ইয়েভগেনি ইয়েভতুসেনকো : বর্ণাঢ্য জীবন ও কীর্তি

কামরুল হাসান | ৮ এপ্রিল ২০১৭ ৮:৪৭ অপরাহ্ন

Evgenyষাটের দশকে রাশিয়া মাতানো কবি ইয়েভগেনি ইয়েভতুসেনকো জন্মগ্রহণ করেছিলেন রাশিয়ার সাইরেরিয়ার ছোট্ট শহর জিমা জংশনে, ১৯৩২ সালে। স্ট্যালিন বিরোধিতার জন্য তাঁর অংকের শিক্ষক বাবাকে গোটা পরিবারসহ সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। আশ্চর্য নয় যে, ইয়েভতুসেনকোর বেড়ে ওঠায় সে ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিলো। তাঁর রক্তধারায় এসে মিশেছিল অনেকগুলো জাতিসত্ত্বার মিলিত ধারা। তাই বুঝি ইয়েভতুসেনকো এত প্রতিভাবান, এত দুর্জ্ঞেয়। শৈশবেই বাবার সাথে বেড়িয়ে এসেছেন রাশিয়ার সংলগ্ন কয়েকটি দেশ। কিন্তু সাত বছর বয়সে মায়ের সাথে বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে পিতার সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হন তিনি। অতঃপর মা এবং মাতৃকুলের পরিজনদের কাছেই বড় হন। বাবার পারিবারিক নাম গ্যাংগনাস ছেড়ে মায়ের উপাধি ইয়েভতুসেনকো জুড়ে দেন নিজ নামের সাথে। অনেক বছর পরে যখন ইয়েভতুসেনকোর কবিতায় উদ্বেল গোটা রাশিয়া, তখন মায়ের উপাধি থেকে নেয়া নামের শেষাংশটুকু নামের প্রথমাংশের সাথে মিলে এক সাঙ্গীতিক দ্যোতনা হয়েই বিশ্ববাসীর কানে পৌঁছায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে বসবাসের জন্য তিনি সাইবেরিয়া থেকে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে চলে আসেন। অত্যন্ত সমৃদ্ধ রাশিয়ান সাহিত্যের রাজধানীও সেটাই। মস্কোতে তিনি সাহিত্য রচনার সঠিক পরিবেশটি খুঁজে পান, পরিচিত হন সমসাময়িক এবং অগ্রজ অনেক কবির সাথে। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ এই চার বছর মস্কোর গোর্কি সাহিত্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন সাহিত্য পড়ার জন্য, কিন্তু অনেক প্রতিভাবান লেখকের মতোই, শেষ করেননি সে পড়াশোনা। কবিতা তখন তাকে পেয়ে বসেছে। উন্মাদের মতো প্রেমে পড়ছেন আর কবিতা লিখে চলেছেন।

ইয়েভতুসেনকোর কবিপ্রতিভা বালক বয়সেই স্ফুরিত হয়। প্রথম কবিতাটি যখন লিখেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০। খেলাধুলার একটি ম্যাগাজিন তাঁর প্রথম কবিতা মুদ্রিত করে ১৬ বছর বয়সে। প্রথম কবিতার বই The Prospects of the Future ছাপা হয় ১৯ বছর বয়সে। তাঁর একটি কবিতা That’s what is happening to me একটি জনপ্রিয় গানে রূপান্তরিত করেন অভিনেতা ও গীতিকার আলেক্সান্ডার ডলস্কি। নিজের জন্মস্থান নিয়ে রচিত ‘জিমা স্টেশন’ ইয়েভতুসেনকোর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রচনা। তাঁর প্রথমদিককার রচনা অনেক বড় কবির প্রশংসা পায়– এর মাঝে আছেন বরিস পাস্তারনাক, কার্ল স্যান্ডবার্গ ও রবার্ট ফ্রস্ট প্রমুখ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সোভিয়েত জমানায় তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন একনায়কবাদী লৌহশাসনের বিরুদ্ধে জনপ্রিয় প্রতিবাদী কবিতা লিখে। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠতো শ্লেষ ও বিদ্রুপ। ইতিহাসের আবর্তনে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়া এবং সেখানে একনায়কতন্ত্র অবসানে যে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াই চলেছিল সে লড়াইয়ে ইয়েভতুসেনকোকে একজন অগ্রদূত মনে করা হয় তাকে। বস্তুত পশ্চিমী দুনিয়ায় তার সমাদর যতখানি না কবি হিসেবে তার চেয়েও বেশি তাঁর প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে জার্মান সৈন্যবাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার ইহুদি নির্মমভাবে নিহত হয়। এটি পৃথিবীর ইতিহাসেই একক নারকীয় গণহত্যার একটি বড় দৃষ্টান্ত। এর প্রতিবাদে লেখা ইয়েভতুসেনকোর কবিতা ‘বাবী ইয়ার’ তুমুল আলোড়ন তোলে পাঠকমহলে। কেবল জার্মান বাহিনীর বর্বরতা নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে একপেশে সোভিয়েত প্রোপাগান্ডার মুখোশও এতে খুলে পড়ে। ‘বাবী ইয়ার’ খুব সম্ভবত ইয়েভতুসেনকোর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা। মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা Literaturnaya Gazeta-এ প্রকাশের পরপরই কবিতাটি সঙ্গীতে রূপলাভ করে। ‘বাবী ইয়ার’-এর সাথে ইয়েভতুসেনকোর আরও চারটি কবিতা মিলে দিমিত্রি সস্তাকোভিচ তার থার্টিনথ সিম্ফনি নির্মাণ করেন। ইয়েভতুসেনকোর কবিতা শুনতে গ্যালারি উপচে পড়তো শ্রোতায়। বস্তুত তার মতো পাঠকপ্রিয় ও প্রভাবসঞ্চারী কবি ষাটের দশকে রাশিয়ায় আর একজনও নেই। অত্যন্ত সুদর্শন এই কবি একটি গোটা সোভিয়েত প্রজন্মকেই কবিতায় আন্দালিত করেছিলেন, পেয়েছিলেন তাদের ভালোবাসা। অবরুদ্ধ সময়ে হাঁসফাঁস করা পাঠকেরা তাঁর রচনার ভেতর খুঁজে পেয়েছিল শ্বাস ফেলার বাতাবরণ।

যদিও সোভিয়েত আমলের নির্যাতন, নিস্পেষণ ও বাকস্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে স্টালিনের নির্মমতার বিরুদ্ধে কলম ধরে, তাঁর বিপুল খ্যাতি এসেছে, তবে এ নিয়েও বিতর্ক আছে। অনেকেই ইয়েভতুসেনকোর মাঝে একটি স্ববিরোধ দেখতে পান; তিনি মুখে সমালোচনা, ভেতরে আঁতাত Ñএমন একটি দ্বৈততা দেখতে পান। তাঁর কট্টর সমালোচকরা মনে করেন, ইয়েভতুসেনকো দু’দিকে ভারসাম্য রক্ষা করে লিখেছেন। তারা এমনও বলেছেন যে, ইয়েভতুসেনকো ততটুকুই লিখেছেন যতটুকু কমিউনিস্ট পার্টি অনুমোদন করেছে। এই সমালোচকদের মধ্যে রয়েছেন পোলান্ডের নোবেলজয়ী নির্বাসিত কবি জোসেফ ব্রডস্কি, যার উপর পোলিশ কমিউনিস্ট জান্তার অন্যায় বিচারের প্রহসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে কবি-লেখকদের স্বাক্ষরসংগ্রহ অভিযানে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলেন ইয়েভতুসেনকো।

রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ইয়েভতুসেনকো কমিউনিস্ট পার্টির দর্শনে বিশ্বাস করলেও মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন, ছিলেন নিপীড়নের বিরুদ্ধে। স্টালিন পরবর্তী রাশিয়ায় মতপ্রকাশের কিছুটা স্বাধীনতা, যদিও তা কমিউনিষ্ট নিয়ন্ত্রিত, তা এনেছিলেন ক্রুশ্চেভ। ইয়েভতুসেনকো বাতাবরণ খোলার এ সুযোগটি পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগান, কখনো সোভিয়েত শাসকদের কোপানলেও পড়েন। কয়েকবার তাঁর বিদেশযাত্রার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যদিও ভ্রমণপিপাসু মানুষটির বহুদেশ ভ্রমণ তাতে আটকায়নি। পশ্চিম তাকে বারংবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তিনি স্টালিনের লৌহশাসন ও নিস্পেষনের ঘোরবিরোধী ছিলেন, যা ফুটে উঠেছে তাঁর আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘স্টালিনের উত্তরাধিকার’-এ। এ কবিতায় তিনি সতর্ক করে দেন এই বলে যে, একনায়ক স্টালিনের মৃত্যু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার প্রেতাত্মা কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে এখনো লুকিয়ে আছে। দেখতে হবে যেন আর কখনোই তার পুনরুত্থান না হয়।

রাশিয়ার বিখ্যাত কবি আন্না আখমাতোভার মতে ইয়েভতুসেনকো খবরের কাগজে কৌতুক সৃষ্টিকারী বিদ্রুপাত্মক কবির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। তবে পশ্চিমের বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবি এবং রাশিয়ার অনেক লেখক-কবিই মনে করেন, ইয়েভতুসেনকো একজন বড় প্রতিভা। টিনা টুপিকিয়ানা গ্লেসনার তাকে “আধুনিক যুগের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি” বলে উল্লেখ করেন। তার মতে ইয়েভতুসেনকোর Bratsk Station আধুনিক রাশিয়ার সাহিত্যে সোভিয়েত জীবনের উপর সবচেয়ে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ, সবচেয়ে গভীর আলো ফেলে। এর দুই দশক পরে মিখাইল পার্সগ্লোভ গ্লেসনারের কথারই প্রতিধ্বনি তোলেন, ইয়েভতুসেনকোর Stanciya Zima-কে “সোভিয়েত সাহিত্যের একটি অন্যতম ল্যান্ডমার্ক” হিসেবে উল্লেখ করেন।

কবি হিসেবেই দুনিয়া তাকে চেনে, কিন্তু তিনি একাধারে প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, গান লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন কবিতার সংকলন। ইয়েভতুসেনকোর অন্য ভালোবাসা ছিল চলচ্চিত্র। সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লিখেছেন, বানিয়েছেন, এমনকি অভিনয় করেছেন রুপালি পর্দায়। অভিনয় তাঁর স্বভাবের মধ্যেই ছিল। দারুণ অঙ্গভঙ্গি করে নাটুকেস্বরে কবিতা পাঠ করতেন। নায়কোচিত চেহারার সাথে ব্যক্তিত্বের কারিশমা মিলে দারুণ উপভোগ্য হতো সে পাঠ। জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন এ কবি, যার অনেকগুলোই কমিউনিস্ট শাসিত রাশিয়ার সরকার দিয়েছে। ১৯৬৩ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন, যদিও শেষাবধি তা তিনি পাননি।

সৃজনশীল মানুষটির ব্যক্তিগত জীবনও অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ছিলো। অসংখ্যবার প্রেমে পড়েছেন, বিয়েই করেছেন চারবার। প্রথম স্ত্রী বেলা আখমাদুলিনা একজন স্বনামধন্য কবি। ইয়েভতুসেনকোর প্রথম কবিতার বইটি প্রকাশে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। কিন্তু সে সম্পর্ক টেকেনি, একইভাবে ভেঙে যায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক। তাঁর তৃতীয় স্ত্রী জান বাটলার ছিলেন একজন ইংরেজ, যিনি ইয়েভতুসেনকোর কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। শেষজীবনে আমেরিকার ওকলাহামা রাজ্যের তুলসা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাশিয়ার কবিতা এবং ইউরোপের চলচ্চিত্র পড়াতেন। সেখানেই শেষ স্ত্রী মারিয়া নভিকোভা, সন্তান ও পরিজন পরিবেষ্টিত হয়ে গত ১লা এপ্রিল ৮৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘজীবনই পেয়েছিলেন সাহিত্যসম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ রাশিয়ার এ কবি যিনি স্মরণকালে রাশিয়ান কবিদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত ব্যাপৃত ছিলেন সৃজনশীল কাজে। তাঁর মৃত্যু বিশ্বকবিতার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Kamrul Hassan — এপ্রিল ১১, ২০১৭ @ ১:২১ অপরাহ্ন

      Artsbdnews24.com readers are fond of literature. I know life is busy, but I also expect some readers would send some comments on the above article.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ASIF AHMED — এপ্রিল ১২, ২০১৭ @ ৩:০২ পূর্বাহ্ন

      some magical writings and most valuable words,, touch my heart,, great work sir ,i wish you give us some more magical writing

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com