‘সমুদ্রস্তন দ্বীপের মতো সে আছে ঘুমিয়ে’ : ডেরেক ওয়ালকটের প্রস্থান

কুমার চক্রবর্তী | ২৪ মার্চ ২০১৭ ১১:০৭ অপরাহ্ন

Walcott১.
শীতল কাচ ছায়াময় হয়ে ওঠে। এলিজাবেথ একবার লিখেছিল—
আমরা কাচকে আমাদের ব্যথার চিত্রকল্প বানিয়ে ফেলি।

২.
কাছে এসো ফিরে
আমার ভাষা।

ওয়ালকট, তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথমত এক ক্যারিবীয় লেখক যিনি মানবগোষ্ঠীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে সবকিছু দেখেছেন আর বলেছেন, পরিপক্বতা হলো প্রত্যেক পূর্বসূরির বৈশিষ্ট্যের সাঙ্গীকরণ। তাঁর একীকরণের বিষয় ছিল ল্যাঙ্গুয়েজ কনটিনাম আর কালচারাল স্ট্রেটাম। ১৯৯২ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত, সেন্ট লুসিয়ার ক্যাস্টিসে ১৯৩০-এর ২৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী ডেরেক ওয়ালকট মনে করতেন যে, অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ লেখকই তাঁদের আত্মবিচ্ছিন্নতা দ্বারা নিজেদের পঙ্গু করে ফেলেন, কবি হিসেবে মানবতার বিভাজনে বিশ্বাস অনুচিত। তাঁর স্টার-আপেল কিংডম কাব্যের ‘দ্য স্কুনার ফ্লাইট’ কবিতায় এই চেতনার স্যাবাইন বলছে এমন কথা যা থেকে তাঁর প্রাতিস্বিকতার পরিচয় ধরা পড়ে:
আমি হলাম সোজাসাপটা একজন লাল নিগার যে সমুদ্রপ্রেমিক,
আমার রয়েছে ঠিকঠাক ঔপনিবেশিক শিক্ষা,
আমি একাধারে ডাচ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং ইংরেজ
আর হয় আমি কেউ নই নতুবা
আমি এক জাতি।

তাঁর ভেতর ইউরোপীয় ইতিহাস, শিল্পসাহিত্য আর সেন্ট লুসিয়ার আফ্রিকানির্ভর সংস্কৃতির সার্থক মিলন ঘটেছে। তিনি ছিলেন না ইউরোপীয় গোছের, আবার সেন্ট লুসিয়ার কৃষ্ণাঙ্গদের মতো কালোও ছিলেন না, ছিলেন কিছুটা সাদাটে। ফলে বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে গ্রহণের ক্ষমতা তাঁকে দিয়েছে সময়ের এক অতলান্ত কৌলিনত্ব। তিনি বলেছিলেন: ‘আামি এক বিচ্ছিন্ন লেখক: আমার মধ্যে রয়েছে এমন-এক ঐতিহ্য যা একদিকে গ্রহণ করে যায়, আর আছে অন্য এক ঐতিহ্য যা অন্যদিকে বিস্তারিত হয়। একদিকে অনুকরণশীল, বর্ণনাত্মক ও নৃতাত্ত্বিক উপাদান অন্যদিকে তা আবার সাহিত্য ও ধ্রুপদি ঐতিহ্যে শক্তিশালী।’

কবি হিসেবে সততই তিনি নিজেকে পুনরাবিষ্কার করে গেছেন। ১৯ বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কাব্য ২৫টি কবিতা এবং যুবকের জন্য এপিটাফ থেকে ওমেরস পর্যন্ত, এবং তিরিশটির মতো নাটকে, বিশাল বিস্তার ও গভীরতা তাঁকে করে তুলেছে মহান লেখক। প্রথম দিকের কবিতায় এলিঅট, পাউন্ড, ডিলান টমাস, অডেনদের তুমুল ছায়াসম্পাত সত্ত্বেও পরবর্তীসময়ে এই প্রভাবকে আত্মস্থ করে তিনি স্বকীয় হয়ে ওঠেন। ‘মিউজ অব হিস্টি’তে তিনি বলেছেন: ‘অনুকরণের ভয় গৌণ কবিদের অবশ করে রাখে। বড়ো কবিরা যা পাঠ করে তাকে আত্মস্থ করেই নিজ মৌলিকত্বকে প্রতিষ্ঠা করে যায়।’ এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন: ‘কোনোদিন আমি স্পেন্ডারের মতো লিখি, কোনোদিন লিখি ডিলান টমাসের মতো, আর যখন বুঝি যে পছন্দের অনেক কবিতা লেখা হয়ে গেছে, কেবল তখনই তা ছাপতে দিই।’
১৯৯০ সালে প্রকাশিত ওমেরস এক মহাকাব্য, কবিতায় লিখিত এক আধুনিক উপন্যাসও বলা যায় তাকে। তিনশ পৃষ্ঠায় ব্যাপ্ত তিনচরণবিশিষ্ট স্তবকবিন্যস্ত তেরসারিমা ছন্দে এক আশ্চর্য বুনুনশৈলীর উদ্ভাাসন, যাকে সমালোচকেরা বলেছেন–প্লট, ইমেজ আর ভাষাতাত্ত্বিক নাটকীয়তার এক দীর্ঘ ও জটিল ইন্দ্রজাল। এতে রয়েছে ৬৪টি অধ্যায় যা আাবার ৭টি পুস্তকে বিন্যস্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে ৩টি ভাগ। প্রথম পুস্তকে ১৩টি, দ্বিতীয়টিতে ১১টি, তৃতীয়টিতে ৮টি, চতুর্থ পুস্তকে ৪টি, পঞ্চমে ৭টি, ষষ্ঠে ১২টি আর সপ্তম পুস্তকে ৯টি অধ্যায় রয়েছে। ওমেরস-এ প্লটের তিনটি প্রধান গ্রন্থি রয়েছে: প্রথমটি, হেক্টর আর অ্যাকিলিস সেন্ট লুসিয়ার মাঝি হেলেনের অনুগ্রহের জন্য প্রতিযোগিতারত; দ্বিতীয়টি, মেজর ডেনিস প্লাংকেট আর তার স্ত্রী মড আয়ারল্যান্ড থেকে সেন্ট লুসিয়ায় এসে দ্বীপের ইতিহাসবিষয়ে অনুসন্ধান চালায়, হেলেন, যে তাদের জন্য কাজ করবে, সেও এই কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ; তৃতীয়টি, লেখক গল্পের বাতাবরণে আশ্চর্যান্বিত হন, অন্ধ দ্রষ্টা সাতসমুদ্রের সহযোগী হন।
ওয়ালকটের অ্যানাদার লাইফ আত্মজীবনীমূলক দীর্ঘ কবিতা। ২৩টি অধ্যায়ের এই গ্রন্থ চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত যার প্রতিটিই একটি এপিটাফ দিয়ে শুরু হয়। জীবন ও শিল্পের সহসম্পর্ক সার হয়ে দেখা দেয় এই গ্রন্থে:
না কোনো রূপক, না রূপান্তর,
যেন কয়লার চুলা তার ধোঁয়ার দরজায় পরিণত।
তিনটি জীবন কল্পনায় অপসৃত,
তিনটি ভালোবাসা: শিল্প, প্রেম আর মৃত্যু,
নিশ্বাসে মেঘাবৃত দর্শন থেকে মুছে যায়,
কোনোটাই বাস্তব নয়,তারা বাঁচতেও পারে না মরতেও পারে না,
তারা সব অস্তিত্বময়,

ওয়ালকটের লেখায় দেখা মেলে ভাষার দার্ঢ্য ব্যঞ্জনা, প্রসারিত আর জাগতিক রূপকের কানামাছি খেলা। ক্যারিবীয় সাহিত্যের তিনি এক বিনির্মাণকারী। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন: ‘প্রতিটি সূর্যাস্ত তোমার জীবনের রক্ত থেকে তুলে নেয় আঠালো তরল।’ তাঁর মৃত্যু ক্যারিবীয় তথা বিশ্বসাহিত্যের অপূরণীয় এক স্তব্ধতা।

ওয়ালকটের তিনটি কবিতা

নতুন বিশ্বের মানচিত্র
১. দ্বীপপুঞ্জ

এই বাক্যের শেষে, নামবে বৃষ্টি,
বৃষ্টির প্রান্তে, একটি পাল।

ধীরে পাল হারিয়ে বসে দ্বীপের দৃশ্যাবলি;
পোতাশ্রয়ে কুয়াশামগ্ন হয়ে পড়ে সমগ্র জাতির বিশ্বাস।

দশ বছরের যুদ্ধ শেষ।
হেলেনের চুল, ধূসর মেঘমালা।
ট্রয়, সমুদ্রের ধারে
এক সাদা অগ্নিকুণ্ড।

বীণার তারের মতো ঋজু সব ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি।
মেঘময় চোখের একজন তুলে নেয় তা
আর রচনা করে ওদিসির প্রথম পঙ্ক্তিটি।

সমাপ্তি

জলের ওপর বাস,
একা। নেই স্ত্রী বা সন্তানাদি।
সব সম্ভাবনাকে নিয়েই
এখানে আসা:
ধূসর জলের ধারে নীচু ঘরখানা,
জীর্ণ সমুদ্রের দিকে জানালাটি খোলা।
এসব পছন্দের নয় আমাদের,

কিন্তু আমরা হলাম আমাদেরই নির্মাণ।
কষ্ট পাই, সময় যায় চলে, আমরা ছেড়েছি
পথ পারাপার, কিন্তু তা নয়
নির্ভারের প্রয়োজনে।
ভালোবাসা হলো পাথর
ধূসর জলের তলে সমুদ্রবিছানায় রয়েছে যে স্থিত।
এখন, কবিতা থেকে কিছুই নেই পাওয়ার শুধু
সত্যবোধ ছাড়া,
না করুণা, না খ্যাতি, না উপশম। নিশ্চুপ স্ত্রী,
ধূসর জল দেখতে এসো বসি,

ক্লিশে আর তুচ্ছতায় প্লাবিত জীবন
পাথরের মতোই করে বাস।
অনুভবকে ভুলে যাব আমি,
ভুলে যাব আর সব চাওয়াপাওয়ার চাল।
জীবনের অপসৃয়মাণতার চেয়ে এসব
কঠিন আর সত্যিই বিশাল।

সমুদ্রগুল্ম

অর্ধেক বন্ধুরাই চলে গেছে মৃতদের দেশে।
পৃথিবী দিতে চাইল নতুন বন্ধু আমাকে।
চিৎকার করে বললাম,তা-না করে তুমি ফিরিয়ে দাও তাদের, মৃত বন্ধুদের,
যেমনটি তারা ছিল ভালোমন্দ মিলিয়ে একদা।

আজ রাতে গুল্মবনের ভেতর
মিইয়ে যাওয়া সমুদ্রের একটানা গর্জনে
শোনা যাচ্ছে মৃত বন্ধুদের কথাবার্তা।
কিন্তু আমি হাঁটতে পারি না সমুদ্রে বিছানো জোছনায়

পরিষ্কার পথ ধরে নির্জনে একা
অথবা জগতের থেকে মুক্ত হয়ে
উড়তে পারি না লক্ষ্মী পেঁচার মতো।
হে আমার ব্রহ্মাণ্ড, প্রেমের জন্যে যারা গেছে
তার চেয়ে বেশি রয়েছে অনেকে জীবনে।

সবুজ ও রূপালি সমুদ্রের উজ্জ্বলতা,
গুল্মবন, বন্ধুর পথ,
আমার বিশ্বাসের ফেরেশতার বর্শা ছিল তারা
কিন্তু যারা গেছে হারিয়ে তাদের চেয়ে উত্তম কেউ জন্মাক তো।

যৌক্তিক উজ্জ্বল পাথর, সহনীয় জোছনা তার গায়
পেরিয়ে নিরাশা, বাতাসের তোড়
ফালা ফালা করা গুল্মবন
মৃত বন্ধুদের নিয়ে আসবে
তাদের ভালোমন্দসহ।

উৎস: ডেরেক ওয়ালকট: কালেক্টেড পোয়েমস, ১৯৪৮-১৯৮৪, ফেবার অ্যান্ড ফেবার।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ৯:৫৩ পূর্বাহ্ন

      কবিতার অসামান্য অনুবাদ ! আমি ঠিক একে অনুবাদ বলব না । এই হচ্ছে সৃজন-প্রক্রিয়ার অন্য এক বিন্যাস । দীর্ঘজীবী হোক কবি ডেরেক ওয়ালকট এবং সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ায় নিরন্তর নিমগ্ন থাকুন আপনি, কবি কুমার চক্রবর্তী !

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com