শান্তনু কায়সার : তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টি

পিয়াস মজিদ | ১৩ এপ্রিল ২০১৭ ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন

photoশান্তনু কায়সারকে (১৯৫০-২০১৭) দেখেছি আমার বেড়ে ওঠার শহর কুমিল্লায়। লেখক নাম ‘শান্তনু কায়সারে’র আড়ালে তাঁর প্রকৃত নাম ‘আবদুর রাজ্জাক’; এ তথ্য জেনেছি যখন তখন ভাবতাম তিনি বুঝি কন্যাকুমারী উপন্যাসের লেখক আবদুর রাজ্জাক। পরে আমার ভুল ভাঙে; জেনেছি তিনি মূলত প্রাবন্ধিক-গবেষক। তবে তাঁর প্রথম দিকের গ্রন্থতালিকায় পাওয়া যাবে কবিতাগ্রন্থ রাখালের আত্মচরিত (১৯৮২) এবং গল্পগ্রন্থ শ্রীনাথ পণ্ডিতের প্রাণপাখি (১৯৮৭)। তাঁর কবিতাগ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছিলেন অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পরে যখন প্রাবন্ধিক-গবেষক হিসেবে শান্তনু কায়সারের চূড়ান্ত সিদ্ধি তখনও কিন্তু তিনি কি এক অন্তর্তাগিদে লিখে গেছেন কবিতাগ্রন্থ শুভ সুবর্ণ জয়ন্তী (২০০২), গল্পগ্রন্থ ফুল হাসে পাখি ডাকে (২০০১), অর্ধশতাব্দী, উপন্যাস- ঐ নূতনের কেতন উড়ে, উপন্যাসিকা সংকলন ত্রয়ী। শকুন শিরোনামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাসও কুমিল্লার কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল যা গ্রন্থরূপ পায়নি।
কুমিল্লা শহরে প্রায়শই মন্টুর দোকান নামে পত্রিকাবিপণিতে তাঁকে দেখা যেত একগাদা পত্রিকা কিনে সহ প্রাতঃভ্রমণকারীদের সাথে রাজনীতি থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে সংসার ইত্যাদি নানা বিষয়ে আড্ডা দিতে দিতে সময় পার করতে। জীবন চলার বাঁকে বাঁকে দেখা হওয়া, কথা হওয়া প্রতিটি মানুষই তাঁর কাছে ভীষণ মূল্যবান ছিলেন। তাই আমরা দেখি পত্রিকার দোকানদার মন্টু মারা গেলে যেমন তিনি তাঁকে স্মরণ করে লিখেছেন তেমনি তাঁর সুদীর্ঘদিনের সুহৃদ সমীর মজুমদারের পিতা ভুবনেশ্বর মজুমদারের প্রয়াণেও শোকার্ত কলম ধরেছেন। যে মানুষটি লিখেছেন দুই খন্ডে বঙ্কিমচন্দ্র (১৯৮২ ও ৮৪), মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ তৃতীয় মীর (১৯৯৪) এবং অদ্বৈত মল্লবর্মনকে নিয়ে দুই বাংলায় পথিকৃৎপ্রতিম বেশ কয়েকটি গ্রন্থ, তাঁকে আমরা কুমিল্লা শহরে হেঁটো পথিকের মতো মাঠে-ঘাটে সক্রিয় দেখেছি।

স্মৃতিতে ভাসছে আমার কৈশোরে কুমিল্লার জামতলায় এক পড়ন্ত দুপুরে আবুল হাসনাত বাবুলের তিননদী পরিষদের একুশের অনুষ্ঠানে বক্তৃতারত শান্তনু কায়সারের ছবি। সে অনুষ্ঠানে তিনি বলছিলেন- আমাদের ইতিহাস-বিকৃতির কথা, বুদ্ধিবৃত্তিক নানা স্খলনের কথা। ২০০১-এ লালন আখড়া আন্দোলনের সময় কুমিল্লার পূবালী চত্বরে পহেলা বৈশাখে আয়োজন করা হয় একটি প্রতিবাদী সমাবেশের। এই লেখক একজন শ্রোতা হয়ে কান্দিরপাড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে শুনছিলেন শান্তনু কায়সারের কথা; হঠাৎ সমাবেশের উদ্যোক্তাদের একজন কাজী দিলজিৎ সজল জানালেন ঢাকার রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়েছে। মুহুর্তে শান্তনু কায়সার বললেন ‘ভয়ের বাতাবরণ দিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক যাত্রাকে স্তব্ধ করা যাবে না।’ আমরা সে কথায় উজ্জীবিত হয়েছি। তাঁকে দেখেছি জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের বর্ষাবরণ অনুষ্ঠানে ফরিদা বিদ্যায়তন প্রাঙ্গণে বলতে ‘আমাদের বাংলার শ্রাবণ নিরীহ নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এ শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে। অতএব যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই আগুন জ্বলে উঠতে পারে।’ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ রোডে দাদার দোকান আড্ডাধারীদের কয়েকজন যেমন– জাভেদ হুসাইন, আজহার ফরহাদ প্রমুখের উদ্যোগে কবিতার কমরেড লাল সালাম শিরোনামে তাৎক্ষণিক স্মরণসভার আয়োজন করা হয় কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে। আমার ধারণা দু’বাংলা মিলিয়ে সেটাই ছিল সুভাষ-স্মরণে প্রথম অনুষ্ঠান। শান্তনু কায়সার আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা বিষয়ে যে উন্মোচক বক্তব্য রেখেছিলেন তা তাঁর গভীর অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণশক্তির পরিচয়বহ ছিল।
তাঁর পৈত্রিক নিবাস চাঁদপুর। নিজের গ্রাম সাচনমেঘকে পটভূমি করে নিয়ে তিনি নাটকও লিখেছেন সাজনমেঘ (১৯৯৫) নামে। কিন্তু জীবনের বেশিরভাগ সময় কুমিল্লায় কাটিয়েছেন বলে অনেকেই তাঁর জন্মস্থান কুমিল্লা বলে ভুল করতেন। আবার একটানা অনেকটা সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে কাটিয়েছেন বলে অনেকেই ভাবতো তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক। আমি মনে করি স্থানিকতার এই বিষয়টি শুধু বসবাসের কারণে হয়নি; তিনি যেখানে থেকেছেন সেখানকার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ঋজু ভূমিকা রেখেছেন, নতুন সংগঠন সৃষ্টি করেছেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন- ফলে সে অঞ্চলের মানুষ তাঁকে ‘তাদেরই লোক’ বলে মনে করতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অধ্যাপনাসূত্রে সেখানে সাহিত্য একাডেমি নামের সংগঠন সৃষ্টি ও বিকাশে ছিলেন তৎপর। মৌলবাদকবলিত একটি অঞ্চলে আশির দশকে তিনি ইবনে সিনা-কার্ল মার্কস-আইনস্টাইন স্মরণসভার আয়োজন করেছেন। কবি জয়দুল হোসেনসহ অন্যান্যরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তাঁর যোগ্য ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন আজ পর্যন্ত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বসবাসের কালপর্বেই তিনি তিতাস তীরবর্তী অঞ্চলের এক শ্রেষ্ঠ ভূমি ও জলপুত্র অদ্বৈত মল্লবর্মণকে যেন মাটি খুঁড়ে বের করেছেন। একথা আজ দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করা যায় যে শান্তনু কায়সারের ক্ষান্তিহীন গবেষণা অদ্বৈত মল্লবর্মণকে নতুন করে আমাদের দৃষ্টিপ্রদীপে নিয়ে এসেছে।
কুমিল্লায় কলেজ ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মিলিত অংশগ্রহণে মঞ্চায়ন করছেন শেকস্পিয়রের নাটক। তাঁর সংগঠকসত্তা বিস্তৃত হয়েছে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত। এক সময় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, বদরুদ্দীন উমরদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ লেখক শিবিরে। এ সংগঠনের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছেন।
গত ২০০১ সালের পর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ শান্তনু কায়সারকে রাজনৈতিক কারণে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত স্থানে বদলি করা হয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে কেউ এক্ষেত্রে এ ধরনের বদলি ঠেকাতে ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ করেন কিন্তু শান্তনু কায়সার যখন জামালপুরের একটি মহিলা কলেজে বদলি হয়ে যান তখন সেখানেও সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টি করেন। জামালপুরের সন্তান হাসান হাফিজুর রহমানকে নিয়ে কাজ করেন, সেখানে বইমেলার আয়োজন করেন। লক্ষ্মীপুরের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বদলি হয়ে সেখান থেকে একটি অতুচ্চ্যমানের কলেজ ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন যাতে কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি লিখেছেন দেশের বিশিষ্ট লেখকবৃন্দ। পত্রিকা সম্পাদনাতে তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। কুমিল্লায় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের মুখপত্র হিসেবে স্বর্ণশস্য নামে তিনি যে সংকলন প্রকাশ করতেন সেখানে আমরা দেখেছি সংগীত বিষয়ক একটি পত্রিকায় কী করে বিজ্ঞানের দর্শন থেকে শুরু করে রাজনীতির শ্রেণিচরিত্র বিষয়ও প্রাসঙ্গিক লেখাপত্র সংগ্রহ করে তিনি সংকলন করতেন। মূলত সমগ্রতাবাদী মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি লালন করতেন বলেই তাঁর সাহিত্য বিশ্লেষণে যেমন এর ছাপ আছে তেমনি সম্পাদিত পত্রিকার পাতায়ও রয়ে গেছে এর অমোচ্য রূপদাগ।
নির্দিষ্ট একটি গবেষণা তিনি পুনঃপুন আবিষ্কারে, সংশ্লেষণে পরিমার্জন করতেন। এ জন্য আমরা দেখি ১৯৮৭তে শুরু হওয়া অদ্বৈত-গবেষণা তিনি অদ্বৈতর জন্মশতবর্ষে এসে আবার নতুন করে ফিরে দেখছেন, আলো ফেলছেন। অতিচর্চিত-গবেষিত বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি সে বিষয়ের কোনো অনালোকিত-দুরূহ অধ্যায় নিয়ে লিখতে ভালবাসতেন তাই নজরুল জন্মশতবর্ষে তিনি লিখলেন নজরুল সৃষ্টির পুষ্প-অধ্যায় নিয়ে একটি অনন্যগ্রন্থ ফুল ও নজরুল (২০০১), জীবনানন্দের গদ্য বিষয়ে একটি অসাধারণ গ্রন্থ গভীর গভীরতর অসুখ গদ্যসত্তার জীবনানন্দ (১৯৯৭)। রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাঁর বই রবীন্দ্রনাথ : চার অধ্যায় এবং সার্ধশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ : না নিন্দা না স্তুতি না দূষণ। মানিক, বিভূতি ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সৃষ্টি প্রসঙ্গে তিনটি দীর্ঘ প্রবন্ধের সংকলন বাংলা কথাসাহিত্য : ভিন্নমাত্রা (২০০১)। তাঁর আরও কয়েকটি গ্রন্থের মধ্যে আছে সুকান্ত ভট্টাচার্য : পাঠ ও পুনপাঠ, স্বর্ণ ও শুভ, তৃতীয় প্রজন্মের কাছে। বাংলা একাডেমির ভাষাশহিদ গ্রন্থমালা সিরিজে কাব্যনাটক (১৯৮৬) গ্রন্থটিও উভয়বঙ্গে এ বিষয়ে আগ্রহীদের কাছে আদৃত হয়েছে। জীবনী রচনায়ও তাঁর উৎসাহ ছিল। অদ্বৈত ছাড়াও লিখেছেন- দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর, একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবী মোহাম্মদ মোর্তজা, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, কবি রাজিয়া খাতুন চৌধুরাণী এবং নাজমা জেসমীন চৌধুরীর জীবনী। সম্পাদনা করেছেন অকালপ্রয়াত অসামান্য লেখক খান মোহাম্মদ ফারাবীর রচনাসমগ্র (১৯৯২)। অনুবাদ করেছেন রবার্ট ব্রাস্টেইনের বিদ্রোহী নাট্যতত্ত্ব : ত্রয়ী নাট্যকার (১৯৮৭) এবং লোপে দা ভেগার নাটক ফুয়েন্তে অভিজুনা (১৯৯৭)। শিশুদের জন্য লেখেছেন ছোট বন্ধুরা (২০০২)। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার জীবনে প্রেমের অধ্যায় নিয়ে লিখেছেন নাটক তুমি। তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ ছিল বলেই শান্তনু কায়সার সাহিত্যের অন্যতম তৃণমূললগ্ন মাধ্যম নাটক নিয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। তাঁর নাটক বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন বাংলাদেশের নাট্য ও নাট্যদ্বন্দ্বের ইতিহাস আমাদের নাট্যগবেষণাক্ষেত্রে একটি বিরল সংযোজন নিঃসন্দেহে।
গুরুভার বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ-গবেষণার পাশাপাশি মাঝে মধ্যে হালকা চালের বিচিত্র বিষয়েও তাঁর কলম সচল থাকতো। শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ-৫ পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে তিনি এ বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর অতিশ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরে গেলে তিনি সে বিষয়কে উপজীব্য করেও গদ্য লিখেছেন।
শান্তনু কায়সার সাহিত্য সমালোচনায় ছিলেন নির্মোহ ও নির্মম। যে নৈর্ব্যক্তিক নিরাসক্তিতে তিনি তাঁর পরিচিত প্রিয়জনেরও সাহিত্য বিশ্লেষণ করতেন তা অনেক সময় তাঁকে সমকালীন সমাজে অপ্রিয় করেছে কিন্তু এতে মোটেও বিচলিত হতেন না তিনি। আপাতদৃষ্টিতে কারো কারো কাছে তিনি হয়তো গাম্ভীর্যের প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছেন কিন্তু যারা তাঁর সঙ্গে মিশেছেন তাঁদেরই অনুধাবনে এসেছে একরাশ খোলা হাওয়ার মানুষ ছিলেন শান্তনু কায়সার। নিজের লেখাতেও প্রায়শই গভীরতার সঙ্গে মিলেমিশে যেতো রসবোধ। কলকাতায় কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে মহানায়ক উত্তমকুমার কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ছাত্র ছিলেন এককালে আর পরবর্তীকালে ঢাকা কলেজে তাঁর ছাত্র ছিলেন শান্তনু কায়সার। শিক্ষক শওকত ওসমানকে নিয়ে লিখতে গিয়ে শান্তনু কায়সার ফিরে ফিরে বলেছেন ‘শওকত ওসমান বলতেন আমার ছাত্র উত্তমকুমার হইতে শান্তনু কায়সার।’ বন্ধুবৎসল ছিলেন দারুন। কথায় কথায় বলতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মুুহম্মদ নূরুল হুদা কিংবা কাজী মোস্তায়ীন বিল্লাহর কথা।
শান্তনু কায়সার লেখার বিষয়ে ছিলেন ভীষণ নিয়মানুবর্তী ও পরিশ্রমী। বাংলা একাডেমি তাঁকে কুমিল্লা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব দিলে তিনি তাঁর কন্যা শাহানা নার্গিস আলোকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রাম-গ্রামান্তরে। বড় পত্রিকা থেকে অতিতরুণদের ছোটকাগজে লেখা দিতে একবার যদি তিনি সম্মত হতেন তাহলে ঠিক সময়ে নিজ দায়িত্বে লেখাটি পৌঁছে দিতেন। কোনো সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখা বা প্রবন্ধ উপস্থাপনের কথা থাকলে ঠিক সময়মতো সেখানে এসে উপস্থিত হতেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে কুমিল্লায় সমতট নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম হাতে নেন তিনি। এই সংগঠন থেকে আয়োজন করেছেন শহিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারক বক্তৃতার। সমীর মজুমদার, আবদুল মালেক, চামেলী মজুমদার, মানসী সাধু, তপন দেবনাথ এবং এই লেখকসহ আরও অনেক তরুণকে তিনি যুক্ত করেছেন সংগঠনের নানা কাজে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণ কবি-লেখকদের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দেয়ার আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে তারুণ্যের প্রতি তাঁর ব্যাপ্ত প্রশয়েরই প্রমাণ মেলে। তাঁর তরুণ অনুরাগীর সংখ্যা বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গ ছাপিয়ে ত্রিপুরার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পশ্চিমবঙ্গের দিবারাত্রির কাব্য, অনুষ্টুপ, চতুরঙ্গ ইত্যাদি সাহিত্যপত্রে তিনি নিয়মিত লেখেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম আলো উপন্যাসটি যারা পড়েছেন তারা দেখবেন সুনীল তাঁর উপন্যাসের তথ্যসূত্রে শান্তনু কায়সারের তৃতীয় মীর বইটির কথা উল্লেখ করেছেন।
শান্তনু কায়সার ও তাঁর স্ত্রী সালেহা বেগম সম্প্রতি তাঁদের প্রবাসী পুত্র অদুদ রায়হান ও রাসেলের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায়। সেসময় মাঝেমধ্যে অতিসকালে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফোন পেয়ে ঘুম ভেঙে চমকে উঠতাম। মুঠোফোনের অপর প্রান্তে শুনতাম শান্তনু কায়সারের কণ্ঠ। বিদেশ থেকে জেনেছেন শহীদ কাদরী, মহাশ্বেতা দেবী বা সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর কথা। বলেছেন ‘আমি এই নিয়ে লিখছি কুমিল্লার কাগজ পত্রিকায়। সম্ভব হলে পড়বে।’ হায়, আজ তাঁর মৃত্যুতেই লিখতে হচ্ছে এলোমেলো শোকলেখন, ভাবা যায়!
নিজের বইপত্রে লেখক-পরিচিতিতে লিখতেন ‘পর্বতমালা ও সমুদ্র দেখার আগে তিনি একটি ঘাসের ওপর একটি শিশিরবিন্দু দেখে নিতে চান। মাটির প্রদীপের বিনয় ও স্পর্ধা তাঁর জীবনের অন্বিষ্ট।’ সাতষট্টি বছরের জীবনের যুগপৎ বিনয়ী ও স্পর্ধিত যাপনে শান্তনু কায়সার আমাদের স্মরণযোগ্য হয়ে রইবেন নিঃসন্দেহে।

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন priscilla raj — এপ্রিল ১৩, ২০১৭ @ ১:২৯ অপরাহ্ন

      তথ্যবহুল এক শ্রদ্ধার্ঘ্য। খুব ভাল লাগল পড়ে। এই মাটির এক বিরলপ্রজ লেখক-গবেষক শান্তনু কায়সার। তাঁর প্রায় অকাল প্রয়াণে অপূর্ব স্মৃতি-তর্পণটি প্রকাশের জন্য বিডিনিউজ২৪-কে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর — এপ্রিল ১৪, ২০১৭ @ ৯:৪৬ পূর্বাহ্ন

      পিয়াস মজিদ-এর লেখাটি তথ্যবহুল ও স্মৃতিজাগানিয়া। লেখককে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গোলাম মোর্শেদ চন্দন — এপ্রিল ১৪, ২০১৭ @ ১২:৪২ অপরাহ্ন

      বাহ্। তাঁর আত্মার পরম্পরা চুড়ান্ত শান্তির পথে ধাবিত হোক।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com