কার্লোস দ্রুমেন দি আন্দ্রাদে’র কবিতা

মাজুল হাসান | ৩১ মার্চ ২০১৭ ১:১৬ পূর্বাহ্ন

carlos-drummond-de-andradeব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। জীবদ্দশাতেই তিনি পরিণত হয়েছিলেন ব্রাজিলের সাংস্কৃতিক আইকনে। জন্ম ১৯০২ সালের ৩১ অক্টোবার ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মাইনাস গেরাইস-এর ইটাবিরা গ্রামে, যেটি খনির জন্য প্রসিদ্ধ। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত বাবা-মা’র সন্তান কার্লোস দ্রমেনের পড়াশোনা ফার্মেসিতে। কিন্তু কখনোই সেই পেশা ভালো লাগেনি তাঁর। ফলে সরকারি চাকরি করেই কাটিয়েছেন বাকি জীবন। ছিলেন ন্যাশনাল হিস্টোরিকাল আন্ড আর্টিস্টিক হেরিটেজ সার্ভিস অফ ব্রাজিলের চেয়ারম্যান।

১৯৩০ সালে প্রকাশ পায় প্রথম কবিতার বই আলগুমা পোয়েসিয়া। সবশেষ কবিতার বই হিস্তোরিয়া দি দোয়েস আমোরেস প্রকাশ পায় ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৭’র ১৭ আগস্ট মারা যান তিনি। এর পরেও ১৯৮৮তে ও পিনতিনহো এবং ২০০৯ সালে বের হয় ক্যারোল ই জিনা। কবিতার পাশাপাশি লিখেছিলেন দেড় ডজনেরও বেশি গদ্যের বই, যেগুলো শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি বিবিধ বিষয়ে লেখা।

মারিও দি আন্দ্রেদে ও ওসওয়াল্ড দি আন্দ্রদেদের কাব্যধারা প্রবাবিত দ্রুমেন ছিলেন মনেপ্রাণে আধুনিক। তাই আধুনিক কাব্যকৌশল যেমন: ফ্রি-ভার্সের প্রতি পক্ষপাত, বিষয়বস্তু হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ না থাকা ইত্যাদি বিষয়গুলো তাঁর লেখায় প্রতীয়মান হয়। ধীরে ধীরে অন্যের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে নিজের কাব্যভাষা ও ধারা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আলফ্রেদো বোসি বলছেন, লজিস্টিক ফ্রিডম ও ফ্রি-ভার্সের মধ্যে থেকেও তার কবিতা পাঠককে অন্য এক ভুবনে নিয়ে যায়। রোমানো ডি সেইন্ট আন্না তাঁর কাব্যচর্চাকে মোটা দাগে ৩টি পর্ব চিহ্নিত করেছেন।
১. greater than the world – marked by ironic poetry
২. lower than the world – marked by social poetry
৩. equal to the world – covers the metaphysical poetry

১৯৮০’র শেষ দিকে কার্লোস দ্রুমেনের কবিতা খানিক ইরোটিক হয়ে ওঠে। মার্কিন কবিমহলেও সমান পরিচিত ছিলেন তিনি। মার্ক স্ট্রান্ড ও লয়েড স্কোয়ার্দজ তার কবিতা ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন। এলিজাবেথ বিশপের সাথে পত্রালাপও ছিল তাঁর, যিনি তাঁর প্রথম ইংরেজি অনুবাদকও। কবিতাগুলো ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে থেকে বাংলায় তর্জমা করা হলো।–অনুবাদক

বালক কাঁদে রাত্তিরে

ঊষ্ণতায়, আর্দ্র রাতে, বালক কাঁদে, নিঃশব্দে এবং মৃত
বালক কাঁদছে দেয়ালের পেছনে, জানালার পাশে আলো
হারিয়ে গ্যাছে বদ্ধ সিড়িটায়, যেন ক্লান্ত স্বরেরা
কান পাতলে এখনও শোনা যায় চামচে ওষুধ ঢালার শব্দ

বালক কাঁদে রাত্তিরে, দেয়ালের ওপাশে, রাস্তায়
বালকের কান্না থেকে বহু দূরে, আরেকটা শহরে
হয়তো আরেক বিশ্বে

আমি দেখতে পাই এক হাতে চামচ আর অন্য হাতে তুলে ধরা মাথা
দেখতে পাই বালকের থুতনি দিয়ে গড়িয়ে পড়া রেশমি সুতা
সহসা ছলকায় রাস্তায়, শুধু একটা সুতা, ফালাফালা করে পুরো শহর
পৃথিবীতে আর কোনো কিছু নেই, শুধু বালকের কান্না।
carlos-drummond-de-andrade 02

বিগত সময়ের বাড়ি

অতীতের দরজায় কড়া নাড়ি, সাড়া দেয় না কেউ
কড়া নাড়ি দ্বিতীয়বার, আবার, আবার, তবু মেলে না সাড়া
বিগত সময়ের বাড়ি আধেক তার ছেয়ে গ্যাছে দ্রাহ্মালতায়
বাকিটাতে ছাইয়ের আস্তরণ

অই বাড়িতে মরে না কেউ, আর আমি ডাকছি, নাড়ছি কড়া
শুধু বৃথা আহ্বান আর তাতে কেউ সাড়া না দেয়ার কষ্ট
শুধু অনবরত কড়া নাড়ার কষ্ট। ফিরে আসে প্রতিধ্বনি
এই ব্যাগ্রতা- কখন খুলবে বরফজমাট সিড়ি
দিন রাত একাকাকার, শুধু প্রতীক্ষা
কড়া নাড়া, কড়া নাড়া

চলে যাওয়া সময় ফিরে আসে না কখনো
আর শূন্য বাড়ির ওপর বর্ষিত হয় নিন্দাবাদ

লজ্জিত শরীর

বুড়ো হতে ভয় পায় শরীর; শরণাপন্ন হয় শয়তানের
প্রার্থনা করে প্রতিবিধান। শয়তান শুনেছিল সব
মাংসের হাজার আকৃতির অতীত ঐশ্বর্য
আবারও হেসে উঠলো মাংস, চির অমরত্বের
বৃথা আশায়, ফুলেল ভালোবাসায়, ভাসমান সুখে
কিন্তু নরকের উপঢৌকনগুলো নতুন বিড়ম্বনা
তৈরি করে লজ্জিত প্রতিরোধহীন শরীরে
কোনো কিছুই পরিতৃপ্ত নয় এবং ফুলের সৌরভ
খানখান হলো কুঞ্চিত ভয়ে।

আলখাল্লার ভেতর মরেছিল যারা

ড্রইংরুমের কোণায় পুরনো অ্যালবাম (বিভৎস ছবির)
বহু মিটার উঁচু আর অসীম মিনিট পুরাতন
সবাই ঐ অ্যালবাম দেখে
যাতে আলখাল্লা পরা মৃতদের বিদ্রুপের মজা পাওয়া যায়

উদাসীন আলখাল্লাগুলো কাটা শুরু করেছে একটা পোকা,
কেটে খাচ্ছে অ্যালবামের পাতা, প্রতিকৃতির উৎসর্গভাব,
এমনকি ধুলোবালিও।
পাশাপাশি পোকাটা কুরেকুরে খাচ্ছে জীবনের ক্রন্দন
যা বেরিয়ে আসে ঐ পুরনো পৃষ্ঠাগুলো থেকে।

প্রত্যুষ

মাতাল কবি পড়ে ছিল স্ট্রিটকারে
পেছন-আঙিনায় প্রত্যুষ হচ্ছিল দিন
সমকামী বোর্ডিং হাউজগুলো ঘুমাচ্ছিল ভীষণ কষ্টে
বাড়িগুলোও ছিল মাতাল

সব মেরামতের অযোগ্য
শব্দের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে জানা ছিল না কারো
(কেবল একটা বাচ্চা অনুমান করেছিল, কিন্তু সে ছিল নিশ্চুপ)
সাতটা ৪৫শে ঘটতে যাচ্ছে পৃথিবীর সমাপ্তি
শেষ ইচ্ছা! শেষ টেলিগ্রাম!
যোসেফ, যিনি করায়ত্ত করেছিলেন নিজের সর্বনাম
হেলেন, যিনি ভালোবেসেছিলেন পুরুষ
সেবাশ্চিয়ান, যিনি নিজেকেই করেছিলেন দেউলিয়া
আর্থার, কিছুই বলেনি সে
অমরত্বের আশে বসেছিল সবাই।

মাতাল ছিল কবি, কিন্তু
ঠিকই শুনতে পেয়েছিল প্রত্যুষের নিমন্ত্রণ
এখন আমরা কি নাচতে নাচতে যাব
স্ট্রিটকার আর গাছের মধ্যখানে?

স্ট্রিটকার আর গাছের মধ্যখানে
নাচ ভাই নাচ!
যদিও কোনো সঙ্গীত নেই
প্রতিশ্রুতির মতো
বিলম্বে আসবে মৃত্যু

শৈশব

বাবা ঘোড়ায় চড়ে মাঠে গিয়েছিলেন
মা বসেছিলেন ঘরে, সিলাই করছিলেন
ছোট ভাইটা ঘুমিয়ে পড়েছিল
আম গাছতলায় একাকী ছোট্ট বালক
আমি পড়ছিলাম রবিনসন ক্রসো
সেই দীর্ঘ কাহিনি কখনোই যার সমাপ্তি আসে না।

দুপুরে, ধপধপে শাদা আলো, একটা কণ্ঠস্বর
ক্রীতদাস কোয়ার্টারে বহু আগে শিখেছিল ঘুমপাড়ানি গান-
কখনো ভোলেনি আর
আমাদের কফি খেতে ডেকেছিল
কফির কালোর চেয়েও কালো এক বৃদ্ধা
সুস্বাদু কফি
চমৎকার কফি

মা বসেছিলেন ঘরে, সেলাই করছিলেন
আর দেখছিলেন আমাকে:
আস্তে- বাচ্চাটাকে জাগাস না
উনি দোলনা দোলানো থামালেন যখন একটা মশা কামড়ালো
দীর্ঘশ্বাস পড়লো একটা… কী সাংঘাতিক!
এসবের বাইরে বাবা চলেছেন ঘোড়ায় চেপে
চষে বেড়াচ্ছেন খামারের অনন্ত আগাছা

আর আমি জানতাম না যে আমার কাহিনি
বরিনসন ক্রুসোর থেকেও যা ছিলো মনোরম।

নিজেকে হত্যা করো না

শান্ত হও কার্লোস, ভালোবাসা
এখন যা কিছু দেখছো তুমি
আজ একটা চুম্বন, আগামীকাল চুম্বনহীনতা
দিনের পর দিন, কাল রোববার
কেউ জানে না সোমে ঘটবেটা কি

প্রতিরোধের চেষ্টা বৃথা
অথবা আত্মঘাতী হওয়া
নিজেকে খুন করো না, খুন করো না নিজেকে!
নিজের সর্বস্ব রাখো বিবাহের জন্য
কে আসছে কখন আসছে
জানে না কেউ, যদি কখনো আসে কেউ

ভালোবাসা, কার্লোস, পার্থিব প্রাণ
তোমার সাথে করে রাত্রিযাপন
আর এখন তোমার ভেতর ফুলেফেঁপে উঠছে
ভাষাতীত জাল
প্রার্থনা,
গ্রামোফোন,
সেইন্ট অতিক্রম করছে নিজেদের
ভালো সাবানের বিজ্ঞাপন
এমন এক জাল
কেউ জানে না কেনো এবং কিসের জন্য।

ইত্যবসরে, তুমি চলে যাও আপনা পথে
খাঁড়া, মেলাঙ্কলি
তুমি আদতে পাম গাছ, তুমিই কান্না
কেউ শুনবে না থিয়েটারে
নিভে যাবে সকল আলো।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফ জুয়েল — মার্চ ৩১, ২০১৭ @ ১২:১৪ অপরাহ্ন

      প্রায় সবগুলো কবিতা পড়ে ভালো লাগল। প্রথমত ভালো কবিতার জন্য এবং দ্বিতীয়ত অসাধারণ প্রাঞ্জল অনুবাদ। আসলে অনুবাদ এক ধরণের নির্মান, নতুন কবিতা লেখা। মাজুল ভাইকে ধন্যবাদ। আর্টস.বিডিনিউজ২৪.কমকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এমন অনুবাদ আরো হোক।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গনী আদম — এপ্রিল ১, ২০১৭ @ ২:৪২ অপরাহ্ন

      অচেনা কবিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ কবি মাজুল হাসান। অনুবাদও হয়েছে চমৎকার।

      ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থগুলোর নাম-ধাম তুলে দিলে ভালো হতো।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com