Shame খন্ডাতে পারেনি মার্কেসের উক্তি। তবে Midnight’s Children-এ রুশদি উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাসকে তুলে ধরেন নতুন এক ঢং ও স্বাদে এবং বিশাল এক আঙ্গিকে। এতই বিশাল যে উপন্যাসের নায়ক জোরালো ভাষায় দায়ী করে – ‘To understand me you have to swallow a world’। সত্যই তাই। ১৯৪৭-এ উপন্যাসের নায়কের জন্মের ঘটনা থেকে শুরু করে, ভারত বিভাগ, দেশ ত্যাগ, নতুন রাষ্ট্রের শাসন ও রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং সর্বপরি তেরানব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্নসমর্পনের মাঝে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। সেদিনের সেই ১৬ই ডিসেম্বরের স্নিগ্ধ সকাল উপন্যাসের নায়কের ভাষায় – ‘Once, long ago, on another independence day, the world had been saffron and green. This morning (১৬ই ডিসেম্বর), the colours were green, red and gold. And in the cities, cries ‘Joi Bangla!’.And voices of women singing ‘Our Golden Bengal ….’। এর প্রায় দুই যুগ পর হুমায়ুন আজাদও তার পাক সার জমিন সাদ বাদ-এ দেশকে অনেকটা একই ভাবে দেখেছেন: ‘চারিদিকে আমার সোনার বাংলা; …. চারিপাশ কী সবুজ; এক অরণ্যের পাশে সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে দেখি ….. সমুদ্রের ভেতর থেকে সবুজের মাঝখানে একটি লাল টকটকে সূর্য উঠেছে’। বাংলাদেশের সেই বিশেষ মুহূর্তের লেখকদ্বয়ের বিবরণ অভিন্ন হলেও, অন্তর্নিহিত ভাব ভিন্ন। Midnight’s Children-এ রুশদি বাংলাদেশের জন্মের কথা বলেন; যে জন্ম হয় তেরানব্বই হাজার পাকিস্তানি সৈন্যের আত্নসমর্পনের মাঝে। আর হুমায়ুন আজাদ বলেন বাংলাদেশের পুনঃজন্মের কথা– স্বাধীনতা যুদ্ধাপরাধীচক্র এবং তাদের সহযোগি উগ্র ধর্মীয় জঙ্গিদের হাত থেকে মুক্তির মাঝে পুনঃজন্ম। এখানে রুশদি বা হুমায়ুন আজাদ কারও উদ্দেশ্য সঠিক ইতিহাস রচনা নয়। ইতিহাসকে পাশাপাশি রেখে কল্পনার মাঝে, লেখার নিজেস্ব ঢংয়ে রুশদি সৃটি করে এক বিশাল চিত্র। Midnight’s Children-এ ৪৭’শে অর্জিত হয় এক স্বাধীনতা; ৭১-এ অন্য আর এক স্বাধীনতা। দুই স্বাধীনতা এসেছে দুই বিপরিতমূখী রাজনৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে। এক স্বাধীনতা এসেছে ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে আলোচনার সমঝোতায়, অসহযোগ ও অহিংসার আন্দোলনের মাধ্যমে। অন্য স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের সহযোগী ঘাতক-চক্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। এক স্বাধীনতা আসে ধর্মের ভিত্তিতে; অন্য স্বাধীনতা অর্জিত হয় ধর্মনিরপেক্ষতার দিক্ষায়।
আকারে Midnight’s Children-এর মত দীর্ঘ না হলেও, Shame তুলনামূলকভাবে আরও অধিক কঠিন ও চাতুর্যপূর্ণ উপন্যাস। প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন হলেও Shame আসলে Midnight’s Children-এর এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ – যেমন, সত্যজিতের ট্রিলোজি – পথের পাঁচালি, অপরাজিতা এবং অপুর সংসার। Shame-এ বজায় রয়েছে Midnight’s Children-এর ধারাবাহিকতা। ভাব ও রাগের তালও দুটি গ্রন্থে প্রায় একই রকম। তবে স্বীয় ভ্রাতৃহননের মাঝে ভারত ও পাকিস্তানের সৃষ্টিতে যে প্রচন্ড ক্রোধের জন্ম হয় তা অকথ্য ভাষায় প্রকাশ পায় Shame-এ।
Midnight’s Children যদি ভারত বিভাগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়, তাহলে Shame পাকিস্তান সৃষ্টির বিরুদ্ধে নিন্দা ও ধিক্কার। পাকিস্তান ‘insufficiently imagined’ একটি দেশ – পাকিস্তানের সৃষ্টিকে রুশদি এভাবেই মন্তব্য করে। দেশ হিসেবে পাকিস্তান কতটাই অপ্রতুল ধারণায় সৃষ্ট তা শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতাই প্রমাণ করে না; আজকের পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটই তার বড় প্রমাণ। কিভাবে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বকে আকড়ে একটি দেশ হয়? রুশদির সেখানেই প্রশ্ন। কিভাবে ইতিহাস-সমৃদ্ধ একটি জনগোষ্ঠি রূপান্তরিত হয় ইতিহাস-বর্জিত জনগোষ্ঠিতে?
ShameMidnight’s Children-এর নায়কের জন্ম ১৫ই আগষ্ট ১৯৪৭। সেই উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহের বর্ণনাকারী। কোন প্রকার ভনিতার আশ্রয় না নিয়ে যে সরাসরি বলে – ‘আমি একজন মাহাজির’ (রিফিউজি)। যে তার কৃষ্টি, পূর্ব-পুরুষের সৃষ্টি এবং ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হয়ে শত-সহস্র অচেনা, অজানা জনতার সামনে নির্লিপ্ত দন্ডায়মান। Shame-এ মাহাজিরে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া physical অর্থে। অর্থাৎ, বাসস্থান ত্যাগের মাঝে অতীত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হয়ে। তবে স্বীকার্য যে মাহাজিরে রূপান্তর শুধুই বাসস্থান ত্যাগের প্রক্রিয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। নিজ পরিমন্ডলের মাঝেও এ পরিণতি সম্ভব।
Shame-এর শুরুতে মনে হয় উপন্যাসটি ওমর খাইয়াম সম্পর্কিত, যেন সে জন্ম নিয়েছে তিন মায়ের গর্ভে। মাহাজির হওয়ার লজ্জা কোনদিন যেন স্পর্শ করতে না পারে, তাই তাকে তিন নারী আগলে রাখে প্রতিনিয়ত। উপন্যাসের মাঝপথে এসে মনে হয় এটা পাকিস্তানের দুই রাষ্ট্রপ্রধান জুলফিকার ভুট্টো এবং জিয়াউল হকের উপর লেখা। শেষে হঠাৎ করেই গল্প মোড় নেয় অন্য পথে। এখানে রূশদি উপস্থাপন করে মহিলার এক রূপক রূপান্তর – বালিকা থেকে মাতৃত্বে। শুরুতে মিস্‌ হায়দার, শিশুসুলভ পবিত্র এক কিশোরী। শেষে সে রূপান্তরিত হয় মিসেস শাকিল নামক ভয়ংকর এক মহিলায়। রূপান্তরটা অনেকটা যেন Jekyll থেকে Hyde-এ (শুধু পুরুষের পরিবর্তে মহিলা)। এখানেও মিস্‌ হায়দার মাহাজির হিসেবে বিয়ের বেশে এক অপরিচিত পুরুষের (ভবিষ্যৎ স্বামী) মুখোমুখি।
Shame শেষ হয় রাগ আর ক্রোধে। Midnight’s Children-এ উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাই মূখ্য। এখানে রুশদি শুধুই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের তিক্ততাই প্রকাশ করেন; ব্যক্ত করে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা কায়েমে অপারগতায় অপমান বোধের জ্বালা। শেষে অবশ্য এক ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন: ‘India’s children of independence may have failed, but their children …. will grow up far tougher, not looking for their fate in prophecy or in the stars, but forging it in the implacable furnaces of their wills।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mozamel — মে ১২, ২০১৭ @ ১০:২১ পূর্বাহ্ন

      সালমান রুশদী পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারে যতোই নিন্দা করুক, পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। কাশ্মীরের অবস্থা হতো- ব্রাহ্মণ্যবাদী বুটের লাথি-গুতা খাওয়া।

      পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দিলীপ ঘোষ যখন বলে ‘বাংলাদেশ ভারতের হবে’ আর তথাকথিত চেতনাবাজরা চুপ করে থাকে, তখনও বোঝা যায় গ্যেটা কি?

      সালমান রুশদী বৃটেন-ভারতকে তৈলমর্দন করে কল্কে পেতে চেয়েছে। সারা বিশ্বে ইসলাম ভিক্টর নয়, ভিক্টিম। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ চাই নাকি প্রায়শ্চিত্ত করে ভারতের পেটের ভেতর ঢুকে যেতে চাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com