শারমিন শামসের গল্প: ক্যারাভান

শারমিন শামস্ | ১২ এপ্রিল ২০১৭ ১২:৪৩ অপরাহ্ন


– একটা উঁচু পাহাড়ঘেরা শান্ত ছিমছাম শহর, সেইখানে এসে দাঁড়াবে আমার ক্যারাভান
– ক্যারাভান থাকবে?
– উমম নাও থাকতে পারে। আচ্ছা ধরে নিলাম থাকবে নাহ
– হুম
-একটা রাকস্যাক নিয়ে আমি এসে থামবো ওই শহরে। তারপরে সেখানেই থাকবো যতদিন মন চায়
– তারপর
– তারপর আর কি? তারপর নতুন শহর নতুন গ্রাম নতুন কোন দেশ ডাক দেবে। আমি চলে যাব
– হুম
– আই নিড মানি। আই নিড এ ওয়ে অফ আর্নিং এন্ড ট্রাভেলিং অ্যাট দ্য সেইম টাইম
– হাও?
– আই ডোন্নো
– হুম
কথাবার্তা এই পর্যন্ত এগোয়। তারপর থেমে যায়। পরের সাত আটদিন কোনভাবেই মিঠু নামের মেয়েটার কাছে পৌঁছুতে পারেন না তৌফিক। না ফোনে না চ্যাটবক্স। তারপর হুট করে একদিন তার অফিসে এসে হাজির মিঠু। তৌফিক তখন কেবল বোর্ড মিটিং শেষ করে নিজের ঘরে এসে লাঞ্চের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পিএ লাবনী জানায়, মিঠু নামের একটা মেয়ে দেখা করতে চায়। আধাঘণ্টা হলো এসে বসে আছে।
মিঠুর আসা অবাক হবার মত কিছু না। মিঠু কখন কী করবে তা এই মেয়ে নিজেও বলতে পারবে না। তবু তৌফিক কিছুটা অবাক হন।
Caravan
– অফিস চিনলে কীভাবে?
– এইটা কোন ব্যাপার হলো! তোমার এত্ত বিখ্যাত অফিস।
– হুম তাই!
মিঠু মিষ্টি করে হাসে।

– লাঞ্চ?
– না। আমি খেয়ে এসেছি।
– কি খেয়েছ?
– নীলক্ষেতের তেহারি
হাহাহাহা। গলা ফাটিয়ে হাসেন তৌফিক।
– আচ্ছা, আবার খাও
– না
– জুস খাবে?
– না, আমি কি বাচ্চা নাকি?
– না?
– না।
– আচ্ছা।
কিছুক্ষণ বসে থেকে, একটু ছটফট করে ঘরের এদিক ওদিক গিয়ে তারপর জানালার সামনে দাঁড়ায় মিঠু। সতেরো তলার উপর থেকে ঢাকা শহর দেখতে থাকে মন দিয়ে। রুটি আর তরকারি খেতে খেতে মনোযোগ দিয়ে মিঠুকে লক্ষ্য করেন তৌফিক। মেয়েটা হুট করে এসেছে ঠিকই, কিন্তু তার বেশ ভালো লাগছে।
– আমি যাই
– কোথায় যাবে?
– জানি না। না না জানি। কিন্তু বলবো না।
– কেন?
– এটা গোপন
– বাহ! আমাকে বল
– নো ওয়ে
– মিঠু তোমার মন খারাপ?
– অবভিয়াসলি
– ক্যানো?
– বাবা আমাকে বলেছে…
– কী বলেছেন?
– সকালে বললো আমি যদি অনার্স অ্যাডমিশান না নিই আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে
– হুম। তবে মিঠু এটা রাগের কথা
– আই নোউ। বাট আমি ডোন্ট ওয়ান্ট ফারদার স্টাডি
– ক্যানো মিঠু?
– আই ওয়ান্ট টু ট্রাভেল। আই ওয়ান্ট টু লিভ মাই ওউন লাইফ
– সেটা পড়ালেখা করেও করা যায়
– আই ডোন্ট বিলিভ ইন দিস কাইন্ড অব স্টাডি। আই হেইট দ্য সিস্টেম
– সো, ওয়াট আর ইউ গোনা ডু?
– ট্রাভেল
– আমার কাছে আসলে ক্যানো?
– বিকজ আই লাভ ইয়্যু
এই পর্যায়ে এসে তৌফিক চুপ হয়ে যান। এই তথ্য তিনি জানেন। মিঠু তার রাকস্যাক পিঠে ঝোলায়। সারাদিন রোদে টো টো করার ছাপ চেহারায়। কাজল থেবড়ে আছে।
– মিঠু বসো
– না যাই
– কোথায় যাচ্ছো আমাকে বলে যাও
– গোয়েন্দা?
– আমি গোয়েন্দা না
– শোনো, আমি আমার মত করে বাঁচতে চাই। এমন একটা জীবন যেটা আমার। তোমরা সবাই অন্য কারো জীবন কাটাও। আমি তা চাই না। শুধু একটা পয়েন্টে এসে ঠেকে যাব।
মিঠু দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা চেপে ধরে কয়েক সেকেন্ড। তারপর নিজেকে সামলে নেয় আবার।
– এনি ওয়ে, দ্যাট ডাজন্ট ম্যাটার
– কোন পয়েন্ট?
– ইউ নোও। বাই। সি ইউ সুন
– সত্যি?
– হুম
তৌফিকের কাছে এসে ঝুঁকে পড়ে তার ঠোঁটে চুমু খায় মিঠু।
– আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাই।


কই গ্যালো সওওবব?
আমার কথাগুলো এলোমেলো হয়ে জড়িয়ে যায়। আমি হাত বাড়িয়ে পানির বোতলটা টেনে এনে খোলার চেষ্টা করি। তারপর ঢকঢক করে পানি খাই। নাহ, শরীর খারাপ লাগছে না। কিন্তু এখনও বড্ড এলোমেলো আমি। সারারাত উল্টোপাল্টা নেশা করে এই ছোট্ট ঘরটায় আমি এখন একা। বাকিরা কে কোথায় গ্যাছে গড জানে। আমি জানি না। আমি আসলে অনেক কিছুই জানি না।
আমি আর বাড়ি ফিরে যাব না। এই প্রতিজ্ঞা মাথায় নিয়ে বন্ধুর বাড়ি এসে উঠেছি। বাড়ি মানে দেড়খানা ঘর। তাতে আবার দুইজন থাকে। অরূপ আর দিহান। এখন থেকে আমিও থাকবো। আমি মেয়ে বলে ওরা আমাকে রাখার ব্যাপারে প্রথমে মৃদু আপত্তি করছিল। পরে মেনে নিয়েছে। হয়তো ভাবছে, দুই দিনের খেয়াল। দুদিন পরেই বাড়ি ফিরে যাব। কিন্তু আমার প্রতিজ্ঞা বজ্রকঠিন। আমি ফিরবো না।
কিছুক্ষণ ঝিম মেরে শুয়ে থেকে থেকে আমার কিছুটা আরাম হয়। অরূপ দিহান ক্লাসে গেছে। মনে পড়ছে। বলেছিল। আমি ধীরে উঠে বসি। ডাইনিং রুম বলে যে জায়গাটা সেখানে ছোট টেবিলে পাউরুটি রাখা। আমি কিচেনে ঢুকে চা বসাই। কড়া চা আর দুই পিস পাউরুটি।
বাবা ফোন করেছিল। বাড়ি ফিরতে বলেছে। আমি বলেছি, না। তার ধৈর্য্য বেশিক্ষণ থাকেনি। আবারো রাগারাগি করে ফোন কেটে দিয়েছে। তবে এটা আমার জন্য ভালো। বাবা যে ইমোশনালি আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে না, এটা ভালো। আমি মাত্র তিনটা টিশার্ট, দুইটা প্যান্ট, একটা স্কার্ট, চারটে প্যান্টি, দুইটা ব্রা, একটা টাওয়েল নিয়ে এসেছি। আর আমার ক্যানন ক্যামেরা আর ল্যাপটপ। তিনদিন আগে একটা ব্যাগে ১৩টা বই ভরে দিহানদের বাসায় রেখে গেছিলাম, আর আমার ছবি আঁকার কিছু জিনিস। এই আমার লাগেজ। জিনিস যত কম হয় তত ভালো। আপাতত বেশ কিছু টাকা আছে আমার অ্যাকাউন্টে। বাবা হয়তো ভাবে, আমাকে টাকা পয়সা যা দেয়া হত সবই আমি উড়িয়ে দিয়েছি। বিষয়টা তা না। বই আর ছবি আঁকার জিনিস কেনা ছাড়া আমার তেমন কিছু কেনার নাই। প্রতি মাসে যে টাকা পেতাম, আই হ্যাভ সেইভড আ বিট। এটা এখন কাজে লাগবে।
আমি এখন তৌফিককে ফোন করবো। কারন আমি ওকে মিস করছি। তৌফিকের এখন মিটিং ফিটিং হাবিজাবি থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু আমার ফোন সে ধরবে।
আমি ফোন হাতে বসে থাকি। ফোন হাতে নেয়া মাত্র ইচ্ছেটা উবে যায়। আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু তৌফিক থেকে যাচ্ছে। তৌফিকের যাওয়ার উপায় নাই।
আমি আরো এককাপ চা বানিয়ে আরেক টুকরা পাউরুটি ভিজিয়ে খেয়ে ফেলি। আমাকে বের হতে হবে। অনেক কাজ প্রথমে কোথায় যাব ঠিক করে ফেলেছি।


– তুমি কোথায় মিঠু?
– ট্যাক্সতে।
– আমি বসে আছি। আসো
– আচ্ছা।
মিঠুর গায়ে লাল গোলাপি টিশার্ট। কালো লেগিনস। এলোমেলো চুল কোনরকমে একটা ব্রাউন রঙের ক্লিপে আটকানো উঁচু করে।
– কী খাবে?
– চপসি। আর আইসড টি।
– মিঠু, বাসায় ফিরে যাও। কিবরিয়া সাহেব খুব চিন্তা করছেন। আমাকে ফোন দিলেন কাল।
– লিসেন তৌফিক, আই হ্যাভ মেড মাই মাইন্ড। যদি বাসাতেও ফিরি, আলটিমেটলি আমি তাই করবো যা আমি ঠিক করে রেখেছি।
– কী সেটা
– আমি চলে যাব
– কোথায়?
– ওয়্যার লাইফ গোজ
– মিঠু, জীবন খুব কঠিন
– আমি জানি। আমি সেটা নিতে পারবো, যদি সেটা আমার জীবনটাই হয়।
– কোনটা তোমার জীবন মিঠু?
– আই হ্যাভ টোল্ড ইউ থাউজেন্ড টাইমস
– আবার বল
– তৌফিক, আমি এইসব পড়ালেখা, চাকরি বাকরি টাকা পয়সা বিয়ে বাচ্চা এর কোনটাই চাই না। আমি আমার মত করে বাঁচতে চাই। আই ওয়ান্ট টু ট্রাভেল। বাট নট উইদ ফ্যামিলি, নট এনিথিং লাইক আ ফ্যামিলি ট্যুর। তোমাদের কাছে হাস্যকর লাগতে পারে, বাট আই ওয়ান্ট টু বি এ জিপসি। আমি জানিনা, আমার এইসব ইচ্ছে টিচ্ছে কতদিন থাকবে। সেসব চিন্তা ঘাড়ে চেপে বসার আগেই আমি বেরিয়ে পড়তে চাই। বিলিভ মি, আমি ভালো থাকবো।
তৌফিক শ্বাস ফেলেন।
– তৌফিক
– ইয়েস
– তুমি আমার সাথে যাবে?
তৌফিক কোন জবাব দেন না। আইসড টি আর লেমোনেড এসে গেছে। মিঠু চুপচাপ বরফ শীতল পানীয়তে চুমুক দেয়।
– আই নোও, ইউ কান্ট। বাট ইটস ওকে।
– মিঠু আমি তোমাকে যেতে দিতে পারিনা
– পারো। কারণ আমাকে আটকে রাখার কিছু নাই। ইউ হ্যাভ ইওর ওউন লাইফ। এন্ড আই অ্যাম নট আ পার্ট অব দ্যাট, ইউ নোও।
– অফকোর্স ইউ আর পার্ট অব মাই লাইফ মিঠু। এ বিগ পার্ট
– মে বি। বাট আই কান্ট হেল্প ইউ। একচুয়ালি ইউ কান্ট হেল্প মি তৌফিক। আই ওয়ান্ট ইউ টু গো উইদ মি। ক্যান ইউ?
তৌফিক জবাব দেন না।
-লাইফ তোমাকে আটকে ফেলেছে তৌফিক। নাও ইউ কান্ট। যদি তুমি বিবাহিত নাও হতে, যদি তোমার বাচ্চারা নাও থাকতো, তাও তুমি পারতে না। ইউ ক্যান টেক রিস্কস ফর বিজনেস, কারন তুমি ভাবো, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি যা চাইছি, সেটা তুমি মানতে পারছো না। এটাকে অস্বাভাবিক ভাবছো। বাবাও তাই। কিন্তু আমি সেভাবে ভাবি না। আমি ভাবি, একটা জিপসী হয়ে পথে ঘোরার জীবনের যে রিস্ক, সেটা নেবার অধিকারও মানুষের থাকা উচিত। সবাই বিজনেস করবে বা বড় চাকরি করবে বা সংসার করবে এমন না। কিংবা সবাই একইভাবে করবে, তাও না। আমি যা চাই, আমাকে তা করতে দেয়া হোক। আ’ম অ্যান অ্যাডাল্ট, ফর গড’স সেক!
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মিঠু।
– তুমি কি আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে?
– অফকোর্স। তোমার সাথে কথা না বলে আমি থাকতে পারি না। তুমি জানো
– কেন পারো না মিঠু?
– বিকজ আই লাভ ইউ
– কেন মিঠু?
– বিকজ অফ দ্য চপসি। দিস ইস টেরিবলি গুড।


এখানে এখন বর্ষাকাল। দিন নাই রাত নাই হুটহাট বৃষ্টি নামে, সাথে ঠান্ডা। মাঝে মাঝে বেশ গরমও পড়ে। তবু কেমন এক আরামদায়ক ব্যাপার আছে বাতাসে। জায়গার নাম কির্তীপুর। কাঠমান্ডু থেকে খুব কাছে। মাত্র দুদিন কাঠমান্ডু থেকে আমি ম্যাপ দেখে চলে এসেছি এখানে। আসা অব্দি এখানেই আছি। পুরোনো শহর, এখানে সেখানে বৌদ্ধ মন্দির, প্রাচীন চেহারার মানুষ আর ভয়ংকর ঝাল নেওয়ারি খাবার- আমার সব কিছুই ভালো লাগছে। আমি কতদিন থাকবো জানি না। আপাতত একমাসের ভিসা, সেটা বাড়াবো নিশ্চয়ই, একমাসে নেপালের মত একটা দেশের কিছুই দেখা হয় না। আমি ছবি তুলছি। এত কিছু আছে ছবি তোলার। অনলি তৌফিক নোজ আয়াম হিয়ার ইন নেপাল। হি প্রমিজড মি নট টু টেল এনিবডি, স্পেশালি বাবা। কিন্তু আমি নিশ্চিত না সে কথা রাখবে কি না। একজন প্রেমিক হিসেবে তৌফিক গ্রেড বি ক্যাটেগরির। তার মধ্যে বাবা ভাব প্রবল। সে আমার টাকা পয়সার মোটামুটি সুরাহা করেছে। ট্যুরিজম সংক্রান্ত একটা বিদেশি ওয়েব ম্যাগাজিনের সাথে আমাকে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে। আমি তাদের নিয়মিত ছবি আর লেখা পাঠাবো। সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট ব্যাপার হলো, বাবা আমার অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়েছে। আমি জানি না, এটাও তৌফিকের কোন কেরামতি কি না। তৌফিক বললে বাবা অনেক কিছুই করবে। এনি ওয়ে, আই নিড দ্য মানি। আরো কিছু কাজ যোগার করতে পারলে, এটা আর লাগবে না। আমি থাকি একটা আশ্রমে। খুব সুন্দর শান্ত নিরিবিলি। আমাকে ছোট্ট একটা ঘর দেয়া হয়েছে। সেটা আদতে একটা বারান্দা ছিল, বাঁশের চিক দিয়ে ঘিরে ঘরমত করা হয়েছে। চিকের পিছনে দুই স্তরে মোটা প্লাস্টিকের আবরণ, ঠান্ডা আটকাতে। আমাকে বলা হয়েছে, আপাতত এ ঘরে থাকা যাবে, কিন্তু আরো ঠান্ডা পড়লে সেটা হবে না। তখন আমাকে ভিতরের লম্বা ঘরটায় আরো পাঁচটা মেয়ে যেখানে থাকে, তাদের সাথে থাকতে হবে। আমি মাথা নেড়ে হু বলেছি। পাঁচ মেয়ের দুইজন নেপালি, একজন ইন্ডিয়ান, একজন তিব্বতি আর একজন এসেছে স্পেন থেকে। এই আশ্রমের মূল আকর্ষণ মেডিটেশন। দিনে পাঁচবার নানারকম সেশন হচ্ছে, সেটাতে সবাই একসাথে অংশ নিচ্ছে। বাকিসময় যে যার মত। শান্তির খোঁজে আসা মানুষ, ইচ্ছে হলে পরস্পরের সাথে কথা বলে, ইচ্ছে না হলে না। তবে কেউ কাউকে ঘাটায় না। ভারি ভালো লাগে ব্যাপারটা।
আমি সারাদিন ছবি তুলি। ক্লান্ত হলে যেখানে ইচ্ছে বসে পড়ি। যেকোন একটা সস্তা হোটেলে ঢুকে খাই। যা খাই সবি ভালো লাগে। যেদিন ইচ্ছে হয় মেডিটেশন করি। সে সময়টা বেশ ভালো লাগে। ভিতরের অস্থিরতা কাটে। এমনিতেই আমার অস্থিরতা কেটে গেছে বেশ। অনলি তৌফিক ম্যাটারস। আমি লোকটাকে ভুলতে পারি না। আমার চাইতে অন্তত বিশ বাইশ বছরের বড় এই লোককে কীভাবে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলবো, সেটা একটা ব্যাপার বটে। তবে এটা ঠিক, বাড়ি ছাড়ার পর থেকে পুরো বিষয়টা আগের চেয়ে অনেক কম জটিল মনে হয়। আগে মাথার ভিতরে যে অপরাধবোধ, গ্লানি আর বিষন্নতা কাজ করতো, এখন সেই বোধ টোধ তেমন তীব্র না। জীবন তোমাকে বুঝিয়ে দেবে, ন্যায় অন্যায় সঠিক বেঠিক বলে যা আছে তা সবই আপেক্ষিক, তুমি কখনো এসবের নির্দিষ্টি সংজ্ঞা দিতে পারো না। বিশেষ করে যখন তুমি ভালোবাসো।

৫.
– তৌফিক, প্লিজ ডোন্ট কাম। আমি নেপাল ছেড়ে যাচ্ছি। এখানে এসে তুমি আমাকে পাবে না।
– কোথায় যাচ্ছ?
– এখনো জানি না। সম্ভবত সিকিম
– আই সি। তৌফিক চাপা শ্বাস ফেলেন। হাও ইজ দ্যাট ম্যান?
– হু? পলিন? ইয়েস হি ইজ গুড। কেন?
– এমনি। পলিনও কি সিকিম যাচ্ছে।
– ইয়েস। আই টোল্ড ইউ। আমার তিনজন বন্ধু হয়েছে। পলিন, অ্যারন, সোফিয়া। আমি ওদের সাথে যাচ্ছি। নট অনলি উইদ পলিন।
– ওকে।
– তৌফিক, পলিনকে নিয়ে তোমার কি কোন সমস্যা হচ্ছে?
– না, তা কেন?
– আমি তোমাকে চিনি
হা হা হা হা হা। ফোনেই গলা কাঁপিয়ে হাসেন তৌফিক। আচ্ছা?
– এনি ওয়ে, আমি রাখছি। এখানে খুব ঠান্ডা পড়েছে। আমাকে কয়েকটা গরম জামা কিনতে হবে। আর একটা ভালো জুতো। বাজারে যাব।
– ওকে। টেক কেয়ার মিঠু।
– তৌফিক
– বল
– আচ্ছা থাক।
– কেমন আছ মিঠু?
– ভালো আছি। লাইফ ইজ গুড

বাসায় যাবার কথা ছিল। যাওয়া হলো না। গাড়িটা কাকলীর মোড়ে এসে গুলশানের দিকে যাবার কথা। তা না গিয়ে কেন এয়ারপোর্ট রোড ধরে উত্তরার দিকে ছুটতে শুরু করলেন, তৌফিক নিজেও জানেন না। আকাশে কালো মেঘ। সন্ধ্যা নামছে হুড়মুড় করে। গাড়ির সিডিতে বাজছে কোহেন।
takes you down to her place near the river
You can hear the boats go by
You can spend the night beside her
And you know that she’s half crayy
But that’s why you want to be there

আজমপুরের সিগন্যালে এসে আকাশের দিকে তাকান তৌফিক। বৃষ্টির দু’একটা বড় বড় ফোঁটা মাঝে মাঝে গাড়ির সামনের গ্লাসে এসে পড়ে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। যেকোন সময় মুষলধারে শুরু হবে। চারিদিক থম ধরে আছে। সিগন্যাল ছাড়লে আবার চলতে শুরু করেন। কোথায় যাচ্ছেন, জানা নাই। কিন্তু ভিতরের অস্থিরতাকে চিরকাল এভাবেই বারবার প্রশমিত করেছেন। পুরোনো প্র্যাকটিস। কিন্তু এবার ভালো কাজ করছে না।

– অল ইউ নিড ইজ লাভ, ইউ নোও তৌফিক?
– আচ্ছা? স্বভাবজাত অট্টহাসি দিয়ে তৌফিক বলেন, তুমি কীভাবে জানো মিঠু? তুমি বাচ্চা একটা মেয়ে
– ওয়েল, যখন থেকে জানি তারপর থেকে আমি আর বাচ্চা নই
– বাহ
– বাসায় যাও। ইউ আর অলরেডি লেইট। শি মাইট বি ওয়েটিং ফর ইউ
– যাচ্ছি
– তুমি বিয়ে করেছিলে কেন?
– সবাই করে তাই
– ওয়েল, তুমি বিয়ে না করলেও আমি তোমাকে বিয়ে করতাম না।
– কেন?
– কারন আমি কখনো বিয়েই করবো না তাই।
– আচ্ছা। তাহলে এই প্রশ্ন কেন?
– তুমি বিবাহিত বলেই আমি তোমাকে মন খুলে চাইতে পারি না। সবসময় মনে হয় দেয়ার ইজ সামওয়ান ওয়েটিং ফর ইউ। আই ফিল ডাউন।
– মিঠু তুমি এত ছোট, আই ফিল গিল্টি। কিন্তু তোমাকে বাদ দিয়ে আমি কিছু আর ভাবতে পারি না। স্ট্রেঞ্জ!
– তুমি এত কিছু ভাবো কেন তৌফিক?
– জানি না।
– আমি যখন প্রথম তোমাকে দেখলাম, তুমি বাবার সাথে বিজনেস টিজনেস হাবিজাবি নিয়ে কথা বলছিলে। বাবা যখন আমাকে তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, তুমি বললে, কোন্ ক্লাস কোন্ স্কুল? এইসব আমার মনে আছে।
– আর কী মনে আছে মিঠু?
– ঐ যে একদিন খুব বাতাস হচ্ছিল আর আমি স্কুল থেকে বেরিয়েই দেখি একটা সাদা গাড়ির পাশে তুমি দাঁড়িয়ে আছো। বাবার ফোন থেকে তোমার নাম্বার নিয়ে ফোন করেছিলাম।
– কেন করেছিলে?
– বিকজ আই ব্যাডলি নিডেড সামওয়ান। আমার ভালো লাগছিল না। আমার মনে হচ্ছিল তুমি সেই লোক যাকে আমি ফোন করতে পারি কিংবা ঘণ্টাখানেক কথা বলতে পারি। এটা কেন মনে হয়েছিল, আমি জানি না। তবে তুমি সত্যিই চলে আসবে, গড! আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না।
– একটা বাচ্চা ফোন করে বলবে আই নিড ইয়োর হেল্প, হাও কুড আই ইগনোর?
হা হা হা হা।
হাঁটুতে ভর দিয়ে বিড়ালের মত পায়ে পায়ে তৌফিকের কাছে আসে মিঠু।
– সো মিস্টার তৌফিক, নাও ইউ নিড আ কিস?
– ইয়েস মিঠু, আই নিড ইট। অল আই নিড – ইজ লাভ।
গাড়ি উত্তরা ছাড়িয়ে নতুন ফ্লাইওভার ঘুরে মহাখালির দিকে ফিরতে থাকে। গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রাখা ফোন বাজছে। গুলশানের দিকে যেতে যেতে বৃষ্টি নামে অঝোর ধারায়।

৭.
প্রিয় তৌফিক,
জায়গাটা সুন্দর। যত সুন্দর ভেবেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি। তবে এখানেও খুব বেশিদিন থাকবো না। একজন নতুন বন্ধু হয়েছে। তার ট্রাক জাতীয় অদ্ভুত এক গাড়ি আছে। তাতে চেপে আমরা দু’এক দিনের ভেতরেই আবার বেরিয়ে পড়বো। তোমার সাথে কয়েকদিন কথা হবে না।
ডু ইউ নোও এনিথিং অ্যাবাউট বাবা? হাও ইজ হি? আমি একদিন ফোন করেছিলাম। কথা বলেনি, ফোন কেটে দিল। এত্ত তার রাগ! শুনলাম বাবা নিউইয়র্ক যাচ্ছে। শেলি আন্টি মেইল করেছিল আমাকে। এইবার বাবা আর ফিরবে বলে মনে হয় না। আমি ছিলাম তার জীবনে একটা যন্ত্রণাময় পিছুটান। ফলে যতবারই সে নিউইয়র্ক তার প্রিেমকার কাছে ছুটে গেছে, শান্তিতে থাকতে পারে নাই। এইবার পারবে আশা করি।
হাও ইজ ইয়োর বিজনেস? গুড? সারাদিন এতো এতো অংকের ভেতরে থাকতে তোমার কেমন লাগে? ইউ নোও, অংক দেখলে আমার ঘুম পায়! তোমার কীভাবে ভালো লাগে? আচ্ছা তৌফিক, হাও ওয়াজ ইয়োর চাইল্ডহুড?
মাঝখানে আমার জ্বর হয়েছিল। এখানে বন্ধুরা খুব সেবাযতœ করেছে। অনেকটা মায়ের মত। ইউ মে আস্ক হাও ডু আই নোও যে মায়ের মত! ইয়েস, আই ডু স্টিল হ্যাভ সাম মেমোরিজ উইদ মা। শি ওয়াজ আ লেডি উইদ ট্রিমেনডাস বিউটি। বাট শি লেফট। হোয়াই ডিড শি লিভ মি তৌফিক?
আজ শেষ করি। ওহ আরেকটা কথা। সেদিন জ্বরের ভেতরে ঘুমের মধ্যে তোমাকে দেখলাম। ইট ওয়াজ নট আ ড্রিম, সামথিং মোর দ্যান ইট, আই মাস্ট সে। দেখলাম তুমি একটা সবুজ কালো মিশেলের বিশাল ঘুড়ি নিয়ে ওড়াচ্ছো আমাদের ধানমন্ডির বাসার ছাদে। আর আমি দাঁড়িয়ে আছি, তাকিয়ে আছি আকাশে ঘুড়ির দিকে। এটুকুই। নতুন স্বপ্ন। এটা এখন কয়েক মাস চলতে থাকবে। হা হা হা হা। আরেকটা আছে, যেখানে তুমি একটা ছোট্ট ঘরের ভিতরে বসে গরম গরম কেক আর বিস্কুট তৈরি করছিলে আর তোমার বিস্কুটের দোকানটা ছিল একটা নদীর পাড়ে, সেই নদীতে আবার বড় বড় ঢেউ, একদম সমুদ্ররে মত। কী ফানি, না?
তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। একদিন নিশ্চয়ই দেখা হবে আমাদের। ঠিক যেরকম একদিন দেখা হবে মায়ের সাথেও। তাকে আমার অনেক কথা বলার আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো মাকে আবার দেখবো বলেই আমি ঘর ছেড়েছি। হয়তো মাকে একনজর দেখে তারপর তাকে ছেড়ে যাব বলেই আমি এমন পথে পথে ঘুরি। জানি না।
ভালো থেকো। আমাদের একটা ক্যারাভান হবে শিগগিরই। উই আর কালেক্টিং মানি। পুরো ক্যারাভান আমরা মনের আনন্দে কালার করবো। ঠিক যেরকম আমি ভাবতাম। যদি খুব হৃদয় দিয়ে ভাবি, তাহলে সেটা বাস্তবে এসে ধরা দেয়। তাই না? এটা কি সত্যি? তুমিও বলতে। আমি তো অনেক কিছুই ভাবি। মাকে ভাবি, বাবাকে ভাবি। তোমাকে ভাবি। ওভেনে বিস্কুট বানাতে বানাতে ক্লান্ত হয়ে তুমি দাঁড়িয়েছো নদীর ধারে। আর আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে আছি শক্ত করে, কারণ নদীর বাতাস খুব ঠান্ডা আর আমার জ্বর হয়েছে।
গুডনাইট তৌফিক। এ স্পেশাল থ্যাংকস ডার্লিং, ফর দ্য সুপার সুইট বিস্কিটস ইউ বেইকড দ্য লাস্ট নাইট।
বাই।

আড়াই ঘণ্টার মিটিং শেষ করে মেইল খুলে বসেন তৌফিক। প্রতিটা শব্দ কয়েকবার করে পড়া। তবুও পড়েন আবার। এই বুড়ো বয়সে এইসব ছেলেমানুষি মানায় না। তবু মানুষ নিজের ভেতরে নিজেরও গোপনে কত কিছুই না করে!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেলসন প্রতীক — এপ্রিল ১২, ২০১৭ @ ১০:৪৮ অপরাহ্ন

      ভাল লাগলো গল্পটি পড়ে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com