ক্যারিবিয় হোমারের মহাপ্রয়াণ

কামরুল হাসান | ২৪ মার্চ ২০১৭ ৫:৩৫ অপরাহ্ন

D.W.অতিসম্প্রতি প্রয়াত হলেন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের নোবেল বিজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট। উল্লেখ্য যে তিনিই পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রথম নোবেল বিজয়ী কবি নন, যদিও কবিতাবিশ্বে তিনিই বেশি আলোচিত। তাঁর আগে ১৯৬০ সালে সাঁ ঝ পের্স সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ওয়ালকটের নোবেল প্রাপ্তি তার ৩২ বছর পরে, ১৯৯২ সালে। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেন্ট লুসিয়ায় ১৯৩০ সালে। প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা সেন্ট লুসিয়াতেই। তাঁর স্কুল শিক্ষিকা মা কবিতা ভালোবাসতেন, ঘরে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতেন। শৈশবে শোনা সেসব কবিতা শিশু ও বালক ওয়ালকটের অবচেতনে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে। তবে তিনি হতে চেয়েছিলেন তার বাবার মতো চিত্রশিল্পী। চিত্রকলায় দীক্ষাও নিয়েছিলেন হ্যারল্ড সিমন্সের কাছে। কবিতা নয়, তার প্রাথমিক হাতেখড়ি চিত্র অাঁকায়। দুর্ভাগ্য বাবার মুখ তিনি দেখতে পাননি। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তার বাবা যখন মারা যান, তখন ডেরেক ও তার জমজ ভাই রবার্ট মাতৃগর্ভে ছিলেন।

কিছুদিন ছবি আঁকার পরেই তিনি ইংরেজি ভাষার প্রেমে পড়ে যান, যা থেকে জন্ম নেয় সাহিত্যপ্রীতি। টি এস এলিয়ট ও এজরা পাউন্ডের কবিতাপাঠ তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে এবং সাহিত্যকেই ধ্যানজ্ঞান করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে মায়ের কাছ থেকে ২০০ ডলার সাহায্য নিয়ে তিনি দু’টি কাব্যগ্রন্থ্ নিজেই প্রকাশ করেন। বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে বই বিক্রি করে মায়ের কষ্টে অর্জিত অর্থ ফেরৎও দিয়েছিলেন।

উল্লেখিত দু’জন মহারথী ছাড়াও তাঁর কবিতায় দু’জন সমসাময়িক অামেরিকান কবি রবার্ট লাওয়েল ও এলিজাবেথ বিশপের প্রভাব রয়েছে। ডেরেক নিজেই তা স্বীকার করেছেন। কবি মাত্রেই প্রভাবিত হন, কিন্তু বড় কবির যে স্বাক্ষর, প্রভাব ছাড়িয়ে মৌলিক কবিতা রচনা- তাই ক্রমশ দানা বাঁধে তাঁর কবিতায়। বস্তত তিনি যে একজন জন্মপ্রতিভাবান কবি তা ফুটে ওঠে তাঁর প্রাথমিক রচনাবলীতেই। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তাঁর মহাকাব্যধর্মী রচনা Omeros প্রকাশের পরপরই কবিতাবিশ্বের মনোযোগ কাড়ে। তিনি যেন মহাকাব্যের হোমারকেই ফিরিয়ে অানলেন, কেননা এতে ইলিয়াডের অনেক চরিত্রের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। Omeros-কে ডেরেক ওয়ালকটের সাহিত্যকীর্তির বড় অর্জন বলে মনে করেন কাব্যবোদ্ধা ও সমালোচকগণ। কবিতার পাশাপাশি তিনি অনেক নাটক রচনা করেছেন, নাটকের দল তৈরি করেছেন, দিয়েছেন নাটকের নির্দেশনা। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়িয়েছেন, তার সবকটিতেই নাট্যচর্চ্চার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এতে বোঝা যায় কবিতার পরেই তাঁর প্রধান ভালোবাসা ছিল নাটক ও নাট্যমঞ্চ। সাহিত্যের দু’টি মাধ্যমেই তিনি শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৭১ সালে লেখা Dream on Monkey Mountain প্রকাশের পরপরই Obie Award জিতে নেয় এবং আমেরিকার টিভিতে প্রদর্শিত হতে থাকে। সুতরাং তাঁর প্রতিভা ছিলো, স্বীকৃতি পেয়েছেন প্রতিভার স্বাভাবিক নিয়মেই।

সেন্ট লুসিয়ায় পড়াশোনা শেষ করে তিনি ত্রিনিদাদে বসবাস শুরু করেন, পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতাকে, পাশাপাশি সাংবাদিকতার সাথেও যুক্ত ছিলেন। কবি ও নাট্যকার হিসেবে আমেরিকার বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যান। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন আরেক নোবেলজয়ী পোলান্ডের অভিবাসী কবি জোসেফ ব্রডস্কি। সেখানে পড়াতে আসেন আইরিশ কবি সিমাস হিনি, যিনি ১৯৯৪ সালে সাহিত্যে নোবেল অর্জন করেন। তাদের তিনজনের মাঝে চমৎকার বন্ধুত্ব ছিলো এবং পরবর্তীকালে ডেরেক ওয়ালকট যখন বিতর্কের শিকার হন, তখন ব্রডস্কি ও হিনি দু’জনেই ওয়ালকটের পাশে এসে দাঁড়ান, অপপ্রচারের বিরোধিতা করেন। এটা ঘটেছিলো ২০০৯ সালে যখন তিনি অক্সফোর্ড প্রফেসর অফ পোয়েট্রির পদের জন্য নিজের প্রার্থিতা দাখিল করেন। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয়েছিল। বিতর্কের কারণে তিনি নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। এরপরে তিনি এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে (২০১০-২০১৩) কবিতার অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এ বিশ্ববিদ্যালয় ডেরেক ওয়ালকটকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।

কী আছে ডেরেক ওয়ালকটের কবিতায়? নোবেল পুরস্কার প্রদানের সময় নোবেল কমিটি তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির যথার্থতা তুলে ধরতে গিয়ে কবিতার যে বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন তা হল, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশিকউত্তর কালের যে জটিল প্রভাব, বহুমাত্রিক সংস্কৃতির যে মিশেল তার অনন্য উপস্থাপন রয়েছে তাঁর কবিতায়। তিনি ছিলেন মেথডিস্ট চার্চে বিশ্বাসী, কবিতাকে উপাসনার বাইরে ভাবতেন না। ঈশ্বরের প্রতি প্রবল বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি তাঁর কবিতায় রয়েছে ঈশ্বরসৃষ্ট প্রকৃতির মধুর ও সুন্দর উপস্থিতি। তিনি শব্দের আনন্দসঞ্চারী ক্ষমতাকে নিজ কবিতায় ছড়িয়ে রেখেছেন। কবিতা সৃষ্টিকে দৈব ব্যাপার বলেই ভাবতেন, যখন কবিতা মাথায় ভীড় করতো, তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নির্জনতার সাধক হতেন, বিশ্বাস করতেন কবিতা সৃষ্টির জন্য নির্জনতা প্রয়োজন। তাঁর মতে কবির অস্তিত্বকে পুনর্জীবনের বদলে কবিতা কবির অনস্তিত্বকেই পুনর্জীবিত করে।

জীবনে বহু পুরস্কার লাভ করা জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি হয়ে ওঠা ডেরেক ওয়ালকট নোবেল প্রাপ্তির পরেও সুদীর্ঘ ২৫ বছর বেঁচেছিলেন। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য রানী তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন। এরও আগে তিনি রানীর কাছ থেকে অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার (OBE), ১৯৮৮ সালে ‘কবিতার জন্য রানীর স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। বস্তুত ইংল্যান্ডের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো সুনিবিড়। তিনি জীবনের বহুবছর ইংল্যান্ডে কাটিয়েছেন। আজীবন শিক্ষকতা ও লেখালেখিতে ব্যাপৃত ডেরেক ওয়ালকটের সাহিত্যকর্মে রয়েছে ২০টি নাটক, ১৯টি মৌলিক কাব্য ও ৮টি প্রবন্ধ ও সাক্ষাৎকারের বই। তাঁর নির্বাচিত কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিলো অন্ততঃ পাঁচবার, যা প্রমাণ করে তাঁর প্রতিভা কতটা প্রভাবসঞ্চারী।

ব্যক্তিজীবনে তিনি তিনবার বিয়ে করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোন বিয়েই শেষাবধি টিকেনি। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে তার একটি পুত্র সন্তান রয়েছে; দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে এলিজাবেথ ও অান্না নামের দু’টি কন্যা সন্তান রয়েছে। তিনি ভ্রমণ ভালোবাসতেন। সেন্ট লুসিয়ায় নিজগৃহে গত ১৭ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নোবেলবিজয়ী এই শক্তিমান কবির প্রয়াণে কবিতাবিশ্বের সাথে আমরাও শোকসন্তপ্ত। ক্যারিবীয় কবিতা ও ইংরেজি কবিতায় তাঁর কবিতার প্রভাব ও উপস্থিতি বহুকাল ধরেই থাকবে বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা!
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Avijit — মার্চ ২৫, ২০১৭ @ ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার হয়ছে লেখাটা। কবির কবিতার পেছনে যে কি পরিমান তথ্য আছে জানা ছিল না। পড়ে অত্যন্ত ভাল লেগেছে। জেনে আরও বেশি ভাল লেগেছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Luna Binta Rahman — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ১২:১৭ অপরাহ্ন

      এত বড় মাপের কবির ব্যাপারে আগে জানতাম না । লেখাটি অনেক তথ্যবহুল ছিল। আর একজন উঁচু মনের কবিই পারেন আর একজন জগৎ বিখ্যাত কবির জীবনাখ্যান এত সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে। স্যার, এক্ষেত্রে আপনি অতুলনীয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sumaiya — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ১২:৩০ অপরাহ্ন

      কবির প্রয়াণে সমব্যথী। তাঁর সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রইলো। কবিরা বেঁচে থাকেন তাদের কবিতায়, তাদের কাজে।
      তথ্যপূর্ণ এবং ভীষণ আবেগময় একটি লেখা। বেদনা এবং গভীর ভালোলাগা একসাথে পাওয়া গেলো লেখাটি পড়ে। একজন কবি নিজের অহমিকা না রেখে আরেকজন কবিকে নিয়ে দারুন একটি লেখা লিখেছেন। নিশ্চয়ই তিনি প্রশংসার দাবিদার।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুল হাসান — মার্চ ২৬, ২০১৭ @ ২:৩৯ অপরাহ্ন

      অভিজিৎ মন্ডল, লুনা বিনতে রহমান ও সুমাইয়া বুশরাকে ধন্যবাদ ডেরেক ওয়ালকটকে নিয়ে আমার লেখাটি পাঠ করে মন্তব্য প্রকাশের জন্য। আর্টসবিডিনিউজের অগুণিত বোদ্ধা পাঠকদের কথা স্মরণ করলে কেবল তিনজনের মন্তব্য পাওয়া অপ্রতুল বলে মনে হয়। আর সে কারণেই এই তিনজনের মন্তব্য আমার কাছে মূল্যবান।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com