বৈচিত্রময় বর্ষবরণ

হিরণ্ময় হিমাংশু | ১৪ এপ্রিল ২০১৭ ১২:৫৭ অপরাহ্ন

noboborsh0-1কৃষিভিত্তিক সভ্যতায় বর্ষবরণ হলো প্রাচীনতম উৎসব। প্রায় অর্ধশত বছর আগে ছায়ানটের হাত ধরে রমনার বটমূলে ১৪ এপ্রিল জাতীয়ভাবে বাংলা বর্ষবরণ উৎসব উৎযাপন শুরু হয়। চলতি কথা, সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন। কিন্তু মুঘল আমলেরও পূর্বে প্রাচীন বাংলায় শত শত বছর ধরে মূল জনগোষ্ঠির পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষও বর্ষবরণ করে আসছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। সরকারি হিসাব মতে ২৯টি আর বিভিন্ন বেসরকারি মতে প্রায় ৪৫ – ৫০টির মত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাস বাংলাদেশে। জাতীয়ভাবে বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ পালন করা হলেও বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠী পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে এক সাথে ৩ – ৭ দিন ধরে উৎসব উৎযাপন করে। ভারতের আসামে নববর্ষের উৎসব চলে ৮দিন। বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী লোকজ ধারায় বর্ষ বরণের মধ্যদিয়ে ফুটে উঠে বৈচিত্রময় সাংস্কৃতিক রুচি বোধ। আর ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশেই শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের বর্ষ বরণ বা চৈত্র সংক্রান্তি এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম ও বৈচিত্র্যময় লোকজ ধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। উত্তরাঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তিকে বলে বিষুয়া, খুলনা অঞ্চলে সারনী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিউ বা বিহু, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সংগ্রাইন বা মাস পইলা পূজা।

বৃহৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বাস। এই অঞ্চলের প্রধান প্রধান নৃ-গোষ্ঠী বিশেষ করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরারা পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বর্ষবরণ উৎসব বৈসাবি উদযাপন করে। ত্রিপুরাদের বৈসুর (বৈ), মারমাদের সাংগ্রাইয়ের (সা) এবং চাকমাদের বিঝুর (বি) উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে হল বৈসাবি। এছাড়াও এ অঞ্চলের আরও কিছু নৃ-গোষ্ঠী যেমন- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মগ, কুকি, লুসাই, সেন্দুজ, পাংখো, বনযোগী, খুমি, গুর্খা প্রভৃতি জনগোষ্ঠী রয়েছে। প্রতিটি জনগোষ্ঠিই নিজস্ব রিতিতে যেমন বর্ষ বরণ করে, তেমনি উৎসবেরও রয়েছে ভীন্ন ভীন্ন নাম। তাদের বর্ষবরণের কিছু উৎসব নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১. চাকমাদের বিজু: চাকমা বা চাংমা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী বাংলাদেশের একটি প্রধান উপজাতি। চাকমাদের বর্ষবরণের উৎসব হলো বিজু। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমারা বলে ফুল বিজু, দ্বিতীয় দিনকে মূল বিজু ও তৃতীয় দিনকে গোজ্যাপোজ্যা বলা হয়। বাংলা বর্ষের শেষ দিনটি হচ্ছে মূল বিজু, তার আগের দিনটি ফুল বিজু এবং নববর্ষের দিনটিকে নতুন বছর বা গোজ্যাপোজ্যা বলা হয়। ফুল বিজুর দিন তরুণ-তরুণী এবং শিশুরা নদীতে গিয়ে কলাপাতায় করে ফুল ভাসিয়ে দেয়। অনেকে আবার ফুল দিয়ে ঘরদোর সাজায়। উৎসবের দ্বিতীয় দিন মূল বিজু। এদিনটিই মূলত চাকমাদের আসল বিজু দিন। নতুন পোশাকে তরুণীরা কলসি দিয়ে নদী থেকে জল এনে গুরুজনকে স্নান করিয়ে তাদের আশীর্বাদ গ্রহণ করে। অতিথি আপ্যায়নের জন্য কলা, পাহাড়ে জন্মানো এক প্রকার ধানের চাল দিয়ে বিনি পিঠা, নানা ধরনের মিষ্টি এবং পাজন [পাচন] থাকে। এদিন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য ঘরের দরজা উন্মুক্ত থাকে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে চাকমারা আয়োজন করে বলীখেলা ও গিলাখেলার।

২. ত্রিপুরাদের বৈসু: ত্রিপুরাদের বর্ষবরণের উৎসব হলো বৈসু। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রথম দিনকে ত্রিপুরারা বলে হারি বৈসু, দ্বিতীয় দিনকে বিসুমা ও শেষ দিনকে বিসিকাতাল। চৈত্র মাসের শেষ দু’দিনসহ নববর্ষের দিনটি পালন করে হারি বৈসুক, বিসিমা বৈসুক ও বিসিকাতাল নামে। হারি বৈসুর দিন গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রত্যেক ঘরের উঠানে নৃত্য করে নাচের দল। নৃত্য শেষে শিল্পীদের মদ, মুরগির বাচ্চা, চাল প্রভৃতি দেওয়া হয়। বিনিময়ে শিল্পীরা গৃহস্থকে আশীর্বাদ করে যায়। পরের দিন উৎসবের মূল পর্ব বৈসুমা। এদিন ত্রিপুরাদের সমাজে ধনী-গরিবের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকে না। এদিন ‘কচুই পানি’ বা পবিত্র পানি দিয়ে ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়। পিঠাপুলি ও রকমারি মুখরোচক খাবার দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। পরের দিন বিসিকাতাল বছরের প্রথম দিন। এদিন শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতীরা নতুন কাপড় চোপড় পরিধান করে বয়স্কদের প্রণাম করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে ত্রিপুরা পরিবেশন করে গরাইয়া নাচ ও বোতল নাচ।

৩. মারমাদের সাংগ্রাইং: মারমাদের বর্ষবরণ হলো সাংগ্রাইং। চাকমা-ত্রিপুরাদের মত মারমারাও বর্ষবরণকে তিন দিনে পালন করে। তা হলো যথাক্রমে সাংগ্রাই আকনিয়াহ্, সাংগ্রাই আক্রাইনিহ্ ও লাছাইংতার বলে। পুরনো বছরের শেষ তিন দিন ও নতুন বছরের প্রথম দিন মোট চার দিন মারমা জনগোষ্ঠী পালন করে সাংগ্রাইং উৎসব। প্রথম দিন সবাই শোভাযাত্রা করে বুদ্ধমূর্তিকে নদীর ঘাটে নিয়ে আসে। তারপর কলাপাতায় তৈরি ভেলায় চন্দন, ডাবের পানি ও দুধ দিয়ে বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করানো হয়। পরের দুটি দিন বিভিন্ন প্রকার পিঠা, বৌদ্ধভিক্ষুদের জন্য ছোয়াইং দান এবং প্রতিবেশিদের জন্য বিশেষ খাবার প্রেরণ করা হয়। মন্দিরে মন্দিরে চলে প্রার্থনা। মারমারা পূর্ববর্তি বছরের সমস্ত যন্ত্রণা, দুঃখ, দুর্ভাগ্য এবং মালিন্য ধুয়ে মুছে দিয়ে নির্মল নতুন বছরকে বরণ করার জন্য মৈত্রী পানি বর্ষণ খেলে।

৪. রাখাইনদের সাংগ্রেং: কক্সবাজারে বসবাসরত রাখাইনদের বর্ষবরণ উৎসব হলো সাংগ্রেং। সাংগ্রাং উৎসব উপলক্ষে রাখাইন সামাজে ঐতিহ্যবাহী জলকেলি, নৌকা বাইচ, ক্যানপোয়ে বা বালী খেলা আয়োজন করা হয়। ১৭ এপ্রিল থেকে রাখাইন নতুন বছর শুরু হয়। চার দিন ধরে চলে তাদের বর্ষবরণ উৎসব। প্রথম দিন প্রধান সড়কে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। দুপুরে প্রার্থনা ও বিকেলে চলে বৈচিত্রময় খাবার পরিবেশন। প্রতিদিন দুপুরেই ম-পে ম-পে চলে তরুণ-তরুণীদের জল কেলি উৎসব। আনন্দে ভরপুর এ জল কেলির প্রধান উদ্দেশ্য হলো পুরনোকে ভুলে গিয়ে নতুনকে বরণ করে নেওয়া।

৫. তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু: বান্দরবান ও রাঙামাটির পার্বত্য অঞ্চলে তঞ্চঙ্গ্যারা বাস করে। তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবরণ উৎসব বিষু তিন দিনে পালন করা হয়। ফুলবিষু, মূলবিষু ও নয়া বছর এই দিনে পালন করা হয়। ফুল বিষুর দিন মেয়েরা বন থেকে ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়। উৎসব উপলক্ষে হরেক রকমের পিঠাও বানানো হয়। গৃহিণীরা তাদের বাড়ি-ঘর ও ঘরের আসবাব পরিস্কার করে রাখে। আর পরদিন ভোরে সবাই স্নান করে নতুন জামা-কাপড় পরে খুব আনন্দ-ফূর্তি করে। ঘরে ঘরে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার আর পিঠার আয়োজন করে। রাতে ‘ঘিলা’ খেলায় মেতে ওঠে সবাই। আর সেই সঙ্গে গ্রামে বসে গানের আসর। তঞ্চঙ্গ্যারা পুজা করে, তরুণ তরুণীরা বয়স্কদের স্নান করায়। আর কিশোর কিশোরীরা বয়স্কদের আশীর্বাদ নেয়। সব গৃহিণীরা লক্ষীপূজা করে। অনেকে আবার এই উৎসবে মন্দিরে গিয়ে উপোস করেন।

৬. ম্রো বা মুরংদের চাক্রান বা চাংক্রান: ম্রো বা মুরংরা বাস করে শুধু বান্দরবনে। তাদের বর্ষবরণের উৎসব হলো ‘চাক্রান’ বা ‘চাংক্রান’। আরাকানি পঞ্জিকা মানে তো, তাই ওরা ম্রাইমাব্দ অনুযায়ী চাক্রান উদযাপন করে। তারা যথাক্রমে চাংক্রান নীওয়ান, চাংক্রান পা-নী ও চাংক্রান নীচুর নামে তিন দিন ব্যাপী চাংক্রান পালন করে। চাক্রান চিং বা পিয়োনীর আগের দিন মেয়েরা বন থেকে ফুল সংগ্রহ করে খোঁপায় ফুল গুঁজে রাখে। ঘরদোরের পাশাপাশি ওরাও ওদের বৌদ্ধমন্দিরগুলো ফুল দিয়ে সাজায়। আর রাতে ধুম পড়ে পিঠা বানানোর। মূল উৎসবের দিন মুরং তরুণ-তরুণী আর কিশোর- কিশোরীরা বন থেকে ফুল তুলে আনে। ওদিকে তাদের সবার ঘরে ঘরে পিঠা ও ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করে মায়েরা। মন্দিরগুলো ফুল দিয়ে সাজানো হয়। এদিন ওরা বাঁশি বাজিয়ে ‘পুষ্প নৃত্য’ করতে করতে মন্দির প্রদক্ষিণ করে। চাংক্রানের মূল দিনে তারা লাঠি খেলা খেলে। চাংক্রানের শেষ দিনে ম্রোরা আবার ফুল দিয়ে মন্দির সাজিয়ে উপাসনা করে। সারাদিন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাদের এই উৎসব।

৭. চাকদের সাংগ্রাইং: চাকদের বর্ষবরণের উৎসব হলো সাংগ্রাইং। এ শুভ দিনে চাকরা সকল হিংসা দ্বেষ ভূলে উৎসবে মেেত উঠনে। সাংগ্রাইং বর্মী সনের দিন ও তারিখ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়। মূলত প্রাক-সাংগ্রাইং, পাইংছোয়েত, আক্যাই ও আপ্যাইং এই চার পর্বে চার দিন ধরে চাকরা সাংগ্রাইং পালন করে। প্রাক-সাংগ্রাইং হলো সাংগ্রাইং শুরুর পূর্বের দিন আগমনী বার্তা। এদিন চাকরা বাস গৃহ ও গৃহস্থালির আসবাব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে উৎসব উৎযাপনের জন্য প্রস্তুত হয়। বিভিন্ন রকম আতশবাজি ফুটিয়ে পাড়া-গ্রাম তোলপাড় করে। উৎসবের প্রথম দিন পাইংছোয়েত বা ফুল দিবস। এই দিনে নানা ধরণের ফুল তুলে ভগবান বুদ্ধের পূজা করে মঙ্গল কামনা করে। উৎসবের দ্বিতীয় দিন আক্যাই। এদিনে চাকরা ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু, শ্রমণ ও উপাসক-উপাসিকদের প্রণাম করে গোসল করায়। এই দিনে সারা রাত ধরে নৃত্য, সংগীত ও নাট্যানুষ্ঠান চলে। চাকরা আক্যাইয়ের পরের দিন পালন করে আপ্যাইং। এদিন নব বর্ষ উপলক্ষে বিভিন্ন রকমের পিঠা, সেমাই ও মিষ্টান্নর আয়োজন করা হয়। এদিন নবীন ও প্রবীনদরে মধ্যে সৌর্হাদ্যতা, জ্ঞানীগুনী ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকেন।

৮. অসমীয়াদের বোহাগবিহু: বোহাগবিহু হলো অসমীয়া বা অহম জনগোষ্ঠির বর্ষবরণ উৎসব। বিহু উৎসবের সাথে অসমীয়াদের কৃষিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বছরে তিনটি বিহু পালিত হয় – বোহাগবিহু, কাতিবিহু ও মাঘবিহু। বোহাগবিহুর সময় ধানের বীজ বোনা হয়, কাতিবিহুতে চারগাছ রোয়া হয় আর মাঘবিহুতে ধান কেটে গোলায় তোলা হয়। তিনটির মধ্যে বোহাগবিহু বেশী গুরুত্বপূর্ণ। একে রঙালীবিহুও বলা হয়। চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে শুরু হয় রঙালিবিহু। এদিন গৃহপালিত গরুকে বাড়তি আদরযতœ করা হয়। গরুকে হলুদ আর তেল দিয়ে মাখিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে সাজানো হয় এবং খোলা মাঠে ছেড়ে দেয়া হয়। ছোটরা বড়দের জন্য লাল পাড়ের গামছা উপহার দেয়। পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে অসমীয়া সমাজে চলে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় বিহুর গান ও নাচ।

৯. পাংখোদের ডাই মার্হে: পাংখোদের বর্ষবরণের উৎসব হলো ডাই মার্হে। বছরের সূচনা লগ্নে তারা ইষ্টদেবতার পূজার মধ্যদিয়ে নতুন দিনকে স্বাগত জানায়। আদিকাল থেকেই পাংখোয়ারা ছিল আনন্দ প্রিয়। এদিন তারা আনন্দ-উৎসব, গান-বাজনা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে মধ্যদিয়ে দিনটি উৎযাপন করে।

১০. খুমীদের সাংক্রাই: খুমীদের বর্ষবরণ উৎসব হলো সাংগ্রাই তিন দিন ধরে পালন করে। প্রথম দিনে পুরুষেরা ভোরে উঠে ঝুড়িতে ধান-ভুট্টা ভরিয়ে গ্রামের প্রতি উঠানে ছিটিয়ে গৃহপালিত পশু-পাখিদের খাওয়ানো হয়। মহিলারা রান্না শেষে সবাইকে পরিবেশন করে। খাওয়ার শেষে পরিবারের সদস্যদের সাথে আড্ডায় বসে। দ্বিতীয় দিনে গিলার খেলা, বাঁশ খেলা ও পানির খেলাসহ নানান খেলাধুলার আয়োজন করে। তৃতীয় দিনে দল বেঁধে নদীতে মাছ ধরতে যায় আবার অনেকে শিকারে বের হয়। সবশেষে তারা অন্যান্ন নৃ-গোষ্ঠির মতই প্রার্থনা করে নব বর্ষের দিনটিকে শুরু করে।

১১. গুর্খাদের চৈতে দশই: গুর্খাদের বর্ষ বরণের উৎসব হলো চৈতে দশই বা বিষু। তারা চৈত্র মাসের শেষ দিনে এটি পালন করে। এদিন তারা নিরামিষ আহার করে গত বছরের ভালো-মন্দ কর্মের জন্য নৌরান বা প্রায়শ্চিত্ত করে। উৎসবের পূর্বের দিন তারা সকালে ফুল দিয়ে নিজেদের বাড়ি সাজায়। সকাল বেলা স্নান করে, গুরুজনদের নিকট আশীর্বাদ প্রর্থনা করে। প্রতিবেশীদের নিজ গৃহে আপ্যায়ন করে। এদিন তারা আনন্দ-উৎসব, গান-বাজনা, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যদিয়ে দিনটি উৎযাপন করে। তাদের ধারণা এই দিন ভালো কাটলে সারা বছরটাই ভালো কাটবে।

এছাড়াও বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা শেরপুর, নেত্রকোনা এবং বৃহত্তর সিলেট জেলার কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। এই অঞ্চলের প্রধান প্রধান নৃ-গোষ্ঠী বিশেষ করে হাজং, মণিপুরী, পাঙ্গন, খাসিয়া, গারো, কোচ, বর্মন, পাঙন, পাত্র, বর্মন, লাহাম ও বানাই প্রভৃতি জনগোষ্ঠী। পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বর্ষবরণ উৎসব উদযাপন করে। তারাও পার্বত্য অঞ্চলের নৃ-গোষ্ঠীদের মত নিজস্ব রীতি ও নামে বর্ষ বরণ করে তা আলোচনা করা হলো-

১. মণিপুরীদের বিষু উৎসব: মৌলবীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার মণিপুরী বসতিগুলোতে চৈত্র মাসের শেষ দিন থেকে সাতদিন ব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়। এই উৎসবের মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়ারা বছরের শেষ দিনটিতে ‘বিষু’ বা ‘চেরৌ’ আর মণিপুরী মৈতৈরা ‘শাজিবু চৈরৌবা’ উৎযাপন করে। বছরের শেষ দিনটিতে মণিপুরীরা সুর্যোদয়ের আগেই ঘরদোর, ঘরের চারপাশ এবং ঘরের যাবতীয় ব্যবহার্য বস্ত্র আসবাবপত্র পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে তুলসীপাতা ভেজানো পানি ছিটিয়ে ঘর এবং বসতভিটা ‘পবিত্র’ করার পর রান্নাবান্না শুরু হয়। অসংখ্য পদের নিরামিষ রান্না করে লৌকিক দেবতা ‘আপোকপা’ এবং কুলদেবতা ‘লামরদৌ’ এর উদ্দেশ্যে ভোগ নিবেদন করে। এরপর চলে সম্প্রীতির নিদর্শন হিসাবে ঘর থেকে ঘরে রান্না করা খাবার বিনিময়ের পালা। সন্ধ্যায় তৈরী হয় নানান জাতের পিঠা। মণিপুরী লেইসাঙ বা মন্দিরগুলো আরতি, পালা, কীর্তন ও মৃদঙ্গের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে। কোথাও কোথাও বসে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য এবং গানের আসর। রাতভর চলে ঐতিহ্যবাহী নিকন,লাকাটিসহ নানান খেলা।

২. হাজংদের হঙ্গরানী : ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা এবং বৃহত্তর সিলেট জেলায় হাজং জাতিসত্তার লোক বসবাস করে। হাজংদের বর্ষবরণ উৎসব হলো হঙ্গরানী। এই উৎসব ২/৩দিন ধরে চলে। হঙ্গরানী উৎসবের শুরু হয় ঘর-বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে। এ সময় ঘরের আসবাবপত্র, থালা-বাসন, কাপড় চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে সাজিয়ে নেয়। তাদের গৃহপালিত পশুদেরও স্নান করিয়ে নেয়। সেদিন হাজংরা স্নান করে আগামী বছর যেন মানুষের জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে ওঠে। বাড়িতে বাড়িতে হঙ্গরাণী উৎসবের সময়ে পিঠা-পায়েস রান্না হয়। সন্ধ্যায় বাড়ির চারিদিকে জ্বালানো হয় মঙ্গল প্রদীপ। উৎসবের সময়ে হাজংরা একশত সাত প্রকারের শাকসবজি দিয়ে তরকারি রান্না করে। এই তরকারিকে তারা মহৌষধ মনে করে।

৩. খাসিদের সেংকুটসনেম: সিলেটের জয়ন্তিয়া, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ খাসিয়াদের বাস। তাদের বর্ষ বরণের উৎসব হলো সেংকুটসনেম। খাসি পুঞ্জির বিশাল মাঠে কয়েক হাজার খাসি নৃ-গোষ্ঠির মানুষ পালন করে সেংকুটসনেম। পুরান বছরের পর্যালোচনা ও নতুন বছরকে সুন্দর ভাবে সাজানো এই ব্রতকে সামনে রেখে দু দিন ব্যাপী উৎস চলে। প্রথম দিনে খাসিয়া গননা অনুযায়ী তাদের বষের্র সমাপ্ত লগ্নে আয়োজন হয় আলোচনাসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও তাদের ঐতিহ্যবাহী সিয়াট খ্নাম বা তীঁর নিক্ষেপ, সিয়াট বাতুল বা ঘোলেল মারা ও কিউট থ্নেন বা তেল মাখা বাঁশে উঠা। এদিন ঐতিহ্যগত খাবার ও পোষাক নিয়ে মেলা। উৎসবের প্রথম দিনে ৩০/৩৫টি খাসি পুঞ্জি। প্রথা অনুযায়ী তাদের ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা দা, ঝুড়ি, কাপর, প্রসাধনী, শাক সবজীসহ নানা সামগ্রী ও পণ্য নিয়ে বসে মেলা। আর দ্বিতীয় দিন কেনা খাদ্য সামগ্রী দিয়ে খাওয়ার আয়োজন করে।

৪. বানাইদের চৈত্রসংক্রান্তি: বানাইরা চৈত্রসংক্রান্তিকে বর্ষবরণের উৎসব হিসেবে পালন করে। উৎসব উপলক্ষে বাড়ির সকল আসবাবপত্র, সরঞ্জাম, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিছানাপত্র, এমনকি গবাদি পশুদেরকেও ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে। তাদের লোকাচা মতে গরুর গবর দিয়ে ঘর লেপে পবিত্র করে। পরিবারের সকলেই গোসল করে ভালো পোশাক পরে পূজা-পার্বনে অংশ নেয়। উৎসব উপলক্ষে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করে।

৫. বর্মনদের বিষু : বর্মন নৃ-গোষ্ঠির বর্ষ বরণ উৎসব হলো বিষু। চৈত্র সংক্রান্তিতে বর্মনরা বিষু উৎসব উদযাপন করে। তারা সন্ন্যাসীপূজা, গাজন, চড়কপূজার মাধ্যমে এ দিনটি উৎযাপন করে। স্থানীয় ভাবে এদিনটাকে ছাতু খাওয়ার অনুষ্ঠানও বলে থাকে। এদিন সকলেই বাড়ি-ঘর, কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিমপাতা, হলুদ ও গরম জল দিয়ে স্নান করে। তারা বিশ্বাস করে এতে চর্মরোগ হয় না। গৃহপালিত পশুগুলোকেও তারা স্নান করায়। এদিন তারা গম, ভুটা, পয়রা, বিভিন্ন প্রকার ডালের ছাতু খায়। দুপুরের খাবারের সাথে বিভিন্ন প্রকার তিতা শাকসহ নিমপাতা, পাট শাক, করলা, আমডাল, কুরুশ ফুল, ডোমকল শাক খায়।

দেশের উত্তরাঞ্চল তথা দিনাজপুর, বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। এই অঞ্চলের প্রধান প্রধান নৃ-গোষ্ঠী বিশেষ করে সাঁওতাল, ওরাও, রাজবংশী প্রভৃতি জনগোষ্ঠী তারাও অন্যান্য অঞ্চলের নৃ-গোষ্ঠীদেরমত পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে নিজস্ব রীতি ও নামে বর্ষ বরণ করে তা হলো-

১. সাঁওতালদের বাহা পরব বা পুল উৎসব: বাংলাদেশে সাঁওতাল নৃ-গোষ্ঠি দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগজ্ঞ, রংপুর, পঞ্চগড়, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ছাড়াও বৃহত্তর সিলেটের চা বাগানে কিছু সাঁওতাল বসবাস করে। সাঁওতাল নৃ-গোষ্ঠি ফাল্গুন মাস থেকে বর্ষ গণনা শুরু করে। সাঁওতালদের বর্ষ বরণ উৎসব হলো বাহা পরব বা পুল উৎসব। বাহা শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ফুল। বাহা পরব পালিত হয় ফালগুন মাসের পূর্ণিমাতে। মানঝির (গ্রাম প্রধান) সঙ্গে পরামর্শ করে বাহা পরবের দিন ঠিক করা হয়। এই উৎসব চলে দুই থেকে চারদিন। বাহা পরবের জন্য নির্ধারিত স্থানকে বলা হয় ‘জাহের থান’ বা ‘জাহের বির’। বনের ভিতরে বাহা পরবের মন্ডপ তৈরি হয়। বাহা পরবের প্রথম দিনকে বলে বাহাউম। এদিন জগ-মাঝি ( সহকারি গ্রাম প্রধান) যুবকদের নিয়ে বনে যায়। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষে শুরু হয় হোলি খেলা। কখনো কখনো সারাদিন-সারারাত এমনকী পরের দিন দুপুরেও এই হোলি খেলা চলে। সাঁওতালদের জনপ্রিয় জনপ্রিয় পানীয় হলো চোয়ানী (মদ)।

২. ওরাওঁদের ফাগুয়া: উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, দিনাজপুর, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগজ্ঞ, রংপুর,পঞ্চগড়, নাটোর, ঠাকুরগাঁও, পাবনা জেলায় ওরাওঁদের বসবাস। ওরাওঁদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের নাম ফাগুয়া। ফাগুয়া উদযাপন করা হয় ফাল্গুনী পূর্ণিমায়। ফাগুয়া শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আবীর। তাতে প্রচুর আবীর ব্যবহৃত হয়। ফাল্গনী পূর্ণিমায় পাহান বা পুরোহিত অফুলন্ত শিমুল, ভেরেন্ডা এবং জিগা গাছের একটি করে শাখা কেটে পূজার থানে পুতে রাখে। এ সময় ওরাওঁরা খোল-করতাল-বাঁশী বাজাতে বাজাতে সেখানে উপস্থিত হয়। ফাগুয়াতে দুটো অনুষ্ঠান হয়। প্রথম অনুষ্ঠান মিপ্তোঃ কিতো, গৃহদেবতার উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে মদ্য পান করে নববর্ষকে আহবান করা হয়। ফাগুয়াতে মদের সঙ্গে থাকে পিঠা। উৎসবের উল্লেখযোগ্য দিক শিকারযাত্রা। ফাগুয়ার তিন দিন পূর্বে প্রতিটি গ্রাম থেকে দশ-পনের জন যুবকের দল শিকারে যায় এবং ফিরে আসে ফাগুয়ার আগের দিন। শিকারে পশু-পাখির মাংস গ্রামবাসীদের নিয়ে একত্রে রান্না করে খায়। এ সময় নৃত্য-গীতও চলতে থাকে। ফাগুয়া উৎসবের নৃত্য-গীতের সময় আনন্দ-উচ্ছলতার সৃষ্টি করে, দুঃখ-বেদনা ভুলে যায়।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com